Author Picture

রাজীব সরকারের রম্যসাহিত্য

শিবশংকর কারুয়া

রাজীব সরকার বাংলাদেশের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক। পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করলেও বিতর্কের সূত্রটি এখনও বিচ্ছিন্ন হয়নি। ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ লেখকের রম্য রচনা। এ বইটিতে লেখক সহজ ও সরস ভঙ্গিতে অনেক কঠিন কথা বলেছেন। রম্য শব্দের অর্থ মনোরম, রমণীয়, সুন্দর। অর্থাৎ রম্য রচনায় জীবনের মনোরম সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। রাজীব সরকার ইতোমধ্যেই রম্য লেখক হিসেবে নিজের একটি বিশেষ স্থান তৈরি করে নিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে রম্য বা রস রচনার ধারাটি ঐতিহ্যবাহী। শিবরাম চক্রবর্তীর কথা আমরা জানি যিনি রম্যলেখক হিসেবেই বিখ্যাত। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু থেকে শুরু করে হালের সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়- কার হাত দিয়ে রম্য রচনা বের হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে রম্য লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন আনিসুল হক। উচ্চশিক্ষার সূত্রে লেখক কিছুদিন ইউরোপে অবস্থান করেছেন। এ বইয়ের রচনাগুলোর অধিকাংশই সেই সময়ে লেখা। তাই কয়েকটি লেখায় পাশ্চাত্যে লাভ করা অভিজ্ঞতার উল্লেখ রয়েছে।

‘‘এমন শিক্ষিত বাঙালি খুঁজে পাওয়া কঠিন যিনি জীবনে কখনও কবিতা লেখেননি, অন্তত একটি ব্যর্থ কবিতা লেখেননি।’’

এ বইয়ে মোট বিশটি রচনা রয়েছে। লেখাগুলোর পরিসর তেমন বড় নয়। ভারমুক্ত হয়ে মাথা খোলাসা করে এক বসাতেই পড়ে ফেলা সম্ভব বইটি। বইয়ের প্রথম লেখাটির শিরোনাম ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’। কবি শঙ্খ ঘোষের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক শুরু করেছেন এভাবে- “কবি শঙ্খ ঘোষ বিজ্ঞাপনের সর্বত্রগামিতা দেখে লিখেছেন মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে। বিজ্ঞাপন এখন মুখের সীমানা ছাড়িয়ে শরীরের অন্যান্য প্রত্যঙ্গও ঢাকতে শুরু করেছে। কাজেই শরীর ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে- এমন কথা অনায়াসে বলা যায়।”

বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির এ যুগে ব্যক্তিস্বার্থই যে মুখ্য তা বোঝা যায় বিজ্ঞাপনের ভাষা থেকে। লেখক বলছেন, ‘‘একটি চিপসের বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, একটি শিশু তার ভাই-বোনদের থেকে নিজেকে লুকিয়ে দরজা বন্ধ করে চিপস খাচ্ছে আর বলছে- একা একা খেতে চাও তো দরজা বন্ধ করে খাও। কী চমৎকার শিক্ষা। সবাইকে ফাঁকি দিয়ে নিজে খেতে না পারলে শিশুরা দেশের সুনাগরিক হয়ে উঠবে কীভাবে?’’

লেখক বলছেন, ‘‘একটি চিপসের বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, একটি শিশু তার ভাই-বোনদের থেকে নিজেকে লুকিয়ে দরজা বন্ধ করে চিপস খাচ্ছে আর বলছে- একা একা খেতে চাও তো দরজা বন্ধ করে খাও। কী চমৎকার শিক্ষা। সবাইকে ফাঁকি দিয়ে নিজে খেতে না পারলে শিশুরা দেশের সুনাগরিক হয়ে উঠবে কীভাবে?’’

একবিংশ শতাব্দীর নারী স্বাধীনতার এ যুগেও এসে যখন আমাদের শুনতে হয় একটি বিজ্ঞাপনের ভাষা থেকে এবার একজন আসল রাঁধুনী (বৌ) নিয়ে আয়- তখন আসলে নারীর অবস্থানটি পরিষ্কার হয়ে যায়। বিজ্ঞাপনে এসব চিন্তার প্রয়োগ চিহ্নিত করার মাধ্যমে লেখক আসলে সমাজের সত্যিকার অবস্থানটি নির্ণয় করতে চেয়েছেন। লেখক ভালোবাসা বিষয়ে বেশ কটি লেখা লিখেছেন যা পড়ে তরুণদের ভালো লাগবে। যারা প্রেম করছেন বা করবেন বলে ভাবছেন অথবা কিছুদিন বিরতির পর আবারও ভালোবাসায় মনোনিবেশ করতে যাচ্ছেন তাদের জন্য এসব লেখা উপযুক্ত পথের সন্ধান দেবে।

ভালোবাসা একটি মৌলিক অধিকার, ডিজিটাল ভালোবাসা, ভালোবাসার বিশ্বায়ন, স্বামী-স্ত্রী-দ্বন্দ্ব সমাস (আসলে এটিও ভালোবাসা), বিরহের জয় হোক (এটিও ভালোবাসার একুশ কলার এক কলা), নারীর মন (ভালোবাসার সূত্র খোঁজা), ঘরকীয়া ও পরকীয়া প্রেম এসব রচনায় লেখক ভালোবাসার জয় জয়কারের কথা বলেছেন। যেমন ভালোবাসা একটি মৌলিক অধিকার- এ বলেছেন, ‘‘হঠাৎ দেখি এক পুলিশ কনস্টেবল একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকাকে রাস্তা থেকে উঠিয়ে নিচ্ছে। অভিযোগ তারা সেখানে অসামাজিক কাজ করছে। তারা সেখানে যা করছিল এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সামাজিক কাজ কি আছে?।’’

এক ব্যর্থ প্রেমিক কাম কবি লিখেছেন, ‘‘মেয়েটি বাদাম ছিলিল, ছেলেটি বাদাম গিলিল। বাদাম হইল শেষ, মেয়েটি নিরুদ্দেশ। মেয়েটি নিরুদ্দেশ হলেও ছেলেটি কিন্তু প্রেমিকার শোকে পাগল হয়ে মদের বোতল নিয়ে পড়ে থাকার পাত্র নয়। ডিজিটাল ভালোবাসায় দেবদাস-পার্বতী তৈরি হয় না।’’

ডিজিটাল ভালোবাসাকে লেখক পণ্যকেন্দ্রিক বলেছেন। সে কারণেই এক ব্যর্থ প্রেমিক কাম কবি লিখেছেন, ‘‘মেয়েটি বাদাম ছিলিল, ছেলেটি বাদাম গিলিল। বাদাম হইল শেষ, মেয়েটি নিরুদ্দেশ। মেয়েটি নিরুদ্দেশ হলেও ছেলেটি কিন্তু প্রেমিকার শোকে পাগল হয়ে মদের বোতল নিয়ে পড়ে থাকার পাত্র নয়। ডিজিটাল ভালোবাসায় দেবদাস-পার্বতী তৈরি হয় না।’’ চিত্তসুখ বনাম বিত্তসুখ লেখায় রাজীব সরকার চমৎকারভাবে রূঢ় সত্য কথা বলেছেন, বিত্তসুখ থাকলেই যে চিত্তে সুখ আসবে এমন কোনো কথা নেই, তবে বিত্ত না থাকলে চিত্তে যে সুখ আসবে না এটা নিশ্চিত। রসায়নের ভাষায় বলা যায়- সকল বিত্তসুখই চিত্তসুখ, কিন্তু সকল চিত্তসুখই বিত্তসুখ নয়।

রাজীব সরকার জীবনের প্রাসঙ্গিকতা এনে জীবনের রস খুঁজে ফেরেন। আমাদের প্রতিদিনকার জীবনেই রয়েছে ঘটন অঘটনের নানা উপাদান। এ জীবনেই রয়েছে রম্যের ঘনঘটা। ‘কবি সব করে রব’ বইতে রাজীব চৌদ্দটি নিবন্ধে রম্যের স্বাদ গন্ধ উপস্থাপন করেছেন। বইটির নামকরণ করেছেন তার প্রথম নিবন্ধ দিয়ে- ‘কবি সব করে রব’। লেখক বলেছেন, ‘‘এমন শিক্ষিত বাঙালি খুঁজে পাওয়া কঠিন যিনি জীবনে কখনও কবিতা লেখেননি, অন্তত একটি ব্যর্থ কবিতা লেখেননি।’’ কিন্তু কবি সমাজের সৌন্দর্যের আকর। কবি আর কবিতার মধ্যেই সমাজের অন্তর্নিহিত শক্তি লুকিয়ে আছে। কবি কিন্তু নির্বিরোধ মানুষ। মানুষের ভেতরের শুভ শক্তি ও কল্যাণ বোধকে জাগিয়ে দেয় কবির কলম। একজন রাষ্ট্রনায়কের তথাকথিত কাব্যপ্রেমকে ব্যঙ্গ করে একজন খ্যাতিমান কবি লিখেছেন-‘সব শালা কবি হবে’। শালার কবি হতে বাধা নেই। এমনকি ভগ্নিপতি অর্থাৎ হবু জামাইয়েরও কবি হওয়ার ইচ্ছা প্রবল। এক প্রেমিক বিয়ের কথা চলার সময় প্রেমিকাকে জিজ্ঞেস করল- ‘‘আমি যে কবিতা লিখি সে কথা তোমার বাড়ির লোকজনকে বলেছ? উত্তরে প্রেমিকা বলেছে- ‘‘তুমি যে নেশা কর, জুয়া খেল এগুলো ভয়ে ভয়ে মা বাবাকে বলেছি। তুমি যে চাকরির পরীক্ষায় পাস করতে পারছ না তাও বলেছি। কিন্তু তুমি যে কবিতাও লেখো এটা এখনও মা বাবাকে বলতে পারিনি। এতটা ধাক্কা বোধহয় তারা সামলাতে পারবেন না।’’ প্রেমিকা বা তার পরিবারের কাছে কবির মূল্যায়ন না হলেও লেখক কবিকে তুলে ধরেছেন সংগ্রামী মানুষ হিসেবে- কবি লড়াকু মানুষ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যেমন কবিদের গৌরবজনক অংশগ্রহণ রয়েছে, তেমনি সে লড়াই অব্যাহত রয়েছে স্বাধীনতার পরও।

‘‘জীবিত ও বিবাহিত’ নিবন্ধে এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলছে, ‘‘বল তো ইয়ে করে বিয়ে, ঘটা করে বিয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?’’ বন্ধুটি উত্তর দিচ্ছে- ‘‘নিজের প্রেমিকাকে বিয়ে করলে ইয়ে করে বিয়ে আর অন্যের প্রেমিকাকে বিয়ে করলে ঘটা করে বিয়ে।’’

আসলে কবিতার মর্ম জানার যোগ্য সবাই নন। কবি আর কবিতার মর্মকে রসগ্রাহী করে তুলতে ‘কবি সব করে রব’ এক অনন্য সাধারণ রচনা। রাজীব সরকার সমাজের বিভিন্ন পেশাজীবীদের নিয়ে লিখেছেন। ‘ডাক্তার সমাচার’ নিবন্ধে এক যুবক ডাক্তারকে এসে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন, ‘‘আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে এলাম। কারণ আপনার চিকিৎসাতেই আমার মামা হামিদুল হক চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মামার কেউ নেই। একমাত্র ভাগ্নে হিসেবে পুরো সম্পত্তির মালিক আমিই এখন। তাই ধন্যবাদ জানাতে এসেছি।’’ ‘‘জীবিত ও বিবাহিত’ নিবন্ধে এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলছে, ‘‘বল তো ইয়ে করে বিয়ে, ঘটা করে বিয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?’’ বন্ধুটি উত্তর দিচ্ছে- ‘‘নিজের প্রেমিকাকে বিয়ে করলে ইয়ে করে বিয়ে আর অন্যের প্রেমিকাকে বিয়ে করলে ঘটা করে বিয়ে।’’ বিয়ে করলেই লাভ। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মিল হলে সুখী দম্পতি। অমিল হলে দার্শনিক হবে। সুতরাং যারা বিয়ের বয়স হওয়ার পরও বিয়ে করছেন না, তারা রাজীবের পরামর্শ আর উপেক্ষা করতে পারবেন না। রাজীব সক্রেটিসের কাছে ধার করে উদ্ধৃতি দিলেও এ উদ্ধৃতি আমরা গ্রহণ করছি। এ বইয়ের প্রতিটি রচনাই পাঠক অপরিসীম আনন্দ নিয়ে পড়বেন। খুঁজে নেবেন পাঠের এক অনিঃশেষ রস আনন্দ।

লেখক রাজীব সরকার বিতার্কিক বলেই হয়তো তার লেখায় যুক্তির ধার খুঁজে পাওয়া যায়। রম্য রচনায়ও এর উপস্থিতি লক্ষণীয়। আগ্রহী পাঠকের মননশীলতায় চিন্তার নতুন খোরাক যোগাবে তার রম্যরচনা। বিজ্ঞাপনের দাপটে যে বাস্তব জীবনের মর্মবাণী হারিয়ে যায় সেই রূঢ় সত্য যেমন ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ বইয়ে হৃদয়গ্রাহী করে তুলে ধরেছেন তেমনি আমাদের প্রতিদিনকার জীবনের অসঙ্গতি কিংবা সঙ্গতির রস পরিবেশন করেছেন ‘কবি সব করে রব’ বইয়ে। তার হাত দিয়ে রম্যের ভান্ডার পরিপূর্ণ হয়ে উঠুক। ভবিষ্যতে রাজীব সরকারের আরও রসগ্রাহী লেখা হৃদয়পুঞ্জে আলোড়ন তুলবে এ প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করবো।

আরো পড়তে পারেন

একাত্তরের গণহত্যা প্রতিহত করা কি সম্ভব ছিল?

২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানি নরঘাতকেরা যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই এক রাতেই শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় তিন হাজার। এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা একতরফাভাবে….

ভাষা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা

আগের পর্বে পড়ুন— চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল) ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে দুই হাজার মাইল দূরত্বের….

চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল)

আগের পর্বে পড়ুন— বায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ একুশের আবেগ সংহত থাকে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেও। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান এক বিবৃতিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। আওয়ামি লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম কমিটির সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র….

error: Content is protected !!