Author Picture

ত্রিভুজ প্রেমের মামলা

খন্দকার রেজাউল করিম

গৃহদাহ
.

“আমার বঁধুয়া আনবাড়ি যায়, আমারি আংগিনা দিয়া ঘাঁটা।”

আমেরিকার এক আদালতে আসামীর কাঠগড়ায় ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে। নারীনির্যাতন, প্রেমিকার গৃহে অগ্নিসংযোগ, এবং একজন নারী ও একটি কুকুরের জীবন বিপন্ন করার অভিযোগে ওর বিচার চলছে। কালো পোশাকপরা এক উকিল ছেলেটিকে জেরা করছে। আদালতের একজন কর্মচারী আসামীর জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করছে, ভাবলেশশূন্য মুখে বিচারক সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। এক বিশাল গ্যালারি, প্রায় দুই শত উৎসুক মেয়ে-পুরুষ, দর্শক-সাংবাদিক এসেছেন মামলার কার্যবিবরণী দেখতে।

মহিম, সুরেশ, এবং অচলার ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী নিয়ে শরৎচন্দ্র লিখেছিলেন তাঁর গৃহদাহ উপন্যাসটি। অচলাকে পাওয়ার জন্যে সুরেশ কি মহিমের ঘরে আগুন দিয়ে অচলাকে ঘরছাড়া করেছিল? এই ছেলেটি কি তাই করেছে? ভালোবাসার কি এমন কুৎসিত একটি রূপ আছে? মানুষের জীবন ‘গৃহদাহ’ উপন্যাসের চেয়েও অদ্ভুত। এটা একটি অবিশ্বাস্য ত্রিভুজ প্রেমের গল্প, এক খ্যাপা প্রেমিকের কান্ড, আসামীর কাঠগড়ায় যে এখন দাঁড়িয়ে আছে।

আমার মতো কোর্ট-কাচারী-জ্ঞানহীন মূর্খ না কি আদর্শ জুরি! জজ এবং আসামি পক্ষের উকিল এদের ভারী পছন্দ করে! মূর্খদের অন্তরে দয়া-মায়া থাকে, পন্ডিতদের হৃদয় শুকনো কাগজ দিয়ে ঠাসা

আমেরিকার যে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের দুটো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে হয়; নির্বাচনে ভোট দেয়া এবং আদালতে জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। আমি আদালতে এসেছি দ্বিতীয় দায়িত্বটি পালন করতে। জজ সাহেবের উল্টোদিকে আরো বারোজন জুরির সাথে বসে সাক্ষীদের সাক্ষ্য, আসামির জবানবন্দি, এবং উকিলদের তর্ক-বিতর্ক মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করছি। যতটুকু পারি নোটবুকে টুকে রাখছি। জুরি-দায়িত্ব পালনের চিঠি আসলে সবাই এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে, আমিও করেছিলাম। আগে অনেকবার ডাক পড়েছে, বিভিন্ন অজুহাতে ফাঁকি দিয়েছি, কিন্তু এবারে আর পার পেলাম না। জুরি নির্বাচিনের সময় বিচারকের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলাম যে আমি আইন-আদালত সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমার উত্তরে মুগ্ধ হয়ে জজ সাহেব সাথে সাথে আমাকে নির্বাচিত করে ফেললেন। পরে শুনেছিলাম যে আমার মতো কোর্ট-কাচারী-জ্ঞানহীন মূর্খ না কি আদর্শ জুরি! জজ এবং আসামি পক্ষের উকিল এদের ভারী পছন্দ করে! মূর্খদের অন্তরে দয়া-মায়া থাকে, পন্ডিতদের হৃদয় শুকনো কাগজ দিয়ে ঠাসা। কোনো পুলিশ, উকিল, জজ-ব্যারিস্টার জুরি হতে পারে না। কারণ ওরা আইন বিষয়ে পন্ডিত এবং পন্ডিতের কাজ সবকিছু পন্ড করা।

মেয়েটি প্রেমিকের নামে তার ঘরে আগুন লাগানো, কুকুর হরণ, এবং নারীনির্যাতনের মামলা ঠুকেছে। এখানে পাত্র-পাত্রীদের আসল নামগুলো গোপন করা শ্রেয়। ধরা যাক মেয়েটির নাম সুজান এবং প্রেমিকের নাম কেভিন। বাদী, বিবাদী ছাড়াও আছে জনা বিশেক সাক্ষী, এবং দুই উকিল। কতদিন ধরে বিচারের কাজ চলবে কে জানে! সাক্ষীদের সাক্ষ্য, বাদী-বিবাদীর বক্তব্য, উকিলদের জেরা, বিতর্ক শেষ হওয়ার পরে শুরু হবে জুরিদের বিচারবিতর্ক, আলোচনা, এবং রায় দেয়ার পালা। জুরিদের রায়ের উপরে ভিত্তি করে এবং রাষ্ট্রের আইন অনুসারে সাজার পরিমান নির্ধারণ করার দায়িত্ব জজ সাহেবের।

প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে এগারোটা পর্যন্ত চলে শুনানির প্রথম অধিবেশন। তারপরে দুই ঘন্টা বিরতি, বিরতির পরে আবার বিকেল চারটা পর্যন্ত চলে দ্বিতীয় অধিবেশন। বিরতির সময় আমাদেরকে পুলিশের হেফাজতে সারিবদ্ধভাবে নিয়ে যাওয়া হয় আসেপাশের কোনো রেস্তোরাঁয়। খাওয়াটা বিনামূল্যে জোটে। রেস্তোরাঁর মালিকেরা জুরির দলকে বেশ খাতির করে বলে মনে হলো, তবে ওয়েটার-ওয়েট্রেসরা আমাদেরকে দেখে মুখ গোমড়া করে স্বাগত জানাতো, ‘ভালোবাসা-উদ্রেগকারী আদালতের মুখগুলো, তোমাদেরকে দেখলেও পুণ্যি হয়, আসতে আজ্ঞা হোক।’ এটা একধরণের মার্কিনি রসিকতা। ওরা মুখে যা বলছে, মনের কথা তার উল্টো! জুরিদের চেহারা ওদের মনে কোনো সুখস্মৃতি জাগাচ্ছে না। ঐতিহাসিকভাবে বখশিস কম দেয়ার পরিনাম! খাওয়ার বিলের শতকরা পনেরো থেকে পঁচিশ ভাগ বখশিস দেয়ার নিয়ম, আদালতের বরাদ্দ দশ। আমাদের বখশিস দেয়া বারণ, ওদিকে কৃপণ আদালতের কাছ থেকে মোটা বখশিস পাওয়ার কোনো আশা নেই।

বাড়ি ফিরে এসে সংবাদপত্র পড়া, টিভিতে বা রেডিওতে খবর শোনা বারণ। জুরি হওয়ার খেসারত! মামলাটি নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমে তখন বেশ হৈচৈ হচ্ছে। মাত্রাধিক প্রণয় কখন নারীনির্যাতনে পরিণত হয়? গুণীজনের দল, নারীর সমানাধিকার আন্দোলনের নেত্রীগন, এবং সাধারণ আমজনতা তাঁদের মতবাদ জানাতে ব্যগ্র। সংবাদপত্রের পাঠকের অংশে লেখা-লিখির ভিড়, মহিলা লেখিকার সংখ্যা অনেক বেশি। জুরি হিসেবে আমার এসব লেখা পড়া বা কোনো আলোচনায় অংশ নেয়া নিষেধ। প্রতিদিনের সংবাদপত্রগুলো জমা করে রাখছি, মামলা শেষ হলে পড়বো। আজ শুনানির দ্বিতীয় দিন শেষ হয়েছে। সারাদিনে নোটবুকে কি লিখেছি তার উপরে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছি। কপালের ফেরে এমন এক অদ্ভুত প্রণয়ঘটিত মামলার জুরিগিরি করতে হচ্ছে। আজ আসামির কাঠগড়ায় কেভিনকে দেখেছি। ছেলেটি সুদর্শন, সুবেশধারী, শিক্ষিত, বিনয়ী, ভদ্র। এমন ছেলে কেন প্রেমিকা সুজানের ঘরে আগুন লাগাতে যাবে!

আরো পড়তে পারেন

মহামায়া (পর্ব-২)

পড়ুন—  মহামায়া (পর্ব-১) ৩. কাঁচা রাস্তায় উঠতে উঠতে কাপড় ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে। পায়ের সাথে কাপড় জড়িয়ে যাচ্ছে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। সবার আগে মনিশঙ্কর হাঁটছে। তার হাতে মাথায় খাবারের টিন। একটা কাপড়ের ট্রাঙ্ক। সকলের হাতেই কাপড়ের পুটুলি। এতটুকু আসতেই হাপিয়ে উঠেছে। আরো অনেকটা দূর যেতে হবে হেঁটে। তারপর নৌকায় সীমানার কাছাকাছি কোনো একটা জায়গায়।….

মহামায়া (পর্ব-১)

১. সূর্য উঠতে এখনো অনেকটা দেরি। আকাশে কোনো তারা নেই। পুরোটা আকাশ মেঘে ঢাকা। রাতের অন্ধকারটা আজকে আরও বেশি চোখে লাগছে। বাতাস হচ্ছে। মাঝে মাঝে মেঘের আলোতে দেবীপুর গ্রামটা দেখা যাচ্ছে। মুহুর্তের জন্য অন্ধকার সরে আলোয় ভেসে যাচ্ছে। রাধাশঙ্করের ভিটাবাড়ি, ধান ক্ষেত, বাঁশঝাড় হাইস্কুল আলোয় ভেসে যাচ্ছে মুহূর্তের জন্য। মহামায়া আর মনিশঙ্করের ঘরে হারিকেন জ্বলছে।….

স্বর্ণবোয়াল

মোবারক তার কন্যার পাতে তরকারি তুলে দেয় আর বলে, আইজ কয় পদের মাছ খাইতেছ সেইটা খাবা আর বলবা মা! দেখি তুমি কেমুন মাছ চিনো! ময়না তার গোলগাল তামাটে মুখে একটা মধুর হাসি ফুটিয়ে উল্লসিত হয়ে ওঠে এই প্রতিযোগিতায় নামার জন্য। যদিও পুরষ্কার ফুরষ্কারের কোন তোয়াক্কা নাই। খাবার সময় বাপবেটির এইসব ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ খেলা আজকাল নিয়মিত কারবার।….

error: Content is protected !!