Author Picture

চুম্বুক, বিদ্যুৎ, এবং মাইকেল ফ্যারাডে

খন্দকার রেজাউল করিম

মাইকেল ফ্যারাডে (Michael Faraday, ১৭৯১-১৮৬৭): মুচির ছেলে আমি। যে বিদ্যুৎ ছাড়া তোমাদের এক দন্ড চলেনা তা আমিই আবিষ্কার করেছিলাম। সেই বিদ্যুৎ দিয়ে কেমন করে চাকা ঘোরানো যায়, কলকারখানা চালানো যায় তাও আমার আবিষ্কার। আইনস্টাইন বলেছিলেন যে বিজ্ঞানের জগতে আমি এক বিপ্লব সৃষ্টি করেছি, আমি নাকি শেক্সপিয়ার, নিউটন, এবং গ্যাটের (Goethe) সমতুল্য প্রতিভা। আমার শৈশব কেটেছে পুরোনো বই সেলাই করে। ইস্কুলের দরজা আমার জন্যে বন্ধ ছিল, তাই দিনে যে বই সেলাই করতাম, রাতে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে সেই বইগুলো পড়ে শেষ করতাম। অংক হলো পদার্থবিদদের ভাষা। সেই ভাষা আমার জানা ছিল না। দৃষ্টিহীন অন্ধ যেমন আর সব ইন্দ্রিয় দিয়ে বিশ্বকে খোঁজে, গণিতবিদ্যাহীন আমিও তেমনি পদার্থবিদ্যার সব রহস্যকে বুঝতে চেয়েছি কল্পনার পাখা মেলে।

লেখক : তোমাকে শ্রদ্ধা জানানোর মতো ভাষা আমার জানা নেই। জীবনের শুরুতে ব্রিটেনের “লর্ড, নাইট, স্যার, নোবলম্যান, এবং ভদ্রলোক” শ্রেণীর লোকদের হাতে তোমাকে অনেক অপমান সহ্য করতে হয়েছে। সে যুগের বিখ্যাত রসায়নবিদ স্যার হামফ্রে ডেভি তোমাকে একসময় তাঁর ল্যাবের কর্মকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। সে তোমারই যোগ্যতার কারণে, তোমাকে ছাড়া তাঁর ল্যাব অচল হয়ে থাকতো বলে। অথচ স্যার হামফ্রে’র বউ তোমাকে ঘরে ঢুকতে দিতো না। তোমাকে বাড়ির বাইরে চাকরদের সাথে খেতে হতো। তুমি হাসিমুখে ওদের সাথে এক থালায় ভাত খেয়েছো। যখন সে যুগের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেলে, তখন অর্থ, মান, স্বীকৃতি সব তোমার পিছু নিয়েছিল। সে সব ধূলিসম উপেক্ষা করে তুমি বিজ্ঞানের এক আবিষ্কার থেকে আরেক আবিষ্কারের পিছনে ছুটে গিয়েছো। প্রতি রাত্রে ঘুমানোর আগে ঈশ্বরের কাছে তোমার প্রার্থনা ছিল, “হে প্রভু, আমার আবিষ্কার যেন মানুষের কল্যানে লাগে।” ব্রিটিশ সেনাবাহিনী যখন তোমাকে যুদ্ধের অস্ত্র তৈরির কাজে নিযুক্ত করতে চেয়েছিলো তখন এমন কাজ মানবতাবিরোধী ঘোষণা দিয়ে তুমি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলে। তোমার মৃত্যুর পরে ওয়েস্ট মিনিস্টার এবিতে নিউটনের পাশে তোমার সমাধি দেয়ার প্রস্তাবটাও তুমি নাকচ করে দিয়েছিলে। কোনো পিরামিড, কোনো তাজমহল তোমার মরদেহকে সন্মান দেখানোর স্পর্ধা দেখায় নি। তুমি সাধারণ মানুষ হিসাবে বাস করেছো, সারাজীবন সাধারণ মানুষের পাশে ছিলে, মৃত্যুর পরেও তাদের পাশেই অন্তিম শয়ানে শুয়ে থাকতে চেয়েছো। তাইতো তুমি অসাধারণ।

ম্যাক্সওয়েল (James Clerk Maxwell, ১৮৩১-১৮৭৯): সবাই বলে আমি চুম্বুক, বিদ্যুৎ, এবং আলোকে অংকের একই সুতায় গেঁথে ফেলেছি। কিন্তু এই গৌরব মাইকেল ফ্যারাডের পাওনা। অংকের চেয়েও বড় হলো কল্পনা। আমার অংকের অনেক আগেই ফ্যারাডে কল্পনায় যে জগতে পৌঁছে গিয়েছিলেন সেখানে চুম্বুক, বিদ্যুৎ, এবং আলো একই জিনিস। পাহাড়ের খাঁজে খুঁজে পাওয়া পাথরের চুম্বুক, মেঘের কোলে বিদ্যুতের ঝলকানি, আকাশে সূর্যের আলো, একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এটা বুঝতে মানুষের কয়েক হাজার বছর লেগে গেল!

হিপোক্রেটিস (Hippocrates of Kos, খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০-৩৭০): আমাকে চিকিৎসাশাস্ত্রের পিতা বলে ডাকা হয়। কর্মক্ষেত্রে ঢোকার আগে ডাক্তাররা মানবকল্যাণের যে শপথ (Hippocratic Oath) নেয় তা আমিই চালু করেছিলাম। গ্রিসের ম্যাগ্নেসিয়া অঞ্চলে ম্যাগনেটাইট বলে একধরণের পাথর খুঁজে পাওয়া যেত যা লোহাকে আকর্ষণ করে। একটি দড়ি দিয়ে এমন একটি পাথরকে ঝুলিয়ে দিলে তা পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণ দিক বরাবর ঝুলে থাকে। দূর মহাসমুদ্রে দিক নির্ণয়ের জন্যে নাবিকরা এখন হালের কাছে এমন পাথর ঝুলিয়ে রাখে, ধ্রুবতারার দিকে তাকানোর আর প্রয়োজন নেই। এমন পাথরের রোগ নিরাময় করার ক্ষমতা থাকা অসম্ভব নয় ভেবে অনেক দুরারোগ্য রুগীকে পাথর-চূর্ণ খাইয়ে দেখেছি, বাতের রুগীর গায়ে পাথরের গুঁড়ার প্রলেপ লাগিয়েছি।

লেখক : এমন পাথরকে চুম্বুক (magnet) বলে। একটি লোহার দণ্ডের সাথে এমন পাথরের ঘসাঘসি করে চুম্বুক-দণ্ড (bar magnet) তৈরী করা যায়। খুব হালকা দণ্ডকে চুম্বুক বানিয়ে তৈরী হয় কম্পাস যা দিকনির্ণয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি চুম্বুক-দণ্ডের একদিকে থাকে উত্তর মেরু, আরেক দিকে থাকে দক্ষিণ মেরু। অনুরূপ মেরু পরস্পরকে বিকর্ষণ করে, বিপরীত মেরু পরস্পরকে আকর্ষণ করে। চুম্বুক-দন্ডটিকে দ্বিখণ্ডিত করলে প্রতিটি খন্ড চুম্বুকে পরিণত হয়। প্রতিটি খন্ডে আবার থাকে দুটি মেরু। এর যেন আর শেষ নেই! আজ পর্যন্ত একটি মেরুকে আলাদা করা যায় নি! তবে এমন “জোড়হীন” নিঃসঙ্গ মেরু (magnetic monopole) আছে কি নেই তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের বিতর্কের শেষ আজও হয় নি। কেউ যদি আজও এমন মেরুর সন্ধান পায় তবে পদার্থবিদ্যার নোবেল পুরস্কার কমিটির কানে খবরটি পৌঁছে দিতে হবে!

ওয়েরস্টেড (Hans Oersted, ১৭৭৭-১৮৫১): বিদ্যুৎ প্রবাহ চুম্বুক তৈরী করে। ধরো একটি তারের পাশে একটি চুম্বুকের দণ্ড রাখলে। এই তারের ভিতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহের সাথে সাথে চুম্বুক দন্ডটি নড়ে উঠবে। তাহলে ধরে নিতে হবে যে বিদ্যুতের প্রবাহ তারটিকে চুম্বুকে পরিণত করেছে, এবং চুম্বুকদুটি একে ওপরের উপরে বল প্রয়োগ করছে।

ফ্যারাডে: এই বলের দিক নিয়ে আমি একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করি। যদি তারের পাশে একটি কম্পাস রাখি তবে কম্পাসের কাঁটা সবসময় তারের সাথে লম্ব (perpendicular) হয়ে থাকে। যদি তারকে ঘিরে একটি বৃত্ত আঁকি তবে কম্পাসের কাঁটা এই বৃত্তের পরিধিকে স্পর্শ করে থাকবে এবং বৃত্তের কেন্দ্র থেকে স্পর্শ-বিন্দু পর্যন্ত টানা সরল লেখাটির সাথে লম্ব হয়ে থাকবে। সে যুগের কোনো বিজ্ঞানী এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেন নি। আমি কল্পনায় দেখতাম অদৃশ্য সব বলের রেখা তারটির চারদিকে চক্রাকারে ঘুরছে। এই অদৃশ্য রেখাগুলো চুম্বুক এবং বৈদ্যুতিক বলকে বহন করে নিয়ে যায়, এদের কারণেই দুটি চার্জ বা চুম্বুকের মধ্যে বলের সৃষ্টি হয়। এই অদৃশ্য রেখাগুলোকে আমি “ফিল্ড” নামে ডেকেছিলাম। আমার এই ধারণা নিউটনের “দূর থেকে ধাক্কা (action at a distance)” ধারণার বিপরীত। আমার মতে নিউটনের “দূর থেকে থাক্কা” কিছুই ব্যাখ্যা করে না! বৈদ্যুতিক চার্জের বেলায় এই রেখাগুলো সোজাসুজি ছুটতে চায়, চুম্বুকের ক্ষেত্রে এই রেখাগুলো তারকে জড়িয়ে থাকতে চায়। সে যুগে মহাবিজ্ঞানী নিউটনের তত্ত্বের বিরোধিতা করা সহজ ছিল না। তবুও আমার “অদৃশ্য রেখার” তত্ত্ব আমি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সেমিনারে প্রকাশ করি।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকের দল: হাসতে হাসতে পেট ব্যাথা হয়ে গেল। মুচির ছেলেকে ল্যাবে ঢুকতে দিলে এই দশাই হয়। অদৃশ্য সব বলের রেখা! সেগুলো আবার গোল হয়ে ঘুরছে! ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক, গণিতবিদ, পদার্থবিদ, মহাবিজ্ঞানী নিউটনের ভুল ধরতে এসেছে এক মুচির ছেলে, পুরানো-বই-বাঁধানো দোকানের দপ্তরী! কালে কালে কত কি যে দেখবো। গণিতবিদ্যাহীন এই মূর্খ ল্যাবে এসে ভুতের গল্প শোনাচ্ছে।

লেখক : ওই ভুতের গল্পের নাম কোয়ান্টাম ফিল্ড তত্ত্ব। মহাবিশ্বের সবখানে ওই ভুতেরা নেচেকুঁদে বেড়াচ্ছে। এমনকি পদার্থ-শক্তিহীন শূন্য স্থানেও ওরা দোল খায়। ওই নাচ থেকে কণা এবং প্রতিকণা ক্ষনিকের জন্যে সৃষ্টি হয়, আবার মিলিয়ে যায়। তবে শক্তির নাগাল পেলে ওরা ভুতের জগৎ ছেড়ে বাস্তব জগতে হানা দিতে পারে!

আরো পড়তে পারেন

একাত্তরের গণহত্যা প্রতিহত করা কি সম্ভব ছিল?

২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানি নরঘাতকেরা যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই এক রাতেই শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় তিন হাজার। এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা একতরফাভাবে….

ভাষা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা

আগের পর্বে পড়ুন— চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল) ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে দুই হাজার মাইল দূরত্বের….

চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল)

আগের পর্বে পড়ুন— বায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ একুশের আবেগ সংহত থাকে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেও। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান এক বিবৃতিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। আওয়ামি লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম কমিটির সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র….

error: Content is protected !!