Author Picture

শূন্য থেকে শূন্য

হাইকেল হাশমী

আমার আসল নাম কি আমি কোনো দিনই জানলাম না। ছোটবেলায় মা বাবলু বলে ডাকত তারপর আরও অনেকে অনেক নাম দিয়েছে। নাম নিয়ে আমি অত চিন্তা করি না, আমার মতো মানুষের নাম থাকলেই বা কি আর না থাকলেই বা কি? যে লোক নিজের বাপের নামই জানে না সে নিজের নাম না জানলে তাতে কি বা আসে যায়?

যা বলছিলাম আমার জন্ম বোধহয় ফুটপাতেই হয়েছিল। আমি যখন বুঝতে শিখলাম তখন দেখলাম আমি একটা ফুটপাতে থাকি। আরও বড় হয়ে চিনলাম ওটা হাইকোর্টের আশপাশে। মা সারা দিন আমাকে কোলে করে ভিক্ষা করে বেড়াত। সিগন্যালের সামনে গাড়ি এসে থামলেই আমার মা গিয়ে হাজির, গাড়ির জানালায় আস্তে করে টোকা দেয় আর বিভিন্ন ধরনের কথা বলে, মাঝে মাঝে কান্নার স্বরে ভিক্ষা চায়, কখনো দুঃখ ভরা স্বরে আমাকে দেখিয়ে ভিক্ষা চায়। আমি তখন কিছুই বুঝতাম না, বেশ মজাই পেতাম, আমিও মাঝে মাঝে জানালায় টোকা দিয়ে আমার তোতলামু ভাষায় ভিক্ষা চাইতাম। একদিনের কথা মনে আছে- মা আমাকে নিয়ে একটি গাড়ির কাছে গেছে, আমি একটি মিষ্টি হাসি দিয়ে জানালায় টোকা দিলাম এবং তোতলা ভাষায় বললাম, ‘মা একটু ভিক্ষা দেন, কিছু খামু, খিদা লাগসে’। একটি মহিলা জানালার কাচ নামিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী খাবি?’ আমি বললাম, ‘মিষ্টি খামু’। মহিলা হেসে দিলেন এবং আমাকে পঞ্চাশ টাকার একটি নোট দিলেন।

ওই দিনই আমি বুঝে গেলাম যে বাচ্চাদের লোকজন বেশি ভিক্ষা দেয়। আবার অনেক লোকজন আছে যারা বকাও দেয়, এইটুকু বাচ্চা আবার ভিক্ষা চায়, ভাগ এখান থেকে। একটু বুঝ হলে দেখলাম সবার একজন বাবা থাকে কিন্তু আমার কোনো বাবা নেই। একটু বড় হলে মাকে জিজ্ঞেস করলাম আমার বাবা কই? মা কোনো উত্তর দিল না, শুধু অন্য দিকে তাকিয়ে রইল। পাশে যে ল্যাঙড়া চাচা থাকত তাকে জিজ্ঞেস করতে সে বলল, ‘বাবা আমি তো জানি না তোর মা কার সঙ্গে শুইল যে তার পেটে তুই আইলি’। আমি খুব আশ্চর্য হয়ে চিন্তা করলাম কারোর সঙ্গে শুইলে কী করে বাচ্চা আসে? তাহলে ওই ল্যাঙড়া চাচা তো একটা লোকের সঙ্গে ঘুমায়, কই ওর পেটে তো বাচ্চা আসে না’। তবুও একটা কথা জানা হলো যে বাচ্চা পেট থেকে আসে।

ওই ফুটপাতে আরও অনেক বাচ্চাই ছিল সবাই আমার মতো, ছোট থাকতে কেউই কাপড় পরে না, আর কাপড় আসবেই বা কোত্থেকে? আমিও ল্যাংটাই থাকতাম। মা কোমরে একটা কালো সুতা বেঁধে দিয়েছিল আবার কোথাও থেকে এনে একটি ছোট ঘণ্টি ঝুলিয়ে দিল। আমি যখন হাঁটতাম তখন ওই ঘণ্টিটি সুরে সুরে বেজে উঠত। ফুটপাতে জীবনটা যে খুব কঠিন ছিল আমার মনে হতো না, মা সারা দিন ভিক্ষা করত রাতেরবেলা ফুটপাতের পাশে বসে ভাত আর কোনো তরকারি রান্না করত আর আমরা পেট ভরে খেয়ে আবার অনেক দিন অর্ধপেট খেয়ে শুয়ে পড়তাম। এমন দিনও গেছে যখন কিছু না খেয়েই ঘুমানোর চেষ্টা করেছি, এপাশ-ওপাশ করেছি, ঘুম তো আর আসে না। যারা কোনোদিন না খেয়ে থাকেননি তারা বুঝবেন না যে ক্ষুধার কত জ্বালা। ক্ষুধায় মাটি, পাথর, গাছ, পাতা সব খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা করে। প্রথম চুরি করেছিলাম এ ক্ষুধার জ্বালায়। সকাল থেকে কোনো খাবার জোটেনি, ঠিক কোর্টের দরজার কাছে একজন লোক বসে কলা বিক্রি করত। ওই দিন অনেকক্ষণ ওর কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম আর এক ফাঁকে তার ঝুড়ি থেকে দুটি কলা চুরি করে আস্তে করে সরে পড়লাম। সে টেরও পায়নি। একটা কলা আমি খেলাম আর একটা মাকে দিলাম, সে জিজ্ঞেসও করেনি যে কোত্থেকে নিয়ে এসেছি। এই প্রথম চুরির পর মনে হলো যে চুরি করা খুব সহজ কাজ, তারপর থেকে টুকটাক চুরিতে লিপ্ত হয়ে গেলাম। এ কারও কলা চুরি করা, কোনো ফুটপাতে বসা ফকিরের পয়সা চুরি করা, নিজে থেকে ছোট বাচ্চাদের হাত থেকে ছোঁ মেরে খাবার নিয়ে যাওয়া। প্রথম দিকে খারাপ লেগেছে কিন্তু পরে এটাই স্বাভাবিক মনে হলো যেহেতু আমার থেকে বুড়ো বয়সের ফুটপাতে থাকা ছেলেগুলো আমার সঙ্গে একই কাজ করত।

কিছুদিন পরে আমার কয়েকজন ফুটপাতের বন্ধু, আমরা যারা টোকাই, তারা আমার সঙ্গে যোগ দিল। এখন আমরা নতুন নতুন পরিকল্পনা করি কীভাবে টাকা রোজগার করা যায়। সত্যি কথা একসঙ্গে থাকলে অনেক কাজ করা যায় কিন্তু মতবিরোধ থাকে এবং স্বাধীনভাবে কাজও করা যায় না। তবুও ওদের সঙ্গে মিলে রাতেরবেলা রাস্তার গ্রিল চুরি করার কাজ অনেক করেছি। গ্রিলটা বেশ ভালো দামে বিক্রি করা যায়, মোটামুটি হাইকোর্ট আর শাহবাগ এলাকার রাস্তার সব গ্রিল চুরি করে বিক্রি করে দিলাম তার সঙ্গে যোগ হলো ম্যানহোলের ঢাকনা। কিছু দিন ভালোভাবেই ব্যবসা হলো কিন্তু তারপর পুলিশ তৎপর হয়ে গেল আর আমাদের কিছু বন্ধুরা ধরা পড়ল। আমি আস্তে করে এ কাজ থেকে কেটে পড়লাম।

‘বাবা আমি তো জানি না তোর মা কার সঙ্গে শুইল যে তার পেটে তুই আইলি’। আমি খুব আশ্চর্য হয়ে চিন্তা করলাম কারোর সঙ্গে শুইলে কী করে বাচ্চা আসে? তাহলে ওই ল্যাঙড়া চাচা তো একটা লোকের সঙ্গে ঘুমায়, কই ওর পেটে তো বাচ্চা আসে না’। তবুও একটা কথা জানা হলো যে বাচ্চা পেট থেকে আসে

ভাগ্য প্রসন্ন হলে যা হয়-একদিন কাল্লু ওস্তাদের সঙ্গে পরিচয়, তার কথা আমরা সব টোকাই শুনেছি, সে আমাদের জগতে একজন লিজেন্ড। আমরা সবাই তার মতোই হতে চাই। ওস্তাদের সঙ্গে এক বন্ধুর মারফতে পরিচয়। আমি মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনছি আর মনে মনে চিন্তা করছি যদি ওস্তাদ আমাকে তার দলে নিত। আমার মুখ দেখে ওস্তাদ কেমনে সেই কথাটি বুঝতে পারল। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল

‘ছোকরা তোর নাম কী?’

আমি বললাম, ‘ওস্তাদ বাবলু বলে সবাই ডাকে’।

‘তোকে আমার পছন্দ হইসে, আমার সঙ্গে কাজ করবি?’

মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি, আমি কি আর এ সুযোগ হাতছাড়া করতে পারি, তাই সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁ করে দিলাম আর তার পা ছুঁয়ে সালাম করলাম।

ওস্তাদ আমাকে তার দলের একজন অভিজ্ঞ ছেলেকে দেখিয়ে বলল, ‘আজ থেকে তুই এ ছেলের সঙ্গে থাকবি এবং ও যা বলবে তাই করবি। বুঝলি আমি কি কইলাম?’

‘জি ওস্তাদ’।

তারপর আমি ওই ছেলে যার নাম ছিল বল্টু তার সঙ্গে কাজ শিখতে লাগলাম। সে আমাকে শিখাল কীভাবে সিগন্যালে দাঁড়ানো গাড়ির সাইড মিরর চুরি করতে হয়, কীভাবে গাড়ির বিট খুলে পালাতে হয়। আমরা দুই-তিনজন মিলে এ কাজগুলো করতাম। হাইকোর্টের সামনে সব সময় গাড়ির ভিড় লেগে থাকে তাই এ জায়গায় কাজ করা আমাদের জন্য খুব সহজ। একজন গাড়ির সাইড মিরর টান মেরে খুলে পালাত আর অন্যজন একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকত এবং প্রথমজন ওই জিনিসটি অন্যজনকে দিয়ে দিত আর সে উলটো দিকে দৌড় দিত। এখন দুজন দুই দিকে দৌড়াচ্ছে তাই লোকজন কনফিউজ হয়ে যেত আর তৃতীয়জন লোকজনকে আবোল তাবোল বলে আরও কনফিউজ করে দিত। রোজ চার পাঁচটা মিরর চুরি করতে পারলে ধোলাই খালে বেশ ভালো দামে বিক্রি করা যেত। আবার মজার কথা যে, যার গাড়ির মিরর চুরি হয়েছে সে আবার ওই চুরি যাওয়া মাল চড়া দামে ওই দোকান থেকে কিনতে বাধ্য হতো।

এ কাজটি প্রায় এক বছরের মতো করার পর ওস্তাদের আস্থা আমার ওপর বেড়ে গেল এবং সে আমাকে আর একজন মিজান ভাই-এর সঙ্গে কাজ করতে বলল। মিজান ভাই ছিনতাই করার ব্যাপারে পারদর্শী ছিলেন। আমি তার সঙ্গে কাজ করতে শুরু করলাম। এ কাজগুলো সাধারণত অন্ধকার হওয়ার পর করতে হয় এবং আমাদের শিকার রিকশা করে যাওয়া মহিলা এবং একাকী পুরুষেরা হতো। তাদের কাছ থেকে ব্যাগ, ঘড়ি আর তাদের পরনের সোনার গয়না, চুড়ি এগুলো আমাদের লক্ষ্যবস্তু হতো।

একদিন গভীর রাতে দোয়েল চত্বরের কাছে আমরা দুজন একটি রিকশা আটকালাম। রিকশা একজন পুরুষ আর একজন মহিলা। মহিলার পরনে গয়না, কোলে একটি ব্যাগ দেখতে পেলাম। মিজান ভাই চাক্কু বের করে ধরল এবং তাদের বলল, ‘যা আছে বের করে দাও’। আমি মহিলার ব্যাগটি কেড়ে নিলাম আর তাকে গয়না দিতে বললাম। হঠাৎ দেখি মিজান ভাই উলটো দিকে দৌড় দিল। আমি কিছু বোঝার আগেই একটি পুলিশের ভ্যান কোত্থেকে এসে হাজির। এ দিকে রিকশায় বসা দুজন চোর চোর, ছিনতাইকারী ছিনতাইকারী বলে চেঁচাতে শুরু করে দিল। ভ্যান থেকে কয়েকজন পুলিশ নামল আর আমি পালানোর আগেই আমাকে ধরে ফেলল। তারপর মার শুরু হলো। ব্যাটা পুলিশ থাপ্পড় মারে, লাথি মারে, ডান্ডা দিয়ে হাঁটুতে মারে। মাটিতে পড়ে গেলাম কিন্তু পিটিয়ে যাচ্ছে। মাথা কেটে গেল, ঠোঁট কেটে রক্ত বের হচ্ছে, নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে কিন্তু পুলিশের কোনো দয়া মায়া নেই। হাতে কড়া পরিয়ে দিয়ে ভ্যানে উঠিয়ে থানায় নিয়ে গেল। সারা রাত হাজতে রেখে সকালবেলা কোর্টে চালান করে দিল। আমার কম বয়স দেখে কোর্ট আমাকে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দিল।

কিশোর সংশোধন কেন্দ্র শুধু নামে সংশোধন কেন্দ্র ছিল। আমার বয়সি অনেক ছেলে ওখানে ছিল যারা বিভিন্ন অপরাধের কারণে ওখানে বন্দি ছিল। ছিনতাইকারী, পকেটমার, গাড়ি চোর, বাইক চোর, সাইকেল চোর থেকে শুরু করে আমার মতো ছিঁচকে চোরও ছিল। সংশোধনের নামে কেন্দ্রের অফিসার আর গার্ডের ব্যক্তিগত কাজ করে দেওয়া আর কোনো কারণ ছাড়া মার খাওয়াই ছিল আসল সংশোধন। ওখান থেকে অনেক কাজের ব্যাপারে বিশদ ধারণা হলো। মঞ্জু নামের একজন পকেটমার থেকে পকেট মারার কলাকৌশল রপ্ত করলাম বিনিময়ে তার হাত-পা টিপে দেওয়া থেকে শুরু করে ওর কাপড়চোপড় ধুয়ে দেওয়া পর্যন্ত সব কাজই করলাম। সে আমাকে ধাপে ধাপে শিখাল কীভাবে শিকারকে টার্গেট করতে হয়, কীভাবে শিকারের মনোযোগ অন্যদিকে নিতে হয় আর বিশেষ করে দুই আঙুলের কাজ কীভাবে সম্পন্ন করতে হয়। আঙুল যত দ্রুতগামী হবে কাজটি তত সহজ হবে। মঞ্জু ভাইর সেবা করে অনেক মূল্যবান শিক্ষা পেলাম যেটা ভবিষ্যৎ জীবনে কাজে লাগবে বলে আমার ধারণা।

বল্টু ভাইর কাছে গাড়ির ইঞ্জিন থেকে শুরু করে ব্যাটারি পর্যন্ত চুরি করার শিক্ষা নিলাম। খোকা ভাই শিক্ষা দিল কীভাবে সাইকেল চুরি করে কোথায় গিয়ে বিক্রি করতে হয়। আমার জন্য সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা ছিল কালু ওস্তাদ থেকে বিভিন্ন ধরনের তালা খোলার কৌশল রপ্ত করা। আমার ছয় মাস কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে একদম বৃথা যায়নি। ছয় মাস পর ছাড়া পেলাম আর বিপরীতভাবে সংশোধিত হয়ে আবার বাইরের অস্থিতিশীল, অস্থির পৃথিবীতে ফিরে এলাম, যেখানে রোজ বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করতে হয়। সংশোধন কেন্দ্রে কমপক্ষে দুইবেলা খাবারের চিন্তা ছিল না।

এক দুই দিন ফুটপাতে থাকলাম, বিশ্রাম নিলাম বলতে পারেন। দশ-বারো ঘণ্টা একটানা ঘুমালাম, রাস্তার কোলাহল আর ফুটপাতের হট্টগোল আমার ঘুমে কোনো ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। মা আমার ভিক্ষা করে এনে রান্না করে খাওয়াল। দুই দিন পর শরীরটা একটু চাঙা মনে হলো। আমার এ অবস্থা দেখে মা আমাকে জিজ্ঞেস করল। ‘বাবা তোর কী হইসে?’

আমি বললাম, ‘এমন কিছু হয় নাই মা, অনেক কাজ করতে হইসে তো তাই একটু আরাম করলাম’।

মা আমারে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা পুলিশ কি তোকে অনেক মারসে?’

আমি উত্তর দিলাম, ‘না মা, বেশি পিটায় নাই’।

মা বলল, ‘তোরে কত কইসি এইসব কাজ করিস না, চুরি করার চেয়ে ভিক্ষা করা বেশি ভালা কাজ’। আমি কোনো উত্তর দেইনি। মা’র কথা মনে গাঁথল, চিন্তা করলাম এই কাজটা ছেড়ে দিব তাই কোনো চাকরি খুঁজতে লাগলাম। আমাদের মতো লোকদের কে চাকরি দেবে? যার ঘর নাই, ঠিকানা নাই, কোনো কাজ জানে না। তবুও চেষ্টা করে আজিমপুরের একটি গ্যারেজে হেলপারের কাজ পেয়ে গেলাম। সারা দিন ম্যাকানিকদের কাজের যন্ত্রপাতি এনে দেই, গাড়ি ধুই, ইঞ্জিন নামাইতে সাহায্য করি, হোটেল থেকে নাশতা আর চা নিয়ে আসি। সারা দিন খাটুনি, যদিও দুপুরের খাবার দেয় কিন্তু কাজের চাপে চেপটা হয়ে যাওয়ার উপক্রম। আমি একমাত্র হেলপার আর দশজন মেক্যানিক, সবার কাজ করতে করতে আমার জীবন শেষ হয়ে গেল। তার ওপর যা মাইনে দিত তাতে পনেরো দিনের খরচাপাতিও চলে না। একদিন পাশের গ্যারেজ থেকে একটি গাড়ির সাইড মিরার চুরি করে আমার পুরোনো জানাশোনা মোটর পার্টসের দোকানে বিক্রি করে বেশ ভালো টাকা পেলাম। আবার অন্য গ্যারেজ থেকে টুলস চুরি করে বেঁচে দিলাম। চিন্তা করলাম বেতন না দিলেও যদি মাসে এক দুটো এমন কাজ করা যায় তাহলে মন্দ নয়। কাজ বেশ ভালোই চলছিল কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, একদিন এক গ্যারেজের লোকজন চুরি করার সময় হাতেনাতে ধরে ফেলল। অনেক মেরে নাক মুখ ফাটিয়ে দিল। আমার গ্যারেজের মালিক আমাকে চাকরি থেকে বের করে দিল এবং ওই মাসের বেতনও দিল না।

এই প্রথম চুরির পর মনে হলো যে চুরি করা খুব সহজ কাজ, তারপর থেকে টুকটাক চুরিতে লিপ্ত হয়ে গেলাম। এ কারও কলা চুরি করা, কোনো ফুটপাতে বসা ফকিরের পয়সা চুরি করা, নিজে থেকে ছোট বাচ্চাদের হাত থেকে ছোঁ মেরে খাবার নিয়ে যাওয়া

এবার আমি আবার চিন্তায় পড়ে গেলাম, কী করা যায়? জীবনটা কীভাবে কাটবে, ফুটপাতেই সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে হবে? কিন্তু চুরি ছাড়া আমি অন্য কোনো কাজও পারি না, কি করা যায়? আবার যেখানে যাই লোকজন দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। আমার মনে হলো আমার চেহারা সুরতে লেখা আছে যে আমি চোর। এসব কথা নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা করলাম তারপর একদিন ল্যাঙড়া চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘চাচা লোকজন আমাকে কীভাবে চিনে ফেলে যে আমি ফুটপাতের মানুষ?’

চাচা উত্তর দিলেন, ‘আমাদের চেহারা দিয়েই বোঝা যায় যে আমরা ফুটপাতের মানুষ’।

‘কিন্তু গোলাপি আর জ্যোৎস্নাকে তো বড় সাহেবরা বড় বড় গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়, তখন কি তাদের ফুটপাতের মানুষ মনে করে না?’ আমি বললাম।

‘এই কথার উত্তর আমি দিতে পারুম না। কিন্তু তাদের

ব্যবহার করে আবার ফেলে দিয়ে যায়’, চাচা বললেন।

‘কি করলে তারা বুঝবে না যে আমি ফুটপাতের মানুষ?’ আমি প্রশ্ন করলাম।

‘দ্যাখ আমার তো ভিক্ষা করতে হয় তাই নোংরা কাপড়, ছেঁড়াফাটা কাপড় পরে থাকতে হয়। শরীর আর মুখও নোংরা রাখতে হয়। কিন্তু তুই যদি পরিষ্কার কাপড় পরিস আর কোনো গরিব মহল্লায় থাকিস তবে লোকজন তোকে ভালো চোখে দেখবে’, চাচা পরামর্শ দিলেন।

চাচার কথাটা আমার পছন্দ হলো, আমি চিন্তা করলাম পাঞ্জাবি পায়জামা পরে আর যদি দাড়িও রেখে দেই তাহলে লোকজন ভদ্র মানুষ মনে করবে। যেই চিন্তা সেই কাজ, মাসখানেকের মধ্যে দাড়ি রেখে পাঞ্জাবি পায়জামা পরে বাড্ডার একটি মেসে থাকতে লাগলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল যেহেতু বাড্ডা গুলশানের কাছাকাছি আর গুলশানে সব ধনী লোকেরা থাকে, যদি ওখানে একটা বড় দান মারতে পারি তাহলে আর কোনো কাজ করতে হবে না।

আমি প্রায় গুলশানের বিভিন্ন রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম এবং ফ্ল্যাট বিল্ডিংয়ের গার্ডদের সঙ্গে খাতির করলাম। তাদের সঙ্গে গল্পগুজব এবং তাদের চা, পান, সিগারেট খাওয়ানো শুরু করে দিলাম। আসল উদ্দেশ্য ওই বিল্ডিংয়ের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে কারা থাকে এবং কয়জন মানুষ থাকে এসব তথ্য কথায় কথায় বের করে নিতাম। এদিকে বেঁচে থাকার জন্য ছোটখাটো চুরি করে জীবন চালানোর জন্য কিছু আয় করতাম।

এরই মধ্যে কি একটা অসুখ সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়ল, সবাই বলে করোনা। দোকানপাট, মার্কেট, অফিস, আদালত বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের মেসের অনেক লোক নিজেদের দেশে চলে গেল, আমার দেশ তো ওই ফুটপাত তাই আমাকে যেতে হলে তো ওখানেই যেতে হবে। গুলশানেও আমি থমথমে অবস্থা দেখলাম। এ এলাকা গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকত, এখন সন্ধ্যা হলেই সুনসান হয়ে যায়, একটি-দুটি গাড়ি হঠাৎ করে স্পিডে চলে যায়। দোকানের সব রঙিন বাতি বন্ধ, রাস্তার ল্যাম্প পোস্ট ছাড়া আর কোথাও কোনো আলোর দেখা মেলে না। যেহেতু ধনী মানুষের এলাকা, প্রচুর পুলিশ থাকে। একদিন একটি পুলিশ চেকপোস্টে আমাকে দাঁড়াতে বলল। পুলিশ আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘এই সময় কোথায় যাচ্ছ?’ আমি আগে থেকেই এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য তৈরি ছিলাম তাই একটু দুঃখ মিশানো কণ্ঠে বললাম, ‘আমার ভাই অনেক অসুস্থ তার করোনা হয়েছে, সে কুরমিটোলা হাসপাতালে ভর্তি, তাকে দেখতে যাই’। এভাবে কয়েকদিন কয়েকবার আমাকে আটকাল কিন্তু মসজিদে যাচ্ছি অথবা হাসপাতালে যাচ্ছি অথবা ওষুধ আনতে যাচ্ছি এসব কথা বলে তাদের ফাঁকি দিয়ে বের হয়ে যেতাম। আসলে তো আমি সুযোগের সন্ধানে ছিলাম, কোনো কাজ করার যদি সুযোগ পাই। আমার কাজ কি হতে পারে তা তো আপনাদের জানাই আছে।

এক সন্ধ্যায় গুলশান রোড নম্বর দশের একটি বিরাট বিল্ডিংয়ের নিচে দেখলাম একজন সাদা বিদেশি সাহেব তার সুটকেস নিয়ে একটি গাড়িতে উঠছে এবং যাওয়ার আগে বাসার গার্ডকে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলল, ‘আমি মাসখানেকের জন্য আমার দেশে যাচ্ছি। যদি আমাকে কেউ খুঁজতে আসে তাহলে বলে দিবা আমি বাসায় নেই, দেশের বাইরে গেছি’। গার্ড জি স্যার বলে জোরে জোরে মাথা নাড়াল। গাড়ি চলে যাওয়ার পর আমি কাছে গিয়ে গার্ডকে সালাম দিলাম আর বললাম, ‘আমি দুই রোড পরে একটি সাহেবের বাসায় ড্রাইভারের কাজ করি, আপনি এখানে কত দিন ধরে আছেন?’

গার্ড বলল, ‘ভাই আমি এ চাকরিতে মাত্র ছয় মাস ধরে আছি’।

‘ওহ আচ্ছা তাহলে বেশি দিন হয় নাই। আসলে আমাদের বিল্ডিংয়ে একটি গার্ড লাগবে। কিছু মনে না করলে বলতে পারেন এখানে কত মাইনে পান?’ আমি বললাম।

‘ভাই দশ হাজার টাকা পাই। আপনার বিল্ডিংয়ে কত বেতন দিবে জানেন না কি?’, সে বলল।

‘হ্যাঁ জানি ভাই, ওরা পনেরো হাজার টাকা দেবে এবং রাতের ডিউটিতে কিছু বাড়তি টাকাও দেবে’, আমি বানিয়ে বানিয়ে বললাম। ‘আপনি যদি বলেন তাহলে আমি আপনার কথা বলতে পারি’।

‘ভাই অনেক মেহেরবানি’, সে বলল।

‘আচ্ছা ভাই আমি আগামীকাল আপনাকে খবর দেব। কালকে আপনার কয়টার সময় ডিউটি?’

‘ভাই আমার নাইট ডিউটি’, সে উত্তর দিল।

‘ঠিক আছে আমি কালকে আসব’। ‘আচ্ছা এই সাহেব কোন দেশি?’

‘উনি লন্ডনের বাসিন্দা, আমাদের এই বিল্ডিংয়ের এ-৪ ফ্লাটে থাকেন’।

আমি তো আসলে এ কথাই জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিলাম, সে নিজেই বলে দিল। আমি তাকে আগামীকাল আসব বলে আমার মেসে ফিরে এলাম।

আপনারা চিন্তা করবেন না যেহেতু চুরি করার পরিকল্পনা ছিল আবার এখানে চুরি করতেও পারি নাই তাই খুব লম্বা সময়ের জন্য জেল হবে না। হয়তো ছয় মাস না হয় এক বছর। কিন্তু এ কয়দিন যে এই বাসায় কাটালাম এটা আমার জীবনের স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে

সারা রাত পরিকল্পনা করলাম কীভাবে ওই ফ্ল্যাটে ঢোকা যায়, কী বলে ঢোকা যায়, কেমন করে ঢোকা যায়। তারপর চিন্তা করলাম আগে গিয়ে দেখি কোনো না কোনো রাস্তা বের হয়ে যাবে। পরের দিন আমি রাতে ওই বিল্ডিংয়ে গেলাম সঙ্গে শিঙ্গাড়া আর অল্প মিষ্টি নিয়ে গেলাম। ওই গার্ড যার নাম কুদ্দুস সে উপস্থিত ছিল। আমি তাকে ডেকে খুশির সংবাদ দিলাম, ‘আমি কথা বলেছি, বিল্ডিংয়ের ম্যানেজার রাজি হয়েছে, এখন শুধু উনার সঙ্গে আপনার দেখা করতে হবে। আমি বলে দিয়েছি আপনি এক তারিখ থেকে কাজে জয়েন করতে পারবেন’। ‘নেন এই খুশিতে মিষ্টি খান। আপনাকে আমার অনেক পছন্দ হয়েছে তাই আপনার সুপারিশ করলাম’।

কিছুক্ষণ পর গার্ডটি আমাকে বসতে বলে একটু বাথরুমে গেল। আমি এ সুযোগে লিফটে করে চার তালায় এ-৪ ফ্ল্যাটে উঠে গেলাম। এসব দরজা খোলা আমার জন্য খুব বিরাট কষ্টের কাজ না। সংশোধন কেন্দ্রে এ ব্যাপারে তালিম নিয়ে ছিলাম ওটা কাজে লাগল। একটি স্টিলের তার দিয়ে মুহূর্তে দরজা খুলে আমি আস্তে করে ভেতরে ঢুকে পড়লাম আর আবার ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। ভেতরে অন্ধকার আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম, একটু পর চোখ অন্ধকারে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেল। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম ওটা ছোট লবি আর তারপর সামনের দিকে একটি বিশাল ড্রইংরুম আর ডাইনিং রুম। ড্রইং রুমের বিশাল জানালায় পর্দা টানা। আমি সুইচ বোর্ড খুঁজে পেলাম এবং লবির বাতি জ্বালিয়ে দিলাম। ওই একটি বাতি যথেষ্ট ছিল আমার জন্য এখন আমি সব কিছুই দেখতে পারছি। রান্নাঘরে গিয়ে দেখি বিরাট একটি ফ্রিজ। ওটা খুলে দেখলাম পুরা ফ্রিজ খাবারে ঠাসা। অনেক খাবার আমি চিনি না। অনেক ডিম, জেলি, পাউরুটি, মাখন সব কিছুই আছে। তারপর বেডরুমে গিয়ে দেখি বিশাল একটি বিছানা পাশে সোফা, আলমিরা, টিভি আর একটি ছোট ফ্রিজ। ফ্রিজ খুলে দেখলাম অনেক মদের বোতল রাখা। আমি আবার বাংলা ছাড়া এখন পর্যন্ত অন্য কোনো মদ খাইনি। চিন্তা করলাম কয়েক বোতল নিয়ে যাব। আলমিরা খুলে দেখলাম কাপড় আর সুট ছাড়া আর কিছুই নাই। কিছু খুচরা টাকা পেলাম যেটা পকেটে ঢুকালাম। তারপর একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বিছানায় বসলাম তারপর একটু শুইলাম। এত নরম আর আরামের বিছানায় আমি আমার জীবনে ঘুমাই নাই। শুয়ে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম কোনো টের পেলাম না। যখন ঘুম ভাঙল তখন দেখলাম জানালার পর্দার আড়াল থেকে সূর্যের আলো দেখা যাচ্ছে। রুমের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম সকাল দশটা বাজে। চিন্তা করলাম এখন বের হওয়া ঠিক হবে না। একটু বসে থেকে উঠে বেডরুমের সঙ্গে লাগোয়া বাথরুমে গেলাম। এত পরিষ্কার পরিছন্ন বাথরুম আমি জীবন এই প্রথম দেখলাম। বাথটাব ছিল, আমি চিন্তা করলাম একটু আরাম আয়েশ করা উচিত। তাই টাবে পানি ভরে আমার কাপড় নামিয়ে গা ভাসিয়ে দিলাম। এত আরাম এত সুখ তো জীবনে কোনো দিন পাই নাই। ঘণ্টাখানেক পানিতে শুয়ে থেকে বের হয়ে, সাদা ধবধবে তোয়ালে দিয়ে গা মুছে আলমিরা থেকে পরিষ্কার টি-শার্ট আর পায়জামার মতো প্যান্ট বের করে পরে নিলাম। এর মধ্যে অনেক খিদে পেয়েছে। ফ্রিজ খুলে পাউরুটি, জেলি আর মাখন বের করলাম, ডিম খেতে ইচ্ছে করল কিন্তু চিন্তা করলাম এত ঝামেলা করার দরকার নেই। পেট ভরে খেয়ে এক গ্লাস দুধ খেয়ে ড্রইংরুমে সোফায় বসে টিভি সাউন্ড ছাড়া দেখতে লাগলাম। বেশ আরাম লাগছিল। দুপুরবেলা খেয়ে চিন্তা করলাম একটু বিশ্রাম করি, নরম বিছানায় আবার ঘুমিয়ে গেলাম।

গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেল। খিদেও পেয়েছে। উঠে বাতি জ্বালিয়ে দিলাম, তারপর মনে হলো এটা করা উচিত না, তাড়াতাড়ি নিভিয়ে দিলাম। মনে মনে ভাবলাম এত রাতে কে আর দেখবে অথবা শুনবে তাই রান্নাঘরের বাতি জ্বালিয়ে চুলায় একসঙ্গে চারটি ডিম পোচ করলাম। পাউরুটি আর মাখন দিয়ে পেট ভরে খেলাম। মনে মনে চিন্তা করলাম কাল সকালে বা দুপুরে এখান থেকে বের হয়ে যাব। কিছু ছোটখাটো জিনিস এক দিকে সরিয়ে রাখলাম যেটা সঙ্গে করে নিয়ে যাব। রাতেরবেলা ড্রইং রুমের ছোট ল্যাম্পটি জ্বালিয়ে রাখলাম, জানালায় মোটা পর্দা বলে শান্তি পেলাম। সাউন্ড ছাড়া টিভি দেখা আর ম্যাগজিনগুলোতে ছবি দেখা, এসব করে আবার বেডরুমে ঘুমাতে চলে গেলাম।

হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গেল, লোকজনের কথার শব্দে। চোখ খুলে দেখি কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। একজন আমাকে ডান্ডা দিয়ে গুঁতা মেরে ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কে? এখানে কি করস?’

আমি এখন পুরা সজাগ এবং বললাম, ‘স্যার আমি বাবলু’।

‘তুই বাবলু বুঝলাম কিন্তু এখানে কি করছিস?’

আমি কিছু বলার আগে ওই গার্ড বলে উঠলো, ‘স্যার আমি রাতে রাউন্ডে ছিলাম হঠাৎ এই জানালায় আলো দেখতে পেলাম। চিন্তা করলাম সাহেব তো নাই বাতি কে জ্বালাইসে তাই ওপরে এসে দরজা চেক করলাম। দরজা বন্ধ কিন্তু ভেতর থেকে ডিম ভাজি করার ঘ্রাণ ভেসে আসছে। আমি বেশি চিল্লাচিল্লি না করে ম্যানেজারকে জানালাম। ম্যানেজার আপনাদের জানাল। এ ব্যাটা চোর মনে হয়’।

আমার বলার কিছু ছিল না, আমি শুধু বললাম, ‘স্যার আমি কিছু চুরি করি নাই। শুধু আমার জীবনে এমন আরাম আয়েশের সামগ্রী দেখি নাই। এত নরম বিছানা আর এমন পরিষ্কার কাপড়, এমন গোসল করার ব্যবস্থা, কোনো দিন নিজের চোখে দেখি নাই। তাই কয়েক দিন এখানে থেকে জীবনের সব আরাম আয়েশ করার পরিকল্পনা করে ছিলাম। আমি চোর কিন্তু এখানে কোনো চুরি করি নাই’।

আমার কথা শুনে পুলিশের কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না সে আমাকে ডান্ডা দিয়ে একটি বাড়ি দিয়ে চুল ধরে টেনে কয়েকটা থাপ্পড় মেরে হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিল। আমি বুঝতে পেরলাম যে আবার জেলে যেতে হবে এখন আর সংশোধন কেন্দ্রে নয় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে যেতে হবে যেহেতু এখন আমি আঠারো বছরের বেশি বয়সি পুরুষ।

আপনারা চিন্তা করবেন না যেহেতু চুরি করার পরিকল্পনা ছিল আবার এখানে চুরি করতেও পারি নাই তাই খুব লম্বা সময়ের জন্য জেল হবে না। হয়তো ছয় মাস না হয় এক বছর। কিন্তু এ কয়দিন যে এই বাসায় কাটালাম এটা আমার জীবনের স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে। এখন আপনারা বলবেন আমি জেল থেকে বের হয়ে কী করব আমি আর কি জানি একটাই কাজ জানি তাই করব, যত দিন ধরা না খাই এ দুনিয়ার কষ্ট সহ্য করব আর ধরা খেলে তো ভালোই জেলের বালি দেওয়া রুটি আর কাঁকর মিশানো ডাল খাব। আমাদের মতো ফুটপাতে থাকা লোকদের কোনো পরিকল্পনা থাকে না শুধু একটি পরিকল্পনা থাকে এক একটি দিন কীভাবে বেঁচে থাকব।

আরো পড়তে পারেন

শেষ বিকেলের অতিথি

আজ চন্দ্রার কথা মনে পড়তেই ছল ছল চোখে অশ্রুবিন্দু ঝড়ছে। তার অভিমানের শেষ আকুতি মনের মধ্যে বারবার ধাক্কা দেয়। তার প্রস্থান শেষ পর্যন্ত এতো কঠিন হবে বুঝতে পারিনি। আগেও চন্দ্রার সাথে হয়েছে অভিমানের খুনসুটি। নিজেকে মেঘের আড়ালে ঢাকতে চেয়েছে, কিন্তু সে মানাভিমান ক্ষণিকেই ইতি ঘটে গেছে। জোছনা হয়ে সে ধরা দিয়েছে। খুব ছোট্ট বিষয় নিয়ে….

স্মৃতি এখন কী করবে

জেলখানা থেকে বেরিয়ে স্মৃতি বাসে চড়ে বসে। সঙ্গে ওর মেয়ে ফাতেমা। বেশিক্ষণ কথা বলতে পারেনি হায়দারের সঙ্গে। শুধুই চোখ বেয়ে পানি পড়েছে। ফাতেমাও ওর বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে। আর হয়তো দেখা হবে না বাবার সঙ্গে। হায়দারের চোখও ভেজা ছিল। আজই হয়তো ওদের শেষ দেখা। হায়দার বারবার স্মৃতির হাত ধরে অনুরোধ করেছে ওকে ক্ষমা করে দিতে।….

ইন্টারভিউ

কত দিন পর দেখা হলো রূপার সঙ্গে। তা মনে করতে পারছি না। চোখে চোখ পড়তেই কিছুটা থমকে গেলাম। চিন চিন করে উঠল বুকের ভেতর। ভেতর-বাইর শুরু হলো জ্বলন-পোড়ন। কথা বলব কি-না তা বুঝে ওঠার আগেই সে এলো এগিয়ে। আমাকে বলল, সায়েম তুমি এখানে? আমার ইন্টারভিউ আজ। তোমারও কি তাই? হ্যাঁ। আমারও তাই। কেমন আছ তুমি?….

error: Content is protected !!