Author Picture

ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার: জার্মান ‘ফুটবলার অব দ্যা সেঞ্চুরি’

মেজবাহ উদদীন

‘আই উইল টেল ইউ আ সিক্রেট। ওল্ড স্টোরিটেলারস নেভার ডাই। দে ডিসঅ্যাপিয়ার ইনটু দেয়ার ওউন স্টোরি।’ লেখকদের নিয়ে বলা ভেরা নাজারিয়ানের এই কথাটি যেকোনো কির্তীমানের বেলায়ই প্রযোজ্য। তেমনই এক কির্তীমান ফুটবলার ছিলেন ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। সর্বকালের সেরা ফুটবলারের সংক্ষিপ্ত তালিকা তাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। যে তিনজন ফুটবলার খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন, তিনি তাঁদের একজন। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার সম্প্রতি ৭৮ বছর বয়সে পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তলোকে।

বেকেনবাওয়ার শুধু জার্মানীর ফুটবলকেই পরিবর্তন করেননি, সাথে সাথে ফুটবল নিয়ে জার্মানদের দৃষ্টিভঙ্গীও পরিবর্তন করে দিয়েছেন। ভক্তদের কাছে তিনি ‘কাইজার’ বা ‘সম্রাট’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ সালে মিউনিখের গিসলিংয়ে জন্ম গ্রহণ করেন বেকেনবাওয়ার। তার বাবা বেকেনবাওয়ার সিনিয়র ছিলেন একজন পোষ্টম্যান। ১৯৫৪ বিশ্বকাপজয়ী ফ্রিৎজ ওয়াল্টারকে আইডল ভেবে শুরু করলেন ফুটবলে পথচলা, ভর্তি হলেন “স্পোর্টস ক্লাব ১৯০৬ ম্যুনশেন”-এ। তবে প্রথমেই বাধা পেলেন পরিবার থেকে। সকল বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে ফুটবলেই মনোযোগ দিল সে। অর্ধাহারে-অনাহারে কাটিয়েও ফুটবলের প্রতি সামান্যতম শিথিলতা দেখাল না সে। তার ভাষায় ‘ আমার পুরো জীবনকে ফুটবল দিয়েই সংজ্ঞায়িত করা যায়। যখন থেকে আমি হাটতে শিখেছি তখন থেকেই ফুটবলে লাথি মারছি।’ তার যদি খারাপ কিছু থেকে থাকে সেটা সংগীতের গলা।

তিনি যেখানে গিয়েছেন, সফলতা তাকেই অনুশরণ করেছে। ক্যারিয়ারজুড়ে সাফল্যের মুকুটে দুর্দান্ত সব পালক যোগ করার পথে তিনি সর্বকালের সেরা ডিফেন্ডারদের একজন হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছেন। শৈশবে ‘১৮৬০ মিউনিখের’ ভক্ত ছিলেন এই জার্মান। কিন্তু বয়সভিত্তিক ফুটবলের জন্য তিনি বেছে নেন মিউনিখের আরেক ক্লাব বায়ার্নকেই। ৬ জুন, ১৯৬৪; ১৯ বছর বয়সে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে প্রথমবার মাঠে নামেন কাইজার। সে সময় ক্লাবটি খেলত জার্মানির দ্বিতীয় সারির লীগে। শুরুতে তিনি ছিলেন একজন সেন্টার ফরোয়ার্ড। বায়ার্নে খেলার সময়েই একপর্যায়ে তিনি মাঝমাঠ এবং পরবর্তী সময়ে ডিফেন্ডার হিসেবে খেলতে শুরু করেন। বায়ার্নকে বুন্দেসলিগায় উঠে আসতে দারুণভাবে সহায়তাও করেন বেকেনবাওয়ার।

‘সে আমাদের জাতিয় হিরো। এটা এমনিতেই হয়ে যায়নি, এটা সে পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জন করেছে’— বেকেনবাওয়ারকে নিয়ে বিখ্যাত ফুটবলার গুন্টার নেটজারের মন্তব্য এমনই। খেলায় তার দখলের কারনে লোকেরা তাকে কাইজার বা সম্রাট নামে ডাকতে ভালোবাসে। ১৯৬৯ সালে সালকের সাথে বায়ার্নের মধ্যেকার একটি ম্যাচে রিনহার্ড লুবিডা নামে সালকের একজন বড়মাপের স্টাইকার ছিল। যাকে সেসময় সালকের কিং বলা হতো। সেই ম্যাচে বেকেনবাওয়ার লুবিডাকে একেবারে ব্লক করে রেখেছিলেন, এবং বায়ার্ন সেই ম্যাচটা ২-১ ব্যবধানে জিতে নেয়। তার পর থেকেই তার ডাক নাম হয়ে ওঠে কাইজার বা সম্রাট।

সর্বকালের সেরা ফুটবলারের সংক্ষিপ্ত তালিকা তাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। যে তিনজন ফুটবলার খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন, তিনি তাঁদের একজন। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার সম্প্রতি ৭৮ বছর বয়সে পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তলোকে।

গোলের খেলা ফুটবলে সব আলো থাকে স্টাইকারদের ওপরে। ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হয়ে যায় ব্যালন ডি’ওর পুরষ্কারের তালিকার দিকে তাকেলে। এখন পর্যন্ত দেওয়া ৬৮ বারের মধ্যে শুধু তিনজন ডিফেন্ডার এই পুরষ্কার পেয়েছেন— ফাবিও কানাভারো, ম‌্যাথায়াস স্যামুয়েল এবং বেকেনবাওয়ার। ফুটবল ইতিহাসের সেরা সেন্টারব্যাক তিনি। বলের দখল রাখা থেকে শুরু করে আধুনিক সুইপার বা লিবেরোর ভূমিকায়ও বেকেনবাওয়ার ছিলেন অনন্য। ২০ বছর বয়সে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে পশ্চিম জার্মানির হয়ে অভিষেক হয় তাঁর। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের কাছে হেরে রানার্সআপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় পশ্চিম জার্মানিকে। ১৯৭২ সালে পশ্চিম জার্মানি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নেয়। আর দুই বছর পর আসে বহুল কাঙ্ক্ষিত ফুটবল বিশ্বকাপটিও।

জার্মানদের বিশ্বকাপ আপন করে নেওয়া শিখিয়েছিলেন কাইজার। ছিলেন ডিফেন্ডার, কিন্তু সেখান থেকেই আক্রমনের এক অদ্ভুত কৌশল তিনি আয়ত্ত করেছিলেন। দূর থেকে গোলমুখে শট নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার। ফুটবলে যা যা জেতা সম্ভব, তার সবই জিতেছেন তিনি। ডিফেন্ডার হয়েও ১৯৭২ ও ১৯৭৬ সালে ব্যালন ডি’অর জিতে নেন এই ডিফেন্ডার (আর কারও নেই এই কীর্তি)। ১৯৭৬ সালে পশ্চিম জার্মানির সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘ক্রস অব দ্য অর্ডার অফ মেরিট অব ফেডারেল রিপাবলিক অফ জার্মানি’ পান তিনি।

খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে মোট পাঁচটি বিশ্বকাপ। যে একবারই শুধু ফাইনাল খেলা হয়নি, সেই ১৯৭০ বিশ্বকাপ আবার স্মরণীয় হয়ে আছে বেকেনবাওয়ারের বীরত্বগাথায়। ইতালির বিপক্ষে সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারের ট্যাকলে বেকেনবাওয়ারের ডান হাত কাঁধ থেকে স্থানচ্যুত হয়ে যায়। তখন মাত্র দুজন খেলোয়াড়ই বদল করা যেত, জার্মানির তা করা হয়ে গেছে। টেপ দিয়ে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া আহত সেই হাত নিয়েই তাই বাকি সময়টা খেলে যান বেকেনবাওয়ার। ‘শতাব্দীর সেরা ম্যাচ’ নামে পরিচিতি পাওয়া সেই ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে, যেখানে ৪-৩ গোলে ইতালির হেরে যায় জার্মানি।

২০১৩ সালে ওয়ার্ল্ড সকার নির্বাচিত সর্বকালের সেরা একাদশে পেলে-ম্যারাডোনার চেয়েও বেশি ভোট পেয়েছিলেন তিনি। তাকে বিভিন্ন বিশ্বকাপে দেখা গেছে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায়। ১৯৬৪ সালের প্রথম বিশ্বকাপে খেলেছিলেন মিডফিল্ডার হিসেবে। ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে খেলেন ডিফেন্ডার হিসেবে। তবে দুই বিশ্বকাপেই জার্মানীর সাথে সাথে হতাস হতে হয় বেকেনবাওয়কেও। কিন্তু দমে না গিয়ে পরেরবার আবার মাঠে নামেন কাইজার এবং ১৯৭৪’র বিশ্বকাপ উচিয়ে ধরেন।

ফুটবলের প্রায় সবকিছুই অর্জন করে ফেলেছেন তিনি, সাথে জয় করেছেন ফুটবলপ্রেমীদের মন। কোচ, প্রশাসক, সংগঠক, প্রভাবক—সব মিলিয়ে ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার সম্ভবত ফুটবল ইতিহাসেরই সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। জার্মানির আইকনিক এই ফুটবলার জার্মানির হয়ে সব মিলিয়ে খেলেছেন ১০৩ ম্যাচ।

বেকেনবাওয়ার ১৯৮৩ সালে ৩৮ বছর বয়সে ফুটবলকে বিদায় জানান। এর আগে তর্কযোগ্যভাবে সর্বকালের সেরা ফুটবলার পেলের সঙ্গে নিউইয়র্ক কসমসে খেলেছেন বেকেনবাওয়ার। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করে সেই একই বছর তাৎক্ষণিকভাবে পশ্চিম জার্মানির কোচের দায়িত্ব গ্রহণ করেন বেকেনবাওয়ার। প্রথমবারেই দলকে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে যান বেকেনবাওয়ার। তবে আরেক মহাতারকা ডিয়েগো ম্যারাডোনার অতিমানবীয় ফুটবলের সঙ্গে সেবার পেরে ওঠেনি পশ্চিম জার্মানি। রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। কিন্তু চার বছর পর সেই আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জেতেন বেকেনবাওয়ার। খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের এই অভিজ্ঞতা তখন ছিল কেবল ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি মারিও জাগালোর। আর পরে সেটি করে দেখালেন ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশম।

কোচ হিসেবে বেকেনবাওয়ারের কীর্তি অবশ্য সেখানেই থামেনি। এরপর ফরাসি ক্লাব মার্শেইকে ১৯৯০-৯১ লিগ আঁর শিরোপা জেতান বেকেনবাওয়ার। আর ১৯৯৩-৯৪ মৌসুমে কোচ হিসেবে বুন্দেসলিগার শিরোপা এনে দেন বায়ার্নকেও। পরবর্তী সময়ে একই ক্লাবকে ১৯৯৫-৯৬ মৌসুমে উয়েফা কাপের শিরোপাও এনে দেন বেকেনবাওয়ার। কোচিং ক্যারিয়ারের ইতি টেনে বায়ার্নের সভাপতি এবং জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেন বেকেনবাওয়ার।

খেলা ছাড়ার পর প্রথমে কোচিং ও পরে সংগঠক হিসেবে কাজ করা বেকেনবাওয়ারকে অবশ্য দুর্নীতির অভিযোগেও অভিযুক্ত হতে হয়েছিল। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে দুর্নীতি করার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগটি ছিল ২০০৬ বিশ্বকাপের আয়োজক হতে আয়োজক নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত ফিফা সদস্যদের ভোট কিনতে তহবিল গঠন করেছিল জার্মান বিডিং কমিটি। আর এই বিডিং কমিটির প্রধান ছিলেন বেকেনবাওয়ার। ২০১৭ সালের মার্চে এই অভিযোগের জন্য সুইস প্রসিকিউটররা তাঁকে জেরাও করেন। জীবনের এই নেতিবাচক অধ্যায়টুকু বাদ দিলে বেকেনবাওয়ারের বাকি জীবন ছিল অর্জন ও প্রাপ্তির।

ফুটবলের প্রায় সবকিছুই অর্জন করে ফেলেছেন তিনি, সাথে জয় করেছেন ফুটবলপ্রেমীদের মন। কোচ, প্রশাসক, সংগঠক, প্রভাবক—সব মিলিয়ে ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার সম্ভবত ফুটবল ইতিহাসেরই সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। জার্মানির আইকনিক এই ফুটবলার জার্মানির হয়ে সব মিলিয়ে খেলেছেন ১০৩ ম্যাচ। এ ছাড়া বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ১৯৭০–এর দশকে হ্যাটট্রিক ইউরোপিয়ান কাপও জিতেছেন বেকেনবাওয়ার। দ্বীধাহীনভাবে সে-ই ছিল জার্মানীর ‘ফুটবলার অব দ্যা সেঞ্চুরি’। মানুষের ভালোবাসা নির্মাণসাপেক্ষ। তার বিশ্বাসে হাজার রঙের পরত। বৈধ তার ভালোবেসে কষ্ট না পাওয়ার আদিম আকাঙ্ক্ষাটুকু। তবুও কাইজারের বিদায়ে জার্মানদের হৃদয়ে চলছে শুধুই হাহাকার।

আরো পড়তে পারেন

বাংলাদেশে আবারো শুরু হচ্ছে বার্সা একাডেমির ট্রেনিং ক্যাম্প

বাঙালির স্বপ্নিল বাসনা আর স্বপ্নের সীমাবদ্ধতা যেখানে ধাক্কা খায়, যে-দারিদ্র্য নায়কনির্ভর চিত্রনাট্য, স্পেক্টাকলের বিনোদন বহু কষ্টে পাঁজরে গোপন করে রাখে। ফুটবল সেখানে যেনো এক মুক্ত বাতাস হয়ে জড়িয়ে থাকে পুরোটা পথ। তবু বাঙালির ফুটবলার হওয়ার রাস্তায় জেগে থাকে অগণিত লাল বাতি। এবার ফুটবলার হওয়ার সেই বাধা দূর করতে ঢাকায় আয়োজিত হতে যাচ্ছে বার্সা একাডেমির নির্ধারিত….

বিশ্বকাপের পনেরো

‘দ্য আম্পায়ার…ইজ লাইক দ্য গিজার ইন দ্য বাথরুম; উই ক্যাননট ডু উইদাউট ইট, ইয়েট উই নোটিস ইট ওনলি হোয়েন ইট ইজ আউট অফ অর্ডার।’ ক্রিকেট-সাহিত্যিক স্যার নেভিল কার্ডাসের এ পঙক্তির বাংলা তরজমা করলে দাড়ায়—  আম্পায়ার সেই নিঃস্ব প্রজাতি, ক্রিকেটারের দৈনন্দিন জীবনে যা একান্ত কাম্য। প্রয়োজনীয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও চরম অবহেলিত। স্বল্পেই বর্জনীয়! অনেকটা বাথরুমের গিজারের….

লেভারকুজেন: বুন্দেসলিগার নতুন ত্রাস

তারপর কত দিন কেটে গেছে। দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধ পেরিয়ে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের উত্তাপ নিয়ে জেগে সময় পারের বাসিন্দারা। তবু গোটা চার-পাঁচ প্রজন্মের প্রেমিকা হয়ে সমর্থকদের একই স্বপ্নের বৃত্তে বেঁধে রাখতে পেরেছে রাইন নদীর তীরের ক্লাব বায়ার লেভারকুজেন। যার জন্য মানুষ তীর্থের কাক হয়ে বসে থাকে। এমন দিন কদাচিৎ আসে কিংবা আসেই না। আসবে নিশ্চয়ই? বেশির ভাগ….

error: Content is protected !!