ঘটনা ও দুর্ঘটনার মিশেলই বলা যায়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, এক বছর পূর্তির আরও দেড় মাস বাকি।

আমি ১৯৬৮র ক্লাস টেন। স্কুলটা ঢাকা শহরের রাজাবাজার এলাকায়, গ্রিন রোড থেকে খুব দূরে নয়। বাসা থেকে হেঁটে আসতে সর্বোচ্চ কুড়ি মিনিট। ক্লাস নাইনে ওঠার পর হেঁটে কমই এসেছি। রিকশাভাড়া এক সিকি মানে চার আনা। আমাদের বাসাটা কলাবাগান বশিরউদ্দিন রোডে, গ্রিন রোডের দিকটাতে।

স্কুলে ক্লাস টেনে আমরা আঠাশ কি ত্রিশ জন। স্কুলটাতে কো-এডুকেশন স্কুলের বাইরে আমার প্রিয় দুই বান্ধবী সায়মা খাতুন মুন্নি ও শামসিয়া নাজ তেজগাঁও পলিটেকনিক গার্লস হাইস্কুলে। কো-এডুকেশন নিয়ে তার কৌতূহলের শেষ নেই।

মুন্নির প্রশ্ন, আচ্ছা ছেলেরা কি তোদের সঙ্গে এক বেঞ্চে বসে?

শামসিয়া বলে, ছেলেরা কি খুব বেহায়া? বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে রাখলেও নাকি হাসে?

মুন্নির প্রশ্ন, ছেলেরা কি একই বাথরুম ব্যবহার করে মানে ওদের আলদা বাথরুম আছে তো?

শামসিয়া জানতে চায়, ছেলেরা কি চোখ মারে?

মুন্নি জিজ্ঞেস করে এ পর্যন্ত ক’টা লাভ লেটার পেয়েছিস?

আমার আপন বোন, শুধু আপন নয় যমজও, নাম আশামনি জিজ্ঞেস করে, খুকুমনি তোদের স্কুলের ছেলেরা আন্ডারওয়ার পরে তো?

আমারা যমজ, তবে আইডেন্টিক্যাল টুইন নই, আমি একটু লম্বা ধাঁচের বাবার মতো আর আশামনি মাঝারি, মায়ের গড়ন। বাবা বলেছে শেষ পর্যন্ত আমি পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি হব আর আশামনি পাঁচ ফুট এক ইঞ্চি। কিন্তু মেধায় আমি তার কাছাকাছিও যেতে পারছি না, ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছে, ক্লাস এইটে বৃত্তি পেয়েছে, হলিক্রস কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় চাঞ্চ পেয়ে ক্লাস সিক্স থেকে ওখানে পড়ছে। কয়েকজন টিচারকে ওরা সিস্টার বলে, সিস্টার ম্যারি অ্যান টেরেজা এবং সিস্টার নিবেদিতা কোরাইয়া।

ভালো ছাত্রীদের খারাপ চিন্তা করার কোনো সুযোগই নেই অথচ আশামনি জানতে চাচ্ছে ক্লাস টেনের ছেলেরা আন্ডারওয়ার পরে কি না? আমি ধমক দিই, এসব তোর জানার দরকার কি? তুই যদি এসএসসিতে স্টার মার্কস না পাস তাহলে বাবা কিন্তু মন খারাপ করে মারাই যাবে।

আশামনি জিজ্ঞেস করে আর তুই।

আমি যদি সেকেন্ড ডিভিশন পেয়ে যাই বাবার হয়তো অতিরিক্ত খুশিতেই হার্ট অ্যাটাক করতে পরে। আমি থার্ড ডিভিশন পেলেই বাবা সবাইকে মিষ্টি খাওয়াবে, আর যদি ফেল করে যাই তাহলে বলবে থাক আর কষ্ট করে পড়াশোনা করার দরকার নেই। আবু হানিফার সঙ্গে তাড়াতাড়ি তোর বিয়েটা সেরে ফেলি।

আশামনি হাসে। ফিজিক্স কেমেস্ট্রি পড়তে পড়তে আমি টায়ার্ড হয়ে পড়ছি অথচ বাবা আমার জন্য ভাবছে না। আবু হানিফাকে তো আমারও বেশ লাগে।

আরও ভালো লাগলেও বাবা তোকে তার অফিসের পিয়নের কাছে বিয়ে দেবে না। আবু হানিফা আমার মতোই মেধাবী, সময় থাকতে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ে ড্রপআউট হয়ে চাকরিতে ঢুকে গেছে।

এরকম প্রশ্ন আমার মা-রও কম নেই। খুকুমনি তুই কি ছেলেদের সামনে দাত বের করে হাসিস? স্যাররা কি তোদের মতো বড় মেয়েদেরও বেত মারে?

মার দুটো প্রশ্নের উত্তরই নগদ দিয়ে দিই। কি করব মা চেহারাটা পেয়েছি তোমার? উঁচু দাত তোমার কাছ থেকেই এসেছে। বাবা যদি বিয়ের আগে তোমাকে দেখত তাহলে পাত্রী পছন্দ করত না। দেখাদেখি না করে বিয়েটা করায় লাভ হয়েছে তোমার, বাবার মতো একটা হ্যান্ডসাম হাজব্যান্ড পেয়েছ। আমার হাসি নিয়ে চিন্তা কর না, স্কুলে হাসা নিষেধ আছে। গফুর স্যার আর অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড মিস্ট্রেস বেগম রাবেয়া বসরির ভয়ে হাসি এলেও সবাই রামগরুড়ের ছানা হয়ে থাকে, দাঁত বের করে না। অবশ্য আমরা মেয়েরা যখন কথা বলি তখন হাসতে মানা নেই। হাসির সময় আমার বের হওয়া দাঁত সবাইকে দেখিয়ে বলি, এটা আমার মার কাছ থেকে পেয়েছি।

মা বলল, খুকুমনি তুই অনেক বেশি কথা বলিস, এটা কি আমার কাছ থেকে পেয়েছিস?

আমি বললাম, না মা তুমি তো মেপে মেপে এমন সব কথা বল তার চেয়ে গায়ের চামড়া ছিলে মরিচের গুঁড়া ঘষে দেওয়াও অনেক ভালো। আমি আসলে কথাটা পেয়েছি নানির, মানে তোমার মায়ের। তোমার মা যখন কথা বলতে শুরু করে কারও কানের পোকা ভেতরে স্থির থাকতে পারে না। লাফিয়ে লাফিয়ে কান থেকে বেরিয়ে আসে। আর কী যেন জানতে চেয়েছিলে, বড় বড় মেয়েদের বেত মারে কিনা? গফুর স্যারের মারের চোটে আমাদের একটি ছেলে, নাম মনির হোসেন, দম বেরিয়ে যাচ্ছিল। স্কুলের চেয়ারম্যান ঢাকার এডিসি জেনারেল এসে স্কুলের সব বেত নিয়ে গেছেন এবং আদেশ দিয়েছেন যে স্যার বেত ব্যবহার করবেন জানা মাত্রই স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হবে।

মা বলল, এটা ঠিক হয়নি। সব স্কুলেই কিছু বানরও তো যায়। বেত না মারলে ওগুলোর বাঁদরামি যায় না।

আশামনি বলল, একদম ঠিক মা। আসলে চার্লস ডারউইন তার অভিব্যক্তিবাদ তত্ত্বে বলতে চেয়েছেন…।

আশামনি এগোতে পারেনি। মা বলল, এসব নাফারমানি কথা আমাকে শোনাতে হবে না। আমার তো বয়স কম হয়নি। একটা বানরকেও তো মানুষ হতে দেখলাম না, আমার মাও দেখেনি।

মা আশামনিকে ধমক দেয়, খুকুমনির সঙ্গে থেকে সময় নষ্ট করে জীবনটা বরবাদ করিস না। নিজের পড়া শেষ কর।

ক্লাস এইট পর্যন্ত আমরা আশামনি আর আমি একটা ডাবল খাটে ঘুমিয়েছি। বাবা বলল, দু’জনের পড়ার ধরন ভিন্ন খুকুমনি রাত দশটার আগে ঘুমিয়ে পড়ে আর আশামনি রাত একটা বাজায়। তারপর বই পড়তেই ঘুমায়, দু’জনের রুম সেপারেট হওয়া দরকার। কিন্তু একটা বাড়তি রুম কোথায় পাবে? বাবা-মা একটাতে, দাদি একটাতে আর রিফাত আর সিফাত একটাতে। তাহলে কিচেনটা দখল করতে হয়। তখন কি না খেয়ে থাকব?

বাবা মিস্ত্রি এবং হার্ডবোর্ড নিয়ে এলো। খাটটা লম্বালম্বি ঠিক মাঝ বরাবর কেটে দুটো করে পা লাগিয়ে দুটি সিঙ্গেল খাট করে ফেলল। আর ঠিক রুমের মাঝ বরাবর কাঠের ফ্রেমে বসিয়ে দিল হার্ডবোর্ডের পার্টিশন। একটা দরজাও রাখা হলো। অ্যাটাচড বাথরুমের ধারণাটা তখন আমাদের ছিল না। যেহেতু পড়াশোনাটা আমার জন্য মুখ্য কিছু নয় আমি বিভাজনটাকে আমার ঘুমের স্বার্থে স্বাগতম জানালাম। আর আশামনির মন খুশিতে ভরে গেল সে পড়াশোনার স্বাধীনতা পেয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে তার দিককার রুমটার চেহারাই পালটে গেল। হার্ডবোর্ডে আঠা দিয়ে লাগিয়েছে পৃথিবীর মানচিত্র, নিউটন ও আইনস্টাইনের ছবি, পিরিয়ডিক টেবিল। এই পিরিয়ড মেয়েদের সেই পিরিয়ড নয়, এটা কেমেস্ট্রির। দেয়ালে আমার দিকটা যেমন ছিল তেমনই। এসব ফালতু ছবি লাগাবার সময় আমার নেই।

স্কুলে আমার মেয়ে ক্লাসমেটদের মধ্যে তনুজা, শবনম, মিলি, শাসসুন্নাহার এবং ছেলে ক্লাসমেটদের মধ্যে রউফ, খালেদ, বাশার, ইমাম হোসেনের কথা বেশি মনে পড়ে।

১৯৬৮ তে আমরা যারা ক্লাস টেনে পড়তাম ২০১৮ তে তাদের ক্লাস টেনে পড়ার কিংবা এসএসসি পাশ করার পঞ্চাশ বছর পূর্তি হচ্ছে। এ নিয়ে আমাদের কয়েকজন উৎসাহী ছেলে ক্লাসমেট অর্ধশতক পরে আবার দেখা, নামের একটি গেট টুগেদারের আয়োজন করেছে। আমি একজনের ফোন পেয়েছি, যার সঙ্গে স্কুল জীবনে আমার একটি কথাও হয়নি। আমি বলেছি, ব্লাড প্রেশারের সমস্যা আছে, একটা পুরোনো ভক্সহল গাড়ি ছিল কিন্তু অনেকদিন ধরে গ্যারেজে পড়ে আছে। আমাকে যদি কেউ নিয়ে যায় যাওয়া হবে। আমি এখন আর বশির উদ্দিন রোডে থাকি না। থাকি কখনো গোপীবাগ সেকেন্ড লেনে। ওটা আমার হাজব্যান্ডের পৈতৃক বাড়ি। অধিকাংশ সময় উত্তরা। আমি সেধেই রিইউনিয়নের একটা চাঁদা দিতে চাইলাম, বলল লাগবে না, আমাদের সবার টাকা আমাদেরই একজন দিয়ে দিয়েছে।

১৯৭২-এর নভেম্বরের প্রথম দিন আমার বিয়ের দিন ধার্য হলো। পাত্র খায়রুল আলম প্রধান, উত্তরবঙ্গের মানুষ হলেও চট্টগ্রামে থাকে। কাজ করে চট্টগ্রাম বন্দরে, ভালো চাকরি, বেতন বেশি, দেখতেও মাশআল্লাহ। পাত্র ঠিক করা থেকে বিয়ে পর্যন্ত প্রায় পুরো দায়িত্বই পালন করেছেন আমার বড় মামা, নিজে কনফার্মড ব্যাচেলর, বন্দরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার মিয়া সাইফুল্লাহ। বিয়েতে আমার মতামতকে কেউ গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি, আমি রাজি কিনা কেউ জিজ্ঞেস করেনি। হাসলে দাঁত বেরিয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকায় পাত্রীদেখা পর্বে আমি মুখই খুলিনি।

আমার স্কুলেরই চার বছরের সিনিয়র আমানুর রহমান খানের সঙ্গে আমার দু’একটা পত্র বিনিময় হয়েছে। প্রেমপত্রই। কিন্তু চিঠির জবাব না পেয়ে ধরে নিই যে প্রতারণার শিকার হতে যাচ্ছি এবং সাধারণ উপসংহারে পৌঁছাই যে প্রেমিক মাত্রই ভন্ড ও প্রতারক। সুতরাং বড় মামার পছন্দ নিয়ে কোনো ধরনের আপত্তি করিনি। আমার খালাতো বোনের প্রেমিক যে দেশ ছেড়ে চলে গেছে তাকে বলেনি।

সেই মোস্তফা নুরুল আনোয়ার ক্লাস নাইনের হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার আগে বাংলা ও ইংরেজির নোট বই, একের ভেতর পাঁচ এবং ইংলিশ এসেস অ্যান্ড কম্পোজিশন নামের আরও দুটো বই, আমাকে অনুসরণ করতে করতে বাসায় প্রায় কাছাকাছি এসে আমার হাতে দিয়ে বলল, এগুলো পরীক্ষায় লাগবে। ফেরত দিতে হবে না, আমার আর এক সেট আছে

ক্লাস এইট থেকে টেন আমার তিন বছরের ক্লাসমেট ক্লাসের মোস্তফা নুরুল আনোয়ার, ক্লাস নাইন থেকেই যে তার সঙ্গে একটা সম্পর্ক চলে আসছিল, স্কুলের কেউই তা টের পায়নি বরং স্কুলে নারীবিরোধী হিসাবে তার সম্পর্কে একটি প্রচারণা শবনমের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে স্কুলে আসার পথে শবনমের পদক্ষেপ পানিতে পড়লে একটু খানি কাদা ছিটকে তার প্যান্টে লাগে। ব্যাপারটাকে দুর্ঘটনা হিসাবে না নিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সে কাদার ওপর দু’পায়ে লাফিয়ে উঠলে কয়েকগুণ বেশি কাদা ছিটকে তার সালওয়ার ও কামিজে লাগে। এটা ক্লাসের ছেলেমেয়ে কেউই পছন্দ করেনি, কেবল আমি ব্যতিক্রম। আমি বরং খুশি হয়েছি অহঙ্কারী শবনমের তো একটা শিক্ষা হলো। শবনম বিচার দেয়নি, কেউ কেউ প্ররোচনা দিলেও বলেছে, একবার ধুয়ে ফেললে সব ঠিক হয়ে যাবে।

সেই মোস্তফা নুরুল আনোয়ার ক্লাস নাইনের হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার আগে বাংলা ও ইংরেজির নোট বই, একের ভেতর পাঁচ এবং ইংলিশ এসেস অ্যান্ড কম্পোজিশন নামের আরও দুটো বই, আমাকে অনুসরণ করতে করতে বাসায় প্রায় কাছাকাছি এসে আমার হাতে দিয়ে বলল, এগুলো পরীক্ষায় লাগবে। ফেরত দিতে হবে না, আমার আর এক সেট আছে।

আমি একদিন একটি কৌটাতে মার রান্না করা পায়েস ভরে কাগজে পেঁচিয়ে সতর্কভাবে মোস্তফার হাতে চালান করে দিয়ে বললাম, খেয়ো, আমার রান্না করা পায়েস। কৌটা ফেরত দিতে হবে। এখানে, মিথ্যেটুকু হচ্ছে ‘আমার রান্না করা’।

কেবল ক্লাস টেনে উঠেছি। স্কুল কমিটির চেয়ারম্যান ঢাকার এডিসি আবু তালেব আমাদের ক্লাসে এসে বললেন, টেক্সট বই দিয়ে স্কুল-কলেজের পরীক্ষা পাশ করতে পারবে। কিন্তু জীবনের পরীক্ষায় পাশ করতে হলে টেক্সট বইয়ের বাইরে অনেক বই পড়তে হবে। কে কি বই পড়েছে তিনি জিজ্ঞেস করতে থাকেন। আমাকে যখন জিজ্ঞেস করলেন একটা বইয়ের নামও বলতে পারলাম না। আমি তো আর আশামনি নই যে টেক্সট বই পড়ব আবার আউট বই পড়ব। গফুর স্যারের নির্দেশ আছে স্কুলে আউট বই পড়া নিষেধ।

আমি কোনো নামই না বলতে পারায় তিনি অবাক হলেন এবং বললেন, ক্লাস টেনে উঠেছ শরৎচন্দ্রের কোনো বইও পড়েনি? তার কথায় আমার অস্বস্তি বোধ করার কারণ নেই, আমি থার্ড ডিভিশন পেলেই যথেষ্ট।

পরদিন ছিল রোববার ছুটির দিন। কড়া নাড়া শুনে দরজা খুলে অবাক হই। আমার বাবার সঙ্গে মোস্তফা তার হাতে একটি ঝোলা ব্যাগ।

কথা বাবাই বললেন, ভাগ্যিস মোশাররফ বলেছে, তা না হলে আমি তো কখনো জানতাম না যে এডিসি সাহেব পড়াশোনার জন্য তোকে অপমান করে গেছে।

আমি জিজ্ঞেস করি, বাবা মোশাররফ কে?

কেন এ ছেলেটি।

আমার নাম মোশাররফ না মোস্তফা।

বাবা বললেন, একই কথা। ছেলেটি তোর জন্য বই নিয়ে এসেছে। তাড়াতাড়ি এগুলো পড়ে শেষ করে ফেরত দিবি। নেক্সট টাইম জিজ্ঞেস করলে দু’চারটা বইয়ের নাম তো বলতে হবে।

বাবার সামনেই মোস্তফা ঝোলা ব্যাগ থেকে বই বের করতে শুরু করল। সবই শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বই: বিন্দুর ছেলে, পরিণীতা, শ্রীকান্ত চার খণ্ড, দেবদাস, চরিত্রহীন, পল্লী সমাজ, পথের দাবী, দত্তা, দেনা পাওনা ও শেষ প্রশ্ন।

মোস্তফা বলল, আরও আছে, এগুলো শেষ করলে পড়তে দেব।

বাবা জিজ্ঞেস করলেন, মোশাররফ তুমি এগুলো পড়েছ তো?

আমি বললাম, বাবা ও মোস্তফা।

বাবা আবারও বললেন, একই কথা।

মোস্তফা বলল, আমি এসব বই পড়ি না। সে জন্যই তো দিয়ে দিলাম। আমি পড়ি দস্যু মোহন, দস্যু বলহুর, কুয়াশা এবং মাসুদ রানা।

এগুলো কী ধরনের বই বাবার কোনো ধারণাই নেই। বললেন, বাহ বেশ তো। আমার সামনেই মোস্তফাকে বললেন, তুমি একটু খেয়াল রেখ এরকম পড়া না পারার কোনো ঘটনা থাকলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানিয়ে যাবে। খুকুমনিকে নিয়ে সমস্যায় আছি, অথচ আশামনি!

আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য মোস্তফা বাড়তি এক মিনিটও দাঁড়ায়নি। বরং বাবাই তাকে বলেছে, কিছু খাবেটাবে না।

কিছু খাবে-টাবে না নিমন্ত্রণের ভাষা নয়, এর মানে খাওনি ভালো করেছ, এখন বিদেয় হও।

আমিই একদিন স্কুলে ঢোকার পথে জিজ্ঞেস করলাম, অনেক টাকার বই, টাকা কোথায় পেলে?

অবলীলায় বলে ফেলল চুরি করেছি, আব্বার আলমারি থেকে। আগেও করেছি এখন পর্যন্ত ধরা পড়িনি, পড়লে পুলিশে দিয়ে দেবে।

পুলিশের নির্মমতার কথা দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়। আমি হেডলাইন পড়েছি। মোস্তফাকে পুলিশ পেটাচ্ছে এমন একটা দৃশ্য কল্পনা করে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। বান্ধবীদের খাওয়াব বলে মাকে দিয়ে ডিমের পুডিং বানাই। চ্যাপ্টা কৌটায় ঢুকিয়ে স্কুলে আসি। দুর্ভাগ্যই সেদিন মোস্তফা আসেনি।

কিন্তু পুডিং কি করব?

আমি শুধু এটুকু জানতাম মোস্তফা রাজাবাজার মসজিদের আশপাশে কোথাও থাকে। আমি তাকে বের করতেই চাই। আজিজ মেডিকেল হল নামের একটি ওষুধের দোকানে এসে জিজ্ঞেস করি, কোথায় মোস্তফাদের বাসা। সন্ধান পাই। কি পরিণতি ঘটবে কি বলব কিছুই না ভেবে দরজায় কলিং বেল টিপি। সে আমলে খুব কম বাড়িতেই কিলং বেল থাকত।

দরজা মোস্তফাই খুলে, চোখ মুখ ফোলা চোখের নিচে কালচে হয়ে আছে। আমি জিজ্ঞেস করি কী হয়েছে।

বলল, আরও বই কেনার জন্য টাকা চুরির সময় ধরা পড়েছে। তারপর তার বাবা ও বড় ভাই মিলে পিটিয়েছে। সমস্যা নেই। সেরে যাবে।

আমি পুডিং-এর কৌটা তার হাতে দিয়ে আবারও মিথ্যে বলেছি, আমি বানিয়েছি। তুমি খেয়ো। কৌটা ফেরত দিতে হবে, নতুবা ধরা পড়ে যাব।

আমি দ্রুত পায়ে রাজাবাজার ছাড়িয়ে গ্রিন রোডে পড়ে রিকশা নিই এবং এক সিঁকিতে বাসায় ফিরে আসি।

মোস্তফার সঙ্গে আমার প্রেমপত্র বিনিয়ম কিংবা ভালোবাসাবাসির কোনো কথা হয়নি। মোস্তফাই একদিন বলল, তোমার আব্বার সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। দু’চার বছর পর আমিই প্রস্তাব দেব, খুকুমনিকে বিয়ে করতে চাই।

আমি কোনো জবাব দিতে চাইনি, তবুও মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, তাহলে তাড়াতাড়ি বড় হও।

আমার কথায় মোস্তফার শরীর যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ওঠে। হঠাৎ ঝলকানোা উজ্জ্বল চোখে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, ঠিক। ঠিক বলেছ।

মোস্তফা আর বেশি বড় হতে পারেনি।

বাহাত্তরের অক্টোবরের ৩০ তারিখ ছিল গায়ে হলুদ। আমার প্রাইমারি স্কুল জীবনের ক্লাসমেট শামসিয়া নূর আমাকে হলুদ দেওয়ার নাম করে করে খুব কাছে এসে বলল, তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে।

বল।

সম্ভব নয়, আলাদাভাবে বলতে হবে।

অতিথির ভিড় কমলে বাথরুমে যাওয়ার কথা বলে শামসিয়াকে নিয়ে এগোই এবং বলি, কী বলতে চাস বল।

বিয়ের দিন, মানে পরশুদিন আমান ভাই তোকে বিয়ের আসর থেকে কিডন্যাপ করবে। তুই শুধু জেনে রাখলি আমান ভাই বলেছেন, তুই যদি কো অপারেট করিস তাহলে ভালো, যদি না করিস তাহলে জোর খাটাতে হবে, দরকার হলে গোলাগুলিও করবে, সেটা খারাপ দেখাবে। কিন্তু এতটা হেলে পড়া যাবে না যাতে কারও সন্দেহ হয় এটা পাতানো খেলা, কিডন্যাপ নয়।

আমি জিজ্ঞেস করি, তিনি এতদিন কোথায় ছিলেন, আমার চিঠির তো জবাব দেননি।

শামসিয়া বলল, আমি যদ্দুর জানি জেলে। এই সপ্তাহেই ছাড়া পেয়েছে।

জেলে কেন?

ধারণা নেই, নিশ্চয়ই সেই রকম আকাম কিছু একটা করেছে।

এখন আমাকে কী করতে হবে?

সিদ্ধান্ত তোর। আমি শুধু মেসেজটা দিলাম।

পরদিন ৩১ অক্টোবর আমার ক্ষুব্ধ বাবা আমার মা-খালাদের স্বভাব চরিত্র খারাপ বলে গালাগাল করলেন, আমিও সেই চরিত্রের এ কথা বললেন। আমান গুন্ডা নাকি তাকে হুমকি দিয়েছে মেয়েকে অন্য কোথাও বিয়ে দিলে খুকুমনির লেখা প্রেমপত্রগুলো জনে জনে বিতরণ করবে। বাবার কথা শুনে মনে হলো আমি যেন হাজার হাজার প্রেমপত্র লিখেছি। আমি তো জানি মোট তিনটা চিঠি আমি লিখেছি, তিনটাই আমাকে লেখা চিঠির জবাব।

মোস্তফা বিয়ের কথা শুধু জানেইনি, আমার বাবা তাকে দাওয়াত দিয়েছে এবং বিয়েটা ভন্ডুল করার একটা ষড়যন্ত্র চলছে এটাও তাকে বলেছে। এরকম কিছু ঘটতে দেখলে তা প্রতিহত করার দায়িত্বও তাকে দিয়েছে।

মোস্তফা বলেছে তাকে সাহায্য করার জন্য কলাবাগানের হিরোকেও দাওয়াত দেবে, হিরোর পিস্তল আছে। অন্য মাস্তানরা তাকে সমীহ করে।

হাসপাতালে মোস্তফাকে দেখতে যেতে চাই। কিন্তু বাসা থেকে বেরুবার অনুমতি দেওয়া হয়নি। সপ্তাহ না যেতেই নটরডেম কলেজের ইংরেজির শিক্ষক নাসিমুল করিমের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে যায়। শান্ত মেজাজের ভালো মানুষ আমার কিডনাপের ঘটনা নিয়ে কখনো কিছু জানতে চায়নি

সে কালের বিশেষ মর্যাদার ইস্কাটন লেডিস ক্লাবই বেছে নেওয়া হয়। ভাড়া বেশি তবুও। বড় মামা বললেন, পাত্রপক্ষকেও তো দেখাতে হবে বশিরউদ্দিন রোডে থাকলেও আমাদের স্ট্যান্ডার্ড ইস্কাটনের চেয়ে কম নয়।

কাতান পরে বউ সেজে সাতটার মধ্যেই আমিসহ কনে পক্ষ হাজির। বরপক্ষ রওয়ানা হবে কমলাপুরের কাছাকাছি রেলওয়ে বাংলো থেকে। রেলের একজন বড়কর্তা পাত্রের দুলাভাই। আটটার মধ্যে তাদের পৌঁছার কথা। পৌনে আটটার দিকে বেশ ক’টা পটকা ফাটল, আমি ভাবলাম পাত্র এসে গেছে। আসলে এসেছে আমান, তার এক হাতে পিস্তল ধরা। খুকুমনি কোথায়, খুকুমনি কোথায় বলতে বলতে আমান বরকনের ডায়াসের দিকে চলে এলো, সঙ্গে আরও তিন-চারজন। আমান ছাড়া সবার চোখে কালো চশমা। বাঁচাও বাঁচাও বলে আমার চেচিয়ে ওঠার কথা, আমি বাধা না দিলেও কোত্থেকে মোস্তফা এসে আমানকে সজোরে ধাক্কা দিল, অমনি আমানের সঙ্গীরা আরও কিছু পটকা ফাটাল, ভেতরটা ধোঁয়াচ্ছন্ন করে ফেলল, মেরে ফেলবে নাকি এ ধরনের দুএকটা চিৎকারও এবং অতিথিদের দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার শব্দ শোনা গেল। ধোঁয়াটে ভাবটা কেটে গেলে স্পষ্ট দেখলাম ফ্লোরে কাতরাচ্ছে মোস্তফা। গুলি কোথায় লেগেছে এত দূর থেকে বলা সম্ভব নয়, তবে খুব রক্ত ঝরছে। আমি বাবা বলে একটা চিৎকার দিলাম। লাভ হলো না কেউ এলো না। আমার এক হাত ধরে আমান বলল, চল।

ইস্কাটন লেডিস ক্লাবের ঠিক গেট বরারব স্টার্টের ওপর থাকা একটি শেভ্রলেট গাড়িতে উঠলাম। পেছনে আমি ও আমান। সামনে ড্রাইভার ও একজন। পেছনে জিপটিতে চারজন সম্ভবত আমানেরই লোক।

আমি শুধু বললাম, এত নাটক করার দরকার কী ছিল? তুমি আগে বললে তো আমি নিজেই এসে হাজির হতে পরতাম। তুমি কি মোস্তফাকে মেরে ফেলেছ?

মোস্তফা কে?

তুমি যাবে গুলি করলে?

আমি গুলি করে থাকলে বাঁচার কথা নয়। আমার নিশানা একশতে একশ। এ হারামজাদা আমাকে ধাক্কা মারতে গেল কেন? আর একটু হলে তো হুমড়ি খেয়ে পড়তাম। ওরা কেউ করে থাকবে। কিন্তু এই মোস্তফাটা কে?

আমি বললাম, বাবার গেস্ট, এমনিতে বাবার সঙ্গে খুব খাতির।

বললে, তোমার বাবাকে খরচ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু দেখেই তো তোমার বাবার ঘাবড়ে যাওয়ার কথা।

ড্রাইভারের পাশে বসা আমানের সাগরেদ বলল, শ্বশুর সাহেবকে কিসের গুলি করব। পটকার আওয়াজেই তো অজ্ঞান হয়ে গেলেন। শালা মেনি বিলাই।

শ্বশুর সাহেব মানে তার নয়, আমানের শ্বশুর।

জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছি?

আমান বলল, ময়মনসিংহের ধোবাউড়া। আমার বাবার বাড়ি।

গাড়িটা ফার্মগেটের কাছাকাছি আসতে একটা বোমা ফাটার মতো শব্দ শুনলাম, পরে জানলাম গাড়িটার চাকায় গুলি করাতে চাকা বার্স্ট করেছে। আমাদের গাড়িটার সামনেই একটা পুলিশের গাড়ি। মুহূর্তেই গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভারের পাশের জন এবং আমার পাশের জন হাওয়া হয়ে গেল।

পুলিশ আমাকে ইস্কাটন লেডিস ক্লাবে নিয়ে এলেও এটা প্রায় জনশূন্য। বরযাত্রী পৌঁছার আগে হাজির হওয়া একজন লেডিস ক্লাবের উল্টোদিকের থেকে কমলাপুরে ফোন করে জানিয়ে দিল তোমরা এসো না। পাত্রী কিডনাপড, ঘাপলা আছে। আমার বাবা মোস্তফাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেছে, আমার বড় ভাই কথা বলছে মোস্তফার মাস্তান বন্ধু হিরোর সঙ্গে। তার মোটরসাইকেল ছিল। আমানের শেভ্রোলেটের গাড়ির চাকার গুলিটা সেই করেছে।

কাতান খুলে ফেললাম বাসায় পৌঁছতেই আশামনি বলল, এটার সঙ্গে তুই জড়িত। মোস্তফা ভাই যদি মারা যায়, তুই হবি খুনের মামলার আসামি, মনে রাখিস।

রাতটা কোনোভাবে কাটল।

সকালের কাগজে দেখলাম রাজধানীতে বিয়ের কনে অপহরণ। বিয়ের অনুষ্ঠানে আসা কিছু পিস্তলধারী কিডনাপারের সামনে যেতে কেউ রাজি নয়। কনে শেষ পর্যন্ত তার হাতে সজোরে কামড় বসালে কিডনাপার তাকে চড় মেরে বলে, শাট আপ। সময় মতো তেজগাঁও থানার ফোন যাওয়া পুলিশ সতর্ক হয় এবং গুলি করে গাড়ি ও চাকা পাংচার করিয়ে কনেকে উদ্ধার করে। ঘটনা ঘটার এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে অপহৃত কনেকে অপহরণকারীর হাত থেকে উদ্ধার করে পুলিশ বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। গাড়ির ড্রাইভার গ্রেফতার হলেও অপহরণকারী এবং গাড়িতে থাকা সহযোগী দ্রুত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

আরও একটি মিথ্যে কথা আমাকে বলতে হয়, আমি অপহরণকারীকে চিনতে পারিনি, মুখোশ ও কালোচশমা পরিহিত ছিল।

হাসপাতালে মোস্তফাকে দেখতে যেতে চাই। কিন্তু বাসা থেকে বেরুবার অনুমতি দেওয়া হয়নি। সপ্তাহ না যেতেই নটরডেম কলেজের ইংরেজির শিক্ষক নাসিমুল করিমের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে যায়। শান্ত মেজাজের ভালো মানুষ আমার কিডনাপের ঘটনা নিয়ে কখনো কিছু জানতে চায়নি। ১৯৭৩ সালেই ইংরেজির শিক্ষক হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো না কোনো দেশে এবং কয়েক বছর নিউইয়র্কে কেটে যায়। আমি তিন সন্তানের-দুই ছেলে এবং এক মেয়ের মা হই।

নাসিমুল করিম যথেষ্ট অর্থ কামাই করেছে। ওয়েজ আর্নার হিসাবে উত্তরায় রাজউকের প্লট পেয়েছে। সেখানে ছয়তলা ভবন হয়েছে। সন্তানদের কেউ দেশে নেই, সবাই আমেরিকায়। আহাদ ও ফাহাদ, আমার দুই ছেলে অনেকদিন ধরেই চাকরি করছে। আহাদ ভারতের কেরালার একটি মুসলমান মেয়েকে বিয়ে করেছে। মেয়েটি মেধাবী, পিএইচডি করছে। ফাহাদ রিটা হেওয়ার্থ জোন্স নামের ওয়েলশে জন্ম নেওয়া এবং আমেরিকাতে মাইগ্রেট করা একটি মেয়ের সঙ্গে লিভ ইন সম্পর্ক রয়েছে, রক্ষণশীল মানসিকতার কারণেই হয়তো ব্যাপারটা আমার পছন্দ হচ্ছে না। লুবনাও মেধাবী ছাত্রী কেপিএমজি তে ইন্টার্নশিপ করছে। ওখানেই চাকরি হয়ে যাবে।

স্থায়ীভাবে বাস করার জন্যই চল্লিশ বছর পর ২০১৪ সালে ঢাকায় ফিরি। আশামনি বিয়ে করেনি, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে অবসর নিয়েছে এখন ধর্ম চর্চা করে। আল কোরআনের সরল অনুবাদে হাত দিয়েছে। আমার সঙ্গে সম্পর্কে ভাটা পড়েছিল ১৯৭২ সালেই। মোস্তফা নুরুল আনোয়ারের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার জন্য আমাকেই দায়ী করে এবং আমাকেও চরিত্রহীন মেয়েদের একজন মনে করে। আমাদের বিয়ের ৩৫তম বছরে আমার স্বামী নাসিমুল করিম হজের সময় শয়তানকে পাথর মারতে গিয়ে পদপিষ্ঠ হয়ে মারা যায়। তাকে মক্কাশরিফে জান্নাতুল বাকীতে সমাহিত করে মধ্যপ্রাচ্যর পাট চুটিয়ে ছেলেদের কাছে নিউইয়র্ক চলে যাই। মধ্যপ্রাচ্য যেমন আমেরিকাতেও ঠিক একইভাবে আমি আমার নিজের জীবন খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে যাবার আগেই বুঝতে পারছিলাম তারা মনে করছে আমি তাদের ব্যাপারে বেশি নাক গলাই, আমার মতামত চাপিয়ে দিই; নিজেকে আর তাদের জীবন গড়ার জন্য অপরিহার্য মনে হয় না।

আমানের খবর আগেই পেয়েছিলাম, অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় তাকে একেবারেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার স্ত্রী এক ভারতীয় অবাঙালি নারী সন্তান কোলে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিল হিস্যা আদায় করতে পারেনি, তার কিঞ্চিত সম্পদ থাকলেও ধারদেনা ছিল তার বহুগুণ। অর্থকষ্টেই জীবন কেটেছে তার। টাকার জন্য দরদ ছিল না, যা পেয়েছে দুহাতে বিলিয়েছে, উড়িয়েছে।

আমি মোস্তফা নুরুল আনোয়ারের খবর নিতে চেষ্টা করি। ঢাকায় নেই। বাবার কাছ থেকে পাওয়া বাড়িটার অংশ ভাইবোনদের কাছে বেচে দিয়ে সে ঢাকায় অনেক দূরে রাজেদ্রপুরের কাছে পাঁচ কাঠা জায়গা কিনে সেখানে এক রুমের একটি বাসা বানিয়েছে। একাই থাকছে। তার শহর ভালো লাগে না, মানুষ ভালো লাগে না। একটা বড় সময় নাকি শুয়ে শুয়েই কাটায়, শরীরের যন্ত্রণা। বিয়েও করেনি। আমি তার রাজাবাজারের বাসায় যাই, আমাকে চিনবে এমন কাউকে পাইনি। তার ভাইয়ের মেয়ে অহনার কাছ থেকে ঠিকানা নেই। তারা কখনো সেখানে যায়নি। মোস্তফা চায় না কেউ সেখানে যাক।

আহনা পরামর্শ দিল, যদি যান তাহলে একটা জিনিস নিয়ে যাবেন। তখন খারাপ ব্যবহার করবে না।

ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়া অহনাকে জিজ্ঞেস করি কি নিয়ে যাব? ফিস ফিস করে বলল, গাঁজা। অনেক বছর আগে গুলি খেয়েছেন তো, সে যন্ত্রণা কমাতে তখনই গাঁজা ধরেছিলেন, এখনো ছাড়তে পারেনি। আরও বলল, মোস্তফা চাচাকে সবাই ভুল বুঝে কিন্তু আমি জানি চাচা খুব ভালো মানুষ।

আমি জিজ্ঞেস করি, তোমার চাচা বিয়ে করেনি কেন?

আমার প্রশ্নের ভুলটা কোথায় তখন ধরতে পারিনি। অহনা জিহ্বায় কামড় দিয়ে বলল, আমি জানি না, জানলেও এটা বলা যাবে না।

আমি দিনের চুক্তিতে ট্যাক্সি ভাড়া করি। অহনার পরামর্শের জিনিস কোথায় পাব জানি না। আমি ট্যাক্সির ড্রাইভারের কাছেই বলতে বাধ্য হলাম কোথায় পেতে পারি, একজন রোগীকে দেখতে যাচ্ছি, ওষুধ হিসাবে এটা খান।

ড্রাইভার বলল, এটা একটা কথা বললেন, এ জিনিস শহরের অলিতে গলিতে পাওয়া যায়।

বিশ্বরোডের পাশে ট্যাক্সি পার্ক করে খবরের কাগজে প্যাঁচানো একটা পোঁটলা আমার হাতে দিয়ে বলে, পাঁচশ টাকা।

আমি বলি, ঠিক আছে।

আমার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। একটা রেস্তোরাঁ থেকে কিছু খাবার নেই। জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে কিছু ফল।

আরও প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ঠিকানায় পৌঁছি। খুব কাছাকাছি এসে একটি দোকানে ঠিকানাটা দেখানোর পর সঠিক নির্দেশনাই দিল। জানতে চাইল আত্মীয় কিনা? তার খোঁজে কখনো কাউকে আসতে দেখেনি। এক নামে সবাই চেনে, বলবেন গাঁজা মোস্তফা।

প্লটের চারপাশে উঁচু দেয়াল। জং ধরা একটা লোহার গেটও আছে। গেটের ভেতর আসলে বিশাল একটা রিকশা গ্যারেজ। দুটো সিএনজি অটোও আছে। একপ্রান্তে ছোট এক রুম টিনশেড। আমি এগিয়ে যাই, কড়া নাড়ি। খালি গা লুঙ্গি পরা যে মানুষটি দরজা খুলে আমি বিয়াল্লিশ বছর পর তাকে দেখছি।

বললাম, মোস্তফা আমি।

আপনি?

মোস্তফা আমাকে চিনতে পারনি?

জি চিনতে পেরেছি, বলেই একটু পিছিয়ে গিয়ে পাঞ্জাবি পরতে চেষ্টা করল, কিন্তু বাম হাতটা পাঞ্জাবির হাতার ঢুকাতে পারছিল না। মোস্তফা আমি তোমাকে সাহায্য করছি।

না না আপনি কেন, আমি পারব।

মোস্তফা পারেনি, আমি পরিয়ে দিয়ে বলেছি, আজ তোমার সঙ্গে খাব।

একজনের ভাত আছে, আচ্ছা আপনি খান আমি রাতে খাব।

মোস্তফা আমি খাবার নিয়ে এসেছি। সেটা ভাগ করে খাব। অন্যের খাবারের আমার কী দরকার, এমন একটা অভিব্যক্তি তার।

মোস্তফা তুমি আমাকে আপনি বলছ কেন?

স্কুলে তো সেরকম নিদের্শই ছিল।

আমি আশ্বস্ত হই সে আমাকে চিনতে পেরেছে।

তারপরও তুমি আমাকে তুমিই বলেছ, আউট বই পড়ি না বলে আমার বাবার কাছে নালিশ করেছ। তোমার বাবার আলমারি থেকে টাকা চুরি করে বই কিনে দিয়েছ, মার খেয়েছ।

মোস্তফার মুখে হাসি, আপনি মনে করিয়ে না দিলে হয়তো আর জীবনেও স্মরণে করতে পারতাম না।

তুমি ঢাকা ছেড়ে এখানে কেন চলে এলে?

ঢাকার খরচ বেশি। এখানে বেশ চলে যায়, রিকশা গ্যারেজ থেকে ভালো টাকা ভাড়া হিসাবেই পাই।

আমাকে জিজ্ঞেস করার মতো কোনো প্রশ্নই তোমার নেই?

কী প্রশ্ন জিজ্ঞেস করব? স্বামী-সংসার-বাচ্চা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে।

আমার খিদে লেগেছে, চল খাই।

আমি খাবার বের করি। মোস্তফা দুটো মেলামাইন প্লেট, দুটো চামচ, একটা গ্লাস বের করে।

আমি ট্যাক্সি ড্রাইভারকে টাকা দিয়ে এসেছি আশপাশের কোনো হোটেল থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে নেবে।

এবার মোস্তফা উঠে বসে, লুঙ্গির গিঁট বাঁধে এবং বলে ঠিক আছে তুমি ঘুমাও আমি তোমার সঙ্গে এক ঘরে থাকলে কথা রটবে। আমি এতদিন যে জীবন যাপন করে এসেছি আমি সেটাই চাই। আমি বললাম অসম্ভব। আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরেই ঘুমাব। আমি আর একলা থাকতে চাই না

আমাকে ভরপেট খেতেই হয়। বাংলাদেশে ফেরার পর আমার ক্ষুধা ও ওজন বেড়েই চলেছে।

মোস্তফা নিস্পৃহভাবে দু’চামচ খাবার নেয়। কিন্তু তার খাওয়া হয় না। বলে ক্ষুধা লাগেনি।

আমি পুঁটলিটা তার হাতে দিয়ে বলি এটা খেলে কি ক্ষুধা লাগবে?

খাবারের কাগজ সরাতেই কাঁচা ঘাসের ঘ্রাণ আসে। পুঁটলি হাতে নিয়ে একবার শুঁকে আমাকে তুমি সম্বোধন করে বলল, খুকুমনি তুমি এত নিচে নেমে গেছ?

আমিও তার কথা শুনে অবাক হই।

কাগজ দিয়ে আবারও পেঁচিয়ে আমার কাছে ফেরত দেয়। বলে ফেরার সময় কোথাও ফেলে দিও। আমি খাই চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছর ধরেই খাই, কিন্তু তোমার কাছ থেকে নিতে পারি না। অসম্ভব। আমার সম্পর্কে তুমি এসব কথা শুনে এসেছ?

চল্লিশ বছর ধরে কেন খাও?

শরীরের যন্ত্রণা কমাতে আর ক্ষুধা বাড়াতে। আমার যন্ত্রণাও কমে না ক্ষুধাও লাগে না।

আমি তিনদিন পর আবার রাজেন্দ্রপুর আসি। কিছু নাশতা, কিছু খাবার সঙ্গে নিই। আমার আসা তাকে অবাক করে না। সেদিনও অবাক হয়নি। অবাক না হওয়া নাকি ম্যাচুরিটির লক্ষণ। হতে পারে মোস্তফা অনেক ম্যাচুরড।

আমি জিজ্ঞেস করি, তুমি বড় হওয়ার জন্য বসে থাকলে। কিন্তু তুমি তো একটা আস্ত বেহায়া, আমার বিয়েতে এলে কেন, আমি তোমাকে দাওয়াত দিইনি।

মোস্তফা বলে, এসব সামান্য ব্যাপারে সেন্টিমেন্টাল হলে হয়। তোমার আব্বা ডেকে বললেন, কারা নাকি তোমার বিয়েটা ভাঙার চেষ্টা করছে, পরে তো দেখলাম আরও ভয়াবহ ব্যাপার, তোমাকে কিডনাপ করছে এর পর কী হতে পারে তা তো আমার জানা আছে। আকাম কুমাম করে এক সময় গলা টিপে তোমার লাশটা কোনো নর্দমায় ফেলে দিত। সে জন্যই ঠেকাতে চেষ্টা করছিলাম। তারপরই তো গুলি করে দিল। আমি যে বেঁচে থাকব এটা তখন মনে হয়নি। তোমার বাবাই আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন।

আমি বললাম, মোস্তফা আমি আজ তোমার সঙ্গে থাকব। অনেক কথা বলব।

থাকার দরকার নেই স্ক্যান্ডাল রটবে।

আমি মোস্তফার কাছে একটা বড় সত্যি লুকিয়েছি, কিডনাপারের সঙ্গে আমার একটা যোগসাজশ ছিল।

আমি এক সপ্তাহ পর আবার আসি। এবার বাসে রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তায় নেমে বাকিটা রিকশায়।

দুপুরের খাবারটা সেরে আমি তার ময়লা এক চিলতে চকির ওপর শুয়ে পড়ি। শরীর সত্যিই খারাপ লাগছে। ব্লাড প্রেশার খুব ওঠানামা করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে জ্বরও এসে যায়।

এ অবস্থায় তুমি আমাকে বের করে দেবে? মানে আমাকে ঢাকা চলে যেতে হবে?

চলে গেলে ভালো না পারলে আর কি করা আমি বাইরে কোথায় থাকব।

আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জেগে দেখি মোস্তফা আমাকে খাওয়াবে বলেই দোকান থেকে এক কাপ দুধ চা নিয়ে এসেছে।

তুমি চা খাবে না?

নেশা আর বাড়াতে চাই না।

আমি শুয়েই চায়ে চুমুক দিই। জিজ্ঞেস করি তুমি বিয়ে করোনি কেন?

মোস্তফা প্রশ্নটাকে উড়িয়ে দেয় পৃথিবীতে কত মানুষই তো বিয়ে করে না, তাতে কী এসে যায়।

আকাশটা অন্ধকার হয়ে আসে। রাজেন্দ্রপুর আসার পথে মনে হয়নি সন্ধ্যায় ঝড়বৃষ্টি নামতে পারে। আমি কিন্তু ব্যাগে দুটো হালকা কাপড় নিয়ে এসেছি, অবচেতনে আমার হয়তো এখানে রাত কাটানোর বাসনাই ছিল।

বেশ বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বজ্রপাতের শব্দ হচ্ছে। আমার বোঝার বাকি নেই মোস্তফা আমার কল্পিত পুরুষদের মতো নয়, সে এগোবে না। আমিই তাকে বলি আমার হাত ধর আর একটু কাছে এসো আমার পাশে শোও।

মোস্তফা বিব্রত বোধ করে। কিন্তু আমিই তাকে আঁকড়ে ধরি। শোও, উঠবে না। কথা বলব তোমার সঙ্গে।

তুমি বিয়ে করোনি কেন?

মোস্তফা মুখ খোলে, বিয়ে করলেও বউ থাকত না।

কেন?

বিয়ে মানে শুধু কাগজে সই করা নয়, আরও কিছু কাজকর্ম আছে। আমার সেই ইচ্ছা থাকলেও সে সাধ্য ছিল না।

মানে তুমি বিয়ে করতে চেয়েছিলে?

সারা জীবন চেয়েছি এখনো চাই, কিন্তু সম্ভব নয়।

কেন?

তোমার ভেঙে যাওয়া সেই বিয়ের দিন আমাকে যে গুলি করেছিল ঠিক জায়গায় লাগতে পারেনি। গুলিটা লেগেছে আমার প্রাইভেট পার্টস-এ। একেবারে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে। তুমি বিয়ে করেছ, সন্তান জন্ম দিয়েছ। তুমি বুঝবে বিয়েতে এটারও একটা ভূমিকা রয়েছে।

আমি উঠে বসি। জিজ্ঞেস করি তুমি এ কী বলছ।

মোস্তফা বলল, এমন কিছু নয়। জীবন তো প্রায় শেষ হয়েই এসেছে। এখন থাকলেই কি না থাকলেই কি?

আমি হঠাৎ যেন কৈশোরের এক ঘোরের মধ্যে বলতে থাকি, কোথায়? আমাকে দেখতে দাও, আমি দেখি।

মোস্তফা বাধা দিতে চেষ্টা করে। আমি দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলি দেখবই। মোস্তফা বলে, না দেখাই ভালো, একবার দেখলে তুমি আর আসবে না, এটাই হবে আমার কাছে তোমার শেষ আসা।

আমি জোর করি। শায়িত মানুষটির লুঙ্গির গিঁট খুঁলে নামিয়ে আনি। মোস্তফা চোখ বন্ধ করে রাখে আর বাধা দেয়নি। তার প্রজনন কিংবা মূত্রপাতের অঙ্গটি নেই, ভেতর থেকে একটি কৃত্রিম নল, কেবল মূত্রপাতের জন্য খানিকটা বের করে রাখা হয়েছে। অন্ডকোষও নিশ্চয়ই ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এখন কৃত্রিম নলটির নিচে একটি উদ্ভট মন্ডের মতো কিছু লেগে আছে।

আমি কিছুক্ষণ ঠোঁট কামড়ে থেকে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকি। আর তাকে জড়িয়ে ধরে বলি, আমার জন্যই তোমার এ অবস্থা। তুমি বোকার মতো আমাকে রক্ষা করতে গিয়ে গুলি খেয়েছ। আমি তো তোমাকে আসতে বলিনি।

আমি অনেক বছর বিদেশে থেকে এসেছি, আমার বাঙালি নারীসুলভ জড়তা নেই। আমি বলে উঠি, মোস্তফা আমি তোমাকে বিয়ে করব।

এবার মোস্তফা উঠে বসে, লুঙ্গির গিঁট বাঁধে এবং বলে ঠিক আছে তুমি ঘুমাও আমি তোমার সঙ্গে এক ঘরে থাকলে কথা রটবে। আমি এতদিন যে জীবন যাপন করে এসেছি আমি সেটাই চাই। আমি বললাম অসম্ভব। আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরেই ঘুমাব। আমি আর একলা থাকতে চাই না।

সে রাতে আমি মোস্তফাকে বেরোতে দিইনি।

বারবার আমাকে বলেছে, তুমি পাগল হয়ে গেছে, তোমার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে খুকুমনি। এমন পুরুষ মানুষকে কেউ বিয়ে করে না।

কিন্তু আমি করব।

সে রাতে আমরা এক বিছানায় ঘুমাই।

আমার জেদেরও একটা নিজস্ব রূপ আছে। ভুল হোক তবুও আমি করে ছাড়ি। আমি এখন যে বয়সে আমার তো ভুল করারও তেমন সময় নেই।

মোস্তফা বলল, আমি কিন্তু রাজেন্দ্রপুর ছেড়ে অন্য কোথাও যাব না।

আমি বললাম, ঠিক আছে।

পরদিন মোস্তফাকে নিয়ে রাজেন্দ্রপুর কাজি অফিসে যাই। অবিবাহিত মোস্তফা নুরুল আনোয়ার বিধবা খুকুমনিকে দুই লক্ষ এক টাকা দেনমোহরের অর্ধেক উসলে ইসলামিক শরিয়ত অনুযায়ী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। আমাদের বিয়ের সাক্ষীরা সেধে এসে সই করেছেন, তারা আশপাশের দোকানের কর্মচারী। কাজি সাহেবের পিয়নকে টাকা দিই, মিষ্টি নিয়ে এসেছে আশপাশের লোকজনকেও খাইয়েছে।

সে রাতে ঝড় বৃষ্টি ছিল না, আকাশে কিছুক্ষণ চাঁদও ছিল। কাবিননামায় সই করার পর মোস্তফার জড়তা কিছুটা কেটে গেছে। মোস্তফা আমার স্বামী হয়ে উঠছে।

সে রাতে মোস্তফাই আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছে, আমার এখন ইচ্ছা করছে। আমার চোখ অশ্রু ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। আমি বলি আমার জন্যই তোমার এ অবস্থা হয়েছে।

না না তোমার জন্য নয়, যা হওয়ার সেটাই হয়েছে নতুবা বিয়াল্লিশ বছর পর তোমাকে কেমন করে পেতাম।

মোস্তফা আমার পোশাকের ওপরের অংশটা খুলে আমার চৌষট্টি বছর বয়সি একজোড়া স্তনের মাঝখানে তার মুখমণ্ডল সমাহিত করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, খুকুমনি আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসতাম।

আরো পড়তে পারেন

মহামায়া (পর্ব-২)

পড়ুন—  মহামায়া (পর্ব-১) ৩. কাঁচা রাস্তায় উঠতে উঠতে কাপড় ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে। পায়ের সাথে কাপড় জড়িয়ে যাচ্ছে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। সবার আগে মনিশঙ্কর হাঁটছে। তার হাতে মাথায় খাবারের টিন। একটা কাপড়ের ট্রাঙ্ক। সকলের হাতেই কাপড়ের পুটুলি। এতটুকু আসতেই হাপিয়ে উঠেছে। আরো অনেকটা দূর যেতে হবে হেঁটে। তারপর নৌকায় সীমানার কাছাকাছি কোনো একটা জায়গায়।….

মহামায়া (পর্ব-১)

১. সূর্য উঠতে এখনো অনেকটা দেরি। আকাশে কোনো তারা নেই। পুরোটা আকাশ মেঘে ঢাকা। রাতের অন্ধকারটা আজকে আরও বেশি চোখে লাগছে। বাতাস হচ্ছে। মাঝে মাঝে মেঘের আলোতে দেবীপুর গ্রামটা দেখা যাচ্ছে। মুহুর্তের জন্য অন্ধকার সরে আলোয় ভেসে যাচ্ছে। রাধাশঙ্করের ভিটাবাড়ি, ধান ক্ষেত, বাঁশঝাড় হাইস্কুল আলোয় ভেসে যাচ্ছে মুহূর্তের জন্য। মহামায়া আর মনিশঙ্করের ঘরে হারিকেন জ্বলছে।….

স্বর্ণবোয়াল

মোবারক তার কন্যার পাতে তরকারি তুলে দেয় আর বলে, আইজ কয় পদের মাছ খাইতেছ সেইটা খাবা আর বলবা মা! দেখি তুমি কেমুন মাছ চিনো! ময়না তার গোলগাল তামাটে মুখে একটা মধুর হাসি ফুটিয়ে উল্লসিত হয়ে ওঠে এই প্রতিযোগিতায় নামার জন্য। যদিও পুরষ্কার ফুরষ্কারের কোন তোয়াক্কা নাই। খাবার সময় বাপবেটির এইসব ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ খেলা আজকাল নিয়মিত কারবার।….

error: Content is protected !!