Author Picture

ভাষা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা

মুহাম্মদ আশরাফুল করিম

আগের পর্বে পড়ুন— চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল)

ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে দুই হাজার মাইল দূরত্বের দুটি অঞ্চল নিয়ে জন্ম হয় একটি উদ্ভট রাষ্ট্র পাকিস্তান। যদিও বাঙালিরা বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ অবসানের আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাঙালির স্বাধিকারের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক চক্র বাঙালিদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের মানসে উপনিবেশসুলভ আচরণ শুরু করে। এই উপনিবেশিক নিপিড়নের বিরুদ্ধে সার্থক প্রতিবাদ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন।

আধুনিক বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো কোনো দেশের ভূখণ্ড দখল না করেও সুকৌশলে সে দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়েছে। উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ প্রসারের এই আধুনিক কৌশল ‘নয়া সাম্রাজ্যবাদ’ বা ‘নয়া উপনিবেশবাদ’ নামে পরিচিত। ‘বাংলা’ পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হলেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকশ্রণির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ স্থাপনে সচেষ্ট হয়। সেই বিবেচনাতেও বাঙালিদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের আচরণ অভ্যন্তরীণ সাম্রাজ্যবাদেরই প্রকাশ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ঘটনা প্রবাহ ও ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের বাইরে যে তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বটি রয়েছে তা হলো সাম্প্রদায়িকবোধকে জোড় করে জাতীয়তায় রূপান্তরের চেষ্টা। ‘পাকিস্তান জাতীয়তাবাদ’ ছিল একটি কৃত্রিম ধারণা। যার আড়ালে লুকিয়ে ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের আধিপত্যবাদী অভিলাস। পাকিস্তান সৃষ্টিতে ইসলামী চেতনার কথা বলা হয়েছে এবং এই ফিকিরকে আশ্রয় করে ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’-এর ধূয়া তুলে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। ভারত একক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলে এখানকার মুসলমানরা সংখ্যালঘু হবে এই আশঙ্কায় জিন্নাহ পাকিস্তান দাবীতে অটল থাকেন। অথচ তার স্বপ্নের পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও তাতে জায়গা হয়নি সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে থাকা এক কোটি মুসলমানের, যারা কার্যত অরক্ষিত থাকেন। তাদের সুরক্ষার জন্য বাংলার মতো মধ্যবর্তী কোন প্রদেশের দাবী তোতিনি তোলেননি? অপরদিকে বাংলার শতকরা ৪৬ জন অমুসলিম হলেও ’৪৭ সালের ভারত বিভাগে তাদের বিষয়টি কোনরূপ বিবেচনায় আনা হয়নি। এ থেকেই বুঝা যায় পাকিস্তান আন্দোলন ছিল মূলত ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে ক্ষমতার চর্চা। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক চক্রের সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনায় রাষ্ট্র ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে প্রবেশ করিয়ে জনগণের মুক্তির সংগ্রামকে বাধাগ্রস্থ করতে সচেষ্ট হয়।

ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন

বাংলা ও উর্দুকে ঘিরে বাঙালি মুসলমানের ভাষা সমস্যার বিষয়টি একটু ভিন্নভাবে হলেও দীর্ঘ দিন ধরেই বিতর্কিত বিষয় হিসেবে উপস্থিত। বাংলা-উর্দু-আরবি-ফারসি এই চতুর্ধারা বিতর্কের মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলমানের আত্ম অন্বেষণের পালা শুরু। কার্যত দেশ বিভাগ আমাদের মাঝে কয়েকটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে- ‘জাতি’ হিসেবে আমরা কী- মুসলমান না বাঙালি? এবং আমরা বাঙালি না বাংলাদেশী? অর্থাৎ চেতনাগতভাবে বাঙালি জাতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, ভৌগোলিক সীমারেখাতেও বাঙালি জাতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এমনটি অন্য কোন ‘জাতি’র ক্ষেত্রে ঘটেছে কিনা তা গবেষণার বিষয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর জিন্নাহ তথা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের মাঝে মুসলিম জাতীয়তাবাদের আবরণে ভাষা-সংস্কৃতি-অর্থনৈতিক বিষয়াবলীর মাধ্যমে জাতিগত উগ্রতা উসকে দেয়ার প্রয়াস পায়। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহর ঘোষণা- “উর্দু এবং কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা” এর প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই আগ্রাসী নীতির অবসম্ভাবি পরিণতির চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে বাঙালি জাতীয়তাবাদে। যা পশ্চিমপাকিস্তানিদের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম রাজনৈতিক অভিঘাত। তারা ধর্মের আবরণ দিয়ে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেয়ার মাধ্যমে একটি উগ্র জাতীয়তাবাদ সৃষ্টির প্রয়াশ চালায়। গণ আন্দোলনের একটি সংকীর্ণ দিক হলো এই আন্দোলনের উপজাত হিসেবে উগ্র জাতীয়তাবদের উন্মেষ ঘটার সম্ভাবনা থাকে। আর উগ্র জাতীয়তাবাদ সাম্রাজ্যবাদের সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পাকিস্তান আন্দোলন সে দোষে দুষ্ট হলেও ভাষা আন্দোলনে সেই লক্ষণ ছিলোনা। বাঙালির এই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং একই সাথে পাকিস্তানের অন্যান্য প্রাদেশিক ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা। জাতীয়তাবাদ একটি অনুভূতি যার পেছনে দুটি প্রপঞ্চ ক্রিয়াশীল। একটি আত্মপরিচয়ের, অপরটি সমষ্টিগত ঐক্যের। বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটিকে উগ্র বা আক্রমণাত্মক জাতীয়তাবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না, বরং এর উন্মেষ ও বিকাশ আক্রান্তের অনুভূতি থেকে। এই আক্রান্তের অনুভব বাঙালির জাতীয় চেতনাকে করেছে দৃঢ় ও সংগঠিত।

বাঙালি দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট কৃত্রিম রাষ্ট্র পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের ভাষা নিয়ে অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধেও তাই রুখে দাঁড়িয়েছে। এই রুখে দাঁড়ানোর মূল প্রেরণা হয়েছে বাঙালির চিরায়ত মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস

বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের প্রধান প্রতিবন্ধকতা ছিল শ্রেণি বৈষম্য। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকচক্রের  বাঙালিদের ওপর উর্দু চাপিয়ে দেয়ার পেছনে অনেকগুলো কারণের একটি প্রচ্ছন্ন কারণ ছিল, বাংলায় শ্রেণি বৈষম্য সৃষ্টিকরা। ঔপনিবেশিক ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক ভারতবর্ষে যে মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের উদ্ভব হয়েছিল তারা জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তানের নীতিনির্ধারণী নিয়ামকে পরিণত হোন। ইরানি ইসপাহানি, দাদাভাই ও করিমভাইরা, আদমজী ও শলেজীরা অবাঙালি গজনবী ও খাজাদের সাথে ঐক্য করে বাংলাকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করার জন্য রাজনীতিকে কুক্ষিগত করতে সচেষ্ট হয়। তবে হিন্দু ও মুসলমান উভয় মুৎসুদ্দিরা সাম্প্রদায়িক  চেতনায় আচ্ছন্ন ছিল। তাদের সাথে যোগ দেয় পশ্চিম পাকিস্তানের আমলারা। পাকিস্তানের যে কয়টি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা  পূর্ব-পাকিস্তানকে একটি উপনিবেশে পরিণত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আমলাতন্ত্র। পাকিস্তান রাষ্ট্রটির জন্মলগ্ন থেকেই উপনিবেশবাদের হাতিয়ার ব্রিটিশ ও ভারতীয় বংশোদ্ভুত এবং তাদের অনুগত এই সকল সামরিক-বেসামরিক আমলা, নব্যপুঁজিবাদী এলিট শ্রেণি, ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তাদের অভিন্ন স্বার্থে একীভূত হোন। তাদের সামরিক স্বেচ্ছাচার ও জাতীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাতি সত্ত্বের অস্তিত্ব রক্ষায় বাঙালির জাতীয়তাবাদ শাণিত হয়ে উঠে।

বাঙালি দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট কৃত্রিম রাষ্ট্র পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের ভাষা নিয়ে অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধেও তাই রুখে দাঁড়িয়েছে। এই রুখে দাঁড়ানোর মূল প্রেরণা হয়েছে বাঙালির চিরায়ত মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস। সেই ইতিহাসে দেখা যায়, এসব আন্দোলন-সংগ্রামের অভিঘাতেই ইংরেজরা যেমন ভারতবর্ষ ছাড়তে বাধ্য হয়, পশ্চিম পাকিস্তানি উপনিবেশিক শক্তির দমন উপেক্ষা করে ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে, যা জন্ম দেয় জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের। তাই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিভিন্ন যুগে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক লড়াইয়ের বাঙালি জাতীয়তাবাদ যে সংগঠিত রূপলাভ করে তারই একটি প্রতিবাদি প্রকাশ।

আরো পড়তে পারেন

একাত্তরের গণহত্যা প্রতিহত করা কি সম্ভব ছিল?

২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানি নরঘাতকেরা যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই এক রাতেই শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় তিন হাজার। এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা একতরফাভাবে….

চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল)

আগের পর্বে পড়ুন— বায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ একুশের আবেগ সংহত থাকে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেও। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান এক বিবৃতিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। আওয়ামি লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম কমিটির সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র….

বায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ

আগের পর্বে পড়ুন— বায়ান্নর প্রস্তুতি পর্ব (১৯৪৯-১৯৫১) পাকিস্তান উন্মেষ ধারা থেকে ধূমায়িত ক্ষোভ প্রকাশে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সর্বব্যাপী রূপ পরিগ্রহ করে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তানের রাজনৈতিক আবর্তন ও ঘটনাচক্রে খাজা নাজিমউদ্দীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ২৪ থেকে ২৬ জানুয়ারি পূর্ব বাঙলা মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্য ২৫ জানুয়ারি তিনি সস্ত্রীক ঢাকায় আগমন করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী….

error: Content is protected !!