Author Picture

লুব্ধক মাহবুবের একগুচ্ছ কবিতা

লুব্ধক মাহবুব

বাবার সোনার কলম

বাবার কবরের পাশে,
মাঝে ও ঠিক ওপরে
কি রঙিন ফুলের সমাহার!
মা’র কবরে রঙিন
পাতা বাহার।
বোন ও চুনিদার কবরে
শান্ত সমাহিত
ঘাস ফুল গুল্ম রাজি
হারিয়ে গেছিলাম
কোথায়
কে জানে?

স্কুল শেষ করে
ভাল কলেজে
ওঠার পুরস্কার,
বাবার সেই
সোনার নিবের
পার্কার পেন।
আহা!
কি সে অনুভূতি!

আজ, বেগম পাড়ার
বাবারা
তাঁদের উঠতি বয়সের
ছেলেকে
কিনে দেন লাম্বারগিনির
সর্বশেষ ভার্সন।
তাতে আমার কি?
আমার যে ছিল,
বাবার দেয়া সেই
সোনার নিবের
পার্কার কলম।
সে যে আমার
হাজার লাম্বারগিনী!

যত্ন করে তুলে রাখতাম
সেই সোনার কলমটি
বুক পকেটে ক্লিপে আটকে।
পড়াশোনার
পাহাড়গুলো
টপকাতে থাকি
কত চড়াই উৎড়াই।
কিন্তু, স্বযত্নে রাখা বাবার
সোনার কলমটি
সেঁটেই থাকতো,
পকেটে
বা দেরাজে।

কাজের জীবনেও
মাঝে মাঝে বুক পকেটে
শোভা পেতো, বাবার সেই
সোনার নিবের কলম।

গাড়ি হল,
পরিবারের জন্য
মোটর সাইকেল হল
অফিসে যাবার।
কোন ফাঁকে পকেট থেকে
বাবার সোনার নিবের কলমটি
হারিয়ে গেল। টের পাইনি।
শুধু অন্তরের এক
হৃদয় নিংড়ানো হাহাকার
জল হয়ে চোখের দুগোড়ায়
জড়ো হচ্ছিল সমান্তরালে।
কাল সেই ফুলেল
কবর থেকে
বাবা যেন বলে উঠলেন
বাবা, সোনার নিবটা
আছে তো?

 

ছায়ারাশি

একটা গোলাপের সাথে
আর কিছুই করতে পারো না
তার বাহুযুগল সারস পাখির
পায়ের মতো।
লাল ছড়ি,
এবং আমি আমার হাঁটু গেড়ে
নেকড়ের মতো গর্জন করছি
তোমার ছোঁয়া এটো সোঁদা
গন্ধের মাঝে।
সাদা চাঁদের মতো।
গন্ধবিলাসে।

তার চুল ভ্রমরের পাখা,
সে সহ্য করে
সূর্যকলঙ্কের বটিকা
তুমি যখন তার বুকের
পাশ দিয়ে যাবে,
গোলাপে রূপান্তরিত
তার হৃদয় থেকে
গন্ধ পাবে।

তুমি যদি খাও
হলুদ খাবার
সূর্য তোমাকে ছায়া দেবে;
তুমি যদি কিছুই না খাও
দিনের কোনো রঙই
থাকবে না।
তোমাকে দিয়েছে এক
স্বর্গীয় ঘুম
এবং হয়তো তুমি
স্বপ্নেরও স্বপ্নে।
এবং কখনও ঘুমোওনি।

আমি বলছি
এটা দুঃখ নয়
শুধুমাত্র এক
প্রচণ্ড শক্তিমান,
জন্মদাতার সঙ্গে
আলিঙ্গন
সুডৌল গালে
একটি কণ্টক,
যখন সে তোমাকে
চুম্বন করে।

হয়তো অন্ধকারেই
তুমি ভালো
হয়তো নীরবতা
মানে শান্তি
হয়তো শব্দাবলি
ও ছায়ারাশি
আঁধারে রক্ষিত।

আগামীকাল
মেঘেরা তোমায়
সাহচর্য দেবে;
দুঃখ বোঝে না
তার বিশ্বাস
দুর্ভিক্ষই পুষ্টি
অভাবই স্বাস্থ্য
তৃষ্ণাই পানীয়।
তার শরীর যেন চলন্ত
ছড়ির চতুর্পাশ্বে
দ্রাক্ষালতা।
তুমি ভাল, হয়তো
অন্ধকারেই তুমি ভাল!

 

মেঘের নেমে যাওয়া

দেখেছো?
সারারাত কালো নদীটায়
তার স্রোতে ভেসে যাওয়া?
দেখেছো ভোরবেলা?
রূপালি বাতাসে তার জেগে ওঠা?

বাহুতে যতটুকু ধরে
তা ভর্তি সাদা ফুল,
তার পাখার বাঁধনে ঝুঁকে
পড়তেই মহা তুলকালাম
রেশম আর লিনেনের মাঝে;
পাহাড়ের খাঁদ, তীর ঘিরে
কুরিঞ্চি ফুল,
কালো ঠোঁট দিয়ে
বাতাস কামড়ে ধরে?

তুমি কি শুনেছিলে?
বাঁশি আর শিসের মতো শব্দ?
কালো অন্ধকারের তীক্ষ্ণ গান—
গাছের গায়ে প্রবল
বৃষ্টির মতো সে সুর—
অন্ধকার কিনারায় ঝরনার
মতো তার ধারালো নেমে যাওয়া?

আর তুমি কি দেখেছো?
অবশেষে?
মেঘের
তীক্ষ্ণ গান—

 

মরা কবি

যদি কখনো
সাধ জাগে কবিতায় ডুবে মরবার
শেষ রাতের ফুরফুরে বাতাস
আর ফুলের গন্ধ
গায়ে মেখে এক্টুখানি
কান পেতো
কবিতার জলোচ্ছ্বাস
তোমাকে ভাসিয়ে নেবে।

অবিরাম, যেনো রক্তের ছিটে,
যেমন ক্ষুধার্ত মানুষ,
ভালোবাসার মতো,
যেমন শিশু, মৃত্যুর মতো,
অনিঃশেষ বৃষ্টি।
তোমার চোখদুটো
আমাকে নিয়ে চলে
বৃষ্টি-বিহারে
সাগর উজিয়ে বিদ্যুৎরেখা
কুড়িয়ে বেড়ায়

তারপর বাতিল সময়
প্রশ্ন করে—কে তুমি?
আমি এক মহাকায়,
শতশত বছরকে আলিঙ্গনে
বেঁধে আমি ফিরে এসেছি
আর মঞ্জুর করেছি পুনরুত্থান।
আমিই সুদূর অতীতের স্রষ্টা
মনোহর আশার চনমনে
আঁচ নিয়ে ফিরেছি
তাকে গোর দেব বলে।

যদি কখনো
তোমাদের পৃথিবীর—
মধ্যরাতের এই ডুবে যাওয়া
চাঁদের ফিকে আলোয়
মনে পড়ে কোন কবির কথা
অপেক্ষায় থেকো শেষ রাতের।

 

নিস্তব্ধ রাত্রি!

আমি ঘুমুতে পারিনা
সহস্রাব্দের নিষ্ঠুরতা
আমাকে অনুক্ষণ,
ক্ষত-বিক্ষত করে;
আমি ঘুমুতে পারি না।
আমার দুটো শ্রান্ত আঁখি
তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে,
মুহূর্তেই বীভৎস স্বপ্ন
দেখে আঁতকে উঠি;
আমি ঘুমুতে পারিনে…

তোমাকে কাছে পেয়েও
যখন কৈশোরের
থেকে এই পরিণত বয়সে।
ভালবাসি বল,
তুমি বল অভিমানে,
অহেতুক কান্ত নি:শ্বাসে।

মানুষ তো আমি!
কে বলবে এই কথা মিথ্যে?
জেগে জেগে কত যে স্বপ্ন
দেখি প্রতিদিন!
দেখি আর ভেঙে যায়,
ভেঙে যায় আবার শুরু করি।
স্বপ্নের এই ভাঙা-গড়াতেই
দিন চলে যায়;
আমি ঘুমুতে পারি না।

তুমি কেমন আছ
জানতে ইচ্ছে করে,
দু’চোখ ভরে তোমায়
শুধু দেখতে ইচ্ছে করে।
তোমার বুকে মুখ লুকিয়ে
থাকতে ইচ্ছে করে,
পরাণ ভরে তোমার কথা
শুনতে ইচ্ছে করে।
তোমার মুখে সুখের হাসি
দেখতে ইচ্ছে করে,
তোমার কোলে মাথা রেখে
সারা জীবন বাঁচতে
ইচ্ছে করে।
তবে!

আজ জীবনটির
ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে!
এক উন্মাতাল হৃদয়ের
শুব্দ শুনি শুধু।
ধুক ধুক! ধুক ধুক।
ভালবাসার ব্যবচ্ছেদে
হৃদয়ের তরঙ্গ
বুদবুদ হয়ে উড়ে যায়
শুধু ঐ সাঁঝ বেলার
আকাশের দিগন্ত রেখায়।
তাই ঘুম ও ঐ রেখাতেই
গিয়ে আছড়ে পড়ে।
ঘুম নেই, প্রেমহীন
এই নিঃসাড় পৃথিবীতে।
আজও, তাই আমি
ঘুমুতেই পারি না যে।

আরো পড়তে পারেন

আরণ্যক শামছ-এর একগুচ্ছ কবিতা

প্রান্তিক কবি আমি এক নির্জনে পড়ে থাকা প্রান্তিক কবি। যেন সমাজতাত্ত্বিক সীমারেখার শেষপ্রান্তে ঝুলে থাকা এক পরিত্যাক্ত পলিথিন ব্যাগ। এখানে লুকিয়ে রেখেছি ক্ষুধা, দারিদ্র্য, ভগ্নস্বাস্থ্য, অসাম্য, অশিক্ষা ও মানুষের ছলাকলার ইতিহাস। আমি গাণিতিক ধারণার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনস্তিত্বের অপ্রয়োজনীয় সংযুক্তি। তবে জিপসিদের মত আমিও দাঙ্গা বাঁধিয়ে দিতে পারি। আমিও মাটির ঘ্রাণ থেকে জেনে নিতে….

আজাদুর রহমানের একগুচ্ছ কবিতা

সবুজ স্তন প্রচুর নেশা হলে দেখবেন— গাছগুলো বৃষ্টি, পাতার বদলে বব চুল, কী ফর্সা! তার বাহু, উরু ব্যাঞ্জনা, জলভারে নুয়ে আছে সবুজ স্তন। নেশা এমনই এক সদগুন যে, মাঝরাতে উড়ে উঠবে রাস্তাগুলো আকাশে মুখ দিয়ে আপনি বলছেন— আমাদের একটা পৃথিবী ছিল, ঠিক চাঁদের মত গোল। চুর পরিমাণ নেশা হলে, আপনার পা থেকে অহংকারী পাথর খসে….

গাজী গিয়াস উদ্দিনের একগুচ্ছ কবিতা

ক্লান্তির গল্প যারা উপনীত সন্ধ্যে বেলায় ফিরে দেখো দিন মলিন স্বপ্ন – ধূসর জীবন, প্রখর রোদের শায়ক ক্রীড়া প্রাচুর্যে আত্মহারা ছিলে স্বাধীন একদিন, পশ্চিম বেলা চেয়ে চেয়ে আজ শেষ করো ক্লান্তির গল্প।   ছড়ানো বিদ্রুপ সাপের চুমোতে কোথা বিষ হিংস্র নিশ্বাসে তোমার গরল বিশ্বাসে আমাকে পাবে জিয়ল সরল। রুক্ষতা ছেঁটে ফেল – চেহারা কমনীয় সব….

error: Content is protected !!