Author Picture

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা : চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

ড. আতিউর রহমান

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিশাল ঐতিহ্য রয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রেরণা বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মুক্তি চিন্তার গভীরতম তল থেকে উৎসারিত। তার দেওয়া ছয়দফা মূলত অর্থনৈতিক মুক্তির সনদ। ওই সনদের ভিত্তিতেই ১৯৭০ সালের ২৮ অক্টোবরে দেওয়া তার নির্বাচনি ভাষণটি ছিল এদেশের কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি জনতার অর্থনৈতিক মুক্তির সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারনামা। একদিনেই এ অঙ্গীকারনামা তৈরি হয়নি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের প্রতিটি ধাপেই ছিল কী করে মানুষের খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার পথকে সুগম করা যায়, সেই অঙ্গীকারের সুচিন্তিত রূপরেখা। আর ষাটের দশকের শেষদিকে ছয়দফাকে কী করে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে এনে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার করা যায় সেসব বিষয় নিয়ে বাঙালি অর্থনীতিবিদদের অঘোষিত নেতা অধ্যাপক নুরুল ইসলামের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সংযোগ ঘটেছিল। অবশ্য অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, মোশাররফ হোসেন, আনিসুর রহমান এবং রেহমান সোবহান তদ্দিনে পাকিস্তানে বাঙালি যে তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার, সে কথাটি তাদের গবেষণা, অ্যাডভোকেসি ও লেখালেখির মাধ্যমে সামনে আনতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ছয়দফা এবং বাঙালি অর্থনীতিবিদদের অর্থনৈতিক বৈষম্যবিরোধী ভাবনা ষাটের দশকের শেষদিকে মোহনায় মিশে যায়। তাই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয়ের পর পরই কী করে ছয়দফার ভিত্তিতে সাংবিধানিক সংস্কার করা যায়, তা নির্ধারণের জন্য যে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয় তাতে অধ্যাপক নুরুল ইসলামসহ শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ যুক্ত ছিলেন।

ছয়দফা বাস্তবায়ন করতে গেলে যে পাকিস্তানের দুই অংশকে আগের মতো আর এক কাঠামোতে রাখা প্রায় অসম্ভব হবে, ওই কমিটিতে সে বিষয়ে অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের পর্যাপ্ত আলাপ হয়েছিল। ওই আলাপের রেশ ধরেই ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে ইয়াহিয়া খানের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এম.এম. আহমদের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিকদের গভীর আলাপ হয়েছে। ২৫ মার্চের গণহত্যা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আলাপের সমাপ্তি ঘটে এবং বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নেই এ অর্থনীতিবিদরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেন। শুরুতেই দিল্লিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত তাজউদ্দীনের সঙ্গে অর্থনীতিবিদদের কারও কারও দেখা হয়। সেই সংযোগ মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় ধরেই থাকে। অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনা সেলে তার অবদান রাখেন। অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রবাসী সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি হিসাবে সারা বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তার স্বভাবসুলভ যুক্তিনির্ভর অ্যাডভোকেসি করেন। অধ্যাপক নুরুল ইসলাম ও আনিসুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। বিশেষ করে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বিশ্ব ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাকিস্তানকে দেওয়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা বন্ধ করার যে যুক্তিনির্ভর আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও অন্যরা যেভাবে মার্কিন কংগ্রেসে তাদের তথ্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন, তা ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে চিরদিন। অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্যারিসে বিশ্বব্যাংকের যে সভায় পাকিস্তানের পক্ষে অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল তা ভণ্ডুল করে দেন। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমে তার সরব উপস্থিতির কথা সর্বজনবিদিত। মাঝখানে অধ্যাপক সোবহান কলকাতায় ফিরে আসেন এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে অর্থনৈতিক নীতি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিস্তর আলাপ করেন। এর প্রভাব আমরা দেখতে পাই প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনা সেলে স্বাধীন দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে কী ধরনের নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত সেসবের প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ডের ভেতর। আর তাই অবাক হইনি যখন স্বদেশে ফেরার পরপরই ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসেই বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান নিয়োগ করার ঘোষণা দেন। এরপর দ্রুতই তিনি অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন, আনিসুর রহমান এবং রেহমান সোবহানকে সদস্য করে অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসাবে বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশন গঠন করেন। মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম ও তার সদস্যদের প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে বঙ্গবন্ধু সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও স্বাধীন দেশের পরিকল্পিত উন্নয়নের এক দুঃসাহসী অভিযাত্রার সূচনা করেন। একই সঙ্গে তাদের নির্দেশ দেন দ্রুতই প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য।

সদ্য গঠিত পরিকল্পনা কমিশনই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিন্তা-চেতনা ও ব্যবস্থাপনার প্রথম জ্ঞানকেন্দ্র হিসাবে স্বীকৃতি পায়। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির কৌশল নির্ধারণ ছাড়াও তখন পরিকল্পনা কমিশনের নেতৃত্বেই বিশ্বব্যাংকসহ সব উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে বিদেশি সাহায্য ও ঋণের দেন-দরবার হতো। ঢাকাতে বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম যে সভাটি হয়েছিল তা নানা কারণে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে আছে। ‘বাংলাদেশ এইড কনসোর্টিয়াম’ নামের সেই সভা শেষে পাকিস্তান আমলে নেওয়া বিদেশি ঋণ (যা বাংলাদেশের প্রয়োজনে খরচ করা হয়েছে) তা পরিশোধের চাপ আসে। শুরুতে বিশ্বব্যাংকের দাবি ছিল ১.২ বিলিয়ন ডলার। সে সময়ের পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক বিষয়ক সচিব জনাব সাইদুজ্জমানের (যিনি পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতেন) দূতিয়ালিতে ৪০০ মিলিয়ন ডলারে সাব্যস্ত হয়েছিল। পাশাপাশি নতুন করে ১.২ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি সহায়তা সংগ্রহের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। এসবই সম্ভব হয়েছিল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বুদ্ধিবৃত্তিক, প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলনের মাধ্যমে। আর এ পথের সন্ধান মিলেছিল বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকেই। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের উন্নয়নের অর্থনৈতিক দর্শন ও ব্যবস্থাপনার মূল পথপ্রদর্শক। তিনিই দেশের সবচেয়ে মেধাবী অর্থনীতিবিদ ও পেশাজীবীদের পরিকল্পনা কমিশনে জড়ো করেছিলেন এবং তাদের ওপর যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, এর মূল লক্ষ্য ছিল ‘পরিকল্পনা কমিশন গঠন করা এবং নিজেদের সর্বোচ্চ বিচার-বিবেচনা অনুযায়ী একটি পরিকল্পনা তৈরি করা।’ (সাইদুজ্জামান, দৈনিক বণিকবার্তা, অক্টোবর ০৭, ২০১৮)।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রেরণা বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মুক্তি চিন্তার গভীরতম তল থেকে উৎসারিত। তার দেওয়া ছয়দফা মূলত অর্থনৈতিক মুক্তির সনদ। ওই সনদের ভিত্তিতেই ১৯৭০ সালের ২৮ অক্টোবরে দেওয়া তার নির্বাচনি ভাষণটি ছিল এদেশের কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি জনতার অর্থনৈতিক মুক্তির সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারনামা। একদিনেই এ অঙ্গীকারনামা তৈরি হয়নি

এ কমিশন ঠিকই সংবিধানে দেওয়া নির্দেশনা মতো বাংলাদেশের জন্য পরিকল্পিত সুষম ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক উন্নয়নের এক চমৎকার প্রতিফলন ঘটিয়েছিল প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। তবে এ দলিলটি বাস্তবায়নের পর্যাপ্ত সময় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার পায়নি। তখনো বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট ছিল। তেল ও খাদ্যের দাম ছিল আকাশছোঁয়া। মূল্যস্ফীতি ছিল অস্বাভাবিক। কিন্তু উপযুক্ত হারে দেশীয় সম্পদের সমাবেশ এবং শর্তহীন বা সহজ শর্তে বিদেশি সাহায্য গ্রহণ করে ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। কৃষি উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ছিল, বৈদেশিক সাহায্যের সঠিক ব্যবহার বাড়ছিল, মূল্যস্ফীতি কমে আসছিল। তাই তো বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের মে মাসের শেষদিকে জ্যামাইকায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলোর প্রধানদের সভায় ধন্যবাদ দিয়ে বলেছিলেন, “তোমরা আমাদের সহায়তা করেছিলে বলে আমরা আজকে এগিয়ে যাচ্ছি, এভাবে এগোচ্ছি।”

মনে রাখা চাই, ১৯৭৩ সালে এই বঙ্গবন্ধুই কিন্তু বিশ্বব্যাংকের সহসভাপতি পিটার কার্গিলকে পাকিস্তানি দায়দেনা বাংলাদেশকে শোধ করার চাপ দেওয়ায় বলেছিলেন প্রয়োজনে তার জনগণ ঘাস খাবে তবু অন্যায় চাপ মানবে না। কিন্তু পরক্ষণেই এ বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বলেছিলেন জনাব সাইদুজ্জামানকে। শেষ পর্যন্ত তিনি বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার এক গ্রহণযোগ্য নীতিকৌশল গ্রহণ করেছিলেন। আর তাই অর্থনীতি পুনর্গঠনের সেই সংকটকালে যথেষ্ট বিদেশি সহায়তাও তার সরকার নিশ্চিত করতে পেরেছিল। এই যে খোলা অর্থনৈতিক কূটনীতি পরিচালনার ঐতিহাসিক ভিত্তি তিনি তৈরি করেছিলেন, এর সুফল বাংলাদেশ পেতে শুরু করেছিল। পারস্পরিক সম্মানের সঙ্গে বিদেশি নীতি ও বিদেশি অর্থনৈতিক সহযোগিতার যে পথনকশা তিনি তৈরি করে দিয়েছিলেন তা হঠাৎ করে থমকে দাঁড়াল ১৯৭৫ এর পনেরোই আগস্ট। থেমে যায় মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের সাহসী অগ্রযাত্রা। বাংলাদেশ হাঁটতে থাকে অদ্ভুত এক উটের পিঠে অন্ধকারের দিকে। এরপর অর্থনৈতিক দর্শন ও ব্যবস্থাপনায় আসে ব্যাপক পরিবর্তন। মুক্তিযুদ্ধের ফসল আমাদের সংবিধানে সাম্যভিত্তিক সমাজ ও অর্থনীতি নির্মাণের যে মৌল আদর্শ স্থান করেছিল, একে পালটে ফেলার চেষ্টা চলে দীর্ঘদিন। পরিকল্পনা কমিশন তার বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব হারায়। এটি পরিণত হয় আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার আরেকটি গতানুগতিক হাতিয়ারে। উন্নয়ন নীতিমালায় পরিকল্পিত কৌশল বাদ পড়ে। স্বল্পমেয়াদি অপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাই মুখ্য বিবেচনায় চলে আসে। ব্যক্তি খাত শক্তিশালী হতে থাকে। বঙ্গবন্ধুও ব্যক্তি খাতের বিকাশের পক্ষে ছিলেন। তবে তিনি বলতেন, তা হতে হবে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পিত নীতিকৌশলের হিসাবে। সব খাতের সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে এ দেশের মানুষের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর করার তার মৌল নীতিকৌশল পথ হারায় পঁচাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশে। দেশে প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও বৈষম্য বাড়তে শুরু করে। দারিদ্র্যও বাড়তে থাকে। এর প্রভাব পড়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। দেশ চলে যায় স্বৈরশাসনের দিকে। প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সামরিক শাসনের অধীনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আরও বাড়ে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় জনপ্রতিনিধিত্বের নেতৃত্বের সুযোগ কমে আসে।

পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক শাসনের পক্ষে ব্যাপক গণ-আন্দোলন দানা বাঁধে। নব্বইয়ে গণআন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে। কিন্তু স্থানীয় ও জাতীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কার্যকরী নেতৃত্ব স্থাপন করা যায়নি। এরপর ফের প্রচ্ছন্ন সামরিক শাসনে দেশ চলে কিছুদিন। রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ২০০৮ সালের শেষদিকে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার যে ধারা চালু করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা তা আবার ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। নতুন করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে সাজান। পঞ্চবার্ষিকী ও বিশ বছরমেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা চালু করেন। আরও দীর্ঘমেয়াদি ব-দ্বীপ পরিকল্পনাও চালু করেন তিনি। আর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের কাজে হাত দেন তিনি।

২০০৮-০৯ এর বিশ্ব আর্থিক সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশ উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য নিরসন হার বজায় রেখে ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের নানা প্রকল্প হাতে নিয়ে উন্নয়নের মহাসড়কে তুলে দেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। কিন্তু এরই মধ্যে চলে আসে কোভিড-১৯ মহাদুর্যোগ এবং তারপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। সারা বিশ্বেই দেখা দেয় সরবরাহ চেইনে বিশৃঙ্খলা। এ কারণে তেল ও খাদ্যমূল্য বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রতিরোধ আরোপ করে। পাশাপাশি তারা তাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে মুদ্রানীতিকে সংকোচনমূলক করে ফেলে। তারা তাদের নীতি সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি বাগে আনতে গিয়ে উন্নয়নশীল ও বিকাশমান দেশের মুদ্রার মানে বড় আঘাত হানে। ডলারে দাম বাড়তে থাকে। উন্নয়নশীল বিশ্বে বিনিয়োগ ডলার দৌড়ে ফিরে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এর প্রভাবে আমাদের মতো দেশের আমদানি মূল্য বিরাট হারে বেড়ে যায়। আমাদের টাকা তার মূল্য হারায় ২৫ শতাংশের বেশি। তাই ডলারের শোধ করা আমাদনি মূল্য ওই হারেই বাড়ে। যদিও রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর খানিকটা ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তবুও লেনদেনের ভারসাম্য নেতিবাচকই রয়ে গেছে। আমরা যে পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা আয় করছি এরচেয়ে ঢের বেশি আমদানি খরচ মেটাতে ও বিদেশি ঋণের কিস্তি এবং সুদ শোধ করতেই চলে যাচ্ছে। ফলে আমরা চলতি অর্থবছরেই দশ বিলিয়ন ডলারের বেশি ডলার আমাদের রিজার্ভ থেকে বিক্রি করেছি। এর ফলে টাকা চলে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। বিনিময় হারে অস্থিতিশীলতা কমানো মুশকিল হয়ে গেছে। অনেক আমদানি এলসি শোধ করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা পর্যাপ্ত ডলারের অভাবে। বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের দিকেই হাঁটছে বাংলাদেশ। কিন্তু এ হাঁটার গতি বেশ ধীর। তাতে বিনিময় হার নিয়ে আঁচ-অনুমান বেড়ে গেছে। এসবের প্রভাবে বিদেশ থেকে যে হারে ডলার আসার কথা সে হারে আসছে না। তাই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা কমছে না। এমন পরিস্থিতিতেই বাংলাদেশ আইএমএফের কাছ থেকে ৪.৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ঋণ কর্মসূচি সই করেছে। এর প্রথম কিস্তি চলেও এসেছে। আইএমএফ কর্মসূচি চালু হওয়ার ফলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে কারণে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকা বাংলাদেশে বেশি করে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আইএমএফ বলেছে তাদের ঋণ পেতে হলে বেশ কিছু শর্ত মানতে হবে। যেমন আগামী বাজেটে ৬৫ হাজার কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব আদায়ের অঙ্গীকার করতে হবে। রাজস্ব ব্যবস্থায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বাজেট ঘাটতি কমাতে হবে। সেজন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলে ভর্তুকি কমাতে হবে। এরই মধ্যে এসবের দাম বাড়ানো হয়েছে। আরও বাড়ানো হবে। আর্থিক খাতেও সুশাসন ও বাজারনির্ভর লেনদেন ও সুদের হার নির্ধারণের পথে বাংলাদেশ ব্যাংককে হাঁটতে হবে। সাধারণ মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষার পরিমাণ বাড়াতে হবে।

বঙ্গবন্ধুও ব্যক্তি খাতের বিকাশের পক্ষে ছিলেন। তবে তিনি বলতেন, তা হতে হবে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পিত নীতিকৌশলের হিসাবে। সব খাতের সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে এ দেশের মানুষের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর করার তার মৌল নীতিকৌশল পথ হারায় পঁচাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশে

এসবই ইতিবাচক নীতি পরামর্শ। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরা এসব নীতি সংস্কারের কথা বলে আসছিলেন। কিন্তু লেনদেনের ভারসাম্য অস্থির হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের এসব কথা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপকরা সেভাবে কানে তোলেননি। এখন আইএমএফ বলছে বলে হয়তো তারা এসব প্রশ্নে আরও সজাগ হবেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির নানা বিভাগে আলাদা আলাদা করে এসব সংস্কার আলাপ হচ্ছে। বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। কিন্তু সবচেয়ে ভালো হতো যদি অর্থনীতির সব বিভাগকে সুসংগঠিত করে কেন্দ্রীয়ভাবে নীতি সমন্বয় করা যেত। আসন্ন বাজেট বক্তৃতায় সমন্বয়ের এ ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে- তার একটি পথনকশা মাননীয় অর্থমন্ত্রী নিশ্চয়ই দিতে পারেন। এ প্রেক্ষাপটে আমরা আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরতে পারি :

১. শুধু প্রবৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়ার ফলে আমাদের অনেক বেশি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিতে হয়েছিল। যদিও বর্তমানে অনেক প্রকল্প স্লথ কিংবা স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও উন্নয়নের জন্য দেশি-বিদেশি অর্থে তারল্য জোগানো বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। শুধু টাকার অবমূল্যায়নের কারণে সব উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ ২৫-২৭ শতাংশ বেড়ে গেছে। আর প্রতিটি টাকা খরচের মাঝে অন্তত পনেরো-বিশ শতাংশ আমদানি পরিশোধ তথা ডলার খরচের দায় আছে। তাই ভোগ ও আমদানিনির্ভর এ প্রবৃদ্ধির গতি আগের মতো সচল রাখা বেশ মুশকিলই হচ্ছে। এজন্য রিজার্ভ কমে যাওয়ার গতিকেও থামানো কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।

২. আমাদের বাজেটপ্রণেতারা যেসব রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করেছেন, সেগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয় মানতে চায় না। কোভিডকালে আমরা দেখেছি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কীভাবে তার প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহে বেহাল হয়ে পড়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয় ও ব্যক্তি খাতের বিশেষ কিছু উদ্যোক্তা দ্রুত এগিয়ে এসেছিল বলে দেশব্যাপী টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। তবুও কোভিড সংকটের শুরুর দিকে বহু প্রাণ আমাদের হারাতে হয়েছে। টাকা হয়তো ছিল। কিন্তু খরচ করার পারদর্শিতা ও বাজেটারি নিয়মকানুন মানার দক্ষতার অভাব নিশ্চয় ছিল। বাস্তবায়নের এ চ্যালেঞ্জ এখনো পুরোপুরি অনেক মন্ত্রণালয়ে কাটেনি। তাই তো বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার মন্ত্রণালয়ভেদে অনেকটাই আশা করার মতো নয়।

৩. নিঃসন্দেহে মূল্যস্ফীতি বাগে আনাই এ মুহূর্তে অর্থনীতির অংশীজনদের বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পয়লা নম্বর অগ্রাধিকার হওয়ার কথা। উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ কাজেই ব্যস্ত। এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারতও সার্বিক চাহিদা ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়ে গত ১১ মাসে মূল্যস্ফীতি ১৮ শতাংশ কমাতে সক্ষম হয়েছে। মূলত সুদের হার বাড়িয়েই তারা এটা করতে পেরেছে। এর বিপরীতে আমরা মাত্র ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এ সময়টায় কমাতে পেরেছি। সর্বশেষ মূল্যস্ফীতি আবার বাড়ন্ত। অন্যদিকে ফিসক্যাল ডেফিসিট (তথা রাজস্ব ঘাটতিও) ধীরে ধীরে বাড়ছে। এ বাস্তবতায় অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের সারা বিশ্বের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সাম্প্রতিক ‘সাকসেস স্টোরি’গুলো ভালো করে অনুধাবন করে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাত কোনো অবস্থাতেই যাতে অপরিণামদর্শী গুজবের শিকার না হয়, সেদিকেও নিয়ন্তাদের সার্বক্ষণিক নজর রাখা চাই।

৪. আমরা সংকটে পড়লে ‘ফায়ার ফাইটিং’ যথেষ্ট করি। কিন্তু মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডের বাইরে গিয়েও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে কাজ করার সংস্কৃতি অর্জন করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না করলে কী বিপদ হয়-তা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও কমার্শিয়াল ভবনগুলোতে ঘন ঘন বিস্ফোরণের কারণে শিল্প মন্ত্রণালয় ও পূর্ত মন্ত্রণালয়ের নাজুক অবস্থায় পড়া দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তাই কঠিন কাঠামোগত সংস্কারকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

৫. তথ্যঘাটতি এক বিরাট অন্তরায়। মন্ত্রণালয়গুলো তাদের পরিকল্পনাকে ডিজিটাল করে ওঠেনি। একই তথ্য বারবার খুঁজে নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে যে বিস্তারিত তথ্য দরকার তা ডিজিটালি প্রণয়ন ও সংরক্ষণে বিরাট ঘাটতি রয়ে গেছে। আর পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে পেশাদারি অর্থনীতিবিদ বা পরিসংখ্যানবিদদের অনুপস্থিতিতে আইএমএফ বা অন্য উন্নয়ন অংশীদারদের চাওয়া মতো তথ্য ও পর্যালোচনা সরবরাহ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেকটা পারলেও এনবিআরের সেই সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি। বিবিএসের সক্ষমতায়ও যথেষ্ট ঘাটতি আছে। এসব চ্যালেঞ্জ সংকটকালে আরও বেশি ধরা পড়ছে।

৬. সর্বত্রই ‘নিয়ন্ত্রণে’র সংস্কৃতির পোয়াবারো। মার্কেটের সিগনাল নিয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপকদের যথেষ্ট অস্বস্তি আছে। চাহিদা ও সরবরাহের গরমিলে যেসব পণ্য বা সার্ভিসের দাম বাড়ে বা কমে এ কথাটি তারা বুঝতেই রাজি নন। গায়ের জোরে দাম ঠিক করে দিলে যে পণ্য বা সার্ভিস সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে তা তারা স্বীকার করতে চান না। আর্থিক বাজারেও এ নিয়ন্ত্রণের ঝোঁক বেশ প্রবল। এ কারণে তারল্য সংকট, আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ, টাকা-ডলার লেনদেন ব্যবস্থা, হুন্ডির দৌড়াত্ব, বাজার দরে ‘সিন্ডিকেটের’ প্রাধান্যের কথাবার্তাসহ নানা বিষয় আমাদের কানে আসে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ডলার পেতে যে ভোগান্তি, প্রবাস থেকে ডলার পাঠাতে গিয়ে স্পেকুলেশন, ডলার মজুত করার প্রবণতা, টাকা পাচারের শোরগোল-এসবেরই উৎপত্তি বাজারনির্ভর অর্থনীতির সচলতার অভাব থেকে।

৭. আমরা গবেষণা কিংবা আলাপ-আলোচনা করে অর্থনৈতিক নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়নের সংস্কৃতি এখনো পুরোপুরি রপ্ত করে উঠতে পারিনি। বড় বড় সিদ্ধান্ত আমরা হুটহাট নিয়ে ফেলি। এর প্রভাবে যে কার লাভ কার ক্ষতি, তেমন কোনো মূল্যায়ন বা পর্যবেক্ষণের ধারওধারি না। ফলে যা হওয়ার তাই হয়। যাদের কণ্ঠস্বর দুর্বল, যারা সংগঠিত নন তাদের ওপর দিয়েই চলে খড়্গ। আর কতিপয়ের হয় বাড়তি সুবিধা। বলা হয় তাদের পোয়াবারো। তারাই বাজেটের আগে লবিং করে বেশি। তারাই দল বেঁধে তাদের কথা পৌঁছে দিতে পারেন ক্ষমতার করিডরে।

এখনো সময় আছে আমরা যেন বদলে যাওয়া এই বিশ্বে টিকে থাকার জন্য জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন ও ব্যবস্থাপনার দিকে আরও মনোযোগী হই। এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা-দুইই আছে। জ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানবসমাজের ভালো বা মন্দ দুইই সাধন করা যায়। এক্ষেত্রে মূল নিয়ামক হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা

এমন আরও অনেক চ্যালেঞ্জের কথা আমি বলতে পারি। এ নিবন্ধে তার লিস্টি আর বাড়াতে চাই না। তার মানে এই নয় যে, এসব সংকট মোকাবিলা করে সম্ভাবনার দুয়ার আমরা খুলতে পারব না। নিশ্চয় সম্ভাবনার অনেক দুয়ার খুলতে পারি আমরা আরেকটু সচেতন ও যত্নবান হলে।

উপরের চ্যালেঞ্জগুলো যদি আমরা স্বীকার করি তাহলেই এসব উত্তরণের পথ খুঁজে পাব। আমাদের দুর্ভাগ্য এ যে, আমাদের মন্ত্রণালয়গুলো গবেষক নিয়োগ দিতে কার্পণ্য করে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্যবসায় সমিতির গবেষকদের সঙ্গে গভীর সংযোগ স্থাপন করে তাদের নীতিগুলো সংস্কার করে সঠিক মূল্যায়ন ও বাস্তবায়নেও তাদের দারুণ অনাগ্রহ। এ অচলায়তন ভাঙাটাই হবে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়ার অন্যতম উপায়। যা কিছুই তারা করছেন বাইরের চোখ দিয়ে, তা দেখানোর উদারতা নীতিনির্ধারণী মহলে চালু করার অভ্যাসটিই হবে সম্ভাবনার দিকে হাঁটার আরেকটি পদক্ষেপ। জাপান কিন্তু পশ্চিমের আইন, সিভিল সার্ভিস থেকে জ্ঞান আহরণ করে ‘মিজি সংস্কার’ অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। চীন ও সিংগাপুর, হংকং, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ডের ‘মিরাকল’ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ধরন থেকে শিখেছে। ভারত বিদেশি নেগোশিয়টরদের কাছে শেখার জন্য তার বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কর্মকর্তাদের বিদেশে পাঠিয়ে চলেছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে কেন আমরা শিখব না। এ বাংলাদেশেও আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের এনে প্রধান অর্থনীতিবিদ ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব দিয়েছি। তাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা ও পরিসংখ্যান ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার ও আধুনিকায়ন করেছি। শত শত কর্মকর্তাকে বিদেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণে পাঠিয়েছি। আর সে কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের তরুণ কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও জ্ঞানার্জনের আগ্রহ অনেকের চেয়ে বেশি বলে আমি দাবি করতে পারি। আমাদের সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝেও বাইরের জ্ঞানার্জনে প্রচুর আগ্রহ দেখি। সরকার সাম্প্রতিক ডলার সংকটের আগ নাগাদ এসব কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠাতে যথেষ্ট আগ্রহী ছিল।

আশা করি, বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট কেটে গেলে, বাংলাদেশের লেনদেন ভারসাম্যে উন্নতি হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার নিশ্চয় তাদের কর্মকর্তাদের নতুন নতুন জ্ঞানকেন্দ্রে পাঠাতে দ্বিধা করবে না। এভাবেই বাইরের বিশ্ব ও স্বদেশের বাস্তবতা মিলে এক নয়া ধাঁচের অর্থনৈতিক কর্মকর্তাদের বিকাশে আমরা আরও মনোযোগী হব। আইএমএফ কিংবা অন্য যে কোনো উন্নয়ন অংশীজনের সঙ্গে নীতি আলাপে এরাই আমাদের নীতিনির্ধারকদের পাশে থাকবে এবং স্বদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। আর এমনটি ঘটলেই আমাদের ঊর্ধ্বতন নীতিনির্ধারক, রাজনীতিক, নাগরিক সমাজ বেশি বেশি সঠিক তথ্য পাবেন এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে পেশাদারি দৃষ্টিতে দেখবেন। অযথা গুজবের শিকার হবেন না। যখন-তখন উত্তেজিত হয়ে ভুল কথা বা সিদ্ধান্ত নেবেন না। অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে জ্ঞানচর্চা কতটা প্রাসঙ্গিকতা বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক কৌশিক বসুর লেখা হালের ‘পলিসি মেকার্স জার্নি’ বইটি পড়লে আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে।

এখনো সময় আছে আমরা যেন বদলে যাওয়া এই বিশ্বে টিকে থাকার জন্য জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন ও ব্যবস্থাপনার দিকে আরও মনোযোগী হই। এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা-দুইই আছে। জ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানবসমাজের ভালো বা মন্দ দুইই সাধন করা যায়। এক্ষেত্রে মূল নিয়ামক হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এ প্রসঙ্গে ১৯৭৪-এর সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ থেকে কটি লাইন আজও একই রকম প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আমাদের সামনে আসে। সেদিন তিনি বলেছিলেন-“আজিকার দিনে বিশ্বের জাতিসমূহ কোন পথ বাছিয়া নিবে, তাহা লইয়া সংকটে পড়িয়াছে। এই পথ বাছিয়া নেওয়ার বিবেচনার উপর নির্ভর করিতেছে আমরা সামগ্রিক ধ্বংসের ভীতি এবং আণবিক যুদ্ধের হুমকি নিয়া এবং ক্ষুধা, বেকারি ও দারিদ্র্যের কশাঘাতে মানবিক দুর্গতিকে বিপুলভাবে বাড়াইয়া তুলিয়া আগাইয়া যাইব অথবা আমরা এমন এক বিশ্ব গড়িয়া তোলার পথে আগাইয়া যাইব-যে বিশ্বে মানুষের সৃজনশীলতা এবং আমাদের সময়ের বিজ্ঞান ও কারিগরি অগ্রগতি আণবিক যুদ্ধের হুমকিমুক্ত উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের রূপায়ণ সম্ভব করিয়া তুলিবে।” সেদিন তিনি ‘মানুষের অজেয়কে জয় করার ক্ষমতা’র ওপর বিশ্বাস রেখে সবাইকে ভবিষ্যতের বিষয়ে আশাবাদী হতে বলেছিলেন। আমরাও সেই বিশ্বাস ও আশাবাদের পথেই এগিয়ে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়িত হতে দেখতে চাই।

আরো পড়তে পারেন

একাত্তরের গণহত্যা প্রতিহত করা কি সম্ভব ছিল?

২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানি নরঘাতকেরা যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই এক রাতেই শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় তিন হাজার। এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা একতরফাভাবে….

ভাষা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা

আগের পর্বে পড়ুন— চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল) ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে দুই হাজার মাইল দূরত্বের….

চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল)

আগের পর্বে পড়ুন— বায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ একুশের আবেগ সংহত থাকে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেও। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান এক বিবৃতিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। আওয়ামি লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম কমিটির সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র….

error: Content is protected !!