Author Picture

কমান্ডার চে গুয়েভারার জোয়েল : রণাঙ্গণে মমতার গল্প

শাহ বুলবুল

‘তিনি (কমান্ডার লা চে) এমন একজন মানুষ ছিলেন যখন তিনি কোন বিষয়ে কিছুটা বাড়াবাড়ি বা ভুল করতেন পরবর্তীতে তা অধীনস্থদের সামনে ভুল হিসেবে স্বীকার করে নিতেন। তাঁর ছিলো অসাধারণ মানবিক সংবেদনশীলতা, আমাদের অনেকেরই হয়তো মনে থাকবে লড়াইকালে যাদের মৃত্যু হতো চে ব্যক্তিগতভাবে তাদের পরিবারকে চিঠি লিখতেন এবং ভাগ করে নিতেন সবার কষ্টগুলোকে। চে হাসতেও জানতেন, ঝাঝা নদী পার হয়ে গেরিলা বাহিনী নিয়ে আমারা পৌঁছলাম একজন গ্রাম্য কৃষাণির বাড়িতে। কৃষাণি আমাদের জন্য কফি তৈরি করলেন কিন্তু ভুল বশত চে’র কফিতে চিনি দেওয়া হয়নি তথাপি চে তেতো কফি পান করে বললেন-বাহ! চমৎকার হয়েছে। আসলে কৃষাণির বাড়িতে প্রথম প্রবেশকারী আরমান্দো আকোস্তার মাধ্যমে আমরা তেতো কফির ব্যাপারটি আগেই টের পেয়ছিলাম তাই সবাই আমরা বেশ হাসাহাসি করলাম। তাঁর (কমান্ডার চে) ব্যক্তিত্বের আরেকটি বৈশিষ্ট ছিলো সকল ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা। তিনি প্রত্যেক কমরেডকে পরিমাপ করতেন বিপ্লবের প্রতি তার শপথ এবং রণ প্রস্তুতি বিবেচনায়। আমার মনে আছে, আমরা তখন লাস ভিলাসের পথে। একজন সহযোদ্ধা তাঁকে ভার্জেন দে লা কারিদাদ দেল কোবরের একটি ছবি দিয়ে বলেছিলেন এটি হাভানার গেটে নিয়ে যেতে হবে। চে তাকে ধন্যবাদ জানালেন এবং প্রতি উত্তরে বললেন অত দূর নিয়ে যেতে হবে না কারণ ছবিট এসকামরের গেট পর্যন্ত নিতে পারলেই তিনি খুশি। চে সম্মানের সাথে উপহার গ্রহণ করেছিনে যদিও তিনি এসব বিশ্বাস করতেন না।’ পিতৃতুল্য সহযোদ্ধা- কমান্ডার চে গুয়েভারা সম্পর্কে স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন সিয়েরা মায়েস্ত্রা থেকে এসকামরে পর্যন্ত প্রতিটি লড়াইয়ের সাহসী যোদ্ধা জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভা। কিউবান লেখিকা আদিস কাপুল রেস এবং লেখক ফ্রোইলান গঞ্জালেজ গার্সিয়ার বই ‘চে এন্ট্রে নোসোত্রোস- আমাদের মাঝে চে’ বইয়ে তুলে ধরা হয় কমান্ডার চে গুয়েভারার সাথে তাঁর সন্তানতুল্য সহযোদ্ধা জুয়েলের সম্পর্কের আদ্যোপ্রান্ত।

লা মেসা ভিত্তিক কলাম-৪ এর সিরো রেদোনদো আক্রমণাত্মক গেরিলা বাহিনী নিয়ে কমান্ডার চে গুয়েভারা দে লা সেরনা পর্বত, জলাভূমি আর সুরক্ষিত জঙ্গল ঘেরা সানক্তি স্পিরিতাসে আসেন ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে। অগ্নিঝরা লড়াইয়ের দিনে বিপ্লবী চে গুয়েভারার আগমন স্মৃতিকে নিবেদন করে সানক্তি থেকে প্রকাশিত এসকামরে পত্রিকা প্রকাশ করে একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র। কমান্ডার চে গুয়েভারার সানক্তি স্মরণে নিবেদিত এসকামরের ক্রোড়পত্রে প্রকাশ করা হয় আদিস কাপুল এবং গার্সিয়ার আমাদের মাঝে চে বইয়ের একটি নিবন্ধ ‘দে লা মানো দেল চে-চে’র হাত থেকে’। এটি মূলত: যোদ্ধা জোয়েল ইগলেসিয়াসের একটি সাক্ষ্য যেখানে জোয়েল বলেন-‘চে আমাদের পরিবার নিয়ে সবসময় চিন্তা করতেন কারণ তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন আমাদের অভাবতাড়িত সাংসারিক জীবন। আমি যখন প্রথম বেতন পেলাম তখন সে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন বেতনের পেসো দিয়ে আমি কী কারার পরিকল্পনা করছি। আমি যখন বিয়ে করলাম তখন চে আমার বিয়ের সাক্ষী হলেন। তিনি সর্বদা আমাদের খোঁজখবর রাখতেন-আমরা কেমন আছি, অধ্যায়ন করছি কি না ইত্যাদি। চে আমাদের প্রতি নজর রাখতেন পিতামাতার মতোই।’

২.
কমান্ডার চে গুয়েভারা দে লা সেরনার সন্তানতুল্য গেরিলা যোদ্ধা জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভা। বাতিস্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত বিপ্লবী গেরিলা বাহিনীর সর্বকনিষ্ঠ যোদ্ধা যাকে বলা যায় শিশু যোদ্ধা। স্বাধীনতাকামী জনগণের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে অকুতোভয় যোদ্ধা জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভার জন্ম ১৯৪১ সালের আগস্ট মাসে, সান্তিয়াগো দে কিউবার লা লুজ ইউনিয়ন পরিষদের অন্তর্গত গ্রামীণ বসতি এল তাবলোনে মতান্তরে ওরিয়েন্তে প্রদেশের এল তাবলোন গ্রামে। অধিকাংশ মতে এটি লা লুজের গ্রামীণ বসতি এল তাবলোন। বিপ্লব পূর্বকালে সান্তিয়াগো দে কিউবার অন্যান্য অঞ্চলগুলো জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় বেশ সমৃদ্ধ হলেও জোয়েলের এল তাবলোন গ্রাম ছিলো অনেকটা পিছিয়ে। অর্থাৎ গেরিলা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ফিদেল কাস্ত্রোর ২৬ জুলাই আন্দোলনের সমর্থক এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভা। স্থানীয় ভাষায় যাদের বলা হয় গাজিরো। কিউবায় বসতি স্থাপনকারী স্পেনিশরা শ্রমদাস হিসেবে গাজিরোদের আমদানি করে কলম্বিয়া এবং ভেনেজুয়েলার মধ্যবর্তী গুয়াজিরা অঞ্চল থেকে। শ্রমদাস হয়ে আসা গাজিরোদের বাস গ্রামাঞ্চলের খুপরিতে যারা বছরের পর বছর ক্ষুধার জ্বালা নিবারনে রক্তচোষা ভূমিমালিকদের হাতে জিম্মি। ফিদেলের ভাষায় গাজিরো শ্রমদাসরা বাস করে দুঃখী কুঁড়েঘরে যারা ক্ষুধার্ত হয়েও সন্তানদের সাথে দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়। আজীবন জমিতে শ্রম দিলেও গাজিরোদের মৃত্যু হয় কোন প্রকার জমির মালিকানা ছাড়া সামন্ত দাস হিসেবে।

গেরিলা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ফিদেল কাস্ত্রোর ২৬ জুলাই আন্দোলনের সমর্থক এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভা। স্থানীয় ভাষায় যাদের বলা হয় গাজিরো। কিউবায় বসতি স্থাপনকারী স্পেনিশরা শ্রমদাস হিসেবে গাজিরোদের আমদানি করে কলম্বিয়া এবং ভেনেজুয়েলার মধ্যবর্তী গুয়াজিরা অঞ্চল থেকে

৩.
আলেগ্রিয়া দে পিও যুদ্ধে বিপ্লবী গেরিলা বাহিনী দুঃখজনকভাবে পরাজিত হলেও তারা প্রথমবার জয়ের মুখ দেখে ১৯৫৭ সালের ১৭ জানুয়ারি। কাস্ত্রো- চে কমান্ড দক্ষিণ উপকূলে একটি সেনা ফাঁড়ি আক্রমন করে তা দখল করে নেয়। লা প্লাতার যুদ্ধে গেরিলা বাহিনীর কাছে শক্তিশালী বাতিস্তা বাহিনীর অপমানজনক পরাজয়ের খরব ছড়িয়ে পড়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। দেশে ও দেশের বাইরে জনমত বাড়তে থাকে বিপ্লবী গেরিলা বাহিনীর পক্ষে। এসময় বহুকাল থেকে কিউবার মাটিতে বঞ্চিত গাজিরোদের ঢল নামে সিয়েরা মায়েস্ত্রার পথে। অন্যান্য গাজিরোদের মতোই শোষণ আর একনায়কত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আগুন চোখে চাচাতো ভাই হার্মিস লেভা ইগলেসিয়া এবং প্রতিবেশী বেনিদিকতোর সাথে রওয়ানা হন সিয়েরা মায়েস্ত্রায়। বিপ্লবী গেরিলাদের পরিখায় পা রাখার আগেই পথে জোয়েলদের আটক করেন কমান্ডার এফিগেনিও আমেইজেইরাস দেলগাদো। সারারাত গেরিলা কমান্ডার দেলগাদোর দুর্গে আটক রেখে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পর সকালবেলা জোয়েল, হার্মিস এবং বেনিদিকতোকে হাজির করা হয় সিয়েরা মায়েস্ত্রায় সর্বাধিনায়ক ফিদেল কাস্ত্রোর সুরক্ষিত দুর্গ দে লা প্লাতায়। এসময় কাসা দেল ফিদেলে উপস্থিত ছিলেন গেরিলা গেরিলা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ফিদেল কাস্ত্রো, বিপ্লবী রাউল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারা, জুয়ান আলমেদা, সেলিয়া সানচেজ মানদুলি, ইনদিবিল সানচেজ আলভারেজ এবং কমরেড সিরো রেদোনদো।

১৯৫৭ সাল। গেরিলা দুর্গ কাসা দেল ফিদেলের মুহুর্তগুলো মোটেও অনুকূলে ছিলো না গাজিরো বালক জোয়েলের জন্য। একে তো কম বয়সী অন্যদিকে তাদের সাথে কোন হাতিয়ার নেই যা দিয়ে শত্রু বাহিনীর মোকাবেলা করতে পারবে। ঐসময় সিয়েরা মায়েস্ত্রার গেরিলা কমান্ড শুধুমাত্র ঐ সকল গাজিরোদের যোদ্ধা হিসেবে গ্রহণ করতেন যাদের সাথে ২৬ জুলাই আন্দোলনের সম্পৃক্ততা আছে অথবা আন্দোলনের কোন কমরেড দ্বারা সুপারিশকৃত। এসবের কিছুই ছিলো না জোয়েলদের হাতে। কমান্ডার দেলগাদোর নিশ্চায়ন সত্ত্বেও সান্তিয়াগো দে কিউবার এল তাবলোন থেকে আসা তিন অপরিচিত গাজিরোকে গেরিলা বাহিনীতে অন্তর্নিবেশ কোন ভাবেই মেনে নিতে চাননি ফিদেল। অনেক পীড়াপীড়ির শেষে জোয়েলের চাচাতো ভাই হার্মিস লেভা ইগলেসিয়া এবং প্রতিবেশী বেনিদিকতোকে গেরিলা বাহিনীতে গ্রহণ করা হলেও জোয়েলকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হলো তাকে তাবলোনে ফিরে যেতে হবে কারণ তার বয়স অনেক কম। দমে যাওয়ার বালক ছিলেন না জোয়েল তার অনঢ় মনোবলের কাছে শেষ অবধি হার মানতে হয়। গেরিলা বাহিনী তাবলোনের গাজিরো বালক জোয়েলকে গ্রহণ করে তবে কোন যোদ্ধা হিসেবে নয় বরং গেরিলা বাহিনীতে সহায়তাকারী হিসেবে কিছু কাজ করবেন এমন শর্তে। সিয়েরা মায়েস্ত্রার দে লা প্লাতা দুর্গে আসার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই হানাদারদের নগ্ন মিছিল মোকাবেলায় গেরিলা বাহিনীর একজন হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করে জোয়েল। সাহস, দক্ষতা আর বিপ্লবী বাহিনীর প্রতি চূড়ান্ত আনুগত্যের কারণে তাকে কমান্ডার ফিদেলের অধীন গেরিলা বাহিনীর জননী খ্যাত জোসে মারতি কলামের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

দে লা প্লাতার নির্দেশে জোয়েল রওয়ানা হন চে বাহিনীর খোঁজে। ১৯ মে ১৯৫৭ সাল, সিয়েরা মায়েস্ত্রায় পেলাদেরো নদীর উপনদী আরোয়ো দেল ইন্দিও’র পাড়। বিপ্লবী চে গুয়েভারার দেখা পান গাজিরো যোদ্ধা জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভা। বারতোলোম মাসোর কাসা দেল ফিদেলে দেখার আগেও বিপ্লবী চে গুয়েভারা দে লা সেরনা সম্পর্কে লোকমুখে শুনেছেন জোয়েল তবে সেটা খুব বেশি কিছু নয়। জোয়েল জানতেন, চে একজন আর্জেন্টাইন ডাক্তার। কমান্ডার ফিদেলে সাথে মেক্সিকোতে যার পরিচয়। অন্যদিকে, দোমিনিকান সংবাদ মাধ্যম দোমিনিকা ভিবেজে ২০১১ সালে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী-১৯৬০ সালে কিউবার জাতীয় বীর জোসে জুলিয়ান মার্তি পেরেজের জন্ম স্মরণে একটি বক্তৃতায় কমান্ডার আর্নেস্তো চে গুয়েভারা দে লা সেরনা জানিয়েছেন, কিউবা বিপ্লবের সর্বকনিষ্ঠ কমান্ডার জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভার সাথে তার প্রথম দেখার কথা। কমান্ডার চে গুয়েভারার স্মৃতি অনুযায়ী-‘কমান্ডার জোয়েল ইগলেসিয়াস যখন সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বতমালায় আসেন তখন তার বয়স ১৫ বছর। যখন সে আমার সাথে দেখা করে তখন আমি তাকে নিতে চাইনি কারণ সে ছিলো খুব ছোট। আমার কাছে মেশিনগানের যে বোঁচকা ছিলো তা কেউ বহন করতে চায়নি তাই আমি তাকে পরীক্ষা করেছিলাম এবং তাকে বললাম মেশিনগানের বোঁচকাটি নিয়ে খাড়া পাহাড়ের চূড়ায় যেতে। তিনি যে আজ এখানে আছেন তার অর্থ হলো সেই মিশনটি তিনি ভালোভাবে পূরণ করতে পেরেছেন।’

কমরেড জোয়েলের প্রাথমিক কাজ ছিলো রণাঙ্গণে চে গুয়েভারার হাতিয়ার ও মেশিনগানের বোঁচকা বহন করা। লড়াইয়ের দিনগুলোতে বীর গেরিলা যোদ্ধার হাতিয়ার বহনকারী হিসেবে মনোনীত হয়ে বাহিনীতে প্রবেশ করলেও ধীরে ধীরে জোয়েল হয়ে উঠেন বিপ্লবী চে গুয়েভারার আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক

বিপ্লবী আর্নেস্তো চে গুয়েভারা দে লা সেরনা সহকারি হিসেবে কমরেড জোয়েলের প্রাথমিক কাজ ছিলো রণাঙ্গণে চে গুয়েভারার হাতিয়ার ও মেশিনগানের বোঁচকা বহন করা। লড়াইয়ের দিনগুলোতে বীর গেরিলা যোদ্ধার হাতিয়ার বহনকারী হিসেবে মনোনীত হয়ে বাহিনীতে প্রবেশ করলেও ধীরে ধীরে জোয়েল হয়ে উঠেন বিপ্লবী চে গুয়েভারার আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক। সশস্ত্র সংগ্রামের বারুদময় রণাঙ্গণে নিজ সন্তানের মতোই জোয়েলকে আগলে রাখতেন চে। পিতৃতুল্য সেনাপতির হাতিয়ার বহনকারী জুয়েল ক্রমাগত চিহ্নিত হন যুদ্ধ জয়ের প্রতীক হিসেবে। সিয়েরা মায়েস্ত্রা থেকে এসকামরে-যুদ্ধের প্রতিটি ময়দানে কমান্ডার চে গুয়েভারার পাশে থেকে লড়াই করা জোয়েল বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখে হয়েও প্রাণে বেঁচে গেছেন পিতৃতুল্য কমান্ডার চে গুয়েভারার আপ্রাণ প্রচেষ্টায়। গুয়ামার এল উভেরো, বুয়ে আরিবার এল হোম্বরিতো, এল পেদরেরো এবং ফোমেন্তোর মতো প্রতিটি ভয়ানক সংঘর্ষে অত্যাচারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ডরভয়হীন সৈনিকের মতো লড়াই করেছেন গাজিরো বালক-কমরেড জোয়েল।

১৯৫৭ সালের জানুয়ারিতে লা প্লাতা জয়ের কয়েকদিন না যেতেই বিদ্রোহী গেরিলা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ফিদেল সিয়েরা মায়েস্ত্রার ওরিয়েন্তে উপকূল বরাবর সামরিক ব্যারাক এল উভেরো আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেন। সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বতমালার দুর্গম পথে বিরামহীন আট ঘন্টা হাঁটার পর গেরিলা বাহিনীটি ওরিয়েন্তে উপকূল বরাবর বাতিস্তা বাহিনীর এল উভেরো সামরিক ব্যারাকের কাছাকাছি এসে থামে ২৭ মে’র মধ্যরাতে। পাহাড়ী অন্ধকারে শত্রু বাহিনীর ব্যারাক ঘিরে অবস্থান নেয় বিপ্লবী গেরিলা বাহিনীর ৮০ জন যোদ্ধা। গেরিলা বাহিনীর পক্ষে আক্রমনের নেতৃত্ব দেন ফিদেল কাস্ত্রো, রাউল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারা এবং জুয়ান আলমেদা। ১৯৫৭ সালের ২৮ মে, খুব ভোরে ব্যারাকের রেডিও কক্ষ বরাবর মেশিনগানের গুলি ছুড়ে আক্রমনের সূচনা করেন বিপ্লবী গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার ফিদেল। ভোর পাঁচটা থেকে সকাল আটটা-তিন ঘন্টার ভয়াবহ সংঘর্ষে জালদিভার বাহিনীর ৫৩ সেনার ১৪ জনকে হত্যা করা হয়। এল উভেরো যুদ্ধে মারাত্মকভাবে আহত হন জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভার চাচাতো ভাই হার্মিস লেভা ইগলেসিয়া, বিদ্রোহী বাহিনীর কমান্ডার জুয়াল আলমেদা, কমরেড পেনা, মিগুয়েল, মারিও এবং আকুনা। যুদ্ধে উভয় পক্ষের আহত সৈনিকদের চিকিৎসা সেবা দেন গেরিলাদের বিপ্লবী ডাক্তার আর্নেস্তো চে গুয়েভারা। যুদ্ধ শেষে পুনরায় কমান্ডার চে ফিরে না আসা পর্যন্ত চাচাতো ভাই হার্মিস- সহ আটজন আহত গেরিলা যোদ্ধাকে পঞ্চাশ দিন দুর্গের গোপন স্থানে রেখে সেবা প্রদান করেন জোয়েল।

৪.
বিদ্রোহী বাহিনীতে জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভার প্রথম যুদ্ধ এল উভেরো। কিউবার বিস্ময়কর বিপ্লবী ইতিহাসে এল উভেরো ছিলো এক মহান বিজয় যার মাধ্যমে অল্প কয়েক জনের গেরিলা বাহিনীটি নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরে। এল উভেরো লড়াইয়ের কমান্ডার-বিপ্লবী চে গুয়েভারার মতে, এই যুদ্ধটি ছিলো সেই বিজয় যা আমাদের গেরিলা যুগের আগমনকে চিহ্নিত করে। শত্রু বাহিনীর ব্যারাক আক্রমনের পর প্লাটুন ভাগ হলে চে বন্ধুসম সর্বাধিনায়ক ফিদেলকে অনুরুধ সাপেক্ষে কমরেড জোয়েলকে রেখে দেন নিজ প্লাটুনে। যখন বাহিনীতে পদোন্নতি প্রদান করা হয় চে সর্বাধিনায়ক ফিদেলকে সুপারিশ করেছিলেন যাতে গাজিরো কমরেড জোয়েলকে লেফটেন্যান্ট মনোনীত করা হয় কিন্তু জোয়েল অক্ষরজ্ঞানহীন হওয়ায় ব্যর্থ হয় কমান্ডার চে’র প্রচেষ্টা। শুধুমাত্র লিখতে পড়তে না জানায় বাহিনীতে কোন পদ লাভ করতে না পারা জোয়েল এবং বাহিনী কমান্ডার চে দু’জনকেই ব্যথিত করে। পূর্বেই বলা হয়েছে সান্তিয়াগো দে কিউবার লা লুজ অঞ্চলের তাবলোন থেকে আসা গাজিরো বালক জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভাকে বিপ্লবী কমান্ডার চে গুয়েভারা নিতান্তই হাতিয়ারের বোঁচকা বহনকারী বা সহযোদ্ধা হিসেবে দেখতেন না, তাকে ভালোবাসতেন নিজের সন্তানের মতো। বিপ্লবী বাহিনীর পদোন্নতিকালে জোয়েল কোন পদে মনোনীত না হলেও কমান্ডার চে তাকে নিজ বাহিনীর অধীন একটি প্লাটুনের দলপতি করে নেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন যদি জোয়েল লিখতে পড়তে জানেন তবে তাকে ল্যাফটেন্যান্ট পদে উন্নীত করা হবে। সেই থেকে শুরু হয় আর্জেন্টাইন বিপ্লবী চে গুয়েভারা দে লা সেরনা এবং লা লুজের তাবলোন থেকে আসা সন্তানতুল্য গাজিরো বলাক জোয়েলের অন্যরকম এক লড়াই।

লালো লাবরাদা বাহিনী দেখতে পান সিয়েরা মায়েস্ত্রার কয়েক কিলোমিটার আগে জুলিও দে জাপাতেরোর পথ ধরে শত্রু বাহিনীর একটি বিশাল বহর রক্তপিপাসু লে. কর্নেল মেরোব সোসা গার্সিয়ার কমান্ডে উপত্যকার দিকে আসছে

আবারও রণ দামামা শোনা গেলো সিয়েরা মায়েস্ত্রায়। কমরেড জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভার জন্য নির্মম এক লড়াইয়ের নাম এল হোম্বরিতো। বিপ্লবী চে গুয়েভারার কমান্ডে গেরলা বাহিনী তখন আলতো দে কনরাদো দুর্গে। ১৮৫৭ সালের ২৯ আগস্ট। রাতের বেলা একজন স্থানীয় কৃষক আলতো দে কনরাদোর দুর্গে এসে কমান্ডার চে গুয়েভারাকে খবর দেন-জালদিভার সশস্ত্র রক্ষীরা এল হোম্বরিতো উপত্যকার পথ ধরে আলতো দে কনরাদোর দিকে আসছে। শত্রু বাহিনীর গতিপথ অনুসরণ করতে অগ্রগামী দল হিসেবে এদুয়ার্দো লালো সারদিনাস লাবরাদার অধীন বাহিনীকে পাঠানো হয় উপত্যকার পথে। লালো লাবরাদা বাহিনী দেখতে পান সিয়েরা মায়েস্ত্রার কয়েক কিলোমিটার আগে জুলিও দে জাপাতেরোর পথ ধরে শত্রু বাহিনীর একটি বিশাল বহর রক্তপিপাসু লে. কর্নেল মেরোব সোসা গার্সিয়ার কমান্ডে উপত্যকার দিকে আসছে। কমান্ডার চে জানতেন, আলতো দে কনরাদো দুর্গ আক্রমন করতে হলে মেরোব সোসা বাহিনীকে একটি গভীর খাদ অতিক্রম করতে হবে যা সমতলে থাকা একটি বাহিনীর জন্য অত সহজ হবে না।

১৯৫৭ সালের ৩০ আগস্ট। গত সারারাত গোপনে অনুসরণ শেষে ধেয়ে আসা বিশাল সেনা বহরকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে কমান্ডার চে গুয়েভারার ক্ষুদ্র গেরিলা বাহিনী। এল হোম্বরিতো উপত্যকার চারপাশ ঘিরে অবস্থান নেয় চে কলামের চৌকষ যোদ্ধ সিরো রেদোনদো গার্সিয়া, এদুয়ার্দো লালো সারদিনাস লাবরাদা, রামিরো ভালদেস মেনেন্দেজ এবং রাউল মার্কাদার। আক্রমনভাগে অবস্থান নিয়ে ভোরবেলা বিশাল মেরোব বহরের উপর প্রথম আঘাত হানেন বিপ্লবী বাহিনীর কমান্ডার চে গুয়েভারা। অল্প সংখ্যাক গেরিলা যোদ্ধার চৌমুখী আক্রমনে মেরোবের অধীনে থাকা বিশাল বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে উত্যকা থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত শত্রু বাহিনীর তুমুল আক্রমনের মুখে একটি পুরনো হাতিয়ার নিয়ে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে জোয়েল। ইরেল পারদো, রামিরো ভালদেস এবং জোয়েল তাদের পুরনো হাতিয়ার নিয়ে জঙ্গলের আড়াল থেকে এমনভাবে এলোপাতাড়ি আক্রমন হানেন তাতে শত্রু বাহিনী ভেবে নেয় জঙ্গলের ভেতর হয়তো বিশাল গেরিলা বহর অবস্থান করছে। ভয়ানক শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জোয়েলের বীরত্বপূর্ণ কৌশলী লড়াই গেরিলা বাহিনীকে বিস্মিত করলেও আতঙ্কিত করে তোলে পুরো মেরোব বহরকে। মুখোমুখি লড়াইয়ের এক পর্যায়ে মেশিনগানের গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হন জোয়েল। ঘিরে থাকা শত্রু বাহিনীর ব্যুহ ভেদ করে রণক্ষেত্র থেকে আহত জোয়েলকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন কমান্ডার চে। নিজের কাছে রেখে চিকিৎসা করেন ফলে মারাত্মক আহত হয়েও প্রাণে বেঁচে যায় কমান্ডার আর্নেস্তো চে গুয়েভারা দে লা সেরনার সন্তানতুল্য জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভা। জোয়েল প্রাণে বেঁচে গেলেও এল হোম্বরিতোর লড়াই তার জন্য চরম বেদনার কারণ এই যুদ্ধেই প্রাণ দেন তার প্রিয় চাচাতো ভাই হার্মিস লেভা ইগলেসিয়া। রক্তপিপাসু মেরোব সোসার সৈন্যরা নির্মমভাবে হার্মিসকে হত্যার পর তার লাশ পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।

সিয়েরা মায়েস্ত্রা থেকে এসকামরের পথে জোয়েলদের অগ্রাভিযানের আগে ভয়াবহ মার ভার্দের যুদ্ধ সংঘঠিত হয় ১৯৫৭ সালের ২৯ নভেম্বর। মার ভার্দে রণক্ষেত্র সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বতমালার অনেক গভীরে তারকুইনো নদীর সীমানায়। জালদিভার বাহিনীর কুখ্যাত আততায়ী সানচেজ মসকুয়েরার সাথে বিপ্লবী চে গুয়োরার কৌশলগত মার ভার্দের লড়াই ছিলো অনেকটা অমিমাংসিত। চে গুয়েভারার লক্ষ্য ছিলো সিয়েরা দে লা নেভেদা থেকে মার ভার্দের দিকে ধেয়ে আসা বাহিনীকে রাত অবধি হয়রানি করা। ক্লান্ত বাহিনীটিকে চারপাশ ঘিরে আক্রমন হানবেন রাতের অন্ধকারে। মূলত: কমান্ডার চে গুয়েভারার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভুল বুঝাবুঝির কারণে মার ভার্দের যুদ্ধে প্রাণ দেন গেরিলা বাহিনীর সবচেয়ে চৌকষ যোদ্ধাদের একজন সিরো রেদোনদো গার্সিয়া। লড়াইকালে আবারও আহত হন জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভা। মার ভার্দের যুদ্ধ নিয়ে কমান্ডার চে গুয়েভারার বিবরণ অনুযায়ী-‘পর পর গুলির শব্দ শোনা গেল এবং কমরেডরা আমাকে বললেন জোয়েল গুরুতর আহত হয়েছে। সব মিলিয়ে জোয়েলের ভাগ্য ছিলো অসাধারণ। বন্দুক থেকে তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। দুটি গুলি বিদ্ধ হয় জোয়েলের কাছে থাকা বন্দুকে ফলে বন্দুকের একটি হাতল ভেঙ্গে যায়। বুলেট আঘাত হানে জোয়েলের হাত, পা এবং দু’বাহুতে। তার আঘাতগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট কিন্তু তার দেহ ছিলো রক্তে ঢাকা। আমরা তাকে তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে নিয়ে আসি এবং সুস্থ করার জন্য হাসপাতালে পাঠাই।’

৫.
২৪ মে ১৯৫৮ সাল, মার ভার্দের লড়াইয়ে জীবনদানকারী বীর যোদ্ধা সিরো রেদোনদো গার্সিয়ার নামানুসারে গঠন করা হয় সশস্ত্র গেরিলা বাহিনীর আক্রমনাত্মক কলাম ‘সিরো রেদোনদো’। চৌকষ যোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত আক্রমনাত্মক কলামের কমান্ডার করা হয় বিপ্লবী যে গুয়েভারাকে। জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভা হলেন আক্রমনাত্মক সিরো রেদোনদো কলামের একজন যোদ্ধা। এসকামরেকে গন্তব্য করে লাস ভিলাসের পথে কমান্ডার চে গুয়েভারার নেতৃত্বে জোয়েলদের সিরো রেদোনদো আক্রমনাত্মক গেরিলা বাহিনী যাত্রা শুরু করে ১৯৫৮ সালের ৩১ আগস্ট। সিয়েরা মায়েস্ত্রার লাস মার্সিদিজ থেকে শুরু হয় কমান্ডার চে গুয়েভারার মৃত্যুময় অগ্রাভিযান। মুষলধারে বৃষ্টি, কর্দমাক্ত পাহাড়ী রাস্তা, প্লাবন, ঘূর্ণিঝড় আর গোলাবারুদের ভার বহন করে পাড়ি দিতে হয়েছে ৬৬৭ কিলোমিটার পথ। ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর চরম ক্লান্তির মুখোমুখি বিপ্লবী গেরিলা বাহিনী লাস ভিলাসে প্রবেশ করে গন্তব্যের ৪৫ দিন। মৃতুময় দীর্ঘ অগ্রাভিযানে কমান্ডার চে গুয়েভারার পাশে থেকেছেন গাজিরো বলাক জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভা, রবার্তো রদরিগুয়েজ ওরফে এল ভাকুয়েরিতো এবং রামন পারদো গুয়েরা। কমান্ডার চে গুয়েভারার আক্রমনাত্মক সশস্ত্র গেরিলা বাহিনী সিরো রেদোনদোর মৃত্যুময় অগ্রাভিযান নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন বাহিনীর সাহসী যোদ্ধা জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভা। গাজিরো বালক জোয়েলের ভাষায়-সমতলে আমাদের মিশন ছিলো জটিল এবং বিপজ্জনক কারণ অচেনা পথ, জলাবদ্ধতা, ঘনঘন বোমাবর্ষণ এবং অতর্কিত হামলা। শত বিপদ জেনেও আমরা অভিযান অব্যাহত রেখেছিলাম কারণ এটা আমাদের কমান্ডারের আদেশ।

১৬ অক্টোবর ১৯৫৮ সাল। গেরিলা বাহিনী নিয়ে চে পৌঁছেন এসকামরে পর্বতাঞ্চলে। ঘাঁটি স্থাপন করেন এসকামরের পশ্চিমাংশে সর্বোচ্চ শিখর গুয়ামুহায়া পর্বতমালায় যা সানক্তি স্পিরিতাসের অন্তর্গত এল ফোমেন্তো পৌর এলাকার গ্রাম পেদরেরো। এল পেদরেরো গ্রামের গুয়ামুহায়া শিখরে ঘাঁটি স্থাপনের অন্যতম কারণ ছিলো এই গুয়ামুহায়া থেকে সহজেই নজরদারি করা যেতো কাবাইগুয়ান, কাবাইগুয়ানের গুয়ায়োস এবং পুরো সানক্তি স্পিরিতাস অঞ্চলে। গুয়ামুহায়ার কাবালেতে দে কাসায় বসেই চে সম্পাদন করেন কৌশলগত এল পেদরেরো চুক্তি যার ফলে ঐ অঞ্চলে লড়াইরত সকল সকল বিপ্লবী বাহিনী ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াইয়ের প্রতিজ্ঞা করেন। গুয়ামুহায়ার কাবালেতে দে কাসা থেকেই কমান্ডার চে জালদিভার বাহিনীকে চূড়ান্ত আক্রমনের আগে প্রথম আঘাত হানেন। একে একে মুক্ত করা হয় ফোমেন্তো, মানিকারাগুয়ার গুইনিয়া দে মিরান্দা এবং সানক্তির কাবাইগুয়ান অঞ্চল। তারকুইনো নদীর সীমানায় মার ভার্দে লড়াইয়ের ন্যায় ফোমেন্তো দখলকালে মারাত্মকভাবে আহত হন জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভা। গুলিবিদ্ধ হন রণক্ষেত্রে মুখোমুখি লড়াইকালে। মেশিনগানের বুলেট আঘাত হানে জোয়েলের বাহু, চোয়াল এবং গলায়। গুলির আঘাতে জোয়েলের চোয়াল এবং কন্ঠাস্থি ছিঁড়ে যায় ফলে দীর্ঘদিন কথা বলতে পারতেন না। মুহমুহ সংঘর্ষ চলাকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মৃতপ্রায় জোয়েলকে রণাঙ্গণ থেকে সরিয়ে নেন চে এবং পাঠানো হয় স্থানীয় হাসপাতালে। কিছুক্ষণ পর যুদ্ধ বিরতীকালে হাসপাতালে হাজির হন চে এবং ব্যক্তিগতভাবে জোয়েলকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। মৃত্যুর সাথে লড়তে থাকা গাজিরো বালক জোয়েলের আঘাতগুলো মারাত্মক ছিলো তাই সান্তাক্লারা যুদ্ধে বিজয়ের পর চে সন্তানতুল্য জোয়েলকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভর্তি করান লা হাভানার সামরিক হাসপাতালে। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর জোয়েল প্রাণে বেঁচে গেলেও আমৃত্যু তাকে বাঁচতে হয়েছে ফোমেন্তো যুদ্ধের দুঃসহ আঘাত নিয়ে।

লড়াইকালে আবারও আহত হন জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভা। মার ভার্দের যুদ্ধ নিয়ে কমান্ডার চে গুয়েভারার বিবরণ অনুযায়ী-‘পর পর গুলির শব্দ শোনা গেল এবং কমরেডরা আমাকে বললেন জোয়েল গুরুতর আহত হয়েছে

৬.
সংঘাতের দিন শেষে কমান্ডার চে স্বপ্ন দেখতেন একটা প্রশিক্ষিত যুব সমাজ যারা হবে বিপ্লবের দ্বারা প্রভাবিত প্রজন্মের প্রকৃত প্রতিনিধি। বীরের মনোভাব দ্বারা নির্মিত ইতিহাসের অপরিহার্য অংশ। চে জানতেন, স্বপ্নটা বপন করতে হবে তরুণ কিউবানদের অন্তরে কারণ তরুণরাই ভবিষ্যৎ, পরিবর্তন ও অগ্রগতির প্রথম সমর্থক। লা চে গড়ে তোলেন ‘অ্যাসোসিয়েসিয়োন দে জোভেনেস রেভেলদেস-তরুণ বিদ্রোহী সংঘ’। লিসেস পিনো সেবেলোসের লেখা এবং বিদ্রোহী সেনাবাহিনীর নির্দেশনা বিভাগের নথি অনুযায়ী কমান্ডার চে তরুণ বিদ্রোহী সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৫৯ সালের ৩০ আগস্ট। দেশাত্মবোধ আর বিপ্লবী অগ্রগতির লাল চিহ্ন ‘তরুণ বিদ্রোহী সংঘে’র সভাপতি করা হয় বিপ্লবী বাহিনীর সর্বকনিষ্ঠ কমান্ডার জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভাকে। ১৯৬০ সালের ২৮ জানুয়ারি, কিউবার জাতীয় বীর জোসে মার্তির জন্মস্মরণ অনুষ্ঠানে বিপ্লবী চে গুয়েভারা যখন কমান্ডার জোয়েলকে তরুণ বিদ্রোহী সংঘের সভাপতি হিসেবে পরিচয় কারান ততদিন সংঘের সদস্য সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়েছে। লা কাসা ভারদে অলিভো’র তথ্যানুযায়ী, তরুণদের বিদ্রোহী সংঘে সদস্য হতে পারতেন ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ছেলে মেয়েরা তবে এতে যোগ দেওয়া ছিলো সংগ্রামে পরিখা দখলের মতো।

১৯৬০ সালের ২৮ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট, কিউবার হাভানায় অনুষ্ঠিত হয় ‘কমুনিদাদ লাতিনো আমেরিকানা দে জুভেনতুদ-লাতিন আমেরিকান যুব সম্প্রদায়’র প্রথম অধিবেশন যাতে তরুণ বিদ্রোহী সংঘের সভাপতি হিসেবে মাতৃভূমির প্রতিনিধিত্ব করেন কমান্ডার জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভা। অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী সরকারের প্রধামন্ত্রী ফিদেল আলেজান্দ্রো কাস্ত্রো রুজ, প্রসিডেন্ট অসভালদো দরতিকোস তোরাদো, বিপ্লবী আর্নেস্তো চে গুয়েভারা দেলা সেরনা, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাউল মোদেস্তো কাস্ত্রো রুজ এবং গুয়াতেমালার নির্বাসিত নেতা জুয়ান জাকাবো আরবেনজ গুজমান। দিনে দিনে তরুণ বিদ্রোহী সংঘ ঐক্যবন্ধ মানবিক আন্দোলনের প্রতীক হয় ছড়িয়ে সমগ্র লাতিন আমেরিকায় এবং বিপ্লবী বাহিনীর সর্বকনিষ্ঠ কমান্ডার জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভাকে উপস্থাপন করে সংঘের একজন জাতীয় নেতা হিসেবে। ১৯৬২ সালের ৩০ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল, সমাজতান্ত্রিক স্বদেশ রক্ষার শপথ নিয়ে হাভানার কার্ল মার্কস নাট্যশালায় অনুষ্ঠিত হয় তরুণ বিদ্রোহী সংঘের প্রথম মহাসমাবেশ। এতে লাতিন আমেরিকার ছয়টি দেশ থেকে ৫৯৬ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন যাদের মধ্যে ২৯৫ জন শ্রমিক এবং ১১৮ জন কৃষক। কমান্ডার জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভার বক্তব্যের মাধ্যমে শরু হয় মহাসমাবেশের কার্যক্রম। মার্কসবাদ-লেলিনবাদকে আদর্শ মেনে গঠিত হয় ‘ইউনিয়ন দে জোবেনেস কমুনিস্তাস-তরুণ কমিউনিস্টদের ইউনিয়ন’ যা মূলত কিউবান কমিউনিস্ট পার্টি ‘পারতিদো কমুনিস্তা দে কিউবা’র একটি যুব সংগঠন। বিপ্লবী যুব কমিউনিস্টদের প্রথম সচিব হলেন কমান্ডার জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভা।

১৯৬৭ সাল, গেরিলা যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি চে গুয়েভারাকে হত্যা করা হয় বলিভিয়ার লা হিগুয়েরা গ্রামে। দেহে ফোমেন্তোর লড়াইয়ে বিদ্ধ বুলেটের ক্ষত, চে’র মৃত্যু কমান্ডার জোয়েলের চিন্তাকে প্রসারিত করে সিয়েরার পথে যার সামনে এসকামরের নিশানা। ঐতিহাসিক সত্যকে মূল্যায়ন করে কমান্ডার জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভা রচনা করেন রণাঙ্গণে রেখে আসা দুঃসহ দিনের কথা ‘দে লা সিয়েরা মায়েস্ত্রা আল এসকামরে-সিয়েরা মায়েস্ত্রা থেকে এসকামরে পর্যন্ত’। ১৯৭৫ সালে লেখা জোয়েলের বইটি কিউবার সশন্ত্র সংগ্রাম নিয়ে অপরিহার্য ঐতিহাসিক দলিল। কমান্ডার চে গুয়েভারার পাশে থেকে জোয়েল লড়াই শুরু করেছিলেন সিয়েরা মায়েস্ত্রা থেকে। আক্রমনাত্মক গেরিলা বাহিনী সিরো রেদোনদোর একজন সশস্ত্র যোদ্ধা হিসেবে কমান্ডার চে গুয়েভারার হাতে হাত রেখে জোয়েল পা বাড়ান এসকামরের পথে। জিরাবো থেকে জোবাবো, সান মিগুয়েল দেল জুনকো, কায়ো তোরো, ত্রোচা, বারাগুয়া, জাতিবোনিকো এবং আক্রমনের শেষ এসকামরে পর্যন্ত যুদ্ধের প্রতিটি দিন এবং বাহিনী অধিনায়ক চে গুয়েভারাকে নিয়ে দে লা সিয়েরা মায়েস্ত্রা আল এসকামরে। দীর্ঘ নাগরিক সংগ্রামের অন্তর্নিহিত তথ্য লিখতে গিয়ে জোয়েল জানিয়েছেন যোদ্ধাদের চেয়ে যুদ্ধের বিশ্বস্ত সাক্ষী আর নেই।
১৯৭৫ সালের পর অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান গেরিলা বীর জোয়েল। নীরবে নিভৃতে পেরিয়ে যায় দীর্ঘ সময়। ২০১১ সালের ১৪ নভেম্বর, হাভানায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিপ্লবী চে গুয়েভারার সন্তানতুল্য সাহসী গেরিলা যোদ্ধা জোয়েল। অন্তিম ইচ্ছা অনুসারে তার মৃতদেহ দাহ করা হয় এবং ছাই জমা করা হয় হাভানায় ভেদাদো পাড়ার কোলন কবরস্থানে। লা লুজের তাবলোন থেকে আসা এক গাজিরো বালক জোয়েল। সিয়েরা মায়েস্ত্রা থেকে এসকামরে পর্যন্ত মৃত্যুময় রণক্ষেত্রে যাকে সন্তানের ন্যায় আগলে রেখেছেন বিপ্লবী চে। সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে কাছে সমাজতন্ত্রের দুর্গ নির্মাণে যাদের অগ্নি ইতিহাস কিউবানদের মাটিতে জমিয়ে রেখেছে মৃত্যুর উত্তরাধিকার। বিপ্লবী দুনিয়া কোনদিনই ভুলবে চে গুয়েভারাকে যেমন করে ভুলতে পারবে না রণাঙ্গণে মমতার গল্প জোয়েল ইগলেসিয়াস লেভাকেও।

আরো পড়তে পারেন

একাত্তরের গণহত্যা প্রতিহত করা কি সম্ভব ছিল?

২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানি নরঘাতকেরা যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই এক রাতেই শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় তিন হাজার। এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা একতরফাভাবে….

ভাষা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা

আগের পর্বে পড়ুন— চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল) ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে দুই হাজার মাইল দূরত্বের….

চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল)

আগের পর্বে পড়ুন— বায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ একুশের আবেগ সংহত থাকে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেও। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান এক বিবৃতিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। আওয়ামি লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম কমিটির সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র….

error: Content is protected !!