Author Picture

স্মৃতি এখন কী করবে

শামসুদ্দিন তৌহিদ

জেলখানা থেকে বেরিয়ে স্মৃতি বাসে চড়ে বসে। সঙ্গে ওর মেয়ে ফাতেমা। বেশিক্ষণ কথা বলতে পারেনি হায়দারের সঙ্গে। শুধুই চোখ বেয়ে পানি পড়েছে। ফাতেমাও ওর বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে। আর হয়তো দেখা হবে না বাবার সঙ্গে। হায়দারের চোখও ভেজা ছিল। আজই হয়তো ওদের শেষ দেখা। হায়দার বারবার স্মৃতির হাত ধরে অনুরোধ করেছে ওকে ক্ষমা করে দিতে। মেয়েকে যেন দেখে রাখে। ফাতেমা যাতে লেখাপড়া শেষ করতে পারে সে চেষ্টা করতে। তারপর ভালো একটা ছেলে দেখে বিয়ে দিতে। হায়দারের কোনো আত্নীয় আসেনি আজ দেখা করতে। আসবে কোথা থেকে, ওর সবাই তো ওপারে থাকে। হায়দার মুর্শিদাবাদের সন্তান। এদেশে পড়তে এসেছিল। লেখাপড়া শেষ করে এখানেই চাকরি নিয়ে থেকে গেছে। এক শিক্ষার্থী বন্ধুর মাধ্যমে স্মৃতির সঙ্গে পরিচয়, তারপর বিয়ে।

গতকাল নোটিশ পেয়ে স্মৃতি আজ মেয়েকে নিয়ে এসেছিল হায়দারের সঙ্গে দেখা করতে। বাসে ঢাকায় ফিরে যেতে যেতে আজ অনেক কথাই মনে পড়ছে। কত বারণ করেছে হায়দারকে চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় জড়িয়ে না পড়তে। ফাতেমাও ওর বাবাকে অনুরোধ করেছিল। কথা শোনেনি। যদি ওদের কথা শুনে ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়াত, তাহলে আজ হয়তো তার এ পরিণতি হতো না। হায়দারের ফাঁসির আদেশ হয়েছে অনেক আগেই। আপিল করেও কিছু হয়নি। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা চেয়ে অ্যাপ্লিকেশন করেও লাভ হলো না। কাল ভোরেই ওর ফাঁসি হয়ে যাবে।

হায়দার গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে স্মৃতি ও ফাতেমার দুঃসহ জীবন শুরু হয়। অর্থকষ্ট তো আছেই। সমাজে মুখরক্ষা করে চলাও মুশকিল হয়ে পড়েছে। মামলা চালাতে গিয়ে জমানো সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। বাড়তি আয়ের কোনো পথ নেই। আজ তারা পথে নেমে এসেছে। অথচ কী সচ্ছল জীবনই না ছিল ওদের। এখন, স্কুলে শিক্ষকতা করে জীবনকে কোনো রকমে টেনে নিয়ে যাচ্ছে স্মৃতি। অভিজাত এলাকার ফ্ল্যাট ছেড়ে ঢাকা খিলগাঁওয়ের বস্তিসম একটি আধাপাকা দু’চালার ঘরে থাকে ওরা।

বিয়ের পর অর্থকষ্টে কখনো থাকতে হয়নি স্মৃতিকে। হায়দারের আয়-উপার্জনও ভালো ছিল। আইটি স্পেশালিস্ট হিসাবে একটি আইটি কোম্পানিতে ভালো বেতনেই চাকরি করত সে। উচ্চ বিলাসী মানুষ ছিল হায়দার। চাকরির টাকায় ওর যেন চলে না। আরও অর্থ চাই। ব্যবসা ছাড়া যে প্রচুর অর্থের মালিক হওয়া যায় না হায়দার সে কথা ভালো করেই বুঝেছিল। স্মৃতিকেও বলেছে দু-একবার। স্মৃতি তাতে সায় দেয়নি। তারপরও তার চেষ্টার শেষ ছিল না। অর্থ নেশার পাশাপাশি মদের নেশাও ছিল হায়দারের। প্রায়ই সে ক্লাব থেকে নেশা করে বাড়ি ফিরত। এসব নিয়ে অনেক যন্ত্রণা দিয়েছে হায়দার স্মৃতিকে। স্মৃতি অনেক চেষ্টা করেও হায়দারকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। স্মৃতির কথার পাত্তাই দিত না হায়দার। বাসে, বাসায় ফিরতে ফিরতে স্মৃতি এসব কথা ভাবছে আর ওর দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। আজ যেন সবকিছু মনের কোণে এসে ভিড় করেছে।

একদিন রাতে, প্রায় একটা বেজে গেছে, হায়দার তখনো ফেরেনি। সেই যে সকালে অফিসে বেরিয়ে গেছে সারা দিন কোনো খবর নেই। প্রায়ই সে এ রকম করে। দিন দিন ওর ব্যবহারেও পরিবর্তন লক্ষ করেছে স্মৃতি। আগে অন্তত উইকএন্ডে বাইরে নিয়ে যেত। ছুটির দিনে ওদের একমাত্র মেয়ে ফাতেমাসহ বাইরে কোথাও না কোথাও সারা দিনের জন্য বেড়াতে যেত ওরা। সর্বশেষ মনে আছে, ওরা যমুনা রিসোর্টে বেড়াতে গিয়েছিল। এক রাত থেকেও ছিল ওখানে। বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুই তখন বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু ছিল। হায়দারের সঙ্গে সেটিই ছিল শেষ ঘুরে বেড়ানো। তারপর থেকেই হায়দার কেমন যেন বদলে যেতে শুরু করেছে। রাত করে বাড়ি ফেরা। বাইরে থেকে ফিরে, না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়া।

ক্লাবে সে আগেও যেত। তবে এত ঘন ঘন নয়। নেশা করে বাড়ি ফেরা ওর অনেক দিনের অভ্যাস। স্মৃতি তাতে আপত্তি করেনি। হায়দার মদের নেশা করলেও মাতলামো করেনি কখনো। স্মৃতি কখনো চায়নি হায়দার মাতাল হয়ে ঘরে ফিরুক। হায়দারেরও সে পরিমিতবোধ ছিল। ক্লাব থেকে বাসায় ফিরে স্মৃতির সঙ্গে ডিনার করে তারপর ঘুমাতে যেত।

কিন্তু কিছুদিন হলো সে লক্ষ করেছে হায়দার বেশ মাতাল অবস্থায় বাসায় ফিরে। আরও একটি বিষয় স্মৃতির চোখ এড়ায়নি, আজকাল ক্লাবে সে ড্রাইভার নিয়ে যায় না। অফিস শেষে ড্রাইভারকে বিদায় করে সে নিজেই ড্রাইভ করে ক্লাবে যায়। হায়দারের এ পরিবর্তন দেখে স্মৃতি দু-একদিন বলেছেও তাকে। হায়দার পাত্তা দেয়নি। তবে যেদিন থেকে গভীর রাতে বাড়ি ফেরা শুরু করেছে, সেদিন থেকে কেন যেন স্মৃতির মনের ভেতর সন্দেহের দানাবাঁধতে শুরু করেছে। অফিসে কোনো সমস্যা হয়নি তো? কোম্পানির সিইও সে। এমডির পরেই তার অবস্থান। এ আইটি কোম্পানির শুরু থেকেই সে চাকরি করে আসছে। এমডি বেশ ভদ্র ও অমায়িক মানুষ। হায়দারের ওপর বেশ নির্ভরশীল। হায়দার কর্মঠ ও দক্ষ। নিজ পেশার ওপর তার ভালো দখল আছে। তাছাড়া নেগেটিভ কিছু বলার সুযোগও দেয়নি সে এমডিকে। স্মৃতি একদিন জিজ্ঞেসও করেছে হায়দারকে। হায়দারের সরাসরি উত্তর, কোনো ঝুটঝামেলা নেই। অফিস চলছে আগের মতোই। স্মৃতি ভেবে পায় না তাহলে সমস্যাটা কোথায়? কেন সে এত রাতে বাসায় ফেরে? হায়দারের ব্যবহারেও বেশ পরিবর্তন এসেছে ইদানীং। অল্পতেই মেজাজ গরম করে। কেমন যেন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। একদিন রাত করে বাসায় ফিরতেই স্মৃতি ওকে ধরে বসে।

— এত রাত করে যে বাসায় ফিরেছ, তোমার জন্য আর কত রাত জেগে থাকব?

— জেগে থাকতে তোমাকে বলেছে কে। খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেই তো পার। হায়দারের কথায় স্মৃতি যেন ধাক্কা খায়। সে কয়েক সেকেন্ড হায়দারের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে ওঠে,

— খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ব মানে! তুমি বাসায় না ফেরা পর্যন্ত কোনোদিন দেখেছ আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। দেরি করে ফিরবে ফোন করে বললেও তো পার। সেটিও তো করনা তুমি। তাছাড়া চারদিকের যে পরিস্থিতি, তোমার কিছু হলো কিনা সে টেনশনেই তো বাঁচি না। আর তুমি বলছ ঘুমিয়ে পড়তে?

— তুমি তো জান মাঝে মধ্যেই আমি ক্লাবে যাই। ক্লাবে গেলে একটু-আধটু দেরি তো হতেই পারে।

— মাঝে মধ্যে বল না। আগে তুমি মাঝে মধ্যে যেতে। সেটা ঠিক ছিল। কিন্তু ইদানীং তুমি রোজই যাচ্ছ সে হিসাব আছে তোমার? কথার শেষের দিকে স্মৃতির গলা যেন ঝাঁঝালো হয়ে ওঠে।

— যাও যাও বেশি কথা বল না। খেয়ে ঘুমিয়ে পড়। আমি খাব না। বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি। হায়দারের কথায় স্মৃতি আহত হয়। সে আর কথা না বাড়িয়ে সোজা শোবার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে।

হায়দার গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে স্মৃতি ও ফাতেমার দুঃসহ জীবন শুরু হয়। অর্থকষ্ট তো আছেই। সমাজে মুখরক্ষা করে চলাও মুশকিল হয়ে পড়েছে। মামলা চালাতে গিয়ে জমানো সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। বাড়তি আয়ের কোনো পথ নেই। আজ তারা পথে নেমে এসেছে। অথচ কী সচ্ছল জীবনই না ছিল ওদের

আরও একদিন, স্মৃতি দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে দেড়টা বেজে গেছে। হায়দার তখনো ফেরেনি। ক্লাব থেকে রাত করে ফিরলেও এত দেরি সে করে না। স্মৃতির ভেতর যেন টেনশন বাড়ে। কী করবে ভেবে পায় না। ক্লাবে একবার ফোন করে দেখবে? হায়দার গুলশান ও উত্তরা দু’ক্লাবেরই মেম্বার। উত্তরা ক্লাবেই যায় বেশিরভাগ সময়। বাসা থেকেও কাছে। স্মৃতিরা উত্তরাতেই থাকে, তিন নম্বর সেক্টরে রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্সের পেছনে। স্মৃতি টেলিফোনের পাশে গিয়ে রিসিভার হাতে তুলে নেয়। তারপর কল দেয় উত্তরা ক্লাবে। কয়েকটি রিং বাজতেই ওপর প্রান্ত থেকে কেউ একজন রিসিভার তুলে। ক্লাবের ফ্রন্ট ডেস্কের কেউ হবে হয়তো। স্মৃতি, হায়দার ক্লাবে আছে কিনা জিজ্ঞেস করতে উত্তর আসে — হায়দার ক্লাবে নেই। কখন বেরিয়েছে জানতে চাইলে অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়, হায়দারকে ক্লাবে আজ দেখেনি। ফ্রন্ট ডেস্কের লোকটি আগ বাড়িয়ে স্মৃতিকে জানায়, ‘স্যার ইদানীং ক্লাবে খুব কমই আসেন। এ সপ্তাহে একবারের জন্যও দেখিনি।’ লোকটির কথা শুনে স্মৃতি অবাক হয়। মনে মনে ভাবে গুলশান ক্লাবে হয়তো গিয়ে থাকতে পারে। লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্মৃতি গুলশান ক্লাবে কল দেয়। বেশ কয়েকটি রিং হতেই ওপর প্রান্ত থেকে একজন ওয়েটার টেলিফোনের রিসিভার তুলে। স্মৃতি হায়দারের খবর জানতে চাইলে ওয়েটারটি জানায়, হায়দার বেশ কয়েকদিন ধরে গুলশান ক্লাবে যায়নি। ওহ্… এ বলে স্মৃতি টেলিফোনের রিসিভার রাখতে না রাখতেই বাসার কলিংবেল বেজে ওঠে। স্মৃতি রিসিভার রেখে ড্রইংরুমের দরজা খুলে দেয়। দরজা খুলতেই হায়দার টলতে টলতে প্রায় পড়ে যাচ্ছে এমন অবস্থায় ঘরে প্রবেশ করে। দরজা বন্ধ করে দ্রুত হায়দারকে ধরে ফেলে স্মৃতি। তারপর কোনো রকমে তাকে সোফায় বসিয়ে দেয়। হায়দার কিছুক্ষণ বসে থাকে সোফায়। স্মৃতি ওর পাশে গিয়ে বসে। কিছুই বলে না সে। বেশ কিছু মুহূর্ত নিশ্চুপ থাকে ওরা। কারও মুখে কোনো রা নেই। ‘তুমি ঘুমাওনি কেন?’ জড়ানো কণ্ঠে স্মৃতিকে জিজ্ঞেস করতে করতে হায়দার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও বসে পড়ে। হায়দারের এ অবস্থা দেখে এগিয়ে যায় স্মৃতি এবং তার এক হাত নিজের কাঁধে চেপে ধরে ধীরে ধীরে হায়দারকে শোবার ঘরে নিয়ে যায়।

বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই হায়দার ঘুমিয়ে পড়ে। স্মৃতিও ওর পাশে শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করে। ঘুম নেই চোখে। মনে মনে ভাবে, হায়দার বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। ইদানীং ওর চলাফেরা সন্দেহজনক। ও অন্য কোথাও নেশা করে নাকি? ক্লাবে যাওয়া বন্ধ করে কোথায় গিয়ে সে নেশা করে খুঁজে বের করতে হবে। হায়দারের বন্ধু হাফিজের সঙ্গে কথা বলবে কাল। উনি বেশ কো-অপারেটিভ। হাফিজ ভাই হয়তো কিছু জানাতে পারবেন।

পরদিন হায়দার অফিসে যাওয়ার পর হাফিজের সেল ফোনে কল দিয়ে যা শুনল তার জন্য স্মৃতি মোটেও প্রস্তুত ছিল না। এত অবনতি হয়েছে হায়দারের? নতুন নেশায় পেয়েছে তাকে। ছি ছি ছি এত অধঃপতন ঘটেছে ওর। তা-ও আবার মোহাম্মদপুর বস্তি এলাকায় গিয়ে। শুধু নতুন নেশা নয়, একই সঙ্গে ব্যবসাও ধরেছে সে? স্মৃতি ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি হায়দার ব্যবসা শুরু করেছে। নতুন বন্ধু জুটেছে ওর। ব্যবসায়িক বন্ধু। দ্রুত ধনী হওয়ার রাস্তা খুঁজে পেয়েছে। বিয়ের পর থেকে শুনে এসেছে চাকরি সে বেশি দিন করবে না। রাতে বাসায় ফিরে এলেই হায়দারকে জিজ্ঞেস করবে স্মৃতি।

সন্ধ্যার পরপরই হায়দার বাসায় ফিরে আসে। অফিসের কাপড় চেঞ্জ করে শোয়ার ঘরে বসতেই স্মৃতি এক কাপ চা নিয়ে হাজির হয়। চায়ের কাপ হায়দারের হাতে ধরিয়ে দিতেই স্মৃতি জিজ্ঞেস করে — আজ যে বড় সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে?

— আমার এক বন্ধুর বাসায় যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হঠাৎ তিনি একটা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় যাওয়া হয়নি। ভালোই হলো, সন্ধ্যার পরপরই বাসায় তো ফিরে আসতে পেরেছি। হাঁ, ভালো কথা। আমি বিশেষ কাজে আগামীকাল কয়েকদিনের জন্য ঢাকার বাইরে যেতে পারি।

শেষের কথাগুলো বলার সময় হায়দারকে কিছুটা চিন্তিত ও অস্থির মনে হলো। হায়দারের কথা শুনে স্মৃতির মনেও কিছুটা খটকা লাগে। তারপরও সে জিজ্ঞেস করে,

— বন্ধু মানে, হাফিজ ভাইয়ের বাসায়? স্মৃতি ইচ্ছে করেই হায়দারের বন্ধু হাফিজের নাম নেয় ওর রিঅ্যাকশন দেখার জন্য।

— না হাফিজ নয়। আমার অন্য আরেক বন্ধু। তুমি ওকে চিনবে না।

— কোনো ব্যবসায়িক বন্ধু? আজকাল মানুষের মুখে শুনছি তুমি নাকি ব্যবসা শুরু করেছ?

স্মৃতির মুখে ব্যবসার কথা শুনে হায়দার প্রথমে হোঁচট খায়। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,

— না, শুরু করিনি। তবে শুরু করব ভাবছি।

— কিসের ব্যবসা জানতে পারি কি?

— ও জেনে তোমার লাভ নেই। যখন শুরু করব, তখন জানতে পারবে নিশ্চয়ই।

— কেন এখন বলা যাবে না? তুমি আমাকে মিথ্যা কথা বলছ। অনেক আগেই ব্যবসায় জড়িয়ে গেছ। যে ব্যবসাটি তুমি করছ তা যে ভালো নয় আমি জানি।

কথাগুলো বলে স্মৃতি হায়দারের আরও কাছে গিয়ে বসে। ওর ডান হাতটি নিজের হাতে নিয়ে অনুরোধের সুরে বলে,

— হায়দার, তুমি যে পথে পা বাড়িয়েছ তাতে ভালো কিছু হবে না। আমাদের এত দ্রুত ধনী হওয়ার প্রয়োজন নেই। ব্যবসা করতে হয় অন্য ব্যবসা করো। তবু এ পথ থেকে তুমি সরে আস।

— কী তুমি যা তা বলে যাচ্ছ এতক্ষণ ধরে। আমি কীসের ব্যবসা করছি? তোমাকে কে বলেছে?

— দেখো কোনো কিছু গোপন করনা। আমি জেনে গেছি। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি তুমি যে ব্যবসায় জড়িয়েছ সমাজ ও দেশের জন্য ভালো নয়। যে কোনো সময় বিপদ হতে পারে। তোমার একটা কিছু হলে আমাদের কী হবে? আমার কথা ভাব। অন্তত ফাতেমার কথা ভেবে ওপথ থেকে সরে আস।

হায়দার এবার গলার স্বর চড়িয়ে বলে ওঠে — এতক্ষণ তুমি কী আবোল-তাবোল বকছ? আমি কীসের ব্যবসা করছি তা নিয়ে তোমার মাথা না ঘামালেও চলবে। আমি যা করছি আমাদের ভবিষ্যৎ ভালোর জন্যই করছি।

— হায়দার আমরা চল আমাদের আগের সময়ে ফিরে যাই। তুমি যে চাকরি করছ তা দিয়েই আমাদের চলে যাবে। এত টাকা-পয়সার আমাদের দরকার নেই।

হায়দার এবার ধমক দিয়ে ওঠে — স্মৃতি তুমি কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করছ। এ বিষয়ে আমি আর তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই না।

— নাহ্ আমাকে এ বিষয় কথা বলতেই হবে। তুমি যা করছ তা আইনের চোখে অপরাধ। স্ত্রী হয়ে আমি জেনেশুনে সে পথে তোমাকে পা বাড়াতে দিতে পারি না।

স্মৃতির কথা শুনে হায়দার চিৎকার করে ওঠে — স্মৃতি এতক্ষণ আমি অনেক সহ্য করেছি। তুমি সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ।

দূরের কোনো মসজিদ থেকে ফজরের আজানের সুর ভেসে আসে। মা-মেয়ে দুজনেই খুব মন দিয়ে শোনে। আজ আজানের সুর যেন কেমন করুণ মনে হয়। স্মৃতি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করে, ফাতেমা ও তার নিজের, কারও চোখেই পানি নেই

হায়দার ও স্মৃতির উঁচু স্বরের কথা শুনে পাশের রুম থেকে ফাতেমা ছুটে আসে। ওর চোখে আতঙ্কের ছাপ। পাশের রুম থেকে সে সবকিছু শুনেছে। ও লেভেলের ছাত্রী সে। অনেক কিছুই সে বোঝে। ইদানীং ওর বাবার আচরণের পরিবর্তন দেখে ওর মনেও ভয় এসে ভর করেছে। আগে বাবাকে যত কাছে পাওয়া যেত, এখন তো দেখাই পাওয়া যায় না। ওর মনেও সন্দেহ হয়, বাবা নিশ্চয়ই কিছু একটা লুকাচ্ছে আম্মুর কাছে। দুপুরে হাফিজ চাচ্চু এসেছিলেন বাসায়। অনেক্ষণ আলাপ করে গেছেন। তখনই তার সন্দেহ হয়েছিল। সবকিছু না শুনলেও পাশের রুম থেকে শুনেছে, হাফিজ চাচ্চু বিদায় নেওয়ার সময় আম্মুকে অনুরোধ করে গেছেন, চাচ্চু যে এসেছিলেন আব্বুকে যেন না বলে। আম্মু তো ঠিকই বলেছে, এত টাকার আমাদের দরকার নেই। আব্বু কীসের ব্যবসা করে? হঠাৎ ফাতেমা চলে আসায় হায়দার স্মৃতিকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে ড্রইংরুমে চলে যায়। রাত তখন আটটা ত্রিশ মিনিট। এমন সময় হঠাৎ কলিংবেল বেজে ওঠে। হায়দার নিজেই ড্রইংরুমের দরজা খুলে দেয়।

দরজা খুলতেই দুজন পুলিশ সদস্য কিছু বোঝার আগেই হায়দারকে ঠেলে ড্রইংরুমে প্রবেশ করে। বাইরে দুজন পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে। পুলিশ দেখে হায়দার ভূত দেখা মতো করে তাকিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতেই সামনে দাঁড়ানো পুলিশ সদস্যটি নিজের পরিচয় দেন, তিনি উত্তরা থানার ওসি। ওসি হায়দারের পরিচয় জানতে চান। হায়দার নিজের পরিচয় দেয়। এমন সময় স্মৃতি ড্রইংরুমে ঢুকে পুলিশ দেখে হতভম্ব হয়ে পড়ে। ওসি স্মৃতির দিকে তাকাতেই হায়দার তার স্ত্রী বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। ওসি এবার হায়দারের দিকে চোখ ফিরিয়ে বলে ওঠে — আপনাকে যে একবার আমাদের সঙ্গে থানায় যেতে হবে। একটা খুনের মামলার বিষয়ে আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন। ওসির কথা শুনে হায়দার যেন ঘাবড়ে যায়। ধরা গলায় সে জিজ্ঞেস করে — কীসের খুনের মামলা? আমি কোনো খুনের ব্যাপারে কিছু জানি না। কথাগুলো বলতে বলতে হায়দারের শরীরে যেন কাঁপন ধরে। স্মৃতি লক্ষ করে হায়দারের শরীর কাঁপছে। ওসি বলেন, সে আপনি থানায় গেলেই বুঝতে পারবেন।

সেই যে পুলিশ হায়দারকে ধরে নিয়ে গেল, ঘরে আর ফেরা হলো না তার। পরের দিন সংবাদপত্রে বড় বড় শিরোনাম, ‘ইয়াবা সম্রাজ্ঞী মনোয়ারা বেগম খুনের অন্যতম অভিযুক্ত জগলুল হায়দার গ্রেফতার।’ হায়দারের ইয়াবা ব্যবসার অন্যতম পার্টনার শফিকের স্বীকারোক্তির পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সন্ধ্যায় হায়দারকে তার উত্তরার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। ইয়াবা ব্যবসার লাভের অর্থ ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে মনোয়ারা বেগম খুন হন। খুনি শফিক গত পরশু গ্রেফতার হয়। মনে করা হচ্ছে, এ খুনের সঙ্গে হায়দারও জড়িত…।

ফাতেমার ধাক্কায় স্মৃতি বাস্তবে ফিরে আসে। বাস খিলগাঁও চলে এসেছে। বাস থেকে নেমে ওরা হেঁটেই বাসায় চলে আসে। ঘড়ির কাঁটা তখন এগারোটার ঘরে। রাতে সে আর কিছু খাবে না। ফাতেমাও রাতে খাবে না বলে ওর রুমে চলে যায়। স্মৃতি কাপড় চেঞ্জ করে গোসল করে নেয়। রাতে আর ঘুম হবে না। ওজু করে সে কুরআন শরিফ নিয়ে বসে। কতক্ষণ কুরআন তেলওয়াত করেছে খেয়াল নেই। হঠাৎ টিনের চালের ওপরের গাছটায় কাকের ডাক শুনে কুরআন শরিফ পড়া বন্ধ করে। এমন সময় ফাতেমা ওর ঘরে ঢুকে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে,

— আম্মু এত ভোরে কাকগুলো ডেকে উঠল শুনেছ?

— শুনেছি মা। বলেই স্মৃতি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

— এতক্ষণে আব্বুর ফাঁসি হয়ে গেছে তাই না? তা না হলে কাকগুলো এভাবে ডেকে উঠবে কেন?

— হাঁ মা, তোর কথাই ঠিক। তোর আব্বুর ফাঁসি হয়তো হয়ে গেছে।

ঠিক এমন সময় দূরের কোনো মসজিদ থেকে ফজরের আজানের সুর ভেসে আসে। মা-মেয়ে দুজনেই খুব মন দিয়ে শোনে। আজ আজানের সুর যেন কেমন করুণ মনে হয়। স্মৃতি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করে, ফাতেমা ও তার নিজের, কারও চোখেই পানি নেই।

আরো পড়তে পারেন

মহামায়া (পর্ব-১)

১. সূর্য উঠতে এখনো অনেকটা দেরি। আকাশে কোনো তারা নেই। পুরোটা আকাশ মেঘে ঢাকা। রাতের অন্ধকারটা আজকে আরও বেশি চোখে লাগছে। বাতাস হচ্ছে। মাঝে মাঝে মেঘের আলোতে দেবীপুর গ্রামটা দেখা যাচ্ছে। মুহুর্তের জন্য অন্ধকার সরে আলোয় ভেসে যাচ্ছে। রাধাশঙ্করের ভিটাবাড়ি, ধান ক্ষেত, বাঁশঝাড় হাইস্কুল আলোয় ভেসে যাচ্ছে মুহূর্তের জন্য। মহামায়া আর মনিশঙ্করের ঘরে হারিকেন জ্বলছে।….

স্বর্ণবোয়াল

মোবারক তার কন্যার পাতে তরকারি তুলে দেয় আর বলে, আইজ কয় পদের মাছ খাইতেছ সেইটা খাবা আর বলবা মা! দেখি তুমি কেমুন মাছ চিনো! ময়না তার গোলগাল তামাটে মুখে একটা মধুর হাসি ফুটিয়ে উল্লসিত হয়ে ওঠে এই প্রতিযোগিতায় নামার জন্য। যদিও পুরষ্কার ফুরষ্কারের কোন তোয়াক্কা নাই। খাবার সময় বাপবেটির এইসব ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ খেলা আজকাল নিয়মিত কারবার।….

প্রতিদান

‘আমাকে আপনার মনে নেই। থাকার কথাও নয়। সে জন্য দোষও দেব না। এত ব্যস্ত মানুষ আপনি, আমার মত কত জনের সঙ্গেই হঠাৎ চেনা-জানা। কেনইবা মনে রাখবেন তাদের সবাইকে?’ বেশ শান্ত গলায় বললেন মিসেস অঙ্কিতা। টেবিল থেকে কি যেন একটা নিলেন তিনি। পিটপিট করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো সাফরাব। একটা ইনজেকশন, একটা ছোট টেস্টটিউবের মতো ভায়াল,….

error: Content is protected !!