Author Picture

যৌনতার রাজনীতি

রেজাউল করিম রনি

ব্লেইম গেইমের (দোষারোপের) বাইরে যৌনতার রাজনীতির আলাপটাই আমরা তুলতে পারি নাই। একটা সময়ে আমাদের দেশের কালচারাল বামপন্থীদের মধ্যে যারা একটু বুদ্ধিজীবীতাগিরি করতে চেষ্টা করতো তারা, বিখ্যাত আমেরিকান নারীবাদী চিন্তক কেট মিলেটের (Kate Millett) ‘সেক্স ইজ পলিটিক্যাল’ মানে ‘যৌনতা রাজনৈতিক’- কথাটা খুব ব্যবহার করতো। যদিও মিলেটের বইটা পুরোপুরি পড়ে দেখেছে বলে তাদের লেখা-লেখি পড়ে মনে হয় নাই। কারণ, তারা মিলেটকে একটা বাম ও শ্রেণী বিপ্লবী হিসেবে হাজির করেছেন অথচ মিলেটের এই কাজের যারা পরে ক্রিটিক করেছেন তারা বরং বলছেন, তিনি রেস/বর্ণ ও শ্রেণীর প্রশ্নটা এখানে গুরুত্ব দেন নাই। যদিও বামরা এখানে মিলেটকে বিশাল বিপ্লবী আকারে হাজির করেছে। অথচ বিষয়টা পুরাই উল্টা। আবশ্য কালচারাল বামদের একটা কমন স্বভাব হলো সব কিছুকে মার্কসবাদের (তাদের তৈরিকৃত মার্কসবাদ) চোখ দিয়ে দেখা।

যাক সেই কথা। খুব ছোট করে এখনকার আমাদের প্রেক্ষাপটে এই পুরানা ক্ল্যাসিক বইটার সূত্র ধরে কিছু কথা বলতে চেষ্টা করবো। কেট মিলেটের ‘Sexual Politics’ বইটি উনার পিএইচডি থিসিসের লিখিত রুপ। এটা প্রথম বই আকারে বের হয় ১৯৬৯ সালে (কোন কোন জায়গায় ১৯৭০ সালের কথাও উল্লেখ আছে। আমি যে কপিটা পড়ছি এটা ২০১৬ সালে নতুন করে ভূমিকা লিখে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে আবার বের করা হয়েছে।) এটাকে একটা ক্লাসিক বই হিসেবে ধরা হয় নারী/যৌনতা/ক্ষমতার আলোচনার জগতে। এই বইটা বের হওয়ার সাথে সাথেই ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। বইটা প্রকাশের পরেই টাইম ম্যাগাজিনে ‘The Politics of Sex’ শিরোনামে একটা প্রচ্ছদ কাহিনীও করা হয়েছিল মিলেট ও এই বইটিকে নিয়ে। বইটার প্রকাশের পরে যে বিপুর আলোচনার জন্ম হয়েছিল তা সহজেই বুঝতে পারা যাচ্ছে। ইংরেজি সাহিত্যের বিখ্যাত কিছু উপন্যাসকে বিশ্লেষণ করে মিলেট তার তাত্বিক কাঠামো গড়ে তুলেছেন। খ্যাতিমান নারীবাদি সাহিত্য তাত্বিক Toril Moi তার আলোচিত বই ‘Sexual/Textual Politics’-এ কেট মিলেটের বইটা নিয়ে ক্রিটিক্যাল আলোচনা করেছেন। তিনি এই বইটাকে খুবই শক্তভাবে ক্রিটিক করেছেন। বইটাতে মূলত তিনটা পার্ট আছে। প্রথম অংশে আছে যৌনতার রাজনীতি নিয়ে আলাপ। দ্বিতীয় ভাগে আছে ঐতিহাসিক ব্যকগ্রাউন্ড এবং এর পরে আছে সাহিত্যিক রিফ্লেকশন।

যৌনতার বা যৌন-আধিপত্যের প্রতি যে ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে তা ক্ষমতার প্রতি আমাদের মনোভাবের আদলেই গড়ে ওঠে

প্রথম অংশে যৌনতার সাথে ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। তারপরে দেখিয়েছেন নারীবাদিদের সংগ্রামের দিকগুলো। এবং বিখ্যাত ইংরেজি সাহিত্যিকদের কয়েক জনের উপন্যাসের আলোচনা করে দেখিয়েছে তাদের কাজে যৌনতার রাজনীতি কিভাবে প্রভাব ফেলেছে। তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষিত ধরে সাহিত্যের আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন যা পরর্বতী প্রায় সব নারীবাদি লেখক-চিন্তককেই কোন না কোন ভাবে প্রভাবিত করেছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মিমাংসা করার চেষ্টা করার জন্য বইটার প্রশংসা করেও টরি মই কেট মিলেটের কাজকে র‍্যাটরিক্যাল বলেছেন।

মিলেট ফ্রয়েডকে যেভাবে এখানে পাঠ করেছেন তারও ক্রিটিক করেছেন। তিনিও অন্য অনেক সমালোচকদের মতো মনে করেন মিলেট ফ্রয়েডকে মিস রিডিং দিয়েছেন। অন্যদিকে তিনি নারীদের কাজ ও তাত্বিক ভূমিকাকে হয়তো উপযোক্ত করণেই যথেষ্ট আমলে নেন নাই এই কাজের বেলায়। যৌনতাকে তিনি যেভাবে ক্ষমতার সম্পর্কের সাথে মিলিয়ে আলোচনা করেছেন তাতে যৌনতার যে মাল্টি ডাইমেনশন আছে তা গরহাজির। মিলেট যৌনতার রাজনীতির মূল কথা মনে করেন- ক্ষমতা।

যৌনতার বা যৌন-আধিপত্যের প্রতি যে ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে তা ক্ষমতার প্রতি আমাদের মনোভাবের আদলেই গড়ে ওঠে। মানে যৌনতার ধারণা ও ক্ষমতার ধারণা এখানে একাকার। টরি মই মনে করেন, মিলেট এখানে রুলিং সেক্স বা ক্ষমতাশ্রয়ী যৌনতার অধীনে বা অধস্তন হিসেবে অন্যসব ধরণের যৌনতাকে দেখছেন। যেন একটা প্রধান যৌন আইডেনটিটি ক্ষমতার দ্বারা তৈরি হয় এবং অন্য আইডেনটিটি ক্ষমতার নির্মানকৃত সেই যৌনতার অধীনে থাকে। টরি মই মিলেটের বই থেকে কোট করে লিখেন, “There are, however, more concrete reasons for Millett’s superficial treatment of other women writers and theoreticians. Millett defines the ‘essence of politics’ as power, seeking to prove that ‘However muted its present appearance may be, sexual dominion obtains nevertheless as perhaps the most pervasive ideology of our culture and provides its most fundamental concepts of power’ (25).
Her definition of sexual politics is simply this: the process whereby the ruling sex seeks to maintain and extend its power over the subordinate sex. Her book as a whole is the elaboration of this single statement, rhetorically structured so as to demonstrate the persistence and pervasiveness of this process throughout cultural life.”
(মিলেটের বইয়ের ২৫ নাম্বার পেজ থেকে কোট করা হয়েছে। আর পুরো লেখাটা আছে টরি মইয়ের বইয়ের ২৬ নাম্বার পৃষ্ঠায়) আগেই বলেছি, মিলেটের এই কাজ নারীবাদি চিন্তার দুনিয়ায় বিপুল প্রভাব বিস্তার করলেও অনেকেই এটার ক্রিটিকও করেছেন। এই বইয়ের লম্বা আলোচনা এখানে করতে পারবো না। দরকারি কয়েকটা কথা পয়েন্ট করে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাসহ বলেই শেষ করবো।

যৌনতাকে একটা ‘মোরাল’ ক্যাটাগরি আকারে হাজির করে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের একটা প্রক্রিয়া শুরু করা হয়

১.
অত্যাচারী শাসক যখন যৌনতাকে ব্যবহার করে তখন সে এটাকে একই সাথে সাংষ্কৃতিক ও রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

২. মিলেট লিখেন, “Sex is deep at the heart of our troubles… ” (২২)
আমাদের সংকটের গোড়ার গভীরে রয়েছে যৌনতা। এবং তিনি এর পরে আরও লিখেন, যদি আমরা আমাদের নিপীড়নমূলক ব্যাবস্থাকে বিনাশ করতে না পারি, যদি আমরা যৌন রাজনীতির গভীরে দেখতে না পারি এবং ক্ষমতার রুগ্ন ও অত্যাচারী রুপটা বুঝতে না পারি, তাইলে আমাদের স্বাধীনতার প্রচেষ্টা কোন কাজে আসবে না। আমরা আবার সেই আগের অবস্থাতেই ফিরে যাবো। কোন কিছুই পরির্বতন হবে না।

৩.তিনি আরও লিখেন, গভীরে ‘sexualization of power is the basis of oppression.’ মানে ক্ষমতার যৌনায়ন নির্যাতনের ভিত্তি তৈরি করে। তখন যৌনতাকে একটা ‘মোরাল’ ক্যাটাগরি আকারে হাজির করে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের একটা প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। মানে যৌনতা এখানে ক্ষমতা প্রয়োগের একটা পাটাতন বা হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

৪. যৌনতার যে ধারণা সমাজে প্রচলিত থাকে তা যৌনতার সমাজিক ধারণা। এটা যৌনতার যে স্বভাব বা প্রকৃতি (ন্যাচারাল) সেই ধারণা না। তখন এর মধ্যে জেন্ডার রোল ও অন্য অনেক বিষয় হাজির হয়। মানে সামাজিক পরিসরে যৌনতার যে ধারণা তা যৌনতার ন্যাচারল যে ধরণ বা ধারণা তার সাথে মিল থাকে না। তাই এই ধারণা যেহেতু প্রকৃত যৌনতার ধারণার থেকে বিচ্যুত একটি ধারণা, ফলে এটাকে নারীর বিরুদ্ধে যেমন ব্যবহার করা যায়, সমাজের ভিন্নমতের এবং দুর্বল পুরুষের বিরুদ্ধেও ব্যবহার করা যায়। আমাদের দেশের তথাকথিত নারীবাদিদের আলোচনাতে যৌনতাকে ধরেই নেয়া যে, এটা পুরুষদের কাছে নির্যাতনের অস্ত্র। খোদ যৌনতাকেই নারীর প্রতি একটা নির্যাতনের হাতিয়ার যা পুরুষ প্রয়োগ করে- এটা তারা ধরেই নেয়। তারা কখনও এটা ভেবেই দেখে না যে, যেই যৌনতার দ্বারা নারী বা পুরুষ বা দুর্বল অত্যাচারিত সেই খোদ যৌনতার ধারণাতেই ‘যৌনতা’ নাই। যে যৌনতাকে ব্যবহার করা হয় এই অত্যাচারের টুল হিসেবে তা যৌনতা বিষয়ে ক্ষমতার প্রয়োজনে তৈরি করা একটা ধারণা মাত্র। যৌনতার ন্যাচারাল স্বভাব তাতে নাই। ফলে নারীবাদের যৌন স্বাধীনতার যে জিকির তাতে যৌনতাকে যৌনতনার ন্যাচারাল রুপে ফেরাবার বার্তা নাই বরং এটা পুরুষ/অন্যরা কেন টুল হিসেবে ব্যবাহার করছে- এটাই মূল প্রশ্ন হিসেবে থাকে।

সামাজিক পরিসরে যৌনতার যে ধারণা তা যৌনতার ন্যাচারল যে ধরণ বা ধারণা তার সাথে মিল থাকে না

এটাকে সে দখল করতে চায়। ফলে কর্পোরেট মর্ডান কালচারাল ইডিওলজি তাকে আরও উস্কে দিয়ে, তার যৌনতাকে বাজারে হাজির করার প্রতিযোগিতায় তাকে সহজেই ঠেলে দেয়। যাক, নারীবাদের চিন্তার অনেক দরকারী দিকও যেমন আছে এটার ক্রিটিকও আছে। এখানে সেই বিস্তারিত আলাপ করে একটা কাজের উদাহরণ দেই।
১৭ আক্টোবল ২০১৪ সালে কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারে অন লাইন একটিভিস্ট গ্রুপ সিপি গ্যাং সরকারের সমালোচক লেখক, সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীদের ছবি সংবলিত একটি ব্যানার নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করে। সেই ব্যানারে লেখা হয়, এই সব স্বাধীনতা বিরোধী বুদ্ধিবেশ্যাদের প্রতিহত করুন। এতো কিছু থাকতে কেন তাদের ‘বুদ্ধিবেশ্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলো? বেশ্যার পরিচয়ের সাথে যৌনতার সম্পর্ক পাকাপাকি ভাবে জড়িত। এই বেশ্যা শব্দটি কেন বেছে নেয়া হলো? যদিও এই তালিকার বেশির ভাগই পুরুষ। যে শব্দটি যৌনতা বিক্রির পেশায় জড়িত নারীকে রগরগে ভাবে চিহ্নিত করতে ব্যবহার করা হয়, কেন সেই শব্দ তাদের বেলায় ব্যবহার করা হলো? এই বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন রেহনুমা আহমেদ। ফ্যাসিবাদি রাজনীতি কীভাবে তার জাতীয় ইতিহাসের নির্মানে যৌনতাকে ব্যবহার করেন এবং নারীকে অপমান করতে করতেই নির্মান করেন জাতীয় গৌরবের ইতিহাস তার নিবিড় পর্যালোচনা করেছেন রেহনুমা আহমেদ। উনার বই, ‘নৈতিক স্মৃতিচারণ হিসেবে ইতিহাস; সিপি গ্যায়- এর “বেশ্যা” ব্যানার” সাম্প্রতিক সমায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

যৌনতার রাজনীতির বর্তমান রুপটি বুঝতে খুবই কাজের একটি বই তিনি লিখেছেন। কিন্তু এই কাজটি নিয়ে কোন আলোচনা চোখে পড়েনি। গোটা ফ্যাসিবাদি ক্ষমতার ইতিহাস প্রকল্পের মিথ্যাচার ও ধোকাটা তিনি উদাম করে দিয়েছেন এই যৌনবাদি ক্ষমতার চরিত্র পাঠ করতে করতে। বইটার সব বিষয়ের সাথে আমি একমত না। অনেক ক্রিটিক আছে। নারীর প্রশ্নকে আমি উনার পদ্ধতির মতো দেখি না। তার পরেও এই কাজটার গুরুত্ব অনেক। এবং খুবই সুলিখিত ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ। এটা নিয়ে আলাদা করে আলোচনার ইচ্ছে আছে। এখানে শুধু একটা অংশ কোট করি। “বেশ্যা হচ্ছে যাকে বলে সবকিছুকে-ধারণ-করা যায় এমনই একটি ‘হোল্ডঅল’ সমাধান: আমরা যুদ্ধে ধর্ষিত নারীকে ফেরত নিতে চাই না, কী করব? তাদের বেশ্যা ঘোষণা করো। আমরা একটি কিশোরিকে গণধর্ষণ করে হত্যা করেছি কিন্তু আমরা শাস্তি পেতে চাই না, কী করি বলো তো? একটি সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলো, ও বেশ্যা। আমরা এই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পছন্দ করি না যারা সরকারের সমালোচনা করে, কী করব? ওদের ছবি পোষ্টারে ছাপো বেশ্যা ডাকো।” (‘নৈতিক স্মৃতিচারণ হিসেবে ইতিহাস; সিপি গ্যায় -এর “বেশ্যা” ব্যানার”- রেহনুমা আহমেদ। প্রথম প্রকাশ, ২০১৮, দৃক বুকস, পৃষ্ঠা-১৬৯)

আমরা যুদ্ধে ধর্ষিত নারীকে ফেরত নিতে চাই না, কী করব? তাদের বেশ্যা ঘোষণা করো। আমরা একটি কিশোরিকে গণধর্ষণ করে হত্যা করেছি কিন্তু আমরা শাস্তি পেতে চাই না, কী করি বলো তো? একটি সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলো, ও বেশ্যা

এই দিকটি যৌনতার রাজনীতির বিষয়টা বুঝতে খুবই কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। যৌনতার সহিংস ব্যবহার আমরা প্রতিনিয়ত সংবাদে দেখি। রাজনৈতিক ব্যবহারও আমরা দেখে আসছি। বিরোধী দল সমর্থন করা। অপছন্দের পার্থিকে ভোট দেয়ার জন্য দল বেঁধে তিন বাচ্চার মাকে ধর্ষণ করার মতোন খবরের সাথেও আমরা পরিচিত, অভ্যস্ত। এগুরা যৌন রাজনীতির খুব সরাসরি প্রয়োগ। কিন্তু এখানে রেহনুমা যে বিষয়টি বুঝাতে চাইছেন তা খুব জরুরী। সেটা হলো- এই ক্ষমতা নতুন আইডেনটিটি তৈরি করে। মানে যৌন আইডেনটিটি তৈরি করে। যা পরে যৌনতার যে মোরাল বা নৈতিক আবেগ আছে তার বিরুদ্ধে অপছন্দের ব্যাক্তিকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়। দেয়া হয় বেশ্যার তকমা। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই হয়ে যায় তখন বেশ্যা। এই বেশ্যাকরণ যৌন রাজনীতির একটি মোক্ষম অস্ত্র। কোন নারীকে বেশ্যা বললে তার আর কোন ডিফেন্স থাকে না। আর কোন আস্ত্রয় থাকে না। কিন্তু ক্ষমতার প্রয়োজনে এই ঘৃণার নৈতিক অনূভুতি পুরুষের বেলাতেও প্রয়োগ করা হয়।

বাস্তবে কার যৌন পরিচয় কি বা জেন্ডার কি তাতে কিছু আসে যায় না। ক্ষমতাই নির্ধারণ করে দেয় সেই পরিচয়। এভাবেই যৌনতার রাজনীতি সমাজের মোরাল কোড, যৌনতার প্রতি তৈরি করা কিছু তকমাকে কাজে লাগিয়ে অসাম্যতাকে, অন্যায়কে একটি মহান কাজ বা কর্তব্য হিসেবে হাজির করে থাকে। আরও একটি প্রসঙ্গ একটু আলোচনা করা দরকার। দেখা যায়, সমাজে যৌনতার যে ধারণার প্রচলন করা হয় তার সাথে বিশ্বাসের একটা বড় সম্পর্ক থাকে। খোদ যৌনতার যে প্রাকৃতিক চরিত্র তা নিয়ে কেউ কোন কথা বলে না। সমাজে যে মোরাল কোড আমরা তৈরি করেছি তার নিরিখে যৌনতার জাস্টিফিকেশন হলেই যেন সমস্যা মিটে যায়! কিন্তু সেইখানে সমস্যা থাকলে বা তৈরি করা গেলে আপনি যত বড় ফিগারই হোন আপনাকে সাইজ করে দেয়া কোন ব্যাপার না। সাধারণ মানুষের একটা আগ্রহ থাকে অন্যের যৌনতা বিশেষ করে একটু সেলিব্রেটি হলে তার যৌনতাকে সে জানতে চায়। জাজ করতে চায়। সেলিব্রেটিদের ঘিরে যৌনতার যে রহস্য তা তাদের বাজার হ্রস-বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটা সেলিব্রেটিরা জানেন। ফলে মানুষের আগ্রহ উস্কে দেয়ার জন্য যতটা যৌনতা দরকার সব সময় তা প্রডিউস করেন। কিন্তু মানুষ তাতে সন্তুষ্ট না। সে তখন গোপন সূত্রে আরও পরিস্কার কিছু পেতে চায়। এই ক্ষেত্রে সমাজের যৌনতার বিষয়ে আমজনতার যে— ‘মোরাল ইমোশন’ আছে এটাকে প্রচন্ড ক্ষমতাশালী খুব সহজেই কাজে লাগাতে পারে। আবার অন্যদিকে ধরেন, আপনি একটা মোরাল গাইড আকারে সমাজে ফাংশন করেন (লেখক, ধর্মপ্রচারক, রাজনীতিবিদ, তারকা ইত্যাদি বিভিন্ন লোক) কিন্তু আপনার নিজের ব্যক্তিগত যৌনতার চর্চার বিষয়টা সমাজের যে মোরাল ইমোশন সেই অনুযায়ী চর্চা করেন না। এবং আপনার সামজের নীতিবোধের বাইরে গোপনে চর্চা করা যৌনতার বিষয়টা যখন প্রকাশিত হয়ে যায় তখন আপনি হয়ে যান জাতীয় খবরের খনি।

অন্যকে নীতির আলোকে জীবন ও যৌনতার চর্চা করতে বলেন ২৪ ঘন্টা। কিন্তু নিজের বেলায় উল্টা, এবং এটা প্রকাশ হলে- তখন ঘটনাটা কিন্তু কৌতুককর হয়ে যায়। ধরেন একজন জনপ্রিয় ধর্মপ্রচারক বা ওয়াজিন যে অনুশাসনের কথা বলেন, এটার বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদের কালচারাল ফোর্সরা(তথাকথিত বামপন্থি ও প্রগতিবাদিরা) সব সময় সংগ্রাম করে আসছে। কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে আপনি শত্রু হিসেবে সিলেক্ট হওয়ার কারণে আপনার গোপন যৌন জীবন প্রকাশ হয়ে গেলে এবং সেটা আপনার প্রচার নীতির মতোন না হলে আপনার সামাজিক পতন সহজ হয়ে যায়। এবং পরে তার জন্য আপনাকে শাস্তির আওতায় আনা হলেও তখনও আপনাকে তারা নিতে পারে না। যদিও আপনিও তাদের আকাঙ্খা মতোন ধর্মী ও সোসাল কোডের বাইরেই যৌনতার চর্চা করেই বিপদে পড়েছেন। এবং এবার আপনিও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার স্বাধীনতা চান। কিন্তু তার পরেও আপনাকে তারা মিত্র মনে করে না। কিন্তু কালচারালি আপনিও তাদের মতোই। ড্রেস ও প্রকাশের ধরণ ভিন্ন কিন্তু তাদের মতো আপনারও কোন এসেন্স নাই। পুরাটাই পারফর্ম। যখন আপনি যে যৌনতার চর্চার কথা প্রচার করেন আর যে যৌনতা নিজে চর্চা করেন তার মধ্যে কোন মিল থাকে না তখন- আপনি মোল্লা, আস্তিক বা নাস্তিক যাই হোন আপনার সাথে এখানে আপনার বিরোধীদের কোন পার্থক্য থাকছে না। যারা যৌনতাকে নিজের সুবিধার জন্য, ক্ষমতার জন্য ব্যবহার করে তাদের সাথে আপনার কোন পার্থক্য থাকে না তখন।

আমাদের মতো সমাজে যে কোন ধরণের যৌন স্বাধীনতাকে দমনের সুযোগ থাকে। মানে, একই সাথে যৌনতার স্বাধীনতা ও নির্যাতনমুক্ত জীবন ও সমাজ চাওয়ার আকাঙ্খাকে দমন করা খুব সহজ। (এটা নারীবাদের ক্রিটিকে অনেক আলোচিত, এই বিষয়ে সাবা মাহমুদের লেখা-লেখি দেখুন)। মিলেটও এই ধারণার ক্রিটিক করেছেন। এখন দেখা যাচ্ছে, যে লিবারেলরা প্রগতীবাদিরা যৌনতার স্বাধীন ও প্রাইভেট অধিকার চান, সব রকম পুলিশিং থেকে মুক্ত থেকে যৌনতার ব্যাপারে নিজের চয়েজের ও অধিকারই একমাত্র চূড়ান্ত হিসেবে গন্য হবে -এমনটা চান কিন্তু সমাজ/রাষ্ট্রের মোরাল ট্রেন্ডের কারণে তা করতে পারেন না তারা যখন দেখলেন, এমন একজন যিনি নিজের মতো করে নিজের যৌনতার চর্চা করছেন। তিনি তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের বাইরের লোক আবার একই সাথে সমাজের বিপুল মানুষের মোরাল ইমোশন তৈরির পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তিনি যখন যৌনতার রাজনীতির শিকার হন তখন যে অবস্থার তৈরি হয়, তা খুবই কৌতুককর মনে হলেও তার জন্য কোন সম্মিলিত নাগরিক আন্দোলন গড়ে ওঠে না। রাজনৈতিক ভাবে বিভক্ত সমাজ, মোল্লা ও প্রগতীবাদির একই
রকম যৌন জীবন প্রকাশিত হলেও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা সংগ্রাম করে ব্যক্তি স্বাধীনতার মর্যাদা রাক্ষার কথা বলেন না। বরং যৌনতার স্বাধীণতাকে ছাপিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার দিকেই থাকে মূল লক্ষ্য। উভয় পক্ষই নিজেদের জায়গা থেকে যৌনতাকে যার যার রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক অবস্থান শক্ত করার কাজে ব্যবহার করেন। আবারও বলছি এর সাথে কিন্তু তার নিজের যাপিত যৌন জীবনের কোন মিল থাক বা না থাক। বরং মতাদর্শের আলোকে হাজির হওয়া বা করা যৌন জীবনই হয়ে ওঠে লড়াইয়ের মূল পাটাতন। ফলে যৌন রাজনীতির দিকটি বুঝতে হলে এই রিয়েল যৌনতা ও রিপ্রেজেন্ট বা হাজির করা যৌনতার বিষয়টি বুঝতে হবে।
মানুষ ফাংশন করে যৌনতার ন্যাচারাল কোডে (অন্তত নিজের জন্য এটা তার কাছে স্বাভাবিক) কিন্তু আপহোল্ড করেন সোশাল, আইনি বা শরিয়তী কোড। সেটা আবার সে তার বিশ্বাস দিয়ে জাস্টিফাইও করতে চেষ্টা করেন। মর্ডান মানুষ/সাবজেক্ট কিভাবে ডিভাইন অর্ডারকে পারসনালাইজ করেন এটা তার একটা ভাল উদাহরণ। এর ফলেই চার্চ থেকে মাদ্রাসা এমন সব জায়গায়ও যৌন-অপরাধের যে ঘটনা ঘটে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। এটা ব্যাক্তির স্থলন, ধর্ম বা নীতির না।

মোল্লা ও প্রগতীবাদির একই রকম যৌন জীবন প্রকাশিত হলেও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা সংগ্রাম করে ব্যক্তি স্বাধীনতার মর্যাদা রাক্ষার কথা বলেন না

আমি সব রকম মোরাল বাটপারির বিরুদ্ধে। বরং এথিক্যাল অর্ডার ফলো করার পক্ষে। যৌনতা যে রাজনৈতিক এটা বারবারই প্রমাণিত হয় নানান ঘটনায়। আপনি রাজনৈতিকভাবে যেই মতাদর্শকে ধারণ করবেন, যেটাকে প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করবেন আপনাকে সেই ধরণের যৌনতারই চর্চা করতে হবে নিজের জীবনে। না হলে আপনার রাজনীতির কোন মানে থাকবে না। অন্যদিকে যৌনতা একটা গিভেন মানে আগে থেকেই হাজির একটা বিষয়। এটা ন্যাচারের মধ্যে অন্যসব বিষয়ের মতো আমরা নিজের শরীরের মধ্যে পাই। ফলে এর একটা স্বাধীন প্রকৃতি আছে। এর একটা নিজের মতো স্বভাব আছে। সেটা কি? এটা অনেকটা আত্মজ্ঞানের সন্ধানের সাথে সম্পর্কিত। সেটা বুঝতে চেষ্টা করার মধ্যদিয়ে মানুষের যৌনতা পশুর যৌনতা থেকে আলাদা হয়ে যায়। আমাদের প্রগতিশীল বলেন, ধর্মশীল বলেন, ভদ্র বলেন, অভদ্র বলেন, শিক্ষিত বলেন, মূর্খ বলেন বেশির ভাগ মানুষকেই আমরা পশুর যৌনতাতেই আটকে থাকতে দেখি। মানুষের এই আত্মজ্ঞান যেহেতু খুব সহজ না, ফলে ধর্ম ও আইনের অনুশাসনে যৌনতাকে চর্চার কিছু নীতি দেয়া হয়েছে। এইসব নীতিকে কেন্দ্র করে মানুষ নিজের মোরাল ঠিক করে নিয়ে জীবন পার করতে থাকে।

নিজের মধ্যে স্বাভাবিক ভাবে যে যৌনতা, তার স্বভাব আবিস্কার করা হয় না। ফুকোর বার্থ অব সেক্সুয়ালিটির আলোচনা এখানে বাদ রাখছি। অনেকে আবার মনে করেন বহুগামিতার মধ্যে দিয়ে এটা আবিস্কার করা সম্ভব। কিন্তু বিষয়টা একগামিতা বা বহুগামিতার মতো সরল না। যে নিজের স্বভাব জানে না তার একগামিতা বা বহুগামিতা কোন কিছুতেই যৌনতার প্রকৃতি জানা হয় না। আমরা চার পাশের মানুষকে সমাজের মোরাল কোডে জাজ করি। অন্যের কাছ থেকে খাঁটি নৈতিক আচরণ আশা করি। নিজে এটা অর্জন করার যে সংগ্রাম তা করি না। এমনকি ধর্মের নীতিকে নিজের সুবিধা মতো বদলে নেই। সেকুলারদের মতো যৌনতাকেও সেকুলার করে ফেলি নিজের সুবিধার জন্য। কেউ করে এটা প্রগতীর নামে কেউ করে খোদ ধর্মের খোলসেই। অন্যদিকে যৌনতার রাজনীতি পর্নোগ্রাফিক সময়ের খুব স্বাভাবিক প্রবণতা। মায়ের যৌনতার ইতিহাস পাঠ করে ছেলে, মেয়ের যৌনতার ফিরিস্তি উদাম হয়ে যায় বাবার কাছে এবং সেইসব যখন জাতীয় ঘটনাতে পরিণত হয় তখন সমাজের মধ্যে রিয়েল পলিটিক্স চর্চার আর কোন স্পেস থাকে না। যা ফ্যাসিবাদের জন্য খুবই কাজে দেয়।
যৌনতার ধারণার জন্ম আসলে ক্ষমতার ধারণার সাথে সম্পৃক্ত। ফলে যৌনতাকে অনুশাসন হিসেবে যখন থেকে আবিস্কার করা হয়েছে -এটার ইতিহাস মানুষের শাসনতন্ত্র শুরু হওয়ার ইতিহাসের সাথেই সম্পর্কিত। তাই এই ক্ষমতার সাথে লড়তে হলে, এই ক্ষমতার আদলে তৈরি যৌনতার ধারণার সাথেও লড়াই করতে হবে। যৌনতার রাজনীতির প্রশ্নকে মিমাংসা না করে নতুন রাজনীতিও তৈরির সুযোগ নাই।

আরো পড়তে পারেন

একাত্তরের গণহত্যা প্রতিহত করা কি সম্ভব ছিল?

২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানি নরঘাতকেরা যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই এক রাতেই শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় তিন হাজার। এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা একতরফাভাবে….

ভাষা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা

আগের পর্বে পড়ুন— চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল) ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে দুই হাজার মাইল দূরত্বের….

চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল)

আগের পর্বে পড়ুন— বায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ একুশের আবেগ সংহত থাকে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেও। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান এক বিবৃতিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। আওয়ামি লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম কমিটির সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র….

error: Content is protected !!