Author Picture

আহমদ বশীরের ‘ত্রিশঙ্কু’: সময়ের জীবন্ত দলিল

রাকিবুল রকি

কবিতার তুলনায় বাংলা উপন্যাসের বয়স খুবই কম। কবিতার বয়স যেখানে প্রায় হাজার দেড়েকের কাছাকাছি, সেখানে উপন্যাসের আয়ু এখনো দুইশ বছর পেরোয়নি। বাংলা উপন্যাসের আঁতুড়ঘরে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথম উপন্যাস নির্মাণ করতে গিয়ে সমকালীন ঘটনাকে আশ্রয় না করে ইতিহাসের আলো-আঁধারির জগৎকে উপজীব্য করেছেন। অর্থাৎ উনিশ শতকে রচিত উপন্যাসে তিনি ষোড়শ শতকের শেষ দিকে উড়িষ্যাকে কেন্দ্র করে মোগল ও পাঠানের সংঘর্ষের ঘটনাকে তুলে ধরেছেন। তারপর বাংলা উপন্যাস এ দেড়শ বছরেই অনেক দূর পথ অতিক্রম করল। নানান জঁরার উপন্যাস লেখা হলো। যেখানে অতীতের ঘটনাকে আশ্রয় করে বাংলাসাহিত্যে প্রথম উপন্যাস রচিত হয়েছিল, এখন সেখানে সুদূর ভবিষ্যতের কাহিনির পটভূমিতেও উপন্যাস লেখা হচ্ছে। তাই বলে অতীত কিংবা ইতিহাসকে আশ্রয় করে উপন্যাস লেখার প্রচলন একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। যাবেও না।

আহমদ বশীরের ‘ত্রিশঙ্কু’ ইতিহাসকে আশ্রয় করেই লেখা উপন্যাস। বঙ্গভঙ্গের সময় ঢাকায় যে রাজনৈতিক অস্থিরতা— সে অস্থিরতাকেই তিনি উপজীব্য করেছেন। তবে ‘ত্রিশঙ্কু’কে ঐতিহাসিক উপন্যাস না বলে, ইতিহাস আশ্রিত রাজনৈতিক উপন্যাস বললেই এর চারিত্র্যকে হয়তো ঠিক মতো উপলব্ধি করা যাবে। উপন্যাস নিয়ে কথা বলার আগে এর নাম নিয়ে দুয়েকটি কথা বলা যেতে পারে।

‘ত্রিশঙ্কু অবস্থা’ বলে বাংলায় একটি প্রবচন আছে। যার অর্থ অনিশ্চিত অবস্থা বা মাঝামাঝি ঝুলে থাকা। এর পৌরাণিক গল্পটি হলো— রাজা ত্রিশঙ্কু জীবিতাবস্থায় স্বর্গে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন। শরণাপন্ন হলেন বিশ্বমিত্রের। বিশ্বমিত্র তাকে তপোবলে আকাশপথে স্বর্গের উদ্দেশে পাঠিয়ে দেন। বিশ্বমিত্র পাঠালে কী হবে, স্বর্গের দেবতারা বিষয়টি মেনে নিতে পারলেন না। দেবরাজ ইন্দ্রের নেতৃত্বে ত্রিশঙ্কুকে আবার পৃথিবীর দিকে ঠেলে দেন। এদিকে বিশ্বমিত্রও বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। তিনি ত্রিশঙ্কুকে স্বর্গের দিকে ঠেলতে শুরু করলেন। ওদিকে দেবতারাও ত্রিশঙ্কুকে কোনো মতেই স্বর্গে যেতে দেবেন না। তাই মর্ত্যরে দিকে ঠেলতে লাগলেন। বিশ্বমিত্র সাধারণ ঋষি ছিলেন না। তপস্যাবলে তিনি বেশ শক্তি অর্জন করেছিলেন। তার ছিল দারুণ তেজ। দেবতারা পড়লেন বিপাকে। মান বাঁচাতে দ্বারস্থ হলেন বিশ্বমিত্রের। বিশ্বমিত্র সব শুনে, বুঝে সিদ্ধান্ত নিলেন, রাজা ত্রিশঙ্কু আকাশ এবং পৃথিবীর মাঝামাঝি অবস্থান করবেন।

এই যে দুয়ের মাঝামাঝি অবস্থা, এ অবস্থায় বঙ্গভঙ্গের সময় পড়েছিলেন মুসলমানরা। সেই দিশেহারা ত্রিশঙ্কু মুসলমানদের অবস্থা উঠে এসেছে ‘ত্রিশঙ্কু’ উপন্যাসে।

উপন্যাসের শুরু হয় বুড়িগঙ্গায় এক তরুণের লাশ ভেসে আসার মাধ্যমে। সদ্যই বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়েছে। এ মৃত তরুণের মাথার ডান দিকে গুলির ক্ষত। তরুণের লাশের বিষয়টি হয়তো চাপা পড়ে যেত, কিন্তু তিন-চার দিন পর পত্রিকায় একটি খবর প্রকাশিত হয়। ঢাকার বিখ্যাত মাওলানা কাদরী হুজুরের এক নাতিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আত্মীয়দের ধারণা তাকে খুন করা হয়েছে। তরুণের লাশ পাওয়ার পর ছবি এঁকে রাখা হয়েছিল। সেই ছবি দেখানো হলো কাদরী হুজুরকে। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। বললেন, এই লাশ তার নাতি শামসুদ্দিনের। কাদরী হুজুর ছিলেন নবাব পরিবারের আত্মীয়। নবাব সলিমুল্লাহকে তিনি ছোটবেলায় আলিফ-বে-তে-সে শিখিয়েছেন।

আহমদ বশীরের ‘ত্রিশঙ্কু’ ইতিহাসকে আশ্রয় করেই লেখা উপন্যাস। বঙ্গভঙ্গের সময় ঢাকায় যে রাজনৈতিক অস্থিরতা— সে অস্থিরতাকেই তিনি উপজীব্য করেছেন। তবে ‘ত্রিশঙ্কু’কে ঐতিহাসিক উপন্যাস না বলে, ইতিহাস আশ্রিত রাজনৈতিক উপন্যাস বললেই এর চারিত্র্যকে হয়তো ঠিক মতো উপলব্ধি করা যাবে

ঢাকা শহরের পুলিশের প্রধান ছিলেন তখন উইলিয়াম জেঙ্কিন্স। তিনি বঙ্গভঙ্গের কাজ শুরু হওয়ার সময় থেকেই ঢাকার দায়িত্বে ছিলেন। জেঙ্কিন্স সাহেবের ডেপুটি হারাধন পান্ডে এ কেসের তদন্তের ভার দেন কোতোয়ালি থানার নতুন দারোগা ফজর আলীকে। বলেন, এই কেস তাকে মীমাংসা করতেই হবে। ফজর আলীকে জেঙ্কিন্স সাহেবের কাছেও নিয়ে যান। জেঙ্কিন্স সাহেব ফজর আলীকে জানিয়ে দেন, অফিসের মধ্যেই কারও কাছ থেকে এ সংক্রান্ত অনেক তথ্য পেতে পারেন। জেঙ্কিন্স সাহেবের ইঙ্গিতের কারণে ফজর আলী বুঝতে পারেন, তাকে এ কাজে সাহায্য করতে পারে পুলিশের ব্যান্ড পার্টির আল্লাদিত্তা। আল্লাদিত্তা শুধু ব্যান্ডপার্টির প্রধানই নন, তিনি ভালো সংগীতজ্ঞ। আল্লাদিত্তার সঙ্গে নানা শ্রেণি এবং পেশাজীবী বিশেষ করে মাঝিদের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। পূর্ববাংলার যোগাযোগ ব্যবস্থা তখনো ছিল নদীনির্ভর। ফলে নদীপথে কী হয় না হয় তা আল্লাদিত্তা সহজেই জেনে যেত। শামসুদ্দিনের হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য একদিন ফজর আলী আল্লাদিত্তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হন। তখন আল্লাদিত্তা সরাসরি কিছু না বলে এক কাহিনি বলতে শুরু করেন। এভাবেই ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে শুরু হয় উপন্যাসের মূলপর্ব। কাহিনি ১৯১১ সাল থেকে চলে যায় ১৯০৪ সালের সকাল বেলায়। দুই দিন পরই ইংল্যান্ডের রাজার প্রতিনিধি, বিট্রিশ ইন্ডিয়ার তৎকালী কর্ণধার, ভাইসরয় লর্ড ন্যাথনিয়েল কার্জন ঢাকায় আসবেন ঢাকাকে একটি প্রদেশের রাজধানী ঘোষণা করার জন্য। বাংলাবাজারে হাতির পিঠে চড়ে যখন লর্ড কার্জনের আগমনের ঘোষণা পাশাপাশি, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ নিয়ে বৈঠকের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছিল, তখন তিন যুবক এসে সেখানে বোমা হামলা করে। যুবক তিনজন হলো- শামসুদ্দিন, হেমচন্দ্র এবং জগদীশ। বঙ্গভঙ্গ যেন না হয়, তার জন্যই এ বোমা হামলা। শামসুদ্দিনের হাত থেকে একটি বোমা পড়ে গেলে সে নিজে মারাত্নকভাবে আহত হয়। হাত মুখ থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। তখন জগদীশ এবং হেমচন্দ্র শামসুদ্দিনকে নিয়ে নৌকায় করে মতিঝিল চলে যায়। সেখান থেকে পুলিনদার নির্দেশে শামসুদ্দিনকে সাভারে রেখে আসা হয়। ব্রাহ্ম নেতা, উকিল জগদানন্দর গ্রামের বাড়িতে। লর্ড কার্জনের আগমন উপলক্ষ্যে আহসান মঞ্জিলে সুধিজনের যে বৈঠক হয়, সেখানে এ বোমা হামলার ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়। বলা হয় ইংরেজদের শত্রুদের ঢাকার মাটিতে রাখা যাবে না।

এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, ঔপন্যাসিক আমাদের একটি বার্তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, সে সময় যারা দেশভাগের বিরুদ্ধে ছিল, তাদের মধ্যে হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলমানরাও ছিল। অন্যদিকে পূর্ববঙ্গের যেসব ক্ষমতাশালী ব্যক্তিবর্গ বঙ্গভঙ্গ চেয়েছিলেন, তাদের মধ্যেও মুসলমানের পাশাপাশি হিন্দুরাও ছিল। ফলে দেশভাগ করতে চাওয়া বা না চাওয়ার পেছনে এককভাবে কোনো সম্প্রদায়কে দায়ী করা যাবে না।

বাংলাবাজারে যে ঘটনা ঘটে তার ছবি তুলে রেখেছিল ফ্রেডারিক ফ্রিটজ কাপ। নবাব আহসানউল্লাহ তাকে কলকাতা থেকে ঢাকায় এনেছিলেন। ক্যামেরায় ছবি তুলে তিনি সেই ছবি বিক্রি করেন। কাপ সেই ছবি তুলে দেন জেঙ্কিন্স সাহেবের কাছে। সেখানে অপরাধীদের অবয়ব স্পষ্টই বোঝা যায়। অপরাধীদের শনাক্ত করার জন্য হারাধন পান্ডে আল্লাদিত্তাকে ডেকে নিয়ে যান। আল্লাদিত্তা ছবিতে মাটিতে পড়ে থাকা ছেলেটিকে চিনতে পারে। বলে, পির কাদরী হুজুরের নাতি সে।

শুধু তাই নয়, সেদিন বৈঠক শেষ করে যাওয়ার সময় দেখা হয় রতন মাঝির সঙ্গে, যে কিনা শামসুদ্দিনদের সাভার পৌঁছে দিয়েছিল। রতন মাঝি বখশিশের বিনিময়ে সবকিছু জানিয়ে যায় আল্লদিত্তাকে।

জগানন্দ বিপ্লবীদের সাহায্য করতেন। তার মেয়ে হৈমন্তী। হৈমন্তী এবং শামসুদ্দিন একে অপরকে ভালোবাসত। পুলিশ শামসুদ্দিনের অবস্থান জেনে যাওয়ায় জগানন্দর নির্দেশে শামসুদ্দিনকে সাভার থেকে রতনের নৌকায় করেই হৈমন্তী ফিরিয়ে আনে।

জেঙ্কিন্স বাংলাবাজারে বোমা হামলাকারীদের গ্রেপ্তার এবং শাস্তি দেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন। তবে শামসুদ্দিন পুলিশের হাতে নিহত হওয়া থেকে বেঁচে যায় লেডি কার্জনের জন্য। লেডি কার্জনের ইচ্ছা, এই দেশে হিন্দু-মুসলমানের যেই সহাবস্থান, সে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার জন্য হিন্দু এবং মুসলমানের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা। তিনি বলেন, ‘এ দেশে হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে বিয়েশাদি হলে যে নতুন জেনারেশন হতো তারা কি শক্তিশালীই না হতো। ইন্ডিয়ার ইতিহাসটাই পালটে যেত।’ (পৃ. ৪৭)।

লেডি কার্জনের ইচ্ছা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেন জেঙ্কিন্স। তিনি শামসুদ্দিন এবং হৈমন্তীর মধ্যে বিয়ে দেওয়ার চিন্তা করেন। লেডি কার্জনের ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে এ মিড সামার নাইটস ড্রিম বাস্তব জীবনে বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেন জেঙ্কিন্স। এভাবেই বেঁচে যান শামসুদ্দিন।

ঔপন্যাসিক আমাদের একটি বার্তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, সে সময় যারা দেশভাগের বিরুদ্ধে ছিল, তাদের মধ্যে হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলমানরাও ছিল। অন্যদিকে পূর্ববঙ্গের যেসব ক্ষমতাশালী ব্যক্তিবর্গ বঙ্গভঙ্গ চেয়েছিলেন, তাদের মধ্যেও মুসলমানের পাশাপাশি হিন্দুরাও ছিল। ফলে দেশভাগ করতে চাওয়া বা না চাওয়ার পেছনে এককভাবে কোনো সম্প্রদায়কে দায়ী করা যাবে না

শামসুদ্দিন এক সময় ঢাকা ফিরে আসে। দেখা করে দাদা কাদরী হুজুরের সঙ্গে। কাদরী হুজুর সেই মুসলমানদের প্রতিভূ যারা ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ দেশে এসে বসবাস শুরু করলেও এ দেশকে তারা মন থেকে গ্রহণ করতে পারেনি। কাদরী হুজুর নিজেকে আশরাফ মুসলমান মনে করেন। বাংলা বলাকে ঘৃণা করেন। বাংলাকে তুচ্ছ মনে করেন। কাদরী হুজুর বংশের গরবে গরীয়ান। মধ্যযুগে যারা বাংলাকে তুচ্ছ মনে করত, আবদুল হাকিম যাদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, ‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী’ কাদরী হুজুর মানসিকতায় তাদেরই উত্তরপুরুষ। কিন্তু শামসুদ্দিন কাদরী হুজুরের বংশধর হয়েও স্বরাজ চায়। হিন্দুদের সঙ্গে মেশে। শামসুদ্দিনের বাবা এ অঞ্চলের মুসলমানদের অধিকাংশই যে রূপান্তরিত মুসলমান, এ বিষয়ে বই লিখতে গিয়ে জীবন দিয়েছে। শামসুদ্দিন দাদার নয়, বাবার চেতনাকেই অন্তরে ধারণ করেছিল। বংশের গৌরব তার কাছে তুচ্ছ। এজন্য কাদরী হুজুর তাকে তিরস্কার করে। বলে, ‘আওর তু? তুই এখন কী করছিস। তু বাগদাদকা আবুল কাসিম ফেরদৌসী কা খান্দানের ফরজন্দ হো কে তু কেয়া কার রাহা? ইস নাচীজ মুলককা কাফেরুন কা সাথ মিলকে আপনে সারহন্দ কা সাথ নাফরমানি কার রাহা। তু ফারসি জবান নাহি বোলতি হ্যায়- তু বাংলা জবান বলতি…। আপনি খান্দান কা সাথ সখদ নাফরমানি- আপনি খুনকা সাথ…।’ (পৃ. ৫৩)।

এমন সময় কাদরী হুজুরের সঙ্গে দেখা করতে আসে নবাব সলিমুউল্লাহর খালাতো ভাই দুসরা নবাব। দেখা হয় শামসুদ্দিনের সঙ্গেও। এতে শামসুদ্দিনের জীবন আরেক পথে হাঁটতে থাকে।

আল্লাদিত্তা ফজর আলীকে একের পর এক কাহিনি বলে যেতে থাকে। কিন্তু শামসুদ্দিনের হত্যার রহস্যের জট খোলে না। বরং আরও নতুন নতুন জট পাঁকিয়ে লেখক আমাদের সামনে এগিয়ে নিতে থাকে। বেলুনে করে মেম সাহেব আসবে- এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়। ব্যাপক প্রাণহানি হয়। মুসলমানদের হত্যা করার জন্য হিন্দুদের পক্ষে টাকা ঢালেন বাবু রূপলাল দাশ, প্রসন্ন পোদ্দারম, বুনদিল কাপুড়িয়া। অন্যদিকে হিন্দুদের মারার জন্য মুসলমানের পক্ষে কে টাকা ঢেলেছেন, তা জানার জন্য আল্লাদিত্তা ছুটে যান ওয়াইজঘাটের গঙ্গাজলী তথা বাইজি পাড়াতে। সেখানে চুন্নিবাইয়ের মাধ্যমে আচ্ছিবাইয়ের কাছে কৌশলে খবর নেয় দুসরা নবাব মুসলমানের পক্ষে টাকা ঢেলেছেন। শুধু তাই নয়। এ গঙ্গাজলীতে দুসরা নবাবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য শামসুদ্দিনও আসত।

অনুশীলন সমিতির কার্যক্রম চলতে থাকে। কলকাতা থেকে বিপ্লবী পুলিনদা ঢাকায় আসেন। পুলিনদা ঢাকার বিপ্লবীদের কাছে বলেন, শুধু বঙ্গভঙ্গ রদ করাই তাদের উদ্দেশ্য নয়। দেশমাতৃকাকে ইংরেজদের হাত থেকে চিরতরে মুক্ত করাই তাদের লক্ষ্য। এজন্য শুধু বোমা হামলা নয়, অনেককে খতমও করতে হবে। অর্থের জন্য ডাকাতি করতে হবে। দুসরা নবাবের সঙ্গেও তারা একটি আঁতাত করে। দুসরা নবাবের নানা ধরনের ব্যবসা ছিল। সে নবাব পরিবারের সদস্য হলেও ইংরেজদের ঠিক পছন্দ করত না। অস্ত্র লুট করার জন্য দুসরা নবাব ঢাকা থেকে পাঁচজনকে নিয়ে যান কলকাতায়। এখানে দেখতে পায় শামসুদ্দিন তার জীবনবাজি রেখে কাজ করলেও মুসলমান হওয়ায় কেউ কেউ তাকে সন্দেহের চোখে দেখে। কলকাতায় অস্ত্র লুট করার পর একজন বাদে সবাই ঢাকা ফিরে আসে। তদন্তে নেমে পুলিশ জেনে যায়, দুসরা নবাব বিপ্লবীদের সঙ্গে করে ঢাকা থেকে কলকাতায় নিয়ে গেছে। এজন্য পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ মরিয়া হয়ে ওঠে স্বরাজীদের নির্মূল করার জন্য। অন্যদিকে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। মুসলমানদের অনেকেই চায় না এ বঙ্গভঙ্গ রদ হোক। কিন্তু হিন্দুরা যখন জানতে পারে বঙ্গভঙ্গ রদ হবে, তারা এ দেশের পাঠ চুকিয়ে কলকাতা চলে যাওয়ার বন্দোবস্ত করতে থাকে। জগানন্দও ছিল তাদের দলে। তাই হৈমন্তী শামসুদ্দিনের কাছে ক্ষমা চেয়ে চলে আসে। ব্যর্থ হয় শামসুদ্দিনের প্রেম। পুলিশেরা একেরপর এক বিদ্রোহী ধরপাকড় করতে থাকায় হিন্দু বিপ্লবীরা মুসলমান বিপ্লবীদের সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। এদিকে দুসরা নবাব জেলে থাকার সময় আচ্ছিবাইকে নিয়ে শামসুদ্দিন থিয়েটার দেখতে যাওয়ায় শামসুদ্দিন দুসরা নবাবের বিষনজরে পড়েন।

‘ত্রিশঙ্কু’ উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর কাহিনি বলার কৌশল। গল্পের বুনন। ডিটেইলসের কাজ। আরব্য রজনীর গল্পের মতোই লেখক গল্প বলে গেছেন। এক গল্পের ভেতরে আরেক গল্প নিয়ে এসেছেন। এক পাত্র থেকে আরেক পাত্রকে কথকের ভূমিকায় নিয়ে গেছেন

উপন্যাসের শুরু যে শামসুদ্দিনের হত্যাকাণ্ড দিয়ে শুরু হয়েছিল, লেখক উপন্যাস শেষ করেছেন সেই রহস্য রেখেই। আমাদের লেখক হত্যারহস্য সমাধানের একাধিক পথের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বিদায় নিয়েছেন। খোলাসা করে কিছু বলেননি, ফলে উপন্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার পরও একটা অশেষের ব্যঞ্জনা রয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, এ উপন্যাস কি চরিত্র প্রধান, নাকি ঘটনা প্রধান? উত্তর হবে ঘটনা প্রধান। ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সালের ঘটনাগুলোকে মূর্ত করে তোলার জন্য লেখক একাধিক চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। উপন্যাসের শুরুতেই লেখক বলে নিয়েছেন, এ উপন্যাসের সব চরিত্র কাল্পনিক। তারপরও এখানে অনেক ঐতিহাসিক চরিত্রের দেখা পাই। একবার রবীন্দ্রনাথের কথাও এসেছে এ উপন্যাসে। মহাকবি কায়কোবাদের চরিত্র কয়েকবারই এসেছে। তাছাড়া বঙ্গভঙ্গ এবং বঙ্গভঙ্গ রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কুশীলবদের দেখা পাই আমরা এ উপন্যাসের পটমঞ্চে।

‘ত্রিশঙ্কু’ উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর কাহিনি বলার কৌশল। গল্পের বুনন। ডিটেইলসের কাজ। আরব্য রজনীর গল্পের মতোই লেখক গল্প বলে গেছেন। এক গল্পের ভেতরে আরেক গল্প নিয়ে এসেছেন। এক পাত্র থেকে আরেক পাত্রকে কথকের ভূমিকায় নিয়ে গেছেন। গল্প বলতে বলতে ফ্ল্যাশব্যাকে ভিন্ন গল্পে চলে গেছেন। কখনো ডায়েরির লেখাও গল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। এ উপন্যাসে আল্লাদিত্তা যেন আরব্য রজনীর গল্প বলিয়ে সেই শেহেরজাদী আর ফজর আলী রাজা। যে শেহেরজাদীর বলা গল্পে মশগুল হয়ে থাকে। আহমেদ বশীর এমনভাবে গল্প বুনেছেন, শুধু ফজর আলী নয়, পাঠকও গল্পে মশগুল হয়ে যাবে। থ্রিলার উপন্যাসের উত্তেজনা এখানে গুঁজে দিয়েছেন। বর্তমানের অধিকাংশ উপন্যাসেই যেখানে ঘটনা বা দৃশ্যের বিস্তারিত বর্ণনা অর্থাৎ ডিটেইলস বলা থেকে বিরত থাকে, পাঠকও যেখানে প্রকৃতির বর্ণনা, চরিত্রের বর্ণনা পড়তে অনীহা প্রকাশ করেন, সেখানে ঔপন্যাসিক যেখানে যেমন প্রয়োজন বিস্তারিতই বর্ণনা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, শামসুদ্দিনকে হরিণঘাটা গ্রাম থেকে আনার জন্য হৈমন্তী যখন গ্রামে গিয়ে উপস্থিত হন, ঔপন্যাসিক তখন সেই গ্রামের বর্ণনা অর্ধ পৃষ্ঠাজুড়ে দিয়েছেন। এ রকম বর্ণনা তিনি স্থানে স্থানেই করেছেন। এত নিখুঁতভাবে বর্ণনা দিয়েছেন, যা পাঠের সময় ইন্দ্রিয় সচেতন হয়ে ওঠে। এ উপন্যাসে জিনও চরিত্র হিসাবে হাজির হয়েছে। চরিত্র অনুযায়ী পাত্রপাত্রীর মুখের ভাষা দিয়েছেন। তবে মাঝে মধ্যে কিছু সম্পাদনার ঘাটতি এবং মুদ্রণপ্রমাদ চোখে পড়েছে। পরবর্তী এডিশনে হয়তো তা ঠিক হয়ে যাবে। উপন্যাসে যেহেতু একটি সময়কে বিশ্বস্তভাবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা করা হয়েছে, ফলে অসংখ্য চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। কিছু কিছু চরিত্র একবারের বেশি আসেনি। আবার কোনো কোনো চরিত্রের নামই শুধু এসেছে, তাদের কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি উপন্যাসে। এ বিষয়গুলো বাদ দিলে তৎকালীন অর্থাৎ বঙ্গভঙ্গ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, হিন্দুদের জাতীয়বাদী আন্দোলন, মুসলমানদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব, অনুশীলন দলের তৎপরতা সর্বোপরি ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সালের ঢাকার একটি বিশ্বস্ত চিত্র আমরা পাই। ঐতিহাসিক যেখানে মৃত দিনের বর্ণনা করে যান, ঔপন্যাসিক সেখানে মৃত ইতিহাসকে জীবন্ত করে পাঠকের সামনে তুলে ধরেন। শামসুদ্দিন কিংবা হৈমন্তী বা আরও অনেক চরিত্র বাস্তবে ছিল না। কিন্তু তাদের মতো কেউ না কেউ সে সময় ঢাকার বুকে বেঁচে ছিল। ঔপন্যাসিক আহমদ বশীরের এসব কাল্পনিক চরিত্রের মাধ্যমে অতীতের ঢাকা আবারও জীবন্ত হয়ে পাঠকের কাছে ধরা দেবে, এ আশা করাই যায়।

ত্রিশঙ্কু  ●  উপন্যাস / লেখক আহমদ বশীর / প্রকাশক ভোরের কাগজ প্রকাশন / মূল্য ৬০০ টাকা

আরো পড়তে পারেন

শাহ বুলবুল-এর মৃত্যু ও নির্বাসন

কবিতা যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও স্বপ্নের সমাহার। কবির চিন্তায় থাকে বৈচিত্র, থাকে দেখার ভিন্নতা। সাধারণের কাছে চাঁদ নেহাৎ চাঁদই থাকে। কিন্তু কবির কাছে চাঁদ হয় কাস্তের মতো, ডাবের মতো, কখনও ঝলসানো রুটির মতো। আবার এক কবি থেকে আরেক কবির দর্শনও পৃথক হয়। একই গোলাপ প্রেমিককে আনন্দ দেয়, বিরহীকে বেদনাকাতর করে। কবি হাজার বছর ধরে….

কুদরত-ই-হুদার ‘জসীমউদদীন’ ও আমাদের জসীমউদদীন চর্চা

প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক ড. কুদরত-ই-হুদা দীর্ঘসময় ধরে বাংলা সাহিত্যের তথা বাংলাদেশের সাহিত্যের পট পরিবর্তনে অগ্রণী ব্যাক্তিত্ব ও মেধাবী সাহিত্যিকদের জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা করে আসছেন। অন্যান্য দিকপাল কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে কবি জসীমউদদীনের জীবন ও কর্ম নিয়ে তাঁর আগ্রহের জায়গাটি যতটা না পেশাগত তার চেয়ে বেশী আবেগ তাড়িত। চিরায়ত বাংলার ধারক, কবি জসীমউদদীনের জন্মস্থান….

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের চেতনার বাতিঘর

এমনটি হতে পারে এবং হয়েছে সে বিষয়ে বিদগ্ধ লেখক প্রশ্ন তুলেছেন এবং সংশ্লিষ্টদের কাজের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন। দেখুন, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের চেতনার বাতিঘর। আমাদের অস্তিত্ব। সেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সেভাবে কথা বলা যায় না; মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কিংবা পরবর্তীকালে যেসব ষড়যন্ত্র হয়েছে কিংবা এখনও হচ্ছে তা নিয়ে কথা বলার মানুষের সত্যিকার অভাব রয়েছে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধ পরিবারের সন্তান….

error: Content is protected !!