Author Picture

স্বৈরশাসনের সময়ে লেখকের কাজ

রেজাউল করিম রনি

চারদিকে অনেক সমস্যা। এর মধ্যে সবচেয়ে কমন সমস্যা হচ্ছে শাসকরা ক্রমাগত মিথ্যা বলছেন। এটা সমস্যা, তবে এর চেয়েও বড় সমস্যা হল, তাদের মিথ্যাকে জনপ্রিয় করে তুলছেন। মিডিয়া ও বিভক্ত বা বিভ্রান্ত বুদ্ধিজীবীরা ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে এতে। ফলে কোন ঘটনা ঘটার সাথে সাথে সমাজে একটা পক্ষ গ্রুপ ও একটা বিপক্ষ গ্রুপ দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। লেখকরাও এই বিভক্তির মধ্যেই নিজেদের বক্তব্য, বয়ান নিয়ে হাজির হন। এইসব ক্ষেত্রে ভিন্ন দৃষ্টিতে বা একটু গভীরভাবে যে কোন বিষয়কে খতিয়ে দেখবেন এমন লেখকরা হতাশ হয়ে যান। কারণ, সমস্যা হল যে কোন বিষয়কেই পপুলিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করবার একটা খাসিলত বেশ ভাল মতই কায়েম হয়ে গিয়েছে।

কোন ঘটনা বা ইস্যু হাজির হলে সেটাকে কেন্দ্র করে জনপ্রিয়তা কুড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। আপনি হয়তো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয়তা দেখাতে গিয়ে খুব জনপ্রিয় ট্রেন্ড অনুসরণ করেই নিজেকে হাজির করছেন। আর ভাবছেন খুব ন্যায়ের পক্ষে আছেন। কিন্তু আপনার অজান্তেই আপনি ফ্যাসিবাদী প্রকল্পে হাজির হয়ে গেছেন। পপুলিজম হল একটি কমন ফ্যাসিস্ট প্রবণতা।

যেমন ধরেন, আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা পুরোই ভেস্তে গেছে। কৃষকরা আর সমাজে কোন আলোচনার বিষয়ই না। কিন্তু যখন তারা একটু প্রতিবাদ জানায় তখন তাদের বেহাল দশা দিয়ে কিছু নিউজ হয়। তখন একদল লোক দামি গাড়ি হাঁকিয়ে কাস্তে নিয়ে মাঠে যায় ধান কাটতে।

কোন ঘটনা বা ইস্যু হাজির হলে সেটাকে কেন্দ্র করে জনপ্রিয়তা কুড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। আপনি হয়তো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয়তা দেখাতে গিয়ে খুব জনপ্রিয় ট্রেন্ড অনুসরণ করেই নিজেকে হাজির করছেন। আর ভাবছেন খুব ন্যায়ের পক্ষে আছেন। কিন্তু আপনার অজান্তেই আপনি ফ্যাসিবাদী প্রকল্পে হাজির হয়ে গেছেন

কৃষকের যে কাস্তে তাদের শরীরে আঘাত করার কথা, সেই কাস্তে নিয়ে যখন মরণঘাতি করোনার কালে, অভাবের কালে, ডেঙ্গুর কালে, তামাশা মঞ্চস্থ হয় তখন আমাদের নেটিজেনরাও কৌতুকে মেতে ওঠে। সিটিজেন তো নাই। এখন তো সব নেটিজেন। ফলে প্রতিবাদ সহজেই কৌতুকের বিষয়ে পরিণত হয়। এতে সমাজে কোন মতামতও তৈরি হয় না। তৈরি হয় একধরণের স্থুল মজা।

গণতন্ত্রের ফাঁক খুঁজে বের করে যে ফ্যাসিস্ট শাসক জনগণের ওপর চেপে বসে, তার একটা বড় কাজই হল ক্রমাগত জনপ্রিয়তা তৈরির চেষ্টায় থাকা। এবং এই প্রবণতাতে বিপুল লোক উৎসাহী হয়ে উঠলে বুঝতে হবে গোটা সমাজে ফ্যাসিবাদের সংস্কৃতির সামাজিকীকরণ হয়ে গিয়েছে।

এমন সময়ে একজন প্রকৃত লেখকের সব চেয়ে বড় সংগ্রাম হল, পপুলিজমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। কিন্তু বাংলাদেশের লেখক, ফেবুকাররা মোটা দাগে এতোটাই পপুলিস্ট হওয়ার রোগে আক্রন্ত যে, জালেমী ক্ষমতার বিরোধীতাকারীদের কাজও রেটরিক, গলাবাজি-মূলক, আবেগে উস্কে দেয়ার চেষ্টাতেই আটকে থাকে।

ক্রমাগত কিছু পোস্ট দিয়ে পরিবেশ গরম করার দিকেই মনযোগ। প্রকৃত লড়াই ও চিন্তার মেজাজ তৈরির জন্য যে ধরণের ইন্টারভেনশন/অভিনিবেশ দরকার তা হচ্ছে না। বিরোধীরাও এই উম্মাদ ক্ষমতার সংস্কৃতি দিয়ে চালিত। ফলে তাদের এই ঝাঁপাঝাঁপি কোন কাজে আসে না, কেবল কিছু আত্মবিজ্ঞাপন হয়। যার সুখ মনে মনে। কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ তৈরিতে এটার কোন ভূমিকা নাই। আপনি যতই এই ক্ষমতার বিরোধিতা করেন না কেন। চরিত্র ও সাংস্কৃতিক মেজাজের দিক থেকে আপনিও এই ক্ষমতার সব বদ আছর হজম করে বসে আছেন। ফলে এই ধরণের বিরোধিতার ২ পয়সার দামও থাকে না। লাখ লাখ লাইক ও সহমত ভাইরা কোন কাজে আসবে না ক্ষমতার মরণ কামড় শুরু হলে।

২০১৯ সালে নেয়া। আমার প্রিয় লেখিকা, The Fourty Ruls of Love এর লেখিকা এলিস শাফাকের একটা সাক্ষাৎকার পড়ে এই ধারণাটা শেয়ার করতে ইচ্ছে হল। সেখানেও এমন কিছু বিষয় নিয়েই আলাপ ছিল।

প্রসপেক্ট ম্যাগাজিন উনাকে প্রশ্ন করেছেন, “কোন ধরনের ব্যক্তির সাথে আপনি একটি দিন কাটাতে পছন্দ করবেন এবং কি করবেন?” তিনি উত্তরে কইলেন, আমি কোন নির্বাচিত (ভোট চুরি করেও যা হওয়া যায়) স্বৈরাচারকে বা জনপ্রিয় নেতাকে বেছে নিবো। এবং তাদের একজকে যদি একটা দিনের জন্য পেয়ে যাই তাইলে তারে দিয়ে একটা প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করে ফেলব। এবং জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়াইবো, দেন পদত্যাগ।

-এই হল একজন প্রকৃত লেখকের অভিপ্রায়।

আপনি যতই এই ক্ষমতার বিরোধিতা করেন না কেন। চরিত্র ও সাংস্কৃতিক মেজাজের দিক থেকে আপনিও এই ক্ষমতার সব বদ আছর হজম করে বসে আছেন

আর আমাদের লেখক-শিল্লীরা তেল নিয়ে রেডি থাকে। সংবাদ সম্মেলগুলোতে যেভাবে দলবাজি করে মনে হয় একদল পশু এক খণ্ড খাদ্য নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। প্রতিযোগিতা করছে। ফলে কেউ সরকার বিরোধী এক্টিভিটি করলেই তারে মাথায় তুলে নাচতে হবে এমন কোন কথা নাই। দেখতে হবে তার মধ্যে এই অসুস্থ ক্ষমতার বিকার যা পপুলিজম আকারে হাজির হয়েছে তা আছে কি না?

আমি আমার অনেক প্রিয় বন্ধুদের যারা সমাজের পরিচিত কবি- লেখক, কলামিস্ট-এক্টিভিস্টদের এখন আর মনোযোগ দিয়ে পড়ি না। ফলোও করি না। যখনই এই প্রবণতা দেখি। একসাথে কাজ করেছি একসময়। কিন্তু যখনই এই পপুলিজমে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ দেখেছি সাথে সাথে নিজেকে সরিয়ে নেই। কেন এমনটা করি তার ব্যাখ্যাও দেই নাই এতো দিন। এই সুযোগে এখানে আজ এইখানে বলে দিলাম।

আরো পড়তে পারেন

একাত্তরের গণহত্যা প্রতিহত করা কি সম্ভব ছিল?

২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানি নরঘাতকেরা যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই এক রাতেই শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় তিন হাজার। এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা একতরফাভাবে….

ভাষা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা

আগের পর্বে পড়ুন— চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল) ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে দুই হাজার মাইল দূরত্বের….

চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল)

আগের পর্বে পড়ুন— বায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ একুশের আবেগ সংহত থাকে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেও। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান এক বিবৃতিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। আওয়ামি লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম কমিটির সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র….

error: Content is protected !!