Author Picture

ভাষা আন্দোলনের পর্যায় বিশ্লেষণ

মুহাম্মদ আশরাফুল করিম

আগের পর্বে পড়ুন— ভাষা আন্দোলন ও আত্মপরিচয়ের রাজনীতি

ভাষা আন্দোলনের ঘটনা প্রবাহ আলোচনায় একটি প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান আবশ্যক। কখন থেকে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি উত্থাপিত হয় বা এ সংক্রান্ত চিন্তার উন্মেষ ঘটে। সাংগঠনিকভাবে এ আন্দোলন শুরু হয় ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সাথে সাথেই। তবে এর মনস্তাত্ত্বিক পর্যায়টি গড়ে ওঠে অনেক পূর্বে। বাঙালির ভাষা অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম দীর্ঘদিনের। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঠিকতা নিরুপণে এই আন্দোলনকে আমরা পাঁচটি পর্যায়ে আলোচনা করতে পারি। ক. মনস্তাত্ত্বিকপর্ব খ. সূচনা ও বিকাশপর্ব (১৯৪৭-১৯৪৮ সাল) গ. বাবায়ান্নর প্রস্তুতিপর্ব (১৯৪৯-১৯৫১ সাল) ঘ. বাবায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ ঙ.  চূড়ান্তপর্যায় : ১৯৫২ থেকে ১৯৫৬ সাল।

মনস্তাত্ত্বিক পর্ব

বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন একটি অনন্য ঐতিহাসিক ঘটনা। যার স্বরূপ বিশ্লেষণে এর মানস গঠনের ধারা সম্পর্কে ধারণা প্রয়োজন। বাঙালির মানস গঠনে বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাব থাকলেও সুফিবাদ ও বৈষ্ণববাদের মতো লৌকিক ধর্মের প্রভাব বাঙালিকে করেছে মানবতাবাদী ও সংশ্লেষণাত্মক। যা পরবর্তীকালে অসাম্প্রদায়িক মানস সংগঠনে ভূমিকা রাখে। বাঙালির মনস্তত্ত্বে একাধারে লালন করে তার নৃতাত্ত্বিক জাতিসত্ত্বার পরিচয় এবং ধর্মীয় আবেগ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের রূপ-প্রকৃতি নিয়ে মতভেদ ও দ্বন্দ্ব বিভিন্ন যুগে বর্তমান ছিল এবং এর প্রকাশ ঘটেছে সরব অথবা নীরব সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। আর্য শাসনামলে এই অঞ্চলের রাজভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যম ছিল বৈদিকভাষা। বৌদ্ধ শাসনামলে তথা পাল যুগে রাজভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যম ছিল পালি। যদিও এই কালপর্বে বাংলা ভাষা ও লিপির উন্মেষ ঘটে। ব্রাহ্মণ্য যুগ তথা সেন আমলেও সংস্কৃত ছিল রাজভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যম। সুলতানি ও মোঘল আমলে বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করা হলেও ফারসি ছিল রাজভাষা। বাংলা এই যুগেও অবহেলিত। তবে বাঙালি কবিদের রচনায় বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা দেখা যায়। ইংরেজ শাসনামলে ইংরেজি ছিল রাজভাষা এবং শিক্ষার মাধ্যম। প্রকৃতপক্ষে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস হাজার বছরের হওয়া সত্ত্বেও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পূর্বে বাংলা কখনই রাজভাষার মর্যাদা লাভ করেনি।

১৮৩৭ সালের ২১ নভেম্বর জারিকৃত প্রেসিডেন্ট অব দ্য কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া XXIX.1837 AD পরিপত্রে ফারসিকে আদালতের ভাষা থেকে বাদ দিয়ে স্থানীয় ভাষা ব্যবহারের কথা বলা হয়। এরই পরিণতিতে উত্তর ভারতে ফারসির বদলে ফারসি হরফে লিখিত উর্দু, একই সাথে প্রথমবারের মতো আদালতের ভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশ শতকের প্রারম্ভে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ধারায় বাংলা ভাষার প্রতি বাঙালি মুসলমানের গভীর মমত্ববোধ গড়ে উঠলেও বাংলা বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা কিনা? এমন একটি অদ্ভুত প্রশ্নের অবতারণা করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯০৩ সালে সৈয়দ এমদাদ আলী (১৮৭৫-১৯৫৬) সম্পাদিত ‘নবনূর’ পত্রিকার একটি নিবন্ধে বলা হয়, ‘বঙ্গভাষা ব্যতীত বঙ্গীয় মুসলমানের মাতৃভাষা আর কি হইতে পারে? যাঁহারা জোর করিয়া উর্দ্দুকে বঙ্গীয় মুসলমানের মাতৃভাষার আসন প্রদান করিতে চান, তাঁহারা কেবল অসাধ্য সাধনের জন্য প্রয়াস করেন মাত্র।’ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষিতে বাংলায় সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ বিস্তার লাভ করে। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় গড়ে ওঠা স্বদেশী আন্দোলনের প্রভাবে দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত সাহিত্যকর্ম বাংলা ভাষার সাথে বাঙালির শেকড়ের বন্ধন দৃঢ় করেছে। এই কালপর্বে বঙ্গবাসী ও হিতবাদী প্রভৃতি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাসমূহের প্রভাব, বিশেষ করে যুগান্তর পত্রিকা ও তার লেখকবৃন্দ জাতীয়তাবাদ ধারণায় হিন্দুত্ববাদের আবেশ সৃষ্টি করেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দ মঠ উপন্যাসে ব্যবহৃত স্লোগান ‘বন্দে মাতারম’ জাতীয়তাবাদ আন্দোলন সংগঠনে ভূমিকা পালন করলেও বাঙালি মুসলমানদের মনে তা অস্বস্তি সৃষ্টি করে। একই সাথে বাঙালি মুসলমানদের ইসলামি জাগরণকামী মনোভাবের প্রেক্ষিতে মুসলমানদের সম্পাদিত সংবাদ-সাময়িকপত্রে বাংলাকে হিন্দুদের সাহিত্য চর্চার ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করে উর্দুর প্রতি পক্ষপাতমূলক লেখার সংখ্যাধিক্য দেখা যায়। তবে এই বিতর্কে প্রগতিশীল মুসলমান চিন্তাবিদগণ সঙ্গত কারণেই বাংলার পক্ষে অবস্থান নেন। ১৯১১ সালে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী রংপুর প্রাদেশিক শিক্ষা সম্মেলনে বাংলা ভাষাকে জাতীয় ভাষার মর্যাদা দেয়ার কথা বলেন। একই বছর এপ্রিল মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা সাহিত্য পরিষৎ।

সুলতানি ও মোঘল আমলে বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করা হলেও ফারসি ছিল রাজভাষা। বাংলা এই যুগেও অবহেলিত। তবে বাঙালি কবিদের রচনায় বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা দেখা যায়। ইংরেজ শাসনামলে ইংরেজি ছিল রাজভাষা এবং শিক্ষার মাধ্যম। প্রকৃতপক্ষে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস হাজার বছরের হওয়া সত্ত্বেও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পূর্বে বাংলা কখনই রাজভাষার মর্যাদা লাভ করেনি

১৯১৫ সালে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত ‘আল-এসলাম’ পত্রিকার একটি নিবন্ধে উর্দু প্রীতির বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করা হয়। মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী ‘কোহিনূর’ পত্রিকায় একটি নিবন্ধে বলেন, ‘বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা বাঙ্গালা’। ১৯১৬ সালে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘বাঙলা উর্দ্দুর চাদর গা ঝাড়া দিয়া যখন উঠিবে, তখন তাহাকে চাপিয়া রাখা যাইবেনা। ’আল এসলাম পত্রিকায় ১৯১৭ সালে মুজফ্ফর আহমদ, ১৯১৮ সালে আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, ১৯১৯ সালে শেখ আবদুল গফুর জালালী প্রমূখ বাংলাকে অবজ্ঞা করে উর্দুর প্রতি এক শ্রেণির বাঙালি মুসলমানের প্রীতির বিরোধিতা করেন। ১৯২০ সালে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা ভাষা ব্যবহারের দাবি জানান। ১৯২১ সালে খেলাফত আন্দোলনের উপজাত হিসেবে মুসলমান নেতৃবৃন্দ উর্দুকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের নিকট আবেদন করেন। এই পরিস্থিতিতে পূর্ববঙ্গ ও আসাম ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ব্রিটিশ সরকারের নিকট লিখিত প্রস্তাব করেন— ভারতের রাষ্ট্রভাষা যাই হোক, বাংলা ভাষাকে বাংলার রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। একই বছরে বঙ্গীয় সাহিত্য পত্রিকায় লুৎফর রহমানও উর্দুকে প্রত্যাখ্যান করে নিবন্ধ প্রকাশ করেন। বাঙালি ছাত্রদের উর্দুর মাধ্যমে মাদ্রাসা শিক্ষাদানের প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে সওগাত পত্রিকা ১৯২৬ সালে প্রতিবাদ করে। এই সময় মাতৃভাষাকে সকল স্তরে শিক্ষার মাধ্যমে পরিণত করার জন্য শিখা গোষ্ঠী সংগঠিত আন্দোলন পরিচালনা করে। ১৯২৭ সালে তৎকালীন আসাম ব্যবস্থাপনা পরিষদে শ্রীহট্ট সদর মহকুমা-সদর দক্ষিণ হতে নির্বাচিত সদস্য আব্দুল হামিদ চৌধুরী মাইজভাগের ছিন্ন কোরআন ঘটনার নায়ক দারোগা বরখাস্তের একটি প্রস্তাব বাংলায় উপস্থাপন করলে তা বিধি সম্মত নয় বলে নাকচ করা হয়। গোপেন্দ্র লাল রায়, রাজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী প্রমুখ এমএলএ-এর দৃঢ় প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে স্পিকার বাংলায় প্রস্তাব উপস্থাপনের অনুমতি দেন। বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে সরকারি কোনো ফোরামে এটিই প্রথম প্রতিবাদ।

প্রতিটি আন্দোলনের যেমন একটি ভিত্তিভূমি থাকে ১৯৪৭ পূর্ববর্তী লেখক-বুদ্ধিজীবিদের তৎপরতায় ভাষা আন্দোলনের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিটি এভাবেই ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে থাকে। ভাষার প্রশ্নটি বাঙালির অস্তিত্বের সাথে একাকার হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি বাস্তবতার মুখোমুখি দাড়ায়। এরই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর রাষ্ট্রভাষা কেন্দ্রিক অপরাপর বৈষম্যমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বাঙালির সার্থক প্রতিবাদ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন।

 

পরের পর্বে পড়ুন— সূচনা ও বিকাশ পর্ব (১৯৪৭-১৯৪৮)

আরো পড়তে পারেন

একাত্তরের গণহত্যা প্রতিহত করা কি সম্ভব ছিল?

২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানি নরঘাতকেরা যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই এক রাতেই শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় তিন হাজার। এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা একতরফাভাবে….

ভাষা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা

আগের পর্বে পড়ুন— চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল) ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে দুই হাজার মাইল দূরত্বের….

চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল)

আগের পর্বে পড়ুন— বায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ একুশের আবেগ সংহত থাকে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেও। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান এক বিবৃতিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। আওয়ামি লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম কমিটির সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র….

error: Content is protected !!