Author Picture

বন্ধনবিলাস

জয়া ফারহানা

এ শতকের ধূলিধূসরিত ঢাকায় দাঁড়িয়ে কল্পনা করাও কঠিন। গত শতকের ঢাকা ছিল রাজহাঁসের পালকের মতো পরিচ্ছন্ন ধবধবে। একতলা-দোতলার ছাদে শীতলপাটি বিছিয়ে রাতের আকাশের দিকে চাইলে দেখা যেত নক্ষত্রদের কনফারেন্স। মেঘহীন রাতগুলোতে খুব কাছের হয়ে যেত দূরছায়া নীহারিকার পথ। যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। অগণ্য তারার যে কোনো তারাকে। রাস্তার দু’ধারে জামরুল-জিউল আর বাবলার অন্ধকার ঢাকতে পারে না সন্ধ্যার মুখে জ্বলে ওঠা গ্যাস পোস্টের আলো। চৈতালী বাতাসের ঝাপটায় জামরুল গাছের ডালপালা ঝটপট করে, যেন তারা উড়ে যেতে চায় আকাশে। শকুনের ডানার মতো পল্লি গন্ধময় তখন এই ঢাকা। মসজিদ মন্দির পুকুর ধানখেতসমেত একেকটি বাড়ি। ডালে গুঁড়িতে বাঁধা ডিঙি নৌকো। দিনান্তের সূর্য বাড়ির শেষ প্রান্তে বাঁশ ঝোপের আড়ালে টুপ করে লুকিয়ে পড়ছে। কোজাগোরী পূর্ণিমার রাতে পুকুরের পাশে বসে পুরান ঢাকার বাসিন্দারা শুনছেন লক্ষ্মীর পাঁচালি। দূর থেকে এক-মাল্লাই দো-মাল্লাই নৌকা এসে ভিড়ছে নারিন্দা পুলের আশপাশে। খালে নিস্তরঙ্গ পানিতে হারিকেনের মৃদু আলো দেখা যাচ্ছে খালসংলগ্ন বাড়িগুলো থেকে।

দুই.

স্মার্ট হওয়ার দৌঁড়ে হাঁপিয়ে ওঠা নাগরিক কোলাহল পেরিয়ে শান্ত ঢাকার নির্জন নিম ডালে কোনো একা পাখিকে দেখলে লেখক সম্পাদক ইতিহাসবেত্তা মীজানুর রহমানকে মনে পড়ে। শত সহস্র  স্কাইস্ক্র্যাপারের ভিড়ে জিন্দাবাহারের কোনো ছিপছিপে গলিতে চিকফেলা পেটানো লোহার ঘোরানো বারান্দা দেখলে মনে হয় এটাই পরিতোষ সেনের সেই জিন্দাবাহার— ‘জীবন্ত বসন্ত’। চোখ খুঁজে ফেরে বন্দুকধারী সেপাই সামন্ত, ঘোড়ার আস্তাবল। খুঁজে ফিরি নানারকম ফুল লতাপাতার নকশায় ঘেরা মস্ত খিলান। দরজার ওপাশে দোদুল্যমান সরু চিকের পর্দা। যেন কান পাতলে শোনা যাবে নূপুরের নিক্কন। রুহিতন আকৃতির কাচ বসানো দরজা জানালা। জানালার ওপাশে কি কোনো রাজেন্দ্রানী? রংধনু রঙের রঞ্জিত ঝাড়লণ্ঠন। নকশাকাটা মখমলের নরম গালিচা। মেহগনি কাঠের কারুকার্য খচিত উঁচু পালংকের ওপর চাঁদোয়ার মতো ঝুলছে গোলাপ মসৃণ ফিনফিনে মশারি। মীজানুর রহমানের কৈশোর কেটেছে কলকাতায়, পরিতোষ সেনের পুরান ঢাকায়। মীজানুর রহমান কলকাতাগত প্রাণ, পরিতোষ সেন পুরান ঢাকা অন্তঃপ্রাণ। কারণ সম্ভবত এই যে কৈশোর কাহিনির গায়েই লেগে থাকে ‘পরণ-কথা’র ঘ্রাণ। আমরা প্রত্যেকেই হয়তো কিশোরবেলার শহরটিকেই ভালোবাসি।

প্রতিদিন কত কিছু ঘটে যাহা তাহা
এমন কেন হয় না আহা!

হতে কি পারে না পুরোনো রেললাইন ধরে রমনা ফুড়ে নীলক্ষেত পার হয়ে তেজগাঁওয়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন মীজানুর রহমান। কিংবা এমন কি হতে পারে না নবাব বাড়ির উত্তর থেকে দক্ষিণমুখী হয়ে অনেকগুলো সরু লেন যেখানে মিলিত হয়েছে সেই জিন্দাবাহার লেন ধরে হেঁটে যাচ্ছেন পরিতোষ সেন! এ দুজনের কি একসঙ্গে দেখা হতে পারে না? দেখা হলে কী কথা বলতেন তারা পরস্পরের সঙ্গে? মীজানুর কী বলতেন দেশভাগের ফলে তার স্মৃতির দুমড়ে মুচড়ে যাওয়ার কথা? পরিতোষ কি ভাগ করে নিতেন মীজানুরের সঙ্গে তার কৈশোরকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিটি? সেই যে একবার তাদের পাড়ার মসজিদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল জন্মাষ্টমীর মিছিল। যাওয়ার সময় একদল মুসলমান লাঠিসোটা ইটপাটকেল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের মিছিলের ওপর। মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ দ্রুতগামী গাড়ির তলায় চাপা পড়ার ভয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ফিরছে। দূর কোনো স্মৃতির জানালায় দাঁড়িয়ে পরিতোষ বললেন, মুসলমানপাড়ায় থেকেও আমাদের কয়েকটি হিন্দু পরিবারের গায়ে সামান্য আঁচড়ও পড়তে দিল না মুসলমান ভাইয়েরা। পড়শী মুসলিম ভাইয়েরা দুধ, চাল, তেল, নুন দিয়ে বেঁচে থাকার যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিস জোগাড় করে দিল। কৈশোরের এ অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে তাকে মানুষকে ভালোবাসতে এবং বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে। কী হতো দেখা হলে তাদের মধ্যে? একজন যখন কথায় দুঃখ দুঃস্বপ্নের ভাইরাস দেখতেন অন্যজন কি তৎক্ষণাৎ হয়ে উঠতেন চিকিৎসা তৎপর? আবার সেই অন্যজন যখন ভেজা পোশাকের মতো মেলে দিতেন তার সব গোপন দীর্ঘশ্বাস তখন আরেকজন কি এগিয়ে দিতেন উপশমের প্রেসক্রিপশন? মীজানুর কি বলতেন ১৯৪৬-এর আগস্ট মাসের ১৬ তারিখের কথা? যেখানে মা বলছেন, হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই রব তুলে শান্তি মিছিল যখন গেল, সব ঠিকঠাক। কিন্তু জানিস খোকা, মিছিল গেল, তোরাও গেলি, হঠাৎ সব কেমন ফাঁকা ঠেকল আমার। সুনসান ভাবটা কেমন যেন গা ছমছম করা। ভয়ে সেঁধিয়ে গেলাম রে। তারপর ধর, থেকে থেকে ‘বন্দে মাতরম’ জিকির আছে না। মানুষের মুখ থেকে বেরোনো কোনো শব্দ যে এত ভয়ংকর হতে পারে তা তো জানা ছিল না রে…।

এ দুজনের কি একসঙ্গে দেখা হতে পারে না? দেখা হলে কী কথা বলতেন তারা পরস্পরের সঙ্গে? মীজানুর কী বলতেন দেশভাগের ফলে তার স্মৃতির দুমড়ে মুচড়ে যাওয়ার কথা? পরিতোষ কি ভাগ করে নিতেন মীজানুরের সঙ্গে তার কৈশোরকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিটি?

বাড়ির নিচে শোরগোল। একজন মুসলমানকেও আস্ত রাখবে না। রাস্তার ধারের জানালার পাট সামান্য খুলে নিচে তাকালুম। গলির আলোয় বন্দুক হাতে তোদের বিষ্টু কাকাকে দেখতে ভুল হলো না। জানিস খোকন, সে কী তেজ। কী বলছিল জানিস, এ বাড়ির ভেতর ঢুকেছ কী মরেছ। আর ধরো যদি ঢুকলেই, এই আমার লাশের ওপর দিয়েই তা ঘটবে। মীজানুর রহমানদের পুরো পরিবারকে লাশ বানানোর ফিকিরে আসা গুন্ডাগুলো বিষ্টু কাকার মহত্বের সামনে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে চলে গেল। একজন মীজানুরের মা বলছেন, আর কারও সম্পর্কে বলতে পারব না তবে বিষ্টুবাবু যে বেহেশতে যাবেন এটা আমি হলফ করে বলতে পারি।

যতক্ষণ আকাশের নীল ঢেউয়ে নক্ষত্রের ফেনা ততক্ষণ কি তাদের কথা ফুরোতা না? কী কথা হতো দুজনের মধ্যে? কী কথা তাদের সঙ্গে, তার সঙ্গে?

তিন.

পরিতোষ: বুঝলেন তো মীজানুর, আমার কৈশোরে ঢাকার স্নায়ুকেন্দ্র ছিল এ জিন্দাবাজার। সারা দিনে বড়জোড় একটা কি দুটো হুড তোলা ফোর্ড গাড়ি চলত এ সড়কে। বেশি চলত ছ্যাকড়া গাড়ি। আর সারা দিন ছিল রিকশার টুংটাং। বর্ষা শেষে শীতের সময় পালকিও চলতে দেখেছি অবশ্য।

জবাবে মীজানুর বলছেন, আমি কিন্তু আমার কৈশোরের সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, যেটা এখন চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, সড়কটিকে মিস করি খুব। সেই উনিশ শতকের গোড়ার দিকে কী সব রাস্তা ছিল, বলুন। রূপসীর সুডৌল ললাটের মতো। চিত্তরঞ্জিনীর চৌকেনো স্লাবমোড়া ফুটপাত। আহা! আর রাস্তাগুলো ছিল অ্যামাজনের মতো লম্বা চওড়া আর নির্জন। চওড়া ফুটপাতে হেঁটে যেমন মজা, যেমন চলো তেমনি চলো রে। ফাউটুকুরও মজা ছিল।

পরিতোষ: গলি ঘুপচির মতো সড়ক হলেও আমাদের পুরান ঢাকার মানুষগুলোর মন কিন্তু বিশাল। ওই আপনার অ্যামাজনের মতো লম্বা চওড়া।

মীজানুর: বন জঙ্গলকে খুব নিরীহ ভাববেন না পরিতোষ।

অ্যনিমেল প্লানেটে দেখেননি নিরীহ হরিণ শাবককে কীভাবে ছিড়ে-খুঁড়ে মুখ রক্তারক্তি করে ফেলে সিংহবাহিনী। কখনো বন জঙ্গলে গেলে বন্দুক ঘাড়ে নিয়ে যাবেন। তখন বুঝবেন নিরস্ত্র হওয়ার অসহায়ত্ব আর সশস্ত্র হওয়ার মজা।

পরিতোষ: থাক পশু প্রসঙ্গ। পাখিদের কথা উঠলে আমার পায়রার কথা মনে পড়ে। আর পায়রার কথা উঠলে আমাদের দর্জি হাফিজ মিয়ার কথা না বললে চলে না। আফিমের নেশার মতোই ছিল ওর পায়রা ওড়ানোর নেশা। হাফিজ মিয়ার হাতে না হলে পায়রাগুলোর খাওয়াই হতো না। সে এক মর্মছোঁয়া মায়াবী দৃশ্যরে ভাই! পায়রা পাগল লোকদের মতো পায়রা নিয়ে বাজি খেলায় হাফিজের উৎসাহ ছিল না। ও এটাকে ছোট মনের কাজ ভাবত। ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে যে বাজি ধরা যায় না এসত্য আমাদের দর্জি হাফিজ বুঝলেও যুধিষ্ঠির বোঝেনি। মাশুলও দিতে হয়েছে তার জন্য। দাবা খেলার জন্য রাজ্য হারাতে হলো, ভাবা যায়?

যাকগে, বাদ দিন ওসব। বুঝলেন তো, ওর ছিল পায়রাদের বিশেষ ট্রেনিং দেওয়ার নেশা। ট্রেনিং দিতও একদম সামরিক কায়দায়। আমাদের হাফিজ ছিল পায়রাদের সার্জেন্ট মেজর। এ বিশেষ পায়রাগুলো ও তৈরি করত খানদানি পায়রা বীজের সঙ্গে মিলিয়ে। বেনারসি কাগজির সঙ্গে বাংলার কাগজি, সাবডুনের সঙ্গে নাসরা, প্লেনের সঙ্গে অপরাজিতা প্লেন, সবচিনিয়ার সঙ্গে কাগজি। অভিজাত শ্রেণির পায়রা তৈরিতে হাফিজের জুড়ি মেলা ভার।

মীজানুর: আর বলেন কেন। কবুতর পোষার নেশা যে কী গোরাকে না জানলে তা বোঝা মুশকিল। কত রকম কবুতর যে ছিল ওর সংগ্রহে। চওড়া লেজ লক্কা, বিলুণ্ঠিত লেজা লোটন, ধাবাড়ে গেরোবাজ, গোলা এসব আর কী। একটা চৌদ্দতলা বিল্ডিং-র দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলেন পরিতোষ। আমাদের পুকুর পাড়ের অর্জুন গাছের চূড়া দেখা গেলে আমরা ভাবতাম বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।

হ্যাঁ, একেবারেই গেছে। আপনি আর কখনো ধলেশ্বরীর আড়াই সেরি চারটে তাজা ইলিশ চার আনায় কিনতে পারবেন? এক কুড়ি ডিম দুই আনায় কিনতে পারবেন? টাকায় কুড়ি সের দুধ? ব্রহ্মদেশের সরু চাল তিন টাকা মন? এক ভরি সোনা ষোলো টাকায়? কোনো কোনো দিন একেবারেই যায়!

মীজানুর: বাড়ি ফেরার আনন্দ বুঝতাম যখন বসুবিজ্ঞান মন্দির ব্রাহ্ম গার্লস স্কুল বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, পার হয়ে যেতাম। মনে হতো ওই তো গড় পাড়ের মোড়। পাশেই ইলেকট্রিক পোস্ট, আরেকটু পরই মানিকতলা নতুন মার্কেটের উলটোদিকে যে সরু রাস্তাটা গড়পাড়ের ভেতর ঢুকে পড়েছে তার চার পাঁচটা বাড়ির পর অমলা আরতিদের বাড়ি তার পরেরটাই আমাদের। হোম, সুইট হোম! সে বাড়ি আর ধরে রাখতে পারলাম কই? জানেন আমার কিন্তু খুব আর্টিস্ট হওয়ার ইচ্ছা ছিল। আপনারা যাকে বলেন চিত্রকর। আপনার তো এ লাইনে চূড়ান্ত সিদ্ধি হয়েছে। তিন তিনবার ফ্রেঞ্চ গভর্নমেন্ট-এর কাছ থেকে স্কলারশিপ পেয়েছেন। একটা প্রভিন্স-এর আর্টিস্ট ইন রেসিডেন্স হয়েছেন। দেশ-বিদেশের কত নামজাদা ভিজিটিং আর্টিস্ট হিসাবে কাজ করেছেন। আমি কিন্তু ঢাকায় এসেই আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে কালার ব্লাইন্ড বলে আর্টিস্ট হওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো না। কার্টুন আঁকারও বাতিক ছিল। নানা পত্রিকায় ছোটদের জন্য কার্টুন এঁকে পাঠাতাম। কেউ ছাপত কেউ আবার ছাপতও না। কে যেন একবার বলেছিল ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব পাকিস্তান আমার একটা কার্টুন ছেপেছে। আর যাই কোথায়। আমি তো খুঁজে খুঁজে হয়রান। কোনো স্টলেই তখন ওই পত্রিকাটা পাওয়া যাচ্ছিল না।

পরিতোষ: আচ্ছা তখন ঢাকার নামকরা স্টল কোনগুলো ছিল? আটচল্লিশের পর ঢাকাকে আমি আর চিনি না।

মীজানুর: হ্যাঁ। উনপঞ্চাশে তো আপনি মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে চলে গেলেন।

পরিতোষ: হ্যাঁ। ইন্দোরের ড্যালি কলেজে তখন শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছিলাম।

মীজানুর: ওহ্! আপনি বলছিলেন স্টলের কথা। তখন ঢাকায় মোটে তিনটা পত্রিকার স্টলই ছিল। মেডিকেল কলেজের সামনে চার চাকার ঠেলাগাড়িতে ক্রিসেন্ট বুক স্টল, সদরঘাটের পাঁচমাথার মোড়ে বাংলাবাজারের মুখে ব্যাপ্টিস্ট মিশনের পাঠভবনের দেওয়ালঘেঁষে একটা চার চাকার স্টল আর চকবাজারের রাস্তাজুড়ে শানবাঁধানো গোল মঞ্চ। আরে, আসলটা তো বলতে ভুলেই গেছি। সেই যে ফুলবাড়িয়ার রেলস্টেশনের হুইলার বুক স্টল।

পরিতোষ: ঢাকা কিন্তু সংগীত আর রাজনীতি এ দুইয়ে সব সময় এগিয়ে।

মীজানুর: কিন্তু ভেবে দেখেছেন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের শুরু কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুঠ হওয়ার ঘটনাকে অন্তত আনুষ্ঠানিক সূচনা বলা যায়। আচ্ছা রাজনীতি থাক। আমরা সংগীত নিয়ে বলি।

পরিতোষ: আরেকটি কথা না বললেই নয়। আগে বিত্তবানরা সংগীত সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এখন সেসবের বালাই নেই।

মীজানুর: একদম ঠিক বলেছেন। নরেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর কথাই ধরুন না। বাড়ির মধ্যেই তৈরি করলেন বলধার মতো নন্দন কানন। রঙ্গমঞ্চ। নিজেই সুরকার, পরিচালক, লেখক। নাট্যমঞ্চ দুর্লভ দুষ্প্রাপ্য অ্যন্টিকের সংগ্রহশালা সব বাড়ির মধ্যে। এমনকি অভিনেতা অভিনেত্রীদের পর্যন্ত নিজের কম্পাউন্ডের ভেতর কটেজ বানিয়ে দিয়েছিলেন থাকবার সুবিধার জন্য। বাড়ির মেয়েদের বড় ওস্তাদের কাছে তালিম দিতেন। তাল লয় গান শেখানোর জন্য।

পরিতোষ: মধ্যবিত্তদেরও সংগীতের প্রতি টান ছিল। ঢপ গানের আসরগুলোর কথাই ভাবুন না। ঢপ তো এমন কোনো উচ্চমানের সংগীত নয়। অথচ সেগুলোও যারা গাইতেন একবার মনে আনুন তাদের ভক্তির ভঙ্গিটুকু। দর্শকরাও ছিল তেমনি সমঝদার।

মীজানুর: হ্যাঁ। পাতলা কোঁচানো ধাক্কাপাড়ের ঢাকাই ধুতি আর ধবধবে সাদা বিলেতি আদ্দির গিলে করা পাঞ্জাবি পরা সব বাবুরা বসে আছেন দর্শকসারিতে। রুপোর গোলাপ দানে গোলাপজল ছিটানো হচ্ছে, রুপোর থালা ভর্তি তবকমোড়া পান…।

সংগীতে ঢাকা যে বরাবরই উত্তাল তার কারণ জানেন তো? লাক্ষ্ণৌ-এর বিখ্যাত বিভিন্ন ঘরানার তবলাবাদক তানপুরাবাদকরা ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছিলেন। খ্যাতনামা হিন্দুস্তানি তবলাবাদকরা সব সময় আসা যাওয়া করতেন। ওয়াজেদ আলী শাহ-এর বিশেষ তবলাবাদক হোসেন বকস্-এর ছেলে আতা হোসেনও এ ঢাকারই। গল্প আছে আতা হোসেন যখন তবলা বাজাতেন তখন তার তবলাবাদনেই মোহিত হয়ে থাকত রইস খানদানরা। হিন্দুস্তানের বিখ্যাত সব গাইয়ে রুবাইয়ে সেতারবাদক সংগীতের উদীয়মান অনুরাগীরা বছরের পর বছর ঢাকায় থাকতেন। কাসেম আলী তখন ছিলেন বিখ্যাত রাবাব বাজিয়ে। জানেন তো, একবার বাজালে তার জন্য গুনতে হতো পাঁচশ টাকা। কাশ্মীরি ঘরানার বিখ্যাত শিল্পী ফয়েজউদ্দীন খাঁন, পাঞ্জাবি ঘরানার রওশন খাঁন, সারেঙ্গীবাদন আর বেহাগ রাগের গানে ছিলেন সবচেয়ে নামকরা।

যতক্ষণ আকাশের নীল ঢেউয়ে নক্ষত্রের ফেনা ততক্ষণ এদের কথাও ফুরোবে না। তাই ফিরে এলাম এই শতকে। মীজানুর রহমান আর পরিতোষ সেনের সঙ্গে এখন সমায়ন্তরের দীর্ঘ দেওয়াল। কেউ কেউ জানতে চাইল ফিরে এলেন কেন? গত শতকের ঢাকা নিয়ে তো শুনলাম, তারচেয়েও বেশি জানা প্রয়োজন, কেমন হবে আগামী শতকের ঢাকা? কেন জানতে চাইলেন না?

পরিতোষ: আমাদের জিন্দাবাহার গলিতে ফিটন গাড়ি চেপে নবাবপুত্ররা আসতেন লুকিয়ে সুন্নাত বাঈয়ের গান শোনার জন্য। ওদিকে আবার সমাজকেও সমঝে চলতে হতো। সে জন্যই এ ঢাক ঢাক গুড় গুড়। আপনার কি লক্ষ্মীবাজারের হাসনুর কথা মনে আছে? ঝুটে তানের আনন্দ দেওয়া গান গাইত। আমার কিন্তু হরি কর্মকারের কথা মনে পড়ে। লাক্ষ্ণৌ ঘরানার বিভিন্ন ওস্তাদদের কাছে শিখে গলা তৈরি করেছিলেন। মনে পড়ে কৃষ্ট দাশ সূত্রধর আর হরিনাথ কাকার কথা। আহ্, সে কি পাখোয়াজ বাজিয়ে! আর সরোদ বাদক এনায়েত খানের সরোদ সুর তো চোখ বন্ধ করলে এখনো কানে ভেসে আসে।

মীজানুর: এনায়েতের কবরও কিন্তু এ জয়দেবপুরে। গান-বাজনার সঙ্গে সেতার যন্ত্রটির জন্ম দিয়েছিলেন যে আমির খসরু তিনিও বছরের পর বছর ঢাকায়ই থাকতেন। মনে হতো ঢাকাই যেন তার ঘরবাড়ি।

পরিতোষ: হ্যাঁ, আমির খসরু ঢাকার না হলেও সৈয়দ আব্দুস সোবাহান কিন্তু এ ঢাকার মুকিমপুরেরই সন্তান। তিনিও ওস্তাদ বাজিয়ে ছিলেন। মাইনু মিয়াও ভালো সেতার বাজাতেন।

মীজানুর: ভগবান দাস বৈরাগী আর শ্যামা দাসের কথা ভুলে যাচ্ছেন কেন? এ দুজনই শান্তিপুরের নবীন চন্দ্র গোস্বামীর শিষ্য ছিলেন।

পরিতোষ: নওয়াব স্যার আব্দুল গনির ওখানে ঢাকার রইসরা জমা হতেন আর চা পান করতেন। এ পান ছুতো মাত্র। আসলে শুনতেন গান।

মীজানুর: এখন যেমন রেস্তোরাঁগুলোতে গান শুনতে শুনতে খাওয়া হয়। এ সংস্কৃৃতি তবে নতুন কিছু নয়! ঢাকার আদি সংস্কৃতিই। ওই চা পানের আসরে আন্নু গান্নু আর নোয়াবিন তিন বোন একসঙ্গে গান করত।

পরিতোষ: আরও ছিল এলাহী জান আর আচ্ছি বেগম, ওয়াসু।

মীজানুর: ওয়াসু আসলে ধারান ঘরানার গায়িকা। পরে ওয়াসু নিজের পেশা ছেড়ে বাইজি হয়ে গিয়েছিল। এমন ওস্তাদ গায়িকা কম দেখেছি। ওয়াসুর মেয়ে জামরারবাদের খুব করুণ মৃত্যু হয়েছিল জানেন?

মীজানুর: না, কষ্টের কথা জানতে চাই না। আপনার কি ঢাকার হীরা বাই-এর নাচের কথা মনে আছে? হীরার মেয়ে আবার গজলে নাম করেছিল। ইমামী নামে আরেকজন ছিল যে আবার উচ্চাঙ্গ সংগীতে পারদর্শী ছিল। আহা! কী স্মৃতি সেসব।

পরিতাষ: আমিরজান নামে ঢাকার বিখ্যাত নর্তকির কথা মনে আছে আপনার?

মীজানুর? আমিরজানের কথা ঠিক আমার মনে নেই। তবে অতুলবাঈ, লক্ষ্মী বাঈ এদের মনে আছে। সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে রাজলক্ষ্মীর কথা।

রাজলক্ষ্মীর নামে ছোট্ট একটি দীর্ঘশ্বাস বয়ে গেল দুজনের মধ্যে। দেখে দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়ে খানিকটা হেসে নিলেন।

মীজানুর: জানি জানি, আপনার সেই জিন্দাবাহার লেনের কালীমন্দির, যা বড় ভূমিকম্পে ধসে গিয়েছিল। রাজলক্ষ্মী সেটা আবার নিজের খরচে তৈরি করে দিয়েছিলেন। আমাদের গেছে যে দিন তা কি একেবারেই গেছে?

পরিতোষ: হ্যাঁ, একেবারেই গেছে। আপনি আর কখনো ধলেশ্বরীর আড়াই সেরি চারটে তাজা ইলিশ চার আনায় কিনতে পারবেন? এক কুড়ি ডিম দুই আনায় কিনতে পারবেন? টাকায় কুড়ি সের দুধ? ব্রহ্মদেশের সরু চাল তিন টাকা মন? এক ভরি সোনা ষোলো টাকায়? কোনো কোনো দিন একেবারেই যায়!

চার.

যতক্ষণ আকাশের নীল ঢেউয়ে নক্ষত্রের ফেনা ততক্ষণ এদের কথাও ফুরোবে না। তাই ফিরে এলাম এই শতকে। মীজানুর রহমান আর পরিতোষ সেনের সঙ্গে এখন সমায়ন্তরের দীর্ঘ দেওয়াল। কেউ কেউ জানতে চাইল ফিরে এলেন কেন? গত শতকের ঢাকা নিয়ে তো শুনলাম, তারচেয়েও বেশি জানা প্রয়োজন, কেমন হবে আগামী শতকের ঢাকা? কেন জানতে চাইলেন না?

বললাম, জানতে চেয়েছিলাম। দুজনেরই মুখের মোনালিসা হাসি পেখম মেলতে গিয়েও মেলল না। বললেন আমাদের তো ফেরার রাস্তায় খিল।

পাঁচ.

ঢাকা এক আশ্চর্য শহর বটে। পাহাড় নেই, শাল মহুয়া নেই। নদীও যেন ছুটতে গিয়ে খোঁড়া। যমুনা নেই, কদমগাছও নেই। অথচ আছে সেই ঘর পালানো মন, প্রাচীনতম বাঁশির ডাক শুনে খুঁজছে অন্ধকারের কুঞ্জবন।

আরো পড়তে পারেন

মহামায়া (পর্ব-২)

পড়ুন—  মহামায়া (পর্ব-১) ৩. কাঁচা রাস্তায় উঠতে উঠতে কাপড় ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে। পায়ের সাথে কাপড় জড়িয়ে যাচ্ছে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। সবার আগে মনিশঙ্কর হাঁটছে। তার হাতে মাথায় খাবারের টিন। একটা কাপড়ের ট্রাঙ্ক। সকলের হাতেই কাপড়ের পুটুলি। এতটুকু আসতেই হাপিয়ে উঠেছে। আরো অনেকটা দূর যেতে হবে হেঁটে। তারপর নৌকায় সীমানার কাছাকাছি কোনো একটা জায়গায়।….

মহামায়া (পর্ব-১)

১. সূর্য উঠতে এখনো অনেকটা দেরি। আকাশে কোনো তারা নেই। পুরোটা আকাশ মেঘে ঢাকা। রাতের অন্ধকারটা আজকে আরও বেশি চোখে লাগছে। বাতাস হচ্ছে। মাঝে মাঝে মেঘের আলোতে দেবীপুর গ্রামটা দেখা যাচ্ছে। মুহুর্তের জন্য অন্ধকার সরে আলোয় ভেসে যাচ্ছে। রাধাশঙ্করের ভিটাবাড়ি, ধান ক্ষেত, বাঁশঝাড় হাইস্কুল আলোয় ভেসে যাচ্ছে মুহূর্তের জন্য। মহামায়া আর মনিশঙ্করের ঘরে হারিকেন জ্বলছে।….

স্বর্ণবোয়াল

মোবারক তার কন্যার পাতে তরকারি তুলে দেয় আর বলে, আইজ কয় পদের মাছ খাইতেছ সেইটা খাবা আর বলবা মা! দেখি তুমি কেমুন মাছ চিনো! ময়না তার গোলগাল তামাটে মুখে একটা মধুর হাসি ফুটিয়ে উল্লসিত হয়ে ওঠে এই প্রতিযোগিতায় নামার জন্য। যদিও পুরষ্কার ফুরষ্কারের কোন তোয়াক্কা নাই। খাবার সময় বাপবেটির এইসব ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ খেলা আজকাল নিয়মিত কারবার।….

error: Content is protected !!