Author Picture

ওসিডি (পর্ব-০১)

হারুন আল রশিদ

ওসিডি (obsessive-compulsive disorder) একটা মানসিক অবস্থা। এ অবস্থায় মানুষ চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। চিন্তা মানে দুশ্চিন্তা। ওসিডি তীব্র হলে মানুষ কোনও কাজ বার বার করে, উদ্বেগ থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য। যেমন বারবার গোসল করা। ধারণা করা হয় শতকরা ৯৪ ভাগ মানুষের এ ব্যাধি আছে। তবে সবার ব্যাধি সমান নয়। সাধারণত শতকরা ৪ জন মানুষের ওসিডির জন্য ডাক্তারের চিকিৎসা লাগে, এবং তাদের জীবনও অনেক কষ্টের।

এইসব স্বাস্থ্যবিষয়ক পরিসংখ্যান, যা কমবেশ হতে পারে, এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু নয়। এই উপন্যাসে ওসিডি আক্রান্ত্র কুশীলবরা আছেন। আবার মোটা দাগে এই উপন্যাসে ওসিডি হল সমাজের উপমা। পৃথিবীতে সামাজিক ব্যাধিসমূহের বহু রূপ থাকলেও এর মূলে রয়েছে গুটিকতক কারণ, যার বর্ণনা সরাসরি শোনার জন্য পৃথিবীব্যাপী জনসাধারণ এখনও প্রস্তুত নয়, যদিও যুক্তিশীল মানুষ প্রস্তুত। আবার পৃথিবীতে যুক্তিশীল মানুষের সংখ্যা এর মোট জনসংখ্যার তুলনায় নগণ্য। আর সে জন্য কথাগুলো শিল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করা।

ওসিডি নামক মূল ধারার উপন্যাসটি সামাজিক ব্যাধিসমূহের মূল কারণগুলোর একটি নিয়ে কাজ করে, যদিও এতে বাকি কারণগুলোও ঘুরে ফিরে আসে। সৃজন উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছে। চরিত্র-নির্ভর এই উপন্যাস উত্তম পুরুষে লেখা। শিশিরকণা এই গল্পের হিরো।

আমাদের বিশ্বাস পাঠক শিশিরকণার জীবন-পথের ভ্রমণের এই অংশের সাথী হবেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে সৃজন থেকে ওসিডি বই আকারে প্রকাশিত হবে। তত দিনে পাঠক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, আপনার বইয়ের তাকে ওঠার যোগ্যতা ওসিডি উপন্যাসের আছে কিনা।


 

হামিদের ভূত আমার পিঠে কিল দেয়। এক একটা কিল আমাকে সামনে ঠেলে দেয়। আমার পিঠ দুইস্তর নরম পোশাকে আবৃত। ভূতের হাত বুঝি লোহালক্কড়ের তৈরি। অবশ্য তাতে জোর নাই, আছে শুধু অধ্যবসায়।
“যা, ঘাতককে দেখে আয়,” হামিদের ভূত বলে।
আমার পিঠ শক্ত হয়। হৃৎপিণ্ডে ইস্পাতের ঘষা লাগে।
হামিদের ভূত আমার শক্ত পিঠে কিল দেয়। আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে পা ফেলি। আমার পায়ের গুল দুটি হাড্ডির ওপর বাড়ি খায়। আমার নরম ত্বকের সুযোগ নিয়ে ওরা জোরে জোরে লাফায়।
হামিদের ভূতের কিল খেতে খেতে আমি গোসলখানায় ঢুকি।
আমার হুঁশ আসে। আমি ঘুরে দাঁড়াই। ভূতের মুখোমুখি। ধরে রাখা নিঃশ্বাস ছেড়ে আমি নিঃশ্বাস গ্রহণ করি। আমি আমাকে একবার অনুভব করি। অনুভব করি আমার নারীর গঠন।
আমার শক্ত হওয়া পাঁজর শিথিল হয়। দরজার হাতল ধরে আমি নিজেকে প্রস্তুত করি।
“মনে আছে তোর?” আমি চেঁচিয়ে উঠি। “সাড়ে দশ ঘন্টা। মনে আছে তোর শখের বিরামঘড়ি। সুইচ টিপে তুই ঘোষণা দিয়েছিলি: দশ ঘন্টা চৌত্রিশ মিনিট বাইশ সেকেন্ড। এক ঢোক তুই গিলেছিস এক ঢোক আমাকে গিলিয়েছিস। তোর গোল্ডেন কালার। মনে আছে কয় বোতল শেষ করেছিস? ভেতর বার। ভেতর বার। তুই শাদ্দাদ হতে চেয়েছিলি। মনে আছে?”
ভূতের মুখের কালো চামড়ায় লাল আভার উদয় হয়। তার মোটা মোটা ঠোঁট নীল রঙে ছেয়ে যায়। হামিদের ভূত পেট চেপে ধরে। যেন বিষ তার অন্ত্রে কামড় দিয়েছে।
“মনে আছে তোর?” আমি আর্তনাদ করে বলি। “সাড়ে দশ ঘন্টা। মনে আছে?”

আমার রাগে দরজা কাঁপে। “সাহস থাকলে আয়,” আমি বলি। মাথা তুলে আমি আমার ঠোঁট দুটো মেলে ধরি। পাতা ওপরের দিকে টেনে চতুর্দিকে প্রসারিত করে দুই চোখ হামিদের ভূতকে দেখাই। আর মাথাটা সামনে এগিয়ে দিই।
“আয়। কাছে আয়।”
হামিদের ভূত এক কদম পিছিয়ে যায়।
“এটাই যদি তোর দ্রোহের কারণ তা হলে তুই আমাকে ধোঁয়ার জন্য মারলি কেন?” হামিদের ভূত বলে।
“কী বললি তুই? আর কীভাবে তুই সেটা জানলি?”
“মৃত্যুর পর সব জানা যায়।”
“কী জেনেছিস তুই?”
“তুই আমাকে ধোঁয়ার জন্য মেরেছিস। তুই আমাকে অতি নীচ মরণ দিয়েছিস।”
“তুই কী আশা করেছিলি?”
“পৌরুষের দর্প।”
“সে কি তোর ছিল?”
“না, ছিল না।” হামিদের ভূত মাথা নিচু করে। “আর আমি কী করে তোর তেজের কথা জানব? তুই আমাকে কিছু বললি না। অথচ তুই আমাকে এমন নিচু মরণ দিলি।”
“অন্যায় করেছি,” আমি বলি। “আয় কাছে আয়।”
হামিদের ভূত আরও দুই কদম পিছিয়ে যায়।
বেচারা। একবার মরেছে। দ্বিতীয় বার মরে সে নিশ্চিহ্ন হতে চায় না। সে নিজেকে শাদ্দাদের প্রতিযোগী হিসাবে ঘোষণা দিয়েছিল। পৃথিবীতে সে বেহেশত তৈরি করতে চেয়েছিল। এখন সে আমার রক্ত পান করারও সাহস পায় না। তারপরও তার চোখে জিঘাংসার আগুন জ্বলে।
“যা খুনিকে দেখে আয়,” হামিদের ভূত বলে।
“তাতে তোর কোনও লাভ হবে না,” আমি বলি। “আমি কার প্রতিনিধি তা তোর জানা নাই। থাকলে তুই আমার পথে আসতি না।”
“তখন জানিনি। এখন জানি।”
“কী জানিস তুই?”
“তার আগে বল তুই আমাকে কিছু জানতে দিলি না কেন?”
জীবিত হামিদের সাথে কথা বলায় কোনও আনন্দ ছিল না। মৃত হামিদের সাথে কথা বলা যায়। জীবিত হামিদ ক্ষমাশীল ছিল। মৃত হামিদ ক্ষমাহীন।
“কেন আমাকে তুই কিছু জানতে দিলি না?” হামিদের ভূত বলে।
“আলসেমি,” আমি বলি। “তোর আঙুলে সুর ওঠেনি।”
“এ কথা কি তোর জঙ্ঘায় লেখা ছিল?”
লজ্জায় আমার গাল গরম হয়। আমি তা অগ্রাহ্য করি।
“অবশ্যই ছিল,” আমি বলি। “তোর পড়ার ক্ষমতা ছিল না। যদিও পৃথিবীতে তুই এ ছাড়া আর কোনও দিকে তাকাসনি।”
“অবশ্যই তাকিয়েছি।”
“সিগারেটের বাট?” আমি বলি।
“আর সেলাইয়ের দাগ,” হামিদের ভূত স্মরণ করিয়ে দেয়।

বেচারা। একবার মরেছে। দ্বিতীয় বার মরে সে নিশ্চিহ্ন হতে চায় না। সে নিজেকে শাদ্দাদের প্রতিযোগী হিসাবে ঘোষণা দিয়েছিল। পৃথিবীতে সে বেহেশত তৈরি করতে চেয়েছিল। এখন সে আমার রক্ত পান করারও সাহস পায় না। তারপরও তার চোখে জিঘাংসার আগুন জ্বলে

হামিদ ছিল ওর বাপের গড়ে তোলা গার্মেন্টস সাম্রাজ্যের অধিপতি। ওর সরবরাহ করা শার্ট আর প্যান্টের কোনও জায়গা থেকে এক ইঞ্চি বা আধা ইঞ্চি সেলাইয়ের সুতা কখনও বের হতো না। তরী’স গার্মেন্টস কারখানাসমূহের এক বিজ্ঞাপনে এই কারখানাগুলোতে তৈরি পোশাকের সেলাইয়ের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি ভুল প্রমাণ করার জন্য পৃথিবীর সব গার্মেন্টস কারখানাকে আহ্বান জানানো হয়েছিল। হামিদের এই চ্যালেঞ্জ কেউ মোকাবেলা করেনি। ফল হয় এই যে, স্পেনের আড়তদার ইন্ডিটেক্স হামিদের কাপড়ের অর্ডার পাঁচ গুণ করেছিল। হামিদ ছিল দক্ষ ব্যবসায়ী
“তুই অনেক জেনেছিস!”, আমি হামিদের ভূতকে বলি।
“জেনে কী লাভ হলো? আমি কি আর ফিরে আসতে পারব?’
“না, পারবি না।”
হামিদ আর হামিদের ভূত। একজন আছে একজন নাই। এই দুইয়ের পার্থক্য আমার দেহের ভেতর মোচড় খায়। আর তাতে আমার দুই হাতের আঙুল বাঁকা হয়ে দুই তালুর ওপর আছাড় খেয়ে পড়ে। যা খুনিকে দেখে আয়, এ কথা আমি নিজেকে অনেকবার বলেছি, কিন্তু নিজে বললে তার এমন প্রতিক্রিয়া অনুভব করি না। অন্য কোনও মানুষ আমাকে এ কথা বললেও এমন প্রতিক্রিয়া হতো না।
‘যা খুনিকে দেখে আয়,” হামিদের ভূত বলে।
আমি সজোরে দরজা বন্ধ করি।
আমি বুক ভরে শ্বাস নিই। যাক্। আপাতত এটুকু করা গেল। হামিদের ভূত বাথরুমে ঢুকতে পারেনি। আমার কানে তার আওয়াজ আসে যদিও। সে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে হাসে।
“তুই বাইরে দাঁড়িয়ে আনন্দ কর,” আমি উচ্চৈঃস্বরে বলি। “তুই ভেতরে এলে আমার জ্বালা বাড়ত। তোর ক্ষমতা সীমিত যদিও। তোর একটাই শক্তি: অমরত্ব। বিরক্ত করা ছাড়া তোর আর কী করার আছে? অন্য ভূতেরা শত্রুর রক্ত খায়। তোর ভাগ্যে তা-ও নাই।”
হামিদের ভূতের হাসি থামে। কিন্তু আমার সমস্যার সমাধান হয় না।

 

দুই

আয়নার ভেতর থেকে খুনির চোখজোড়া আমার দিকে তাকায়। পাপ-খোদাই-করা ভারী চোখ। আমি পাগলের বুক দুমড়ানো দীর্ঘশ্বাস শুনি। আমার বুক কাঁপে। হাঁটু কাঁপে। রানের ওপর রান চেপে আমি ওদের স্থির রাখার চেষ্টা করি। আবার শোঁ করে আমার কানে পাগলের দীর্ঘশ্বাস ঢোকে। আমার সারাদেহ কেঁপে ওঠে।
জানি না এই আতঙ্ক আমাকে কত দূর নিয়ে যাবে। মৃত হামিদ কখনও আমার পিছু ছাড়েনি। আবার এমন ভূত হয়েও আগে কখনও সে সামনে আসেনি। পাগলের সাথে মারামারি করে আমি অনেক দুর্বল হয়ে গেলাম। তাই ভূত এই সাহস পেল।
আমার দুই উরু তপ্ত মোমের থামের মতো নরম হয়ে পড়েছে। কিংবা কাঁটা গলে যাওয়া সিদ্ধ ইলিশ মাছের মতো। আমি ওদের ওপর মনোযোগ বিদ্ধ করি। স্পর্শের তরঙ্গও একপা থেকে আর এক পায়ে প্রবাহিত হচ্ছে না। আমি নিঃশ্বাস নিই। নিঃশ্বাসের শব্দ বন্ধ হলে পাগলের দীর্ঘশ্বাস কানে বাজে। আমি দুই হাত দিয়ে বেসিনটা আঁকড়ে ধরি। আহারে পাগল। আপনাআপনি একটা নিঃশ্বাস আমার দেহে ঢুকতে থাকে, যেন সারা দেহ তার শক্তি একত্র করে নাক দিয়ে একটা রেলগাড়ি টেনে ভেতরে ঢোকাচ্ছে। তারপর আমার দেহ নিঃশ্বাসটা ছেড়ে দেয়।
আমি কিছু আরাম পাই।

আমি এমন এক সময়ে পাগলকে আঘাত দিলাম যখন আমি মা-মেয়ের ভালবাসা আবিষ্কার করেছি। আমার সামনের আয়নাটা ঝাপসা দেখায়। আমি বাম বাহু তুলে বাম চোখ মুছি। তারপর ডান বাহু দিয়ে ডান চোখ মুছি। আয়নাটা পরিষ্কার হয়। আয়না আবার ঝাপসা হয়। হোক। এবার আর কান্না আটকানোর চেষ্টা করি না। বেসিনটা শক্ত করে ধরি আর চোখ থেকে পানি পড়তে দিই। চোখ ধুয়ে যায়। আয়না আবার স্বচ্ছ হয়। আমি অশ্রুর তাপ অনুভব করি না। রক্ত থেকে আসা আগুন ভেতর বাহির দুইদিক থেকে আমার গাল দুটিতে আক্রমণ চালাতে থাকে।
আমি নিঃশ্বাস নিই। আর অশ্রুর আড়ালের খুনিকে দেখি। মাথা নিচু করে আমি খুনির হাত-জোড়া দেখি। আগুন আমার দুহাতে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক কষ্টে ডান হাত টেনে এনে পানির কলের মাথায় রাখি। আঙুলে জোর আনি মনের জোর দিয়ে। আমি পানির কল ছাড়ি। ঠান্ডা পানি বের হয়ে আসে।

প্রাণ বের হয়ে যাওয়ার আগে হামিদ একটা ঝাঁকুনি দিয়েছিল। সেই ঝাঁকুনি আমাকে আছাড় মারে। আমার আর মুখে পানি দেয়া হয় না। বুকের ভেতর থেকে যন্ত্রণার তীরগুলি ছুটে এসে মেরুদণ্ড হয়ে মাথার দিকে ছুটতে থাকে। আমি মনের চোখে তাদের দেখি। ভাল করে। জুম ইন। জুম আউট। জুম ইন।
প্রতিটা তীরের আগা তীক্ষ্ণ। তাদের গোড়া থেকে করুণার বিষ ঝরে। পতনশীল উল্কার মতো তীরগুলি আমার মগজের দিকে ছুটে আসে। আতঙ্কে আমার চোখ দুটি আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়। চেষ্টা করি যেন আমি সেই মুহূর্তটা সচেতন থাকতে পারি যে মুহূর্তে ওরা আমার মস্তিষ্কে আঘাত হানবে।

আমি সচেতন থাকি। তীরগুলি আঘাত হানে। ওরা আমার মগজে নিচের দিক থেকে আক্রমণ করে, কেউ এক ইঞ্চি কেউ তিন ইঞ্চি পর্যন্ত গেঁথে যায়। আমি বিদ্ধ হওয়ার যন্ত্রণা অনুভব করি। আমার ঘাড়ের কশেরুকাগুলি ফুলে ওঠে। কপালের হাড়ে টান লাগে। প্রবৃত্তির শক্তিতে বন্দি জীবন যাপনের ফল। আমি নিঃশ্বাস ছাড়ি। তীরের ক্ষতের ব্যথা দেহের মধ্যে শুষে নিতে চাই। আমি চোখ খুলি কাজটা আরও ভালভাবে করার জন্য। শত শত স্মৃতির তীর আমার মগজে গাঁথা হয়ে গেছে। ওরা আমার মস্তিষ্ক থেকে ঝুলছে, যেন এক খণ্ড সাদা মেঘে গেঁথে থাকা শত শত কালো বর্শা।
প্রকৃতির নিয়ম। যা কিছু উত্থিত হয়, তা-ই পতিত হয়। হামিদের ধ্বজের মতো। আমি মাথা ঝাড়ি। এক একটা তীর ঝরতে থাকে। যদিও ক্ষত দ্বিগুণ করে দিয়ে যায়। শেষ তীর খুলে পড়া পর্যন্ত আমি তাদের ঝেড়ে যাই।

আমার চোখ পড়ে আমার তর্জনি দুটির ওপর। আপন পাপের শক্তিতে সোজা হয়ে তারা আমার চোখের দিকে উঠে আসে। তারা হামিদের নাকে ঢুকে গিয়েছিল। মানুষের নাক যে এত গভীর তা এভাবে আমাকে আবিষ্কার করতে হল। আমি যা আশঙ্কা করেছিলাম তা হামিদের নাকের ভেতর ছিল না। না চুল, না অন্য কিছু। পৃথিবীতে এমন পরিষ্কার নাক বুঝি দ্বিতীয়টি ছিল না। সেই নাকে ধোঁয়া। যার থেকে এক সময় শত মাইল বেগে দৌড়ে পালিয়েছি।

এখন আমার আঙুলের ডগা থেকে সেই ধোঁয়া বের হয়, হামিদের নাক দিয়ে বের হওয়া ধোঁয়া। ধোঁয়া আমার নাকে প্রবেশ করে।
ধোঁয়ার স্মৃতি অসহনীয়। আমি সাবধান হই। আমার দেহে ম্যালেরিয়া রোগীর কাঁপন ওঠে। বোধ হয় আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না। মাথাটা একটা চক্কর দেয়।
আমি চেষ্টা করি সোজা থাকার। যেই ভাবি সেই কাজ। দুই হাতের তালু দেয়ালে চেপে ধরি। পায়ের আঙুলগুলিকে মেঝেতে ঠেসে ধরি। নিঃশ্বাস নিয়ে নিয়ে দেহের মধ্যে শক্তি ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করি। পা দুটিকে বলি, শক্ত হ। দেহের শক্তি পায়ে জড়ো করি। নিজেকে জিজ্ঞাসা করি, কী নাম তোর? উত্তর আসে, শিশিরকণা।
মনে রাখিস, আমি বলি।

প্রাণ বের হয়ে যাওয়ার আগে হামিদ একটা ঝাঁকুনি দিয়েছিল। সেই ঝাঁকুনি আমাকে আছাড় মারে। আমার আর মুখে পানি দেয়া হয় না। বুকের ভেতর থেকে যন্ত্রণার তীরগুলি ছুটে এসে মেরুদ- হয়ে মাথার দিকে ছুটতে থাকে। আমি মনের চোখে তাদের দেখি। ভাল করে। জুম ইন। জুম আউট। জুম ইন

তিন

আমি সোজা হয়ে দাঁড়াই। সাবানের বোতলের ঢাকনায় চাপ মারি। সাবান বের হয়ে হাতের তালু ভরে যায়। তালু থেকে উপচে গিয়ে বেসিনেও সাবান পড়ে। খোলা কলের নিচে। পানির ছিটার সাথে বাড়ি খেয়ে কিছু সাবান আমার জামায় লাগে। আমি ডলে ডলে হাত ধুই। দুই তর্জনি এক করে পানির নিচে ধরি। ফিস্টার কোম্পানির সেরা কল। প্রবল জলবেগ। যত ধুই, তত যেন ওই দুই আঙুলের মাথা থেকে ধোঁয়ার উদ্গীরণ বেড়ে চলে।
এবার কী শুরু হবে আমি জানি। বুকের ধুকধুকানি। আমি তা গ্রহণ করি। আমি আমার মস্তিষ্ককে বলি, এত সাবান দিলাম, এত পানি দিলাম, তারপরতো আঙুল অপরিষ্কার থাকার আর কোনও কারণ নাই। শরীরের ভেতরের পথঘাট কীভাবে পরিষ্কার হয় তা আমার জানা আছে। আমি এই পরিমাণ পানি পান করি যাতে আমি সব সময় জলের রঙের পানি বিয়োগ করি। হামিদের বিয়োগকৃত পানি ছিল সোনালি, হামিদের পানীয়ের রঙের রং। সেই থেকে আমার পানির রঙের পানি বিয়োগের খেয়াল মাথায় চাপে। আমি পরিষ্কার আছি, মগজ, আমি বলি। খেয়াল আসে: শুধু মগজইতো মন নয়। আমি, আমার দেহ, আমার মগজ, সব কিছুর সমষ্টি আমার মন। আমি মনকে বলি, মন, তুই যুক্তি মানবি না, আমিও তোকে প্রশ্ন করা বন্ধ করব না। আমি আমার দেহকে বলি, মনের কাছে তোকে বিজয়ী ঘোষণা করতে হবে। মন তোর। তুই মনের হয়ে যাসনে। মনের কাছে তোর পরাজিত হওয়া চলবে না। পাগলের মতো হওয়া যাবে না। কিছুতেই না। ওসিডি। তোর তেজ কমানোর জন্য আমি ক্ষণে ক্ষণে হামিদের মতো উত্থিত হব। খেঁচার তুফান তুলে তোর পতন ঘটাব। দেখি তুই কতবার আসতে পারিস। আর আমি কতবার সচেতন হতে পারি।

আমি পানির নিচ থেকে হাত দুটি সরিয়ে আনি। অনুধাবন করি, আমি এখনও ক্ষমা করিনি। প্রকৃতি থেকেও কিছু শিখিনি। শিখলে মেনে নিতাম প্রাণিজগতে মা-সন্তানের মধ্যে ছাড়া বিরাজমান সকল বন্ধন অনিশ্চিত। পাগলকে এমন এক সময় কষ্ট দিলাম যখন আমার এই অনুভব এল। নাকি কষ্ট দেয়ার ফলে তা বুঝলাম?
আমি কেন ক্ষমা করলাম না? ক্ষমা করা চর্চার বিষয়। আমি তা করিনি। ক্ষমা অনেক উপকারী, আমি এটা শিখেছি, যেমন ইস্কুলের বাচ্চারা শেখে মঙ্গল গ্রহের ব্যাসার্ধ কত। ক্ষমার চর্চা কি সহজ? কাঙ্ক্ষিত জীবন যাপন কি সহজ? ক্ষমা করার প্রতিজ্ঞা নিয়েই আমি নতুন জীবন শুরু করেছিলাম। আমি তা করতে পারিনি।
না পারার কারণ আছে। আমার মাথা আমার কাঁধে নাই। এখন যেটা আছে সেটা আর মানুষের মাথা নয়। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে হাসপাতালে গিয়ে স্ক্যান করিয়ে ফিল্মের মধ্যে নিজের মস্তিষ্কটার গঠন নতুন করে দেখে নিই। একদিন হয়তো মস্তিষ্কের ছবি না দেখে স্বয়ং মস্তিষ্কটাকেই দেখতে চাইব। তুলনা করতে চাইব একজন সচেতন মানুষের মস্তিষ্কের সাথে। কোথায় কোথায় আমার মস্তিষ্কে খাদ আছে আমি তা দেখতে চাইব। কারণ আমি তা মেরামত করে পরিপূর্ণভাবে সচেতন মানুষের মস্তিষ্কে রূপান্তর করতে চাই। জ্ঞানের বইগুলো বলে এটা করা সম্ভব। তবে তার জন্য আমার আর একটা পতন দরকার। এমন পতন যেখানে এক মুহূর্তও আত্মবিস্মৃতির সুযোগ থাকবে না। সিসিফাস এক মুহূর্তও আত্মবিস্মৃত হয় না। তারপরও পাথরটা তাকে একবার করে মাড়ায়, যখন সে চূড়ার কাছে পৌঁছে। আত্মবিস্মৃত হলে পাথরটা তাকে পর্বতের ওই ঢালু পথে হাজার বার মাড়াত।

শিশিরকণা, আমি নিজেকে বলি। হয় ধোঁয়াকে মেনে নাও। না হয় ধোঁয়া পরিষ্কার কর। মাঝামাঝি থাকিস না। সিদ্ধান্ত নে। সিদ্ধান্ত।
চোখ বন্ধ করে আমি মনের চোখে সিসিফাসকে দেখি। দেখি দীর্ঘ পথ ধরে বিশালদেহী সিসিফাস পাথরটাকে ওপরের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক ওপরে পৌঁছে গেছে সে। সিসিফাসকে এখন অনেক ছোট দেখাচ্ছে। পাথরটা নিজেই একটা ছোটোখাটো পাহাড়ের সমান। সিসিফাস তা ঠেলে চলেছে। আপন গতিতে। আপন ছন্দে। কঠিন তার মনোযোগ। দৃঢ় তার পথ চলা। সিসিফাস গান গাইছে। মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে। আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের দৃষ্টিতে সিসিফাস সাজা খাটছে। সিসিফাসের দৃষ্টিতে সে কর্তব্য পালন করছে। সানন্দে। সে গলা ছেড়ে গায়। স্তব্ধ সর্ব কোলাহল, শান্তিমগ্ন চরাচর। এক তুমি, তোমা-মাঝে আমি একা নির্ভয়ে।

আমি সিসিফাসের সবল পায়ের দিকে তাকাই। আর সচেতনতা দিয়ে নিজের পায়ে আমার মনোযোগ দিই। অনুভব করি আমার পা থেকে মোমের তারল্য চলে যাওয়া। পায়ে রক্ত চলাচল শুরু হয়েছে, তা-ও অনুভব করি। আমার টলটলায়মান অবস্থা অটল হতে থাকে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত নিজেকে অনুভব করি। অনুভব করি আমার নারীর শরীর।
আমি হাতের মধ্যে শীতল পানির ছোঁয়া নিই। দুই গালে পানি লাগাই। কোশের পর কোশ পানি নিয়ে গালে চেপে ধরি। নিজের গালের ত্বক নিজে অনুভব করি। গাল। সুখখাল। সমান রং। সমান নরম। আমি কুলি করি। খোলা চোখে আর কপালে পানির ছিটা দিই। আমি শ্বাস নিই। শ্বাস বের করি। অনুভব করি হৃৎপি- অম্লজানপূর্ণ পরিশুদ্ধ রক্ত উৎসারিত করে। সে রক্ত সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে। এক ঢেউ মাথার তালুতে পৌঁছে। এক ঢেউ পায়ের তালুতে।

আমি দুই হাত জোড় করে ত্বক থেকে ত্বকে তরঙ্গপ্রবাহ অনুভব করি। বাথরুমের মেঝেতে আমার পড়ে যাওয়ার আর সম্ভাবনা নাই। আমি হামিদের ভূতকে বলি:
তুই যতবার ফিরে আসবি, ততবার আমার লাত্থি খাবি। দেখি তোর মাজায় কত জোর? আর আমার পায়ে কত শক্তি? আমি শিশির কণা। তোর মতো নিচু মরণ আমি মরব না। মুক্তি অর্জন না করে আমি যাব না। আমি চোখ খুলে, কান খাড়া রেখে, পৃথিবীর গন্ধ শেষবারের মতো বুক ভরে গ্রহণ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করব। নিজের শক্তি দিয়ে। আমি বাইরের কোনও শক্তির ওপর নির্ভর করি না। এমনকি রাগমোচনের জন্যও না।

 

ওসিডি‘র প্রকাশিত পর্বগুলো পড়ুন—
ওসিডি (পর্ব-০১)
ওসিডি (পর্ব-০২)
ওসিডি (পর্ব-০৩)
ওসিডি (পর্ব-০৪)
ওসিডি (পর্ব-০৫)
ওসিডি (পর্ব-০৬)
ওসিডি (পর্ব-০৭)

আরো পড়তে পারেন

ওসিডি (পর্ব-১০)

পড়ুন— ওসিডি (পর্ব-০৯) উনিশ আমরা সিঁড়ি বেয়ে বারন্দাতে নামি। ড্যাব করে একটা আওয়াজ হয়। একটা ফুলের টব উল্টে গেছে। প্লাস্টিকের হালকা টব। মাটি আছে ওটার ভেতরে। সোনিয়া বসে গাছটার গোড়া ধরে ওটাকে টেনে তোলে। বারান্দার ছাদের বাইরের দিকের দুই কোনায় দুটি বাল্ব আছে। তাদের ঢাকনাগুলি বেশ পুরনো আর ওদের ওপর অনেক ধুলাও জমেছে। আবছা আলো।….

ওসিডি (পর্ব-০৯)

পড়ুন— ওসিডি (পর্ব-০৮) এরপর আমার আসল পরীক্ষা শুরু হয়। পাগল এক বালতি পানি আর একটা নতুন তোয়ালে নিয়ে এসে দরজার সামনে বসে যায়। পাগল পানিতে তোয়ালে ভিজিয়ে ফ্লোর মোছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে দরজার সামনে আর যাওয়ার উপায় থাকে না। প্রথম ঝগড়াটা হয় আমার চপ্পল-জোড়া নিয়ে। আমার চপ্পল পাগলের মোছা ফ্লোর ময়লা করে। সেই চপ্পল যেই….

ওসিডি (পর্ব-০৮)

পড়ুন— ওসিডি (পর্ব-০৭) আঠারো শপাত! শপাত! .            কীইইই? আমি লাফ দিয়ে উঠি। সত্যিই কি চেয়ারম্যান স্যারের পিঠে জুতার বাড়ি? আমি এতক্ষণে চিত হয়ে পড়ে যেতাম, যদি আমি এক যুগ আগের শিশিরকণা হতাম। সেই পতনে আমার মাথা ফাটত। কিন্তু আমি এক যুগ আগের শিশিরকণা নই। শপাত! শপাত! চেয়ারম্যান স্যারের পিঠে আবার জুতার….

error: Content is protected !!