আজ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় লীনার ফ্লাইট। কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে লীনা ইংল্যান্ড যাচ্ছে। সাদিকে দুপুরে ঘুম দিতে যেয়ে লীনার চোখ বেয়ে জল গালে গড়াচ্ছে। শুধু বারবার মনে হচ্ছে, মোট চার বছরে যদি শেষ করতেও পারি, তারপরও তো একবছর এর আগে আসতে পারব না। শাহেদ পাশে শুয়ে লীনার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, সাদির কোন অযত্ন হবে না। আমি নিজে তোমার অবর্তমানে সাদির খেয়াল রাখব। তুমি মনস্থির করে সামানে অগ্রসর হও।
শাহেদ আজ একটু দ্রুত বাসায় চলে এসেছে। শাহেদ বি.সি. এস ট্যাক্স ক্যাডারের কর্মকর্তা। লীনা আর শাহেদ দুজনেই জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেছে। লীনা বি.সি. এস শিক্ষা ক্যাডারে যোগদান করে। আর শাহেদ ট্যাক্স ক্যাডারে। শাহেদের এক বছর পরে লীনা চাকরিতে যোগদান করে। শাহেদের খুব চাওয়া ছিল লীনা তার ক্যারিয়ার নিয়ে একটা অবস্থানে নিজেকে দাঁড় করাক।
লীনা আর শাহেদ দাম্পত্যের চার বছর। দুই বছরের মাথায়ই লীনা গর্ভবতী হয়। সাদির বয়স এক বছর। শাহেদ কে নিয়ে লীনার কোন অভিযোগ নেই। শুধু শাহেদ একটু বেশি বন্ধু বৎসল। শাহেদের স্পর্শ ছাড়া লীনা চব্বিশ ঘন্টা পার করতে পারে না। এসব ভাবতে ভাবতে যখন লীনা আর কূল কিনারা পাচ্ছে না। তখনই শাহেদ তাড়া দেয়, সাড়ে চারটা বাজে। দ্রুত কর পাঁচটায় বাসা থেকে বেরুবো। বিমানবন্দরে এসেছে লীনার শ্বশুর, শ্বাশুড়ি, বাবা, মা লীনার ছোট ভাই সবাই। সাদিকে কোলে নিয়ে বসে ছিল গাড়িতে পুরোটা সময় শাহেদের কোলে মাথা রেখে হাতে হাত রেখে। শাহেদ লীনার গালে, চোখে ফাঁকে ফাঁকেই ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়েছে।
ফ্লাইটে উঠিয়ে দেয়ার জন্য শাহেদ শুধু ভেতরে প্রবেশ করেছে লীনার সাথে। ফ্লাইটে ওঠার আগে শাহেদ লীনাকে এক ঝটকায় টেনে নেয় বুকে। হাতে পরিয়ে দেয় একটা হীরার আংটি। লীনার চোখে চাঁদনি রাতে জলে পরা জোছনা কিরণ।
আঠারো ঘন্টা জার্নি করে লীনা পৌঁছায় বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটিতে। পৌঁছেই প্রথমে শাহেদকে মেসেঞ্জারে ভিডিও ফোনে কথা বলেছে। শাহেদ বলেছে সাদি হাসিখুশি আছে। লীনা যেন নিজের খেয়াল রাখে এবং খাওয়া দাওয়া ঠিকভাবে করে।
প্রথম দিন ক্লাসে এসেছে লাল পাড়, সাদা জামদানি শাড়ি আর হাত ভর্তি লাল কাঁচের চুড়ি পরে। কপালে পরেছে লাল টিপ। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পি.এইচ.ডি. ফেলোরা দেখছে লীনাকে আর অনেকেই হাসছে মিটিমিটি। লীনা অবশ্য একটুও অস্বস্তি বোধ করছে না। লীনা ভাবছে আমি বাঙালি, আমি শাড়ি পেয়েছি আমার দাদী, নানী, মা সবার থেকে। এমনকি আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শাড়ি পরেন। আর এটা শাহেদ চাকরির প্রথম মাসের বেতন দিয়ে কিনে দিয়েছে। এটা আমার খুবই প্রিয়। আজ ছবি তুলে শাহেদকে পাঠাব। অনেকেই হ্যান্ডশেক করতে এসে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করেছে, ফরম ইন্ডিয়া? লীনা বলেছে ফরম বাংলাদেশ।

শাহেদ লীনার ঠোঁটে এঁকে দিয়েছে প্রগাঢ় চুম্বন। তখন ভূমিকম্প হলেও লীনা টের পেতো কিনা সে বিষয়ে জগৎ সংসার বেশ সন্দিহান। সেদিন পুরো বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস বাঙালি নারী আর পুরুষের দাম্পত্য প্রেম দেখেছে

বিকেল থেকে মন খারাপ হতে শুরু হয়, সন্ধ্যায় শাহেদের ঘরে ফেরার সময়। সবার সাথে চা খাওয়া সাদি, শাহেদ সবাইকে নিয়ে বসে থাকা। বাবা, মা দুজনকে একসাথে দেখলে সাদি খুব খুশি হয়ে যায়। লীনা প্রায়ই কান্নাকাটি করে কাটায়। কিন্তু বাংলাদেশের সাথে সময় মেলে না তাই ভিডিও কলেও কথা বলা হয়ে ওঠে না সবসময়।
একদিন হাসিমুখে এগিয়ে এসে জর্জ ব্যাননি হ্যান্ডশেক করে। লীনাকে বলে, আই এম ফরম ফিলিপাইন। আই এম এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর অফ জুলোজি ইন সান্তো মারিয়াম ইউনিভার্সিটি। লীনাও নিজের পরিচয় দেয়।
এরপর মাঝে মাঝেই ব্যাননি আর লীনা বিকেলে কফি আর স্ন্যাকস শেয়ার করে। ঘুরে বেড়ায়, বিভিন্ন নদী আর পার্কে। শাহেদের সঙ্গে ভিডিও ফোনে কথা বলিয়ে দিয়েছে লীনা। শাহেদও খুশি যে লীনা একজন বন্ধু পেয়েছে।
লীনা একটু একটু করে ধাতস্থ হচ্ছে। পড়াশোনায় মন দিচ্ছে। সাদিও এখন নানুর কাছে আর বাবার কাছে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুমায়, খায়।
ব্যাননি কবিতা লেখে, ছবি আঁকে। বিভিন্ন সময় কবিতা লিখে লীনাকে দিয়েছে। লীনাও খুব প্রশংসা করেছে। সেদিন ছিল ব্যাননির জন্মদিন লীনা ব্যাননিকে পারফিউম আর সিগারেট গিফট দেয়। ব্যাননি লীনাকে অনুরোধ করে ওর সাথে বারে যেয়ে শেয়ার করতে। লীনা বলেছে, আই ক্যান শেয়ার কফি এন্ড স্ন্যাকস উইথ ইউ। মুসলিম ওমেন ডোন্ট শেয়ার হার্ড ড্রিঙ্ক লাইক ভদকা এন্ড আদার্স। ব্যাননি বলেছে, ওকে আই উড ড্রিঙ্ক। ইউ উইল রিমেইন সিটিং ওভার দেয়ার। লীনা বলেছে, এনাদার ডে। নট টুডে। শাহেদ লীনাকে শক্ত করে বলে দিয়েছে লীনা যেন কখনো বারে না যায়। ব্যাননি ভদকা কিনে লীনাকে ডর্মে পৌঁছে দিতে যেয়ে বলে, আই এম সিম্পলি ফ্যাসিনেটেড ইন ইউর ভয়েস, ড্রেসআপ, মেকওভার। আই রেসপেক্ট ইউ ফরম মাই হার্ট। ক্যান আই কিস অন ইউর ফরহেড এন্ড আইস? লীনা উত্তর দেয়, নো ইউ আর মাই গুড ফ্রেন্ড। বাট আই ক্যান্ট এলাউ দিস। ব্যাননি লীনার হাত ধরে চোখে স্পর্শ করে।
সেদিনের পর থেকে লীনা ব্যাননিকে একটু এভয়েড করছে। তিন চার দিন পর ব্যাননি এসে লীনার সামনে দাঁড়ায়। সরাসরি জিজ্ঞেস করে,
“হোয়াই ডু ইউ এভয়েড মি? ইফ আই মেড এনি রঙ, আই উইল কনভে সরি।”
তারপর লীনাকে নিয়ে একসাথে লাঞ্চ করে ব্যাননি।
লীনার ইংল্যান্ড যাবার সাত মাসের মাথায় লীনা আর শাহেদের পঞ্চম ম্যারেজ এনিভারসারি। লীনা আগের রাতে মন খারাপ করে বসে আছে। শাহেদের কোন মেসেজ নাই। শাহেদ কি ভুলে গেছে? পরের দিন একটা লাল ড্রেস পরে লীনা ক্যাম্পাসে গিয়েছে। ব্যাননি এসে হাসিমুখে খোঁচা দিচ্ছে, এনিথিং রঙ? লীনা নিজেকে সামলে নিয়ে বলে কিছু হয়নি। ব্যাননি বলে, ডোন্ট অফার মি লাঞ্চ?
ক্লাস থেকে বের হলে ব্যাননি বলে, লীনা স্টপ, আই উড লাইক টু মিট ইউ ওয়ান অফ মাই ফ্রেন্ডস। লীনা একরকম ইচ্ছার বিরুদ্ধেই রাজি হয়। তারপর এক পৃথিবী বিষ্ময় আর এক সমুদ্র আনন্দ লীনার প্রাপ্তিযোগ হয়। শাহেদ লীনার সামনে দাঁড়ানো। হাতে একটা ব্লু জামদানি আর রুপোর গয়না সেট। লীনা চিৎকার দিয়ে শাহেদকে জড়িয়ে ধরে। শাহেদ লীনার ঠোঁটে এঁকে দিয়েছে প্রগাঢ় চুম্বন। তখন ভূমিকম্প হলেও লীনা টের পেতো কিনা সে বিষয়ে জগৎ সংসার বেশ সন্দিহান। সেদিন পুরো বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস বাঙালি নারী আর পুরুষের দাম্পত্য প্রেম দেখেছে।
শাহেদ, লীনা আর ব্যাননিকে লাঞ্চে নিয়ে যায়। শাহেদ জানায় চার দিনের অফিস ট্যুরে এসেছে। অনেক কষ্টে ট্যুর ম্যানেজ করতে পেরেছে। কৃতজ্ঞতা আর আনন্দে লীনার চোখে পানি চলে আসে। শাহেদ আর লীনা দুজনে ঘুরে ঘুরে সাদি, লীনার বাবা, মা, শাহেদের বাবা, মা, লীনা আর শাহেদের ছোট ভাই সবার জন্য কেনাকাটা করেছে। এই চার রাত লীনা শাহেদের সাথেই শাহেদের হোটেলে থেকেছে। প্রতিটা রাতই ওদের জীবনে ভরা যৌবনা নদী হয়ে ধরা দিয়েছে। প্রেম যেন নতুন করে প্রাণ পেয়েছে।
শাহেদ চলে যাবার পর ব্যাননি একদিন সপ্তাহান্তে লীনার কাছে সময় চায়। সারাদিন ঘুরবে লীনার সাথে আর নিজের জীবনের সবকিছু শেয়ার করবে। সারাদিন ঘোরাঘুরি শেষে ওরা টেমস নদীর তীরে আসে। কথা বলতে বলতেই জানায়, ব্যাননি সৎ মায়ের কাছে বড় হয়েছে। তারপর অষ্টম শ্রেণিতেই ওর বাবা মারা গিয়েছে। ব্যাননি অনেক কষ্ট করে বড় হয়েছে। ওর বাবার টাকা পয়সাও ওর সৎ ভাই আর মা’ই নিয়েছে। একজন প্রেমিকা ছিল যাকে ব্যাননি অনেক ভালোবাসতো। কিন্তু সেই প্রেমিকা তাকে ছেড়ে এক শিল্পপতির ছেলেকে বিয়ে করেছে। এবার লীনার চোখ থেকে ঝরে পড়ে টপটপ কয়েক ফোঁটা অশ্রু। ব্যাননি হাত পেতে মাথায় তুলে নেয় সে অশ্রু। বলে, দিস ড্রপ অফ টিয়ার্স ইজ ওয়ান অফ মাই বেষ্ট এচিভমেন্ট ইন মাই লাইফ।
তারপর ব্যাননি যা বলে তার সারমর্ম হল, তোমার দেশে আমাকে নিয়ে যাও। তোমার মতো একটা মেয়ের সাথে আমাকে বিয়ে দিয়ে দাও। যে নিজের, ধর্ম, সংস্কৃতি, পরিবার, হাসবেন্ড, বাচ্চা সব ভালোবেসে প্রাণপণে আগলে রাখবে।
প্রায় দেড় বছর পর লীনা দুই মাসের জন্য দেশে আসে। কিছু তথ্য, উপাত্ত সংগ্রহ করবে আর সাদি, শাহেদ, বাবা, মা সবার সাথে সময় কাটাবে।

ফেরার দুই মাসের মাথায় লীনা একদিন মাথা ঘুরে পরে যেতে নেয়। ডাক্তার পরীক্ষা, নিরীক্ষা করে দেখে লীনা গর্ভবতী

লীনার সময় চমৎকার কেটে যাচ্ছে। ব্যাননি প্রায়ই ফোন করলে লীনা সপ্তাহে একদিন ফোন করতে বলেছে।
ইংল্যান্ড ফিরলে ব্যাননি লীনাকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করে। প্রথম কয়েকদিন ব্যাননি লীনাকে সময় দিয়েছে। এখন লীনা আর ব্যননি দুজনেই ব্যস্ত পড়াশোনা আর থিসিস নিয়ে।
দেখতে দেখতে সময় শেষ হয়ে আসে। লীনার থিসিস প্রেজেন্টেশনের দিনও এগিয়ে আসে। ব্যননি কমপ্লিট স্যুট পরে প্রেজেন্টেশন দিতে বলেছে। নিজে প্রেজেন্টেশনের সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চেক করেছে। শাহেদের সাথে ফোনে কথা বলেই প্রেজেন্টেশনে যায়। প্রেজেন্টেশন শেষে হাসিমুখে বেরিয়ে আসে। অপেক্ষা করেছিল ব্যননি। শাহেদও টেক্সট করেছে উই অল আর ওয়েটিং ফর এ গ্রেট লেডি।
লীনার সাথে সব শপিং করে দিচ্ছে ব্যাননি। নিজেও সাদির জন্য চকলেট, খেলনা অনেক কিছু কিনে দিয়েছে, লীনাকে ওভারকোট গিফট করেছে। লীনাও আফটার সেভ, পারফিউম, টি শার্ট অনেককিছু গিফট করেছে ব্যননিকে। শপিং করতে করতেই জানতে চায় ব্যাননিকে লীনার মনে থাকবে কিনা? লীনা জানায়, তুমি আমার সাথে ফেসবুকে আছ, মেইলে আছ, কেন মনে থাকবে না? আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে। ব্যাননি প্রশান্তির হাসি দেয়। ব্যাননি জিজ্ঞেস করে, উড ইউ এক্সেপ্ট এ রিকুয়েষ্ট! লীনা বলে, টেল উইদাউট এনি হেসিটেইট। ব্যাননি বলে, প্লিজ স্পেন্ড এ নাইট উইথ মি। উই উইল গসিপ, ওয়াচ মুভি, উড টেল মাই চাইল্ডহুড স্টোরিজ। প্লিজ ডোন্ট সে নো! ব্যননি লীনার হাত চেপে ধরে।
ফিরে এসে লীনা ঢাকা কলেজে জয়েন করেছে। এর মধ্যেই পদোন্নতি পরীক্ষা দিয়েছে। ফেরার দুই মাসের মাথায় লীনা একদিন মাথা ঘুরে পরে যেতে নেয়। ডাক্তার পরীক্ষা, নিরীক্ষা করে দেখে লীনা গর্ভবতী। খুব খুশি শাহেদ। লীনা একটু দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগছে। শাহেদ জিজ্ঞেস করেছে, কি সমস্যা? সাদি ইতিমধ্যেই স্কুলে যাচ্ছে। এখনই ঠিক সময়। তাছাড়া মা আছেন। তোমার কোন অসুবিধা হবে না।
সংসার, চাকরি, বাচ্চা সব সামলে ভালোই চলছে লীনার সংসার। লীনা এখন এসোসিয়েট প্রফেসর। ব্যাননির সাথে মেসেঞ্জার, ওয়াটসএপে কথা হয়।
ফিরে এসে প্রথমে সাদি একটু দূরে দূরে থাকলেও এখন আবার সারাক্ষণ মায়ের কোল ঘেষে থাকে। দেখতে দেখতে সময় চলে আসে বাচ্চা হওয়ার।
পুত্র সন্তান জন্ম দিয়েছে আবারও লীনা। নাঁক, ঠোঁট লীনার মতোই। গায়ের রঙ অনেক ফর্সা আর চোখগুলো চায়নাদের মতো ছোট। শাহেদ টিপ্পনী কেটে বলে, ইংল্যান্ডে তুমি কোন চায়নার প্রেমে পরেছিলে নাকি? সারাদিন তার চেহারা কল্পনা করেছ? লীনা নিঃশব্দে অভিমান দেখায়।
ছেলের নাম রাখে শিবলী। সাদি যেমন মায়ের কোল ঘেষা, শিবলী তেমনি বাবার কোল ঘেষা। লীনাই শিবলীকে সবসময় বাবার কাছে বেশি দিয়েছে।

লীনা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে বিশ্বাস কর, আমি ইচ্ছা করে কিছুই করিনি। যখন বুঝতে পারি, তখন তুমি কিছুতেই এবোরশন করতে রাজি হলে না

ব্যাননির ইউনিভার্সিটিতে পি. এইচ. ডি করতে এসেছে জাপানি মেয়ে হিমারি। হিমারি ব্যননিকে অনেক পছন্দ করে। ব্যাননি হিমারিকে বলেছে লীনার কথা। হিমারি বাংলাদেশে আসতে চায়। ব্যাননি, লীনাকে জানিয়েছে বাংলাদেশে আসার কথা। লীনা শাহেদের সঙ্গে কথা বলে, ব্যাননিকে আসতে বলেছে। লীনা, শাহেদ, ব্যাননি, হিমারি সবাই ঘুরে বেড়িয়েছে রাঙামাটি, কক্সবাজার, সিলেট। ব্যাননি খুব খুশি। যাবার সময় ব্যাননি শাহেদকে ফিলিপাইনে যাবার দাওয়াত দেয়। বিমানবন্দরে ব্যাননি শিবলীকে কোলে নিলে লীনা এক ঝটকায় শিবলীকে নিয়ে শাহেদের কোলে দিয়ে দেয়।
শিবলী আর সাদি দুজনের খুবই ভাব। দুই ভাই দুই ভাইকে ছাড়া কিছু খায় না। দিন শেষে দুজনে পুটুস পুটুস করে গল্প করে। দুজনে একই রকম ড্রেস পরে। যদিও ছয় বছরের গ্যাপ। কিন্তু সাদি শিবলীর সাথে বন্ধুর মতো আচরণ করে। লীনা আর শাহেদ এসব দেখে মিটিমিটি হাসে। সাদি এখন বুয়েটে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে আর শিবলী পড়ছে মতিঝিল আইডিয়াল এ অষ্টম শ্রেনিতে।
আজকাল প্রায়শই শিবলীর জ্বর থাকে। ইদানীং হাতপাও ফুলে ওঠে। শাহেদ আর লীনা খুব চিন্তিত হয়ে পরে। শাহেদ বলে ওকে নিয়ে ইন্ডিয়া চল।
ইন্ডিয়া গেলে ডাক্তার জানায় শিবলীর দুটি কিডনিই ড্যাম হয়ে গেছে। শাহেদ শিবলীকে কিডনি দিতে এক পায়ে দাঁড়া খাড়া। কিন্তু শাহেদের সবকিছু ম্যাচ করে না। ম্যাচ করে লীনার। লীনা কিডনি দেয় ছেলেকে। শাহেদ খুব আফসোস করে কেন ওর কিডনি ম্যাচ করল না!
হিমারি একদিন লীনার সাথে অনেকক্ষণ কথা বলে। হিমারি জানায় ব্যাননির ফুসফুস ক্যান্সার। স্টেজ ফোর। লীনার চোখ ফেটে অজান্তেই গড়িয়ে পরে নোনাজল। লীনা হিমারিকে সাহস যোগায়।
কিছুদিন পরেই লীনার বিশতম বিবাহ বার্ষিকী। লীনা শাহেদকে জানায় বিশতম বিবাহবার্ষিকী সে শাহেদের সাথে একা কক্সবাজারে কাটাতে চায়। শাহেদ “লং বীচ” হোটেলে সি ভিউ রুম নেয়।
লীনা আজ বিয়েতে দেয়া শাড়িটা পরেছে, সব গয়না পরেছে, বড় লাল টিপ পরেছে। শাহেদ চোখ ফেরাতে পারছে না লীনার থেকে। লীনা লাইট নিভিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে শাহেদের পাশে এসে বসে। লীনা শাহেদকে জিজ্ঞেস করে, শাহেদ তোমার কখনো মনে হয়েছে এই বিশ বছরে আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসি? শাহেদ বলে না। তুমি অন্যকাউকে ভালোবাসতে পারোই না। লীনা বলে, এটাই সত্যি। তুমি আদর, ভালোবাসা, সম্মান, যত্ন কোনটার অভাব রাখনি। আমি শুধু তোমাকেই ভালোবেসেছি সারাজীবন। আজ তোমাকে একটা কথা বলতে চাই, যা আমি গত ১৪ বছর ধরে বলতে চেয়েছি। শাহেদ লীনাকে বুকে চেপে ধরে বলে, বল।
লীনা বলে, আমি যখন ইংল্যান্ড থেকে ফিরি; ব্যাননি নিজেই আমার টিকিট করে দেয়। আমার সাথে শপিং করে। তারপর ও খুব রিকুয়েষ্ট করে আমি যেন ওর সাথে একটা নাইট স্পেন্ড করি। ও আমাকে ওর আশৈশব সবকিছুর গল্প করে, ওর কয়েন জমানোর হবি, ও সব কয়েন দেখায়, ওর বাবা মার সাথে ওর শৈশবের ছবি দেখায়,ওর ছেড়ে যাওয়া প্রেমিকার আর ওর অন্তরঙ্গ ছবি দেখায়। ও চোখে জল নিয়েই ভদকা খাচ্ছিল। হঠাৎ আমাকে হাসতে হাসতে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলে, তুমি জীবনেও ভদকা খেতে পারবে না। কখনো পারবে না। তারপর আমি ওর থেকে নিয়ে গিলে ফেলি অনেকটুকু। তারপর ও আরও খায়। ও কাঁদতে কাঁদতে ওর ছেড়ে যাওয়া প্রেমিকার নাম ধরে আমাকে ডাকে আর আমার কোলে শুয়ে পরে, বলে প্লিজ ডোন্ট লিভ মি। আই লাভ ইউ। ততক্ষণে আমিও শক্তি হারিয়েছি, হারিয়েছি অনেকখানি হুঁশ। পরেরদিন ও হাতজোড় করে আমার কাছে ক্ষমা চায়। বলে, আমি যেন কোনদিন কাউকে না বলি। আর তোমাকে যেন কোনদিনই না বলি!
শাহেদের চোখ থেকে টুপটাপ ঝরে পরছে শিশির। লীনা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে বিশ্বাস কর, আমি ইচ্ছা করে কিছুই করিনি। যখন বুঝতে পারি, তখন তুমি কিছুতেই এবোরশন করতে রাজি হলে না। তারপর তোমাদের কাউকে হারাতে চাইনি। শাহেদ বলে, এতদিন যখন জানালে না, বাকি জীবন কেন চেপে গেলে না! লীনা জানি না বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। শাহেদ জিজ্ঞেস করে, ব্যাননি কিছু জানে? লীনা বলে না!
ব্যাননির অবস্থা খুব খারাপ আই সি ইউ তে। হিমারি জানিয়েছে। লীনা শাহেদকে জানায় ব্যাননি হসপিটালে। শাহেদ যাবার ব্যবস্থা করে।
ফিলিপাইন যায় লীনা, শাহেদ আর শিবলী। ব্যাননি আই. সি.ইউ লাইফ সাপোর্ট এ। কিন্তু সেন্স পুরা আছে। প্রথমে লীনা যায়, যেয়ে দেখা করে আসে। তারপর শাহেদ শিবলীকে নিয়ে যায়। ব্যাননির কানে কানে বলে, শিবলী ইজ মাই ইয়ংগেষ্ট সান। বাট ইউ আর হিস প্রজিনেটর। হি ইজ ফ্লেশ অফ ইউর ফ্লেশ!
তখন শিবলী যেয়ে ব্যাননির হাতে হাত রাখে। অদূরে দাঁড়িয়ে আছে লীনা। তিন জোড়া চোখ থেকে ঝরে পরে শ্রাবণ!

আরো পড়তে পারেন

প্রতিদান

‘আমাকে আপনার মনে নেই। থাকার কথাও নয়। সে জন্য দোষও দেব না। এত ব্যস্ত মানুষ আপনি, আমার মত কত জনের সঙ্গেই হঠাৎ চেনা-জানা। কেনইবা মনে রাখবেন তাদের সবাইকে?’ বেশ শান্ত গলায় বললেন মিসেস অঙ্কিতা। টেবিল থেকে কি যেন একটা নিলেন তিনি। পিটপিট করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো সাফরাব। একটা ইনজেকশন, একটা ছোট টেস্টটিউবের মতো ভায়াল,….

লিলিথ

শাওয়ার বন্ধ করে দিতেই পানির হালকা ঝিরঝিরে শব্দটা বন্ধ হয়ে যায়। প্রযুক্তির কল্যাণে ঝরনার শব্দ আজকাল বাসাতেই শোনা যাচ্ছে। আর এ শব্দটা অদ্ভুত সুন্দর। কেমন যেন মোলায়েম। সাদা তুলতুলে মেঘের মতো। অনেক দূর থেকে ভেসে ভেসে এসে জড়িয়ে ধরে। চোখের পাতাগুলোয় ঠান্ডা আমেজ ছড়িয়ে ঘাড় বেয়ে নামতে থাকে। আরামে চোখ বুজে আসে আমার। রিলাক্স হতে….

বন্ধনবিলাস

এ শতকের ধূলিধূসরিত ঢাকায় দাঁড়িয়ে কল্পনা করাও কঠিন। গত শতকের ঢাকা ছিল রাজহাঁসের পালকের মতো পরিচ্ছন্ন ধবধবে। একতলা-দোতলার ছাদে শীতলপাটি বিছিয়ে রাতের আকাশের দিকে চাইলে দেখা যেত নক্ষত্রদের কনফারেন্স। মেঘহীন রাতগুলোতে খুব কাছের হয়ে যেত দূরছায়া নীহারিকার পথ। যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। অগণ্য তারার যে কোনো তারাকে। রাস্তার দু’ধারে জামরুল-জিউল আর বাবলার অন্ধকার ঢাকতে….

error: Content is protected !!