Author Picture

রিয়াসাত আল ওয়াসিফের একগুচ্ছ কবিতা

রিয়াসাত আল ওয়াসিফ

রেট্রোসপেক্টিভ

বই সাজাতে সাজাতে জনৈক কবির মনে হলো— এত এত বই কবে পড়ব! এই ফোকাস হারানো সময়ে মানুষ যেন গুড়ো গুড়ো কাচ। হঠাৎ তাঁর মনে হলো বই বাদ দিয়ে আজ বরং পাপগুলোকে একটু সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা যাক। কতদিন দেখেনি দেখতে চায়নি, দেখা হয় না, দেখা যায় না। যাপিত জীবনের কাদায় শুধু মুখ ঢেকে যায়। মুখ আর মুখ থাকে না। তারপর যথাদ্রুত শুরু হলো পাপ খনন। এ এক একাকী নিভৃত খনন। খনি থেকে উঠে আসে হরেক রকম পাপ। কঠিন, তরল, বায়বীয়, গরম, শীতল, কবোষ্ণ, কারণ- অকারণ পাপ। পাপগুলো পরস্পর মিথস্ক্রিয়া করে, গালগপ্পো করে, খুনসুটি করে। পাপগুলো সাজাতে সাজাতে ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়ে, মুদে আসে চোখ। এ এক অন্তহীন অমানিশা। ক্রমান্বয়ে ছোট টিলা, বড় টিলা, পাহাড়, পর্বত হয়ে পর্বতমালায় রূপ নেয় রাশি রাশি বিততি পাপ।

তারপর একদিন কবি নেমে যায় সমুদ্রে!

 

আষাঢ় এলে বৃষ্টি এলে

আষাঢ় এলে বৃষ্টি এলে
পষ্ট মনে পড়ে
এক অস্পষ্ট দিনের কথা।
মায়া কুহক এক আবছায়ায়
ঝনঝন করে কেঁপেছিল
আমাদের যৌথ আবেগ।
আর যাই বলো
যত হেসে উড়িয়ে দাও
জল ভরা চোখ যতই লুকোও
সেদিনের সবকিছু সত্য ছিল।
তুমি সত্য ছিলে
আমি সত্য ছিলাম
বৃষ্টি সত্য ছিল
সত্য ছিল কদমফুল।

আষাঢ় এলেই সবকিছু ওলট-পালট
সেই দুপুরের মতো!

 

বিকেলের চা

একসময়ের জমজমাট ঘাটলায়
আজ মানুষের জটলা নেই।

জগতে শুধু লয়েরই খেলা
শুধু শ্যাওলা আর শ্যাওলা।

মরিচের ঝাঁঝ কমে আসে
অরুণা আর ঠোঁট রাঙায় না
গাঢ় লিপস্টিকে, চশমার কাচ মুছে
উদাস তাকায় দক্ষিণের জানালায়।

ঘাটলার জটলা আর নেই
নেই সেই সব মানুষেরা
যাদের গালগল্পে আমরা পেতাম
সঞ্জিবনী সুধা।

রোদেলার কথা মনে পড়ে
কোথায় এখন সেই কিশোরী?
সেও নিশ্চয়ই ম্লান বয়সের ভারে
রোদেলা এখন সাদাকালো ছবি!

এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে
কড়া লিকারের সন্ধ্যা নামে,
ঘোলা হয় চশমার কাচ,
ঠাণ্ডা হয়ে যায় বিকেলের চা!

 

মানুষের ভেতরে মানুষ

স্যুটেট বুটেট একজন মানুষ
চশমাধারী রাশভারী
মেপে মেপে ঠোঁট নাড়েন
এক পরিমার্জিত সংস্করণ।
সভা সেমিনার সিম্পোজিয়াম
পাঁচ তারকা হোটেল
যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে
আবশ্যিক তিনি।

অথচ এই তিনিই কেঁপে ওঠেন
যখন একতারার শব্দ শোনেন
যখন মন্দিরা বেজে ওঠে
খোলের তালে কেউ গায় কীর্তন।

যখন তিনি জোনাকির আলোয় সমর্পিত
তখন তাবৎ আলোর রোশনাই
তাঁর কাছে ধুসর ম্রিয়মাণ।

হঠাৎ কোনো মৃৎশিল্প দেখলে
তিনি আঙুলের পরশে
তুমুল কেঁপে ওঠেন।
শিল্পীকে খুঁজতে থাকেন শিল্পের ভেতর।

জাগতিক বাহুল্যের বৃত্তে
জনারণ্যে প্রায়শই মানুষটি
জীবনানন্দ দাশের সাথে
মৃদুস্বরে কথা বলেন!

 

পাখি

দুপুরবেলা গাছের ডালে
একলা আমি পাখি
করছি ডাকাডাকি।

তুমি তখন একলা ঘরে
তখন তোমার উদাসতা
স্মৃতিমগ্ন বিধুরতা।

আমি হঠাৎ উড়ে গিয়ে
বসি তোমার ঘুলঘুলিতে
তোমায় দেখিতে!

হঠাৎ দেখি তুমি নেই
চলে গেলে অন্য রুমে
কোনো এক গোপন কোণে।

আমি ফিরি গাছের ডালে
ঘনপাতার অন্তরালে
সঙ্গীবিহীন স্বপ্নজালে।

গাছের ডালে নিশীথরাতে
একলা আমি পাখি
শুধু তোমায় ডাকি!

 

একা

কেউ দেখুক বা না দেখুক
আমি বসে থাকব
একা।

সারারাত শিশির মেখে
ঠিক মেলে ধরব
স্মৃতির খাতা।

কেউ ডাকুক না ডাকুক
বাড়ি ফিরব না
মানুষ মাত্রই অনিকেত, একা।

জীবন উপান্তে চোখ শুষ্ক
প্রিয় মুখ-চোখ সব ঝাপসা
কত কথা দেওয়া ছিল
রাখা গেল না!

এই বনবাদাড়ে আমি, জোনাকি
আর দূরে শেয়ালের ডাক
বসে থাকি নির্বাক, একা।

জীবন মানেই একাকিত্বের আস্ফালন!

আরো পড়তে পারেন

আরণ্যক শামছ-এর একগুচ্ছ কবিতা

প্রান্তিক কবি আমি এক নির্জনে পড়ে থাকা প্রান্তিক কবি। যেন সমাজতাত্ত্বিক সীমারেখার শেষপ্রান্তে ঝুলে থাকা এক পরিত্যাক্ত পলিথিন ব্যাগ। এখানে লুকিয়ে রেখেছি ক্ষুধা, দারিদ্র্য, ভগ্নস্বাস্থ্য, অসাম্য, অশিক্ষা ও মানুষের ছলাকলার ইতিহাস। আমি গাণিতিক ধারণার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনস্তিত্বের অপ্রয়োজনীয় সংযুক্তি। তবে জিপসিদের মত আমিও দাঙ্গা বাঁধিয়ে দিতে পারি। আমিও মাটির ঘ্রাণ থেকে জেনে নিতে….

আজাদুর রহমানের একগুচ্ছ কবিতা

সবুজ স্তন প্রচুর নেশা হলে দেখবেন— গাছগুলো বৃষ্টি, পাতার বদলে বব চুল, কী ফর্সা! তার বাহু, উরু ব্যাঞ্জনা, জলভারে নুয়ে আছে সবুজ স্তন। নেশা এমনই এক সদগুন যে, মাঝরাতে উড়ে উঠবে রাস্তাগুলো আকাশে মুখ দিয়ে আপনি বলছেন— আমাদের একটা পৃথিবী ছিল, ঠিক চাঁদের মত গোল। চুর পরিমাণ নেশা হলে, আপনার পা থেকে অহংকারী পাথর খসে….

গাজী গিয়াস উদ্দিনের একগুচ্ছ কবিতা

ক্লান্তির গল্প যারা উপনীত সন্ধ্যে বেলায় ফিরে দেখো দিন মলিন স্বপ্ন – ধূসর জীবন, প্রখর রোদের শায়ক ক্রীড়া প্রাচুর্যে আত্মহারা ছিলে স্বাধীন একদিন, পশ্চিম বেলা চেয়ে চেয়ে আজ শেষ করো ক্লান্তির গল্প।   ছড়ানো বিদ্রুপ সাপের চুমোতে কোথা বিষ হিংস্র নিশ্বাসে তোমার গরল বিশ্বাসে আমাকে পাবে জিয়ল সরল। রুক্ষতা ছেঁটে ফেল – চেহারা কমনীয় সব….

error: Content is protected !!