Author Picture

ত্রিপুরায় বাংলা ভাষা প্রচলনে রাজাদেশ

মযহারুল ইসলাম বাবলা

মাণিক্য-রাজাদের শাসনামল জুড়ে তাঁরা রাজভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করতেন। ত্রিপুরার বাংলা ভাষার গদ্য রচনার শুরু হয়েছিল রাজাদের আদেশপত্রের মাধ্যমে। পুরাতন চিঠিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ, তাম্রপট্ট, সনদ-দানপত্র ইত্যাদিতে প্রাচীন বাংলা গদ্যের নিদর্শন পাওয়া যায়। মহারাজা কল্যাণমাণিক্যের ব্রহ্মোত্তর সনদটি ১৬৫১ সালে লেখা। [ড. শিশির কুমার সিংহ, ত্রিপুরার বাংলাসাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিহাস ]
সনদটি এরূপ :
ব্রহ্মোত্তর সনদ তাম্রপট্ট : মহারাজ কল্যাণমাণিক্য
(ত্রিদল বিল্বপত্রে শ্রী স এবং তদ খোদিত)
৭ স্বস্তি-শ্রী শ্রীযুক্ত কল্যাণমাণিক্যদেব বিশম সমর বিজয়ী মহামহোদয়ি রাজা নামাদেশায়ং শ্রীকারকোন বর্গে বিরাজতে হন্যৎ পরং রাজধানী হস্তিনাপুর সরকার উদয়পুর পরগণা নুরনগর মৌজে বাউড়খাড় অজ্জঙ্গলাতে শতদ্রোণ ভূমি প্রীতে শ্রীমুকুন্দ বিদ্যাবাগীশ ভট্টাচার্যকে দিলাম ইহা আবাদ করিয়া পুত্র পৌত্রাদিক্রমে ভোগ করিয়া আশীর্বাদ করিতে রহুক এহি ভূমির মাল খাজনা গয়রহ সমস্ত নিষেধ ইতি শকাব্দ ১৫৭৩ সন, ১০৬০ ত্রিপুরাব্দ তাং ১৬ মাঘ [ নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মণ, আবর্জনার ঝুলি ]

উদ্ধৃত সনদটি রাজাদেশ প্রচারের বা সনদ লেখার একটি প্রচলিত বয়ান। ‘স্বস্তি’ ত্রিপুরার অধিকাংশ রাজার সনদ ও আদেশনামায় দেখা যায়। রাজার নামের পরের বিশেষণগুলো ‘বিশম সমর বিজয়ী’ ইত্যাদি দ্বারা ত্রিপুরার রাজারা যে ক্ষত্রিয় এবং চন্দ্রবংশজাত একথা বোঝানো হয়েছে। আদিতে ত্রিপুরা রাজারা চীন-তিব্বতী গোষ্ঠীর তাই হস্তিনাপুরের কুরুরাজদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক প্রদর্শন আভিজাত্য প্রকাশেই ব্যবহার করতো। উদয়পুর দীর্ঘকাল রাজধানী ছিল বলেই ‘সরকার উদয়পুর’ বলা হয়েছে। সনদটির মূল অংশ নূরনগর (বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার একটি অঞ্চল) পরগনার বাউড়খাল মৌজায় অজ্জলঙ্গাতে অর্থাৎ জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলের একশত দ্রোণ ভূমি শ্রীমুকুন্দ বিদ্যাবাগীশ ভট্টাচার্যকে বংশানুক্রমে চাষাবাদের জন্য দেয়া হলো। এবং ওই জমির কর রাজ-সরকারকে দিতে হবে না। তারা জমি প্রাপ্তিতে রাজাকে বংশানুক্রমে আশীর্বাদ করবেন। স্বস্তি বচন, দানপত্রের বয়ান এবং কাল নির্ধারণে শকাব্দ, ত্রিপুরাব্দ, মাস, তারিখ ও দিনের উল্লেখ করা হয়েছে। সনদটি সংস্কৃত বা তৎসম শব্দযুক্ত। আরবি, ফারসি ভাষার শব্দও বাংলায় মিশ্রিত রয়েছে। সনদপত্রে কোন দাঁড়ি (। ) কমা (,) উল্লেখ নেই। [ ড. শিশির কুমার সিংহ, ত্রিপুরার বাংলাসাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিহাস ]

মহারাজা গোবিন্দমাণিক্যের বেশ ক’টি সনদ পাওয়া গেছে। সনদগুলো ভূমিদান সংক্রান্ত। প্রথম সনদটি ব্রহ্মোত্তর তাম্রপট্ট সনদ। কাল ১০৮২ ত্রিপুরাব্দ ২০ মাঘ (১৬৭২ সাল) এবং সর্বশেষটি ১৫৯৮ শকাব্দ (১৬৭৬ সাল)। মহারাজা কল্যাণমাণিক্য মঞ্জুরীকৃত এবং গোবিন্দমাণিক্য প্রদত্ত একটি আয়মা সনদ এরূপ:
৭ স্বস্তি-শ্রী শ্রীকল্যাণমাণিক্য দেব বিষম সমর বিজয়ী মহা ম(ভগ্ন) পাদপদ্মা নামা দেশোহয়ং শ্রী কারকোন বর্গে বিরাজ হন্যৎ রাজধানী হস্তিনাপুর সরকার এলাকে উদয়পুর পং মেহারকুল মৌজে গোবিন্দপুর ও কান্দিরপার কাজি মুমিন ও কাজি মনসুর ও কাজি হুসেন ও কাজিরলি এহারাবে ৫দ
পাঁচ দ্রোণ বারকানি ভূমি আয়মা (নিষ্কর ভূমি) দিলাম হাসিলা (কর্ষণযোগ্য ভূমি) বার বার দ জঙ্গলা ৫ দ্রোণ (৩২ সের পরিমাপক) সেই অনুসারে আবার পুত্রেরে জান মাহাম্মদ ও শুকুর মাহাম্মদ ও হাসিমে আয়মা দিলাম বাড়ীঘর মাপ এহি বাড়ী জরিপ না করোক এহি ভূমি ও লিয়াদোয়া করিয়া সুখ ভোগ করোক পাচা পঞ্চক ভেট বেগার ইত্যাদি সকল মানা ইতি সন যাব্রা ১৫৬৩ সন (যাব্রা বা যাব্দা শকাব্দ বা ত্রিপুরাব্দ) ১৯৬৯ তেরিজ (অঙ্ক যোগ) ৭ মাঘ
শ্রী শ্রীযুক্ত গোবিন্দমাণিক্য দেবেন দত্তং এবং ৫’পাঁচ দ্রোণ বারো কানি হাসিলা দিলাম সন ১০৭৭ [ ঐ ]

সনদটির সারকথা হচ্ছে মহারাজ কল্যাণমাণিক্য মেহেরকুল পরগনার (কুমিল্লা) অন্তর্গত গোবিন্দপুর ও কান্দিরপার মৌজার ৫ দ্রোণ বা বারো কানি নিষ্কর জমি ওই চার ব্যক্তিকে দান করলেন। আবাদযোগ্য বারো কানি, জঙ্গল ৫ দ্রোণ তাদের তিন পুত্রকে উপহার হিসেবে দিলেন। খাজনা মওকুফ। বাড়ি জরিপের বা মাপজোকের প্রয়োজন নেই। বাড়ি জমি সব ভোগ করুক। ঈশ্বরের শুভকামনায় সুখভোগ করুক। পঞ্চায়েতী কর (পাচাপঞ্চক), উপঢৌকন, বেগার প্রদান ইত্যাদি নিষিদ্ধ।

ত্রিপুরার প্রশাসনিক বাংলা ভাষার বিভিন্ন সনদ, দলিলপত্র, চিঠিপত্র, রাজকীয় মুদ্রা ও অন্যান্য রাজ অধ্যাদেশগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার বিশ্লেষণ করলে বাংলা গদ্যের বিবর্তনের বিষয় জানা যায়। 

রাজাদের বিভিন্ন আদেশনামাও পাওয়া গিয়েছে। মহারাজা কৃষ্ণকিশোরমাণিক্যের একটি পরোয়ানা বেশ কৌতূহলজনক। বাস্তুত্যাগী প্রজাদেরকে নিজেদের গৃহে প্রত্যাবর্তনের জন্য মহারাজা একটি পরোয়ানা জারি করেন। পরোয়ানাটি এরূপ:
সময়-কৃষ্ণকিশোরমাণিক্য
নং ২৫১ চিঠি রুজু
চিঠি রুজু-শ্রী বকস্ আলী ও ইচমাইল আলী সাকিন নিজ কৈলাসহর মোতালকে পর্ব্বত ত্রিপুরাকে সমাজ্ঞেয়ং কার্য্যঞ্চ পরং শোনা গেল তোমায় বাড়ী ছাড়িয়া অন্যখানে যাইয়া রহিয়াছ অতয়ব লিখা যায় তোমরা খাতির জমা হইয়া আপন বাড়ীতে আসিবা তোমাগ কোন বিষয় অন্যায় হইব না ইতি সন ১২৫৬ ১৮ কার্তিক

শোনা গেল তোমরা তোমাদের বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় গিয়ে রয়েছ। অতএব তোমরা নিজেদের বাড়িতে চলে আসবে। তোমাদের সম্বন্ধে কোন অন্যায় হবে না। পরোয়ানাটি ১৮৪৬ সালের।
ত্রিপুরা রাজ্যের রাজকার্যে বাংলা ভাষার আধুনিকায়ন সূচনা করেন মহারাজ বীরচন্দ্রমাণিক্যের (১৮৬২-৯৬) শাসন কালে। তাঁর আমলেই প্রশাসনিক, সনদ রচনায়, আদেশনামা, নিয়োগ, দান, ব্যক্তিগত পত্রাদি রচনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার যথাযথ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। [ ঐ ]
মহারাজা রাধাকিশোরমাণিক্যের ২টি আদেশনামা উদ্ধৃত করা হলো, ২টি আদেশনামাই রাজার নিজ হাতে লিখিত।
আদেশনামা-১, বাংলাভাষা সম্পর্কে মহারাজা রাধাকিশোরমাণিক্যের আদেশনামা। রাজমন্ত্রী রমণীমোহন চট্টোপাধ্যায়কে লিখিত।
এখানে আবহমান কাল রাজকার্যে বাঙ্গালা ভাষার ব্যবহার এবং এই ভাষার উন্নতিকল্পে নানা রূপ অনুষ্ঠান চলিয়া আসিতেছে; ইহা বঙ্গদেশীয় হিন্দুরাজ্যের পক্ষে বিশেষ গৌরবজনক মনে করি। বিশেষতঃ আমি বঙ্গভাষাকে প্রাণের তুল্য ভালোবাসি এবং রাজকার্যে ব্যবহৃত ভাষা যাহাতে দিন দিন উন্নত হয় তৎপক্ষে চেষ্টিত হওয়া একান্ত কর্তব্য মনে করি। ইংরেজি শিক্ষিত কর্মচারীবর্গের দ্বারা রাজ্যের এই চিরপোষিত উদ্দেশ্য ও নিয়ম ব্যর্থ না হয়, সে বিষয়ে আপনি তীব্র দৃষ্টি রাখিবেন।
মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী
শ্রী রাধাকিশোর দেববর্মা
১৩১৫ ত্রিপুরাব্দ

আদেশনামা-২। রাজমন্ত্রী অন্নদাচরণ গুপ্তকে লেখা মহারাজ রাধাকিশোরের আদেশ।
শ্রীহরি
অন্নদা বাবু,
এখানকার রাজভাষা বাঙ্গালা। বাঙ্গালাতেই সরকারী লিখাপড়া হওয়া সঙ্গত। ইদানীং কোন কোন স্থলে সরকারী কার্যে ইংরেজী ভাষার ব্যবহার হইতেছে ইহা আমি জানিতে পারিয়াছি। যাহাতে এরূপ কার্য না হয় তাহার প্রতিবিধান করিয়া দিবে। অবশ্য যে কার্য্যে ইংরেজী ভাষা ব্যবহার অনিবার্য্য তথায় ইংরেজী ভাষা ব্যবহার অবশ্য কর্তব্য হইবে। যেমন Political Deptt.। এরূপ স্থান ব্যতীত অনর্থক ইংরেজী ভাষা ব্যবহার করিয়া প্রচলিত ভাষাকে উপেক্ষা করা সঙ্গত হইবে না।
মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী
শ্রী রাধাকিশোর বর্ম্মন

প্রথম আদেশনামাটি ১৩১৫ ত্রিপুরাব্দে অর্থাৎ ১৯০৫ সালের এবং উদ্ধৃত দ্বিতীয় আদেশনামাটি ১৯০৮ সালের। বলা বাহুল্য ভারতবর্ষের প্রশাসনে তখন ইংরেজি ভাষা চেপে বসেছে। এমনকি অবিভক্ত বাংলা প্রদেশেও যখন প্রশাসনিক কাজে বাংলা ভাষা উপেক্ষিত, ওই সময়ে এক প্রত্যন্ত পার্বত্য রাজ্যের এক আদিবাসী রাজা বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য অধ্যাদেশ জারি করেছেন— এটা বিস্ময়কর বটে। মহারাজা রাধাকিশোর-এর পুত্র মহারাজা বীরেন্দ্রকিশোরও তাঁর পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ও আদর্শ অনুসরণে সমস্ত প্রশাসনিক কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহার করার জন্য অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন। ১৩২৪ ত্রিপুরাব্দের ১৭ই বৈশাখ মন্ত্রী ব্রজেন্দ্রকিশোর দেববর্মনের স্বাক্ষরে মহারাজার সেই আদেশ (ত্রিপুরা রাজ্য সারকুলার নং-৩) প্রচারিত হয়। তাতে বলা হয়—
“এ রাজ্যের অফিস আদালত সমূহের প্রচলিত ভাষা বাঙ্গালা। সর্ব্ববিধ রাজকার্য্যে আবহমানকাল হইতে বাঙ্গালা ভাষা ব্যবহৃত হইয়া আসিতেছে। এই নিয়ম অক্ষুণ্ণ রাখা স্বর্গীয় মহারাজ বাহাদুরগণের অভিপ্রেত ছিল। এই অভিপ্রায় সংসাধনোদ্দেশ্যে প্রাতঃস্মরণীয় স্বর্গীয় মহারাজ বীরচন্দ্রমাণিক্য বাহাদুর ১২৮৪ ত্রিপুরাব্দে ‘নিষ্পত্তি পত্রাদি লিখিবার আইন’ শীর্ষক এক বিধি প্রচার করিয়াছিলেন, বর্তমান সময়েও তাহা প্রচলিত ও প্রবল আছে। পরমপূজ্য স্বর্গীয় মহারাজ রাধাকিশোরমাণিক্য বাহাদুর লিখিত ও বাচনিকরূপে এ বিষয়ে স্বীয় অভিমত বারম্বার কর্মচারীদিগকে জানাইয়াছেন। তাঁহাদের এই কল্যাণকর মহদভিপ্রায় সসম্মানে প্রতিপালন করা রাজকর্ম্মচারী মাত্রেরই কর্ত্তব্য। কিন্তু অধুনা কোন কোন স্থলে তাহার বৈলক্ষণ্য ঘটিতে দেখা যাইতেছে।” [ ঐ ]

উদ্ধৃত আদেশনামাটি থেকে একথা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে যে ত্রিপুরা রাজ্যে সুদূর অতীতকাল থেকে রাজভাষা ছিল বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষাতে প্রশাসনিক কাজের উপযোগী করে তোলার জন্য রাজারা আদর্শবিধি প্রণয়ন করেছিলেন। তাছাড়া আইন, বিচার, ব্যবস্থাপক সভা, জেল প্রশাসন, শিক্ষা প্রভৃতি বিষয়ক প্রশাসনিক বাংলা ভাষা গঠনে তথা শব্দকোষ ও পরিভাষা (ইংরেজি শব্দের) প্রণয়নের ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছিল। ত্রিপুরা রাজ্যের প্রশাসনিক কাজের ব্যবহারের জন্য যে শব্দকোশ (দেশি ও বিদেশি ইংরেজি, আরবি-ফারসি), ইংরেজি শব্দ, বাক্য ও বাক্যাংশের পরিভাষা তথা ভাবানুবাদ করা হয় তা যেমন বিস্ময়কর তেমনি প্রশংসার দাবি রাখে।

বাংলাদেশ আজ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র— বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ২৭ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। এই বাংলা ভাষা পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম ভাষা। এই ভাষার ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি। অথচ বাংলা ভাষা অখণ্ড বাংলার রাজভাষা কখনো ছিল না।

বাংলাদেশ আজ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র— বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ২৭ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। এই বাংলা ভাষা পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম ভাষা। এই ভাষার ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি। অথচ বাংলা ভাষা অখণ্ড বাংলার রাজভাষা কখনো ছিল না। অথচ বাংলাদেশের বাইরে এক ককবরক (বোড়ো) ভাষী আদিবাসী মোঙ্গল গোষ্ঠীভুক্ত রাজাদের রাজ্যের রাজভাষা ছিল বাংলা এবং তা সুদূর অতীতকাল থেকেই। ভারতের অপর বাংলাভাষী প্রদেশ পশ্চিম বাংলা। বাংলাদেশের পরই সর্বাধিক বাঙালির বাস সেখানে। রাজ্যের ভাষা বাংলা হলেও বাংলা ভাষার প্রচলন সেখানে ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে হিন্দি-ইংরেজি ভাষার আধিপত্য প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার ম্রিয়মান হয়ে পড়েছে। ত্রিপুরার রাজারা শাসন ব্যবস্থায় ধারাবাহিকভাবে বাংলাভাষা ব্যবহার করেছেন। খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতক থেকেই ত্রিপুরার মুদ্রায় (মহারাজ ধন্যমাণিক্যের মুদ্রা শক ১৪১২, খ্রি. ১৪৯০) বাংলা লিপির ব্যবহার দেখা যায়। এমনকি রাজকার্যে বাংলা ভাষা ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায় ১৬৫১ সাল থেকেই (মহারাজ কল্যাণমাণিক্যের সনদ)। কিন্তু ড. দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর গ্রন্থে মহারাজ গোবিন্দমাণিক্যের একটি তাম্রলিপির উল্লেখ করলেও আর সবাই ত্রিপুরার মূল্যবান প্রাচীন দলিলগুলোকে উপেক্ষা করেছেন। অথচ ত্রিপুরার মহারাজাদের সনদ, তাম্রপট্ট, মুদ্রা, চিঠিপত্র ইত্যাদিতে বাংলা গদ্য ব্যবহৃত হয়েছিল বাংলা গদ্যের উদ্ভব ও বিকাশের পর্যালোচনার ক্ষেত্রে সেগুলোর মূল্য অপরিসীম। বিশেষ করে দলিল ও সনদগুলোর বিষয় বৈচিত্র্যও লক্ষণীয়। ভূমি দান থেকে শুরু করে মনুষ্য বিক্রয় (আত্ম বিক্রয়), নিষ্কর ইনাম, কাজীনামা, নানকার (বসত বাড়ির জন্য প্রদত্ত ভূমি) সনদ, মজুমদারী সনদ, চেরাগী খয়রাতের সনদ (চেরাগ প্রদীপ দেখানোর ভূমি দান), দেবোত্তর দলিল, বাস্তুত্যাগী প্রজাকে নিজগৃহে প্রত্যাবর্তনের জন্য পরোয়ানা ইত্যাদি সনদ ও দলিল এবং রাজ অধ্যাদেশ পাওয়া গেছে। সনদ রচনার ছক গতানুগতিক হলেও অনেক দলিল, পরোয়ানা, রাজ অধ্যাদেশে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে মহারাজা রাধাকিশোরমাণিক্যের সময়ে রচিত রাজ অধ্যাদেশগুলোর বৈচিত্র্য লক্ষ্য করার মতো। ওই সময়ে ত্রিপুরাতে সাধু বাংলা গদ্যের যে একটা সাধু সংস্কৃত রূপ গড়ে উঠেছিল তা তাঁর অধ্যাদেশগুলো গভীর ভাবে লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে। একটি অধ্যাদেশ উদ্ধৃত করা হলো:
এক দুঃস্থ ঠাকুর পরিবারের জন্য খোরপোশ মঞ্জুরি
শ্রীহরি
R. K. DebBarman
(মেমো নং-১) মেমো নং-১ কুমিল্লা নিবাসী শ্রীযুক্ত মহেশচন্দ্র ঠাকুরের প্রার্থনাপত্র পাঠে জানা যায় ঈশ্বরচন্দ্র ঠাকুরের মৃত্যু হওয়াতে তাহার সন্তান সন্ততিগণ নিতান্ত বিপন্ন অবস্থায় পতিত হইয়াছে এবং এ পক্ষের অনুগ্রহ ভিন্ন তাহাদের গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য কোন উপায় নাই এজন্য উহাদের জীবিকা নির্বাহের একটা বন্ধ্যান করিয়া দেওয়া এপক্ষে অভিপ্রেত, অতএব আদেশ হইল যে, মৃত ঈশানচন্দ্র ঠাকুরের পরিবারের ভরণ পোষণ ব্যয় বাবদ বর্তমান বৈশাখ মাস হইতে দ্বিরাদেশ পর্যন্ত মাসিক মং ৭৫ (পঁচাত্তর) টাকা হারে দেওয়া হইবে, প্রতিমাস অন্তে এখানে আসিয়া উক্ত টাকা নেওয়ার পক্ষে অসুবিধা ও ব্যয়সাধ্য হইবে বিবেচনায় ঐ টাকা চাকলার কাছারী হইতে দেওয়ার বরাত দেওয়া গেল। চাকলার কার্যকারক রীতিমত টাকা দিয়া এখানে ইরশালী চালান প্রেরণ করিবে;
এই মেমোর প্রতিলিপি অবগতি ও আচরণার্থ সংসার বিভাগে ও চাকলা কাছারীতে পাঠান যায়। ইতি ১৩০৯ ত্রিং ৩০ শে বৈশাখ। [ ঐ ]

অধ্যাদেশটির ভাষা বিদ্যাসাগর সৃষ্ট ও বঙ্কিমচন্দ্র কর্তৃক মার্জিত গদ্যরীতির কথা মনে করিয়ে দেয়। ভাষা বেশ স্বচ্ছন্দ, তৎসম শব্দের ব্যবহার কম। বিদেশি শব্দের ব্যবহার আরো কম। ‘কার্যকারক’ শব্দটির ব্যবহার লক্ষণীয়, এটি ইংরেজি ‘manager’ শব্দের প্রতিশব্দ।

ত্রিপুরার প্রশাসনিক বাংলা ভাষার বিভিন্ন সনদ, দলিলপত্র, চিঠিপত্র, রাজকীয় মুদ্রা ও অন্যান্য রাজ অধ্যাদেশগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার বিশ্লেষণ করলে বাংলা গদ্যের বিবর্তনের বিষয় জানা যায়। সপ্তদশ শতক থেকে উনিশ শতকের শেষ ভাগ পর্যন্ত সময়কালে বাংলা গদ্যের যে প্রচলন গড়ে উঠেছিল তার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় যে, ওই সময়ে ত্রিপুরায় প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত বাংলা গদ্য সংস্কৃত রীতি আশ্রিত কিংবা আঞ্চলিক কথ্য ভাষার দ্বারা প্রভাবযুক্ত হলেও, অনেকাংশেই সমকালে প্রচলিত গদ্যরীতির চেয়ে অধিকতর পার্থক্য মনে হবে না।

চিঠিপত্র :
১৫৫৫ সালে (১৪৭৭ শকাব্দে) কোচবিহার রাজ নরনারায়ণ কর্তৃক আসামের রাজা চুকাম্ফা স্বর্গদেবকে লিখিত পত্রটিকে— ‘লেখনং কার্য্যঞ্চ। এথা আমার কুশল। তোমার কুশল নিরন্তরে বাঞ্চা করি। তোমার আমার সন্তোষ সম্পাদক পত্রাপত্রি যাতায়াত হইলে উভয়ানুকূলে প্রীতির বীজ অঙ্কুরিত হইতে রহে’… ইত্যাদি বাংলা গদ্যের প্রাচীনতম নিদর্শন বলেই মনে হয়।

১৫৫৩ শক অর্থাৎ ১৬৩১ সালে আসামের রাজা গৌহাটির ফৌজদার আলোয়ার খাঁকে যে পত্রটি লেখেন—
স্বস্তি বিবিধ
সস্নেহ লিখন্য কার্যঞ্চ। আগে এথা কুশল। তোমার কুশল সতত চাহি। পরং সমাচার পত্র এহি। এখন তোমার উকিল পত্রসহ আসিয়া আমার স্থান পঁহুছিল। আমিও প্রীতিপ্রণয়পূর্বক জ্ঞাত হইলাম। আর তুমি যে লিখিয়াছ তোমার উত্তমপত্র আসিচে আমার কিঞ্চিত মনস্বিতা না রহে এযে তোমার ভালই দৌলত। অতএব আমিও পরম আহ্লাদরূপে জানিতে আছো তোমার আমার অদ্বয়ভাব প্রীতি ঘটিলে সমমাফিক সন্তোষ কি কারণে না হইবেক।
১৬৫৩ সালের একটি স্বীকৃতিপত্র
৭ঁ আদিকীর্দ্দ সকল মঙ্গলালয় শ্রী সিবারাম চক্রবর্ত্তী সদাসয়েষু শ্রীলিখিত কার্যঞ্চ আগে মৌজে (গ্রাম বা এলাকা) মৃজ্জাপুর তোমাকে আয়মা (নিষ্কর) দিল ওয়া দোয়া করিয়া ভোগস্বত্ব গ্রামের রাজস্ব আমীদির তোমার সহিত রাজস্বের দাতা (দাবি, অধিকার) নাহি আর আমরা আবহ পরগণাতে জে তোমার আমল (শাসন) আছে তাহা আমলস্বত্ব ইতি তাং ২১ ফাল্গুন সন ১০৫৯ [ ঐ ]

১২৯৬ ত্রিপুরাব্দের ১৮ই জ্যৈষ্ঠ (‘রাজর্ষি’ উপন্যাসের উপকরণ বিষয়ে) মহারাজ বীরচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে লিখিত পত্রের অংশ বিশেষ—
‘সদ্গুণান্বিতেষু—আপনার পত্র পাইয়া যারপর নাই সুখী হইলাম। লিখিয়াছেন, আমাদের পরিবারের সহিত আপনাদের পরিবারের যে সম্বন্ধ ছিল তাহা স্মরণ করিয়া দেওয়াই আপনার উদ্দেশ্য। সে সুখের সম্বন্ধ আমি ভুলি নাই। আপনি পুনরায় তাহা গৌরব করিতে অগ্রসর হইয়াছেন, তজ্জন্য বিশেষ আপ্যায়িত ও বাধিত হইলাম। ভরসা করি, মধ্যে মধ্যে আপনার অবসর মত এরূপ অমায়িক ভাবপূর্ণ পত্র পাইব।
‘মুকুট’ ও ‘রাজর্ষি’ নামক দুইটি প্রবন্ধই আমি পাঠ করিয়া দেখিয়াছি। ঐতিহাসিক ঘটনা সম্বন্ধে যে যে স্খলন হইয়াছে তাহা সংশোধন করা আপনার বিশেষ কষ্টসাধ্য হইবে না।’ [রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরা, রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ]

আরো পড়তে পারেন

একাত্তরের গণহত্যা প্রতিহত করা কি সম্ভব ছিল?

২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানি নরঘাতকেরা যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই এক রাতেই শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় তিন হাজার। এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা একতরফাভাবে….

ভাষা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা

আগের পর্বে পড়ুন— চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল) ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে দুই হাজার মাইল দূরত্বের….

চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল)

আগের পর্বে পড়ুন— বায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ একুশের আবেগ সংহত থাকে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেও। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান এক বিবৃতিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। আওয়ামি লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম কমিটির সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র….

error: Content is protected !!