Author Picture

মার্কেসের মরণোত্তর প্রকাশিত উপন্যাস ‘আনটিল আগষ্ট’

মেজবাহ উদদীন

সাহিত্যে নোবেল জয়ী গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ বইয়ের লেখক হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। কলম্বিয়ার সন্তান গার্সিয়া মার্কেস জীবনের বেশিরভাগ সময় বসবাস করেছেন মেক্সিকো এবং ইউরোপের বিভিন্ন শহরে। ১৯৯৯ সালে মার্কেসের লিম্ফাটিক ক্যান্সার ধরা পড়ে এবং ২০১২ সালের দিকে স্মৃতি বিলোপ হতে শুরু করে। তার দুই বছর বাদেই ২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন এই কথাশিল্পী। সম্প্রতি এ শিল্পীর ৯৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে তার অসমাপ্ত উপন্যাস ‘আনটিল আগষ্ট’।

নিউ ইয়র্কার অনুসারে ১৯৯৯ সালে মার্কেস  মাদ্রিদের একটি মঞ্চে আনটিল আগস্ট থেকে পড়ার পরে মন্তব্য করেছিলেন— ‘এটা কোনো বই হয়নি। এটা অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে।’ মার্কেসের মরণোত্তর প্রকাশিত উপন্যাস আনটিল আগস্ট নিয়ে তাঁর এই মন্তব্য থেকেই এটা পরিষ্কার যে, তিনি চাননি এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হোক। কিন্তু তাঁর ছেলেরা বইটি প্রকাশ করেছে এবং এর মুখবন্ধে বলেছে, মার্কেস বইটি অসম্পূর্ণ রেখে যান, এবং মার্কেস উপন্যাসটি প্রকাশ করতে চাননি। তবে উপন্যাসটিকে মূল্যবান মনে করে তার ছেলে রদ্রিগো এবং গঞ্জালো গার্সিয়া পিতার ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে এবং ‘পাঠকদের আনন্দ’কে অগ্রাধিকার দেওয়ার উপায় হিসেবে আনটিল আগষ্ট বইটি প্রকাশ করেছে। যদিও গার্সিয়া মার্কেসের লেখার সাথে পরিচিতদের মধ্যে এটা অস্বাস্থ্যকর মাত্রায় হতাশার উদ্রেক করতে পারে।

‘আনটিল আগস্ট’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ৪৬ বছর বয়সী আনা ম্যাগদালিনা বাখ। গ্যাবোর বেশিরভাগ চরিত্রের মতোই আনাও জটিল এবং সেই সাথে প্রেম, ঈর্ষা ও অবজ্ঞায় আক্রান্ত। আনা বিয়ে করেছে ৫৪ বছর বয়সী সুদর্শন, সুশিক্ষিত ডোমিনিকো আমারিস নামের একজনকে। আমারিস একজন সঙ্গীত সমালোচক যে বিশ্বাস করে, মহান সঙ্গীতজ্ঞদের কাজ সবসময় তাদের ভাগ্য থেকে অবিচ্ছেদ্য ছিল। এক ছেলে এবং এক মেয়ে নিয়ে তাদের ছিল একটি সুখের সংসার।

উপন্যাসে দেখা যায়, আট বছর আগে মারা যাওয়া আনার মায়ের শেষ ইচ্ছানুসারে দুরবর্তী এক নির্জন ক্যারিবিয়ান দ্বীপে তাকে সমাহিত করা হয়। এরপর প্রতি বছর আগস্টের ১৬ তারিখ মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে মায়ের কবরে ফুল দিতে এবং কিছুক্ষণ সময় অলস পার করতে আনা সেখানে চলে যায়। প্রথম সাতবার তেমন কোনো ঘটনা না ঘটলেও আনার অষ্টম ভ্রমণকে কেন্দ্র করে উপন্যাসটি নতুন বাঁকের দিকে এগিয়ে যায়। দূরবর্তী দ্বীপ থেকে ফিরে আসার আগে আনা স্থানীয় এক হোটেলে একজনের সাথে সঙ্গম করে। আর সঙ্গমের পর ঐ লোকটি কোনো এক ফাঁকে আনার কাছে থাকা একটি বইয়ের মধ্যে ২০ ডলার রেখে চলে যায়। মূলতো লোকটি আনাকে একজন পতিতা ভেবেছিল।

আনা ম্যাগডালেনার জন্য সেটাই ছিল সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা। যখন সে দ্বীপ থেকে ফিরে আসে, বুঝতে পারে তার জীবন এখন অপরিবর্তনী দিকে পরিবর্তিত হয়েছে। সেই ঘটনায় তার জীবন স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে। তিনবছর পর টেলিভিশনে সেই লোকটিকে দেখে আনা চিনতে পারে। লোকটি একজন সম্ভাব্য খুনী এবং আইন তাকে খুঁজছে।

মার্কেসের মরণোত্তর প্রকাশিত উপন্যাস আনটিল আগস্ট নিয়ে তাঁর মন্তব্য থেকেই এটা পরিষ্কার যে, তিনি চাননি এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হোক। কিন্তু তাঁর ছেলেরা বইটি প্রকাশ করেছে এবং এর মুখবন্ধে বলেছে, মার্কেস বইটি অসম্পূর্ণ রেখে যান, এবং মার্কেস উপন্যাসটি প্রকাশ করতে চাননি। তবে উপন্যাসটিকে মূল্যবান মনে করে তার ছেলে রদ্রিগো এবং গঞ্জালো গার্সিয়া পিতার ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে এবং ‘পাঠকদের আনন্দ’কে অগ্রাধিকার দেওয়ার উপায় হিসেবে আনটিল আগষ্ট বইটি প্রকাশ করেছে

মার্কেসের গল্প সংলাপবহুল নয়, বর্ণনামূলক; যেখানে লেখক সবজান্তার ভূমিকা পালন করেন। তার গদ্য ঘনবুনোটে লেখা, দীর্ঘ ও জটিল বাক্যে তিনি অভিব্যক্ত করেন তার বক্তব্য। পাঠক প্রতিটি প্যারায় অনুভব করেন যে একজন গদ্যের জাদুকর অনায়াসে দৃঢ় গদ্যের গাঁথুনি রচনা করে চলেছেন। মানুষের মনস্তত্ত্ব তার উপজীব্য নয়, তিনি মানুষের আচরণ বর্ণনা করে চরিত্র ফুটিয়ে তোলেন।

পরবর্তী ১৬ আগস্টে গিয়ে আনা এমন এক সত্যের মুখোমুখি হয় যেটা জানলেই তার জীবন সুখের হতে পারতো। সে আবিষ্কার করলো তার মৃত মায়ের কবরে তার মতোই আরও একজন আসে ফুল দিতে। এটা দেখে আনা হঠাৎই বুঝতে পারে এই দ্বীপে তার মায়েরও একজন প্রেমিক ছিল। কিন্তু সেটা ছিল রোম্যান্স, তার মতো একের পর এক নামহীন ব্যক্তিদের সাথে সঙ্গমে জড়ানো নয়। সে বুঝতে পারে এটাই তার নিয়তি, বুঝতে পারে এতোদিন ধরে মিথ্যার পিছনে ছুটছে, বুঝতে পারে যে জীবনটাকে সে সুখী ভাবছিলো সেখানেও প্রতারিত হচ্ছে। আর বিবাহবহির্ভূত সঙ্গমে জড়িয়ে সে নিজের প্রতারণা করছে।

বইটি নৈতিকতা, অবিশ্বস্ততা এবং বিশ্বস্ততা অন্বেষণ করে। প্রতিবার দ্বীপ থেকে বাড়ি ফেরার সময় আনার উদ্বেগ আমাদেরকে তার ইচ্ছার সাথে সম্পর্কিত করে। তার উদ্বেগ বেল হুক্সের অল অ্যাবাউট লাভ (১৯৯৯) এর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে তিনি লিখেছেন, ‘প্রেমের অনুশীলন সবকিছুকে অরক্ষিত করে দেয়। আমরা ক্ষতি, আঘাত, ব্যথার ঝুঁকি হারিয়ে ফেলি।’

আনাকে প্রায়ই গল্পের সাথে প্রাসঙ্গিক বই পড়তে দেখা যায়, যেমন— ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলা, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি, লাজারিল্লো ডি টরমেস, আলবেয়ার কাম্যুর দ্যা স্ট্রেঞ্জার, বোর্হেস, বিজয় ও ওকাম্পোর এন্থোলজি দ্যা বুক অব ফ্যান্টাসি, জন উইন্ডহামের দ্যা ডে অব দ্যা ট্রিফিডস, রে ব্র্যাডবেরির দ্যা মার্টিন ক্রনিকলস, প্রাহাম গ্রিনের দ্যা মিনিস্ট্রি অব ফিয়ার এবং ড্যানিয়েল ডিফোর এ জার্নাল অব দ্যা  প্লেগ ইয়ার।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে শারীরিক সৌন্দর্য হারিয়ে আনা আরো একা হয়ে যাচ্ছে এবং এজন্যেই তাকে বলতে শুনি, এই বয়সে নারীরা একা হয়ে পড়ে। বিবাহিত জীবনের মরাল কোড ভেঙে সাময়িক সুখের খোঁজে এটাই হয়তো আনার বেঁচে থাকা। মানুষের নির্জনতা ভাগ্যবানদের জন্য এক অদ্ভুত জায়গা। এটি অনায়াসে ভালবাসা এবং ইচ্ছা দ্বারা পূরণ করা যেতে পারে। এটিই এই দুর্দান্ত উপন্যাসের ভিত্তি।

যদিও ডিমেনশিয়ার কারণে মার্কেস এটিকে যথাযথ রিভিশন দিতে পারেননি, এজন্যেই তিনি বলেছিলেন এই বইটিকে নষ্ট করে ফেলার কথা। তবুও অন্য ঔপন্যাসিকদের জন্য যা একটি সম্পূর্ণ প্লট সরবরাহ করতে পারে, তা হল গার্সিয়া মার্কেসের জন্য কেবলমাত্র অর্ধেক বাক্যাংশের ছোঁয়া। কিন্তু সাসপেন্স ও বিস্ময়ের উপাদান ছাড়া কোনো সাহিত্যই সম্পূর্ণ হয় না। বইটি শুধুমাত্র মার্কেসের শব্দ ও চিত্রকল্পের যাদুর জন্য নয়, এর ক্লাইম্যাক্সের জন্যও পড়া উচিত। পরিষ্কার রাতের আকাশে বজ্রপাতের অত্যাশ্চর্য প্যাটার্নের মতো এর শেষটা মর্মান্তিকভাবে সুন্দর। প্রথমে উপন্যাসটি ৬০০ পৃষ্ঠারও বেশি দীর্ঘ এবং পাঁচ-অংশের আখ্যান হিসাবে কল্পনা করা হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত প্রকাশ পেয়েছে মাত্র ১০০ পৃষ্ঠার মতো।

সূত্র: গার্ডিয়ান ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

আরো পড়তে পারেন

শাহ বুলবুল-এর মৃত্যু ও নির্বাসন

কবিতা যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও স্বপ্নের সমাহার। কবির চিন্তায় থাকে বৈচিত্র, থাকে দেখার ভিন্নতা। সাধারণের কাছে চাঁদ নেহাৎ চাঁদই থাকে। কিন্তু কবির কাছে চাঁদ হয় কাস্তের মতো, ডাবের মতো, কখনও ঝলসানো রুটির মতো। আবার এক কবি থেকে আরেক কবির দর্শনও পৃথক হয়। একই গোলাপ প্রেমিককে আনন্দ দেয়, বিরহীকে বেদনাকাতর করে। কবি হাজার বছর ধরে….

আহমদ বশীরের ‘ত্রিশঙ্কু’: সময়ের জীবন্ত দলিল

কবিতার তুলনায় বাংলা উপন্যাসের বয়স খুবই কম। কবিতার বয়স যেখানে প্রায় হাজার দেড়েকের কাছাকাছি, সেখানে উপন্যাসের আয়ু এখনো দুইশ বছর পেরোয়নি। বাংলা উপন্যাসের আঁতুড়ঘরে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথম উপন্যাস নির্মাণ করতে গিয়ে সমকালীন ঘটনাকে আশ্রয় না করে ইতিহাসের আলো-আঁধারির জগৎকে উপজীব্য করেছেন। অর্থাৎ উনিশ শতকে রচিত উপন্যাসে তিনি ষোড়শ শতকের শেষ….

কুদরত-ই-হুদার ‘জসীমউদদীন’ ও আমাদের জসীমউদদীন চর্চা

প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক ড. কুদরত-ই-হুদা দীর্ঘসময় ধরে বাংলা সাহিত্যের তথা বাংলাদেশের সাহিত্যের পট পরিবর্তনে অগ্রণী ব্যাক্তিত্ব ও মেধাবী সাহিত্যিকদের জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা করে আসছেন। অন্যান্য দিকপাল কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে কবি জসীমউদদীনের জীবন ও কর্ম নিয়ে তাঁর আগ্রহের জায়গাটি যতটা না পেশাগত তার চেয়ে বেশী আবেগ তাড়িত। চিরায়ত বাংলার ধারক, কবি জসীমউদদীনের জন্মস্থান….

error: Content is protected !!