আকাশের শরীর জুড়ে কালো মেঘের আহাজারি। দুঃখ গলে থোকায় থোকায় ঝরে পড়া অশ্রুর মতো প্রবল ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। আলোর ঝলকানি মুহূর্তে মুহূর্তে আঁধারের বুকে আলো দিয়ে যাচ্ছে। দুইটি বৈদ্যুতিক খুঁটির মাঝামাঝি দুরত্বে তারের ওপর একটি পাখি বসে আছে। মেঘের গর্জন হতেই কেঁপে কেঁপে উঠছে। সঙ্গে ছাতা নেই, চায়ের দোকানে বসে আছি। বৃষ্টি থামার অপেক্ষা। ফুলবাড়ি থেকে কয়েক মিনিট দূরত্বে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। মিলির কাছে প্রতারিত হওয়ার পর প্রথম এসেছি। সেদিনও খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। চোখের জল কেউ দেখেনি। মানুষ ভুলে গেলেও প্রকৃতি সব লিপিবদ্ধ করে রাখে। কখনো সখনো পুনরাবৃত্তি ঘটায়। না হলে আজকেই বৃষ্টি হতে হবে কেন! কয়েকদিন আগেও বৃষ্টির জন্য কি হাসফাস অবস্থা। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জীবন অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ছিটে-ফোঁটাও ঝরেনি।

সামনের কাচা-পাকা চুলের ভদ্রলোকের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু ভদ্রলোক স্বাভাবিক ভাবে বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবেন কিনা- না পারলে পাগল মনে করতে পারেন ভেবে বলিনি। পাগল ভাবলেও খুব যে ক্ষতি ছিল, খারাপ লাগতো তা নয়। বাড়ির অনেকেই আমাকে পাগল মনে করে। যদিও সাইকোলজির ভাষায় আমার কর্মকাণ্ডকে পাগলামি বলা হয়নি। তাছাড়া আমি লিখতে ভালোবাসি। দশটা-পাঁচটা চাকরিতে যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন কোনোদিন ছিল না। বাবা-মায়ের পরিশ্রমের টাকায় পড়ালেখা শিখেছি। ছাত্র জীবনে ভালো ফলাফল করে আনন্দ দিতে পারিনি। তাঁরা খুশি হবেন ভেবেই অনার্স শেষে চাকরির প্রস্তুতি নিই। নিয়তি প্রসন্ন ছিল। দ্রুত চাকরি পেয়ে যাই। পাশাপাশি লেখালেখির স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে দ্বিতীয় মাস্টার্স করি। সৌভাগ্যের দ্বার খুলে যায়। এক পরিচিতের সহযোগিতায় চাকরির পাশাপাশি ছদ্মনামে একটি জাতৗয় দৈনিকে কনট্রিবিউটর হিসেবে লিখতে শুরু করি।

চাকরির নৈমিত্তিক চাপ, জীবনের টানাপোড়েন যন্ত্রণা দিলেও লিখতে পারা ও লেখা প্রকাশের আনন্দ সময়কে ইতিবাচক করে তুলছিল। চাকরি ছেড়ে দেব দেব করলেও সম্ভব হচ্ছিল না। সব সিদ্ধান্ত একা নেওয়ার অধিকার ব্যক্তির থাকে না। বারো বছর পর হারানো দুর্লভ বস্তু ফিরে পাওয়ার মতো নিভে যাওয়া প্রদীপে আলো জ্বলে উঠল। জাতীয় দৈনিকটি থেকে সহকারি সম্পাদক পদে যোগ দেওয়ার অফার পেয়ে বাড়িতে বললাম। কেউ রাজী না, বড় চাকরি ছেড়ে গিয়ে লাভ কী নানা প্রশ্ন। কিন্তু কারো আপত্তি শুনিনি। টাকা-পয়সা জমানো আছে। কালো টাকা না, বেতনের টাকা। বারো বছর ধরে মা-বাবাকে পাঠানোর পর নিজের খরচ ছাড়া বেতনের বাকি অংশ ব্যাংকে জমেছে। বিয়ে করিনি। সাদা-মাটা জীবনাচরণে অভ্যস্ত। কোনো খারাপ বাতিক নেই। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে কী করব!

যুক্তিতে কেউ কেউ ঘায়েল হলেও মায়ের সঙ্গে পারি না। তাঁর ধারনা, মিলিকে দেওয়া কথা রাখতেই চাকরি ছেড়েছি। এ কথা মিথ্যে, মায়ের মাথায় হাত রেখে বলতে পারিনি। মিলির সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে জানেন তিনি। এমনকি সংগীত সভায় ভায়োলিন বাদক যেদিন এলেন সেদিনও মা উপস্থিত ছিলেন। ‘জীবনের সুখ ভায়োলিনে খুঁজে পাই। খুশি হয়ে লোকে যা দেয় তাতেই খরচ চলে যায়।’ নিজের প্রসঙ্গে বাদক বলতেই পেছন থেকে মিলি বলল, ‘ভায়োলিন আমার খুব পছন্দ। আমার জন্য কেউ যদি ভায়োলিন বাজানো শিখত!’ প্রেমিক মন, তখন বয়সও কম। সগর্বে বলেছিলাম, ‘একদিন নিশ্চয়ই ভায়োলিন বাজাতে শিখব। তাছাড়া আমার তো চাকরি করার ইচ্ছে না। কিছুদিন চাকরি করব। টাকা-পয়সা কিছু জমলে চাকরি ছেড়ে দেব। তারপর ভালো লাগার কাজগুলো নিয়েই থাকব। লিখব, গান গাইব আরো কত কি করব!’ ভায়োলিন চর্চা তুলনামূলক কঠিন। হো হো করে সবাই হেসে উঠল। মা কিছু বললেন না। ভায়োলিন কিনতে চাইলেও কিনে দিলেন না। এইচএসসির পর মিলি প্রকৌশলে ভর্তি হলো। আমি কোথাও চান্স পেলাম না। কলেজে বিএসসি কোর্সে ভর্তি হলাম। কিছুদিন যেতেই মিলি নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করল। কষ্ট পেলেও আশা হারালাম না। প্রায়ই মিলির ক্যাম্পাসে গিয়ে অপেক্ষা করতে শুরু করলাম। কিন্তু কয়েক দিন যেতেই মিলি চূড়ান্ত ধাক্কাটা দিল। ‘কোনোদিন আমার ছায়াও যেন মাড়াবে না। আগে যা ছিল সব ভুলে যাও। তোমাকে পাত্তা দেওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। পারলে ক্ষমা করো, ভালো থাকো।’ বলে বন্ধুদের দিয়ে অপমান করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিল। ভালোবাসা হারানোর কষ্ট আত্মসম্মানকে ছাপিয়ে যায়। বেঁচে থাকার ইচ্ছে কমতে কমতে শূন্যের কাছে গিয়ে পৌঁছল। বাবা-মায়ের কথা মনে করে নিজেকে বোঝাতে বোঝাতে কষ্ট নিয়ন্ত্রণে এলেও সংগীত সভায় দেওয়া কথা হারালো না। চাকরি পেয়েই ভায়োলিন কিনে শিখতে শুরু করি।

মিলি বকুল ফুল খুব পছন্দ করতো। বকুল ফুল খুঁটে কত মালা গেঁথেছি। কলেজ শেষে বাড়ি আসার সময় বকুল ফুলের মালা হাতে দিলে কি যে খুশি হতো মিলি। ওর আনন্দ দেখেই মন ভরে যেত। ভদ্রলোক কি মিলিকে বকুল ফুলের মালা কিনে দেন?

বৃষ্টি কমে গেছে। আকাশ কাচের মতো ঝকঝকে পরিষ্কার। জীবন ও আবহাওয়া দুই সমার্থক। মুহূর্তে বদলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট থেকে একটু দূরে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। শিক্ষার্থীরা বেরোচ্ছেন। মিলি ও মিলির বর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সোর্সের দেওয়া তথ্য মিলছে। কিছুক্ষণের মধ্যে মিলিও বেরোবে। ব্যাগ থেকে ভায়োলিন বের করে বাজাতে শুরু করলাম। বুকের ভেতর আর্তনাদ হচ্ছে। মিলি থাকলে জীবনটা কী অন্যরকম হতো না! একটা জীবন অনায়াসে ভালোবেসেই কাঁটিয়ে দিলাম। কতজনের আহবান, মা-বাবা কারো কথার গুরুত্ব দিলাম না। ভাবছি আর বাজাচ্ছি। চারপাশে শীক্ষার্থীরা জড়ো হয়েছেন। সুর কেঁটে কেঁটে যাচ্ছে। গেটের দিকে চেয়ে চেয়ে বাজাচ্ছি। মিলির গাড়ির রং কালো। মিলি কি আমাকে চিনতে পারবে? পনেরো বছর দেখেনি। আমার ফেসবুকও নেই। মাথার চুল পড়ে গেছে। পেটে মেদ জমেছে। জিন্সের উপর টি-শার্ট পরি। ভায়োলিনের ব্যাগটা নিচে মাটিতে রাখা। ব্যাগের ওপর টাকা জড়ো হয়েছে। দশ টাকা, পাঁচ টাকার নোট। কয়েক মুহূর্ত বিরতি দিয়ে পুনরায় বাজাতে শুরু করলাম। রবীন্দ্রনাথের গান।
‘দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ও পারে,
আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাইনে তোমারে॥’ 

কালো গাড়িটা এসে থামল। উঁচু, ফর্সা, সুদর্শন একজন লোক নামলেন। না, মিলি ভুল করেনি। আমার চেয়েও ভদ্রলোক অনেক গুণ এগিয়ে। তাছাড়া মানুষ তো সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। আজকের অবস্থানে আমি যে কখনো আসতে পারব, কেউ তো কল্পনা করেনি। নিয়তির বোধ হয় এমনই নিয়ম, সম্ভাবনার চেয়েও অনেক অনেক মূল্যবান কিছুও কেউ কেউ পেয়ে যায়। মিলি কি তবে নির্দোষ? ভালোবাসা কি সম্ভাবনা, যোগ্যতা, পদবী, ভালো ফলাফল ইত্যাদির নিরিখে চলে। আর চললে তাকে কি ভালোবাসা বলে! মিলি বকুল ফুল খুব পছন্দ করতো। বকুল ফুল খুঁটে কত মালা গেঁথেছি। কলেজ শেষে বাড়ি আসার সময় বকুল ফুলের মালা হাতে দিলে কি যে খুশি হতো মিলি। ওর আনন্দ দেখেই মন ভরে যেত। ভদ্রলোক কি মিলিকে বকুল ফুলের মালা কিনে দেন? মিলি কি এখনো বকুল ফুল ভালোবাসে। পছন্দ, ভালোলাগা সময়ের সাথে সাথে বদলে যায়। মিলির ছোটো ছোটো ভালো লাগা গুলোও কি বদলে গেছে। কি সুন্দর গান গাইতো মিলি। একসঙ্গে হলে প্রায় বলতো বিয়ের পর বৃষ্টির দিনে গিটার নিয়ে ব্যলকনিতে বসে দুজনে গলা মিলিয়ে গান গাইব। ভদ্রলোক কি গান জানেন? মিলির স্বপ্নটা কি পূরণ হয়েছে। নাকি স্বপ্নও প্রতিনিয়ত বদলায়। কিংবা বাস্তবতা বদলাতে বাধ্য করে। লেখালেখি, গান, শিল্পকলার আর কতই বা মূল্য! পদ, পদবী, অর্থের ওজনে সম্মান নির্ধারিত হয়। তাই তো কবি, লেখক পরিচয় দিতে কেউ কেউ ইতস্তত করে। কিংবা একই কারণে লেখক, কবি, শিল্পী পরিচয় শুনে ঠোঁটের নিচে গোপন হাসি হাসে অনেকে। ভদ্রলোকও অন্য অনেকের মতো দাম্ভিক? বুকের ভেতর অহংকার নিয়ে ঘোরেন! কোনো কারণে কথা কাঁটাকাঁটি হলে মিলিকে কি কথা শোনান। মিলি কী সত্যিই ভালো আছে। মিলিকে কি ভদ্রলোক আমার চেয়েও বেশি ভালোবাসেন?

মিলি গাড়ি থেকে নামল। পরনে নীল শাড়ি, চোখে চশমা। অপরূপা দেখতে লাগছে। ওর দিকে চেয়ে আছি। অভ্যাসগত ভাবে হাত ভায়োলিন বাজিয়ে চলেছে। মিলি আমার দিকে এগিয়ে আসছে। দুই চোখ জলে ভরে উঠল। মিলি কি চিনতে পেরেছে, কথা বলবে? মিলি থামল। পার্টস থেকে পাঁচশ টাকার নোট বের করে ভায়োলিনের ব্যাগের ওপর রেখে ফিরে গেল। মুহূর্তের জন্য বুকের সমস্ত রক্ত হিম হয়ে গেল। মিলির গাড়ি ছুটে গেল বড় রাস্তার দিকে। আমি এক জীবন ভালোবাসার পুরস্কার হাতে নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম।

আরো পড়তে পারেন

প্রতিদান

‘আমাকে আপনার মনে নেই। থাকার কথাও নয়। সে জন্য দোষও দেব না। এত ব্যস্ত মানুষ আপনি, আমার মত কত জনের সঙ্গেই হঠাৎ চেনা-জানা। কেনইবা মনে রাখবেন তাদের সবাইকে?’ বেশ শান্ত গলায় বললেন মিসেস অঙ্কিতা। টেবিল থেকে কি যেন একটা নিলেন তিনি। পিটপিট করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো সাফরাব। একটা ইনজেকশন, একটা ছোট টেস্টটিউবের মতো ভায়াল,….

লিলিথ

শাওয়ার বন্ধ করে দিতেই পানির হালকা ঝিরঝিরে শব্দটা বন্ধ হয়ে যায়। প্রযুক্তির কল্যাণে ঝরনার শব্দ আজকাল বাসাতেই শোনা যাচ্ছে। আর এ শব্দটা অদ্ভুত সুন্দর। কেমন যেন মোলায়েম। সাদা তুলতুলে মেঘের মতো। অনেক দূর থেকে ভেসে ভেসে এসে জড়িয়ে ধরে। চোখের পাতাগুলোয় ঠান্ডা আমেজ ছড়িয়ে ঘাড় বেয়ে নামতে থাকে। আরামে চোখ বুজে আসে আমার। রিলাক্স হতে….

বন্ধনবিলাস

এ শতকের ধূলিধূসরিত ঢাকায় দাঁড়িয়ে কল্পনা করাও কঠিন। গত শতকের ঢাকা ছিল রাজহাঁসের পালকের মতো পরিচ্ছন্ন ধবধবে। একতলা-দোতলার ছাদে শীতলপাটি বিছিয়ে রাতের আকাশের দিকে চাইলে দেখা যেত নক্ষত্রদের কনফারেন্স। মেঘহীন রাতগুলোতে খুব কাছের হয়ে যেত দূরছায়া নীহারিকার পথ। যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। অগণ্য তারার যে কোনো তারাকে। রাস্তার দু’ধারে জামরুল-জিউল আর বাবলার অন্ধকার ঢাকতে….

error: Content is protected !!