Author Picture

বৈষ্ণব কবিদের কাজ

সৈয়দ আবুল মকসুদ : বাংলা ভাষার সবচেয়ে মৌলিক এবং বিশ্বসাহিত্যের মৌলিক শিল্পকর্মগুলোর অন্যতম বৈষ্ণব পদাবলী। তাতে শুধু আর্ট নয়, আছে ফিলসফিও। আছে রস, আছে ভাব। নর-নারীর দেহঘনিষ্ঠ প্রেমের কথা আছে, অতিন্দ্রীয় ঈশ্বরপ্রেমের কথাও আছে। তাতে কি আছে বা না আছে, তার চেয়ে বড় কথা সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্ম হিসেবে তা চমৎকারিত্বে নিখুঁত, অনবদ্য, উৎকর্ষের পরাকাষ্ঠা।
বিদ্যাপতি, চ-ীদাস, গোবিন্দদাস, জ্ঞানদাসদের বিদেশী কারও দ্বারা বা ভিনদেশী- পশ্চিমজগতের হোক বা পূর্বদেশের হোক- কোনো কবির দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ ছিল না। সুতরাং কাউকে অনুকরণ করার প্রশ্নই আসে না। প্রয়োজনও হয়নি। তারা তাদের হৃদয়ের ভেতর থেকে লতিয়ে উঠা কথাই লিপিবদ্ধ করে গেছেন। রয়েছে তাতে তাদের জীবনের কথা এবং তাদের জীবনদর্শন- ফিলসফি অব লাইফ। সতের ও আঠার শতকের বাংলা সাহিত্য যদি কখনও বিলীন হয়ে যায় বৈষ্ণব পদাবলী চিরকাল বেঁচে থাকবে। তা শিল্পকর্ম হিসেবে অক্ষয়, অমর।
আমি যখন বাংলা সাহিত্য নিয়ে কিছু ভাবি তখন বৈষ্ণব পদাবলী থেকেই শুরু করি। তার ওদিকে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করি না, এদিক থেকেও শুরু করি না। ওদিক থেকে শুরু না করলে বিশেষ ক্ষতি নেই; এদিক থেকে শুরু করলে বাংলা সাহিত্যের সুন্দর ও স্নিগ্ধতম অংশটিই বাদ পড়ে যায়।
কি বিদ্যাপতি কি চ-ীদাস- তারা একজন না কয়েকজন তা নিয়ে মাথা ঘামানো আজ অর্থহীন। তারা তাদের পদাবলীতে প্রেমের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন, নর-নারীর চিরকালের হৃদয়ের আবেগ ও ভাষাকে বন্দি করে রেখেছেন এবং রেখেছেন এক বিস্ময়কর শিল্পিত ভাষায়, সেটাই বড় প্রাপ্তি। বঙ্গের বৈষ্ণব ধর্মসাধনায় পরকীয়া প্রেম বা রসসাধনা পদ্ধতি আধ্যাত্মিকতায় ম-িত হয়ে তাদের কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে। সেটি চাট্টিখানি কাজ নয়। চ-ীদাস বা অন্য বৈষ্ণব কবিদের পদে অশ্লীলতার দোষ খুঁজে পেয়েছেন আধুনিক যুগের ভদ্রলোক ও বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা সাহিত্যের রসবিচারকরা। চ-ীদাসের শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের পদগুলোতে গ্রাম্যতা দোষ আছে, আছে অশ্লীলতার ছোঁয়া, তাতে হলটা কী? তাতে আছে অপরিমেয় রস ও প্রচুর ভাবের কথা। ওগুলোই তো আসল।
বৈষ্ণব কবিদের সময়, সেই চৌদ্দ, পনের ও ষোল শতকে, পুরো বাংলাদেশটাই তো ছিল গ্রাম, ছিটেফোঁটা শহর যা ছিল তা সামান্য। যে কবি গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে বাস করেন, তিনি তো তাদের হৃদয়াবেগের কথা তাদের ভাষাতেই প্রকাশ করবেন। তাতে যদি গ্রাম্যতা থাকে তো থাকল। এক সময় বৈষ্ণব প্রেমধর্মে ভেসে গিয়েছিল বাংলাদেশ। বৈষ্ণব কবিরা সেই সময়েরই কবি। আজকের শহরগুলোর মতো শ্বাসরুদ্ধকর যানজটের কোনো শহরে যদি বৈষ্ণব কবিরা বাস করতেন তা হলে তাদের পদের ভাষা হতো ভিন্ন। তাদের পদের বিষয়বস্তু হতো একেবারেই অন্যরকম।
বৈষ্ণব সাহিত্য হল রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা। বৈষ্ণবধর্ম হল প্রেমধর্ম। শ্রীকৃষ্ণ বলে কোনো ব্যক্তি ছিলেন কিনা, থাকলে তার দৈহিক গড়ন ও সৌন্দর্য কেমন ছিল তা প্রত্যক্ষদর্শী কারও থেকে পাওয়া যায়নি। কিন্তু কল্পনার কৃষ্ণ আমাদের মাঝে খুবই আছে, আমরা তাকে দেখতে পাই মনের চোখে। ভক্তের দৃষ্টিতে তিনি তুলনাহীন সৌন্দর্যের অধিকারী। শুধু সৌন্দর্য নয়, তিনি অপার মানবিক গুণের আধার। বয়সের দিক থেকে কৃষ্ণ নবযৌবনপ্রাপ্ত। তাকে বলা হয় ‘নওলকিশোর’। তার গায়ের রং চিকন কালো যেন ‘আষাঢ়ে আকাশে নবমেঘ’। গোবিন্দদাসের ভাষায় ‘তরুণতমাল’। কৃষ্ণের গায়ের রংকে বৈষ্ণব কবিরা কেউ কেউ তুলনা করেছেন চোখের কাজলের সঙ্গে। রং তার যা-ই হোক, তার রূপের লাবণ্য অতুলনীয়। তার রূপ দেখে মদন বা হিন্দুপুরাণের কাল ও প্রেমের দেবতা বা কামদেব পর্যন্ত মূর্ছা যান। গোবিন্দদাসের কি অপরূপ বর্ণনা :
ঢল ঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণী অবণী বহিয়া যায়।
ঈষৎ হাসির তরঙ্গ-হিলোলে মদন মূর্ছা যায়।
বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা প্রত্যেক কবির চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী ও আকর্ষণীয় বয়সী। একেক কবি রাধাকে একেক রূপে এঁকেছেন। রাধার রূপ বর্ণনায় কবিদের কল্পনার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। এ ব্যাপারে তাদের ভাষা অতি উচ্ছ্বসিত। অপরূপ উপমা ব্যবহার করেছেন অজস্র। রাধার মুখ শরৎকালের নির্মেঘ আকাশের পূর্ণিমার চাঁদের মতো অকলংক। গোবিন্দদাসের ভাষায় : ‘মুখম-ল জিনি শারদ সুধাকর।’
রাধার পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত সবই সৌন্দর্যের উপমা। তার শরীরের আকর্ষণীয় অংশগুলোর যে বর্ণনা পাওয়া যায় বৈষ্ণব কবিতায় তা মধ্যযুগের বিশ্বসাহিত্যের আর কোনো ভাষায় বিরল। রাধার চুল, ভুরু, চোখ, কপোল, নাক, চিবুক, ঠোঁট, গ্রীবা, বাহু, স্তন, কোমর, নিতম্ব, জঙ্ঘা প্রভৃতি কি যে অপরূপ তা শুধু বৈষ্ণব কবিদের নয় পৃথিবীর যে কোনো পুরুষের মাথা বিগড়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। ওই সব অঙ্গের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে কবিরা যে উপমা-উৎপ্রেক্ষা দিয়েছেন তাকে বাংলা ভাষার আর কোনো কবি অতিক্রম করতে পারেননি।
রাধার ঘন মেঘের মতো চুল পুরো পিঠ ছাপিয়ে তার নিতম্বে গিয়ে আছড়ে পড়েছে। এক কবি বলেছেন, তার মুখ চাঁদের মতো, আরেকজন বলেন শরতের জলাশয়ে প্রস্ফূটিত পদ্মের মতো অপরূপ। চাঁদের শুধু রূপ আছে সৌরভ নেই, পদ্মের রূপও আছে স্নিগ্ধ সৌরভও আছে। রাধার রূপ থেকে যেন ঘ্রাণ বের হয়। রাধার চোখের যে কত উপমা দিয়েছেন! চোখ নারীর আকর্ষণীয় অঙ্গগুলোর একটি। রাধার কালো ভ্রমরের মতো বা হরিণীর মতো নয়ন শুধু কৃষ্ণের নয়, বৈষ্ণব কবিদের নয়, বাঙালি পাঠকেরও হৃদয় হরণ করে। কোনো কোনো কবির ভাষায় খঞ্জনের মতো রাধার চোখ। তার কাজলকালো চোখে বাঁকা ভুরুর এমনই শক্তি যে তা পুরুষের বুকে গিয়ে বেঁধে। কৃষ্ণের প্রতি কৃত্রিম কোপে রাধা যে ভ্রƒকুটি করেন তার কাছে নীল যমুনার তরঙ্গ-ভঙ্গ হার মানে। রাধার দাড়িম্ববীজের মতো বা ডালিমের দানার মতো এমন সুন্দর দাঁত, যখন তিনি হাসেন তখন ঝরে পড়ে সে ‘হাসিতে অমিয়া ধারা’ [চ-ীদাস]। অথবা সে হাসিতে বিজলী চমকায় এবং মধুও প্রবাহিত হয়- ‘দামিনী ঝলকত/হসইতে অমিয়া ধারা’ (গোবিন্দদাস)। আবার একই কবি বলেন :
যাঁহা যাঁহা হেরিয়ে মধুরিম হাস।
তাঁহা তাঁহা কুন্দকুমুদ পরকাল।
রাধা যার পানে তাকিয়ে তার ‘নয়নবান’ হানেন সেই পুরুষের ধরাশায়ী হওয়া ছাড়া উপায় নেই। চ-ীদাসের ভাষায়, ‘আড় নয়নে ঈষৎ হাসিয়া ব্যাকুল করিল মোরে।’
রাধিকার ঠোঁট ফুলের পাপড়ির মতো। তার বুকের ভূগোল বিশেষ করে তার
স্তনের যে বর্ণনা দিয়েছে বৈষ্ণব কবিরা তার কোনো তুলনা নেই। তার স্তন নরোম কিন্তু সুঢৌল। তিনি পরেছেন গলায় মোতির মালা। সেই মালা গিয়ে পড়েছে তার দুই স্তনের ওপরে। বিদ্যাপতি কল্পনা করেছেন রাধার বুকে শোভিত মোতির মালা যেন দুটি পর্বতশৃঙ্গের ওপর প্রবাহিত দুটি
জলস্রোত। তার ভাষায় :
পীন পরোধর অপরূপ সুন্দর
উপর মোতিম হার।
জনি কনকাচল উপর বিমল জল
দুই বহ সুরসরি ধার।
সব বৈষ্ণব কবির কাছেই রাধার বুক যেন দুই পাহাড়ে চূড়া। ‘যুগল গিরি’। মালা পরা অবস্থায় নিখুঁত স্তনের অধিকারিণী রাধা চ-ীদাসেরও বর্ণনার বাইরে থাকতে পারেন না। তিনিও পূর্ববর্তী বিদ্যাপতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বলেছেন :
উঁচ কুচ মূলে হেম হার দোলে
সুমেরু শিখর জিনি।
রাধার কোমর সরু। কিন্তু তার নিতম্ব সুডোল ও ভারী। আজও গ্রামের মানুষ কোমরকে মাজা বলে। গোবিন্দ দাস রাধার কোমর সম্পর্কে বলেছেন, ‘অতিশয় মাজা ক্ষীণী’। তবে বলেছেন তার নিতম্ব যেমন তেমন নয়, তার ভাষায় রাধা হলেন ‘গুরুয়া নিতম্বিনী’। তিনি বলেছেন, রাধার দুই ঊরু সুগঠিত- ‘ঊরুযুগ সুর্বলনী’। বিদ্যাপতিরও চোখ এড়ায়নি রাধার নিতম্ব। তার ভাষায় ‘কটিক গৌরব পায়ল নিতম্ব’।
রাধা হলেন চিরকালের নারী। সেই নারীর শরীরের অনির্বচনীয় অঙ্গগুলোর বর্ণনা দেয়ার সুযোগ বা বাস্তব অবস্থা আমাদের চেয়ে মধ্যযুগের কবিদেরই ছিল বেশি। রাধার উত্তমাঙ্গ ও নিম্নাঙ্গের সৌষ্ঠব ও সৌকুমার্য বর্ণনা করতে যে বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রয়োজন বৈষ্ণব কবিদের তা ছিল। এ কালের কোমলমতি কোনো কোনো পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেয়া ভালো যে উনিশ শতকের আগে বাঙালি মেয়েরা ব্রা তো দূরের কথা ব্লাউজ পর্যন্ত পরতেন না। তাদের শরীরের অনেকটাই ছিল দৃষ্টিগ্রাহ্য। শাড়ি দিয়ে শরীর যতটা সংযতভাবে ঢেকে রাখা সম্ভব তারা তাই রাখতেন।

[দুই]
মানুষকে তার সমাজ, পরিবেশ ও নিসর্গ থেকে আলাদা করা যায় না। বৈষ্ণব কবিদের সময়ে বাংলার নৈসর্গিক পরিবেশের সঙ্গে আজকের বাংলাদেশের পরিবেশের পার্থক্য স্বর্গ ও নরকের। বৈষ্ণব কবিদের বাংলায় প্রতিটি জনপদই ছিল এক একটি তপোবন। এমন গ্রাম খুব কমই ছিল যার পাশ দিয়ে ছোটো হোক, মাঝারি হোক বা বড় হোক, নদ-নদী, উপনদী, শাখানদী প্রবাহিত হতো না। পানি আনতে নারীদের যেতে হতো নদীর ঘাটে। তারা নাইত নদীতে বা পুকুরে। নারীকে দেখা যেত কলসী কাঁখে নদী থেকে পানি নিয়ে ঘরে ফিরতে। নিজের নিতম্বের ভার, তার উপর কাঁখে ভরা কলস, দুই ভার বইতে কষ্ট হতো যুবতীর। তাই দেখে কবি লিখলেন, ‘গৌরী ধীরে চলো, গাগরী ছলক নাহি কয়।’ হে গৌরবর্ষা মেয়ে একটু ধীরে যাও, আমিও তোমাকে দেখি, তোমার কাঁখের কলস থেকে পানি ছলকে পড়ে যাবে।
নদীতে গোসল করে ভেজা বসনে বাংলার নারী সলজ্জ পদক্ষেপে ঘরে ফিরত। বাড়ির কোথাও আড়ালে দাঁড়িয়ে কাপড় পাল্টাত। কারো শরীরে আকাশী রংয়ের নীলাম্বরী শাড়ি লেপ্টে থাকে। যৌবনকে ঢেকে রাখতে পারে না সিক্ত শাড়ি। যেমন নজরুল গেয়েছেন : ‘নীলাম্বরী শাড়ি পরে কে যায় নীল যমুনায়।’
বৈষ্ণব কবিদের পল্লীনারীরা কি শুধু নীল শাড়িই পরতেন? সব রংয়ের শাড়িই তারা পরতেন। আর নীলাম্বরী শাড়ি বলতে পুরো শাড়িটিই যে নীল রংয়ের হতে হবে তা নয়, তার জমিনে নীলের কিছু কাজ থাকলেই হলো। অম্বর অর্থাৎ আকাশ নীল, তা থেকেই নীলাম্বর। নীলাম্বরী শাড়ির বয়ন ও পাড় বিশেষ ধরনের। স্নানের সময় খোঁপাটি আর থাকে না/চুল ছড়িয়ে পড়ে পিঠ বেয়ে নিতম্ব পর্যন্ত। চ-ীদাসের ভাষায় :
সিনিয়া উঠিতে নিতম্ব তটিতে
পড়েছে টিকুর রাশি।
ভেজা শাড়ির পানি নিঙড়াতে নিঙড়াতে রাধাকে ঘরে যেতে দেখে কবি চ-ীদাসের বা কৃষ্ণের হৃদয় আর স্থির থাকতে পারে না :
চলে নীল শাড়ি নিঙাড়ি নিঙাড়ি
পরাণ সহিত মোর।
সেই হৈতে মোর হিয়া নহে থির
মনোরথ জ্বরে ভোর।
বহু বৈষ্ণব কবিতাই বিত্তরূপময়। বাধার অপরূপ ছবি ফুটে ওঠে পাঠকের হৃদয়ের পটে। ব্যাকুল রাধা দাঁড়িয়ে আছেন, পিঠের উপর খসে পড়ল তার এলো চুল : ‘সন্ডস্তকেশ ভার পৃষ্ঠে পড়ি গেল খসি’। জ্ঞানদাশ রাধার মনের কথা প্রকাশ করেন এই ভাষায় :
রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।।
বৈষ্ণব পদাবলীতে যে রাধাকে আমরা দেখি তার বয়স বেশি নয়, চৌদ্দ-পনের হবে। কিন্তু কৃষ্ণের সঙ্গে তার মিলনের আকাক্সক্ষা প্রবল। বৈষ্ণব কবিতার যতই আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দেওয়া হোক, তা মানব-মানবীর চিরকালের প্রেমলীলার কথাই বলে। রাধা বলেন, চ-ীদাসের ভাষায় :
সই, কেবা শুনাইল শ্যামনাম।
কানের ভিতর দিয়া সরসে পশিন গো
আকুল করিল মোর প্রাণ।
কানুর জন্য রাধিকার প্রতীক্ষার শেষ নেই। অবিরাম বর্ষণের রাত। সখীদের নিয়ে হাসি তামাশায় আর কত সময় কাটবে। শয্যা পেতে অপেক্ষায় থাকেন আর ভাবেন নিশ্চয়ই অন্য কোনো নারী নিয়ে রসরসে মত্ত কানু। তার অভিমান হয়। বান্ধবীদের বলেন কীভাবে একাকী কাটবে তার এই রাত। বাদল রাতে পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন এই বুঝি কানু আসেন :
এ ঘোর রজনী মেঘ গরজনি
কেমনে আওব পিয়া।
শেজ বিছাইয়া রহিলু বসিয়া
পথ পানে নিরখিয়া।
ঘর বাহির করতে করতে অবলা নারীর জীবন শেষ। কানুর প্রেমে দিনকে রাত আর রাতকে দিন করে তার সময় কাটে। চ-ীদাস বলেন :
কী মোহিনী জান বঁধু কী মোহিনী জান।
অবলার প্রাণ নিতে যাই তোমা হেন।
ঘর কৈনু বাহির, বাহির কৈনু ঘর।
পর কৈনু আপন, আপন কৈনু পর।।
রাতি কৈনু দিবস, দিবস কৈনু রাতি।
বুঝিতে নারিনু বঁধু তোমার পিরীতি।
রাধার রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষার কথা বৈষ্ণব পদাবলীতে প্রচুর। কানু আসবেন সে জন্য তার প্রস্তুতির বা আয়োজনের শেষ নেই। কুঞ্জুকুটির তিনি চাপা, মালতী প্রভৃতি ফুল দিয়ে সুসজ্জিত করেন। কৃষ্ণের সঙ্গে রাধা শারীরিক যৌন সম্ভোগে মিলিত হবেন। তাই নিজেকে তিনি সাজসজ্জায় যতদূর সম্ভব আকর্ষণীয় করে তোলেন। সেকালে নারীর প্রসাধনের উপাদান ছিল আজকের আধুনিক নারীর প্রসাধন সামগ্রীর চেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত। সবকিছু তারা গ্রহণ করতেন প্রকৃতি থেকে। সুগন্ধী চন্দন মেখে তারা গোসল করতেন। তারপর শরীরে মাখতেন ফুলের রেণু। বিশেষ করে কদমফুলের রেণু পাউডারের মতো মাখতেন সারা শরীরে। যুবক-যুবতীর যত রকমভাবে রতিসুখ লাভ সম্ভব সে চেষ্টার কোনো ত্রুটি দেখা যায় না বৈষ্ণব পদাবলীতে। যদিও তাতে বৈষ্ণব কবিদের নায়িকারা বসন্তের জন্য বসে থাকতেন না। বছরের বারো মাসই তাদের মধুমাস। তবে ফাল্গ–নও তাদের কাছে মধুমাস নয় যদি কানু বা কৃষ্ণ কাছে না থাকেন।
রাধা তার উঠানে দাঁড়িয়ে আকাশে তাকিয়ে দেখেন আষাঢ়ে ঘন মেঘ ঘন ঘন গর্জন করে। বড়ু চ-ীদাসের ভাষায়, ‘আষাঢ় মাসে নবমেঘ গরজত’। কিন্তু তার কাছে নেই কানু, সুতরাং মেঘমেদুর এই রোমান্টিক পরিবেশ মাটি। শ্রাবণ মাসে ঘন ঘন বর্ষিত হয় বাদল, কবির ভাষায়, ‘শ্রাবণ মাসে ঘন ঘন বরিষে’। কিন্তু কানু কোথায়? উচাটন মন নিয়ে বর্ষণমুখর রাত কাটান রাধা। কানুর কথা ভাবেন আর যে কোনো যুবতীর মতো শয্যায় এপাশ ওপাশ করেন বিরহে। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, ভ্যাপসা গরমের মাস ভাদ্রে বিরহে চারদিক কেমন অন্ধকার ঠেকে। ‘ভাদর মাসে অহোনিশি অন্ধকার’ লাগে রাধার। আশ্বিন মাসের আবহাওয়াও কেমন মন উড়ু উড়ু করে। বড়ু চ- আকাশে সাদা মেঘ, জমিনে সাদা কাশফুল। আজ বাংলাদেশে কাশফুলের বড়ই অভাব। তবে ফুল ফুটুক বা না ফুটুক, জগতে যা খুশি তাই ঘটুক কৃষ্ণ ছাড়া রাধার জীবন মাটি-‘কাহ্ন বিনী হৈবে নিফল জীবন।’
বৈষ্ণব পদাবলী থেকে রাধা-কৃষ্ণের যে প্রেমলীলার পরিচয় পাই তা জগতের সব যুবক-যুবতীর প্রেমলীলারই পরম রূপ। সব প্রেমেরই প্রকৃতি এক, তবে রয়েছে পরিমাণে কমবেশি তারতম্য। সব যুবতীরই প্রাণ চায় পাখি হয়ে শ্যামনাগরের কাছে উড়ে যেতে।
বৈষ্ণব কবিদের প্রভাব বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ দুই কবি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলামে সামান্য নয়। রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতায় বৈষ্ণব কবিতার ছায়া পড়েছে। তিনি বলেছেন, বৈষ্ণব কবিদের ‘বৃন্দাবনগাথা’ শুধু দেবতাদের জন্য নয়, মর্তবাসী নর-নারীদের প্রতিদিন প্রতি রাতের দৈহিক প্রেম ভালোবাসার কথাও বটে :
শ্রাবণের শর্বরীতে কালিন্দীর কূলে,
চারি বক্ষে চেয়ে দেখা কদম্বের মূলে
শরসে সম্ভ্রমে, একি শুধু দেবতার!
‘বৈষ্ণব কবিতা’, সোনারতরী
বৈষ্ণব কবিদের নিজেদের যদি প্রেমপীরিত করার অভিজ্ঞতা না থাকত তা হলে অমন ‘কবিতা লিখলেন’ কী করে। তাই তাদের কাছে রবীন্দ্রনাথের জিজ্ঞাসা :
সত্য করে কহ মোরে হে বৈষ্ণব কবি
কোথা তুমি পেয়েছিলে এই প্রেমচ্ছবি,
কোথা তুমি শিখেছিলে এই প্রেমগান
বিরহতাপিত। হেরি কাহার নয়ান
বাধিকার অশ্র“ আঁখি পড়েছিল মনে?
বিজন বসন্তরাতে মিলনশয়নে
কে তোমারে বেঁধেছিল দুটি বাহুডোরে,
বৈষ্ণব কবিদের মতোই নজরুলকে গাইতে শুনি :
এ ঘোর শ্রাবণ-নিশি কাটে কেমনে।
হায় রহি রহি সেই মুখ পড়িছে মনে।
নজরুলের বহু গান যেন আধুনিক বৈষ্ণব কবিতা। তাতে বৈষ্ণব কবিতার আমেজ পাওয়া যায়, যেন একালের বৈষ্ণব পদাবলী। এসব গানে নায়ক-নায়িকার অভিসারের কথা, তাদের প্রতীক্ষা, মান-অভিমান, আক্ষেপ, বিরহ, মিলন সবই আছে। নজরুলের বন-গীতিতে এই উপাদানগুলো অনেক গানেই আছে :
১. যমুনা-সিনানে চলে
তম্বী মরাল-গামিনী।
লুটায়ে লুটায়ে পড়ে
পায়ে বকুল কামিনী।

২. পথ-ভোলা কোন রাখাল ছেলে
সে একলা বাটে শূন্য মাঠে
খেলে বেড়ায় বাঁশি ফেলে।

৩. পদ্মদিঘির ধারে ঐ
সখি লো কমল-দিঘির ধারে।
আমি জল নিতে যাই
সকাল মাঝে সই,
সখি, ছল করে সে মাছ ধরে
আর চায় সে বারে বারে।।

৪. যমুনা-কূলে মধুর মধুর মুরলী সখি বাজিল।
মাধব নিকুঞ্জচারী শ্যাম বুঝি আসে-
কদম্ব তমাল নব-পল্লবে সাজিল!!
উনিশ ও কুড়ি শতকের আধুনিক কবিরা ইংরেজি সাহিত্য থেকে ভাব, বিষয়বস্তু, প্রকরণ প্রভৃতি যত কিছুই ধার করুন না কেন, বাংলা গীতিকবিতার ভিত্তি রচিত হয়েছে বৈষ্ণব কবিদের হাতেই।

আরো পড়তে পারেন

একাত্তরের গণহত্যা প্রতিহত করা কি সম্ভব ছিল?

২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানি নরঘাতকেরা যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই এক রাতেই শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় তিন হাজার। এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা একতরফাভাবে….

ভাষা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা

আগের পর্বে পড়ুন— চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল) ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে দুই হাজার মাইল দূরত্বের….

চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল)

আগের পর্বে পড়ুন— বায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ একুশের আবেগ সংহত থাকে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেও। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান এক বিবৃতিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। আওয়ামি লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম কমিটির সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র….

error: Content is protected !!