Author Picture

ত্বহা হুসাইনের দিনগুলি

কাউসার মাহমুদ

চৌদ্দ.

মিশরের প্রাদেশিক শহর ও গ্রামগুলোতে শিক্ষা যেমন বিরাট মর্যাদার এক বিষয়; শহর ও এর পরিমণ্ডলে থাকা বিভিন্ন শিক্ষা ক্ষেত্রগুলোয় তা একেবারোই উল্টো। আর অবশ্যই এতে আশ্চর্য হওয়ার মত কিছু নেই। কেননা এটিও সম্পূর্ণভাবে চাহিদা ও সরবরাহ আইন; যা ক্রয়বিক্রয় সম্বন্ধীয় অন্যান্য জিনিসের মতো জ্ঞানের ক্ষেত্রেও চলত। এই যেমন, কায়রোতে বিদ্বান আলেমরা স্বাভাবিক আসা-যাওয়া করে। কেউ তাদের দিকে বিশেষ মনোযোগই দেয় না। কিন্তু যখন তারা কোনো বিষয়ে কথা বলা শুরু করেন, তখন ওই বিষয়ের প্রতিটা শাখা প্রশাখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এসময় তারাও তাদের ছাত্রদের ছাড়া অন্য কারও দিকে কোনোরূপ ভ্রুক্ষেপ করেন না। বিপরীতে শহর ও গ্রামের উলামাদের দেখুন, যখন তারা আসা-যাওয়া করে, তখন তাদের চারপাশে মাহাত্ম্য, গাম্ভীর্য ও সম্মানের একটা বলয় তৈরি হয়। তারপর যখন তারা কথা বলেন, জনসাধারণ প্রবল এক বিস্ময় ও শ্রদ্ধার সাথে তা শ্রবণ করে। একইসাথে যা তাদের বিমুগ্ধ ও আকৃষ্ট করে তোলে। ফলে আমাদের বন্ধুটিও গ্রামীণ এই চেতনা দ্বারা প্রভাবিত হয়। অন্যান্য পল্লিবাসীদের মত সেও উলামাদের মহান মনে করে। এমনকি সে তো এও ভেবেছিল যে, তাদের হয়তো বিশেষ কোনো মাটি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। যেগুলো ওসব মাটি থেকে ভিন্ন; যা থেকে অন্যান্য সকল মানুষের সৃষ্টি হয়েছে। তদুপরি যখনই সে তাদের কথা শুনত; প্রশংসা ও বিস্ময় তাকে গ্রাস করে নিত। এমনকি কায়রোতে বড় বড় উলামা ও গুটিকয়েক শায়খদের মাঝেও সে তা অন্বেষণ করেছে, কিন্ত ঠিক অমনটা পায়নি।

শহুরে উলামা; যারা মানুষকে বিস্মিত ও প্রভাবিত করে রেখেছিল; তারা ছিল তিন-চারভাগে বিভক্ত। এদের একজন শরীয়া আদালতের মুহুরি। বিরাট শরীরের খাটো এক লোক। যার কণ্ঠ কর্কষ ও গমগমে। কথা বলার সময় শব্দসমষ্টি দিয়ে সে তার চোয়াল পূর্ণ করে রাখে। এরপর হঠাৎই তা তোমার দিকে তার স্ফীত শরীরের বক্তার মতোই অমসৃণ, রুক্ষ্মভাবে নিক্ষেপ হতে শুরু করবে। আর তার শব্দের মত অর্থগুলোও তোমাকে করুণভাবে আঘাত করবে। কিন্ত এই শায়খ বেচারা আযহার থেকে পাশ করে আসতে পারেনি। যদিও বহু চেষ্টা সে করেছে এবং সে মতে বেশ ক বছর কাটিয়েছে ওখানে। কিন্ত না সে আযহার থেকে মৌলভীর ডিগ্রি পেয়েছে, না পেয়েছে কাজির টাইটেল। তাই অগত্যা সে কোর্টে এই মুহুরির পদটাই বাগিয়ে নিয়েছে। এদিকে তার আপন ভাই অবশ্য একজন বিশিষ্ট বিচারক। যার ওপর পুরো এক প্রদেশের বিচারকার্যের ভার ন্যস্ত। সে যাহোক, তাই বলে এই শায়খ কখনও কোনো সমাবেশে তার ভাইয়ের দম্ভ দেখানো ছাড়া বসতেই পারে না। এমনকি যদিও তখন সে কাজির পেছনে পেছনে দৌঁড়ে চলে।

কায়রোতে বিদ্বান আলেমরা স্বাভাবিক আসা-যাওয়া করে। কেউ তাদের দিকে বিশেষ মনোযোগই দেয় না। কিন্তু যখন তারা কোনো বিষয়ে কথা বলা শুরু করেন, তখন ওই বিষয়ের প্রতিটা শাখা প্রশাখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন

সে ছিল হানাফি মাযহাবের অনুসারী। আর পুরো শহরে হানাফি মাযহাবের অনুসারী ছিল হাতে গোনা মাত্র ক’জন। বিষয়টি যারপরনাই তাকে তার প্রতিপক্ষ শাফেয়ী ও মালেকি মাযহাবের অনুসারী উলামাদের প্রতি বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ করে তুলত। শহুরে আলেমদের মাঝে যাদের গণ্য করা হত। জ্ঞানের প্রতি যাদের আগ্রহ ছিল সর্ববিদিত ও যাদের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে ফতোয়া চাওয়া হত। ফলে সুযোগ পেলে কখনওই সে আবু হানিফার মাযহাবকে মহিমান্বিত এবং শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবকে হেয় প্রতিপন্ন না করে ক্ষান্ত হত না। কিন্তু গ্রামের লোকেরা যেহেতু সুচতুর ও বুদ্ধিমান, তাই তারা বেশ ভালোভাবেই বুঝত যে, শায়খ যা-কিছু বলছে ও করছে; তা সে কেবল তার ক্ষোভ ও আক্রোশ থেকেই। সুতরাং তারা তাকে সহানুভূতি জানাত ঠিক; কিন্তু তাকে নিয়ে ঠা ঠা করে হাসতও। তাছাড়া এই শায়খ ও আযহারি যুবার মাঝে ছিল শীতল এক যুদ্ধ। কেননা প্রতি বছর এ আযহারি যুবাই খলিফা নিযুক্ত হয়। আর এতেই শায়খের গা জ্বলে। কেন তার পরিবর্তে অমন তরুণ কাউকে খলিফা নিযুক্ত করা হয়েছে! এমনকি লোকেরা যখন এ নিয়ে বলাবলি করছিল যে, জুমাবার তরুণ ওই আযহারি খুতবা দেবে। শায়খ তাদের সব কথাই শুনেছিল ঠিক; কিন্তু কিছুই বলে নি তখন।

অবশেষে শুক্রবার আসে। পুরো মসজিদ কানায় কানায় ভর্তি মানুষে। আযহারি তরুণ খুতবা দেওয়ার জন্য মিম্বরে ওঠে মাত্র; অমনি শায়খ মানুষের মাঝ থেকে উঠে দাঁড়ায়। ধীরে সে ইমামের কাছে যায় এবং সবাইকে শুনিয়ে, স্বর উঁচু করে বলতে শুরু করে, ‘এই যুবা এখনও অপরিণত। তাই তার জন্য মিম্বারে ওঠা ও শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে খুতবা দেওয়া সমীচীন নয়। এমনকি তার ইমামতিও অশোভন; কেননা মুসল্লিদের মাঝে অনেক বয়োবৃদ্ধও আছেন। সুতরাং তোমরা যদি তার মিম্বারে ওঠা মেনে নাও, তাহলে আমি মসজিদ থেকে চলে যাব।’ এরপর সে পুনরায় মুসল্লিদের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘অতএব তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের নামাজ বরবাদ করতে না চাও,তারা আমার অনুসরণ করো।’ লোকেরা তা শোনা মাত্রই তাদের মাঝে ইশারা ও ফিসফাস শুরু হয়। এমনকি সেখানে তথা মসজিদে একটা গোলযোগও ঘটে যেত; যদি না মসজিদের নির্ধারিত ইমাম তাদের উদ্দ্যেশ্যে খুতবা না দিতেন এবং নামাজ না পড়াতেন। সুতরাং এভাবেই সে বছর ওই যুবা ও মিম্বরের মাঝে এক অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। যদিও দীর্ঘদিন ধরে পরম অধ্যাবসায় পুনঃপুন খুতবা মুখস্থ করেছিল সে এবং ধারাবাহিক পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করেছিল।

এমনকি বহুবার সে পিতার সামনে একাকী ওই খুতবা পাঠ করিয়েও শুনিয়েছে। অধিকন্ত তার বাবাও এই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেছিল। মা ছিল উৎকণ্ঠা জর্জরিত। তার দুচোখ জুড়ে যেন ভয় বাসা বেঁধে ছিল। ফলে সেদিন কোনোরকম সে ঘর থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই মা কিছু জ্বলন্ত কয়লা নেন। ওগুলো একটা পাত্রে রেখে তার ওপর বিভিন্ন প্রকারের ধূপগন্ধী ছেটাতে শুরু করেন। তারপর সারা বাড়িময় ঘুরে ঘুরে এক রুম থেকে আরেক রুমে যান। প্রতিটি রুমেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে বিবিধ মন্ত্র জপতে থাকেন। এমনকি তিনি তা লাগাতার তার ছেলে ফিরে আসা পর্যন্ত করেন। এরপর যখন সে ফেরে, তখন তিনি পেছনের দরজা দিয়ে তার সঙ্গে ধূপ ছেটাতে ছেটাতে ও মন্ত্র জপতে জপতে দেখা করেন। ইতোমধ্যে ছেলেটির বাবা ওই ব্যক্তিটিকে (হিংসা যার হৃদয়কে গ্রাস করে নিয়েছিল) আজন্মের শাপ শাপতে থাকেন। অভিসম্পাতে অভিসম্পাতে ধ্বংস করে দিচ্ছিলেন তাকে। কেননা সে-ই তো তার ছেলেকে মিম্বর ও ইমামতি থেকে বঞ্চিত করেছে।

যাহোক, তা শহরে আরেকজন শাফেয়ী আলেম ছিলেন। তিনি ছিলেন মসজিদের ইমাম ও খতিব -দুটোই। তিনি তার সাধুচরিত্র ও ধর্মনিষ্ঠার জন্য বেশ পরিচিত। লোকেরা তার গুণকীর্তন ও প্রশংসায় এতোটাই উদার যে, তাকে প্রায় পবিত্র আত্মার অনুরূপ মনে করত। তারা তার কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করত। তাদের অসুখ-বিসুখ ও প্রয়োজন পূরণে তার শরণাপন্ন হত। ফলে সেও নিজের মাঝে সাধুচরিত্রের বিশেষ কিছু শক্তি অনুভব করত। এমনকি তার মৃত্যুর কয়েক বছর পরও লোকেরা তার কল্যাণের কথা স্মরণ করেছিল। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস অনুযায়ী পরস্পর তারা এও বলাবলি করত যে, যখন তাকে কবরে নামানো হয়, তখন তিনি সুউচ্চ আওয়াজে বলে উঠেছিলেন, ‘হে আল্লাহ এই স্থানকে আপনি আশীর্বাদপুষ্ট করুন।’ শবানুগমনকারী সকলেই যা শুনেছিল কি-না! তদুপরি তারা এও বলে থাকে যে, কীভাবে নিজেদের স্বপ্নে তারা তাকে আল্লাহর কাছ থেকে বিশেষ পুরস্কার গ্রহণ করতে দেখেছে! এবং তার জন্য জান্নাতে কত অবারিত নেয়ামত প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে!
এছাড়া শহরে তৃতীয় আরেক শায়খ ছিলেন; যিনি ছিলেন মালেকি মাযহাবের অনুসারী। কিন্তু নিজেকে তিনি একেবারে জ্ঞানার্জনের পথে উৎসর্গ করে দেন নি। আবার না এটাকে তিনি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তিনি চাষবাস করতেন, কিছু ব্যবসা বাণিজ্যের সাথেও জড়িত ছিলেন। শুধুমাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে যেতেন। কখনও কখনও লোকদের সঙ্গে বসতেন তিনি। তাদের হাদিস পাঠ করে শেনাতেন এবং কোনোরূপ হম্বিতম্বি ছাড়াই বিনীতভাবে তাদেরকে ধর্মীয় বিষয়াদি সম্বন্ধে জ্ঞানদান করতেন। কিন্তু সামান্য কজন লোক ছাড়া কেউ তার দিকে তেমন মনোযোগ দিত না। এই ছিল উলামাদের সাধারণ একটি স্তরভেদ। তবে তারা ছাড়াও উলামাদের আরও অনেকেই শহর, উপশহর বা গ্রামাঞ্চলে বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে ছিল। সাধারণ জনগণের ওপর সরকারি নথিভুক্ত উলামাদের চেয়ে যারা কম প্রভাবশালী ছিলেন না। এমনকি জনসাধারণের চেতনা ও বিবেকবুদ্ধির ওপরও তাদের ছিল যথেষ্ট কর্তৃত্ব।

তাদের মাঝে একজন হাজি ছিলেন। তিনি ছিলেন দর্জি। যার দোকানটি ছিল একেবারে গ্রামের মকতবের সামনেই। তার ব্যাপারে মানুষের ঐক্যমত হলো, লোকটি যাচ্ছেতাই কৃপণ ও ইতর প্রকৃতির। তার সম্পর্ক ছিল বিরাট এক আধ্যাত্মিক সূফির সাথে। উলামাদের সবাই যাকে চরম ঘৃণা করে। কেননা তারা জ্ঞানার্জন করেছে কিতাবাদি (বইপুস্তক) থেকে, শায়খদের থেকে নয়। কিন্তু তার মত হলো, প্রকৃত ইলম তথা জ্ঞান হচ্ছে ইলমে লাদুনি তথা ঐশ্বরিক জ্ঞান। যা সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে হৃদয়ে আসে। কোনো প্রকার বইপুস্তক বা লেখাপড়া জানা ব্যতিরেকে। সেখানে আরও একজন শায়খ ছিলেন; জীবনকে যিনি গাধাওয়ালা হিসেবে প্রবর্তিত করেছিলেন, যে মানুষের পণ্যসামগ্রী ও অস্থাবর সম্পত্তিসমূহ বয়ে চলত। এরপর একসময় সে নিজেই ব্যবসায়ী হয়ে যায় এবং তার গাধা নিজের পণ্যসামগ্রী বহনে লেগে যায়। তার ব্যাপারেও প্রসিদ্ধ ছিল যে, সে অনাথ ও দুর্বলের সম্পদ গ্রাস করে খায় এবং এই করে সে বিরাট ব্যাবসায়ীও বনে গিয়েছিল। যদিও প্রায়শই সে অনাথ ও দুস্থদের সম্বন্ধে বর্ণিত কোরানের এই আয়াত পাঠ ও তার ব্যাখ্যা করে মানুষকে শোনায় যে, ‘যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমদের ধন-সম্পত্তি গ্রাস করে, নিশ্চয় তারা স্বীয় উদরে অগ্নি ব্যতীত কিছুই ভক্ষণ করে না এবং সত্বরই তারা অগ্নি শিখায় উপনীত হবে।’

তদুপরি জামে মসজিদে নামাজ পড়তে অনীহা ছিল তার। কেননা সে ইমাম ও অন্যান্যদের তীব্র ঘৃণা করে। ফলে ছোটো এক মসজিদ গিয়ে নামাজ পড়ত সে।যেখানে না আছে মানুষের আনাগোনা, না আছে এর পরিচিতি। তাদের মাঝে অন্য আরেক শায়খ ছিল, যে ছিল একেবারে নিরক্ষর। এমনকি সূরা ফাতেহাটা পর্যন্ত ভালোভাবে পড়তে জানত না সে। কিন্তু সেই কি-না বিরাট এক সূফি দলের প্রধান। জিকিরের জন্য মানুষকে জড়ো করত সে। তারপর ইহকাল ও পরকাল বিষয়ের বিনির্দেশ শোনাত। এছাড়াও তাদের মাঝে ছিল ফুকাহা। যারা নিজেরা কোরান পড়তেন এবং মানুষকে তা শেখাতেন। নিজেদেরকে তারা ‘আল্লাহর কোরানের বাহক’ বলে উলামাদের থেকে পৃথক করে নিয়েছিলেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ ও নারীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল ঠিক। এদের সংখ্যাগরিষ্ঠরা দৃষ্টিহীন। তারা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোরান পাঠ করে শোনাত। তখন নারীরা তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলত ও নামাজ, রোজা ইত্যকার বিষয়ে তাদের কাছে বিধিনিষেধ জানতে চাইত। এই ফুকাহাদের শিক্ষা পদ্ধতি ছিল অন্যান্য উলামাদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

যারা বইপুস্তক থেকে জ্ঞানার্জন করে এবং তাদের ও আযহারের মাঝে যেকোনোভাবেই মোটামুটি একটা সম্পর্ক হলেও আছে। অধিকন্তু সুফি এবং যারা ইলমে লাদুনি তথা ঐশ্বরিক জ্ঞানের প্রবক্তা তাদের থেকেও আলাদা ছিল ফুকাহাদের শিক্ষা পদ্ধতি। অর্থাৎ সরাসরি তারা কোরান থেকে জ্ঞানার্জন করতেন এবং তাদের সাধ্যানুযায়ী তারা তা বুঝতেন ও ব্যখ্যা করতেন। তবে তা আক্ষরিক অর্থে নয় এবং যেভাবে তা ব্যখ্যা করা উচিত; সেভাবেও নয়। প্রকৃতপক্ষে কোরানকে তারা সেভাবেই বুঝত যেভাবে আমাদের শিক্ষক বুঝেছিলেন (তিনি ছিলেন ফকীহদের মধ্যে সবচেয়ে ধীমান, জ্ঞানে সর্বশ্রেষ্ঠ ও ব্যখ্যাপ্রদানে অতুলনীয়)। তা একদিন বালক তাকে জিজ্ঞেস করে, আল্লাহ তায়ালার এ কথাটির অর্থ কী যে, ‘অক্বদ খলাকাকুম আতওয়ারা’ (মূল অর্থ : ‘অথচ তিনিই তোমাদেরকে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি করেছেন।’ সূরা নূহ : আয়াত ১৪।) তিনি তখন ধীর, নিশ্চিন্ত জবাব দেন, তোমাদের ষাঁড়ের এর মত সৃষ্টি করা হয়েছে। অবশ্য তুমি এর অর্থ বুঝতে পারবে না। অথবা তারা কোরানের ব্যখ্যা করত যেভাবে বালকের দাদা তা করত। যিনি ছিলেন বহু হাফেজ (কোরান মুখস্থকারী) এর চেয়েও শ্রেষ্ঠ হাফেজ। তার উপলব্ধি ছিল বহু মানুষের চেয়েও সূক্ষ্ম। কোরানের ব্যখ্যায় তিনি ছিলেন অনেকের চেয়ে সুদক্ষ।

একদিন তার নাতি তাকে কোরানের এই আয়াতের মর্মার্থ জিজ্ঞেস করেন, ‘ওয়ামিনান্নাসি ….আলা হরফিন…’ অথাৎ : মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর ইবাদাত করে দ্বিধার সাথে; তার মঙ্গল হলে তাতে প্রশান্তি লাভ করে এবং কোনো বিপর্যয় ঘটলে সে তার পুর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুনিয়াতে ও আখেরাতে; এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি।’ * উত্তরে তিনি বলেন, ‘এখানে হরফ শব্দের অর্থ কোনো পাথুরে বেঞ্চ এর প্রান্তদেশ…সুতরাং এর অর্থ হলো, যদি কল্যাণ ও ভাল তাকে স্পর্শ করে তাহলে সে তার জায়গায় নিশ্চিন্ত। আর যদি অনিষ্টতা ও মন্দ তাকে স্পর্শ করে তাহলে সে তার সম্মুখে উল্টে পড়ে। যাহোক, অতএব আমাদের বন্ধুটি এই সকল উলামাদের মতাদর্শ ও জ্ঞানার্জনের রীতিনীতি স্বাধীনভাবেই সংমিশ্রণ করেছিল এবং তাদের সবার থেকেই কিছু কিছু গ্রহণ করেছিল। ফলে সে নিজের ভেতর জ্ঞানের বিরাট এক ভাণ্ডার জমা করে নিয়েছিল; যা ছিল দ্বিধাজড়িত ও পরস্পরবিরোধী। আমার মনে হয় না, তার নিজস্ব চিন্তা গঠনে এসব সামান্যও কাজে এসেছে। কেননা সেসব কোনোভাবেই দ্বিধা,দ্বন্দ্ব, পরস্পর বিরোধিতা, অভিমত ও বৈপরীত্যতা থেকে মুক্ত ছিল না।
….
* ফতোয়া বা ফাতওয়া হলো : বিধান ও সমাধান; যা কোনো ঘটনা বা অবস্থার প্রেক্ষিতে ইসলামি শরিয়তের প্রমাণাদির আলোকে মুফতি বা ইসলামি আইন-বিশেষজ্ঞ প্রদান করে থাকেন। তবে ফতোয়া শব্দের পরিভাষাগত অর্থে ইসলামি পণ্ডিতদের বিভিন্ন মতামত রয়েছে। যেমন, ইমামি কারাফি বলেন, ফতোয়া হলো : আল্লাহর আদেশ-নিষেধের ব্যাপারে সংবাদ দেয়া। ইমাম জুরজানি বলেন, মাসআলা-মাসায়েল সম্বন্ধে বর্ণনা করা।
ইমাম ইবনে হামদান আল-হিরানি বলেন, যারা এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে তাদেরকে শরযী হুকুমের ব্যখ্যা প্রদান।
* সূরা আন-নিসা : আয়াত: ১০ *সূরা হাজ্জ : আয়াত : ১১

আরো পড়তে পারেন

একাত্তরের গণহত্যা প্রতিহত করা কি সম্ভব ছিল?

২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানি নরঘাতকেরা যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই এক রাতেই শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় তিন হাজার। এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা একতরফাভাবে….

ভাষা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা

আগের পর্বে পড়ুন— চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল) ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে দুই হাজার মাইল দূরত্বের….

চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল)

আগের পর্বে পড়ুন— বায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ একুশের আবেগ সংহত থাকে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেও। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান এক বিবৃতিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। আওয়ামি লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম কমিটির সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র….

error: Content is protected !!