Author Picture

সিদ্ধার্থ হকের একগুচ্ছ কবিতা

সিদ্ধার্থ হক

পরিচয় ২৮
~
ঘুম আজ শুধু ঘুমের চেষ্টা করা—
চোখের ভিতরে সাত বেটারির টর্চ।
বহু ধূলা বহু লাল নীল পাতা
চোখের ভিতরে বসবাস করে, ওড়ে।
আমার নীরব অন্তর্জ্ঞান যেন কিছু কথা জানে।
হয়ত সে কথা গাঢ় ও ভয়ঙ্কর;
অন্তর্জ্ঞান আমাকে জাগিয়ে রাখে।
ঘুম না হলেও সকালে আমার তরতাজা ভাব থাকে
কবিতা লেখায় কোনো অসুবিধা হয় না আমার; আর
লিখতে লিখতে আমার বয়স ধীরে ধীরে কমে যায়।
বহুত পথের ধুলায় গড়িয়ে আবার রাত্রে ফিরি,
বালিশ ক্রমেই আগুনের গোলা হয়।
দফায় দফায় বালিশ উল্টে দিই;
ক্রমেই বালিশ ধানকাটা মাঠ হয়ে
ফিসফিসে কথা বলে;
মাথার বালিশ ইটের ভাটার হৃদয়ের মত পোড়ে।
এখন আমার কাছে নাই যারা, পৃথিবীতে নাই আর,
বালিশে তাদের মাথার ওজন জাগে;
শূন্যের মুখ বালিশে সজাগ হয়;
ফলত বালিশ যত উল্টাই সুবিধা হয়না তাতে—
আবার তপ্ত হয়ে ওঠে তুলাগুলি।
বালিশের নিচে বেদনারা হাঁটে চলে।
বালিশ উল্টে মাথা রাখি ফের ডান থেকে বামে ফিরি
বাম থেকে ডানে ডান থেকে বামে ফিরতেই থাকি আমি।
হয়ত ঘুমিয়ে পড়ি সব শেষে তবু;
ঘুমিয়ে পড়ার মুহূর্ত মনে থাকেনা সকালবেলা।
পরিচয়হীন আবার হাঁটতে বের হয়ে যাই আমি।


পরিচয় ২৯
~
পথের কুকুর অনেক রাত্রে কাঁদে।
পথের কুকুর কাঁদে কেন এইভাবে?
আমি জানতাম পথের কুকুর ভীষণ শক্ত প্রাণী;
শত কষ্টেও কখনো কাঁদে না।
শত বেদনায় কাঁদেনা কখনো যারা,
অনেক রাত্রে তাদের কান্না শুনি;
পৃথিবীর কোনো দূরের কোনায় একাধিক হয়ে বসে
মুখ উঁচু করে কুকুরেরা কাঁদে চন্দ্রের দিকে চেয়ে।
কান্না কাউকে ডাকা;
কাকে ওরা ডাকে আজ রাতে এইভাবে?
রাত্রির সাথে সকল প্রাণের কান্নার যোগাযোগ;
সূর্যের প্রাণ, মানুষের প্রাণ, আঁধারের শত প্রাণ,
ঘাসের জীবন, হেমন্ত পাতা সব কিছু আজ রাতে
পথের কুকুর হয়ে গেছে কোনোভাবে।
কুকুরের সাথে নিজের অনেক মিল খুঁজে পাই আমি;
কুকুর যেভাবে না কাঁদার গাঢ় প্রচেষ্টা করে যায়,
তবুও কখনো অনেক রাত্রে সব ভুলে কেঁদে ওঠে;
বয়স্ক লোক ওইভাবে কাঁদে ভাবি।
কে যেন সময় না দিয়ে আমাকে প্রবল আঘাত করে।
কোথায় তা লাগে বুঝতে পারেনা ঠিক;
আঘাতের কথা আগে থেকে জানা ছিল;
তথাপি আঘাত আঘাতের মত লাগে।
মৃত্যুর পরে শ্বাস নেয় কেউ দূরে বসে একা একা।
জানতে চাওয়ার ইচ্ছা হয়তো শ্বাস।
যে আঘাতে তার মৃত্যু গিয়েছে ঘটে,
তাকে জানতেই তার নিশ্বাস পড়ে।
পরে ফের আমি নানা দিক থেকে আসা
বহু কুকুরের কান্না শুনতে পাই;
কান্না কাউকে ডাকা। পুনরায় আমি ভাবি।


পরিচয় ৩২
~
হেমন্তে যানবাহনের চাকা কাঁঠাল পাতার মত—
পথের উপরে একটানা ওড়ে, একটানা ঘুরে চলে।
মনে পড়ে নাকি দূরের শহরে তুমি,
বহু উপরের অফিসের ঘরে বসে—
দেখেছিলে বহু ঘুরন্ত চাকা পাতাদের টেনে নেয়?
পাতাগুলো উড়ে, কিছু দূর গিয়ে,
ফের নেমেছিল পথে।
তোমার রক্ত হেমন্তে বনভূমি;
অসময়ে আসা বৃষ্টির হাত তোমার ভিতরে ঢুকে
ঝরে গেয়েছিল কাল; ঝাঁড়ুর শব্দ ক্রমাগত আসছিল;
ঝাড়ু দিয়ে ক্রমে মন্থর পাতা ফেলে দিচ্ছিল ওরা;
ঘুরে ঘুরে স্নায়ু নেমে গিয়েছিল কাদার ভিতরে ভোরে;
পাতার শব্দে কেঁপে উঠছিল দিন।
বারবার আসা নির্জনতারা আসছিল ঘুরে ঘুরে;
আনেক আগের শেষ হওয়া দিন আবার চাকার মত
অলীকের পথে ঘুরতে ঘুরতে এসেছিল কাল কাছে;
ঝরে যাওয়া দিন, প্রেমহীন হাত, এখনো চাকার মত
ঘুরছে কোথাও, অলীক শূন্যে, কালো গহ্বর হয়ে।
সব ঝরে যাওয়া— নতুন এবং পুরাতন একসাথে।
দরজার দিক থেকে বাতাসের অচিন ঢেউরা আসে
গাছেরা তাকায় প্রগাঢ় দৃষ্টি মেলে
চমকে উঠতে হয়— গাছের দৃষ্টি মানুষের চোখ নয়;
তুমি নিজে ছাড়া আর সব কেন এভাবে নতুন হয়?
প্রত্যহ তুমি ঘরের ভিতরে বিভিন্নভাবে হাঁটো;
হাঁটতে হাঁটতে দেখো—
মৃত ও জীবিত বহু ঘর সব ঘরের ভিতরে আছে।
দেখোনি কখনো যাকে,
দেখবে না যাকে আর কোনদিন তুমি,
ওরা সকলেই রয়েছে এ ঘরে, গভীর ঘরের মত।
তোমার ভিতরে, ঘর নয়, এক সুক্ষ্ম অন্ধকার
দিনেও রয়েছে কুয়াশার মত বসে।
চারপাশে এতো গাছ পালা তবু চুপ করে আছে ঘর।


পরিচয় ৩৫
~
যে লোকটা অসমাপ্ত থেকে থেকে, ছায়া হয়ে গেছে,
আমি তার পরিচয় জানি; বহুদিন পায় নি সে চিঠি।
আমি জানি, তার পরিচয় বুঝতে চেয়ে তুমি,
তার পরিচয়কে, ভাঙতে শুরু করবে।
পরিচয় ভাঙতে ভাঙতে সব শেষে পাবে তুমি
সাব এ্যটোমিক অন্ধকার আর সীমাহীন শূন্যতা,
আর এক চেতনা যা দেখা যায়না, স্পর্শ করা যায়না।
এই অন্ধকার শূন্যতার মুখামুখি হয়ে, কি করবে তুমি?
সব ছেড়ে উঠে তুমি হাঁটতে চলে যাবে।
হয়তোবা ছায়া মানুষের আ্যটোমিক শূন্যতা
তোমাকেও আক্রান্ত করেছে;
তার ব্যথা, তুমিও অনুভব করছ হৃদয়ে।
এখন নিজকে ভাঙছো তুমি, গুঁড়াগুঁড়া করে ফেলছো।
নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে সব শেষে মিলল সেই একই
অন্ধকার শূন্যতা আর এক নিভু নিভু চেতনা;
নিজেকে এভাবে দেখে তুমি বেদনায় বাঁকা হয়ে গেলে।
ছায়া হয়ে যাওয়া মানুষেরা স্বপ্নে আবার শরীর খুঁজে পায়।
বহু রাতে কারা যেন পথের ওদিক থেকে কথা বলে ওঠে।
ওরা কি মানুষ, নাকি পথ? ওই পথে তুমিও কি হেঁটেছিলে?
তুমি যদি পথ ভাঙতে থাকো, হায়, যদি পথ গুড়া কর,
সব শেষে পাবে আবারো সেই অন্ধকার, শূন্যতা, চেতনা,
অন্ধকার, অন্ধকার চেতনা, শূন্যতা, অন্ধকার, অন্ধকার
বারবার সেই অন্ধকার আর চেতনার গহীন শূন্যতা…
এবার কি করবে তুমি, ভাঙবে নাকি নিজেকে আবার?
কিভাবে ভাঙবে নিজেকে? একবারে ভেঙে ফেলবে,
নাকি বহুদিন ধরে ক্রমে ক্রমে? যা-ই কর, পাবে সেই,
এক আকাশের মত অমর অন্ধকার,
যেখানে অগুনিত তারা,
তোমার অস্তিত্ব তার একটি বা দুটি, নড়ছে দূর থেকে।
যে কোনো অন্ধকার ভাঙতে ভাঙতে পাওয়া যায় মানুষের
ভিতরের অমর অন্ধকার। ক্রমে তুমিও টের পাবে,
বিমর্ষ ইচ্ছার দীপ জ্বলছে আহত হয়ে সেই অন্ধকারে।


পরিচয় ৩৭
~
হেমন্তে পাতার শব্দ সত্য মনে হয়। ডাল থেকে
চ্যুত হওয়া ফিসফিস সারাদিন শুনি।
অদৃশ্য ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়া
পাতার পায়ের শব্দ বেদনার মত তৃপ্তি দেয়।
প্রুস্তের স্মৃতির ন্যায়, রাত্রে ঘুমাতে গেলে মনে হয়,
আমি ইতিমধ্যেই ঘুমিয়ে গিয়েছি।
ঘুমের ভিতরে ভাবি, জেগে আছি আমি,
ধীরে ধীরে ঘরময় হাঁটছি, ঘূর্ণিত হচ্ছি ধীরে, ধীরে ধীরে;
নিজ ঘুমে জেগে থেকে অন্যদের ঘুমের ভিতরে ঢুকে গেছি।
অথবা ঘুমের মধ্যে এম্নি এক বাস্তবে পৌঁছেছি
যা আমার নয়। যে বাস্তব কারো নয়, হেমন্তে তাকেও
দেখি বাস্তবই লাগে। ঘুম থেকে জেগে উঠে
টের পাই তখনো ঘুমিয়ে আছি আমি

আরো পড়তে পারেন

আরণ্যক শামছ-এর একগুচ্ছ কবিতা

প্রান্তিক কবি আমি এক নির্জনে পড়ে থাকা প্রান্তিক কবি। যেন সমাজতাত্ত্বিক সীমারেখার শেষপ্রান্তে ঝুলে থাকা এক পরিত্যাক্ত পলিথিন ব্যাগ। এখানে লুকিয়ে রেখেছি ক্ষুধা, দারিদ্র্য, ভগ্নস্বাস্থ্য, অসাম্য, অশিক্ষা ও মানুষের ছলাকলার ইতিহাস। আমি গাণিতিক ধারণার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনস্তিত্বের অপ্রয়োজনীয় সংযুক্তি। তবে জিপসিদের মত আমিও দাঙ্গা বাঁধিয়ে দিতে পারি। আমিও মাটির ঘ্রাণ থেকে জেনে নিতে….

আজাদুর রহমানের একগুচ্ছ কবিতা

সবুজ স্তন প্রচুর নেশা হলে দেখবেন— গাছগুলো বৃষ্টি, পাতার বদলে বব চুল, কী ফর্সা! তার বাহু, উরু ব্যাঞ্জনা, জলভারে নুয়ে আছে সবুজ স্তন। নেশা এমনই এক সদগুন যে, মাঝরাতে উড়ে উঠবে রাস্তাগুলো আকাশে মুখ দিয়ে আপনি বলছেন— আমাদের একটা পৃথিবী ছিল, ঠিক চাঁদের মত গোল। চুর পরিমাণ নেশা হলে, আপনার পা থেকে অহংকারী পাথর খসে….

গাজী গিয়াস উদ্দিনের একগুচ্ছ কবিতা

ক্লান্তির গল্প যারা উপনীত সন্ধ্যে বেলায় ফিরে দেখো দিন মলিন স্বপ্ন – ধূসর জীবন, প্রখর রোদের শায়ক ক্রীড়া প্রাচুর্যে আত্মহারা ছিলে স্বাধীন একদিন, পশ্চিম বেলা চেয়ে চেয়ে আজ শেষ করো ক্লান্তির গল্প।   ছড়ানো বিদ্রুপ সাপের চুমোতে কোথা বিষ হিংস্র নিশ্বাসে তোমার গরল বিশ্বাসে আমাকে পাবে জিয়ল সরল। রুক্ষতা ছেঁটে ফেল – চেহারা কমনীয় সব….

error: Content is protected !!