Author Picture

ইউক্রেনের কবি ও চিত্রকর তারাস শেভচেন্কো’র একগুচ্ছ কবিতা

মঈনুস সুলতান

ভূমিকা ও কবি পরিচিতি:

ইউক্রেনীয় সাহিত্যের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য দূর অতীতের এগারো শতাব্দী থেকে আজ অব্দি বহমান সাহিত্যিকদের মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন উনিশ শতকের কবি ও চিত্রকর তারাস শেভচেন্কো, প্রথম জীবনে যিনি রচনা করতেন রোমান্টিক ধারায় পদাবলী, যা বিবর্তিত হয়ে পরবর্তী জীবনে গীতল শৈলীতে প্রতিনিধিত্ব করেছিল ইউক্রেনের উপনিবেশবাদ-বিরোধী চেতনার। সাহিত্যে ধ্রুপদী যুগের এ কবি ও চিত্রকরের জন্ম ১৮১৪ সালে, তৎকালীন রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ইউক্রেনের মরিনট্সি গ্রামে। একাধারে কবি, চিত্রকর, সমাজতাত্ত্বিক ও আধিপাত্যবাদ বিরোধী এ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ত্বের বেড়ে ওঠার সময়কালে ইউক্রেনে প্রচলিত ছিলো ‘সার্ফডোম’ বা ‘ভূমিদাসভিত্ত্বিক’ সমাজব্যবস্থা। তাঁর পূর্বপুরুষরা সতেরো ও অষ্টাদশ শতকজুড়ে সংগঠিত রুশ জার-বিরোধী কসাক বিদ্রোহে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তরুণ বয়সে শেভচেন্কো কিছুদিন এসোসিয়েশন ফর এনকারেজমেন্ট অব আর্টিস্টস্-এ চিত্রকলার ওপর পড়াশুনা করেন। তখন ‘দ্যা বেগার বয় গিভিং ব্রেড টু অ্যা ডগ’ শিরোনামে একটি তৈলচিত্র এঁকে ইমপিরিয়েল একাডেমি অব আর্টস্ থেকে পুরষ্কার লাভ করেন। ১৮৪০ সালে যখন তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘কবঝার’ প্রকাশিত হয়, তখন অব্দি শ্রেণীবিভক্ত সমাজে তাঁর পরিবারটি ছিল ‘সার্ফ’ বা ‘ভূমিদাস’। এ গ্রন্থ সম্পর্কে সে যুগের একজন কবি ইভান ফ্র্যাংকোর মন্তব্য হচ্ছে, “সৃষ্টি করেছেন তিনি কবিতার সম্পূর্ন এক নতুন বিশ্ব—যাতে স্বচ্ছতোয়া ঝর্ণাজলের মতো প্রবাহিত হচ্ছে দ্যুতিময় পদাবলী,… শিল্পশোভণ এ অভিব্যক্তি তাঁর আগে ইউক্রেনের সাহিত্যে বিরল ছিল।’’

১৮৪১ সালে শেভচেন্কো ‘দ্যা জিপসি ফরচুন টেলার’ নামক চিত্রের জন্য রৌপ্যপদকে ভূষিত হন। রুশ সাম্রাজ্যের ভূমিদাসভিত্ত্বিক শাসণব্যবস্থার সরাসরি বিরুদ্ধাচরণ করে কবি ও চিত্রকর ১৮৪৪ সালে প্রকাশ করেন ‘পিক্চারাস্ক ইউক্রেন’ শিরোনামে একটি চিত্রময় এ্যলবাম। ১৮৪৫ সাল থেকে শেভচেন্কো সক্রিয়ভাবে শামিল হন; উপনিবেশবাদ বিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতায়। ওই সময় রচনা করেন ‘ড্রিম’ শিরোনামে একটি কবিতা। কতৃপক্ষ কবিতাটিকে ‘জব্দ’ করে কবি ও চিত্রকরকে প্রেরণ করে কারাগারে। প্রথমে তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গ-এ কারারুদ্ধ থাকেন কিছুকাল, তারপর তাঁকে উরাল পর্বতমালায় নিযুক্ত রুশসেনা ছাউনিতে নির্বাসন দেয়া হয়, এবং কেড়ে নেয়া হয় তাঁর লেখাজোখা ও আঁকার অধিকার। সাম্প্রতি ইউক্রেনের জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত শেভচেন্কোর সবচেয়ে জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে ‘কবঝার’, যা অনুদিত হয়েছে বিশ্বের ১৮৭টি ভাষায়। পুরো দশকজুড়ে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর কবি ও চিত্রকরকে তাঁর স্বদেশ ইউক্রেনে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু পিতৃভূমিতে থিতু হওয়ার কোন সুযোগ পাননি তিনি, রাজনৈতিক মতবিরোধীতার অভিযোগে ফের কারারুদ্ধ হন। ১৮৬১ সালে সেন্ট পিটারবার্গ তাঁর মৃত্য হয়। তারাস শেভচেন্কোর কবিতা ও চিত্রকর্মকে বিবেচনা করা হয় ইউক্রেনীয় সাহিত্যের ভিত্তি হিসাবে। দুটি ভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত সৃষ্টিতে যেমন প্রতিফলিত হয়েছে রাজবন্দী হিসাবে তাঁর দিনযাপনের অনুভূতি, তেম্নি শব্দ, ছন্দ ও চিত্রকল্পে উচ্চকিত হয়ে ওঠেছে জাতিসত্ত্বার প্রতিরোধের স্পৃহা ও স্বাধীনতার তুমুল আকাঙ্ক্ষা। ইউক্রেনিয়ান ভাষায় রচিত কবিতাগুলো এবং ভূমিকা সংক্রান্ত তথ্য, কবির বায়ো, প্রতিকৃতি ও চিত্রকর্ম প্রভৃতি চয়ন করা হয়েছে ইন্টারন্যাট থেকে। ইংরেজী থেকে বাংলায় ভাষান্তরিত কবিতাগুলোতে ইংরেজী অনুবাদকের নাম মূল রচয়িতার নিচে উল্লেখিত হয়েছে। একগুচ্ছ ভাষান্তরিত কবিতার সাথে কবি তারাস শেভচেন্কোর দুটি চিত্রকর্মের নমুনাও উপস্থাপিত হচ্ছে।

 

শিরোনামহীন — ১
.
যখন মৃত্যু হবে, ঘুমাতে দিও আমাকে নীরবে
আমার শেষ শয্যা যেন তৈরী হয় ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ স্তেপে।
আমি যেন দেখতে পাই আদিগন্ত মাঠ
ও গড়িয়ে নেমে যাওয়া ঢাল,
আমাকে দেখতে দিও ইউক্রেনের চিরায়ত নিসর্গ
যা ছিলো জীবনভর আমার প্রিয়।
নিপ্র নদীর স্রোতজলের গর্জন যেন শুনতে পাই সদাসর্বদা।
যখন সমুদ্রের নীলাভ জলে মিশে যাবে ইউক্রেনের দুষমণদের রক্ত
তখন আমি ছেড়ে যাব মাঠ ও পাহাড়,
বিস্মৃত হবো সমস্ত কিছু
আর প্রার্থনা করবো—
এর আগ অব্দি আমার চেতনায় ঈশ্বর বলে কিছু নেই।

সুতরাং সমাহিত করো আমাকে—
তারপর রুখে দাড়াও,
আর ছিন্ন করো বন্ধন জিঞ্জির।
স্বাধীনতার স্রোতজলে মিশিয়ে দাও আধিপত্যবাদীদের রক্ত।
সদ্যমুক্তিপ্রাপ্ত পরিবারের সহজিয়া আলাপচারিতায়
মৃদুস্বরে স্মরণ করো আমাকে।

(ইংরেজীতে অনুবাদ: আলেকজান্দার জে মোটিল)

 

শিরোনামহীন—২
.
দিন চলে যায়, রাতও কাটে কায়ক্লেশে
দেখতে দেখতে গ্রীষ্মের সুন্দর ঋতুটিরও সমাপ্তি ঘটে;
পত্রালি হরিদ্রাভ হয়, জড়ো হয় ঝরা পাতার শুকনো স্তূপ;
আমার দু-নয়নে দৃষ্টি ক্ষীণ হতে হতে মরে যায়।
চেতনার ক্ষীণতোয়া ধারাটি শুকিয়ে আসে
সুপ্তিতে নিমগ্ন হয় ভাবনাচিন্তার কোষনিচয়,
হৎপিন্ডও আর সঞ্চালিত হয় না তেমন—
ভালো লাগার, এমন কী বিষ্মিত হওয়ার ক্ষমতাও লোপ পায়,
নিজস্ব স্বত্তার সমস্ত কিছু যেন তলিয়ে যায় গভীর নিদ্রায়।
আমি কী আসলেই জীবিত,
নাকি কোনক্রমে স্রেফ বেঁচেবর্তে আছি,
ঘুরে বেড়াচ্ছি বিভ্রান্তির বিপুল ঘোরে?
যদি একবার হাসতে পারতাম,
কিংবা কোনক্রমে শুধু একবার আগের মতো অজোরে কাঁদতে পারতাম।

হে অদৃষ্ট, বলো তো কোন ভুবনে তোমার অবস্থান?
আমার বিধিলিপিতে কিছুই কী লেখা নেই?
আমার জন্য ভালো কিছু নির্ধারন করতে না পারলে
হে প্রভু, বেজায় অমঙ্গলজনক কিছু ঠুকে দাও না আমার ভালে?
শুধু একটি অনুরোধ, বিনম্র ভাষায় করজোরে প্রার্থনা করছি,
স্বপ্নের বেভুল ঘোরে বিভ্রান্ত করে আমাকে এলোপাথাড়ি ছুটিয়ে মেরো না:
হৎপিন্ডের স্পন্দনকে পিষে মেরে.. প্রভু হে.. যাঞ্চা করি
বৃক্ষের পড়ে থাকা আধপঁচা কান্ডটির মতো
পাহাড়ের ঢালে সজোরে ঠেলে সরিয়ে দিও না।
বাঁচতে দাও আমাকে, আমার হৃৎপিন্ড যেন ফের স্পন্দিত হয়—
করুণা করো, ভালোবাসতে দাও আমাকে ফের।

অতি সামান্য প্রার্থনা আমার
এতেও যদি পারো না দিতে অনুমোদন,
তাহলে—যাক্, জাহান্নামে যাক তোমার গড়া এ বিশ্ব!
দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা হয়ে মরার মতো বাজে কিছু আর হতে পারে না।
কিন্তু তার চেয়েও খারাপ— কিছু না করে ঢলে পড়া বেঘোর সুপ্তিতে,
এবং পেছনে অস্তিত্ত্বের কোন চিহ্ণ বর্ণ না রেখে—
স্বাধীনভাবে দিনযাপনের স্বাদ না নিয়ে
নিশ্চেতন হয়ে তুমুল সুপ্তিতে তলিয়ে যাওয়া.. ..
তুমি বেঁচে আছো? না কী স্রেফ ডুবে মরলে? খবর রাখে কে?
হে আদৃষ্ট, কোথায়— কোন ভুবনে তোমার অবস্থান?
জবাব দাও আমার প্রশ্নের—
কিছুই কী লেখা নেই আমার বিধিলিপিতে?

(ইংরেজীতে অনুবাদ: আলেকজান্দার জে মোটিল)

 

শিরোনামহীন —৩
.
দিগন্তে হেলে পড়া সুরুযের অস্তরাগে
যখন পর্বতমালায় নামে গাঢ় অন্ধকার,
সারা দিনের কাকলি সমাপ্ত করে পাখীরা ফিরে যায় নীড়ে
আর প্রান্তরে নেমে আসে নিস্তব্দতা,
হাসিখুশি মানুষজন যখন বিশ্রামের প্রস্তুতি নেয়,
পর্যবেক্ষণ করি আমি— ম্রিয়মান হয়ে আসা তাবৎ তৎপরতা।

হৃদয় আমার উড়ে যায়
গোধূলি আভায় রাঙা হয়ে ওঠা ইউক্রেনের উদ্যানে,
আমার দেহমনে তাড়াহুড়া লেগে যায়,
অস্থির হয়ে ওঠে ভাবনা স্রোত
যখন আমার হৃদয় খুঁজে বিশ্রাম।
তেপান্তরের মাঠ ঘাট থেকে আলো সরে যায়,
অন্ধকার হয়ে ওঠে ঝোপঝাড়,
পাহাড় পর্বত তালিয়ে যায় গাঢ় আন্ধকারে,
আকাশে ফুটে ওঠে সন্ধ্যাতারা,
আর আমি কাঁদি, ঝরে অশ্রুধারা অজোরে।
বলি হে নক্ষত্র—
তোমার জ্যোতি ছুঁয়েছে কী ইউক্রেনের উপত্যকা,
কৃষ্ণাভ চোখ দুটি কী ঘঁষেমেজে তোমার জন্য
পরিমার্জন করে রেখেছে নীলাকাশটি?
নাকি তারা ওসবের তোয়াক্কা রাখে থোড়াই?
নাকি বেখবর হয়ে আছে তারা নিঝুম ঘুমের ঘোরে?
আমার অদৃষ্ট সম্পর্কে নেই কী তাদের কোন ধারনা?

(ইংরেজীতে অনুবাদ: আলেকজান্দার জে মোটিল)

 

শিরোনামহীন—৪
.
যদি একবার
শুধু একবার
ফের দেখতে পেতাম আমার প্রিয় প্রান্তর
ঘাসের ছাওয়া ধূ ধূ স্তেপ।
মঙ্গলময় প্রভু কী
আমার এই বৃদ্ধ বয়সে
শুধু একবার আমাকে স্বাধীনতার স্বাদ দিতে পারেন না?
ফিরে যেতে চাই আমি ইউক্রেনে
ফিরতে চাই জন্মভূমি… স্বদেশে
ফিরে যেতে চাই নিজস্ব বসতবাড়িতে।
ওখানে প্রতিবেশীরা আমাকে সংবর্ধনা জানিয়ে বলবে,
প্রিয় সুহৃদ— তোমার প্রত্যাগমনে খুশি হয়েছি আমরা সকলে।
বিশ্রাম নেবো আমি, আমরা প্রার্থনা করবো সদাপ্রভুর দরবারে,
কেন আমি বাস্তুহারা হয়ে ঘুরে বেড়াবো পথে প্রান্তরে
আর কতদিন এভাবে…
না, আমার অদৃষ্টে মনে হয় মঙ্গলজনক কিছুই নেই লেখা,

কীভাবে অতিক্রম করি দাসত্বের দিনকাল
কতকাল আশা ভারসা বিহীন?
চাই জবাব সামান্য এ প্রশ্নের,
আমি যে ক্রমশ উদভ্রান্ত হয়ে ওঠছি দেহমনে।

(ইংরেজীতে অনুবাদ: আলেকজান্দার জে মোটিল)

 

শিরোনামহীন —৫
.
আকাশকে দেখাচ্ছে কেমন যেন অপরিচ্ছন্ন
ছড়িয়ে আছে তন্দ্রাচ্ছন্ন তরঙ্গরাজি;
সমুদ্রতীর থেকে যত দূরে দৃষ্টি যায়—
মনে হয়— প্রকৃতি নিচয় আজ হয়ে আছে নেশাগ্রস্থ,
হাওয়া-বাতাস ছাড়াই উড়ছে নলখাগড়ার ঝোপঝাড়।

যিশু— প্রভু হে!
আমি কী দীর্ঘ মেয়াদে আটকা পড়েছি তালাবদ্ধ এ জিন্দানখানায়?
দৈত্যপ্রতিম সমুদ্রের প্রান্তিকে বিরাণ এ ভূখন্ডে?
পৃথিবীর দিকে ফিরে তাকাতেও ইচ্ছা হয় না, বিবমিষা জাগে।
বাকরুদ্ধ, নতজানু হয়ে আছি স্তেপের বিপুল নির্জনে;
বেঁচে আছি কী আমি?
চতুরদিকের দীঘল ঘাস হরিদ্রাভ হয়ে এসেছে,
নিসর্গেরও তুমুল অনিহা সত্যভাষণে,
কিন্তু কোথাও আর তো কেউ নেই যাকে করা যায়
একটি প্রশ্ন।

(ইংরেজীতে অনুবাদ: দানিয়েল ময়শেন্কো)

 

রাজদ্রোহী সতীর্থদের প্রতি
.
ইউক্রেনে থিতু হই আমি— কিংবা বাস করি ভিন্ন কোন ভূখন্ডে
তফাত হয় না তেমন কিছু,
কেউ যদি আমাকে একেবারে ভুলে যায়
অথবা কাকতালীয়ভাবে খুঁজে পায়— ধূধূ মরু-বালুকা
অথবা তুষারাচ্ছন্ন সাইবেরিয়ায়..
না হয় তালাশ পেলো আমার— বিদেশ বিভূঁয়ে
বলো— কি-বা আসে যায়?
বন্দীদশায় আমার দিন কাটে অচেনা মানুষজনদের সান্নিধ্যে—
এ নিয়ে নেই তোমাদের কোন মনস্তাপ;
ক্রীতদাসের দিনযাপনে লাগাতার ক্রন্দন
আর ক্রমাগত মৃত্যুর দিকে ধেয়ে চলাতে তফাৎ অতি সামান্য…

প্রতিটি আধিকারকে কেড়ে নেয়া হয়েছে,
দ্যুতিপ্রভ যে ভূখন্ডে তুমি বিবেচিত হও না আর নাগরিক হিসাবে,
ওখানে রেখে যেও না হাল্কা পদচিহ্ন,
পিতার স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা হচ্ছে পুত্র
বলো না এসব বাখানি সন্তানকে,
তবে সে যেন প্রার্থনা..শুধু প্রার্থনা করে
ইউক্রেনের লাঞ্চনার করুণ কথা বলে কী ফায়দা,
আত্মজের প্রার্থনায় মতি না হলে—
আমার বিশেষ কিছু যায় আসে না,
বন্দীত্বের দিনযাপনে আমার জন্য বিষয়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন
চোখের সামনে কিছু দুশ্চরিত্র লম্পট
জননীকে প্রবঞ্চনায় ভুলিয়ে ভালিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে—
অপহৃত মা-কে এনে অতঃপর ফেলে দেয়
ফেলে দেয় প্রজ্জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে…

আহ.. আমার জন্য বিষয়টা আসলেই সম্পূর্ণ ভিন্ন।

(ইংরেজীতে অনুবাদ: দানিয়েল ময়শেন্কো)

 

আবদ্ধ হয়ো না পরিণয় সূত্রে
.
বন্ধু হে, বিত্তশালী কোন রমনীর সঙ্গে আবদ্ধ হয়ো না পরিণয় সূত্রে,
যখন খুশি— ঘর থেকে বের করে দেবে সে তোমাকে।
দরিদ্র নারীর সঙ্গে ঘরবাঁধাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়, বুঝলে— প্রিয় বন্ধু,
নিস্তেজ জীবনের এক ঘেয়েমিতে স্রেফ প্রাণে মারা যাবে জ্যান্তবস্থায়;
চেষ্টা করো কসাক অশ্বারোহীদের মতো দিনযাপন করতে,
মেনে নাও তাদের ঝুঁকিপূর্ণ অদৃষ্ট:
যদি জোটে ছেঁড়া কাঁথা—
তা জড়িয়ে মড়িয়ে কাটিয়ে দাও তুমুল তুষারে সমাচ্ছন্ন শীত।
চলার পথে— হাতের কাছে যা পাও
তা দিয়ে বানিয়ে নাও দিনযাপনের হাতিয়ার,
এ রকম বাঁচতে শিখলে— ছিচকাঁদুনে নালিশের কিছু থাকবে না।
চেষ্টা করো নিজেকে নিজেই উজ্জীবিত করতে,
সব কিছু নিয়ে প্রশ্ন তোলা,
তাবৎ কিছুতে তোতো-বিরক্ত হওয়া কোন কাজের কথা নয়,
তোমার রোগ-শোক-কষ্ট নিয়ে নিজের মতো করে টিকে থাকো,
অন্য কারো তাতে তেমন কিছু আসে যায় না… বুঝলে—
দুই প্রকারের দুর্ভাগ্যের মধ্যে কোনটা খারাপ—
তুমি নিজেই না হয় বিবেচনা করো;
নিজের দুর্বিপাকে নীরবে ফোঁপিয়ে কাঁদবে
না অজোর ধারায় আহাজারিতে অশ্রুপাত করবে—
নিজেই সিন্ধান্ত নাও… বন্ধু হে।

(ইংরেজীতে ভাষান্তর: জন উয়ার)

 

ঈর্ষান্বিত হবে না কখনো
.
ঈর্ষান্বিত হবে না কখনো, বন্ধু
ধরো তোমার চেয়ে বিত্তশালী কারো কথা:
প্রভূত সম্পদের অধিকারী মানুষটির তো নেই সত্যিকারের কোন বন্ধু—
বিশ্বস্ত ভালোবাসার আর্শীবাদ থেকেও বঞ্চিত—
ওই দুটি জিনিস তাকে কিন্তু বিত্তের বিনিময়ে ভাড়া করতে হয়।
সামজিকভাবে উচ্চপদস্থ কাউকেও ঈর্ষা করতো যেও না— হে প্রিয় সুহৃদ,
তার ক্ষমতার উৎসমূলে আছে বলপ্রয়োগের দক্ষতা।
যশস্বী কাউকে ঈর্ষার বিষবাণে জর্জরিত করা উচিত হবে না— বুঝলে
মানুষটি নিজেও সচেতন যে, স্তাবকদের তাকে নিয়ে নেই তেমন কোন শিরোপীড়া,
তারা মুগ্ধ হয়ে আছে তার কীর্তির যাদুময় সম্মোহনে;
যে খ্যাতি মানুষটি অর্জন করেছে অশেষ পরিশ্রম ও অশ্রুর বিনিময়ে
তাতেও গুণমুগ্ধদের নেই সবিশেষ আগ্রহ।
আরেকটি প্রসঙ্গ, তরুণদের জাময়েতে তোমার মনে হতে পারে
সমস্ত কিছু নায্য, দৃষ্টিভঙ্গি উদার, তৎপরতার মানও উত্তম,
এমন কী পরিবেশও স্বর্গীয়,
এ ধারনাটি সঠিক নাও হতে পারে,
এখানেও হুশিয়ার হওয়া বাঞ্চনীয়, হে বন্ধু
কারণ শোভণ সব সরণীর অন্তরালেও থাকতে পারে শয়তানের পদছাপ।

বিজ্ঞাপন দিয়ে এই কথা বলতে চাচ্ছি, বুঝলে বন্ধু..
কাউকে কদাপি ঈর্ষা করতে যেও না,
নিরিখ করে একবার পর্যবেক্ষণ করো—
নিজেই অনুধাবন করতে পারবে
পৃথিবীতে যেমন নেই স্বর্গ
আকাশেও নেই তার কোন অস্তিত্ত্ব।

(ইংরেজীতে ভাষান্তর: জন উয়ার)

 

ফের বিপর্যয়…
.
ফের বিপর্যয়… প্রিয় প্রভু হে!
পরিস্থিতি কেবলমাত্র সুস্থির হয়ে এসেছিল
শান্তিপূর্ণ… নির্মল আকাশ… নির্মেঘ
যে শিকল আমার সম্প্রদায়কে দ্বাসত্বের বন্ধনে বেঁধে রেখেছে অষ্টেপৃষ্টে,
কেবলমাত্র তা ছিন্ন করতে শুরু করেছিলাম।
বিনামেঘের ভীষণ বজ্রপাতে তাবৎ কিছু যে স্তব্দ করে দিলে ফের,
আবার বাইতে শুরু করলো রক্তগঙ্গা,
হাঁড়ের দিকে ধেয়ে আসা হিংস্র কুকুরের মতো
রাজন্যের পোষা ডাকাতরা ছোরা হাতে আবার
উঠে বসলো আমাদের পাঁজরে.. প্রভু হে…

(ইংরেজীতে ভাষান্তর: জন উয়ার)

 

দুর্জয় দানিপার
.
তরঙ্গ গর্জনে হয়ে ওঠে আজ দুর্জয় দানিপার নদী
দামাল হাওয়া তুমুল ক্রোধে ছড়ায় যেন বিদ্রূপ,
পাইন বৃক্ষগুলো দুমড়ে মুছড়ে— ভাঙ্গে পাড় জলধি
ক্যানু নৌকাটির গলুই ডুবে-ভাসে— নামে ধ্বস ঝুপ ঝুপ।

অশান্ত ঊর্মিমালার চূড়ায় নিমেষে প্রতিফলিত হয়
ফ্যাঁকাশে চাঁদ,
মোরগের বাঁকটিও যায় না শোনা প্রভাতে—
কোথাও জাগে না কোন প্রতিবাদ,
ঝিমিয়ে পড়া নির্বাক মানুষজন সহসা যেন হয়ে পড়ে ধ্যানী
প্যাঁচাগুলো অমঙ্গল ধ্বনিতে চরাচরে ছড়ায় সাবধান বাণী,
ঝড়ো হাওয়ায় শাখাপ্রশাখা ভেঙ্গেচুরে হয় চুরমার—
উত্তাল স্রোতজলে দানিপার নদীটি হয়ে ওঠে দুর্নিবার।

(ইংরেজীতে ভাষান্তর: জন উয়ার)

আরো পড়তে পারেন

রিয়াসাত আল ওয়াসিফের একগুচ্ছ কবিতা

রেট্রোসপেক্টিভ বই সাজাতে সাজাতে জনৈক কবির মনে হলো— এত এত বই কবে পড়ব! এই ফোকাস হারানো সময়ে মানুষ যেন গুড়ো গুড়ো কাচ। হঠাৎ তাঁর মনে হলো বই বাদ দিয়ে আজ বরং পাপগুলোকে একটু সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা যাক। কতদিন দেখেনি দেখতে চায়নি, দেখা হয় না, দেখা যায় না। যাপিত জীবনের কাদায় শুধু মুখ ঢেকে যায়। মুখ….

সাযযাদ আনসারীর একগুচ্ছ কবিতা

ঋতু রমনী অন্তহীন পথের মত ছিলো ঋতু রমনী চেনা পাতা ও পাখি থেকে অচেনা ফুলের পথে চলে গেল সে। কথা ছিলো তার সাথে রাগ-রাগিনীর কথা ছিলো অসংখ্য পত্র-পল্লবীর, কথা ছিলো আমাদের নাম উড়াবার কথা ছিলো কত কথা দেবার নেবার। এই খানে আমাদের মন অন্ধ অধীর এই খানে না বাঁধা ঘাট জীবন নদীর, এই খানে পথে….

আজাদুর রহমানের তিনটি কবিতা

দূরত্ব একটা ধারণা আমাদের মধ্যে কোন দূরত্ব নেই। তুমি যেভাবেই থাকো, শুয়ে-বসে-দাঁড়িয়ে সামনে-পিছনে-ডাইনে-বায়ে তোমার যেভাবে মন চায় এমনকি পরস্পর গভীর আলিঙ্গনেও। তুমি যেখানেই থাকো ঢাকা বগুড়া চট্রগ্রাম আমেরিকা কোস্টারিকা কিংবা পৃথিবীর যে কোণাতেই, আমাদের মধ্যে এতটুকু দূরত্ব নেই। দূরত্ব বলে আসলে কিছুই নেই এই যে ছায়াপথের পর সুদূরে জ্বলছে যে তারা সেখানে কেউ কারও দূরে….

error: Content is protected !!