Author Picture

ত্বহা হুসাইনের দিনগুলি

কাউসার মাহমুদ

তের

সে দেখে শহুরে ওই যুবক প্রথম ও দ্বিতীয় দিন কিছুই বলে না তাকে। কিন্তু এই ঘটনা যখন ধারাবাহিক ঘটতে থাকে, তখন একদিন (শায়খ) বাবার চলে যাওয়ার অপেক্ষা করে সে। তারপর বালককে তার মায়ের সামনে বলে, ‘তুমি তোমার বাবার সঙ্গে প্রতারণা করছ এবং তাকে মিথ্যা বলছ। মকতবে পড়াশোনা কিছুই করো না, শুধু কেবল খেলাধুলাই করো ওখানে।’

আর কেনই বা তার আনন্দ করা উচিত নয়! যখন প্রথম দিনই সে বুঝতে পেরেছিল তার মর্যাদা কয়েক স্তর উন্নীত হয়েছে। কারণ আমাদের শিক্ষক তাকে আলফিয়া মুখস্থ করাতে বা তার থেকে তা শ্রবণ করতে অক্ষম। কেননা অজপাড়াগাঁ’র এই ছোটো মকতব থেকে বহুদূরে ছিল আলফিয়ার ব্যাপ্তি। তাই এ কিতাব পড়ার জন্য মকতব ছেড়ে রোজ তার আদালতে কাজির দরবারে যেতে হয়। যেখানে সে তার কাছে ইচ্ছে অনুযায়ী মুখস্থ করে।
কাজি ছিলেন আযহারে পড়ুয়া আলেম। যিনি বালকের আযহারি ভাইয়ের চেয়েও অনেক বড় পণ্ডিত। যদিও বালকের বাবা বিষয়টি বিশ্বাস করেন না এবং মনে করেন কাজি আর তার ছেলে সমান সমান।
তা যাই হোক, তবু তিনি আযহারে পাশ করা উলামাদের একজন এবং শরীয়াহ আইনের একজন কাজি। যিনি তার ‘ক্বাফ’ শব্দ উচ্চারণে বেশ প্রশস্ত করেন এবং ‘রা’ বলার সময় চেপে জোর দেন। তদুপরি তিনি বসেন শরীয়া কোর্টে, মকতবে নয় অবশ্যই। ওখানে গদি ও গালিচা সজ্জিত উঁচু এক বেদিতে উপবিষ্ট থাকেন তিনি। যা কোনোভাবেই আমাদের শিক্ষকের বেদির সঙ্গে তুল্যযোগ্য নয়, না তার চারপাশে অসংখ্য জুতো ছড়িয়ে থাকে। বরং তার দরজায় সবসময় দুজন দারোয়ান গম্ভীরমুখে দাঁড়িয়ে থাকে। ‘নকিব’ বলে লোকেরা যাদের চমৎকার একটি নাম দিয়েছিল।
হ্যাঁ। তা আমাদের বালক প্রত্যহ ভোরে কাজির দরবারে যেত এবং আলফিয়ার যেকোনো অধ্যায় থেকে তার কাছে পড়ত। আহ! কী চমৎকার করেই না কাজি তা আবৃত্তি করতেন। কী অদ্ভুতভাবেই না তিনি পুরো মুখ ভরে ‘ক্বাফ’ ও ‘রা’ উচ্চারণ করতেন। আর ইবনে মালেকের এ পঙক্তিগুলো বলার সময় কী অপূর্ব সুষমায় যেন তার কণ্ঠ কাঁপত!
‘কালামুনা লফযুন মুফিদুন কা-ইস্তাকিম/
ও ইসমুন ও ফেয়লুন ছুম্মা হরফুল কালিম
ওয়াহিদুহু কালিমাতুন ওয়ালক্বাওলু আম/
ওয়াক্বিলমাতুন বিহা ক্বালামুন ক্বদ য়ূআম।’
মোটকথা কাজি-বালকের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন এবং যখন তিনি নিম্নোক্ত পঙক্তিগুলো আবৃত্তি করতেন, তখন বালকের হৃদয় বিনয়ে পূর্ণ হয়ে ওঠতো :
‘ওয়া তাকতাযি রিদন্ বিগাইরি সুখতিন/
ফা-য়িকাতান আলফিয়্যাতা ইবনে মুতি
ওহুয়া বিসাবাকীন হায়ীযুন তাফযিলা/
মুস্তাউজিবুন সানায়িয়্যাল জামিলা;
ওয়াল্লাহু ইয়াকযি বিহাবাতিন ওয়াফিরা/
লি ওয়ালাহু ফি দারাজাতিল আখিরা।’
এই শ্লোকগুলো তিনি ভাঙা গলায় মৃদু কান্নার স্বরে পাঠ করেন। তারপর বালককে উদ্দ্যেশ্য করে বলেন, ‘যে আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়; তিনি তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। কিন্ত তুমি কি পদ্যগুলো বুঝেছ?’
জবাবে বালক জানায়, ‘জি না।’
আচ্ছা শোনো তবে, মূল ঘটনাটি হলো, লেখক যখন (আল্লাহ তার ওপর রহম করুন) এই কিতাব তথা আলফিয়ার কাব্যসমূহ রচনা শুরু করেন, তখন একপর্যায়ে তিনি ধোঁকায় নিপতিত হন এবং নিজের এই অভূতপূর্ব রচনা তাকে দাম্ভিক করে তোলে। তাই তিনি বলেন, ‘আমার এই রচনা ইবনে মুতির আলফিয়াকেও অতিক্রম করে যাবে।’ কিন্তু সেই রাতে ঘুমুতে যাওয়ার পর স্বপ্নে দেখেন ইবনে মুতি তাকে চরমভাবে তিরস্কার করছেন। এরপর যখন তিনি ঘুম থেকে ওঠেন তখন নিজের এই আত্মপ্রতারণা সংশোধন করে বলেন, ‘না ইবনে মুতি বরং আমার অগ্রদূত ছিলেন।’
তবে শায়খ (বাবা) সেদিন কী আনন্দিতই না ছিলেন, যখন বালক দুপুরে বাড়ি ফেরে এবং কাজির কাছে কি কি শুনেছে ও কিভাবে তার কাছে আলফিয়ার প্রথম স্তবকগুচ্ছ পড়েছে- সব তাকে জানায়! এও জানায়, কিভাবে কাজি আল্লাহ আল্লাহ বলে কবিতাগুলো পাঠের মাঝে, সম্মত জানাতে তাকে থামাতেন। কিন্তু প্রতিটি জিনিসেরই তো একটা সীমা আছে। সুতরাং সেভাবে আমাদের বন্ধুটিও ভীষণ উৎফুল্লে আলফিয়া মুখস্থ শুরু করে, যতক্ষণ না সে মুবতাদা (ইংরেজিতে যেটিকে সাবজেক্ট বলে) এর অধ্যায়ে আসে। এরপর যেন তার সমস্ত শক্তিই ফুরিয়ে যায়। এদিকে বাবাও তাকে রোজ জিজ্ঞেস করেন, ‘গিয়েছিলে কাজির দরবারে?’
সে ও জবাবে বলে, ‘হ্যাঁ।’
তখন বাবা পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, ‘আজ কতটুকু মুখস্থ করলে?’
‘বিশটি।’
‘তাহলে ওগুলো শোনাও আমাকে।’
তখন সেও তা বাবাকে আবৃত্তি করে শোনায়।
কিন্তু এ সমস্ত বিষয়াদি মুবতাদা অধ্যায় থেকে তার কাছে যারপরনাই কঠিন মনে হত লাগল। ফলে তীব্র এক আলস্যতা নিয়েই আজকাল সে কাজির ওখানে যায়। তদুপরি কোনোমতে যখন সে ‘মাফউলে মুতলাক’ অধ্যায় পর্যন্ত পৌঁছে-এরপর কোনোভাবেই সে আর এগুতে পারে না। কিন্তু রোজ সে ঠিকই কাজির দরবারে যায় এবং তার কাছে আলফিয়ার বিভিন্ন অধ্যায় সমূহ থেকে যেকোনো একটি অধ্যায় পড়ে। এরপর আগে যেসময়ে মকতব থেকে ফিরে আসত, এখনও সেসময়েই ফিরে আসে এবং ঘরের এককোণে কিতাবটি ছুঁড়ে ফেলে খেলাধুলা ও গল্প পাঠে মশগুল হয়ে পড়ে।
এরপর বিকেলে যখন বাবা জিজ্ঞেস করেন, ‘পড়তে গিয়েছিলে আজ?’
সে জানায়, ‘হ্যাঁ।’
‘কয়টা কবিতা মুখস্থ করলে?’
‘বিশটি।’
‘কোন অধ্যায় থেকে?’
‘ইযাফত’ এর অধ্যায় থেকে, ‘নাঅত’ অধ্যায় থেকে অথবা ‘জমঅে তাকসীর’ অধ্যায় থেকে।
তখন বাবা তাকে বলেন, ‘আচ্ছা যা মুখস্থ করেছ শোনাও আমাকে।’
বালক তখন প্রথম দুইশো পদ্যের যে বিশটি মুখস্থ করেছিল; ওই শোনায় তাকে। এরপর একবার শোনায় ‘মু’রাব-মাবনি’ থেকে। দ্বিতীয়বার ‘মারেফা-নাকেরা’ আর তৃতীয়বার ‘মুবতাদা-খবর’ থেকে।
কিন্ত শায়খ-এর মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝে না। এমনকি এও বুঝতে পারে না যে, তার সন্তান তার সঙ্গে প্রতারণা করছে। সে বরং ওই কাব্যগুচ্ছ শুনেই খুশি। এবং কাজির ওপরেও তার আস্থা আছে বেশ।
তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়টি হলো, একবারের জন্যও (শায়খ) বাবা আলফিয়া কিতাবটি খোলার চিন্তা করেননি এবং তা ধরে ছেলের আবৃত্তি শোনেননি। একদিনের জন্যও যদি তিনি এমনটি করতেন, তাহলে এই গল্পটিও সূরা শুয়ারা, সাবা ও সূরা ফাতিরের মতোই হত।
কিন্তু বালক একবার এই ঘোরতর বিপদের সম্মুখীন হয়েছিল ঠিক। যদি না মা সেবার তার জন্য সুপারিশ করতেন; তাহলে নিশ্চিত বাবা ও তার মাঝে একটি দৃশ্য স্মরণীয় হয়ে থাকত।
মূলত তার এক ভাই ছিল, যে শহরের মাদরাসায় পড়ে। গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতে কায়রো থেকে বাড়িতে এসেছিল সে। সে-ই একদিন শুনতে পায় যে শায়খ তার ছেলেকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘কোন অধ্যায় পড়েছ?’
জবাবে বরাবরেই মতোই বালক জানায়,‘আতফ’ এর অধ্যায়।’
এরপর বাবা যখন তাকে আবৃত্তির জন্য বলেন। সে তখন তাকে ‘আ-লাম’ ও ‘সিলা-মওসুলের’ অধ্যায় পাঠ করে শুনিয়ে দেয়।
এই দেখে শহুরে ওই যুবক প্রথম দিন বা দ্বিতীয় দিন কিছুই বলে না তাকে। কিন্তু এই ঘটনা যখন ধারাবাহিক ঘটতে থাকে, তখন একদিন (শায়খ) বাবার চলে যাওয়ার অপেক্ষা করে সে। তারপর বালককে তার মায়ের সামনে বলে, ‘তুমি তোমার বাবার সঙ্গে প্রতারণা করছ এবং তাকে ক্রমাগত মিথ্যা বলছ। মকতবে পড়াশোনা কিছুই করো না, শুধু কেবল খেলাধুলাই করো ওখানে।’
জবাবে বালক বলে,‘তুমি একটা মিথ্যুক। তাছাড়া তোমার এখানে কী? আলফিয়া আযহারীদের জন্য। তোমার মতো মাদরাসায় পড়ুয়াদের জন্য নয় নিশ্চয়। যাও কাজিকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর, প্রতিদিন তার কাছে শরীয়াহ কোর্টে পড়তে যাই আমি।’
যুবা তখন জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা! কোন অধ্যায় মুখস্থ করেছ আজ?’
‘অমুক অধ্যায়।’
‘কিন্তু তুমি তো এই অধ্যায়টি তোমার বাবার কাছে পাঠ করনি। অন্যটি পড়েছ। যাও আলফিয়া নিয়ে এস। আমি তোমাকে পরীক্ষা করব।’
এতে অবশ্য বালকের বিস্ময়ে হতবাক হওয়ার জোগাড়। তার বিহ্বলতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে তখন।
এই অবস্থা দেখে যুবক ভাবে সবকিছু শায়খকে জানাবে। কিন্ত মা তার কাছে এসব না বলার মিনতি জানায় । মায়ের আর্জি শুনে যুবক মায়ের প্রতি সহমর্মি হয়ে ওঠে এবং ভাইয়ের প্রতিও দয়া হয় তার। ফলে এ ব্যাপারে কিছুই বলে না সে। আর শায়খও তার অজ্ঞতার ভেতর নিপতিত থাকে; যতদিন পর্যন্ত না বালকের আযহারি ভাই কায়রো থেকে ফিরে এসেছিল। এরপর ভাই এসে যখন তার পরীক্ষা নেয় তখন প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ হতে দেরী হয় না আর। যদিও এতে সে একদমই রাগ করে না, বালককেও সতর্ক করে না, শায়খকেও কিছু জানায় না। পরিবর্তে স্থির কণ্ঠে সে শুধু বালককে মকতব ও কাজির ওখানে না যাওয়ার নির্দেশ দেয় এবং দশ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ আলফিয়া মুখস্থ করে শোনাতে বলে তাকে।

আরো পড়তে পারেন

একাত্তরের গণহত্যা প্রতিহত করা কি সম্ভব ছিল?

২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানি নরঘাতকেরা যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই এক রাতেই শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় তিন হাজার। এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা একতরফাভাবে….

ভাষা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা

আগের পর্বে পড়ুন— চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল) ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে দুই হাজার মাইল দূরত্বের….

চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল)

আগের পর্বে পড়ুন— বায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ একুশের আবেগ সংহত থাকে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেও। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান এক বিবৃতিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। আওয়ামি লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম কমিটির সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র….

error: Content is protected !!