Author Picture

ওসিডি (পর্ব-০২)

হারুন আল রশিদ

পড়ুন— ওসিডি (পর্ব-০১)

চার

হামিদের ভূত এমন সময়ে এল যখন আমি ভূতে না করি বিশ্বাস, না পাই ভয়। অথচ হামিদকে খুন করার পর আমি ভূতের ভয়ই পাচ্ছিলাম।

বিপর্যয়ের প্রথম ধাক্কা কাটতে আমার এগারো দিন সময় লেগেছিল। ওই এগারো দিন আমি বার বার আশঙ্কা করছিলাম এই বুঝি হামিদ ভূত হয়ে আমার সামনে হাজির হবে। রাতে আমার সামনে হাত-পা ছুঁড়বে, আমার গলা চেপে ধরবে, কিংবা দিন-দুপুরে আমাকে পেছন থেকে তাড়া করবে। অথবা যে জিনিসটাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম, হামিদের অনিয়ন্ত্রিত কামনার রোগ, তাতে ভর করে হামিদের ভূত আমাকে জাপটে ধরবে।

না, হামিদ তখন ভূত হয়ে আসেনি। এমনকি আরও যে সব জিনিস ভয় পেতাম যথা সাপ, ব্যাঙ, তেলাপোকা, টিকটিকি, তাদের বেশেও সে এল না।

হামিদ এল ভার হয়ে। এগারো দিন পর আমি টের পেলাম হামিদের লাশ কুন্ডলীকৃত হয়ে আমার হৃৎপিন্ডে ঢুকে গেছে। আমার মা, যে খুনের পর ওসিডির হাতে আত্মসমর্পণ করে, আমাকে বলেছিল, আমার উচ্চতা তখন তিন ইঞ্চি কমে গিয়েছিল। আমার মতো শক্ত-সবল একটা মেয়ের মেরুদন্ড তিন ইঞ্চি সঙ্কুচিত করতে হলে আমার মাথার উপর তখন কমপক্ষে পাঁচ মন ওজন চাপাতে হত। খুনের এগারো দিন পর আমি টের পাই আমার বুকের ভেতর পাঁচ মন ওজনের লাশের ভার গুটিয়ে আছে। তবু ভাগ্য ভাল বলতে হবে। কারণ লাশটা আমার জরায়ুও বেছে নিতে পারত। কিন্তু তা তো আমি সহ্য করতাম না।

পরিস্থিতি আরও অচেনা লাগে যখন আমার পৃথিবী গুমোট হতে থাকে। একদা আমি বুঝতে পারি কেন হামিদের লাশ বিষক্রিয়া ছড়াল না। কারণ আমি তখন মরতে প্রস্তুত ছিলাম না। আমি প্রস্তুত ছিলাম কষ্ট সহ্য করার জন্য

দুটি ঘটনা এখানে প্রাসঙ্গিক। কোনটা কখন ঘটল তা সাথে সাথে বলতে পারিনি। আমার তখন সময়ের আন্দাজ ছিল না। তবে এখন কিছুটা ধারণা করতে পারি। প্রথম ঘটনাটা সকালের দিকে ঘটেছিল। সেটা সম্ভবত ছিল খুনের ত্রয়োদশ দিন। আমরা তখন গুলশানে থাকি। একটা সরকারি বাড়িতে। আব্বা তখন রাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র সচিব। আব্বার জন্য বরাদ্দকৃত বাড়িটার পেছনে একটা বড় আম গাছ ছিল। এর আগের বছর জুন মাসে ওটা থেকে পাঁচ মন ল্যাংড়া আম পাড়া হয়েছিল, যার অর্ধেক খেয়েছিল আমার ছোট ভাই রাশেদ। হামিদের লাশের ভার বুকে নিয়ে আমি জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছি। দেখি আম গাছের ডাল থেকে একটা মরা কাঠবিড়ালি পৃথিবীতে পড়ে থ্যাতলে যায়। সবুজ শেওলার আবরণযুক্ত কালো শানের উপর। খুনের পর সেই প্রথম আমি খেয়াল করি আমি কোথায় আছি, আমার সামনে কী ঘটল। আমি পচা প্রাণির গন্ধ পাই, যার থেকে চিরতা ভেজানো পানির রঙের তরল চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই ফাঁকে আতঙ্কটা আমার মাথা চেপে ধরে। আমি ভাবি কী হবে যদি আমার বুকের ভেতর হামিদের লাশ গলতে থাকে? চিরতা রঙের লাশের তরল আমার দেহের সব দিকে ছড়িয়ে যাবে। সিরিঞ্জ দিয়ে বের করলে দেখা যাবে আমার দেহে রক্ত নেই, আছে লাশের তরল। কংকালের হাড়গুলি আমার বুকের ভেতর থেকে খোঁচা দেবে। আমি সংক্রমণ আর বিষক্রিয়ায় মরে যাব। এমন এক মরণ যার কারণ কোনও ডাক্তার পরীক্ষা করে বের করতে পারবে না।

আমাকে বিষক্রিয়ার আতঙ্ক পেয়ে বসে। আমার সময় কাটতে চায় না। এক মিনিটকে এক বছর মনে হয়। খুন করেছি বলে আব্বা বা মা কেউ আমার কাছে আসত না। যদিও পেছন থেকে আমার জন্য সব কিছু করে যেত। আমারও মন খুলে সব কথা কাউকে বলার মতো অভিরুচি ছিল না। আমি খুনের শাস্তি একাকি ভোগ করতে চেয়েছিলাম। যেহেতু থানা-পুলিশ হয়নি, তাই আব্বা আর মা নিজেকে অনেক বেশি অপরাধী মনে করত। শত্রুতা করেছিল শুধু আমার ভাই রাশেদ। তখন আমি যতই অপেক্ষা করি হামিদের লাশ পচার জন্য, ততই মনে হয় হামিদের লাশ দিন দিন তাগড়া হচ্ছে। তার ভার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি আরও অচেনা লাগে যখন আমার পৃথিবী গুমোট হতে থাকে। একদা আমি বুঝতে পারি কেন হামিদের লাশ বিষক্রিয়া ছড়াল না। কারণ আমি তখন মরতে প্রস্তুত ছিলাম না। আমি প্রস্তুত ছিলাম কষ্ট সহ্য করার জন্য।

আসল কষ্টটা আসে দ্বিতীয় ঘটনার পর। একটা বজ্রপাত। মে মাসের কোনও এক দিন হবে। সন্ধ্যা নেমে গেছে। এমন গরমে সবাই ঘামে। আমি ঘামি দশগুণ; আমার দেহে হামিদের লাশ বহনের শ্রম। জানালার রড ধরে দাঁড়িয়েছিলাম। বজ্রের শব্দে আমি কেঁপে উঠি। শুধু আমি কেন? সারা শহর কাঁপে। আমাদের ইটের বাড়ি ধাক্কা খায়। তখন সচেতনতা আমার কাছে ক্ষণিকের জন্য ধরা দেয়।

আমার ধোঁয়ার ভয় শুরু হয়। আমি ভাবি হামিদ আমার ভেতর অলস বসে আছে। সিগারেট খাওয়া ছাড়া তো ওর আর কোনও কাজ নাই। হামিদ জানে আমি সিগারেটের ধোঁয়াকে কত ভয় পাই। আমি বুঝি হামিদ কেন ভূত হল না। আমার মধ্যে ধোঁয়ার ত্রাস সৃষ্টির জন্য ভূত না হয়ে সে আমার ভেতর আস্তানা গেড়েছে। আমি বজ্রের মুন্ডুপাত করি, মুন্ডুপাত করি সচেতনতার। আমি তখন জানতাম না সচেতনতাতেই মানুষের মুক্তি। জানতাম না বলে ধোঁয়ার ত্রাস আমাকে কাঁপিয়ে দেয়, অথচ তখন আমার জন্য কাঁপা কঠিন ছিল, কাঁপলে হামিদের লাশ আমাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে ফেলে। ধোঁয়ার ভয়ে আমি কেঁদে ফেলি।

 

পাঁচ

জীবিত হামিদ একটানা সিগারেট খেতে পারত। এক বার আমাকে শাস্তি দেয়ার জন্য সে চব্বিশ ঘন্টায় দু’শ একচল্লিশটা সিগারেট খেয়েছিল। ওটা ছিল শনিবার। হামিদ ওর ব্যক্তিগত সহকারি মাকসুদকে দিয়ে সিগারেটের বাটগুলি আমার সামনে গুনিয়েছে। লাল টি-শার্ট পরা ঝাঁকড়া চুলের মাকসুদ দাঁত কেলিয়ে নাচতে নাচতে বড় একটা অ্যালুমিনিয়ামের ট্রে নিয়ে আসে। ট্রে-টা ঘরের মেঝেতে রেখে মাকসুদ ঝুল বারান্দা, বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, সিঁড়ি, গ্যারেজ, গাড়ি, খাটের তলা, দেয়ালের কানা, টেবিলের পিঠ, চেয়ারের গোড়ালি, জানালার ধার, আলমারির চিপা, জুতার তলা আর তেরোটা ছাইদানি থেকে সিগারেটের গোড়া সংগ্রহ করে আর সেগুলিকে এক জায়গায় রাখে। মাকসুদ বাথরুমে ঢোকে। মনে হল সে তার পোঁদের ফুটোয় আটকে থাকা কিছু সিগারেটের গোড়া বের করতে গেছে। মাকসুদ অবশ্য কয়েকটা সিগারেটের গোড়া হাতে করে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর সংগৃহীত বস্তুর সামনে বসে গুনে গুনে দশটা করে সিগারেট বাটের একটা স্তুপ সে ট্রের মধ্যে রাখে। কোনও কোনও সিগারেট হামিদ এতটাই টেনেছে যে, ওগুলোর গোড়ার চেয়ে আমাদের মতো শক্তসমর্থ মেয়েদের জাগ্রত বোঁটা বেশি লম্বা হয়। মাকসুদ মাথা ঘুরিয়ে ওগুলি দুই আঙ্গুলের চিপায় চুনুট পাকিয়ে আমাকে দেখায়। কোনও কোনও স্তুপের বাটগুলি মাকসুদ দ্বিতীয় বার গোনে। নীল জিন্সে আবৃত মাকসুদের চিমসানো পাছা থেকে ক্ষমতার আলো ঝরে। আমি যে তার মনিবের স্ত্রী, মাকসুদ সে কথা ভুলে গেছে। স্তুপগুলোর সামনে বসে মাকসুদ মাথা তুলে আমার দিকে চায়। আমি ওর চৌদ্দ কি ষোলোটা দাঁত দেখি। দেখি ওদের রং: ঝিনুকের বুকের মতো, মাদার অফ পার্ল। ধোঁয়ার দাগ পড়া দাঁত।

“এতগুলান, এতগুলান,” মাকসুদ বলে। “স্যার আমারে কিছু দিবার পারত।”

হামিদ এসে তার ডান হাঁটু দিয়ে মাকসুদের পিঠে ঠেলা দেয়। মাকসুদ তিড়িং করে লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। “ও কি তোমার সাথে বেয়াদবি করেছে?” হামিদ আমাকে জিজ্ঞেস করে।
আমি বলি, “না।”

হামিদ আমাকে বিশ্বাস করে না। হামিদ এক কদম পিছিয়ে গিয়ে মাকসুদের দুই গালে ঠাস ঠাস দুইটা থাপ্পড় মারে। মাকসুদের গাল লাল হয়ে যায়। হামিদ মাকসুদকে আর একটা থাপ্পড় মারে। মাকসুদের ডান চোখ থেকে বড় এক ফোঁটা জল লাফ দিয়ে বের হয়ে ওর থুতনিতে বাড়ি খায়। হামিদ ঠেলে মাকসুদকে ঘর থেকে বের করে দেয়। আমি হামিদের এই আন্তরিকতা কখনও ভুলিনি। আর ভুলতে পারিনি মাকসুদের কালো পরিষ্কার থুতনিতে ঝুলে থাকা ওই বিশাল অশ্রুর ফোঁটা।

মাকসুদের জায়গায় হামিদ বসে। মাকসুদের মতো গোড়ালির উপর ভর করে নয়। পাছার উপর আরাম করে। বিয়ারের মেদে ভারী হামিদের ডবকা পাছা। নাদুসনুদুস মেয়েদের মতো। হামিদ ট্রে-টা কোলের উপর টেনে নেয় আর আমাকে স্তুপগুলো গুনে দেখায়: চব্বিশটা স্তুপ। তেইশটা স্তুপের প্রতিটাতে দশটা করে সিগারেটের গোড়া। আর চব্বিশ নম্বর স্তুপে এগারোটা।

হামিদ ভেবেছিল ওই ঘটনার পর সিগারেটের ধোঁয়া সহ্য করতে আর অসুবিধা হবে না আমার। ও জানত জলাতঙ্ক রোগীর এক মাত্র চিকিৎসা হল হাত-পা বেঁধে তাকে পুকুরের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলা। হামিদ আমাকে তার জ্ঞানমতো চিকিৎসা দেয়। তাতে আমার সিগারেটের ধোঁয়ার ভয় আরও বেড়ে যায়।

রক্ত প্রবাহ দেখে বুঝতে পারি আমার চারিদিকে কী হচ্ছে। আমি বৃষ্টির শব্দ শুনি। আমার হাতের উপর বৃষ্টির ফোঁটার ছিটা পড়ে। আমি তার শীতলতা অনুভব করি। আষাঢ় মাসের প্রথম দিনের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আমার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। আহা! যদি আমি খুন না করতাম!

হামিদের লাশ আমার সামনে থেকেই তুলে নেয়া হয়েছিল। অ্যাম্বুলেন্সের মানুষগুলি। হলুদ অ্যাপ্রন পরা। ডাক্তারের গায়ে অ্যাপ্রন ছিল না। ডাক্তার এসেছিল পাজামা আর পাঞ্জাবি পরে, বোধ হয় সরাসরি বাসা থেকে গিয়ে সে অ্যাম্বুলেন্সে উঠেছিল। আমি সবই দেখেছি। অথচ হামিদের মৃত্যুর সতেরো দিন পর আমার মনে হল, ওর লাশ ঘরেই পড়ে ছিল। আর কোনও এক কেরামতিতে তা আমার ভিতর ঢুকে গেছে। তা না হলে ওর ভার কেন আমার ভেতরে? গার্মেন্টস ব্যবসায় ব্যস্ত জীবিত হামিদ নানান কাজকর্ম সেরেও যদি ঘন্টায় দশটা সিগারেট খেতে পারত, তবে মৃত এবং কর্মহীন হামিদ আমার ভেতরে বসে ঘন্টায় কয়টা সিগারেট টেনে চলেছে? আমি ধোঁয়া সহ্য করতে পারতাম না বলে হামিদ যদি দিনে দুশ একচল্লিশটা সিগারেট টেনে আমাকে সাজা দিতে পারে, ওকে মেরে ফেলার সাজা হিসাবে ও এখন দিনে কয়টা সিগারেটের ধোঁয়া আমার নাভির কাছে ছেড়ে চলেছে। হামিদের যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। মালবোরো ছেড়ে নিশ্চয় এখন ও রেঙ্গুনী বিড়ি ধরেছে, যাতে আরও কটু ধোঁয়া ছাড়তে পারে।

যত ভাবি তত শিউরে উঠি আমি। হঠাৎ হঠাৎ গায়ে এমন কাঁটা দেয় যে, জীবনে প্রথম লক্ষ করি আমার কব্জিতেও পশম আছে। আমি গর্ব করতাম আমার শরীরের কোনও অপ্রয়োজনীয় জায়গায় কোনও পশম নাই। আমাকে কখনও উরুর উপর ব্লেড চালাতে হয়নি। ধোঁয়ার আতঙ্কে আমার ভুল ভাঙ্গে। রোমহর্ষ আমাকে অদৃশ্য জিনিস দেখিয়ে দেয়। আমার খিঁচুনি আরও বাড়ে যখন আমি আমার হাত আর পায়ের দিকে তাকাই। দেখি সব আঙ্গুলের মাথা থেকে ধোঁয়া বের হয়। সবচেয়ে বেশি বের হয় নাভি দিয়ে। আমি পাজামার ভেতর থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখি। সামনে থেকে। পেছন থেকে। নিকোটিন, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, ফর্মালডিহাইড, সীসা, আর্সেনিক, অ্যামোনিয়া, বেনজিন, কার্বনমনোক্সাইড। মুখ দিয়ে কেন নয়, আমি ভাবি। মনে হয় মৃত হামিদ ভারী ধোঁয়া ছাড়ে। যা এত ভারী যে উপরের দিকে উঠতে পারে না।

তত দিনে কাগজে কলমে আমি রসায়ণবিদ হয়ে গেছি। বিরতিহীনভাবে ধোঁয়ার উপাদানগুলির কথা ভাবি। এতগুলি রাসায়নিক পদার্থকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য আমি কী শরবত পান করতে পারি? হামিদ বেঁচে থাকতে ধোঁয়ার গন্ধ কমানোর জন্য ঘরের মধ্যে ভিনিগার আর লেবুর রস ছিটাতাম। আমি যখন আমার ভেতর থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখি তখন আমাদের অন্যতম গৃহপরিচারিকা আক্লিমা আমার পাশে ছিল। আমি আক্লিমাকে জিজ্ঞেস করি সে ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছে কি না। আক্লিমা বলে, না, সে কোনও ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছে না। আমি আক্লিমাকে গালি দিই। আক্লিমা বলে সে ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছে। আমি আক্লিমাকে বলি আমার জন্য ভিনিগার আর লেবু দিয়ে শরবত বানিয়ে আনতে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আক্লিমা গেলাশে করে শরবত নিয়ে আসে। আমি তার এক ঢোক গিলতে না গিলতে বমি করে ফেলি।

ধীরে ধীরে আমি ধোঁয়ার শাস্তি হজম করি। না করে আমার কোনও উপায় ছিল না। আমি জেদ ধরেছিলাম। দেখি কত সাজা আমি হজম করতে পারি। নিজেকে বার বার বলি, নিষ্পাপ হামিদকে খুন করে এটুকু শাস্তিতো তোকে পেতেই হবে। আর ধোঁয়াটা যে আমার মনের রোগ ছিল তাতো বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে লাশের ভারটাও কি মনের রোগ ছিল? এ বিষয়ে আমি বিহ্বল ছিলাম। কারণ ওজনটা আমি অনুভব করতাম। মাঝে মাঝে আমি আমার পা দুটি পরীক্ষা করতাম। দেখতাম ওগুলো বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত শিশুদের পায়ের মতো বাঁকা হয়ে গেছে। তারপরও মনে সন্দেহ থাকত। এক দিন পাজামার দড়ি খুলে দিই, খালি পা দেখার জন্য। কে বলেছে আমার দেহে চুল নাই। আসলে গোসল নাই। পরিচর্যা নাই। আর আমিতো পা দেখতে চেয়েছিলাম। দেখি, আমি ভুল করিনি। সন্দেহ থাকে না যে, মৃত হামিদের ভারে কিছু দিনের মধ্যে আমার পা দু’টি একটা বৃত্তের রূপ নিবে। আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না পায়ের কাছে লুটানো পাজাম তুলে আবার তা কোমরে বাঁধা। আমি আক্লিমাকে ডাকি।

লাশের ভার আমার নড়নচড়ন পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। ছাব্বিশ দিন দাঁড়িয়ে ছিলাম। ওই সময় এক মুহূর্ত বসতেও পারিনি, কখনও বিছানায়ও যাইনি। প্রাত্যহিক সব কাজ দাঁড়িয়ে সেরেছি। সব কাজ মানে সব কাজ। প্রথম চার দিন জাউ খেয়েছি। বাকি বাইশ দিন ডাবের পানি। জানালার রড ধরে দাঁড়িয়ে থেকে ঘুমিয়েছি। ঘুম মানে ঝিম মেরে থাকা। মাঝে মাঝে শার্সিতে মাথা ঠুকে যেত। চার বার কপাল কেটে রক্ত বের হয়েছে।

এত কষ্টের মধ্যেও যখন মাসিক হয় তখন আনন্দ আর ধরে রাখতে পারিনি। রক্ত দেখে যে সুখ পেলাম তা বলে বোঝাতে পারব না। আক্লিমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলাম। জীবনে কখনও এমন সুখ আগে অনুভব করিনি। সুখের সাথে আসে সচেতনতা। রক্ত প্রবাহ দেখে বুঝতে পারি আমার চারিদিকে কী হচ্ছে। আমি বৃষ্টির শব্দ শুনি। আমার হাতের উপর বৃষ্টির ফোঁটার ছিটা পড়ে। আমি তার শীতলতা অনুভব করি। আষাঢ় মাসের প্রথম দিনের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আমার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে।

আহা! যদি আমি খুন না করতাম!

 

ওসিডি‘র প্রকাশিত পর্বগুলো পড়ুন—
ওসিডি (পর্ব-০১)
ওসিডি (পর্ব-০২)
ওসিডি (পর্ব-০৩)
ওসিডি (পর্ব-০৪)
ওসিডি (পর্ব-০৫)
ওসিডি (পর্ব-০৬)
ওসিডি (পর্ব-০৭)

আরো পড়তে পারেন

ওসিডি (পর্ব-১০)

পড়ুন— ওসিডি (পর্ব-০৯) উনিশ আমরা সিঁড়ি বেয়ে বারন্দাতে নামি। ড্যাব করে একটা আওয়াজ হয়। একটা ফুলের টব উল্টে গেছে। প্লাস্টিকের হালকা টব। মাটি আছে ওটার ভেতরে। সোনিয়া বসে গাছটার গোড়া ধরে ওটাকে টেনে তোলে। বারান্দার ছাদের বাইরের দিকের দুই কোনায় দুটি বাল্ব আছে। তাদের ঢাকনাগুলি বেশ পুরনো আর ওদের ওপর অনেক ধুলাও জমেছে। আবছা আলো।….

ওসিডি (পর্ব-০৯)

পড়ুন— ওসিডি (পর্ব-০৮) এরপর আমার আসল পরীক্ষা শুরু হয়। পাগল এক বালতি পানি আর একটা নতুন তোয়ালে নিয়ে এসে দরজার সামনে বসে যায়। পাগল পানিতে তোয়ালে ভিজিয়ে ফ্লোর মোছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে দরজার সামনে আর যাওয়ার উপায় থাকে না। প্রথম ঝগড়াটা হয় আমার চপ্পল-জোড়া নিয়ে। আমার চপ্পল পাগলের মোছা ফ্লোর ময়লা করে। সেই চপ্পল যেই….

ওসিডি (পর্ব-০৮)

পড়ুন— ওসিডি (পর্ব-০৭) আঠারো শপাত! শপাত! .            কীইইই? আমি লাফ দিয়ে উঠি। সত্যিই কি চেয়ারম্যান স্যারের পিঠে জুতার বাড়ি? আমি এতক্ষণে চিত হয়ে পড়ে যেতাম, যদি আমি এক যুগ আগের শিশিরকণা হতাম। সেই পতনে আমার মাথা ফাটত। কিন্তু আমি এক যুগ আগের শিশিরকণা নই। শপাত! শপাত! চেয়ারম্যান স্যারের পিঠে আবার জুতার….

error: Content is protected !!