Author Picture

বিস্তৃত পাঠ সবচেয়ে আনন্দের : ইমান মিরসাল

কাউসার মাহমুদ

ইমান মিরসাল ১৯৬৫ সালে মিসরে জন্মগ্রহণ করেন। একজন আধুনিক আরব কবি, প্রবন্ধকার, অনুবাদক, সাহিত্য গবেষক এবং কানাডার আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা ও সাহিত্যের সহযোগী অধ্যাপক। নব্বই দশকের উজ্জ্বল তরুণ লেখকদের একজন। সমসাময়িক আরবি কবিতার অন্যতম আকর্ষণীয় কণ্ঠ ইমান মিরসালের বহু কবিতাই এক ডজনেরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বিখ্যাত লিটারারি জার্নালগুলোয় নিয়মিত লেখাপত্র প্রকাশের পাশাপাশি পৃথিবীর অসংখ্য কবিতা উৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে কবিতা পাঠ করেছেন। এমনকি ইতিহাসে কবিদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলা হিসাবে আখ্যা পাওয়া ‘লন্ডন পোয়েট্রি পার্নাসাস’-এ অংশগ্রহণ করেও মিসরের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ইত্তিসাফাত’ (Characterizations) কায়রোর দার আল-গাদ প্রকাশনী থেকে ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয়। পরে ধারাবাহিকভাবে ‘মামাররুন মু’তাম্মুন য়ুসলাহু লি-তায়াল্লুমির রকসি’ ‘জুগরাফিয়্যা বাদীলাহ,’ ‘দুবাবাতুন ফিল-হিসা’ এবং ‘ফি-আছরি ইনায়াতিয যাইয়্যাতি’সহ আরও বেশকিছু অভূতপূর্ব গ্রন্থ রচনা করেন। তরুণ আরবদের মাঝে অসম্ভব জনপ্রিয় এ লেখিকা ক্রমশই আধুনিক আরবি সাহিত্যের অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ এক নাম হয়ে উঠছেন। ২০২১ সালে লাভ করেছেন শেখ যায়েদ বুক এওয়ার্ড। তার বই The Threshold (নির্বাচিত কবিতা, আরবি থেকে অনুবাদ রবিন ক্রেসওয়েল) ২০২৩ সালে গ্রিফিন পোয়েট্রি প্রাইজের জন্য নির্বাচিত বইয়ের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল। মূলত কবিতা, কবিতার যাত্রা, অনুবাদ এবং কবিতা বিষয়ে তার ভাবনা নিয়েই এ সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মার্সিয়া লিঙ্কস কোয়ালি। বাংলাভাষী পাঠকের জন্য এর বিশেষ অংশ অনুবাদ করেছেন কবি কাউসার মাহমুদ


মার্সিয়া লিঙ্কস: কবিতাবিষয়ক কোনো এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, প্রতিবাদী কবিতার সঙ্গে সত্যিই আপনার তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ, এক অর্থে আপনার বেশ কিছু কবিতাই প্রতিবাদী হিসাবে পড়া যায়। ফলে কেন কিংবা কোনো বিশেষ কারণে নিজেকে প্রতিবাদমূলক কবিতা থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন?

ইমান মিরসাল: দেখুন, একজন লেখক হিসাবে কোনো ধরনের কবিতা থেকে নিজেকে দূরে রাখা আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে একজন পাঠক হিসাবে যে কবিতার সঙ্গে আমি সংযোগ করতে পারি না, সে সম্পর্কে বলতে পারি। জাতি সম্পর্কে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে, আদর্শে পূর্ণ মহান এক আখ্যান নিয়ে বড় হয়েছি। উদাহরণস্বরূপ, আমি আমার এমএতে আদুনিস পড়েছিলাম এবং গভীর রাতে কবিতা পড়তাম-যার সৌন্দর্য, ভাষা এবং চিত্র থাকা সত্ত্বেও তার সঙ্গে নিজেকে রিলেট করতে পারিনি। বস্তুত তিনি একজন মহান কবি, একজন ভবিষ্যদ্বক্তা-যিনি আরবি ভাষা ও সংস্কৃতি পরিবর্তন করে বিশ্বকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু আমার সঙ্গে তিনি কথা বলেন না। আসলে আমি মূলত অন্য কিছুর সঙ্গে লড়াই করছিলাম। যে লড়াই নিজেকে বোঝার ইচ্ছা, নিজের স্মৃতির সঙ্গে এবং প্রাত্যহিক জীবনের অন্ধকার মুহূর্তগুলো মোকাবিলা করার সঙ্গে। তেমনি আমি আমার বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্কের জটিলতা, বন্ধুত্ব এবং কর্তৃত্বের সঙ্গে খুব বিস্তৃত অর্থে আগ্রহী ছিলাম, আর তা কেবল ধর্মীয় বা রাজনৈতিকভাবে নয়। মোটকথা, সেখানে আমি আমার ব্যক্তিত্ব আবিষ্কার করছিলাম এবং নিজের কণ্ঠের সন্ধান করছিলাম।

মার্সিয়া লিঙ্কস: আদুনিস ছাড়া আর কাকে পড়ে বেড়ে উঠেছেন?

ইমান মিরসাল: সাধারণত, কবিতা এমন একটি ধারা যা আমি সবচেয়ে কম পড়ি। যা হোক, তা আরবি কবিতার স্বর্ণযুগ ছিল হাইস্কুল থেকে আমার বিস্তৃত কবিতা পাঠের মূল উৎস। যেখানে পরে আধুনিক আরব কবি যেমন মাহমুদ দারবিশ, আমাল ডানকোল এবং সালাহ আবদেল সাবোর ছিলেন অন্যদের মধ্যে। দেখুন, সিরিয়ার কবি সানিয়া সালেহ সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম এবং কেবল এ সত্য কিংবা তথ্যটি নিয়ে পরিতাপ করছিলাম, আমি এই ভেবে বড় হয়েছি যে, আমার জন্য কোনো আধুনিক আরব মহিলা কবি নেই-যতক্ষণ না আমি সানিয়া সালেহকে পড়ি, মাত্র তিন বছর আগে বা তারও বেশি সময় ধরে। ফলে স্বভাবতই এটি আপনাকে বিস্মিত করে যে, একজন তরুণ পাঠক হিসাবে কেন এ ধরনের কবিতা আমার কাছে সুলভ ছিল না? তাই আমার মনে হয়, জীবনের প্রথম দিকে যদি আমি তাকে পড়তাম, তাহলে বিষয়টি খুবই চমৎকার হতো।

মার্সিয়া লিঙ্কস: এখন কতটা ব্যাপকভাবে পড়েন? এ বিস্তৃত কিংবা ‘ব্যাপকভাবে’ পড়াটা কি গুরুত্বপূর্ণ?

ইমান মিরসাল: এ শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়, বরং এ হলো সবচেয়ে আনন্দময় বিষয়ের একটি। তরুণ পাঠক হিসাবে আমরা অনূদিত কবিতা পড়তাম। যদিও কিছু অনুবাদ বেশ খারাপ ছিল, তবু সেগুলা আমাদের ওপর প্রভাব ফেলেছিল। তবে আমরা তা কবিতা বলে কবিতার বৈচিত্র্য আবিষ্কার করেছি। সেখানে যাদের পড়েছি যেমন, কনস্টানটাইন ক্যাভাফি, উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস, উইসলাওয়া সিজিম্বরস্কা, এমিলি ডিকিনসন, নিকানোর পাররা, আনা আখমাতোভার মতো সেরা কবিদের।

একজন লেখক হিসাবে কোনো ধরনের কবিতা থেকে নিজেকে দূরে রাখা আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে একজন পাঠক হিসাবে যে কবিতার সঙ্গে আমি সংযোগ করতে পারি না, সে সম্পর্কে বলতে পারি। জাতি সম্পর্কে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে, আদর্শে পূর্ণ মহান এক আখ্যান নিয়ে বড় হয়েছি। উদাহরণস্বরূপ, আমি আমার এমএতে আদুনিস পড়েছিলাম এবং গভীর রাতে কবিতা পড়তাম-যার সৌন্দর্য, ভাষা এবং চিত্র থাকা সত্ত্বেও তার সঙ্গে নিজেকে রিলেট করতে পারিনি। বস্তুত তিনি একজন মহান কবি

মার্সিয়া লিঙ্কস: এখন নতুন কণ্ঠস্বরগুলো কীভাবে জানতে পারেন?

ইমান মিরসাল: এ ক্ষেত্রে আরবি কবিতার দৃশ্যকে ঘনিষ্ঠভাবে এবং উৎসাহের সঙ্গে অনুসরণ করি। এ মুহূর্তে এমন অনেক চমৎকার নারী কবি আছেন, যারা পাঠের যোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সম্প্রতি আমি অন্য অনেকের মধ্যে আয়া নাবিহ, আসমা ইয়াসেন এবং মালাকা বদরকে উপভোগ করেছি। বিপরীতে অনারবি কবিতার জন্য ইংরেজি ও আরবি অনুবাদ এবং আন্তর্জাতিক পাঠে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এর সঙ্গে সংযুক্ত হই। আসলে, জীবনে আপনি অনেক কবির সঙ্গেই সাক্ষাৎ করেছেন, কিন্তু তাদের মাঝে মাত্র কয়েকজনই আছেন যাদের সঙ্গে আপনি কথোপকথনে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন এবং তাদের প্রশংসা করেন।

মার্সিয়া লিঙ্কস: এমন কোনো সাহিত্যিক দৃশ্য আছে, যা আপনি বিশেষভাবে কাছাকাছি অনুভব করেন?

ইমান মিরসাল: ২০০৭ সালে ‘ডেইজ অব পোয়েট্রি অ্যান্ড ওয়াইন’ নামে একটি স্বাধীন কবিতা পাঠ উৎসবে স্লোভেনিয়ায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল আমায়। সেখানে আমিই ছিলাম একমাত্র আরব কবি। ইভেন্টের আগে তারা অংশগ্রহণকারীদের কবিতা অনুবাদ করেছিল এবং তা ইংরেজি, স্লোভেনিয়ান এবং মূল ভাষায় প্রকাশ করেছিল। সুতরাং সেখানে আমি সেসব কবিদের পড়তে পারছিলাম, যাদের সঙ্গে চমৎকার দিনগুলো অতিবাহিত করছিলাম। সেখানে প্রকৃতই আমি এমন অনুভব করেছিলাম যে, একটি জানালা খোলা হয়েছে। যেখানে নব্বই দশক থেকে লেখা তাদের ও আরবি কবিতার মাঝে প্রশ্ন এবং চিত্রের ব্যবহারে অনেক মিল রয়েছে। ব্যাপারটা কল্পনা করতে পারেন যে, ১৯৯০-এর দশকে একজন কবি, যিনি পোস্ট-কমিউনিস্ট রোমানিয়াতে বসবাস করছেন এবং ভাবছেন যে, আরব জাতীয়তাবাদ, ইরাকি যুদ্ধের ঘটনা এবং ফিলিস্তিনি সংকটসহ অনেক মতাদর্শের পতনের সময় কায়রোতে বসবাস করছি আমি। আসলে আমরা প্রায় একই সীমানা পার হয়ে গেছি। ফলে অনুভব করেছি, যেন আমরা এমন ব্যক্তি-যারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির মাধ্যমে একই বিকাশমান মুহূর্তগুলো অনুভব করেছি।

মার্সিয়া লিঙ্কস: কখনোই আপনাকে কবিতা অনুবাদ করতে দেখিনি। কেবল গদ্যই অনুবাদ করেছেন। এমনটা কেন?

ইমান মিরসাল: কবিতা অনুবাদ করতে ভয় পাই আমি। হতে পারে কারণ এটি একটি ভারী দায়িত্ব। কিন্তু সম্প্রতি আমি নিজের এ ভয়টি নিয়ে প্রশ্ন করছি এবং ভাবছি যে, হয়তো এটা নিছকই হাস্যকর একটা ব্যাপার।

মার্সিয়া লিঙ্কস: তাহলে কার মাধ্যমে আপনি অনূদিত হতে চাইবেন, একজন কবি নাকি যিনি কবি নন তিনি?

ইমান মিরসাল: অনুবাদের কাজটিতে সব সময় উদ্বেগ থাকে। কেননা একটি পাঠ্যকে এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে নিয়ে যায় এটি। দেখুন, আমার সৃষ্টিকর্মে খালেদ মাত্তাওয়ার অনুবাদ সবচেয়ে প্রিয়-তা-ও কিন্তু এ উদ্বেগ থেকে মুক্ত ছিল না। বরং সেখানে এমন কিছু মুহূর্ত ছিল যখন আমি ভেবেছিলাম, তিনি একজন দুর্দান্ত কবি এবং অনুবাদক। তাহলে এর মানে কি ইংরেজিতে আমার কবিতার মধ্যে দুটি কণ্ঠস্বর লড়াই করছে, আমার এবং তার। ফলে একজন অনুবাদক যিনি কবি নন, তার ব্যাপারে আমার ভিন্ন চিন্তা থাকবে। সেখানে মূলত একটা সময় পর, আপনাকে আপনার কবিতাগুলোর ওপর অভিভাবকত্ব ছেড়ে দিতে হবে। তাদের নতুন ভাষা এবং বাড়িতে স্থানান্তরিত করার অনুমতি দিতে হবে। কল্পনা করুন, আপনার কণ্ঠস্বর বাতাসের মাধ্যমে আপনার থেকে অনেক অনেক দূরের কানে বাহিত হয় : অতএব, কীভাবে আপনার কণ্ঠটি অন্য প্রান্তে পৌঁছাবে তা নির্ধারণ করা অসম্ভব। হয়তো সত্যিই এটি প্রকৃতির চেয়ে আরও দীর্ঘায়িত বা নরম শোনাতে পারে। হয়তো এটি আরও সাড়ম্বর বাকপটু হতে পারে, যেন আপনি একজন অভিজাত নেটিভ স্পিকার। কাজেই যে অনুবাদক আমার কবিতা বাছাই করেন এবং সেখানে বসে তার নিজের ভাষায় লেখার সংগ্রাম করেন, তা তার পুনরায় লেখার অধিকার থাকে-যতক্ষণ না আমার উচ্চারিত কণ্ঠস্বর বেঁচে থাকে তার যাত্রার গন্তব্যের পথে।

আরো পড়তে পারেন

রুশ সংস্কৃতির প্রধান শত্রু রুশ রেজিম: মিখাইল শিশকিন

অন্য দেশে ইমপেরিয়াল অথবা সোভিয়েত রাশিয়া থেকে বর্তমানের রুশ ফেডারেশনের নির্বাসিত লেখকদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। অনেকে যাকে সমকালীন রুশ সাহিত্যে পাস্তারনাক ও সলঝোনেতসিনের উত্তরসূরি হিসেবে মনে করেন, সেই মিখাইল শিশকিন ১৯৯৫ সাল থেকে বসবাস করছেন সুইজারল্যান্ডে। একমাত্র লেখক হিসেবে লাভ করেছেন রাশিয়ার প্রথমসারির প্রায় সব সাহিত্য পুরস্কার, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য— রুশ বুকার (২০০০), বিগ….

বাংলা সাহিত্যের লেখকদের কূপমণ্ডূকতা পাঠকদের কূপমণ্ডূক করেছে : হারুন আল রশিদ

রুদেবিশ শেকাবের ব্যতিক্রমী জীবন উপন্যাসের লেখক হারুন আল রশিদ বাংলা সাহিত্যে এক ব্যতিক্রম ও সম্পূর্ণ নতুন কণ্ঠ। তার  গদ্যের শক্তি ও গভীরতা পাঠকের কাছে যেমন বিস্ময়ের ব্যাপার তেমনি তার ভাষার সহজবোধ্যতা বাংলা গদ্যের একটি নতুন ধারা তৈরি করেছে। মাত্র দুটি উপন্যাস প্রকাশ করে তিনি পাঠকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। অন্য উপন্যাসটি হল— ‘রেণুর আবির্ভাব’। তাঁর তৃতীয়….

ঘৃণা কাটিয়ে ওঠা একজন ফিলিস্তিনি এবং একজন ইসরায়েলি বাবার মুখোমুখি

তাদের গল্পটা এতটাই অবাস্তব যে মনে হয় এটি কোনো চলচ্চিত্রের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এমনকি, স্টিভেন স্পিলবার্গ  তাদের গল্পকে বড় পর্দায় আনার স্বত্বও কিনেছিলেন। ফিলিস্তিনি বাসাম আরামিন এবং ইসরায়েলি রামি এলহানান বছরের পর বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অক্লান্ত লড়াই করে যাচ্ছেন। যারা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে সন্তান হারিয়েছেন তাদের দল ‘দ্য প্যারেন্টস সার্কেল’ নামে….

error: Content is protected !!