Author Picture

ওসিডি (পর্ব-০৪)

হারুন আল রশিদ

পড়ুন— ওসিডি (পর্ব-০৩)

সাত

ছাব্বিশ দিন এক টানা দাঁড়িয়ে থেকে কারও পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব কি না কে জানে। আমি বেঁচে ছিলাম। তবে তখন আমার মর-মর অবস্থা। পানি এসে পা দু’টি ফুলে গেছে। কোমর অবশ। ঘাড় দু’টি কাঠের মতো শক্ত। আমি আমার মাথার খুলি অনুভব করতে পারি, ভারী একটা খুলি, অথচ তার ভেতর নরম কিছু নাই, যেন ওটা ইস্পাতের একটা শূন্য কোঠর। হাত-পায়ের নখ এক-একটা এক ইঞ্চি লম্বা, যা আমি আগে কখনও সহ্য করতে পারতাম না। অথচ তখন আমার সব কিছুতেই বিতৃষ্ণা। যেমন বিতৃষ্ণা ছিল আক্লিমাকে ডেকে বলায়: আয়, আমার নখ কেটে দে। জীবন-মরণ ব্যাপার না হলে আমি ওকে ডাকতাম না। তবে নখের দৈর্ঘ্য আমাকে ততটা কষ্ট দিচ্ছিল না যতটা কষ্ট দিচ্ছিল আমার ফোলা পা দু’টি। মনে পড়ে এক সময় আমি ছিলাম হাম্বার্টের উপদেশ মেনে রানের ঘের সতেরোর মধ্যে রাখার খেয়ালে চলা মেয়ে। এখন আমার গুলের বেড়-ই সতেরো ছেড়ে গেছে। আর উরু দু’টি বুঝি উপরের খোসা ছাড়ানো দু’টি মোটা কলাগাছের সাদা কাণ্ড। ওই অবস্থায় আমি আর আমার পা দু’টির উপর ভরসা করতে পারছিলাম না। আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যত কষ্টই হোক, আমি রাতে বিছানায় যাব।

.            সেই সন্ধ্যায় আক্লিমা আমার জন্য সাদা বালিশ আর সাদা চাদর দিয়ে বিছানা করে। আক্লিমা তার প্রাণের দুলাভাইয়ের শোকে কাতর। আমি আক্লিমার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করি। আমি ছাব্বিশ দিন দাঁড়ানো। আর দশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলে মরে যাব না। আমি বলি, এই মাগী, বিধবার বিছানা কেন বানিয়েছিস, নতুন বউয়ের বিছানা বানা, দরকার হলে তোর মাগের সাথে ঘুমাবো, তাকে বস্তি থেকে ডেকে আন। লজ্জায় আক্লিমা মাথা নিচু করে। সে লাল চাদর আর লাল বালিশ দিয়ে নতুন করে বিছানা করে। আক্লিমা আমাকে পাঞ্জা করে ধরে, আমি দুই হাত দু’দিকে নিয়ে দুই তালুর উপর ভর করে আমার দেহকে লাল বিছানার উপর বিছিয়ে দিতে সক্ষম হই। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে গিয়েও ফেলি না। যদিও তা না করা ভুল ছিল। তখনও আমি নিঃশ্বাসের গুরুত্ব বা উপকারিতা কোনওটাই জানতাম না।

.            আমি ঘন্টা দুয়েক স্থির হয়ে ছিলাম। আর চিন্তা করছিলাম পৃথিবীতে কত ভাল স্বাস্থ্য নিয়ে আমার জন্ম হয়েছিল। নাকে-গলায় কদাচ স্পর্শকাতরতা বা ভার বোধ করেছি, তবে তা কখনও সর্দিতে গড়ায়নি, সর্দি-জ্বরতো অনেক দূরের বিষয়। দুধ-দাঁতে ব্যথা ছিল বটে, নতুন দাঁত দিয়ে চাইলে যা ইচ্ছা তা কাটতে পারি, যদিও তা করি না, দাঁতের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি আমার চারিদিকের পরিচিত মেয়েদের সাধারণ একটা ব্যাধি : ইউরিন ইনফেকশন। আমার তা কখনও হয়নি। আর এ জন্যেই হামিদের লাশের ভার বুকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে যখন আমি টের পাই আমি আরোগ্য লাভ করছি, তখন আমি অবাক হইনি।  আমি আমার পায়ের গিরা আর হাঁটুর খোন্দল থেকে পানি সরে যাওয়া অনুভব করি। যেমন করে ফেনীর বছরগুলোতে আমি রাতে ঘুমের মাঝে গাছের কাণ্ড, বাঁশের বেড়া, চায়ের টঙ, রাস্তার ঢালের ঝোপঝাড় থেকে বন্যার পানি সরে যাওয়া অনুভব করতে পারতাম। বন্যায় নেতিয়ে যাওয়া ধান ক্ষেতে যেমন করে কচি পাতা জেগে ওঠে তেমন করে আমার কোমরের চেতনা ফিরে আসে। আমি আমার ঘাড় ঘোরাতে পারি। করোটির কাঠিন্য কমে স্বাভাবিক হয় আর আমি অনুভব করি আমার মাথার ভেতর মগজ আছে, তার বিশুদ্ধ মাখনীয় বৈশিষ্ট্যও আছে।

.            তবে আমার আরাম স্থায়ী হয় না। বুকের ভেতর লাশের ওজনটা জানান দেয়। আমার পাশ ফিরে শুতে ইচ্ছে করে। আমি দাঁতমুখ খিঁচে শক্ত হয়ে থাকি। তাতে কাজ হয় না। আমি যত শক্ত হই তত পাশ ফেরার জন্য আমার বুকের ছাটনার ভেতর স্পর্শকাতরতা বাড়ে আর তা আমাকে পাশ ফেরার জন্য উত্ত্যক্ত করে। এর পরও, ডান দিকে কাত হব না বাম দিকে, এই সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিই। বুকের কোন পাশ নখের আঁচড় বেশি চায় তা বোঝার চেষ্টা করি। আমার লম্বা নখগুলোকে আশির্বাদ মনে হয়। কিন্তু আদতেতো আর বুক খুলে পাঁজরের উপর নখের আঁচড় দেয়া সম্ভব নয়। তাই শেষ পর্যন্ত কুণ্ডূলতার কাছে হার মানি। ডান দিকে একটু হেলতেই বুকের ভেতর বিরাজমান পাহাড়টা গড়ানি দেয়। আমি খাটের এক পাশ খামচে ধরি। যাতে পাথরটা আমাকে টেনে নিয়ে মেঝেতে ফেলে না দেয়। ওই ভার নিয়ে মাটিতে পড়লে আমার বাঁচার সম্ভাবনা ছিল না।

.            আমার দিন কাটে হামিদের লাশ বুকে নিয়ে। কোনও কোনও রাতে ঘুমের মধ্যে লাশের ওজন আমাকে টেনে উল্কার মতো শূন্যে নিক্ষেপ করে। ঘুমের ওষুধের রাতগুলোর দুঃস্বপ্ন আবার দেখা শুরু করি। মৃত হামিদের আর ক্ষমতা নাই আমার জরায়ুতে মরিচের ঘষা দেয়ার, ক্ষমতা আছে শুধু আমার নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখার। শ্বাসরোধ অবস্থায় বছরের পর বছর কাটে, তবু মনে আসে না যে আমি স্বপ্নে আছি, যখন মনে আসে আমি স্বপ্ন দেখছি, তখন আমি লাফ দিয়ে উঠে বসি। লাশের কুণ্ডলি তখন আমার হৃৎপিণ্ডের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত থেঁতলে দেয়। আমি চেঁচিয়ে আক্লিমাকে ডাকি। আক্লিমা লাফ দিয়ে ওঠে। আমাকে পাঞ্জা করে ধরে দাঁড় করায়। বাকি রাত আমি জানালার রড ধরে দাঁড়িয়ে থাকি।

আমার দিন কাটে হামিদের লাশ বুকে নিয়ে। কোনও কোনও রাতে ঘুমের মধ্যে লাশের ওজন আমাকে টেনে উল্কার মতো শূন্যে নিক্ষেপ করে। ঘুমের ওষুধের রাতগুলোর দুঃস্বপ্ন আবার দেখা শুরু করি। মৃত হামিদের আর ক্ষমতা নাই আমার জরায়ুতে মরিচের ঘষা দেয়ার, ক্ষমতা আছে শুধু আমার নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখার

.            প্রতি রাতে বিছানায় যাই। কারণ বিছানায় যাওয়ার পর থেকে আমি বুঝতে পারি আমার অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল। কয়েক মাস পর আমি নিজে নিজেই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারি। উচ্চতাও ফিরে পাই। তিন মাস তেইশ দিনের মাথায় আমি আমার নারীর বুক পুনরায় উপলব্ধি করতে পারি, সেই বুক, যা দিয়ে, একদা জহিরের আবেশ ভরা দৃষ্টি দেখে আমার মনে হয়েছিল, আমি পৃথিবীর প্রতিটা পুরুষ পালতে পারি।

.            স্বাস্থ্য ফিরে পাওয়াতে আমার খুশি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমি খুশি হতে পারিনি। ধীরে ধীরে আমার আকাশের মেঘ সরে যাওয়ার কথা। তা-ও হয়নি। আমি খেয়াল করি আমার বুকের ভেতর থেকে ওজনটা একটু একটু সরে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তা আবার একটু একটু করে মনের মধ্যে জড়ো হচ্ছে। এটা বুঝতে পেরে আমি বিচলিত হই। আমার চোখ দিয়ে পানি আসে। এক দিন বুঝলাম আমার দেহে হামিদের লাশের ওজনটা নাই, কিন্তু তা আমার মনের মধ্যে পুরোপুরি গেঁথে গেছে। সে দিন আমি দরজা বন্ধ করলাম কাঁদার জন্য। যেন আমি দোজখের দরজা বন্ধ করলাম। আর সে দিন আমার জন্য বেহেশতের দরজাও বুঝি চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।

 

আট

খুন করার পর খুনির কেমন লাগে? এ প্রশ্নের সহজ কোনও উত্তর আছে কি? মানুষ যখন খুন করে তখন সে অসচেতন থাকে। এটা হল এক বিশেষ অসচেতনতা যার অর্থ অভিধানে লেখা নাই। এটা সেই অবস্থা, যে অবস্থায় মানুষের শরীর থেকে তার মন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখন সে অনুভব করতে পারে না তার একটি দেহ আছে। ধরুন সে দা দিয়ে কাউকে জবাই করছে, অথচ সে তার হাতের মুঠোয় ধরে রাখা দায়ের কাঠ অনুভব করতে পারে না। সে কিছুই স্মরণ করতে পারে না। না বাপের নাম। না মায়ের নাম। না টাকাপয়সা। না ইহকাল। না পরকাল। না তার পুংলিঙ্গ। না তার স্ত্রীলিঙ্গ। এ সময় হঠকারিতা এমন চরমে পৌঁছে যে খুনের কাজটা দ্রুত সারতে পারলে সে বর্তে যায়। অনেক খুনি জীবনে কখনওই সেই সচেতনতা আর ফিরে পায় না। তাই আমরা দেখি শতকরা আটানব্বই জন খুনি শেষ পর্যন্ত বলে যায় তার কোনও অপরাধবোধ নাই। সুযোগ পেলে সে আবার খুন করবে, অন্য কাউকে না, আগে যাকে খুন করেছে তাকেই সে আবার খুন করবে, বার বার সে খুন করবে।

.            খুনির সচেতনতা ফিরে আসে তখন, যখন তাকে তার ফাঁসির সংবাদ দেয়া হয়। তখন তার চিৎকারই জানান দেয় তার সচেতনতা ফিরে এসেছে। তখন সে কাঁদতে থাকে। এর মধ্যে যদি সে পাগল হয়ে যায়, মৃত্যুদণ্ডের খবর পাওয়ার সাথে সাথে তার পাগলামিও সেরে যায়। তখন সে বুঝতে পারে অপরাধবোধের কষ্ট।

.            আবার এমন অনন্যসাধারণ খুনিও আছে, সংখ্যায় যদিও এক লক্ষে এক জন, যে সম্পূর্ণ সচেতন অবস্থায় খুন করতে পারে। সে এমনকি আঙ্গুল দিয়ে ছুরির ধারও পরখ করতে পারে, এমনকি ফলার শীতলতাও। আর জবাইকালে যে রক্তের ফোয়ারা তার হাতে-বুকে বাড়ি দেয়, সে তার উষ্ণতাও অনুভব করতে পারে। এমন খুনি সানন্দে ফাঁসির দড়ি নিজেই নিজের গলায় পরে। ফাঁসুড়েকে কনুইয়ের গুতায় সরিয়ে দিয়ে সে নিজের সচেতন বাহাদুরি দেখায়। আর শেষ নিঃশ্বাসটাও সে সচেতনভাবে ত্যাগ করতে পারে।

.            আমি এই দুই শ্রেণি খুনির কেউ নই। খুনের তিন মাস তেইশ দিনের মাথায় আমি সচেতনতা ফিরে পাই।

.            তারপর গত দশ বছর আমি পাঁচ মন ওজনের পাপ মনের মধ্যে বয়ে বেড়াচ্ছি। শুরুতে আমি আর আমার পাগল মা অনেক পাগলের ডাক্তারের কাছে গিয়েছি। তাঁদের ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক কথা বলেছি, কারণ আমরা খুনের কথা বলতে চাইনি। আমরা বলেছি আমাদের মাথার ডান দিকে সব সময় কামড়ায় কিন্তু মগজের ডাক্তাররা আমাদের মাথায় কোনও টিউমার খুঁজে পায়নি। ডাক্তার সাহেব আমাদের বিশ্বাস করেননি, নিজেই আমাদের মাথা নতুন করে স্ক্যান করিয়েছেন, তারপর ফিল্মে কোনও টিউমার না পেয়ে তিনি বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছেন, আমরা পাগল। আমরা বলেছি আমরা এক বসায় দশ কেজি করে গরুর গোস্ত খাই কিন্তু আমাদের ওজন বাড়ে না। আমরা ঘুমের মধ্যে হাঁটি আর জাগরণে ঘুমাই। আমাদের সাথে জিন কথা বলে, ভূত কথা বলে, মাঝ রাতে আমাদের মৃত দাদা-পরদাদারা আমাদের সাথে বৈঠকে বসে। বৈঠকে নানি-দাদিরাও অংশ নেয়। কেমন এ বৈঠকগুলো? কোথায় থাকে এ সব দাদা-পরদাদারা? আমাদের এ সব প্রশ্নের উত্তরও দিতে হয়েছে। আমরা বলেছি এ বৈঠকগুলো হয় শীতকালে গ্রামের বাড়িগুলোর পেছনে মাটির যে ধূসর রং তৈরি হয় তেমন ধূসর রঙয়ের উঠানে। পূর্বপুরুষ-ও-মহিলারা ধূসর রঙয়ের কবর থেকে উঠে আসে। শীতকালের পরিষ্কার কবর, যার পাশ দিয়ে হাঁটতেও ভাল লাগে। আমরা তাদের সাথে বৈঠক করি। বৈঠকের বিষয়বস্তু? আমি বলতে চেয়েছিলাম হামিদের খুন। তা না বলে, বলেছি, বৈঠকের বিষয়বস্তু বৈঠক শেষে আমাদের আর মনে থাকে না। আমরা বলেছি আমাদের জীবনে আরও অনেক অনেক আচানক ঘটনা ঘটে চলেছে। আমরা ইউনুছ নবিকে মাছের পেটে স্বপ্নে দেখি। মুসা নবিকে দেখি তুর পাহাড়ে। আমাদের মাসে পাঁচ বার করে মাসিক হয়, আর এ ভাবে মাসে পঁচিশ দিন আমরা মাসিকের উপর থাকি, তারপরও আমাদের রক্তে লোহার কোনও ঘাটতি হয় না। এ কথা তৃতীয় বার যে ডাক্তারকে বলেছিলাম তিনি এটা গা… বলতে না বলতে নাকে ওড়না চেপে ধরেন, কথা অসম্পূর্ণ রেখে বেসিনে গিয়ে বমি করেন। তাঁর আর ডাক্তারি করা হয়নি। তিনি নিজে পাগল হয়ে গেছেন। তাঁকে পরে পাবনায় নেয়া হয়েছে। তিনি কখনও কাউকে তাঁর নাক থেকে সেই ওড়না আর সরাতে দেননি। আমরা বলেছি অমাবস্যার রাতে আমাদের মাথা আলাদা হয়ে যায়, আমরা তা হাতে নিয়ে বসে থাকি। পূর্ণিমার রাতে আমাদের হৃৎপিণ্ড বের হয়ে আসে, তাতে নীল রং লাগানো থাকে, কাপড়ে যে নীল দেয়া হয়, একদম তা। আমরা সে রং পানি দিয়ে ধূয়ে হৃৎপিণ্ড দুটির গোলাপি রং ফিরিয়ে আনি, আমাদের বুকে ব্যথা লাগে তাই আমরা খুব আস্তে করে গেলাশ থেকে আমাদের হৃৎপিণ্ডের উপর পানি ঢালি। বেশি ডলি না। কারণ আমাদের কষ্ট লাগে। ডাক্তাররা বুঝেছেন এমন পাগল তাঁরা আগে কখনও দেখেননি। আর ভবিষ্যতেও কখনও দেখবেন না। আমাদের কষ্টের তীব্রতা বোঝানোর জন্য এক ডাক্তারকে আমরা বলি, আমরা এক সমকামী যুগল। আমাদের উপর থেকে আক্রোশে-জ্বলা-জনতার সন্দেহের চোখ সরানোর জন্য আমরা মা-মেয়ের বেশে একত্রে বাস করি। আজন্ম সমকামী হওয়ার পাপবোধের দংশনে আমাদের বিশ বছর ধরে ঘুম নাই। আমাদের কথা শুনে ডাক্তার ম্যাডামের চোখ ঠিকরে বের হওয়ার অবস্থা। তিনি দাঁড়িয়ে গিয়ে গলা ঠেলে ধরে জিজ্ঞেস করেন, তা হলে কি আপনারা রাত দিন চব্বিশ ঘন্টা প্রেম করেন? তিনি এমন অস্থির হয়ে প্রশ্ন করেন, মনে হয়, আমরা ডাক্তার আর তিনি রোগী। তিনি তাঁর সহকারী আবুলকে ডেকে জানতে চান বাইরে কত রোগী অপক্ষো করছে। আবুল বাইরে গিয়ে এক মিনিট পরে ফিরে আসেন, তাঁর দুই হাতের উপর একটা খোলা রেজিস্টার শোয়ানো, আবুল বলেন, সাতষট্টি জন। ডাক্তার ম্যাডামের মুখ কালো হয়। আমরা দুই পাগল, মা আর মেয়ে, মুখ চাওয়াচওয়ি করি। আমি মনে মনে বলি, আহা তাঁর মনে কত মায়া। ডাক্তার ম্যাডাম আমাদের অনেক সময় দিলেন। পরের দিন আসতে বললেন। একেবারে বেলা এগারোটায়, বললেন, সবার আগে তিনি আমাদের দেখবেন, এমন জটিল কেস তিনি আগে কখনও দেখেননি। আমরা মা মেয়ে বললাম, আহা তাঁর মনে কত মায়া? আমরা বাসায় এসে আলাপ করলাম, এই সব মিথ্যা কথা বলে কি কোনও চিকিৎসা সম্ভব? পাগল বলল, আমি জানি না, আমিতো ডাক্তারি ভুলে গেছি। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম এভাবেই আমাদের চিকিৎসা করিয়ে যেতে হবে।

.            আমরা পরের দিন এগারোটায় ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে হাজির হই। চেম্বারের বাইরের সুবিশাল বসার জায়গায় শ’খানেক চেয়ারের প্রত্যেকটা খালি। ভেতরে কান বন্ধ করা নীরবতা। আমি পাগলের হাত শক্ত করে ধরি। পাগল ভয় পায় না। আমি ভয় পাই। আর আমার বুকটা কেমন যেন করে। মনে হল আমাদের কারণে বিখ্যাত মনোরোগবিদ ডাক্তার গুল আফরোজ বানু, এমবিবিএস (ঢামেক), ডক্টরেট ইন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি (বার্মিংহাম), ডক্টর অফ ম্যাডিসিন (শিকাগো)-কে তাঁর সব রোগী পরিত্যাগ করেছে। কারণ তিনি দুই সমকামিনী মানসিক রোগীর চিকিৎসা হাতে নিয়েছেন, যাদের নিয়ে কাজ করতে পৃথিবী প্রস্তুত নয়। আমার আরও খারাপ লাগে কারণ আমরা মিথ্যা কথা বলে গুল আফরোজ ম্যাডামের সহানুভূতি আদায় করেছি। আমরা যত খালি হল ঘর ধরে চেয়ারের সারিগুলো অতিক্রম করে এগুতে থাকি, তত আমাদের বুক কাঁপে। আমরা মা-মেয়ে ফিসফিস করে বলাবলি করি, আমরা ভুল জায়গায় এলাম না তো? গুল আফরোজ ম্যাডামের সহকারী আবুলেরতো অন্তত থাকার কথা ছিল। কিন্তু তিনিও নাই। সবই না হয় বাদ দিলাম, কিন্তু এই যে বিরানির খুশবু, রেজালার খুশবু, বোরহানির খুশবু, গোলাপজলের খুশবু, জর্দার খুশবু, এ সব? ডাক্তারখানাতো আর বিয়ে বাড়ি নয়।  আমরা আস্তে আস্তে পা ফেলি। আগাবো কি আগাবো না তা ভাবতে না ভাবতে আমরা দেখি আমাদের থেকে একশ হাত দুরে ফট করে দরজাটা খুলে যায়। গুল আফরোজ ম্যাডাম দৌড়ে বের হয়ে আসেন। কোনও মানুষের কান এত খাড়া থাকতে পারে, ভাবাই যায় না। কৃতজ্ঞতায় আমার মন গলে যায়। আফরোজ ম্যাডাম দৌড়ে এসে পাগলের হাত ধরার জন্য নিজের হাত বাড়ান। তিনি পাগলের হাত খুঁজে পাবেন না, তা আমি জানি। তাই আমি নিজেই হাত বাড়িয়ে দিই। আফরোজ ম্যাডাম আমার হাত ধরে টেনে টেনে আমাকে ভেতরে নেন। পাগল আমাদের অনুসরণ করে।

.            আমাদেরকে ভেতরে ঢুকিয়ে আফরোজ ম্যাডাম পেছনে এসে দরজা ভিড়িয়ে দেন। এক রাতের মধ্যে আফরোজ ম্যাডামের চ্যাম্বারের চেহারা বদলে ফেলা হয়েছে, মানে অতিরিক্ত আসবাবপত্র ঢুকানো হয়েছে। দুইটা বড় বড় টকটকে লাল আরামকেদারা রাখা হয়েছে। আমরা আগের দিনের ধূসর রঙের চেয়ারে বসতে গেলে আফরোজ ম্যাডাম ওই দুটি আরামকেদারার দিকে ইশারা করেন। বলেন, বিদেশে মানসিক রোগীদের এ ধরনের আরামকেদারায় আরাম করে বসানো হয় যাতে তারা আরাম পায়। তারা আরাম করে কথা বলে আর ডাক্তার তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে। বিদেশে কোনও মানসিক রোগের ডাক্তার দিনে দশ জনের বেশি রোগী দেখে না। অথচ এখানে দিনে আফরোজ ম্যাডাম একশ জন করে রোগী দেখেন। কেউ কিছু বলে না। এখানে রোজগারের কত সুযোগ। তবু কেন যে মানুষ বিদেশে যায়, আফরোজ ম্যাডাম বলেন।

.            পাগল বলে, “আমি নিজে ডাক্তার, আমাকে এত ভোজবাজি দেখানোর দরকার নাই। আমরা চেয়ারেই বসি।”

.            “অবশ্যই, ম্যাডাম,” “ডাক্তার গুল আফরোজ বানু বলেন, “আপনারা চেয়ারেই বসুন।”

.            আমরা আগের দিনের চেয়ারে বসি। ডাক্তার গুল আফরোজ তাঁর চেয়ারে বসেন। তাঁর দেহ থেকে আসা খুশবু বিয়ে বাড়ির খুশবু গিলে ফেলেছে। এখন আমরা বেহেশতের খুশবু পাচ্ছি। আমি ভাল খাবার আর সুগন্ধ ভালবাসি। আফরোজ ম্যাডামের চেম্বারের জলবায়ু আমার ভাল লাগে। কিন্তু পাগলের তা ভাল লাগে না। পাগল যেন কেমন করে। আমি পাগলের হাত চেপে ধরি। ডাক্তার গুল আফরোজ ম্যাডাম বসার আগে তাঁর সাদা অ্যাপ্রন খুলে পেছনে ছুঁড়ে মারেন। অ্যাপ্রনের নিচে তাঁর হলুদ কামিজ আর বাঁশপাতা রঙের সালোয়ার। আমরা মা মেয়ে আছাড় খাই। আফরোজ ম্যাডামের কামিজের দুই স্লিভের পরিমাণ আমার মাথার দুটি চুলের সমান।

.            ডাক্তার ম্যাডাম বলেন, “আপনারা সমকামী কি না তা পরীক্ষা করলাম। যে ভাবে আছাড় খেলেন তাতেতো সন্দেহ হল।”

.            আমি আর পাগল একে অন্যের দিকে তাকাই। পাগলের গাল শক্ত হয়ে যায়। আমি বুঝে নিই আমাকেই এই পাগল দলের নেতৃত্ব দিতে হবে। আমি বলি, “ম্যাডাম, আসলে এমন কামিজ কখনও দেখিনিতো, সে জন্য এ রকম হল। বিশ্বাস করেন, আমরা আপনাকে সত্য কথাই বলেছি। আমাদেরকে তাড়াতাড়ি বড়ির নাম লিখে দেন।”

.            “সে জন্যইতো আপনাদের একান্তে ডেকেছি,” ডাক্তার বলেন। “ভাল হত যদি আপনারা আরামকেদারায় বসতেন।”

.            পাগল দেখি উঠে গিয়ে লাল আরামকেদারায় বসে গেছে। কী আর করা?  আমি নিজে উঠে গিয়ে পাগলের পাশের লাল আরামকেদারায় গিয়ে শুয়ে পড়ি। আরামকেদারায় বেশ আরাম। আগস্ট মাসের গরমে এসির আরাম। তার উপর আরামকেদারার আরাম। আমাদের সামনে একটা কাচের টেবিল। তার উল্টা দিকে একটা মধ্যম মাপের লাল আরামকেদারা। ডাক্তার ম্যাডাম ওটাতে আরাম করে বসে কাচের টেবিলের উপর ওনার খালি পা দুটি তুলে দেন। দুই পায়ে দুটি রূপার মল। আমি পাগলের জন্য ভয় পাই। কারণ পাগল কারো খালি পা সহ্য করতে পারে না। এখন সেই পায়ের তালু আমাদের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। আশার কথা পাগলের হয়তো তেমন অসুবিধা হবে না। কারণ পা দুটি পরিষ্কার আর তুলতুলে, কিশোরীদের পায়ের মতো। আর আফরোজ ম্যাডামের পা থেকেও বেহেশতি সুগন্ধ ভেসে আসে।

     খুনির সচেতনতা ফিরে আসে তখন, যখন তাকে তার ফাঁসির সংবাদ দেয়া হয়। তখন তার চিৎকারই জানান দেয় তার সচেতনতা ফিরে এসেছে। তখন সে কাঁদতে থাকে। এর মধ্যে যদি সে পাগল হয়ে যায়, মৃত্যুদণ্ডের খবর পাওয়ার সাথে সাথে তার পাগলামিও সেরে যায়। তখন সে বুঝতে পারে অপরাধবোধের কষ্ট।

.            আফরোজ ম্যাডাম হাতে একটা খাতা নিয়ে বসেন। তিনি আমাদের ঠিকানা নেন। আলাদা করে আমাদের মোবাইল নম্বর নেন। তিনি জানাতে চান আমরা কে কখন গোসল করি, একত্রে না আলাদাভাবে, দিনে কত বার দাঁত মাজি আর কোন টুথপেস্ট আর কোন টুথব্রাশ ব্যবহার করি, কে কোন লোশন মাখি, কত দিন পর পর ক্ষৌর কর্ম করি, ক্ষৌর কর্মে কী কী পদ্ধতি অবলম্বন করি, উপরের পোশাকের নিচে ছোট ছোট যে সব পোশাক পরি সেগুলো কোন মাপের, কোন ডিজাইনের, কোন ব্র্যান্ডের, ইত্যাদি। তিনি আরও জানতে চান আমরা কেমন খাটে ঘুমাই, খাটের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ কত, উচ্চতা কেমন, কোন ম্যাট্রেস ব্যবহার করি, কেমন বালিশ, কেমন বিছানার চাদর, আর কী কী আসবাবপত্র আছে আমাদের শোয়ার ঘরে, আয়না আছে কি না, কত বড় আয়না, কয়টা আয়না, দুইটা না তিনটা। আমি সব কিছুর বর্ণনা দিই। বলি আমাদের সব কিছু আছে। খাট এত বড় যে চার জন নরনারী অনায়াসে ঠ্যাং মেলে ঘুমাতে পারবে। আয়না আছে চারটা। আমাদের উপরের পোশাক আছে একশ সেট করে, ভেতরের পোশাক আছে একেক জনের তিনশ সেট করে। দেশি বিদেশি যত বড় পোশাকের কোম্পানি, ছোট পোশাকের কোম্পানি, ঘড়ির কোম্পানি, লোশনের কোম্পানি, সুগন্ধির কোম্পানি, জুতার কোম্পানি, হারবাল কোম্পানির নাম জানি, সবগুলোর নাম বলি। আমি আরও বলি আমাদের সাথে তৃতীয় কোনও ব্যক্তি বাস করে না। আমার কথা শুনে আফরোজ ম্যাডাম কাচের টেবিল থেকে পা টেনে নামিয়ে দাঁড়িয়ে যান। বলেন, “আমার এখানে দুই কাজের মেয়ে ছাড়া আর কেউ নাই। এই ফ্লোর থেকে উপরের দিকে আরও তিনটা ফ্লোর খালি।”

.            এ ভাবে আমরা জানতে পারি পান্থপথের এই চৌদ্দ তলা আবাসিক বাড়ির এগারো তলায় এই চেম্বার। এখানে অন্য কোনও ডাক্তার বসে না। এই ফ্লোরে অন্য কোনও অফিসও নাই, কিছুই নাই। বাড়িটা ম্যাডামের  চা শিল্প মালিক পিতার। ওই পিতার এক মাত্র উত্তরাধিকার হিসাবে ম্যাডাম পুরো বাড়ির মালিক। তাঁর পিতা মারা গেছেন। লন্ডনে। এই বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে তিনিও লন্ডনে চলে যাবেন। আমরা দুশ্চিন্তায় পড়ি। ম্যাডাম বলেন, “ভয়ের কিছু নাই। আপনাদের ট্রিটমেন্ট শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি বাড়ি বিক্রিতে হাত দেব না।”

.            “আশ্বস্ত হলাম, ম্যাডাম,” আমি বলি।

.            আমি ভয়ে পাগলের দিকে তাকাই না।

.            আফরোজ ম্যাডাম আমাদের এবার মূল প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করা শুরু করেন। তিনি জানতে চান আমরা কে কার ভূমিকায় আছি। আমরা বুঝতে না পারাতে তিনি ভাবলেন আমরা ভান করেছি। খুলে বলেন, কে পুরুষের ভূমিকায় আছেন, আর কে নারীর ভূমিকায়, আফরোজ ম্যাডাম বলেন। তিনি আরও ভেঙ্গে বলেন, কে স্বামীর ভূমিকায়, কে স্ত্রীর ভূমিকায়?

.            আফরোজ ম্যাডাম তাঁর আরামকেদারায় বসে আমাদের অনেক প্রশ্ন করেন। এর মধ্যে আমি এক বার মাত্র পাগলের দিকে তাকিয়েছি। সে ঘেমে গেছে। আমিও ঘেমে গেছি। আমিই সব কথার উত্তর দিই। আফরোজ ম্যাডাম ধরিয়ে দিলেন, আমরা কে কোন ভূমিকায় আছি, এই প্রশ্নের উত্তরে আমি এক বার বলেছি, আমি পুরুষের ভূমিকায় আছি, আর দুই বার বলেছি আমি নারীর ভূমিকায় আছি। আফরোজ ম্যাডাম বলেন, এটা স্বাভাবিক, মাঝে মাঝে ভূমিকাওতো বদল হতে পারে। তিনি সবচেয়ে বেশি করে আমাদের পাপবোধের কথা শোনেন। তারপর তিনি চোখ আর নিঃশ্বাস আর মুখ এক সাথে বন্ধ করেন। আমি আর পাগল অনেকক্ষণ একে অন্যের দিকে চেয়ে থাকি। তারপর একে অন্যের হাত ধরে আফরোজ ম্যাডামের দিকে তাকাই। তখনও আফরোজ ম্যডামের চোখ, নিঃশ্বাস, মুখ বন্ধ। আমি আমার পাগল মায়ের হাত আরও জোরে চেপে ধরি যখন আফরোজ ম্যাডামের দীর্ঘশ্বাস বের হয়। আফরোজ ম্যাডাম চোখ খোলেন। তাঁর ঠোঁট কাঁপে।

.            “আমি নিজেও একই পাপবোধ নিয়ে জীবন কাটাচ্ছি,” কাঁপতে কাঁপতে আফরোজ ম্যাডাম বলেন।

.            এ কথা বলে আফরোজ ম্যাডাম দাঁড়িয়ে যান আর দ্রুত তাঁর সালোয়ার আর কামিজ খুলে ফেলেন। এরপর তাঁর দেহে তিনি ছাড়া আর কিছু নাই। আমরা আর এক বার আছাড় খেলাম। তবে তা কততম আছাড় সে কথা ভুলে গেছি। আফরোজ ম্যাডাম কেঁদে ফেলেন। ওনার চোখ থেকে বড় বড় অশ্রুর ফোঁটা পড়ে। ম্যাডামের বয়স পঁয়তাল্লিশের এদিক ওদিক হতে পারে। পেটে এক বিন্দু চর্বি নাই। রোমান দেবী মিনার্ভার নাভির মতো সুন্দর নাভি তাঁর। মাথা ছাড়া দেহের কোথাও একটা পশম নাই। সারা দেহ জলাপইয়ের ত্বকের মতো। হলুদ জলপাই রোদে পুড়লে যেমন তামাটে রং হয় তাঁর ত্বকের রঙও তেমন। তিনি অহেতুক দুই হাত তুলে তাঁর চুলের খোঁপা বানান আবার খোঁপা না বেঁধেই চুল ছেড়ে দেন। তারপর তিনি আমাদের অনেকগুলো প্রস্তাব দেন। তার মধ্যে প্রধান প্রস্তাব হল: প্রেমের পথে তিনি আমাদের সাথে যোগ দিতে চান। তিনি আমাদের বাড়ি এসে থাকতে চান। নতুবা আমরা তাঁর বাড়িতে উঠতে পারি।

.            “প্রেমের স্বর্গ গড়ে আমরা তিন জন এক সাথে আমাদের পাপবোধের মোকাবেলা করব,” তিনি বলেন।

.            আমি জানতাম পাগলের তেজ উঠে যাচ্ছে। ম্যাডামতো তথ্যের বোমা ফাটিয়েছেন। পাগল ফাটাবে মারের বোমা। পাগল অবশ্য তা করে না। পাগল শুধু আরামকেদারা ছেড়ে উঠে যায়। তাতেই আমার হাত ঠাণ্ডা হয়ে যায়। আমি পাগলকে অনুসরণ করি। আফরোজ ম্যাডাম বার বার আশ্বস্ত করতে চান, তিনি বার বার বলেন, তাঁর দ্বারা আমাদের কোনও ক্ষতি হবে না। আর তা প্রমাণ করার জন্যইতো তিনি সব খুলে ফেলেছেন। তাতেও কি আমরা ভরসা পাচ্ছি না? পাগল দরজার দিকে হাঁটা ধরে। আফরোজ ম্যাডাম পাগলের পেছনে ছোটেন, কিন্তু পাগলকে ধরার সাহস পান না।

.            “আমাকে ছেড়ে আপনারা যাবেন না,” আফরোজ ম্যাডাম বলেন।

.            পাগল আমার হাত ধরে আমাকে দরজার দিকে টানে। আমরা কোনও কথা না বলে হাঁটতে থাকি। চেম্বার থেকে বের হয়ে আমরা কয়েক কদম মাত্র সামনে যাই। এমন সময় আফরোজ ম্যাডাম আমাদের পথ আটকান।

.            তিনি বলেন, “আমার কপালটাই খারাপ।”

.            তিনি পাগলকে বলেন, “আপনি বেশি কমনীয়, তাই হয়তো আপনি স্ত্রীর ভূমিকাতেই আছেন, আবার আপনার বয়স যেহেতু বেশি, আপনি পুরুষের ভূমিকায়ও থাকতে পারেন। যে ভূমিকাতেই থাকুন না কেন, আমাকে অন্তত দুটি টোকা দিয়ে যান। এখানেই দিতে পারেন। কেউ নাই। আর কেউ আসবেও না। কত দিন, কত দিন, বুঝছেনতো?”

.            পাগল আফরোজ ম্যাডামকে ঠেলা দেয়। আফরোজ ম্যাডাম মেঝেতে পড়ে যান। আফরোজ ম্যাডাম মাথা নত করে কয়েক সেকেন্ড মেঝেতে ওই অবস্থায় বসে থাকেন। আমার মনে হল ওনার মাথা ঘুরাচ্ছে। তারপর উনি উঠে দাঁড়ান, আবার তাঁর চোখে পানি আসে। আমার মায়া লাগে। আফরোজ ম্যাডাম বলেন, “শুধু দুটি টোকা। যে কোনও এক জন দিলেই হল। আমার দুর্ভাগ্য যে সহসা বদলে যাবে, এটা ভাবা আমার ঠিক হয়নি। শুধু দুটি টোকা। প্লিজ। আপনাদের কোনও পাপ হবে না। সব পাপ আমার।”

.            আমি ম্যাডামকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি: আমাদের কারও পক্ষে টোকা দেয়া সম্ভব নয়।

.             “তা হলে মাত্র একটা টোকা,” ম্যাডাম আকুল হয়ে বলেন। তিনি বলেন, একটা টোকার বিনিময়ে তিনি আমাদের সব পাপ, সারা জীবনের পাপ, নিজের কাঁধে নিবেন। আমরা বিনা হিসাবে বেহেশতে যাব। বিনিময়ে তিনি জাহান্নামের আগুনে জ্বলবেন।

.            “আর কীভাবে আমি আপনাদের আমার কষ্টের কথা বুঝিয়ে বলতে পারি?”

.            এ কথা বলতে গিয়ে ম্যাডামের অশ্রু ঘন হয়। তিনি আমার হাত ধরে টানেন। অন্তত আমি যেন তাঁকে একটা টোকা দিয়ে যাই। একটা মাত্র টোকা।

.            একটা টোকা, একটা টোকা। আফরোজ ম্যাডাম ডুকরে ডুকরে কাঁদেন, সেই শিশুর মতো যার পিতামাতা বেঁচে নাই, বা থাকলেও যারা তাকে ফেলে রেখে অন্য জায়গায় প্রেম করতে চলে গেছে।

.            আফরোজ ম্যাডামের কষ্টে আমার বুক ফাটে। তাঁর সাথে আমাদের যা হয়ে গেল, তা তো একটা খুন কিংবা একটা বিয়ের মতোই জীবন বদলানো দুর্ঘটনা। আমরা যদি মিথ্যা না বলতাম, আমরা নিজেরা যদি সত্যি তা-ই হতাম, যা তাঁকে বলেছি, তা হলেতো তিনি শুধু টোকাই নিতেন তা নয়, আমাদেরকেও প্রাণ ভরে টোকা দিতেন। আমাদের দোষে এখন তাঁর এই অবস্থা। আর একটা টোকা যদি তাঁকে দিয়েই দিই, তাতে এমন কী হবে? পৃথিবী নামক গ্রহে এই মুহূর্তে কত জায়গায় কত জন কত জনকে টোকা দিচ্ছে, তা আমি জানি না। কিন্তু টোকাটুকিতো হচ্ছে, ভূমিকম্পও হচ্ছে, অগ্ন্যুৎপাতও হচ্ছে, আকাশে বিমান বিকল হচ্ছে, সমুদ্রে জাহাজ ডুবছে, কেউ ফুটপাতের উপর মনের সুখে ট্রাক চালাচ্ছে, কেউ বাচ্চাদের ইস্কুলে ঢুকে হ্যান্ডগানের ট্রিগার চেপে আঙ্গুলের সুখ করে নিচ্ছে, কেউ সোমালিয়ার উপকূলে মালবাহী জাহাজের ক্যাপ্টেনকে চাবুক দিয়ে পেটাচ্ছে, আর এখানে সেখানে শত শত কর্কটরোগী, কেউ একাকি, কেউ প্রিয়জনের হাত ধরে, শেষ নিঃশ্বাসতো ত্যাগ করছেই। এত কিছুর পরও পৃথিবী থেমে নেই। আর শুধু একটা টোকাতেই কি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে? আমার দৃঢ় বিশ্বাস এক টোকায় পৃথিবী ধ্বংস হবে না। সূর্য যত দিন বাঁচার তত দিনই বাঁচবে। এক দিন আগেও সে নিভবে না।

.            “একটা টোকাতেই আমার জীবন হয়তো সার্থক হয়ে যেতে পারে,” আফরোজ ম্যাডাম আমার হাত চেপে ধরে মিনতি করে বলেন। “আমার মতো নারীর জীবনে সার্থক মুহূর্ততো বেশি আসে না। তুমি নিশ্চয়ই এটা বোঝ।”

.            একটি টোকায় কারও জীবন যদি সার্থক হয়ে যায়, তা হলে সেই টোকাটি কি দেয়া উচিত নয়, আমি নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি। আমার কাজটি না হয় ধাত্রীর কাজ হল। ধাত্রীর কাজে ধাত্রীর কি আর এমন লাভ বা ক্ষতি হয়, অথচ অন্য পক্ষ তাতে মাতৃত্ব লাভ করে। আমি সিদ্ধান্ত নিই, আমি টোকা দেব।

.            “মা ওই দিকে ফিরে তাকাও,” আমি বলি। “এই দিকে তাকিয়ো না।”

.            মা দাঁতমুখ খিঁচে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। আফরোজ ম্যাডাম আমাকে টেনে তাঁর চেম্বারে ঢোকান।

.            এক টোকার কথা বলে আফরোজ ম্যাডাম দুশ টোকা নিলেন। তাঁর কণ্ঠ থেকে অনবরত গলা কাটা ছাগলের শব্দ বের হয়। আমাকে তিনি এমন ভেজানো ভেজান, আমি তাঁর চেম্বারের বাথরুম, যেটা তিনি ছাড়া আর কেউ ব্যবহার করেন না, তা ব্যবহার করে আরও ভিজে যাই।

আফরোজ ম্যাডাম আমাদের এবার মূল প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করা শুরু করেন। তিনি জানতে চান আমরা কে কার ভূমিকায় আছি। আমরা বুঝতে না পারাতে তিনি ভাবলেন আমরা ভান করেছি। খুলে বলেন, কে পুরুষের ভূমিকায় আছেন, আর কে নারীর ভূমিকায়, আফরোজ ম্যাডাম বলেন। তিনি আরও ভেঙ্গে বলেন, কে স্বামীর ভূমিকায়, কে স্ত্রীর ভূমিকায়?

.            ধুয়ে আসার পর আফরোজ ম্যাডাম আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “তোমরা কেন আমার কাছে মিথ্যা বললে, বুঝলাম না। তবু তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি একটা ভাল মেয়ে। আমার কত স্বপ্ন ছিল জানো? গতকাল তোমরা যাওয়ার পর মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেছি বলে মিথ্যা কথা বলে সব রোগীকে না দেখেই বিদায় করে দিয়েছি। তারপর থেকে প্রস্তুতি নিতে থাকি। তোমাদেরকে নিয়ে কী কী করব তার আয়োজন করি। উপরে রান্না হচ্ছে। অনেকগুলো রেশমি গাউন নতুন করে ধুয়ে ইস্ত্রি করা হয়েছে। তিন জনে পরব বলে। উপরে নাচের একটা ঘর আছে। ওটাতে নতুন কয়েকটা লাইট লাগিয়েছি। যদি এক বার গিয়ে দেখে আসতে। তবে বাইরে যিনি অপেক্ষা করে আছেন, তিনি বোধ হয় তোমাকে তা করতে দেবেন না। আশা ছিল তোমাদের দুই জনকে নিয়ে একেবারে বেহেশতের পরিবেশে বাহত্তর ঘন্টা প্রেম করব। বুঝছতো?। আমরা আমরা। নারীতে নারীতে। যেখানে লজ্জার কোনও জায়গা থাকবে না। শুধু অসংযম আর অসংযম। আমিতো গত রাতেও ঘুমাই নাই। আরও বাহাত্তর ঘন্টা কেন, প্রেম পেলে আমি পরবর্তী বাহাত্তর মাস জেগে থাকতে পারব। আমার চোখে এক বিন্দু ঘুম আসবে না। কিন্তু আমার পরিকল্পনা ছিল এক নাগাড়ে বাহাত্তার ঘন্টার। তারপর তিন জন মিলে রানের উপর রান তুলে আটচল্লিশ ঘন্টা ঘুমাব। এই ছিল পরিকল্পনা। যেই বিশাল খাট বানিয়েছি। যদি এক বার দেখতে। কিন্তু কী কপাল আমার?”

.            আফরোজ ম্যাডামের চোখ থেকে অনবরত পানি পড়ে। তিনি আমার কাছে আর একটা ছোট জিনিস চান। আমি তা দিতে পারি না। পরিবর্তে আমি তাঁকে আমার দুই গাল দিই।

.            নারী যে নারীকে এত ভালবাসতে পারে আমার তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হল। মনে হচ্ছিল না, দুই গাল নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারব। তবে উনি এত ভাল যে দাঁতের ব্যবহার করেননি।

.            আমি গাল ধোয়ার জন্য আর এক বার বাথরুমে গেলাম। ফিরে আসার সময় আফরোজ ম্যাডাম আমার দিকে যে কৃতজ্ঞতার চোখে চাইলেন, তা আমি কখনও ভুলতে পারিনি। তাঁর এত আছে অথচ তাঁর কিছুই নাই। তিনি বললেন, তোমাদের কোনও উপকার করতে পারিনি বলে খারাপ লাগছে।

.            পরে আমি যখন মেডিটেশন শুরু করি, আমি আফরোজ ম্যাডামকে মেডিটেশন করার জন্য পরামর্শ দিতে অনেক খুঁজি। আমাদেরকে প্রত্যেক ডাক্তারই মেডিটেশন করতে বলেছিলেন। আফরোজ ম্যাডামের তা অজানা থাকার কথা নয়। তবু আমি তাঁকে খুঁজেছি নিজে তাঁকে মেডিটেশনের কথা বললে শান্তি পাব এই ভেবে। আমি আফরোজ ম্যাডামকে আর পাইনি। তিনি তখন লন্ডন চলে গেছেন।

.            ফেরার পথে পাগল গাড়িতে বমি করে। কারণ আমার জামা, মুখ, বুক, হাত, চুল সব কিছু থেকে ডাক্তার গুল আফরোজ বানুর প্রগাঢ়তম সুবাস বের হতে থাকে। পাগলকে কী দোষ দেব? আমার নিজেরই অস্বস্তি লাগছিল।

.            বাসায় এসে পাগল চার কি পাঁচ ঘন্টা ধরে গোসল করে। পাগল যখন গোসলখানা থেকে বের হয় ততক্ষণে আমি নিজে গোসল করেছি, আব্বার দুপুরের খাবার তদারক করেছি। আমার ভাই রাশেদ যে অনেক আগে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে সে জন্য আমি আল্লাহ আর রাশেদ দুজনকেই মনে মনে অনেক কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি।

.            গোসলখানা থেকে বের হয়ে পাগল আমাকে আমার ঘরে নিয়ে গিয়ে মারে। আফরোজ ম্যাডামের সুবাস মুক্ত আমাকে পাগল ইচ্ছেমতো ধোলাই করে। গালে, পিঠে, বুকে, কোনও জায়গা নাই যেখানে পাগলের হাত আমাকে আঘাত করে না। আমি পাগলের মার হজম করি। কারণ আমি তার কষ্টের কথা জানি। পাগলতো আমাকে শুধু আফরোজ ম্যাডামের সুবাসের জন্য মারছে না। সে আমাকে মারছে আমাদের পরিবারের যাবতীয় দুঃখের জন্য। যার শুরু জহিরের আগমন আর শেষ হামিদের খুনের মাধ্যমে। আমি গন্ধ-পাগল হামিদের কথা স্মরণ করি, তার জন্য এক দীর্ঘশ্বাসও ফেলি। আমি পাগলকে বলি, গন্ধকে তুমি এত ঘৃণা কর কেন? আমার আর রাশেদের যখন জন্ম হয়, তখন কোন গন্ধ বের হয়েছিল?

.            এ কথা বলার পর পাগল থামে। আমি ইচ্ছে করে পাগলকে আঘাত করি।

.            সে রাতে আমি আর পাগল আর আব্বা এক সাথে খানা খাই। আব্বা জিজ্ঞেস করে, আমার গালে কী হয়েছে। আমার গাল লাল কেন? আমি বলি, কিছু হয়নি, আব্বা। হামিদের খুনের পর থেকে আমি আব্বার জীবন হতে এক রকম নির্বাসিত ছিলাম। মা পাগল হয়ে নিজেই আব্বার বিছানা ত্যাগ করেছে। তারপর থেকে লোকমান, মানে আমাদের ড্রাইভার, আব্বার ঘরে ঘুমাত। কারণ আব্বাকে ধরে বাথরুমে নিয়ে যেতে হত। লোকমান আব্বাকে ভালবাসত। আমাদের গাড়ির তেমন ব্যবহার ছিল না। লোকমানের প্রধান কাজ ছিল আব্বার দেখাশোনা করা। খাবারের টেবিল থেকে উঠে আব্বা লাঠির সাহায্যে হেঁটে নিজের ঘরে যায়। আমি আর পাগলও আব্বাকে অনুসরণ করি। আব্বার ঘরে ঢুকে দেখি লোকমান বাথরুমে আব্বার সিপাপ মেশিনের নল ধুচ্ছে। ওই মেশিন ছাড়া আব্বা ঘুমাতে পারত না। আমি খেয়াল করি, লোকমান ভাল করে সিপাপের নল ধুতে পারছে না। সিপাপ মেশিন ভাল করে ধোয়া না হলে আব্বার বিপদ হবে। ওই মেশিনের অপরিষ্কার নল থেকে আব্বার ফুসফুসে সংক্রমণ হতে পারে। আব্বার নিউমোনিয়া হলে আব্বা মরে যাবে। আমি সিপাপের নল আর মাস্ক ভাল করে ধুয়ে দিই। আমার গালে নিপীড়নের ছাপ দেখে আব্বার বুঝি দয়া হয়। আমার গলা ঘেমে যায় যখন ভাবি আফরোজ ম্যাডাম কীভাবে নেহারিতে সুখ টান দেয়ার মতো করে আমার গাল টান দিয়েছে আর কীভাবে তা চিবিয়েছে। আব্বার করুণা পাওয়াতে আমার মন আফরোজ ম্যাডামের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়।

.            আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে লোকমানকে আব্বার ঘর থেকে স্থানান্তর করা হয়। পাগল আক্লিমাকে দিয়ে লোকমানের সিঙ্গেল খাটটায় নতুন বিছানা করে দেয়। সে রাতে আমি নিজে আব্বার নাকে সিপাপ মেশিনের মাস্ক পরাই। লোকমান চলে যায় নিচতলায়, সেখানে একটা খালি ঘর আছে, ম্যানেজার মাজহারের ঘরের পাশে। আমি আব্বার জন্য মশারি টাঙাই। লোকমানের খাটে না শুয়ে আমি আব্বার খাটে শুই। আমার গভীর ঘুম হয়। অনুভব করি আব্বার একটা হাত আমার মাথার উপর। যত তা অনুভব করি তত গভীর ঘুমাই। পাঁচ কি ছয় দিন পর আমি লোকমানের খাটে শুতে গেলে আব্বা নাক থেকে সিপাপের মাস্কটা দুই হাত দিয়ে একটুখানি খুলে ধরে জিজ্ঞেস করে, এর কারণ কি ? আমি বলি, আপনি কিছু বোঝেন না? আপনি নামাজ পড়েন। আব্বা বলে, তুমিতো নামাজ পড়ো না। এ কথা বলে আব্বা আবার সিপাপের মাস্কটা নাকে স্থাপন করে। আব্বার কণ্ঠের তীক্ষ্ণতা আমি অবহেলা করতে পারি না। আমি গিয়ে আব্বাকে জড়িয়ে ধরি। আর তাতে এমন সুখ পাই মনে হল শৈশবে চলে গেলাম। মন চাইল লোকটার বুকের উপর গিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরে শুই, তারপর ঘুমাই, যেমন করে শৈশবে ঘুমাতাম। কিন্তু ওই লোকের তখন আর সেই শক্তি ছিল না। তার বুকের উপর যদি আমার হাতও রাখতাম তাও তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হত। তারপরও সে রাতে তার বুকে ঘুমিয়েছি। গভীর ঘুম। এক মুহূর্তের জন্য তার একটা হাত আমার মাথা থেকে সরেনি। আর সেই সুখে সে রাতে আমি একের পর এক আসমানে উঠে গেছি। এ ভাবে সপ্তম আসমানে উঠেছি। এত সুখ পেয়েছি মনে হয়েছে ঘুমের মধ্যে আমি সিদরাতুল মুনতাহার চারিদিকে ভেসে বেড়াচ্ছি। এর পর আব্বার মৃত্যু পর্যন্ত একটা রাত যায়নি যে রাতে আব্বার একটা হাত আমার চুলের উপর ছিল না। আব্বা হাসপাতালে মারা যায়। রাত একটা ছয় মিনিটে। আব্বার বাম হাত ছিল আমার চুলের উপর। তবে আব্বা আমার ক্ষমা না পেয়েই মৃত্যু বরণ করেছে। সে কথা এখন থাক।

.            হামিদের খুন দিয়ে যাওয়া রোগের জন্য ডাক্তার গুল আফরোজ বানুর ঘটনার পর আমি আর কোনও ডাক্তারের কাছে যাইনি। পাগলের অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। ফলে পাগলকে আরও অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি। আমি আগের ডাক্তারদের দেয়া বিভিন্ন বড়ি খেতে থাকি। পাগলও নতুন নতুন ডাক্তারের দেয়া বড়ি খেতে থাকে। বড়িতে আমার কী উপকার হয়েছে, তা আমি জানি না। পাগলের কোনও উপকার হয়নি।

.            এ-সব নয়-দশ বছর আগের কথা। এর পর আমি বড়ি ছেড়েছি। কিন্তু হাল ছাড়িনি। হাল না ছেড়ে আমি খুনের পাপবোধকে আমার জীবনের অংশ করে নেয়ার সংগ্রামে লিপ্ত থাকি। অনেক বার মনে হয়েছে তৃতীয় কোনও ব্যক্তিকে মন খুলে কথাটা বললে শরীর কিছুটা হালকা হবে। তার জন্য আমি রোদালিকাকে বেছে নিলাম। ভাবলাম ওকে খুনের ঘটনাটা বলব। অনেক বছর ধরে রোদালিকার সাথে আমার পরিচয়। আমাদের মধ্যে আস্থার সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল। দু’এক দিনের মধ্যে রোদালিকাকে বলব, এমন সিদ্ধান্ত আমার চূড়ান্ত ছিল।

.            আজ সেই সুযোগ নষ্ট হয়ে গেল। আগামী দিনগুলোতে আমার কী হবে কে জানে। আগামী দিনগুলোতে রোদালিকার জীবন আবর্তিত হবে মুক্তি ক্লিনিক ঘিরে। রোদালিকা যদি আরও পনেরো বছর ঋতুবতী থাকতে পারে, তবে সে পঁয়তাল্লিশ কি চুয়াল্লিশ বার মুক্তি ক্লিনিকে যাবে। মুক্তি ক্লিনিকে রোদালিকা ক্ষণিকের জন্য মুক্তি পাবে। আবার ভারী হবে। আবার মুক্তি ক্লিনিকে গিয়ে মুক্ত হবে। মুক্তি ক্লিনিক রোদালিকাকে মুক্তি দেয়। মুক্তি ক্লিনিক আমাকে ধ্বংস করেছে। আমাকে খুনি বানিয়ে ছেড়েছে।

.            জানি না, আমার মুক্তি আসবে কীভাবে?

 

ওসিডি‘র প্রকাশিত পর্বগুলো পড়ুন—
ওসিডি (পর্ব-০১)
ওসিডি (পর্ব-০২)
ওসিডি (পর্ব-০৩)
ওসিডি (পর্ব-০৪)
ওসিডি (পর্ব-০৫)
ওসিডি (পর্ব-০৬)
ওসিডি (পর্ব-০৭)

আরো পড়তে পারেন

ওসিডি (পর্ব-১০)

পড়ুন— ওসিডি (পর্ব-০৯) উনিশ আমরা সিঁড়ি বেয়ে বারন্দাতে নামি। ড্যাব করে একটা আওয়াজ হয়। একটা ফুলের টব উল্টে গেছে। প্লাস্টিকের হালকা টব। মাটি আছে ওটার ভেতরে। সোনিয়া বসে গাছটার গোড়া ধরে ওটাকে টেনে তোলে। বারান্দার ছাদের বাইরের দিকের দুই কোনায় দুটি বাল্ব আছে। তাদের ঢাকনাগুলি বেশ পুরনো আর ওদের ওপর অনেক ধুলাও জমেছে। আবছা আলো।….

ওসিডি (পর্ব-০৯)

পড়ুন— ওসিডি (পর্ব-০৮) এরপর আমার আসল পরীক্ষা শুরু হয়। পাগল এক বালতি পানি আর একটা নতুন তোয়ালে নিয়ে এসে দরজার সামনে বসে যায়। পাগল পানিতে তোয়ালে ভিজিয়ে ফ্লোর মোছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে দরজার সামনে আর যাওয়ার উপায় থাকে না। প্রথম ঝগড়াটা হয় আমার চপ্পল-জোড়া নিয়ে। আমার চপ্পল পাগলের মোছা ফ্লোর ময়লা করে। সেই চপ্পল যেই….

ওসিডি (পর্ব-০৮)

পড়ুন— ওসিডি (পর্ব-০৭) আঠারো শপাত! শপাত! .            কীইইই? আমি লাফ দিয়ে উঠি। সত্যিই কি চেয়ারম্যান স্যারের পিঠে জুতার বাড়ি? আমি এতক্ষণে চিত হয়ে পড়ে যেতাম, যদি আমি এক যুগ আগের শিশিরকণা হতাম। সেই পতনে আমার মাথা ফাটত। কিন্তু আমি এক যুগ আগের শিশিরকণা নই। শপাত! শপাত! চেয়ারম্যান স্যারের পিঠে আবার জুতার….

error: Content is protected !!