Author Picture

মিশরীয় কবি ইমান মারসাল-এর একগুচ্ছ কবিতা

এনামূল হক পলাশ

কবি পরিচিতি

কবি ইমান মারসাল (১৯৬৬-বর্তমান) আরবী ভাষার একজন মিশরীয় কবি। তিনি ১৯৬৬ সালে মিশরের উত্তর নীল ব-দ্বীপের একটি ছোট গ্রাম মিট অ্যাডলোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মাসুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৮৮ সালে কায়রোতে চলে আসেন। ১৯৯৮ সালে তিনি তার পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আধুনিক আরবি কবিতায় অতীন্দ্রিয় ধারণা এবং ধারণার ভূমিকা নিয়ে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখেন। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে তিনি কানাডার এডমন্টনে চলে যান। যেখানে তিনি আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি পড়ান।

প্রথম দিকে ট্রেডিশনাল আরবি কবিতা লিখলেও পরবর্তীতে তিনি গদ্য কবিতা লেখা শুরু করেন। তিনি দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা, আনন্দ এবং বেদনা, জীবনের বড় বা ছোট, অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন। তার নির্বাচিত কবিতা থেকে ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, স্প্যানিশ, ডাচ এবং হিব্রু ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে।


 

তারা কমলালেবু নয়, আমার ভালোবাসা

তুমি সেখানে যা শিখেছ তা থেকে
এখানে যা শিখছো তা আলাদা নয়:
তুমি যা পড়ছো তা বাস্তবে অস্তিত্বহীন।

অশ্লীল কথার আড়ালে তুমি লজ্জা লুকিয়ে রাখো,
নখ লম্বা রেখে তুমি নিজের দুর্বলতা আড়াল করো।

উদ্বেগ চেপে রাখতে সারাক্ষণ ধূমপান করো
আর নানান আয়োজনের মাধ্যমে যাও
এবং
কখনো কখনো ড্রয়ার পুনঃপুন সাজিয়ে রাখো।

দৃষ্টি পরিষ্কার করতে
তিন ধরনের চোখের ড্রপ ব্যবহার করো
তারপর উপভোগ করো আসন্ন অন্ধত্ব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল অদ্ভুত মুহূর্তে
তোমার বন্ধ হওয়া চোখের পাতা জ্বলে উঠা।

এখানে সেখানে জীবন বিদ্যমান আছে
শুধু দূর থেকে দেখার জন্য।

 

জীবনের চিত্র (সিভি)

নির্মম দুঃখের একটি সূচি:
পর্দার মুখোমুখি বছরগুলো,
চাকরির আগে ডিপ্লোমা,
আর ভাষাগুলো— সব যেন যন্ত্রণা—
এখন ভাষায় বিন্যস্ত আছে।

কোথায় সব অপব্যয় হওয়া দিনগুলো?
আর হাত প্রসারিত করে হাঁটা রাতগুলো
এবং দেয়ালের উপর গা ছমছমে কল্পনা?

কোথায় সে অপরাধবোধ কিছু বিস্মৃত রাস্তায়
একটি ঠেলাগাড়ি আর মাথায় ফলের এক
ছোট পাহাড়ের মুখোমুখি আকস্মিক দুঃখ?

ঘণ্টাহীন অথবা শেষকৃত্য ইঙ্গিত করে না বছর,
মুছে ফেলা কালো বিষণ্নতা আর ঠুকরান নখ,
ঘরের চাবি ভুলে গেছে ঘরের ভেতর।

একটিও খোলা জানালা নেই
আর বাসনার কোন দাগ,
বিলম্বিত,
লাফিয়ে লাফিয়ে চলা।

শিক্ষায় ঠেসে ভরা একটি জীবন,
ধোলাই করা ময়লা মুক্ত:
এটাই প্রমাণিত যে
সে এর ভেতরে বাস করে
পৃথিবীর সকল বন্ধন ছিন্ন করেছে।

 

মার্ক্সের প্রতি শ্রদ্ধা

উজ্জ্বল আলোকিত জানালার সামনে
মেয়েদের উছলে পড়া অন্তর্বাস
নিজেকে আটকাতে পারি না
মার্কস সম্পর্কে চিন্তা থেকে।

কার্ল মার্ক্সের প্রতি শ্রদ্ধা
এই এক বিষয়ে আমার প্রেমিকদের মিল ছিল।
আমি তাদের সকলকে অনুমতি দিয়েছিলাম,
যদিও ভিন্ন মাত্রায়,
কাপড়ের পুতুল এর থাবা
আমার শরীরে লুকায়িত আছে।

মার্ক্স
মার্ক্স
আমি তাকে কখনই ক্ষমা করব না।

 

উদযাপন

গল্পের যোগসূত্র মাটিতে পড়ে গিয়েছিল
তাই আমি হাঁটু গেঁড়ে হাত নামিয়ে
এটির অনুসন্ধান করতে গিয়েছিলাম।

এটি দেশপ্রেম উদযাপনগুলোর একটি ছিল,
আমি দেখেছিলাম সব আমদানি করা
জুতা আর প্রায় হাঁটু পর্যন্ত বুট।

একবার, ট্রেনে, একজন আফগান মহিলা
যিনি কখনো আফগানিস্তান দেখেননি,
আমাকে বলেছিলেন, ‘বিজয় সম্ভব।’

এটা কি ভবিষ্যদ্বাণী?
আমি জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু আমার ফারসি ছিল একেবারে
প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক থেকে
আর তিনি আমার কথা শোনার সময়
এমনভাবে তাকাচ্ছিলেন,
যেন তিনি একটি ওয়ারড্রোব থেকে
কিছু নিচ্ছিলেন
যার মালিক আগুনে মারা গেছে।

ধরা যাক, লোকেরা চত্ত্বরে
একত্রে জড়ো হয়েছিল।
ধরা যাক,
মানুষ একটি নোংরা শব্দ নয়
আর আমরা একত্রে জড়ো হওয়ার অর্থ জানি।
তাহলে এই সব পুলিশ কুকুর
এখানে এলো কীভাবে?
কে তাদের বিচিত্র মুখোশ লাগিয়ে দিয়েছে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ, কোথায় সীমারেখা?
পতাকা আর মেয়েদের অন্তর্বাসের মধ্যে
আশির্বাদ আর অভিশাপ, ঈশ্বর এবং তাঁর সৃষ্টি-
যার বেশিরভাগ পৃথিবীতে এসেছে কর দিতে?

উদযাপন।
যে কথাটা আগে কখনো সত্যি করে বলিনি।
যেন এটি গ্রিক অভিধান থেকে এসেছে
যেখানে বিজয়ী স্পার্টানরা তাদের বর্শা ও ঢালে
ভেজা পার্সিয়ান রক্ত নিয়ে বাড়ি ফিরেছে।

সম্ভবত কোনো ট্রেন ছিল না,
কোনো ভবিষ্যদ্বাণী ছিল না,
কোনো আফগান মহিলা আমার পাশে
দুই ঘণ্টা বসে ছিল না।
সময়ে সময়ে, তার নিজের বিনোদনের জন্য,
ঈশ্বর আমাদের স্মৃতিগুলিকে বিপথে নিয়ে যান।
আমি এখানে বলতে পারি কে নীচু
জুতা আর প্রায় হাঁটু পর্যন্ত বুটের মধ্যে,
আমি কখনই নিশ্চিতভাবে জানতে পারব না
কে কার ওপর জয়লাভ করেছে।

 

বাড়ির ধারণা

আমি সোনার দোকানে কানের দুল বিক্রি করেছি
বাজার থেকে একটি রূপার আংটি কিনতে।
পুরানো কালি আর একটি কালো নোটবুকের জন্য
আমি এটি অদলবদল করেছি।
এটি ছিল ভুলে যাওয়ার আগে আমার পৃষ্ঠাগুলো
ট্রেনের সিটে যা বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
যখনই আমি একটি শহরে পৌঁছেছি,
আমি অনুভব করেছি যে আমার বাড়িটি অন্য শহরে।

ওলগা বলে, তাকে নিজ জমিদারির কিছু না বলেই,
‘বিক্রি না করা পর্যন্ত তোমার বাড়ি কখনই
সত্যিকারের বাড়ি হবে না। তারপর তুমি সমস্ত কিছু
উন্মোচন করে তার বাগান আর বড় কক্ষগুলোর
সাথে তুমি যা করতে চাও তাই করতে পারো—
যেন একজন দালালের চোখ দিয়ে তুমি দেখো।
তুমি তোমার সকল দুঃস্বপ্ন চিলেকোঠায় রেখেছো,
এখন তোমাকে সেগুলো একটি বা দুটি
স্যুটকেসে প্যাক করতে হবে।’

ওলগা নীরব হয়ে পড়ে, তারপর হঠাৎ হাসে,
তার বিষয়বস্তুর মধ্যে একজন সম্রাট,
সেখানে রান্নাঘরে তার কফি মেশিন আর
ফুলের দৃশ্যসহ একটি জানালার মধ্যে।

ওলগার স্বামী এই রানীসুলভ বক্তৃতা
অবলোকনের জন্য সেখানে ছিলেন না।
হয়তো সে কারণেই সে এখনও মনে করে যে
বাড়িটি একটি বিশ্বস্ত বন্ধু হবে এমন কি যখন
সে তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলবে-
এমন একটি বাড়ি যার ভিত্তি স্থির থাকবে,
যার সিঁড়ি তাকে করুণার সাথে
অন্ধকারে পতন থেকে রক্ষা করবে।

আমি চারপাশে একটি চাবি খুঁজছি যা সবসময়
আমার হ্যান্ডব্যাগের নিচ দিয়ে হারিয়ে যায়,
এখানে ওলগা বা তার স্বামী
কেউই আমাকে দেখতে পায় না,
বাস্তবতা আমাকে প্রশিক্ষণ দেয়
যাতে আমি বাড়ির ধারণা ছেড়ে দিতে পারি।

দুনিয়ার ময়লা নখের নীচে নিয়ে প্রত্যেক সময়
তুমি তোমার বাড়ি ফিরে আসো,
তুমি যা বহন করতে পারো তার সমস্ত কিছু
ঠেসে ভরো এর কক্ষগুলোতে।
কিন্তু তুমি বাড়িকে আবর্জনার বিশ্রামস্থল
হিসাবে নির্ধারণ করতে অস্বীকার করো,
এটি এমন জায়গা যেখানে এই মৃত জিনিসগুলি
একসময় বিভ্রান্ত ছিল আশা নিয়ে।
বাড়িটিকে এমন জায়গা হতে দাও যেখানে
তুমি কখনই খারাপ আলো ঠাহর করবে না,
এটি এমন একটি প্রাচীর হোক
যার ফাটল বাড়তে থাকে যতক্ষণ না একদিন
তুমি তাদের দরজার জন্য গ্রহণ করতে পারো।

আরো পড়তে পারেন

গাজী গিয়াস উদ্দিনের একগুচ্ছ কবিতা

বীভৎস খেলা নগরে বাতাসে মথিত জনস্রোতের কোলাহলে শুনতে পেয়েছি সারিগান গঞ্জের হাটে আকাঙ্খার গভীরে মন্দ্রিত অভিন্ন প্রাণ নীরব দর্শক ছিলাম ব্যর্থতার করুণ গান ফেরার মহড়ায় বঞ্চিত কুঁড়েঘরে সরাইখানার- শুঁড়িখানার মাছিরাও নেশায় বুদ্বুদ প্রকম্পিত কান্নার পর একদিন হাসির তিলকরেখা বিচ্ছুরিত শৈশবের ক্ষুধার্ত চিৎকার ক্রর হাসি চেপে মৃত্যু পরোয়ানা ঝুলে ভাগ্য প্রহসনে যুদ্ধের ব্যগ্র দামামা থেমে গেলো-….

তোফায়েল তফাজ্জলের একগুচ্ছ কবিতা

উপায় অবলম্বন কাঁটা থেকে,  সুচালো কাঁকর থেকে পা রাখিও দূরে, জায়গা না পাক চলন-বাঁকা চেতনায় উড়ে এসে বসতে জুড়ে; এসবে খরগোশ কানে থাকবে রাতে, পড়ন্ত বেলায়, দ্বিপ্রহরে, পূর্বাহ্নে বা কাক ডাকা ভোরে। দুর্গন্ধ ছড়ানো  মুখ ও পায়ের তৎপরতা থেকে গ্রীষ্ম থেকে সমস্ত ঋতুতে একে একে নেবে মুখটা ফিরিয়ে তিলার্ধকালও না জিরিয়ে। কেননা, এদের চরিত্রের শাখা-প্রশাখায়….

আহমেদ ফরিদের একগুচ্ছ কবিতা

তোমার সাথে দেখা হওয়া জরুরী নয় সেদিন তুমি আমাকের ডেকে বললে, ”আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি ঝরছে এসো চা খেয়ে যাও ঝাল মুড়ি, পেঁয়াজ ভেজে দেবো সঙ্গে কাঁচালংকাও থাকবে। দুজনে চা খাব, মুড়ি খাব, আর গল্প করবো।’ আমি বললাম, ’না, আমি যাবো না । আমি আমার জানালায় বসে আকাশ দেখছি, বৃষ্টি দেখছি, আকাশের কান্না দেখছি, গাছেদের নুয়ে….

error: Content is protected !!