Author Picture

কুদরত-ই-হুদার ‘জসীমউদদীন’ ও আমাদের জসীমউদদীন চর্চা

আতিয়া সুলতানা

প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক ড. কুদরত-ই-হুদা দীর্ঘসময় ধরে বাংলা সাহিত্যের তথা বাংলাদেশের সাহিত্যের পট পরিবর্তনে অগ্রণী ব্যাক্তিত্ব ও মেধাবী সাহিত্যিকদের জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা করে আসছেন। অন্যান্য দিকপাল কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে কবি জসীমউদদীনের জীবন ও কর্ম নিয়ে তাঁর আগ্রহের জায়গাটি যতটা না পেশাগত তার চেয়ে বেশী আবেগ তাড়িত। চিরায়ত বাংলার ধারক, কবি জসীমউদদীনের জন্মস্থান ফরিদপুরেই নিজের জন্ম বলে, জসীমউদদীনের কাব্য ও রচনায় ফরিদপুর অঞ্চলের আবহমান প্রকৃতি, নৈসর্গ ও সেখানকার গ্রামীণ জীবনের প্রভাব এবং লোকজ জীবন-নির্ভর কবিতা রচনার প্রেরণা ইত্যাদি বিষয় খুব নিবিড়ভাবে গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন ড. হুদা। তাই অন্য সকলে কবি’র সাহিত্যকর্মকে যে আঙ্গিক থেকে বিশ্লেষণ করেছেন, ড. হুদা তাদের চেয়ে একটু ভিন্ন পথে হেঁটে কবি’র জীবন ও কর্মকে পাঠকের সামনে তুলে এনেছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। কবিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাঁর সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, আর কবি’র সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম উপায় হলো তাঁর সৃষ্টি নিয়ে অবিরত চর্চা; জসীমউদদীনের জন্ম, বেড়ে উঠা, বাল্যবয়সের শিক্ষা ও সাহচর্য, তাঁর আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং তাঁর কাব্যপ্রতিভার নানা দিক নিয়ে ড. কুদরত-ই-হুদা’র বই ‘জসীমউদদীন’ কবিকে নিয়ে চর্চার অন্যতম একটি প্রয়াস। স্বল্প পরিসরে হলেও বইটি জসীমউদদীনের কবি পরিচয় ছাড়িয়ে ব্যক্তি জসীমউদদীনকে আরো নিকট থেকে চিনতে সহায়তা করে।

বাংলার গ্রামীণ জীবন, লোকজ সংস্কৃতি, গ্রামের সহজ সরল মানুষদের উপজীব্য করেই সাহিত্য রচনা করেছেন কবি জসীমউদদীন, গ্রামীণ সমাজ জীবনকে বড় আঙ্গিকে ও বিস্তারিত পরিসরে কবিতায় তুলে এনেছেন তিনি

বাংলার গ্রামীণ জীবন, লোকজ সংস্কৃতি, গ্রামের সহজ সরল মানুষদের উপজীব্য করেই সাহিত্য রচনা করেছেন কবি জসীমউদদীন, গ্রামীণ সমাজ জীবনকে বড় আঙ্গিকে ও বিস্তারিত পরিসরে কবিতায় তুলে এনেছেন তিনি। শুধু কাব্যই নয়, জসীমউদদীনের শিশুতোষ রচনা, গান, নাটক, উপন্যাস সবর্ত্রই গ্রামীন জীবনই প্রাধান্য। এই গ্রামলগ্নতার দোষে ‘দোষী’ করেই তাকে ‘পল্লীকবি’ ছাপ মেরে তিরিশের দশকের আধুনিক কবিদের কাতার থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। তা সত্ত্বেও জসীমউদদীন তৎকালীন জীবনানন্দীয় পরাবাস্তবতা, রাবীন্দ্রিক ভাব-ঐশ্বর্যময়তা কিংবা নজরুলীয় সাম্যবাদী চেতনা থেকে অনেকটা বিপরীত দিকে হেঁটে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধারার কবিতা রচনা করেন। জসীমউদদীন রচিত কবিতাগুলো তাঁর সহজ-সরল, স্বতঃস্ফুর্ত ও মোচড়হীন কবিত্বশক্তির অন্যতম পরিচায়ক। সারাজীবন ‘পল্লীকবি’ মার্কা মারা মোড়কে আবৃত থাকায় জসীমউদদীনের কবিতা বা রচনায় গ্রামলগ্নতার বিষয়টি ছাড়া তাঁর কবিতার অন্য বৈশিষ্ট্য বা আঙ্গিক নিয়ে খুব একটা চর্চা হতে দেখা যায় না। এইদিক থেকে ড. কুদরত-ই-হুদা’র জসীমউদদীন গবেষণার আঙ্গিক একেবারেই ভিন্ন। তিনি পল্লীকবি নামান্তের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া কবি’র বৈচিত্র্যময় জীবনের পাশাপাশি তাঁর কাব্যশৈলী, ভাষা ও উপমার ব্যবহার, কবি’র রচনায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ ইত্যাদি অচর্চিত বিষয়গুলোর নির্মোহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে জসীমউদদীনের সাহিত্যকর্মকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবার বিষয়ে পাঠককে আগ্রহী করে তুলেন।

তিরিশের দশকে আধুনিকতার ছুঁৎমার্গ থেকে জসীমউদ্দিনকে আলাদা করে দিলেও, ড. হুদা জসীমউদ্দিনের কবিতায় আধুনিকতার উপস্থিতি ও তাঁর কবিতার আধুনিক বৈশিষ্ট্য সমূহ নিয়ে নিবিড় বিশ্লেষণ করেছেন

তিরিশের দশকে আধুনিকতার ছুঁৎমার্গ থেকে জসীমউদ্দিনকে আলাদা করে দিলেও, ড. হুদা জসীমউদ্দিনের কবিতায় আধুনিকতার উপস্থিতি ও তাঁর কবিতার আধুনিক বৈশিষ্ট্য সমূহ নিয়ে নিবিড় বিশ্লেষণ করেছেন। জসীমউদদীনের কবিতার আধুনিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে ড. হুদা আধুনিক কবিতায় উপমা ও অলংকারের ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। আধুনিক কবিতার ন্যায় নানা উপমা ও উৎপ্রেক্ষার শৈল্পিক ব্যবহার জসীমউদদীনের কবিতায় গভীর আর অব্যর্থভাবে ধরা দিয়েছে, রাখালের বাঁশীর সুরের সাথে কিশোরীর নাকের নোলকের দোলন কিংবা মোরগের পাখার মতো উড়তে থাকা তার শাড়ীর যে প্রাণবন্ত ও প্রেমময় আদান-প্রদান হতে পারে তা একমাত্র জসীমউদদীনের চোখেই ধরা পড়া সম্ভব। হলুদ বাটছে কিংবা দেহলিজে বসে সেলাই করছে, আবার কখনোবা খড়ি কুড়োচ্ছে বা বিয়ের গীত গাইছে, এমন সাধারন নারীদের অসাধারনভাবে দেখার কাব্যদৃষ্টি যে জসীমউদদীনের ছিলো তা কুদরত-ই-হুদার বর্ণনাতেই পাওয়া যায়। জসীমের কবিতায়ই প্রেম-প্রণয় আর লোকঐতিহ্য মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে পারে, নকশী কাঁথার মাঠে রূপাই-সাজুর প্রণয়ের সাথে বাংলাদেশের লোকঐতিহ্য আর ইতিহাসের অন্যতম অনুষঙ্গ নকশী কাঁথার আত্মিক যোগাযোগ-এর উপমা আধুনিক কবিদের কানে খটকা লাগলেও, জসীমউদদীনের কবিত্বশক্তি ও ভাষাশৈলীর গুণে তা হয়ে উঠে ছেদহীন ও মসৃণ! তৎকালীন কলকাতা কেন্দ্রিক আধুনিক সাহিত্যের হালচাল জেনেও তাদেরকে অনুকরনের সহজ পথ ছেড়ে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধারার কবিতা রচনার মধ্য দিয়ে জসীমউদদীন বাংলার লোকায়ত ঐতিহ্যের উত্তরসূরী হয়ে আছেন।

আরো পড়তে পারেন

শাহ বুলবুল-এর মৃত্যু ও নির্বাসন

কবিতা যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও স্বপ্নের সমাহার। কবির চিন্তায় থাকে বৈচিত্র, থাকে দেখার ভিন্নতা। সাধারণের কাছে চাঁদ নেহাৎ চাঁদই থাকে। কিন্তু কবির কাছে চাঁদ হয় কাস্তের মতো, ডাবের মতো, কখনও ঝলসানো রুটির মতো। আবার এক কবি থেকে আরেক কবির দর্শনও পৃথক হয়। একই গোলাপ প্রেমিককে আনন্দ দেয়, বিরহীকে বেদনাকাতর করে। কবি হাজার বছর ধরে….

আহমদ বশীরের ‘ত্রিশঙ্কু’: সময়ের জীবন্ত দলিল

কবিতার তুলনায় বাংলা উপন্যাসের বয়স খুবই কম। কবিতার বয়স যেখানে প্রায় হাজার দেড়েকের কাছাকাছি, সেখানে উপন্যাসের আয়ু এখনো দুইশ বছর পেরোয়নি। বাংলা উপন্যাসের আঁতুড়ঘরে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথম উপন্যাস নির্মাণ করতে গিয়ে সমকালীন ঘটনাকে আশ্রয় না করে ইতিহাসের আলো-আঁধারির জগৎকে উপজীব্য করেছেন। অর্থাৎ উনিশ শতকে রচিত উপন্যাসে তিনি ষোড়শ শতকের শেষ….

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের চেতনার বাতিঘর

এমনটি হতে পারে এবং হয়েছে সে বিষয়ে বিদগ্ধ লেখক প্রশ্ন তুলেছেন এবং সংশ্লিষ্টদের কাজের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন। দেখুন, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের চেতনার বাতিঘর। আমাদের অস্তিত্ব। সেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সেভাবে কথা বলা যায় না; মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কিংবা পরবর্তীকালে যেসব ষড়যন্ত্র হয়েছে কিংবা এখনও হচ্ছে তা নিয়ে কথা বলার মানুষের সত্যিকার অভাব রয়েছে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধ পরিবারের সন্তান….

error: Content is protected !!