Author Picture

যাত্রা শুভ হোক, মাননীয় রাষ্ট্রপতি

সুরাইয়া ফারজানা হাসান

কারিবীয় অঞ্চলের এক নির্বাসিত রাষ্ট্রপতির চিকিৎসার্থে ছদ্দবেশে জেনেভায় আগমন এবং সেখানে তাঁর দারিদ্র্য জর্জরিত জীবনে স্বদেশী অভিবাসী অ্যাম্বুলেন্স চালকের সাথে পরিচয় এক জটিল সম্পর্কে রূপ নেয়…। মার্কেসের জাদুবাস্তবতার বাইরে ভিন্নধর্মী গল্পটি মনে করিয়ে দেয়, লেখালেখির বাইরে দীর্ঘ সময় তাঁর সাংবাদিকতায় কেটেছে, লিখেছেন রাজনৈতিক অনুসন্ধানমূলক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ন প্রতিবেদন। পাঠকদের জন্য ‘যাত্রা শুভ হোক, মাননীয় রাষ্ট্রপতি’ এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।


তিনি বসে আছেন, হলুদ পাতা ছাওয়া নির্জন পার্কের এক কাঠের বেঞ্চিতে, রুপোয় মোড়ানো ছড়ির হাতলের ওপর বিশ্রামরত হাতদুটি রেখে ধূলিধূসরিত রাজহাঁসের দিকে চিন্তাযুক্তভাবে চেয়ে আছেন আর মৃত্যুর কথা ভাবছেন। তিনি জেনেভায় যখন প্রথম আসেন, সরোবরটি ছিলো শান্ত, স্বচ্ছ, এবং এখানে পোষা গাংচিলগুলো লোকজনের হাত থেকে খাবার খুঁটে খেতো আর সরোবরের পাশে কুঁচি দেয়া অর্গান্ডি জামা পড়া, রেশমী ছাতা হাতে ভাড়ায় খাটা মেয়েগুলোকে সন্ধ্যে-ছটার ভুতুড়ে ছায়ামূর্তির মতো দেখাত। এখন এখানে কেবলমাত্র তাঁর একটি নারীই দেখার সম্ভাবনা, সে হলো জনশুন্য জেটির ফুল বিক্রেতা মেয়েটি। তাঁর পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন, সময় শুধুমাত্র তাঁর নিজের জন্যই নয়; পুরো পৃথিবীর জন্যই একটা সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে।
তিনি এই ছদ্মবেশীদের শহরে আরেকজন আত্মগোপনকারী। পড়ে আছেন অবসরপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের মতো গাঢ় নীল রঙা ডোরাকাটা স্যুট, ব্রোকেডের হাত কাটা জ্যাকেট আর মাথায় শক্ত টুপি। মুখে বন্দুকধারী সৈনিকের মতো দাম্ভিক গোঁফ আর মাথাভর্তি রোমান্টিক ঢেউখেলানো নীলচে-কালো চুল। বিপত্নীক লোকটির বাঁ হাতের অনামিকায় বিয়ের আংটি, হাতদুটো বীনাবাদকের মতো, এবং চোখ জোড়ায় আনন্দ ফুটে উঠছে। কেবলমাত্র তাঁর ক্লান্ত পরিশ্রান্ত ত্বক স্বাস্থ্যের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তা সত্ত্বেও, তেহাত্তর বছর বয়সে তাঁর দেহ সৌষ্ঠব লক্ষণীয়। যাহোক, সেদিন সকালে, তিনি বুঝতে পেরেছেন, তাঁর আর অহমিকা করার মতো কিছুই নেই। ক্ষমতা আর গৌরবের বছরগুলি চিরতরে পেছনে ফেলে এসেছেন, আর এখন কেবলমাত্র মৃত্যুর জন্য অপেক্ষার বছরগুলি সামনে পড়ে আছে।
তিনি দু দুটি বিশ্বযুদ্ধের পর জেনেভায় ফিরে এসেছেন, একটি বিশেষ ব্যথার চুড়ান্ত অবস্থান জানতে, যেটা মার্তিনিকের ডাক্তাররা চিহ্নিত করতে পারেননি। ভেবেছিলেন দু সপ্তাহের বেশী থাকবেন না, অথচ প্রায় ছসপ্তাহ কাটালেন ক্লান্তিকর পরীক্ষা নিরীক্ষা আর নিষ্পত্তিহীন ফলাফল নিয়ে। ব্যথাটার শেষটা অবস্থান এখনও দৃষ্টিগোচর হয়নি। ডাক্তার তাঁর লিভার, কিডনি, প্যানক্রিয়াস, প্রোষ্টেট তন্নতন্ন করে দেখেছেন, কোথাও ব্যথার উৎস পাওয়া যায়নি। এমন ধারা ঘটতে থাকে, সেই নির্মম বৃহস্পতিবার পর্যন্ত, যেদিন সকাল নয়টায় তিনি স্নায়ুরোগ বিভাগে, এ পর্যন্ত যত ডাক্তার দেখিয়েছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে কম পরিচিত এক ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেন।
ডাক্তারের চেম্বার দেখতে অনেকটা সন্ন্যাসীর খুপরির মতো এবং ডাক্তার সাহেব বেশ ছোটখাটো আর গুরুগম্ভীর ধরনের লোক, তাঁর ডানহাতের ভাঙ্গা বুড়ো আঙ্গুলে প্লাস্টার মোড়ানো। চেম্বারের বাতি নিভিয়ে ফেলা হলে, এক্স-রে যন্ত্রের পর্দায় শিরদাঁড়ার হাড়ের উদ্ভাসিত চিত্র দেখা যায়। তবে তিনি ছবিটা নিজের বলে চিনতে পারলেন না যতক্ষণ না পর্যন্ত, ডাক্তার সাহেব একটা পয়েন্টারের মাধ্যমে তাঁর কোমরের নীচে দুটো মেরুদন্ডের অস্থিসন্ধি দেখিয়ে বলেন :
‘আপনার ব্যথাটা এখানে।’
ব্যথাটা তার কাছে, এমন সহজ কিছু বলে মনে হয়নি। অকল্পনীয় এক ব্যথা—এঁকেবেঁকে কখনো ডানপাশের পাঁজরে, কখনোবা তলপেটে, আবার হঠাৎ হঠাৎ কুঁচকিতে ছুরির ফলার মতো আঘাত হানে। ডাক্তার সাহেব মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শোনেন, এক্স-রে মেশিনের পর্দায় পয়েন্টারটা থেমে আছে। ‘এই কারনেই, ব্যথাটা এত দীর্ঘ সময়ে আমাদের চোখ এড়িয়ে গেছে,’ তিনি বললেন। ‘তবে এখন আমরা জেনে গেছি, এটা এখানে।’ তিনি নিজের কপালের একপাশে তর্জনী ঠেকিয়ে, ষ্পষ্টভাবে বললেন:
‘যদিও কঠিন শোনাবে, জনাব প্রেসিডেন্ট, আপনার সব ব্যথা কিন্তু এখানে।’
ডাক্তারের ব্যথা নির্ণয় প্রক্রিয়া এতটা নাটকীয় ছিলো যে, তাঁর চুড়ান্ত রায় শুনে মনে হলো তিনি বুঝি দয়া দেখাচ্ছেন আর মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে একটা বিপজ্জনক এবং অবশ্যম্ভাবী অস্ত্রোপচারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হলো। তিনি ঝুঁকির শেষ সীমানাটা জানতে চাইলেন, এবং বৃদ্ধ ডাক্তার তাঁকে অস্থির আলোয় ঢেকে দিলেন।
‘আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না,’ তিনি উত্তর দিলেন।
তিনি বুঝিয়ে বলেন, কিছুদিন আগে পর্যন্ত, মারাত্মক দূর্ঘটনার ঝুঁকি ছিলো খুব বেশি, এমনকি বিভিন্ন মাত্রায় পক্ষাঘাত ঘটার বিপদও ছিল। কিন্তু দুটি মহাযুদ্ধে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের এতটা অগ্রগতি হয়েছে যে, ভয়টা এখন অতীতের বিষয়।
‘চিন্তা করবেন না,’ ডাক্তার সাহেব সবশেষে বললেন, ‘বিষয়টা ভালোভাবে খতিয়ে দেখবেন, এরপর আমাদের সাথে যোগাযোগ করবেন। তবে ভুলে যাবেন না, যত তারাতারি করবেন, ততই মঙ্গল।
এ ধরনের একটা সংবাদ আত্মস্থ হওয়ার জন্য সকালটা মোটেও শুভ ছিল না, অন্তত বিদেশ বিভুঁইয়ে। তিনি খুব সকালে ওভারকোট ছাড়াই হোটেল থেকে বেড়িয়ে পরেছেন, কারণ আজ জানালা খুলে উজ্জ্বল সূর্যটা দেখতে পেয়েছেন, আর তাই শোম্যা দু বো-সোলেই হাসপাতাল থেকে মাপা পথ হেঁটে গোপন প্রেমিকদের আস্তানা জার্দিন এঙ্গলাইসে চলে এলেন। সেখানে তিনি একঘন্টারও বেশী সময় ছিলেন, যে সময়টুকু শুধু মৃত্যুর কথাই ভেবেছেন, অথচ হেমন্তকাল শুরু হয়ে গেছে। সরোবরটা এখন ক্রুদ্ধ সাগরের মতো উত্তাল। এক দস্যি বাতাস গাংচিলদের ভয় দেখিয়ে শেষ পাতাটাও সরিয়ে নিয়ে গেল। রাষ্ট্রপতি উঠে দাড়ালেন, ফুলের পশরা সাজিয়ে বসা মেয়েটির কাছ থেকে ডেইজি ফুল কিনে নেয়ার বদলে, সরকারী বাগান থেকে ফুল তুলে নিয়ে, কোটের বোতামঘরে লাগালেন। মেয়েটি তাঁকে দেখে ফেলে।
‘মঁশিয়ে, ওই ফুলগুলোর মালিক ঈশ্বর নন,’ সে খোঁচা মেরে বলে। ‘ওগুলো শহরের সম্পত্তি।’
তিনি মেয়েটির কথায় কান না দিয়ে ছড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে বেপরোয়া ভঙ্গিতে হেঁটে চলে গেলেন। পোঁ দ্যু মঁ ব্লকে সুইজারল্যান্ডের সহযোগী দেশের পতাকাগুলো, ঝোড়ো বাতাসের ঝাপটায় হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে, যতদ্দুুর সম্ভব নুইয়ে পড়ে, আর ফেনার মুকুট পড়া কমনীয় ফোয়ারাগুলো অন্যসব স্বাভাবিক সময়ের চাইতে সাত তারাতারি বন্ধ হয়ে গেল। রাষ্ট্রপতি সরোবরের সাথে লাগোয়া যে ক্যাফেতে সবসময় যান, সেটা চিনত পারলেন না, কারণ ওরা প্রবেশ মুখের সবুজ চাঁদোয়াটা নামিয়ে নিয়েছে, গ্রীষ্মের ফুল ঘেরা অলিন্দ এইমাত্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ক্যাফের ভিতরে ভর দুপুরে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে, আর বাদ্যযন্ত্রে বেজে চলা মোৎসার্টের কোন এক সুর বিপদের পূর্বাভাষ দিচ্ছে। রাষ্ট্রপতি ক্যাফের কাউন্টারে খদ্দেরদের জন্য ঢাই করে রাখা পত্রিকা থেকে একটি তুলে নিলেন, র‌্যাকে টুপি ঝুলিয়ে, হাতের ছড়ি রেখে, সোনালী ফ্রেমের চশমাটা সবচেয়ে নিরিবিলি টেবিলের ওপর রাখলেন, এবং তখনই কেবলমাত্র তাঁর খেয়াল হয়—হেমন্তকাল সত্যি এসে গেছে। তিনি পত্রিকার আন্তর্জাতিক পাতা পড়া শুরু করে দিলেন, যেখানে নিয়মিত দুই আমেরিকার দুর্লভ খবরগুলো পাওয়া যায়, এবং তিনি পত্রিকার শেষপৃষ্টা থেকে প্রথম পৃষ্টা পড়তে থাকেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত ক্যাফের খাবার পরিবেশনকারী মেয়েটি তাঁর প্রতিদিনকার ‘এভিয়ান’ পানির বোতল নিয়ে আসে। ডাক্তারের পরামর্শ মতো তিনি তিরিশ বছরেরও বেশী সময় হলো কফি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন, তবে ডাক্তারকে বলে রেখেছেন, ‘যদি কখনো নিশ্চিত জানি, মরতে যাচ্ছি, আমি আবারো কফি খাওয়া শুরু করে দিব।’ সম্ভবত সময়টা এসে গেছে।

‘আমার জন্য কফিও নিয়ে আসুুন,’ তিনি নির্ভুল ফরাসিতে বললেন। এবং কথাটার দু রকমের অর্থ খেয়াল করে সুনির্দিষ্ট করে বললেন, ‘ইতালিয়ান কফি, এতটা কড়া যে মৃত মানুষও জীবিত হয়ে উঠবে।’
তিনি চিনি ছাড়া কফিটা খেলেন, ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে, এবং এরপর কাপটা উল্টে পিরিচের ওপর রাখলেন যাতে অবশিষ্ট কফিটুকু পড়ে এমন একটা নকশা আঁকে, যেখানে এতোগুলো বছর পর নিজের নিয়তি দেখার সময় পাবেন। পুনরায় ফিরে পাওয়া কফির স্বাদ তাকে তাৎক্ষণিকভাবে, বিষন্ন ভাবনা থেকে মুক্তি দেয়। কিছুক্ষণ পর, কফির জাদুতেই যেন এক বিশেষ অনুভূতি হলো, কেউ তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি সাবধানে পত্রিকার পাতা উল্টালেন, এরপর চশমার ফাঁক দিয়ে সামনে তাকিয়ে, স্পোর্টস টুপি আর ভেড়ার চামড়ার লাইনিং দেয়া জ্যাকেট পড়া, খোঁচা খোঁচা দাড়িওলা ফ্যাকাশে চেহারার এক যুবককে দেখতে পেলেন, যে তৎক্ষণাৎ চোখটা সরিয়ে নেয়, যাতে দুই চোখের মিলন না হয়।

কফির স্বাদ তাকে তাৎক্ষণিকভাবে, বিষন্ন ভাবনা থেকে মুক্তি দেয়। কিছুক্ষণ পর, কফির জাদুতেই যেন এক বিশেষ অনুভূতি হলো, কেউ তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে

মুখটা পরিচিত। হাসপাতালের লবিতে, তারা অনেকবার একে অপরকে পাশ কাটিয়েছে, তিনি যখন সরোবরের রাজহাঁসের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবছিলেন লোকটিকে প্রমোনাদ দু লাক্-এ একটা মটর সাইকেলের ওপর বসে থাকতে দেখেছেন, কিন্তু তিনি ঘূর্ণাক্ষরেও অনুমান করেননি, লোকটি তাঁর পরিচয় জানে। তিনি ভেবেছিলেন, এটা একজন নির্বাসিত ব্যক্তির ভীতিকর কল্পনা।
তিনি বাহামা অঞ্চলের অতি ব্যয়বহুল চেলোর সুরে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে খবরের কাগজটা পড়ে শেষ করেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত ব্যথাটা সঙ্গীতের বেদনানাশক ঔষধের চেয়ে শক্তিশালী হয়। এরপর তিনি তাঁর বুকপকেটে যে ছোট্ট সোনার মালাসহ ঘড়ি বয়ে এনেছেন তাতে তাকিয়ে দেখেন আর দুপুরবেলার দুটি ঘুমের বড়ি খেয়ে এভিয়েন পানির বোতলের শেষটুকু গিলে ফেলেন। চশমাটা খোলার আগে, তিনি কফির তলানীর নকশায় তাঁর নিয়তি বোঝার চেষ্টা করে এক হিমঠান্ডা কাঁপুনি অনুভব করেন : সেখানে এক অনিশ্চয়তা দেখতে পান। অবশেষে বিলটা পরিশোধ করে, কৃপণের মতো যতসামান্য কিছু বখশিশ রেখে, ছড়ি আর টুপিটা তুলে নিয়ে, যে লোকটি তাঁর পানে চেয়ে আছে, তার দিকে না তাকিয়েই রাস্তা বরাবর হেঁটে যান। তিনি ঝোড়ো বাতাসে তছনছ হয়ে যাওয়া ফুলের বেডটার পাশ দিয়ে উল্লসিতভাবে হেঁটে যান, আর ভাবেন কিছুক্ষণের জন্য তিনি মুক্ত। একপাক ঘুরে আসার পর, পেছনে পায়ের পায়ের আওয়াজ শুনে একটু থেমে, ঘুরে দাড়ান। যে লোকটি তাঁকে অনুসরণ করছিল, তার সাথে সংঘর্ষ যাতে না হয়, সেজন্য একটু সরে দাড়ান, আর তাঁর আঁতকে উঠা চোখদুটো লোকটিকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দুর থেকে দেখে।
‘সেনঁর রাষ্ট্রপতি,’ সে ফিসফিস করে বলে।
‘যারা অনেক আশা করে তোমায় টাকা দিয়ে আমার পিছনে লাগিয়ে দিয়েছে, তাদের বলো,’ রাষ্ট্রপতি বলেন, মৃদু হেসে, কন্ঠস্বরের মাধুর্য না হারিয়ে। ‘আমার শরীর-স্বাস্থ্য একদম ঠিক আছে।’
‘সে কথা আমার চেয়ে আর বেশী কে জানে,’ লোকটি বলে, রাষ্ট্রপতির সম্মানের চাপে পিষ্ট হয়ে। ‘আমি হাসপাতালে কাজ করি।’
লোকটার শব্দ নির্বাচন এবং কথাবলার ভঙ্গি, এবং এমনকি ভীরুস্বভাব খাঁটি কারিবীয়দের মতো।
‘বলো না যে, তুমি একজন ডাক্তার,’ রাষ্ট্রপতি বলেন।
‘তা যদি হতাম তবে ভালোই হতো, সেনঁর। আমি একজন সামান্য অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার।’
‘আমি দুঃখিত,’ রাষ্ট্রপতি বললেন, ভুল করেছেন বলে।
‘কাজটা বেশ কঠিন।’
‘আপনার কাজের মতো কঠিন নয়, সেনোঁর।’
তিনি লোকটরি দিকে সরাসরি তাকান, হাত দুটো ছড়ির ওপর রেখে খানিকটা ঝুঁকে, বেশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন:
‘তুমি কোথা থেকে এসেছো?’
‘কারিবিয়া অঞ্চল থেকে।’
‘আমি তা জেনে গেছি,’ রাষ্ট্রপতি বললেন। ‘কিন্তু সে অঞ্চলের কোন দেশটি?’
‘আপনার আমার একই দেশ, সেনোঁর।’ লোকটি বলে, তার হাতটা বাড়িয়ে দিল। ‘আমার নাম ওমেরো রে।’
রাষ্ট্রপতি বিষ্ময়াভিভুত হয়ে হাতটা চেপে ধরলেন।
‘বাহ্,’ তিনি বললেন। ‘কী সুন্দর নাম!’
ওমেরো স্বস্তি অনুভব করে।
‘বেশ ভালো লাগছে শুনতে,’ তিনি বললেন। ‘ওমেরো রে দে লা কাসাÑÑআমি তাঁর প্রাসাদের হোমার রাজা।’
রাস্তায় ছুরির ফলার মতো ঝোড়ো বাতাস ওদের ছেঁকে ধরে। রাষ্ট্রপতি কনকনে শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলেন এবং জানতেন, ওভারকোট ছাড়া তিনি দুই ব্লক পরে স্বস্তা রেস্তোরাঁয় যেতে পারবেন না, যেখানে সাধারণত তিনি খান।
‘তুমি দুপুরের খাবার খেয়েছ?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
‘আমি কখনও দুপুরে খাই না,’ ওমেরো বলে। ‘রাতে বাড়িতে একবেলা খাবার খাই।’
‘আজ না হয় অন্যরকম হোক,’ তিনি বললেন, গলায় ফুর্তির সবটুকুভাব ঢেলে, ‘আজ আমাকে তোমায় মধ্যাহ্নভোজে নিয়ে যেতে দাও।’
তিনি ওমেরোকে রাস্তার ধারে রেস্তোরাঁর দিকে হাত দেখিয়ে নিয়ে গেলেন: ল্যো ব্যোফ কুরনে। রেস্তোরাঁর ভিতরটা সরু, উষ্ণ, এবং মনে হলো টেবিল খালি নেই। ওমেরো রে, ভারি অবাক হলো, এখানকার কেউই রাষ্ট্রপতিকে চিনেনি। ও রেস্তোরাঁর পিছনে চলে যায় সাহায্য চাইতে।
‘ইনি কি বর্তমান রাষ্ট্রপতি?’ রেস্তোরাঁর মালিক বলে।
‘না,’ ওমিরো বলে। ‘ক্ষমতাচ্যুত।’
মালিকটি অনুমোদন সূচক মিটিমিটি হাসে।
‘ওনাদের জন্য,’ সে বলে, ‘আমার সবসসময় একটা বিশেষ টেবিল থাকে।’
মালিক ওদের রেস্তোরাঁর পিছনে একটা বিচ্ছিন্ন টেবিলে নিয়ে যায়, যেখানে তারা যত খুশি কথা বলতে পারে। রাষ্ট্রপতি মালিককে ধন্যবাদ জানালেন।
‘নির্বাসিতদেরও যে সম্মান আছে, আপনার মতো অনেকই তা বুঝতে পারে না’ তিনি বললেন।
রেস্তোরাঁটার কয়লায় ঝলসানো গরুর সিনার মাংসের বিশেষ খ্যাতি আছে। রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর অতিথি চারপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে দেখতে পেলেন, অন্যান্যদের টেবিলে মাংসের ভাজা খন্ডগুলো তুলতুলে চর্বি দিয়ে ঢাকা। ‘দারুন উমদা গোস্ত,’ রাষ্ট্রপতি বিড়বিড় করে বললেন। ‘তবে আমার এসব খাওয়ার অনুমতি নেই।’ তিনি ওমেরোর দিকে তির্যক দৃষ্টি হেনে কন্ঠস্বর পাল্টালেন।
‘সত্যি বলতে কি আমার কোন কিছু খাওয়ার অনুমতি নেই।’
‘আপনার কফি খাওয়ারও বারণ,’ ওমেরো বলে, ‘কিন্তু আপনি তা খেয়েছেন।’
‘আর তুমি দেখেও ফেলেছো?’ রাষ্ট্রপতি বললেন। ‘তবে আজ ছিলো সেই ব্যতিক্রমী দিনের একটি ব্যতিক্রম।’
কফিই একমাত্র দিনটির ব্যতিক্রম ছিলো না, আরো অনেক ব্যাতিক্রমী কাজও তিনি করেছেন। তিনি ফরমায়েশ দিলেন কয়লায় ঝলসানো সিনার মাংস এবং একফোঁটা জলপাই তেল মাখানো টাটকা সব্জির সালাদ। তাঁর অতিথিও একই খাবার আনতে বলে, সাথে থাকবে আধা-বোতল রেড ওয়াইন।

ওরা যখন মাংসের জন্য অপেক্ষা করছিল, ওমেরো টাকাকড়ি শূন্য, কাজপত্রে ঠাসা তার মানিব্যাগখানা জ্যাকেটের পকেট থেকে বের করে, এবং রাষ্ট্রপতিকে একটা ঝাপসা হয়ে যাওয়া ছবি দেখায়। ছবিতে তিনি নিজেকে দেখতে পেলেন—পরনে ফুলহাতা শার্ট, শরীরের ওজন কয়েক পাউন্ড কম এবং মাথায় কালো চুল আর মুখে গোঁফ। একদল যুবক তাঁকে ঘিরে আছে। ওদের যাতে ছবিতে দেখা যায়, সেজন্য পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের ওপর ভর করে উঁচু হয়ে দাড়িয়ে আছে। এক পলকেই তিনি জায়গাটা চিনে ফেললেন। চিনতে পারলেন ন্যাক্কারজনক সেই নির্বাচনী প্রচারনার প্রতীক আর বিকৃত হয়ে যাওয়া হতচ্ছাড়া তারিখটিও। ‘বিষয়টি খুবই বেদনাদায়ক!’ তিনি বিড়বিড় করে বললেন। ‘আমি সবসময়ই বলি বাস্তবের চেয়ে সবাই ছবিতে দ্রুত বুড়িয়ে যাই।’ এবং তিনি ছবিটা এমনভাবে ফিরিয়ে দেন, যেন সবটুকু দেখা হয়ে গেছে।
‘আমি ঘটনাটা খুব ভালোভাবেই মনে করতে পারছি,’ তিনি বললেন। ‘ঘটনাটা ঘটেছিলো এক হাজার বছর আগে। সান ক্রিস্তোবাল দে লা কাসাসের মোরগের লড়াইয়ে।’
‘ওটাই তো আমার শহর,’ ওমেরো বলল, আর নিজেকে দলের ভেতর দেখিয়ে বলে। ‘এই যে আমি।’
রাষ্ট্রপতি ওকে চিনলেন।
‘তুমি বাচ্চা ছেলে ছিলে!’
‘অনেকটা সেরকমই,’ ওমেরো বলে। ‘বিশ্ববিদ্যালয় ব্রিগেডের নেতা হিসেবে, আমি আপনার সাথে পুরো দক্ষিণাঞ্চলের নির্বাচনী প্রচারণার সময় ছিলাম।
রাষ্ট্রপতি ওমেরোর মনের ভিতর জমে থাকা অভিযোগ অনুমান করতে পারলেন।
‘আমি আসলে, তোমাকে খেয়াল করে উঠতে পারিনি,’ তিনি বললেন।
‘ঠিক তা নয়, আপনি দারুন এক লোক ছিলেন,’ ওমেরো বলল। ‘তবে আমরা সংখ্যায় এতজন ছিলাম যে আপনার আমাকে মনে থাকার কথা নয়।’
‘আর তারপর?’
‘তার পর কী সেটা আপনি যে কারো চেয়ে ভাল করে জানেন,’ ওমেরো বলে।
‘সেনা অভ্যুত্থানের পর, অলৌকিক ঘটনা হলো, আমরা দুজনেই এখানে রেস্তোরাঁয় বসে, প্রায় অর্ধেকটা গরু খেতে প্রস্তুত। অনেকেই এতটা সৌভাগ্যবান নয়।’
ঠিক তখনই টেবিলে খাবার আনা হলো। বাচ্চাদের গলায় যেমন করে বিব বেঁধে দেয়া হয়, অনেকটা তেমন করে রাষ্ট্রপতি গলায় ন্যাপকিন বেঁধে নিলেন। অতিথি যে নিরব বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে সেটাও বেশ বুঝতে পারছেন। ‘যদি এভাবে ন্যাপকিন না বাঁধি, প্রত্যেকবার খাবারের সময় টাইয়ের বারোটা বাজবে,’ তিনি বললেন। খাওয়া শুরু করার পূর্বে, মাংসটা একটু চেখে দেখেন, এতে ঝাল লবন কিছু মেশাতে হবে কিনা। সব যে ঠিকঠাক মতো আছে দেখে সন্তুষ্ট হবার একটা ভঙ্গি করে, পুরনো আলাপে ফিরে এলেন।
‘আমি বুঝতে পারছি না,’ তিনি বললেন, ‘ব্লাড-হাউন্ড কুকুরের মতো পিছু নেয়ার আগে, কেন তুমি আমার সামনে আসোনি।’
ওমেরো জানায়, হাসপাতালের বিশিষ্ট রোগীদের জন্য সংরক্ষিত দরজা দিয়ে ঢোকার সময়ে, ও রাষ্ট্রপতিকে চিনতে ফেলে। তখন ছিল গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়, এবং তিনি আন্তিয়্যেইসের একটা থ্রি-পিস-লিনেন স্যুট পড়েছিলেন, পায়ে ছিলো সাদা-কালো জুতো, একটি ডেইজি তাঁর কোটের কলারে গোঁজা, এবং সুন্দর চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছিল। ওমেরো জানল, রাষ্ট্রপতি জেনেভায় একা, তাঁকে সাহায্য করার কেউ নেই। এ শহরে আইন পড়েছিলেন বলে, তিনি এ শহকে হৃদয় দিয়ে চেনেন। হাসপাতাল প্রশাসন তারঁই অনুরোধে, তার আত্মগোপনের নিশ্চয়তা দিতে অভ্যন্তরীণ সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে নেয়। সেই বিশেষ রাতে ওমেরো এবং তার স্ত্রী সিদ্ধান্ত নেয় ওরা রাষ্ট্রপতির সাথে যোগাযোগ করবে। সেজন্য সেই বিশেষ সময়ের অপেক্ষায়, পাঁচ সপ্তাহ তাঁকে অনুসরণ করে। তবে ও তাঁর সাথে আদৌ কথা বলে উঠতে পারত না, যদি না সেদিন রাষ্ট্রপতি ওর মুখোমুখি হতেন।
‘আমি যে আত্মগোপন করে আছি, তাতে আমি খুশী। যদিও সত্যিটা হচ্ছে, একা থাকাতে আমার আর অতটা খারাপ লাগে না।’
‘এটা ঠিক নয়।’
‘কেন?’ রাষ্ট্রপতি আন্তরিকতার সাথে জিজ্ঞেস করলেন। ‘আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া হচ্ছে, সবাই আমাকে ভুলে গেছে।’
‘আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না, আমরা আপনাকে কতটা মনে করি,’ ওমেরো আবেগ না লুকিয়ে বলে। ‘আপনাকে এমন তরুণ, সুস্বাস্থ্যবান দেখতে পাওয়াটা সত্যি খুব আনন্দের।’
‘তবে এখনও,’ তিনি নাটকীয় ছাড়াই বললেন, ‘সমস্ত লক্ষণ বলে দিচ্ছে, আমি খুব শীঘ্রই মারা যাবো।’
‘আপনার সেরে উঠার সম্ভবনাও প্রবল,’ ওমেরো বলে।
রাষ্ট্রপতি বিষ্ময়ে চমকে উঠলেও রসিকতা করতে ছাড়লেন না।
‘বাহ্, বাহ্!’ তিনি অবাক হয়ে বললেন। ‘রূপসী সুইজারল্যান্ডে কি তবে চিকিৎসা সংক্রান্ত গোপনীয়তা সব লোপ পেয়েছে?’
‘পৃথিবীর কোথাও, কোন হাসপাতালে, একজন অ্যাম্বুলেন্স চালকের কাছে গোপনীয়তা বলে কিছু নেই,’ ওমেরো বলে।
‘বেশ, আমি যা জানি, তা দু ঘন্টা আগে, এমন এক লোকের মুখ থেকে শুনেছি, যারই কেবলমাত্র কথাটা জানার কথা, তিনি হলেন আমার ডাক্তার।’
‘যাইহোক, আপনি নিরর্থক মিছেমিছি মারা যাবেন না,’ ওমেরো বলে। ‘কেউ একজন আপনাকে সঠিক জায়গায় উদ্ধার করবে, আপনার প্রতি সম্মান স্বরূপ।’
রাষ্ট্রপতি মজা পেয়েছেন এমন অবাক হওয়ার ভান করলেন।
‘আমায় সতর্ক করে দেয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ,’ তিনি বললেন।
তিনি সবকিছু যেমনভাবে করেন তেমন করেই খাওয়া-দাওয়ার পর্বটা সারলেন: ধীরে সুস্থে আর যতœ নিয়ে। তিনি ওমেরোর চোখে সরাসরি তাকালেন। অল্পবয়সী ছেলেটার মনে হলো, বয়স্কলোকটি কী ভাবছেন, তা সে দেখতে পাচ্ছে। দেশ নিয়ে স্মৃতিচারণ করার পর রাষ্ট্রপতি মৃদু হেসে, একটু দুষ্টমি করলেন।
‘আমি আমার মৃতদেহ নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করব না ভেবেছিলাম,’ তিনি বললেন, ‘তবে এখন দেখছি এটাকে গোপন রাখার জন্য আমাকে রীতিমতো গোয়েন্দা উপন্যাস পড়ে সতর্ক ব্যবস্থা নিতে হবে।
‘এতে কোন লাভ হবে না,’ ওমেরো ঠাট্টা করে বলে। ‘হাসপাতালে কোন রহস্যই এক ঘন্টার বেশী টেকে না।
কফি খাওয়া শেষ হলে, রাষ্ট্রপতি তাঁর কাপের তলানির সংকেতের পাঠোদ্ধার করলেন, এবং আবারো ভয়ে কেঁপে উঠলেন: বার্তা একই। এখনও তাঁর মুখেরভাব পরিবর্তন হয়নি। তিনি নগদ টাকায় বিল পরিশোধ করলেন। তবে মোট টাকার পরিমাণটা কয়েকবার দেখে নিলেন, বিলের টাকাটাও কয়েকবার অতিযত্নের সাথে গুনে নিয়ে কিছু বখশিশ দিলেন, যা পেয়ে ওয়েটার ঘোঁতঘোঁত ধরণের একটু আওয়াজ ছাড়া কিছুই করল না।
‘বেশ ভালো লাগল,’ ওমেরোর কাছ থেকে বিদায় নিতে নিতে তিনি শেষ মুহূর্তে বললেন। ‘আমি এখনও অপারেশনের তারিখ ঠিক করিনি। এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি, এটা আদৌ করবো কিনা। তবে সবকিছু যদি ঠিকঠাক মতো চলে, আমাদের আবারো দেখা হবে।’
‘তার আগে নয় কেন?’ ওমেরো বলে। ‘আমার স্ত্রী লাসারা, বড়লোকের বাড়িতে রান্নাবান্না করে। ওর চেয়ে ভালো চিংড়ি-পোলাও কেউ রাঁধতে পারে না, আর আমরা আপনাকে খুব শীঘ্রই কোন এক রাতে আমাদের বাসায় একবেলা খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ জানাবো।’
‘আমার চিংড়ি-কাঁকড়া জাতীয় খাবার খাওয়ার নিষেধ, তবে তোমার ওখানে ওসব খেতে বেশ লাগবে,’ তিনি বললেন। ‘শুধু আমায় বলো কবে যাবো।’ঁ
‘বৃহষ্পতিবার আমার ছুটি,’ ওমেরো বলে।
‘চমৎকার,’ রাষ্ট্রপতি বলেন। ‘বৃহষ্পতিবার সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ আমি তোমার বাসায় পৌঁছে যাবো বেশ দারুন হবে ব্যাপারটা।’
‘আমি আপনাকে নিতে আসবো,’ ওমেরো বলে। ‘ অতেলারি দাম, ১৪ রু দ্যা ল্যান্দ্রুস্ত্রি। স্টেশনের পিছনে। ঠিক আছে তো?’
‘ঠিক আছে,’ রাষ্ট্রপতি বললেন, এবং উঠে দাড়ালেন, অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে আনন্দ নিয়ে। ‘মনে হচ্ছে, তুমি আমার জুতোর মাপও জানো।’
‘অবশ্যই, সেনোঁর,’ ওমেরো মজা করে বলল। ‘একচল্লিশ সাইজ।’
ওমেরো রে রাষ্ট্রপতিকে যা বলেনি, তবে পরবর্তীতে বহুবছর ধরে, লোকজন যারাই শুনতে চেয়েছে, তাদের বলেছে, সেটা হলো ওর উদ্দেশ্য অতটা মহৎ ছিল না। অন্যান্য অ্যাম্বুলেন্স চালকের মতো, ও অন্তেষ্টিক্রিয়ার সংস্থা এবং বিমা কোম্পানির সাথে, হাসপাতালের রাষ্ট্রপতির মৃত্যু সংক্রান্ত লেনদেনের বন্দোবস্ত ঠিকঠাক করে রেখেছিল। মোটের ওপর এদেশে বিদেশি রোগীদের জন্য কিছু সীমিত ব্যবস্থা আছে। লাভের অংকটা বেশ ক্ষুদ্র, এবং সেটা ওমেরোকে হাসপাতালের অন্যান্য কর্মচারী যারা গুরুতর অসুস্থ রোগী-সংক্রান্ত গোপনীয় নথিপত্র নাড়াচড়া করে, তাদের সাথে ভাগাভাগি করে নিতে হবে। তবে ওমেরোর মত ভবিষ্যত সম্ভাবনাবিহীন নির্বাসিত ব্যক্তি, যে পরিহাসমূলক বেতন ভাতা দিয়ে স্ত্রী এবং দুই সন্তান ভরণ পোষন করে, তার জন্য এই প্রাপ্তিটুকু সান্তনা বটে।
ওমেরোর বউ লাসারা দেবিসের, বাস্তব জ্ঞান আরো বেশী টনটনে। পুয়ের্তোরিকোর সান্ হুয়ানের মেয়ে লাসারা শেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ বাবা-মার সন্তান। দেহটা শুকনো, ছোটখাটো হলেও বেশ শক্তপোক্ত, গায়ের রঙ আগুনের তাপে পোড়ানো চিনির মত কালচে বাদামী, এবং চোখ দুটো শেয়ালের মতো ধূর্ত, যা তার মেজাজের সাথে বেশ খাপ খায়। ওদের প্রথম দেখা হয় হাসপাতালের এক দাতব্য ওয়ার্ডে। সেখানে ও আয়া হিসেবে কাজ করত। ওকে জেনেভায় এনেছে স্বদেশী এক ধনী ব্যক্তি। লোকটি নার্সের সহকারীর কাজ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, এ শহরে লাসারাকে ভাসমান অবস্থায় ফেলে যায়। ইউরুবা গোত্রের রাজকন্যা হওয়া স্বত্তেও, লাসারা আর ওমেরো ক্যাথলিক এক অনুষ্ঠানে বিয়ে সেরে ফেলে। ওরা আটতলায় দুই বেডরুমের এক অ্যাপার্টমেন্টে থাকে, যেখানে কোন লিফট নেই এবং আফ্রিকা থেকে আসা উদ্বাস্তুদের ঘাঁটি। ওদের কন্যা বারবারা নয় বছর বয়সী। পুত্র লাসারোর বয়স সাত। ওকে দেখলে আংশিক মানসিক প্রতিবন্ধী বলে মনে হয়।

গায়ের রঙ আগুনের তাপে পোড়ানো চিনির মত কালচে বাদামী, এবং চোখ দুটো শেয়ালের মতো ধূর্ত, যা তার মেজাজের সাথে বেশ খাপ খায়

লাসারা দেবিস বুদ্ধিমতি ও বদমেজাজী হলে কী হবে, হৃদয়টা ছিলো বেশ কোমল। নিজেকে নির্ভেজাল বৃষরাশির জাতিকা বলে মনে করে এবং গ্রহনক্ষত্রর প্রতি ওর যথেষ্ট অন্ধ বিশ্বাস। তবে এখন পর্যন্ত জোতিষী হিসেবে কোটিপতিদের ভাগ্য নির্ণয় করে টাকা কামাইয়ের স্বপ্নটা অধরাই থেকে গেছে। বরং, কখনো সখনো, মাঝেমধ্যে পরিবারে অর্থ জোগানের জন্য ধনী গৃহিনীদের হেঁসেলে রান্না করে দেয়। এইসব গৃহীনিরা আন্তিয়্যেসের খাবার রাঁধতে জানে বলে অতিথিদের মুগ্ধ করতে চায়। ওমেরোর ভীরু স্বভাব ওর কাছে যন্ত্রণাদায়ক ঠেকে। অল্পকিছু উপার্জন ছাড়া ওর তেমন কোন উচ্চাকাঙ্খা নেই। তবে ওর নিষ্পাপ মন এবং কর্মশক্তির জন্য লাসারা ওকে ছাড়া জীবন ভাবতে পারে না। ওদের সবকিছুই ঠিকঠাক মতো চলছিল, তবে প্রতিটি বছর জীবনটা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছিল, আর এদিকে ছেলেমেয়েরাও বেড়ে উঠছে। রাষ্ট্রপতি যখন এদেশে আসেন, সে সময় ওরা পাঁচ বছরের সঞ্চয়ে হাত দিতে শুরু করেছে। আর তাই ওমেরো যখন রাষ্ট্রপতিকে হাসপাতালের আত্মগোপনকারী রোগী হিসেবে আবিষ্কার করে, তখন ওদের আশাটা জেগে উঠে।

ওরা ঠিক জানে না, ওরা কী চাইতে যাচ্ছে, অথবা কোনটা সঠিক। প্রথমে ওরা মৃতদেহ সংরক্ষণ এবং দেশে পাঠোনোর বন্দোবস্তের সম্পূর্ণ অন্তেষ্টিক্রিয়া প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতিকে বিকানোর পরিকল্পনা করে। কিন্তু একটু একটু করে ওরা উপলব্ধি করে, তাঁর মৃত্যুটা এতটা আসন্ন নয়, যতটা শুরুর দিকে ছিল। রাষ্ট্রপতির সাথে মধ্যাহ্নভোজের দিন ওদের সন্দেহটা বদ্ধমুল হয়ে যায়।
সত্যটা হলো ওমেরো বিশ্ববিদ্যালয় ব্রিগেড বা অন্যকিছু নেতা ছিল না। নির্বাচনী প্রচারনায় তার অংশগ্রহণ বলতে ছিল কেবলমাত্র ছবিটাতে উপস্থিত থাকা, যে ছবিটা সে আচমকা আলমারির কাগজ-পত্রের স্তুপের মধ্যে পেয়ে যায়। তবে তার আগ্রহটা ছিল সত্যি। এটাও সত্যি, ও সেনা অভ্যুত্থানের বিপক্ষে রাস্তায় প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করেছিল বলে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। যদিও এতগুলো বছর পরও জেনেভায় থাকার কারণ কিন্তু ওর দুর্বল মনোবল। আর তাই দুচারটে মিথ্যে বলে রাষ্ট্রপতির আনুকূল্য পাওয়া ওর জন্য বাঁধা হয়ে দাড়ায়নি।
ওমেরো আর লাসারার জন্য প্রথম বিস্ময় ছিল, এই বিখ্যাত নির্বাসিত ব্যক্তি লে গ্রোতের মতো নিরানন্দ এলাকার চতুর্থ শ্রেণির হোটেলে থাকেন, যেখানে এশিয়া মহাদেশ থেকে আসা শরণার্থী আর দেহপোসারিণীদের আবাস, এবং তিনি স্বস্তা রেস্তোরাঁয় খাবার খান, অথচ জেনেভা ব্যর্থ রাজনীতিবিদদের উপযুক্ত অভিজাত বাসাবাড়িতে ভর্তি। দিনের পর দিন ওমেরো রাষ্ট্রপতিকে সেদিনের সেই একই কাজ করতে দেখেছে। ও তাঁকে চোখে চোখে রেখেছে, মাঝে মাঝে ঝুঁকি নিয়ে কাছাকাছি থেকেছে, এমন কী রাতের বেলায় পুরনো শহরের জরাজীর্ণ দেয়ালের ছেঁড়াছেঁড়া হলদে ঘন্টাফুলের মাঝে তিনি যখন হাঁটাহাটি করেন তখনও কাছাকাছি থেকেছে। ও তাঁকে বুর্গ দ্য ফুরের চূড়া, গ্রীষ্মের ধীর সন্ধ্যার নিয়ে চিন্তা করার সময়, কেলভিনের মূর্তির সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা ভাবনায় হারিয়ে যেতে দেখেছে। জেসমিনের কড়া গন্ধের মাঝে রুদ্ধশ্বাসে ও রাষ্ট্রপতিকে পাথরের সিড়িতে প্রতি পদক্ষেপে অনুসরণ করেছে। একদিন রাতে ওমেরো দেখে, তিনি রুবিনস্তেইনের সংগীত-অনুষ্ঠানে গান শোনার জন্য ছাতা ছাড়াই ছাত্রদের লাইনে দাড়িয়ে বছরের প্রথম বৃষ্টিতে ভিজছেন। ‘জানি না, কেন যে তাঁর নিউমোনিয়া হয় না।’ ওমেরো পরে ওর স্ত্রীকে বলেছে। গত শনিবার, যখন আবহাওয়ার পরিবর্তন শুরু হয়, ও রাষ্ট্রপতিকে নকল মিঙ্ক কলার লাগানো হেমন্তকালে পড়ার উপযোগী কোট কিনতে দেখে। তবে তিনি সেটা রু দু রোনের ঝাঁ চকচকে দোকান থেকে কিনেননি, যেখানে পলাতক আমিরেরা কেনাকাটা করে, বরং রাস্তার ধারে পুরনো কাপড়ের মার্কেট থেকে কিনলেন।

‘তাহলে আমাদের আর করার কিছু নেই!’ লাসারা আর্তনাদ করে উঠে, ওমেরো যখন ওকে ঘটনাটা বলে। ‘উনি ভয়ানক কৃপণলোক। উনার ইচ্ছে দাতব্য কোন অন্তেষ্টিক্রিয়ায় নিজেকে সঁপে দেয়া এবং ভিখিরিদের কবরস্থানে নিজের সমাধি হতে দেয়া। আমরা কখনো ওনার কাছ থেকে কিচ্ছুটি পাব না।’
‘হতে পারে উনি সত্যিই গরিব,’ ওমেরো বলে, ‘এতগুলি বছর বেকার থাকার পর।’
‘ওহ্ লক্ষীটি, এটা মীনরাশির জাতক আর চরম বুদ্ধুদের ক্ষেত্রে ঘটে। লাসারা বলে। ‘সবাই জানে উনি দেশের সব সোনা নিয়ে সটকে পড়েছেন এবং মার্তিনিকের সবচেয়ে ধনী নির্বািসত ব্যক্তি।’
লাসারার দশবছরের বড় ওমেরো, খবরের কাগজের যেসব প্রবন্ধ পড়ে বেড়ে উঠেছে, সেখানে বলা হতো, রাষ্ট্রপতি জেনেভায় পড়াশুনা করেছেন, এবং নির্মাণকর্মী হিসেবে কাজ করে পড়ার খরচ জুগিয়েছেন। অপরদিকে, লাসারা বিরোধীদলীয় যে লোকের বাসায় আয়া হিসেবে কাজ করেছে, সেখানে কিশোরী বয়স থেকে সংবাদপত্রে তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা শুনে বড় হয়েছে। ফলে, যে রাতে ওমেরো রাষ্ট্রপতির সাথে মধ্যাহ্নভোজ করেছে বলে ডগমগ হয়ে ফিরে এল, সে রাতে তিনি যে কেন ওকে দামী রেস্তোরাঁয় নিয়ে যাননি, লাসারা তার কোন যুক্তি খুঁজে পায়নি। সে বেশ বিরক্ত হলো, কারন ওমেরো রাষ্ট্রপতির কাছে অফুরন্ত আবদার করেনি, যেগুলো ওদের স্বপ্ন ছিলো—বাচ্চাদের বৃত্তি থেকে শুরু করে, হাসপাতালে তুলনামূলকভাবে ভালো চাকরি। বেশকিছু সুইস ফ্রাঁ খর্চা করে সমাধিস্থ এবং জমকালোভাবে লাশ দেশে ফেরানোর বদলে নিজের মৃতদেহ শকুনির জন্য ছেড়ে দেয়া বিষয়টি, বোধহয় লাসারার সন্দেহকে দৃঢ় করেছে। তবে শেষ খড়কুটো হিসেবে ওমেরো শেষ পর্যন্ত যে খবরটা সঞ্চয় করেছিলো, তা হলো, সে রাষ্ট্রপতিকে বৃহষ্পতিবার রাতে চিংড়ি-পোলাও খেতে নিমন্ত্রন করেছে।

‘এইতো আমরা চেয়েছিলাম,’ লাসারা চীৎকার করে বলে। ‘কৌটোর চিংড়িতে বিষক্রিয়া হয়ে উনি মারা যাবেন, আর বাচ্চাদের শেষ সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে উনাকে দাফন করব।’
অবশেষে, দাম্পত্য জীবনে বিশ্বস্ততার কারনে, লাসারা ওমেরোর আবদার মেনে নেয়। এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে রুপোর চামচ, আর স্বচ্ছ কাচের সালাদের বাটি, আরেকজনের কাছ থেকে একটি বৈদ্যুতিক কফি পাত্র, এবং তৃতীয় জনের কাছ থেকে একটি এমব্রয়ডারি করা টেবিলক্লথ আর চিনেমাটির কফির কাপ ধার করে আনে। পুরনো পর্দাটা নামিয়ে উৎসব পার্বণের জন্য তুলে রাখা নতুন পর্দা লাগায় এবং আসবাবপত্র থেকে সমস্ত ঢাকনা খুলে ফেলে। সারাটা দিন মেঝে ঘষে, ধুলো ঝেড়ে, জিনিসপত্র নাড়াচাড়া সহ এমন সব জিনিস করে কাটাল, যা ওদের লাভের বদলে উল্টোটা করে ফেলে। পরিপাটি ঘরদোর দেখে মেহমানের ওদের দারিদ্র্যের জন্য মনে করুনা জাগার বদলে বরঞ্চ সম্মানবোধ জাগবে।

রাতের খাবারের সময় তিনি দুটো জিনিসের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো তিনি বরদাস্ত করতে পারেন না, তা হলো : কুকুর আর বাচ্চাকাচ্চা

বৃহষ্পতিবার রাতে, আটতলায় উঠতে রাষ্ট্রপতির নাভিশ্বাস হচ্ছিল। তিনি নতুন কোট আর পুরনো দিনের তরমুজ আকৃতির টুপি পড়ে লাসারার জন্য গোলাপসহ ওমেরোর বাড়ির দরজায় আবির্ভূত হলেন। লাসারা তাঁর পুরুষোচিত সুদর্শন চেহারা আর যুবরাজের মতো আচরণ দেখে অভিভূত হয়। ও দেখে, যা আশা করা হয়েছিল, তিনি সবকিছুর বাইরে। ও ভেবেছে তিনি একজন কপট এবং লোভী মানুষ। ও তাঁকে উদ্ধত ভেবেছে। ও জানালা খুলে রান্না করেছে, এই ভেবে—চিংড়ির গন্ধ বাড়িতে পেলে তিনি হয়তোবা নাক কুঁচকাবেন। অথচ প্রথমে বাড়িতে ঢুকে তিনি যা করলেন, তা হলো বুকভরে শ্বাস নেয়া, যেন হঠাৎ পরমানন্দে, চোখ দুটো বন্ধ করে হাত প্রসারিত করে, বিষ্ময়ভরা কন্ঠে বললেন, ‘আহ, আমাদের মহাসাগরের গন্ধ!’ একটি মাত্র গোলাপ নিয়ে আসার কারনে লাসারা ভেবেছে—লোকটা অতি হাড়কিপ্টে, সরকারী উদ্যান থেকে তুলে এনেছেন, কোনো সন্দেহ নেই। ও ভেবেছে তাঁর মধ্যে তাচ্ছিল্যের ভাব প্রকট—যেমন গর্বভাব তার রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে পত্রিকার কেটে রাখা অংশে দেখা গেছে, যেমন উদ্ধতভাব তাঁর প্রচারণার সময়ের ছোট পতাকায় ফুটে উঠেছে, যেগুলো ওমেরো বসার ঘরের দেয়ালে খুবই সরল মনে সাজিয়ে রেখেছে। ও তাঁকে ভেবেছে পাষান হৃদয়ের মানুষ, কারণ তিনি ওদের সন্তান বারবারা এবং লাসারোকে শুভেচ্ছা জানাননি, যে বাচ্চা দুটি তাঁর জন্য উপহার বানিয়েছে। এবং রাতের খাবারের সময় তিনি দুটো জিনিসের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো তিনি বরদাস্ত করতে পারেন না, তা হলো : কুকুর আর বাচ্চাকাচ্চা। লাসারা তাঁকে ঘৃনা করেছে। তা সত্ত্বেও কারিবীয় অঞ্চলের অতিথি পরায়ণতা,ওর বিদ্ধেষকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ উৎসবে ও যে আফ্রিকান গাউন, সান্তোরিয়া মালা এবং ব্রেসলেট পরে, আজ সেগুলো পরেছে। সে রাষ্ট্রপতিকে খাওয়ানোর সময় কোন আতিশয্য দেখায়নি বা অনাবশ্যক কথা বলেনি। লাসারা নিখুঁতেরও বেশী কিছু: ও ত্রুটিহীন।

সত্যটা হলো চিংড়ি-পোলাও ওদের রান্নাঘরে সাধারণত করা হয় না। তবে আজ লাসারা খুব সদিচ্ছার সাথে এগুলো রান্না করেছে, এবং রান্নাটা বেশ হয়েছে। রাষ্ট্রপতি দু দুবার খাবার চেয়ে নিয়েছেন এবং প্রশংসা করেছেন, তিনি পাকা কলার চাক ভাজা আর অ্যাভোকাডো সালাদ খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়েছেন, যদিও এসংক্রান্ত স্মৃতি তিনি ওদের সাথে ভাগাভাগি করেননি। মিষ্টি পরিবেশনের আগ পর্যন্ত লাসারা চুপ করে রাষ্ট্রপতির কথা শুনে গেছে। ঠিক তখনই ওমেরো কোন দৃশ্যমান কারণ ছাড়া ঈশ্বরের উপস্থিতির কানা-গলিতে আটকা পড়ে।
‘আমার বিশ্বাস, ইশ্বর আছেন,’ রাষ্ট্রপতি বলেন। ‘কিন্তু মানুষ নিয়ে তাঁর বোধকরি কিছু করার নেই। তিনি আরো বড় কিছুর সাথে জড়িত।’
‘আমি শুধুমাত্র গ্রহ-নক্ষত্রে বিশ্বাস করি,’ লাসারা বলে, এবং রাষ্ট্রপতির প্রতিক্রিয়া মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করে। ‘আপনি কোন দিনে জন্মগ্রহণ করেছেন?”
‘এগারো মার্চ।’
‘আমি সেটা জানি।’ একটু চমকে উঠে বিজয়ীর ভঙ্গিতে লাসারা বলে এবং বেশ কৌতুকপূর্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার কি মনে হয় না, একই টেবিলে দুজন মীনরাশির জাতক-জাতিকা খুব বেশী হয়ে যায়?’
লাসারা যখন রান্নাঘরে কফি বানাতে যায়, ওরা তখনও সৃষ্টিকর্তা নিয়ে আলাপ করছে। ও টেবিলটা পরিষ্কার করেছে, এবং সন্ধ্যাটা যাতে ভালোমত শেষ হয়, সে জন্য মনে প্রাণে চেষ্টা করছে। কফি নিয়ে বসার ঘরে ফিরে আসার পথে, ও রাষ্ট্রপতিকে এমন মন্তব্য করতে শোনে, যাতে ও স্তম্ভিত হয়ে পড়ে।
‘আমার কোন সন্দেহ নেই বন্ধু : আমি যদি রাষ্ট্রপতি হতাম, তবে আমার দরিদ্র দেশের জন্য সেটা ভারি নিকৃষ্ট ব্যাপার হতো।’
ওমেরো দেখল লাসারা ধার করা চিনামাটির কাপ আর কফির পাত্র এনেছে। ও ভাবল, লাসারা বুঝি এখনই অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতিও ব্যাপারটা খেয়াল করলেন। ‘আমার দিকে অমন করে তাকাবেন না, সেনোঁরা।’ তিনি অমায়িকভাবে বললেন। ‘আমি হৃদয় থেকে বলছি।’এবং ওমেরোর দিকে তাকিয়ে কথা শেষ করলেন :
‘নিজের বোকামির জন্য আজ এত মূল্য দিচ্ছি।’

লাসারা কফি পরিবেশন করে। কড়া আলো আলোচনায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে বলে টেবিলের ওপর আলোটা নিভিয়ে দিল, আর সঙ্গে সঙ্গে ঘরটা গাঢ় ছায়ায় ছেয়ে যায়। প্রথমবারের মতো ও অতিথির ব্যাপারে আগ্রহী হয়, লোকটার রসিকতা তাঁর বিষন্নতাকে ঢাকতে পারছিল না। লাসারার কৌতূহল আরো বেড়ে যায়, যখন তিনি কফি শেষ করলেন এবং কাপটা পিরিচের ওপর উল্টে রাখলেন, যাতে তলানিটা স্থির নকশা আঁকে।
রাষ্ট্রপতি ওদের বললেন, নির্বাসনের জন্য তিনি মার্তিনিক দ্বীপ বেছে নিয়েছেন, কারন কবি আইমে সেসাইরের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব, যিনি সে সময় সবে তাঁর স্বদেশে ফিরে আসার খেরোখাতা বইটি প্রকাশ করেছেন, এবং রাষ্ট্রপতিকে নতুন জীবন শুরু করতে সাহায্য করেছেন। স্ত্রীর উত্তরাধিকার সুত্রে যা কিছু অবশিষ্ট ছিল তা দিয়ে রাষ্ট্রপতি ফোর্ত-দে ফ্রান্সের পাহাড়ে উন্নত মানের কাঠ দিয়ে তৈরী এক বাড়ি কিনেছিলেন। বাড়িটির জানালায় জাফরি লাগানো এবং সাগরের দিকে মুখ করা, আর বারান্দাটা বুনো ফুলে ছাওয়া, যেখানে ঝিঁঝিপোকার ডাক এবং চিনির কল থেকে ভেসে আসা ঝোলাগুড়-রামের গন্ধে বড় সুখকর এক ঘুম হতো। সেখানে তিনি তাঁর চেয়ে চৌদ্দ বছর কম বয়সী স্ত্রীর সাথে থাকতেন, যিনি প্রথম সন্তানের জন্মদানের পর পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলেন। তবে রাষ্ট্রপতির ভাগ্য সহায়ক ছিল বলা যায়, কারণ তিনি লাতিন রচনাগুলো লাতিন ভাষায়ই পড়তে অভ্যস্ত ছিলেন, এবং দন্ডাদেশ অনুযায়ী এটাই ছিল রাষ্ট্রপতির জীবনের একমাত্র কাজ। তিনি বছরের পর বছর, তাঁর দলের লোকেরা যে সমস্ত দুঃসাহসিক অভিযানের পরামর্শ দিত, সেই লোভকে প্রতিহত করতেন।

‘তবে আমি কখনো একটি চিঠিও খুলিনি,’ তিনি বললেন। ‘কক্ষনোই না, যখন বুঝতে পারি, অতি গুরুত্বপূর্ন জিনিষও এক সপ্তাহ পর কম গুরুত্বপূর্ন হয়ে যায়, এবং দু মাস পরে যে চিঠি লিখেছে তাকেও মানুষ ভুলে যায়।
তিনি আবছা আলোয় দেখলেন, লাসারা সিগারেট ধরাচ্ছে। তিনি ওর কাছ থেকে সিগারেটটা বেশ লোভের সাথে নিজের আঙুলে তুলে নিলেন। লম্বা একটা টান মেরে ধোঁয়াটা গলায় আটকে রাখেন। লাসারা চমকে গিয়ে আরেকটা ধরানোর জন্য সিগারেটের প্যাকেট আর দেয়াশলাইয়ের বাক্স তুলে নেয়। তবে তিনি ওকে জ্বলন্ত সিগারেটটা ফিরিয়ে দিলেন। ‘তুমি এত আনন্দের সাথে ধুমপান করো যে, লোভ সামলাতে পারিনি,’ তিনি বললেন। তখনই গলায় আটকানো ধোঁয়াটা ছাড়তে হলো, কারণ তিনি কাশতে শুরু করেছেন।
‘আমি অনেক আগে অভ্যাসটা ছেড়েছি, তবে অভ্যাস আমায় পুরোপুরিভাবে ছেড়ে যায়নি,’ তিনি বললেন। ‘বিভিন্ন উপলক্ষে সিগারেটের নেশা আমায় কাবু করে ফেলে। এখনকার মতো।’
কাশির দমক তাঁকে আরো দুইবার কাঁপিয়ে দেয়। ব্যথাটা ফিরে এল। রাষ্ট্রপতি তাঁর ছোট্ট পকেট ঘড়িটা দেখে নিলেন এবং সন্ধ্যের সময় যে দুটো বড়ি খাওয়ার কথা, সেগুলো খেয়ে নিলেন। এরপর তিনি কাপের তলানির নকশা জটিল দৃষ্টিতে দেখলেন : কিছুই পাল্টায়নি, তবে এবার তিনি আর ভয়ে কেঁপে উঠেননি।
‘পুরনো সমর্থকদের মধ্যে কেউ কেউ আমার পরে রাষ্ট্রপতি হয়েছে,’ তিনি বললেন।
‘সায়াগো,’ ওমেরো জানায়।
‘সায়াগো এবং অন্যরাও,’ তিনি বললেন। ‘আমরা সবাই অন্যায়ভাবে একটি সম্মানের স্থান দখল করেছি, যা আমরা আশা করতে পারি না। এমন একটি অফিস দখল করছি, যেটা কী করে ভরে ফেলতে হয় তাও জানি না। এদের মধ্যে অল্প কজন কেবলমাত্র ক্ষমতা চায়, তবে বাকী সবাই খোঁজে সামান্য কিছু : একটি চাকুরী।’
লাসারা রেগে যায়।
‘আপনি কি জানেন, ওরা আপনার সম্পর্কে কী বলে?’ ও জিজ্ঞেস করে।
ওমেরো বিপদ আঁচ করে ওদের কথার মধ্যে ঢুকে পড়ে:
‘ওরা মিথ্যে বলে।’
‘ওরা মিথ্যে বলে আবার ওরা মিথ্যে বলেও না,’ রাষ্ট্রপতি অপার্থিব শান্তস্বরে বলেন। ‘যখন বিষয়টা রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে ঘটে, নিকৃষ্ট কলঙ্কিত ঘটনাটা একই সাথে সত্য এবং মিথ্যা দুটোই হতে পারে।’
তিনি নির্বাসনের সবটুকু সময় মার্তিনিক দ্বীপে কাটিয়েছেন। বাইরের পৃথিবীর সাথে তাঁর একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম ছিল, অফিসিয়াল কাগজপত্রের কিছু খবর। এক স্কুলে এস্পানঁল ও লাতিন শিখিয়ে, এবং বিভিন্ন সময়ে আইমে সেসাইরে পত্রিকায় বেশ কিছু অনুবাদ করে নিজের খরচ চালাতেন। আগষ্ট মাসের গরম ছিল অসহনীয়, আর তিনি দুপুর পর্যন্ত দোল বিছানায় শুয়ে শোবার ঘরের পাখার ভোঁ ভোঁ আওয়াজ শুনতেন। এমনকি দিনের সবচেয়ে গরমের সময়টায় তাঁর স্ত্রী সূর্যের আলো থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য বিশাল ঘেরঅলা, কৃত্রিম ফল আর অর্গান্ডি কাপড়ের ফুল দিয়ে সাজানো শনের টুপি পরে বাড়ীর বাইরে পোষা পাখীগুলোর পরিচর্যা করতে যেতেন। তবে যখন তাপমাত্রা কমে যেতো, তখন ঠান্ডা বাতাসে বারান্দায় বসে থাকতে বেশ লাগত, আর যতক্ষণ না পর্যন্ত আঁধার নেমে আসে, তিনি চোখদুটো সাগরে সেঁটে রাখতেন। এদিকে তাঁর স্ত্রী চটে যাওয়া রকিং চেয়ারে বসে, মাথায় ছেঁড়া টুপি, আর প্রতিটি আঙুলে ঝকমকে পাথরের আংটি পড়ে পৃথিবীর যাবতীয় সব জাহাজের আসা যাওয়া দেখতেন। ‘ওটা পুয়ের্তো সান্তোর। ‘একদম নড়তে পারছে না, পুয়ের্তো সান্তোর কলা দিয়ে ভর্তি,’ তিনি বলতেন। কারন তাঁর দেশ ছাড়া অন্য কোন দেশের জাহাজ যে এই পথে যেতে পারে তা তিনি ভাবতেই পারতেন না। রাষ্ট্রপতি তাঁর এসব কথা না শোনার ভান করতেন। যদিও শেষপর্যন্ত স্ত্রী তাঁর চেয়ে দেশকে বেশী ভুলে যেতে পেরেছিলেন, কারণ ভদ্রমহিলার স্মৃতিভ্রংশ হয়েছিল। তাঁরা এইভাবে বসে থাকতেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত কোলাহলপূর্ণ সন্ধ্যা মিলিয়ে যায়, এবং মশার আক্রমণে পরাস্ত হয়ে বাড়িতে ঠাঁই নিতে হয়। এরকম এক আগষ্ট মাসে, বারান্দায় বসে পত্রিকা পড়ার সময় রাষ্ট্রপতি চমকে উঠলেন।
‘কী কা-!,’ তিনি বললেন। ‘আমি নাকি এস্তোরিলে মারা গেছি!’

চাপটা ও আর নিতে পারলো না। মাঝরাতে বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ায়। বাড়িতে ঘুমানোর সময় যেমনটি থাকে, তেমনটি আপাদমস্তক নগ্ন

তাঁর স্ত্রী ঝিমুচ্ছিলেন, মৃত্যুর খবর শুনে ভড়কে গেলেন। সম্পাদকীয় প্রবন্ধটা খবরের কাগজের পাঁচ নম্বর পৃষ্টায়, ছ’টি লাইনে এক কোণে ছাপা হয়েছে। পত্রিকাটিতে কখনও কখনও তাঁর অনুবাদ ছাপা হয়, আর পত্রিকার ম্যানেজার মাঝে মধ্যে তাঁকে দেখতে আসেন। আর সেই পত্রিকায় এখন বলা হচ্ছে, তিনি এস্তোরিল দি লিসবোঁয়ায় মারা গেছেন, যে জায়গাটা পরাজিত ইউরোপিয়ানদের অবলম্বন এবং আশ্রয়স্থল, যেখানে তিনি কখনোই যাননি এবং যেটা সম্ভবত পৃথিবীর একটিমাত্র জায়গা যেখানে তিনি মরতে চাননি। একবছর পর, রাষ্ট্রপতির স্ত্রীর মারা যান স্মৃতির যন্ত্রণায় ক্ষত বিক্ষত হয়ে : একমাত্র সন্তানের স্মৃতি, যে সন্তান পিতার ক্ষমতাচ্যুতিতে অংশগ্রহণ করেছে, এবং পরবর্তী সময়ে নিজের দুস্কর্মের সহযোগীর গুলিতে মারা যায়।
রাষ্ট্রপতি দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। ‘এই তো আমাদের হাল, আর কিছুই আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। ‘পৃথিবীর সব গাদ দিয়ে তৈরী একটি মহাদেশ, যেখানে ভালোবাসার একটি মুহূর্তও নেই : আছে শুধু অপহরণের শিশু, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, কুখ্যাত লেনদেন, প্রতারণা, শত্রুর সাথে শত্রুর মিলন।’ তিনি লাসারার আফ্রিকান চোখের দিকে তাকালেন, যে চোখ তাঁকে কোন প্রকার অনুকম্পা ছাড়াই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে, আর তিনি বৃদ্ধ প্রভুর সুনিপুন বাগ্মিতায় ওর মন জয় করতে চাইছেন।
‘বর্ন-সংকরের মানে হলো ঝরে পড়া রক্তের সাথে চোখের জলের মিলন। এ ধরনের মিশ্রণ থেকে একজন মানুষ কী আশা করতে পারে?’
লাসারা রাষ্ট্রপতিকে তাঁর স্থানে মৃত্যুর নিরবতায় নিশ্চল করে রাখে। তবে মাঝরাতের একটু আগে ও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় এবং আনুষ্ঠানিক চুম্বনের দিয়ে তাঁকে বিদায় জানায়। রাষ্ট্রপতি ওমেরোকে তাঁর হোটেল পর্যন্ত এগিয়ে দেয়ার অনুমতি দিলেন না, যদিও তিনি ওকে ট্যাক্সি ডেকে দেয়া থেকে বিরত রাখতে পারেননি। ওমেরো ফিরে এসে দেখে, ওর স্ত্রী ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে আছে।
‘উনিই পৃথিবীর একজন রাষ্ট্রপতি যাকে ক্ষমতা থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেয়া যায়,’ সে বলে। ‘বেজন্মা একটা।’
ওমেরোর লাসারাকে শান্ত করার অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও, ওরা একটা ভয়ানক, ঘুম বিহীন রাত কাটায়। লাসারা স্বীকার করে, লোকটা ওর দেখা সেরা সুপুরুষদের মধ্যে একজন, যার সম্মোহনী শক্তি যে কাউকে তছনছ করে দেবে এবং যার পৌরুষত্ব ষাড়ের মতো। উনি যতই বুড়ো আর পোড়খাওয়া খাওয়া লোক হোক, এখনো অবশ্যই বিছানায় বাঘ,’ ও বলে। কিন্তু ওর ধারণা, লোকটা ঈশ্বর প্রদত্ত এইসব গুণ ভ-ামির কাজে নষ্ট করেছে। ও লোকটার হামবড়াভাব সহ্য করতে পারে না, উচু গলায় বলেন কিনা তিনি দেশের সবচেয়ে নিকৃষ্ট রাষ্ট্রপতি। লাসারা সহ্য করতে পারে না লোকটার সাধু সাজার কঠিন চাল, ও ভালো করেই জানে, উনি মার্তিনিকের অর্ধেক আখ-খেতের মালিক ছিলেন। এছাড়া লোকটা ক্ষমতার প্রতি ঘৃণা দেখানোর সেই ভ-ামিও সহ্য করতে পারে না, এটা দিনের আলোর মত ষ্পষ্ট, এতদিন পর লোকটা তাঁর রাষ্ট্রপতির পদ ফিরে পাবার জন্য, শত্রুদের ধুলায় মিলিয়ে দিতে যে কোন কিছু করতে পারেন।
‘এবং ওসব দেখনদারীর সব কিছুই,’ ও বলে, ‘এই জন্য, যাতে আমরা তাঁর পায়ের নীচে বসে তাকে পূজা করি।’
‘তাতে উনার কী লাভ?’ ওমেরো বলে।
‘কিছুই না,’ লাসারা বলে। ‘কিন্তু আসল কথা হলো, কাউকে সম্মোহন করাটা একটা নেশা, যে নেশাটা কখনো কাটে না। লাসারার ক্রোধ এত বেশী যে, ওমেরোর ওর সাথে বিছানায় থাকার মানসিক চাপটা ও আর নিতে পারলো না। মাঝরাতে বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ায়। বাড়িতে ঘুমানোর সময় যেমনটি থাকে, তেমনটি আপাদমস্তক নগ্ন। এবং এমন ভাবে কথা বলছে যেন, কোন বিষয়ের ওপর ক্রমাগত বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছে। একটি ঘাই মেরে ও সেই ঘৃণিত নৈশভোজের সবটুকুই স্মৃতিথেকে মুছে দিল। ভোরবেলায় ও নতুন পর্দার জায়গায় পুরনো পর্দা লাগায়, এবং আসবাবপত্রগুলোকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনে, যাতে বাড়িটা রাতের আগে যেমনটি দরিদ্র এবং শোভন ছিল তেমন অবস্থায় ফিরে যায়। এরপর ও পিন দিয়ে আটকানো ছবিগুলো ছিড়ে, ব্যানার, পতাকাসহ জঘন্য প্রচারনার সব কিছু দলা পাকিয়ে আবর্জনার ঝুড়িতে নিক্ষেপ করে চীৎকার দিয়ে ওঠে।
‘আপনি গোল্লায় যেতে পারেন।’
সেই নৈশভোজের এক সপ্তাহ পরে, ওমেরো দেখে রাষ্ট্রপতি ওর জন্য অপেক্ষা করছেন, কারন তিনি হাসপাতাল ছাড়ার সময় অনুরোধে করেছেন ও যেন তাঁকে হোটেলে সঙ্গ দেয়। ওরা তিনটে খাড়া সিঁড়ি বেয়ে একটা চিলেকোঠায় পৌঁছায়, যেখানে ধুসর আকাশে আলোর আভা দেখা যাচ্ছে; ঘরের ভেতরে সারি সারি কাপড় শুকোতে দেয়া। একটা ডাবল বেড অর্ধেক জায়গা দখল করে আছে, একটি শক্ত চেয়ার, একটি হাতমুখ ধোওয়ার বেসিন এবং একটি বহনযোগ্য শৌচকর্ম করার পাত্র, এবং ঘোলাটে আয়না সহ গরিবের আলমারি। রাষ্ট্রপতি ওমেরোর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেছেন।
‘এটা সেই কোটর, যেখানে আমি ছাত্রাবস্থায় থাকতাম।’ যেন ক্ষমাপ্রার্থী এমন ভাবে কথা বলছেন। ‘আমি ফোর্ত-দে-ফ্রান্স থেকে এটা ভাড়া করে করেছি।’
একটা মখমলের ব্যাগ থেকে তিনি তাঁর অবশিষ্ট ধন-সম্পদ বের করলেন এবং বিছানার ওপর ছড়িয়ে দিলেন : নানা রকম পাথর সহ কয়েকটি সোনার ব্রেসলেট, তিন লহরীর মুক্তার হার, দুটো সোনার ও মূল্যবান পাথরের হার, সাধু সন্তের মেডেল সহ তিনটি সোনার মালা, একজোড়া সোনার ওপর পান্না বসানো কানের দুল, আরেকটি সোনা ও হিরের দুল, এবং তৃতীয়টি সোনা ও রুবির তৈরী, ধর্মকর্ম করার জিনিস পত্র রাখার জন্য দুটো পাত্র এবং একটি লকেট; মূল্যবান মনিমুক্তো বসানো এগারোটা আংটি এবং রানীর উপযুক্ত এক হিরের টায়রা। একটি বাক্স থেকে তিনি তিনটে রুপোর এবং একটা সোনার কাফলিঙ্ক বের করলেন, সবগুলোর সাথে ম্যাচিং টাইয়ের ক্লিপ, এবং সাদা সোনার পাতে মোড়ানো পকেট ঘড়ি। এরপর তিনি জুতোর বাক্স থেকে ছয়টি ঘরসাজানো জিনিস সরালেন : দুটো সোনার, একটি রুপার এবং বাকিগুলো মূল্যহীন।
‘এগুলোই আমার জীবনে অবশিষ্ট আছে,’ তিনি বললেন।
রাষ্ট্রপতির চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটানোর জন্য এগুলো বিক্রি করার কোন বিকল্প নেই। এবং তিনি ওমেরোকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তা করে দিতে বললেন। কিন্তু ওমেরোর মনে হলো না, যথার্থ রসিদ ছাড়া সে কাজটা যথাযথভাবে করতে পারবে।
রাষ্ট্রপতি ব্যাখ্যা দিলেন, ওগুলো তাঁর স্ত্রীর মহামূল্যবান হীরে জহরত, যেগুলো তাঁর দাদুর কাছ থেকে পেয়েছে, যিনি ঔপনিবেশিক আমলের লোক ছিলেন এবং কলম্বিয়ার সোনার খনির একটা অংশ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। ঘড়ি, কাফলিঙ্ক আর টাইয়ের ক্লিপগুলো তাঁর নিজের। ঘর সাজানোর জিনিসগুলো অবশ্যই তাঁর ছাড়া আর কারো ছিল না।
‘আমার মনে হয় না, কারো কাছে এ ধরনের রসিদ আছে,’ তিনি বললেন।
ওমেরো গোঁ ধরে রইল।
‘সে ক্ষেত্রে,’ রাষ্ট্রপতি বললেন। ‘আর কিছু করার নেই, নিজে নিজে এগুলোর দেখভাল করা ছাড়া।’
তিনি শান্তভাবে গহনাগুলো গুনে গুনে একত্রিত করতে লাগলেন। ‘আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি, ওমেরো, তবে জানো তো একজন গরিব রাষ্ট্রপতির থেকে নিকৃষ্ট দারিদ্রতা আর নেই,’ তিনি বললেন। ‘এমনকি বেঁচে থাকাটাও, ঘৃণিত বলে মনে হয়। সে মুহূর্তে ওমেরো তাকে অন্তর দিয়ে দেখেছে এবং নিজের অবস্থান থেকে সরে আসে।
লাসারা সে রাতে দেরীতে ফিরেছে। ও দরজা থেকে দেখল তেজস্বী আলোর নীচে, টেবিলের ওপর হিরে জহরত ঝকমক করছে। ওকে দেখে মনে হলো ও যেন বিছানার ওপর একটা কাঁকড়াবিছে দেখতে পেয়েছে।
‘গাধামো করো না লক্ষিটি,’ ও ভয়ে ভয়ে বলে। ‘ওই জিনিসগুলো এখানে কেন?’
ওমেরোর ব্যাখ্যা ওকে আরো বিরক্ত করে। স্বর্ণকারের মতো যত্ন নিয়ে গয়নাগুলো একটি একটি করে পরীক্ষা নিরিক্ষা করে দেখতে বসে যায়। এক পর্যায়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘ওগুলো দিয়ে সৌভাগ্য আনা যাবে।’ এরপর ও বসে থাকা ওমেরোকে দেখতে থাকে এবং দ্বিধা দন্দ্বের কোন কূল কিনারা করতে পারে না।
‘গোল্লায় যাক,’ লাসারা বলে। ‘আমরা কী করে বুঝবো, লোকটা যা বলছে, সবই সত্যি।’
‘কেন সত্যি হবে না?’ ওমেরো বলল। ‘আমি নিজের চোখে দেখেছি, উনি নিজের হাতে তার কাপড় চোপড় ধুয়ে ঘরে একটি দড়ি টেনে কাপড়গুলো শুকান, ঠিক আমাদের মতোই।’
‘কারণ উনি স্বস্তা ধরণের লোক,’ লাসারা বলল।
‘অথবা গরিব,’ ওমেরো বলে।

আঙুলে যতগুলি সম্ভব আংটি পরে, এমনকি বুড়ো আঙুলে পর্যন্ত বাদ গেল না এবং ওর হতদুটোতে যতগুলো ব্রেসলেট আঁটে, পরে নেয়

লাসারা গয়নাগুলোকে আবারো পরীক্ষা করে দেখল। তবে এবার অতটা মনেযোগ দিয়ে নয়, কারণ সেও বুঝে গেছে এগুলো মূল্যবান জিনিস। আর তাই, পরেরদিন সকালে লাসারা সবচেয়ে ভাল পোশাকটা পড়ে, নিজেকে সবচেয়ে দামী গহনা দিয়ে সাজায়। প্রতিটা আঙুলে যতগুলি সম্ভব আংটি পরে, এমনকি বুড়ো আঙুলে পর্যন্ত বাদ গেল না এবং ওর হতদুটোতে যতগুলো ব্রেসলেট আঁটে, পরে নেয় আর গহনাগুলি বিক্রি করতে বেড়িয়ে পড়ে। ‘দেখা যাক, লাসারা দেবিসকে কেউ রসিদের কথা বলে কিনা। বলেই সে হাসি ছড়িয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। ও বেছে বেছে সেই গহনার দোকানে ঢুকে, যে দোকান বড়মাপের না হলেও গ্রাহকদের ন্যায্য দাবী মেটায়। ও জানে এ দোকানে খুব বেশী জিজ্ঞাসাবাদ না করেই অলংঙ্কার কেনাবেচা হয়। সে ভয়ে ভয়ে তবে দৃঢ় পায়ে দোকানে ঢুকে পড়ে।
সন্ধ্যের পোশাক পরা একটা রোগা পাতলা, ফ্যাকাশে দেখতে দোকানদার, প্রথা মাফিক ওকে দেখে মাথা নুইয়ে, হাতে চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করে, কীভাবে সাহায্য করতে পারে। আয়না আর ঝলমলে আলোর জন্য দোকানের ভিতরটা দিনের আলোর চেয়েও উজ্জ্বল। মনে হচ্ছে দোকানটা হীরের তৈরী। লাসারা সতর্ক হয়, কর্মচারীটা যেন ওর অভিনয় করা মুখে ভয়ের ছাপ না দেখতে পায়, আর তাই সরাসরি না তাকিয়ে লোকটাকে অনুসরণ করে দোকানের পিছনে যায়।
লোকটা ওকে লুইস পঞ্চদশ আমলের নকশা করা তিনটে টেবিল, যেগুলো একেকটি কাউন্টার হিসেবে ব্যবহার হয় তার একটির সামনে বসতে বলে। টেবিলটার ওপর একটি পরিষ্কার কাপড় বিছিয়ে দেয়। এরপর লাসারার সামনে বসে অপেক্ষা করতে থাকে।
‘আমি আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?’
লাসারা আংটি, ব্রেসলেট, নেকলেস, কানের দুল, যা যা পরেছিল—সবগুলো খুলে, দাবার খোঁপের মতো নকশা কাটা ডেস্কের উপর রাখতে লাগল। ও জানতে চায় গহনাগুলোর আসল দাম কত।
জহুরি বাঁ চোখের সামনে একটি আতশ কাচ তুলে ধরে, একজন রোগীর যেমনি করে রোগ নির্ণয় করা হয়, ঠিক তেমনিভাবে নিরবে নিঃশব্দে ওগুলো পরীক্ষা করা শুরু করে। দীর্ঘ সময় পর, পরীক্ষা নিরীক্ষায় ন্যুনতম ব্যাঘাত না ঘটিয়ে, জিজ্ঞেস করে :
‘আপনি কেত্থেকে এসেছেন?’
এ ধরনের প্রশ্ন যে করা হতে পারে, লাসারার তা মাথায়ই ছিল না।
‘ইয়ে মানে, সেনোঁর,’ ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ‘অনেক দূর থেকে।’
‘আমি আন্দাজ করতে পারি,’ লোকটা বলে।
লোকটা আবারো নিরব হলো, লাসারার ভয়ানক সোনালী চোখদুটো লোকটাকে নির্দয়ভাবে খুঁটিয়ে খুঁঁটিয়ে দেখে। জহুরী হীরের টায়রার দিকে বিশেষ মনোযোগে দেয়, অন্যান্য গহনা থেকে সেটাকে দুরে সরিয়ে রাখে। লাসারা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
‘আপনি একজন যথার্র্থ কন্যারাশির লোক,’ ও মন্তব্য করে।
জহুরী তার পরীক্ষা নিরীক্ষায় বিঘ্ন ঘটায় না।
‘আপনি কী করে জানলেন?
‘আপনি যে রকম ব্যবহার করছেন, তাতেই বুঝেছি’ লাসারা বলল।
লোকটা কাজ শেষ করা না পর্যন্ত কোন কথা বলে না, এবং প্রথম থেকে যেরকম সংযতভাবে কথা বলছিল, সেটাই বজায় রাখে।
‘এগুলো কোত্থেকে এসেছে?’
‘এগুলো আমার দাদিমার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া,’ লাসারা উত্তেজিত স্বরে বলে। ‘উনি গতবছর পারামারিবোয় সাতানব্বুই বছর বয়সে মারা গেছেন।’
জহুরী ওর চোখের দিকে চাইল। ‘আমি খুবই দুঃখিত,’ সে বলে। ‘গহনাগুলোর দাম শুধুমাত্র সোনার ওজনে হবে।’ সে আঙুলের ডগা দিয়ে টায়রাটা তুলে নিয়ে, এর উজ্জ্বল আলোর দ্যূতি ছড়াতে দিল।
‘কেবল এটা ছাড়া,’ লোকটা বলে। ‘টায়রাটা অনেক প্রাচীন, মিশরীয় সম্ভবত, এবং এটা অনেক দামী হতো যদি হীরার অবস্থা এতটা খারাপ না হতো। তবে যাইহোক এটার একটা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক মূল্য আছে।’
অথচ অন্যসব গহনার নীলকান্তমণি, পান্না, চুনিপাথর, উপল—দুই একটি ছাড়া সবকটিই নকল। ‘সন্দেহ নেই আসল পাথরগুলো ভালো ছিল,’ জহুরি লাসারার কাছ থেকে নেয়া অলঙ্কারগুলো ফিরিয়ে দিতে দিতে বলে। ‘তবে ওগুলো পুরুষানুক্রমে এত ঘনঘন হাতবদল হয়েছে যে, আসল পাথরগুলো খোঁয়া গেছে আর তার বদলে বোতলের কাচ বসিয়ে দেয়া হয়েছে। লাসারা চোখে শর্ষে ফুল দেখে। একটা গভীর শ্বাস নিয়ে মনের ভেতরের আতঙ্ককে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। দোকানদার ওকে সান্তͦনা দিলো।
‘এরকম প্রায়ই হয়, মাদাম।’
‘আমি জানি,’ লাসারা একটু সামলে নিয়ে বলে। ‘একারনেই আমি ওগুলো থেকে মুক্তি পেতে চাইছিলাম।’
ওর তখন মনে হচ্ছিল কোন প্রহসনের দৃশ্যে অভিনয় করছে এবং আবার নিজের ভূমিকায় অবতীর্ন হলো। একমূহুর্তও দেরী না করে ব্যাগে থাকা কাফলিঙ্ক, পকেট ঘড়ি, টাইয়ের ক্লিপ, সোনার রুপোর ডেকোরেশন পিস এরং রাষ্ট্রপতির বাকি ব্যক্তিগত উপহার সামগ্রী সব বের করে টেবিলের ওপর রাখল।
‘এগুলোও বিক্রি হবে?’ জহুরী জিজ্ঞেস করে।
‘সবগুলোই,’ লাসারা বলে।
ওকে সুইস ফ্রাঁয় দাম পরিশোধ করা হলো, টাকাগুলো এতোটাই নতুন ছিলো যে ওর ভয় হলো, আঙুলে নোটের কালির দাগ না লেগে যায়। ও হিসেব না করেই টাকাগুলো নিল, এবং জহুরি যেভাবে দরজায় এসে শুভেচ্ছা জানিয়েছিল সেভাবেই ওকে শিষ্ঠাচারপূর্ণ বিদায় দিল। লাসারার জন্য কাচের দরজাটা খুলে, লোকটা এক মুহূর্তের জন্য ওকে থামায়।
‘এবং একটা শেষ কথা বলি, মাদাম,’ সে বলে। ‘আমি কিন্তু কুম্ভরাশির জাতক।’
সেদিন সন্ধ্যার আগেই, লাসারা আর ওমেরো রাষ্ট্রপতির হোটেলে টাকা নিয়ে যায়। আরেকবার হিসেব নিকেশ করে দেখে, অল্প কিছু টাকা কম পড়েছে। আর তাই, রাষ্ট্রপতি বিছানায় বিয়ের আংটি, কাফলিঙ্ক, সোনার মালাসহ ঘড়ি এবং টাইয়ের ক্লিপ, যা যা তাঁর গায়ে ছিল সব খুলে রাখে।
লাসারা আংটিটা ফেরত দিলো।
‘এটা নয়,’ ও বলে। এমন স্মৃতিচিহ্ন বিক্রি হতে পারে না। রাষ্ট্রপতি ওর কথা মেনে নিলেন, এবং আংটিটা আঙুলে আবার পড়ে নিলেন। লাসারা মালাসহ ঘড়ি ফেরত দেয়। ‘এটাও নয়,’ ও বলে। রাষ্ট্রপতি একমত হননি, তবে লাসারা তাঁকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে।
‘সুইজারল্যান্ডে কে ঘড়ি বিক্রি করার চেষ্টা করবে বলুন?’
‘আমরা এরই মধ্যে তা করে ফেলেছি,’ রাষ্ট্রপতি বললেন।
‘হ্যাঁ, তবে ঘড়ি নয়, আমরা সোনা বেচেছি।’
‘এটাও সোনা,’ রাষ্ট্রপতি বললেন।
‘আপনার অপারেশন না হলেও চলবে, কিন্তু এখন কটা বাজে সেটা তো আপনাকে জানতে হবে।’
লাসারা রাষ্ট্রপতির সোনার ফ্রেমের চশমাটাও নিতে রাজী নয়, যদিও তাঁর অতিরিক্ত কচ্ছপের খোলের ফ্রেমের চশমা রয়েছে। ও জিনিসগুলো উঠাল, এবং রাষ্ট্রপতির সকল সন্দেহের অবসান ঘটায়।
‘তাছাড়া,’ ও বলে, ‘এতেই পর্যাপ্ত পর্যাপ্ত টাকা পাওয়া যাবে।’

চলে যাওয়ার আগে, ও রাষ্ট্রপতির ভেজা স্যাঁতসেঁতে কাপড়গুলো তুলে নেয়, আর তাঁর অনুমতি না নিয়েই ওগুলো বাড়িতে শুকানো আর ইস্ত্রি করতে নিয়ে যায়। ওরা মটর সাইকেলে চড়ে বসে, ওমেরো চালাচ্ছে, লাসারা পিছনে বসে, ওর হাত ওমেরোর কোমরে। ফিকে লাল রঙের গোধুলি বেলায়, রাস্তার বাতিগুলো সবে জ্বালানো হয়েছে। শেষ পাতাটা ঝোড়ো হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে গেছে। গাছগুলো জীবাশ্মের মত দেখাচ্ছে। রন নদী বরাবর একটি গুণায়-টানা ট্রাক চলছে, পূর্ন ভলিয়্যুমে রেডিও বাজিয়ে এবং রাস্তায় গানের সুর লহরী ছড়িয়ে দিয়ে। জর্জ ব্রাসেনস গাইছেন: ধৈর্য্য ধরো ওগো প্রিয়তমা, এ সময় চলে যাবে, বর্বর এসময় ঠিক যেন আত্তিলা-র মতো। হোক সে হৃদয়ের প্রেম কিংবা খরস্রোতা নদী, সময়ের ঘোড়া তাকে বানিয়ে দেবে মরুভূমি। ওমেরো এবং লাসারা মোটর সাইকেলের উপর নিরবে বসেছিল। গানে ওদের মন উদ্বেলিত এবং হায়াসিন্থ ফুলের সুবাস মনে পড়ছে। কিছুক্ষণ পর, মনে হলো দীর্ঘ নিদ্রা থেকে ও জেগে উঠেছে।
‘ধ্যাত্তেরিকি,’ ও বলে।
‘কী?’
‘হতভাগা বুড়ো লোক একটা,’ লাসারা বলে। ‘কী জঘন্য একটা জীবন!’
পরের শুক্রবার, অক্টোবরের সাত তারিখ, রাষ্ট্রপতির পাঁচ ঘন্টার অপারেশন হয়, মুহূর্তের জন্য, বাকি জিনিসগুলো আগের মতোই ঝাপসা রেখে যান। নিয়ন্ত্রিত চেতনায়, তিনি যে বেঁচে আছেন, এটাই সান্তনা। দশ দিন পর তাঁকে অন্য রোগীদের সাথে একটি ঘরে রাখা হয়, যেখানে ওমেরো আর লাসারা দেখতে যেতে পারত। তিনি যেন এক অন্য মানুষ: কাউকে চিনতে পারছেন না। জীর্ণশীর্ণ দেহ, মাথার পাতলা চুল বালিশের ছোঁয়ায়ই উঠে যায়। আগেকার যা আছে, তা হলো তার হাতদুটোর দ্রবীভূত কমনীয়তা। দুটো ক্রাচের ওপর ভর করে তাঁর হাঁটার চেষ্টা হৃদয়বিদারক। লাসারা ব্যক্তিগত নার্স রাখার পয়সাটুকু বাঁচানোর জন্য রাষ্ট্রপতির পাশে থাকে এবং ঘুমায়। সেই ঘরের আরেকজন রোগী প্রথম রাতটা কাটায় মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে। সে সব অন্তহীন রাত লাসারার শেষ আপত্তিটাও নিয়ে চলে যায়।

তিনি যেন এক অন্য মানুষ: কাউকে চিনতে পারছেন না। জীর্ণশীর্ণ দেহ, মাথার পাতলা চুল বালিশের ছোঁয়ায়ই উঠে যায়

জেনেভায় আসার চার মাস পর তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। ওমেরো রাষ্ট্রপতির টানাটানি তহবিলের অতি সতর্ক কোষাধ্যক্ষ। সে হাসপাতালের বিল পরিশোধ করে এক সহকর্মীকে সাথে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে রাষ্ট্রপতিকে বাড়িতে নিয়ে আসে। সহকর্মীটি তাঁকে আটতলা উঠাতে সাহায্য করে। ওরা তাঁকে বাচ্চাদের শোবার ঘরে রাখে, যে বাচ্চাদের তিনি চিনেন না, এবং ধীরে ধীরে তিনি বাস্তবে ফিরে আসেন। তিনি তাঁর স্বাস্থ পুনরূদ্ধারের সময়টা নিজেকে কঠোর সামরিক অনুশীলনে ব্যস্ত রাখেন, এবং আবারও হাঁটতে থাকেন শুধুমাত্র ছড়ির ওপর ভর করে। তবে পুরনো ভালো পোশাকেও তাঁকে চেহারায় ও ব্যবহারে আগের থেকে একেবারেই অন্যরকম লাগে। শীতকাল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রচন্ড রূপে আসবে এবং সেটা এল শতাব্দীর অতি উগ্ররূপ নিয়ে। ডাক্তার বেশ লম্বা সময় তাঁকে পর্যবেক্ষণে রাখতে চেয়েছিলেন। তিনি সে পরামর্শের বিপরীতে সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন, ডিসেম্বরের তের তারিখে মার্সেই ছেড়ে যাবে যে জাহাজ, তাতে করে বাড়ি ফিরবেন। শেষ মুহূর্তে তাঁর ভ্রমণের জন্য কানাকড়িও ছিল না, লাসারা ওর স্বামীকে না জানিয়েই বাচ্চাদের সঞ্চয়ের শেষ তলানি থেকে চেঁছেপুছে নিয়ে খরচ মেটানোর চেষ্টা করে, তবে সঞ্চয়ের যে পরিমাণ আশা করা হয়েছিল, তার চেয়ে কম। তখন ওমেরো স্বীকার করে, লাসারাকে না জানিয়ে সে ওগুলো হাসপাতালের বিল মেটাতে খরচ করেছে।
‘বেশ,’ লাসারা হাল ছেড়ে দিয়ে বলে। ‘না হয় ভাবি তিনি আমাদের বুড়ো ছেলে।’

ডিসেম্বরের এগারো তারিখে লাসারা-ওমেরো তাঁকে প্রচ- তুষার ঝড়ের মধ্যে মার্সেইয়ের ট্রেনে তুলে দেয়। ওরা বাড়িতে ফিরে দেখতে পায় একটা বিদায়ী চিঠি, যেটা বাচ্চাদের বিছানার পাশের টেবিলের ওপর রাখা, সেখানে তিনি তাঁর বিয়ের আংটি আর মৃতস্ত্রীর বিয়ের আংটিও রেখেছিলেন, যেগুলো তিনি কখনোই বিক্রি করার চেষ্টা করেননি, এবং লাসারোর জন্য রেখে গিয়েছেন ঘড়ি আর মালা। যেহেতু সেদিন ছিলো রোববার, প্রতিবেশী কারিবীয়, যারা গোপন কথাটি জেনে ফেলেছিল, ওরা ভেরাক্রুজ থেকে হার্প বাদকের দল, করনাভিন স্টেশনে নিয়ে আসে। রাষ্ট্রপতির হাওয়ায় ওড়া উচ্ছৃঙ্খল ওভারকোট এবং লম্বা নানা রঙের স্কার্ফের ভেতর থেকে মুমূর্ষূভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছেন, যে স্কার্ফটা আগে লাসারার ছিল। তিনি শেষ কামরার খোলা জায়গায় দাড়িয়ে ছিলেন আর ঝোড়ো হাওয়ার কশাঘাতে টুপি নেড়ে ওদের বিদায় জানান। ট্রেনটা গতি বাড়াতে শুরু করলে ওমেরোর খেয়াল হয় ওর কাছে এখনও রাষ্ট্রপতির ছড়ি। ও প্লাটফর্মের শেষ মাথায় দৌড়ে এসে ছড়িটা জোরসে ছুড়ে মারে যাতে তিনি ধরতে পারেন। কিন্তু হায়, ছড়িটা চাকার নীচে পড়ে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। ভয়ের একটা মুহূর্ত ছিল তখন। শেষ যে জিনিসটি লাজারা দেখে—তা হলো রাষ্ট্রপতির কম্পমান হাতদুটো ছড়িটা ধরতে বাড়িয়ে দিয়েছেন, এবং কখনোই ওটা তাঁর কাছে পৌঁছোয়নি, এবং ট্রেনের কন্ডাক্টর বরফে ঢাকা বুড়ো লোকটিকে তার স্কার্ফ দিয়ে জড়িয়ে ধরে তাঁকে মধ্য বায়ুতে রক্ষা করে। লাসারা আতঙ্কে চীৎকার করতে করতে তার স্বামীর দিকে যায়, চোখের জল লুকোতে হাসার চেষ্টা করে।

‘হায় ঈশ্বর!’ লাসারা চীৎকার করে উঠে, ‘কোন কিছুই ওই লোকটিকে মেরে ফেলতে পারে না।’
রাষ্ট্রপতির ধন্যবাদ জানিয়ে পাঠানো দীর্ঘ টেলিগ্রামের ভাষ্য মতে, তিনি নিরাপদে সুস্থ শরীরে বাড়িতে পৌঁছেছেন। এক বছর তাঁর কাছ থেকে এর বেশী কিছু শোনা গেল না। অবশেষে ওরা তাঁর হাতে লেখা ছয় পৃষ্টার এক চিঠি পায়, যে চিঠিতে তাকে চেনা যাচ্ছিল না। রাষ্ট্রপতির ব্যথাটা ফিরে এসেছে, আগের মতোই তীব্র আর নিয়ম মেনে, তবে তিনি ব্যথাটা অগাহ্য করতে শিখে গেছেন এবং জীবন যেমন তেমনভাবেই যাপন করে গেছেন। কবি আইমে সেসাইরে তাঁকে আরেকটি ঝিনুক খচিত ছড়ি দিয়েছেন। তবে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ছড়িটা ব্যবহার না করার। ছয় মাস ধরে তিনি মাংস এবং সব রকমের চিংড়ি খাচ্ছেন, এবং দিনে কুড়ি কাপ কড়া তেতো কফি পান করছেন। যে দিন তাঁর পঁচাত্তর বছর বয়স হয়, তিনি কয়েক গ্লাস ঝাঁজালো মার্তিনিক রাম খেলেন। পানীয়টা তাঁর শরীরের সাথে সয়ে গেছে। এবং তিনি আবারো ধুমপান করা শুরু করলেন। তিনি ভালো বোধ করেননি, অবশ্যই, তবে খারাপও বোধ করেননি। তা সত্ত্বেও, তাঁর চিঠি লেখার প্রকৃত কারণ ছিল লাসারা আর ওমেরোকে বলা, দেশ পুনর্গঠন আন্দোলনের নেতা হিসেবে, দেশে ফিরে আসার জন্য তিনি প্রলুব্ধ ছিলেন—জাতির সম্মান পুনরূদ্ধারই সেই কারন—যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত কেবল বৃদ্ধবয়সে বিছানায় শুয়ে মৃত্যুবরণ না করে দারিদ্রের মহিমা অর্জন করেছিলেন। সে অর্থে, চিঠির শেষে তিনি জানালেন, তাঁর জেনেভা যাত্রা শুভই ছিল।

জুন, ১৯৭৯

আরো পড়তে পারেন

মহামায়া (পর্ব-১)

১. সূর্য উঠতে এখনো অনেকটা দেরি। আকাশে কোনো তারা নেই। পুরোটা আকাশ মেঘে ঢাকা। রাতের অন্ধকারটা আজকে আরও বেশি চোখে লাগছে। বাতাস হচ্ছে। মাঝে মাঝে মেঘের আলোতে দেবীপুর গ্রামটা দেখা যাচ্ছে। মুহুর্তের জন্য অন্ধকার সরে আলোয় ভেসে যাচ্ছে। রাধাশঙ্করের ভিটাবাড়ি, ধান ক্ষেত, বাঁশঝাড় হাইস্কুল আলোয় ভেসে যাচ্ছে মুহূর্তের জন্য। মহামায়া আর মনিশঙ্করের ঘরে হারিকেন জ্বলছে।….

স্বর্ণবোয়াল

মোবারক তার কন্যার পাতে তরকারি তুলে দেয় আর বলে, আইজ কয় পদের মাছ খাইতেছ সেইটা খাবা আর বলবা মা! দেখি তুমি কেমুন মাছ চিনো! ময়না তার গোলগাল তামাটে মুখে একটা মধুর হাসি ফুটিয়ে উল্লসিত হয়ে ওঠে এই প্রতিযোগিতায় নামার জন্য। যদিও পুরষ্কার ফুরষ্কারের কোন তোয়াক্কা নাই। খাবার সময় বাপবেটির এইসব ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ খেলা আজকাল নিয়মিত কারবার।….

প্রতিদান

‘আমাকে আপনার মনে নেই। থাকার কথাও নয়। সে জন্য দোষও দেব না। এত ব্যস্ত মানুষ আপনি, আমার মত কত জনের সঙ্গেই হঠাৎ চেনা-জানা। কেনইবা মনে রাখবেন তাদের সবাইকে?’ বেশ শান্ত গলায় বললেন মিসেস অঙ্কিতা। টেবিল থেকে কি যেন একটা নিলেন তিনি। পিটপিট করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো সাফরাব। একটা ইনজেকশন, একটা ছোট টেস্টটিউবের মতো ভায়াল,….

error: Content is protected !!