Author Picture

আর্জেন্টিনা ১৯৮৬ বিশ্বকাপ স্কোয়াড ছিল দিয়েগো মারাদোনার চাইতেও বেশি কিছু

তানভীর হোসেন

যে লোকটির জন্যে ’৮৬-এর বিশ্বকাপ সবসময়ই স্মরিত হবে, তিনি দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। অবিসংবাদিতভাবে তিনিই ছিলেন সেই আসরের সেরা আর আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় দফা বিশ্বজয়ী হওয়ার তুরুপের তাস। সঙ্গত কারণেই আসর জুড়ে যাবতীয় শিরোনামের জন্মদাতা ছিলেন তিনিই। যদিও আর্জেন্টাইন দলে তার ভূমিকার এই আখ্যান কখনও কখনও অতিকথনও হয়ে থাকতে পারে।

‘সেইবার আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতেছিল— কিন্তু বাস্তবে মেক্সিকো সিটিতে জেতা সেই বিখ্যাত ট্রফিটার নেপথ্য কারিগর ছিলেন মারাদোনাই।’
দা সান, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

‘মারাদোনার কারিকুরিতে ভরপুর মাসটা দলীয় দক্ষতায় অনেক এগিয়ে থাকা বেশ কিছু দলের বদলে আর্জেন্টিনাকে শিরোপার কাছাকাছি টেনে আনে। কিন্তু খুদে মায়েস্ত্রোর যাদু আর জেতার অদম্য ইচ্ছাই তাদেরকে শেষ পর্যন্ত জয়ের মুকুট এনে দেয়।’
দা ডেইলি মিরর, ১৮ নভেম্বর, ২০১৫

‘১৯৮৬ বিশ্বকাপ: মারাদোনার একক প্রদর্শনী।’
স্পোর্টসনেট, ৮ জুন, ২০১৪

কেউ কেউ বলে বা ইঙ্গিত করে যে ’৮৬-এর আর্জেন্টাইন বিশ্বকাপ একাদশ ছিল ‘ওয়ান ম্যান টিম’। অনেকের মতে তিনি প্রায় একাই সেই টুর্নামেন্টটা জিতেছিলেন আর তার সতীর্থ খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপ জেতার জন্য যথেষ্ট ছিলেন না। গবেষণার অভাবে অন্যান্য খেলোয়াড় এবং কোচকে গোণায়ই ধরা হয়নি; কিছু বিভ্রান্তিকর মিথের পেছনে আছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা মারাদোনার সেই আজবগোল আর ৬ জন বেলজিয়ান ডিফেন্ডারের বিপক্ষের দৃশ্যটা যা আসলে ’৮২-এর ঘটনা; লোকে তাকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় প্রমাণ করতে এমন ভাব ধরে যে, তিনি একাই সেই টুর্নামেন্টটা জিতিয়েছিলেন। ফুটবল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি নিয়ে পেলের সাথে করা তার তুলনাগুলোও বহু শিরোনামের জন্ম দিয়েছে।
(Read: The Pele Myth)

শুরুতেই একথা বলে নেয়া ভাল যে, এই লেখাটা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের একজন হিসাবে মারাদোনার যে মর্যাদা তা খণ্ডনের উদ্দেশ্যে লেখা হয়নি। তার অসাধারণত্বকে খাটো করার কোন আকাংখা আমার নাই; বরং এই ম্যাচগুলোর পুরো ৯০ মিনিট দেখার পর আমি বুঝতে পেরেছি তিনি আসলে কত বড়মাপের খেলোয়াড় ছিলেন। প্রশ্নাতীতভাবে তিনিই ছিলেন দলের সেরা খেলোয়াড়; এই লেখাটির উদ্দেশ্য শুধু এটুকু দেখানো যে, সেই দলটিতে আরও কিছু গ্রেট খেলোয়াড় ছিলেন যাদের অবদান ভোলার মতো নয়।
দা ম্যানেজার: কার্লোস বিলার্দো

ইতিহাসে ড. বিলার্দোর নাম শুধু একজন গ্রেট ম্যানেজার হিসাবেই নয়, একটা গ্রেট চরিত্র হিসাবেও উচ্চারিত হওয়া উচিত। তাকে শুধু পারফেকসনিস্ট বললে কম বলা হবে। ফাইনালে ৩-২ ব্যবধানে জেতার পরও তিনি দলের ডিফেন্ডারদেরকে দুইটা সেটপিস থেকে গোল হজম করার জন্য ধুয়ে দিয়েছিলেন। সেন্টার ব্যাক হোসে লুইস ব্রাউনের ভাষ্যমতে বিশ্বকাপ জেতার এক ঘন্টা পার হতে না হতেই তিনি ’৯০-এর বিশ্বকাপ নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করে দিয়েছিলেন।

’৮৬-এর বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন দলের ম্যানেজার কার্লোস বিলার্দো ও মারাদোনার

তার দল নির্বাচন এবং ট্যাকটিকস জনপ্রিয় ছিল না, আর তিনি সেসবের ধারও ধারতেন না। যদি আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক দানিয়েল পাসারেল্লার বদলে মারাদোনাকে অধিনায়ক করার মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি তিনি না নিতেন তবে ’৮৬-এর গ্রীষ্মটা হয়তো এমন হতো না।

একটা বিষয় সবাই ভুলে গেছে যে, আজ মারাদোনার যে কিংবদন্তীতুল্য স্টেটাস তা ’৮৬ পূর্ববর্তী সময়ে ছিল না। ’৮২ বিশ্বকাপে মেজাজ হারিয়ে লাল কার্ড দেখার পর বার্সেলোনায় খুব পীড়াদায়ক দুইটি বছর কাটান তিনি। এরপর একে একে হেপাটাইটিস, বাজে রকমের ইনজুরি সমস্যার সাথে যোগ হয় মাঠের বিতর্ক যার যবনিকা ঘটেছিল অ্যথলেটিক বিলবাও এর বিপক্ষে ’৮৪-এর কোপা দেল রে’র ফাইনালে হওয়া মারামারি দিয়ে, সেদিন মারাদোনা বিপক্ষের একজন খেলোয়াড়ের গায়ে হাত তোলেন আর ফলশ্রুতিতে তাকে ১৯৮২-১৯৮৫ সময়টা আর্জেন্টাইন দলের বাইরে কাটাতে হয়।

সে সময়টিতেও বিলার্দো তার ভবিষ্যতের তারকাটিকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। কোচের দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিয়মিত ওভারসিজ খেলোয়াড়দের সাথে গিয়ে দেখা করতেন। তিনি খেলোয়াড়দের সাথে দেখা করে তাদেরকে ভিডিও টেপ দেখাতেন এমনকি খেলোয়াড় ধার করে তাদেরকে নিয়ে সেট পিস অনুশীলনও করাতেন আর জাতীয় দলের বাইরে থাকা মারাদোনার ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটতো না। এ কারণেই ম্যানেজার আর তার তুরুপের তাস মারাদোনার মধ্যে একটা বোঝাপড়া গড়ে উঠেছিল।

কিন্তু দিয়েগোর প্রতি এমন খেয়াল রাখার চাইতেও যে জিনিসটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছিল তা ছিল অধিনায়কত্ব দিয়ে তাকে ঘিরে একটা দল গঠন করার সিদ্ধান্ত। এই কারণেই মারাদোনা তার সবচে সেরা খেলাটা খেলতে পেরেছিলেন আর সেই শ্রমের ফল আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। মারাদোনাকে ছাড়া হয়তো আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জেতা হতো না কিন্তু ড. বিলার্দো না থাকলে মারাদোনাও তার নৈপুণ্যের সেই স্তরে পৌঁছাতে পারতেন না।
আর দলটা যে ওয়ান ম্যান টিম ছিল না এটা তার প্রথম উদাহরণ।

~স্কোয়াড~

ফাইনালে ওঠার পথে, পশ্চিম জার্মানির কোচ ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার লা সেলেসিওদের প্রায় নিখুঁত আর সুনির্দিষ্ট কোন দুর্বলতাহীন একটা দলের আখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি বাড়িয়ে বলেন নি। দলটা সারা মাঠজুড়ে খেলার (বুরুচাগা) এবং মারাদোনার সেরাটুকু বের করে আনার জন্য (ভালদানো) অত্যন্ত সুচারুরূপে গঠন করা হয়েছিল।

~ট্যাকটিকস~

খুদে ১০ নাম্বার ছাড়া বাকি আর্জেন্টাইন দল কড়া ট্যাকটিকাল নির্দেশনার অধীনে ছিল। ব্রাউনকে স্যুইপার আর হোসে লুইস কুসিউফো এবং অস্কার রুজেরিকে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসাবে রেখে বিলার্দো ৩-৫-২ ইয়োরোপীয় স্টাইল ব্যবহার করেছিলেন। মাঝমাঠের ৫ জন মিডফিল্ডারকে তৈরি করেছিলেন বিপক্ষকে চেপে ধরে রাখার মতো করে যেন মারাদোনা স্বাধীনতা নিয়ে খেলতে পারেন আর তার কারিকুরি দেখাতে পারেন। আর্জেন্টিনার জন্য এ ধরণের ট্যাকটিকাল মারপ্যাঁচ একেবারেই নতুন ব্যাপার ছিল। দলের নাম্বার ৭ জর্জ বুরুচাগা বলেছিলেন, ‘বিলার্দোর ফুটবলীয় দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে আমরা আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়রা অভ্যস্ত ছিলাম না— বিশেষ করে যেমন করে তিনি আমাদের জীবন যাপন করতে এবং ভাবতে বলতেন। কোচ হিসাবে সবার আগে তিনি ভাবতেন শূন্য নিয়ে, নিশ্চিত করতে চাইতেন যেন আপনার বিপক্ষে কোন গোল না হয়।’

১৯৮৬-র বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত নাম মারাদোনার

যে দল এইভাবে গড়ে তোলা সে দল কখনও ওয়ান ম্যান টিম হতে পারে না আর তেমন হলে সে দলের ভরাডুবি অবশ্যম্ভাবী। মারাদোনার কাছ থেকেই সিংহভাগ সুযোগ তৈরির প্রত্যাশা ছিল কিন্তু তার মানে এই নয় যে পুরো দলটাকে তার একারই বয়ে বেড়াতে হতো, এমনকি হাল জামানার ফুটবলেও অনেক দলকে বিলার্দোর আঁটোসাঁটো ট্যাকটিকসের এই নীল নকশা অনুসরণ করতে দেখা যায় যেখানে একজন প্লে-মেকার নিজের মতো করে পুরো দলের আক্রমণকে এক সুতায় গাঁথে।

(বাড়তি কথা: যেটা এবারে এবং গত কয়েকটি বিশ্বকাপে লিওনেল মেসিকে ব্যবহার করে কাজে লাগাতে পারতেন ভিন্ন ভিন্ন আর্জেন্টাইন কোচ)

~রক্ষণভাগ~

পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা মোট ৫ টি গোল খেয়েছিল— আর যার মধ্য সেট পিস থেকে খাওয়া ৩টি গোলের ২টি কেবল ফাইনালেই— এটা এমন এক ডিফেন্সিভ রেকর্ড যা অদ্যবধি বিশ্বকাপজয়ী প্রতিটি দল হয় করে দেখিয়েছে বা ছাড়িয়ে গেছে কিন্তু ডিফেন্সই ছিল এই দলের সবচেয়ে মনোলোভা ইউনিট। ডিফেন্সে মাত্র ৩জন থাকায় মনে হতে পারে যে তারা হয়তো ব্যাকে দুর্বল ছিল বিশেষ করে ওয়াইড প্লেয়ার রিকার্দো গিউস্তি যেখানে ডিফেন্সের চাইতে আক্রমণে যেতেই বেশি ভালবাসতেন।

(বাড়তি কথা: হালের মার্সেলো, লরেন্ত কোসিয়েলনির মতো যারা ডিফেন্ডার হয়েও মাঝেমধ্যেই আক্রমণে উঠে যান)

দুর্দান্ত পজিশনিং আর শক্ত সমর্থ গোলকিপার নেরি পম্পিদো যিনি কিনা সে বছরই রিভার প্লেটের হয়ে কোপা লিবার্তাদোরেস জিতেছিলেন আর সে সময় লাতিন আমেরিকার ঘরোয়া ফুটবল এখনকার চাইতে অনেক বেশি সমীহ জাগানো ব্যাপার ছিল। ডানে খেলা সেন্টার ব্যাক অস্কার রুজেরিও ’৮৬ তে রিভারেই ছিলেন যিনি আর্জেন্টিনার সর্বকালের সেরা ডিফেন্ডারদের একজন এবং জাতীয় দলের হয়ে শেষ পর্যন্ত ৯৭ টি ম্যাচ খেলার পাশাপাশি ’৮৬-এর বিশ্বকাপে সেরা আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের একজন হিসাবে বিবেচিত হন। আরেকদিকে খেলা হোসে লুইস কুসিউফো— ছিলেন একজন বুদ্ধিদীপ্ত ডিফেন্ডার যিনি প্রায়শই আক্রমণের সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টা চালাতেন।

ফাইনালের প্রথম গোলদাতা হোসে লুইস ব্রাউন যিনি শেষ মিনিট পর্যন্ত কাঁধে বাজে রকমের আঘাত নিয়ে খেলা চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি ছিলেন দলটির মূল চালিকাশক্তির একজন। শুধুমাত্র পাসারেল্লার ইনজুরির সুবাদে সুযোগ পেয়ে প্রতিটি ম্যাচেই তিনি দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়েছিলেন এবং ফাইনালের আগ পর্যন্ত ৬ ম্যাচে মাত্র ৩ গোল খাওয়ার কৃতিত্বের মূল দাবীদার তিনিই। দুর্দান্ত ফুটবল মস্তিষ্কের অধিকারী ছিলেন তিনি যা তার খেলোয়াড়ি জীবন থেকে অবসর নেয়ার পরের সফল কোচিং ক্যারিয়ার দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু নির্ভীক মনোভাবই ছিল স্যুইপার হিসাবে তার সাফল্যের মূলমন্ত্র।

হুলিও ওলার্তিকোচিয়া মূলত মাঝমাঠের পঞ্চপাণ্ডবের সর্ব বামজন হলেও তাকে উইং ব্যাক হিসাবে অপরদিকের আক্রমণাত্মক মানসিকতার গিউস্তির সাথে কাজে লাগানো হতো। টুর্নামেন্টের ফাইনালে শুরু থেকেই সুযোগ পেয়ে নিজের পাশে প্রতিপক্ষের খেলা নস্যাৎ করার মাধ্যমে অসামান্য অবদান রাখা ইনিই ছিলেন সম্ভবত দলটির সবচে কম বিখ্যাতজন।

~অন্যান্য তুরুপের তাসেরা~

মারাদোনা পরে দলের সবচে বিখ্যাত খেলোয়াড় ছিলেন সম্ভবত দুই জর্জ: বুরুচাগা আর ভালদানো। ভালদানো, ১৯৮৫-৮৬ তে লা লিগার বর্ষসেরা বিদেশি খেলোয়াড়ের মর্যাদা লাভ করেন, রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে মাত্র কিছুদিন আগেই লা লিগা ও উয়েফা কাপ জেতা খেলোয়াড়টি তখন নিজের সক্ষমতার শিখরে ছিলেন। আর্জেন্টিনার হয়ে করা তার ৭ গোলের ৪টিই ’৮৬-এর বিশ্বকাপে আর সেগুলোর ১টা আবার ফাইনালে।

ফাইনালে জয়সূচক গোলটি করা বুরুচাগাও সে সময় ইয়োরোপে ফ্রেঞ্চ ক্লাব নঁতস’এ খেলতেন। মাঠের প্রতিটি জায়গায় তিনি ছিলেন একজন মূল খেলোয়াড়। অসাধারণ অলরাউন্ড দক্ষতার সাথে সাথে চোখে পড়ার মতো খেটে খেলা এই ফুটবলারটির আক্রমণের সূচনা করার সামর্থ্যও ছিল। মারাদোনার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও মারাদোনার চেয়ে কম উচ্চারিত হয় তার নাম।

বহুল আলোচিত এবং সমালোচিত হাত দিয়ে করা সেই গোল।

~মাঝমাঠের অনুচ্চারিত নায়কেরা~

আর্জেন্টিনার মাঝমাঠে যদি রিকার্দো গিউস্তি, সার্জিও বাতিস্তা এবং হেক্টর এনরিকের চেয়ে দুর্বল খেলোয়াড় থাকতো তবে তাদের ফাইনালে ওঠার পথ এতো মসৃণ হত না আর এদের ছাড়া ফাইনালের গল্পটাও অন্যরকম হতে পারতো। ডানপাশে প্রতিপক্ষকে ব্যতিব্যস্ত রেখে গিউস্তি তার সতীর্থদের জন্য জায়গা বানিয়ে দিতেন, বাতিস্তা পুরো ৯০ মিনিট জুড়েই প্রতিপক্ষকে চাপের মুখে রাখতে পারতেন, এনরিকে লোথার ম্যাথিউসের কড়া নজরে থাকা মারাদোনার সাথে মিলে আক্রমণ শানানোর ক্ষেত্রে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

এই দলটি কোনক্রমেই কোন একজন খেলোয়াড়ের প্রদর্শনীর উপর নির্ভরশীল ছিল না। যদিও আদতেই তাদের একজন অবিসংবাদিতভাবে সেরা খেলোয়াড় ছিলেন কিন্তু তুরুপের তাস ছিলেন কয়েকজনই। বুরুচাগা, ভালদানো এমনকি ব্রাউন, রুজেরি, বাতিস্তার মতো খেলোয়াড়দের উপরেও যে কোন সময় যে কোন মুহূর্তের প্রয়োজনে ভরসা করা যেত।

~ট্যাকটিকস~

মারাদোনার বিস্ময়কর ৫ গোল এবং ৫ অ্যাসিস্ট প্রমাণ করে যে তার দলের করা মোট ১৪ টি গোলের ১০টিতেই তার সরাসরি অবদান ছিল। যদিও এই পরিসংখ্যান প্রতিটি ম্যাচে মাঠে তার বাদবাকি ১০ সতীর্থের বিশাল অবদানের চাইতে তার অবদানকে বড় করে দেখায়। বলতে গেলে মাঠ দখলে রাখা, রক্ষণ সামলানো, পাস করা বা স্রেফ গোল করার পথটা তৈরি করা এসব যাবতীয় কাজগুলো মানে ডার্টি ওয়ার্কগুলো তারাই করতেন।

ফুটবল এবং কেবলমাত্র ফুটবলই একমাত্র পরিসংখ্যান আর তা গোল বা অ্যসিস্টের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সার্বিক খেলাটা হল সবচে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আর যেখানে মারাদোনা বিশাল অবদান রাখলেও তা সব সময়ই ছিল দলীয় প্রচেষ্টা আবার এটা এও প্রমাণ করে যে দলটি যতোটা না তাদের ১০ নাম্বারের খেলোয়াড়টির উপর নির্ভর করতো তারচে বেশি তার প্রচেষ্টাগুলোর সহায়ক হিসাবে কাজ করতো। সার্বিক খেলা একজন খেলোয়াড়ের সকল সামর্থ্যকে আমলে নেয় যা রক্ষণাত্মক পারফর্মেন্স থেকে দলীয় গোল পার্থক্য বাড়ানো পর্যন্ত সব কিছু আমলে নেয়। একটা প্রকৃত সত্য হল, মারাদোনার সার্বিক গোল ইমপ্যাক্ট তালিকায় নীচে থাকা প্রমাণ করে যে, ’৮৬-এর আর্জেন্টাইন বিশ্বকাপ দল তার উপর এতোটা নির্ভরশীল ছিল না যতোটা এর আগের দলগুলো ছিল।

~ম্যাচগুলো~

আর্জেন্টিনার ’৮৬-এর বিশ্বকাপ জয়ের পেছেনে দলীয় পারফর্মেন্স এর সবচে বড় প্রমাণ পরিসংখ্যান নয় বরং ম্যাচগুলো। অবশ্যই, ইংল্যান্ড আর বেলজিয়াম ম্যাচ ছিল মারাদোনাময় কিন্তু তা সম্ভব হয়েছিল শুধুমাত্র দলীয় ও ম্যানেজারিয়াল প্রচেষ্টার জন্যে যে কারণে তিনি সুযোগ, গোল আর ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন।

এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে বিচার করতে ম্যাচগুলো সবচে গুরুত্বপূর্ণ আর সৌভাগ্যজনকভাবে ফাইনাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ’৮৬ ক্যাম্পেইনের প্রায় পুরো ফুটেজই পাওয়া যায়। সেই ফাইনাল যা তাদের দলীয় প্রচেষ্টার সবচে ভাল প্রমাণ।

ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির গেমপ্ল্যান ছিল সোজাসাপ্টা: যে কোন মূল্যে মারাদোনাকে আটকাও। মারাদোনাকে ম্যান মার্কিংয়ের দায়িত্ব ছিল লোথার ম্যাথাউসের উপর যা তিনি ম্যাচজুড়ে দুর্দান্তভাবে করেওছিলেন। ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির মারাদোনার জন্য কিছু করা আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল এই কারণে যে, তার পায়ে বল এলেই ম্যাথাউসের সাথে কেউ না কেউ এসে জোট বাধছিল ফলে বলের দখল রাখতে তাকে আসলে দুইজনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছিলো।

আর এই জায়গাতেই আর্জেন্টিনা একটা দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। অবিশ্বাস্যভাবে মারাদোনা ম্যাচটিতে নিজের ছাপ রাখার একটা উপায় বের করেছিলেন। হাতেগোণা কয়েকটা ফাঁকা মুহূর্তের একটাতে যেখানে তিনি সামনে একটু জায়গা পেয়েছিলেন সেটাতেই তিনি তার দুর্দান্ত ফার্স্ট টাইম পাসে বুরুচাগাকে বল দেন ফলে আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায়। যদিও, এটা ছিল একটা দলীয় ফাইনাল, ব্যক্তিগত নয়।

৯০ মিনিট জুড়েই আর্জেন্টিনা পশ্চিম জার্মানির চেয়ে অনেক শ্রেয়তর দল ছিল। মূলত, দুইটা সেট পিস ছাড়া যা ছিল পুরো ম্যাচে পাওয়া তাদের সবচে ভাল সুযোগ বেকেনবাওয়ারের দলটির ২-২ সমতায় আসার মতো কোন অবস্থাই ছিল না। আর রক্ষণের এই জোড়া ভুল না হলে (যা বিলার্দোকে খুবই রাগিয়ে দিয়েছিল) মারাদোনার সেই যাদুকরী মুহূর্তেরও প্রয়োজন হতো না। এমনকি জার্মানির এই দুই গোলের আগেই আর্জেন্টিনা অনেকগুলো সুযোগ পেয়েছিল ৩-০ বা তারচেও বেশি ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার।

এমন প্রভাবশালী পারফর্মেন্সের জন্য দলের প্রতিটি সদস্যের নিজ নিজ দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করাটা ধন্যবাদ পাওয়ার দাবী রাখে। রক্ষণভাগ বিপক্ষের খেলোয়াড়দেরকে গোলের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দিচ্ছিলো না, মাঝমাঠ প্রতিপক্ষের খেলাকে দুমড়ে মুচড়ে মাঠের মধ্যভাগকে নিজেদের সম্পত্তি বানিয়ে ছেড়েছিল এবং অসংখ্য আক্রমণ করছিল। ভালদানো দ্বিতীয় গোলটি করার সুযোগটিকে চমতকারভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন; গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একটু ফাঁকা পাওয়া জায়গাটিকে কাজে লাগিয়ে মারাদোনা তার যাদুকরী মুহূর্তটির জন্ম দিয়েছিলেন। সেটপিস থেকে জার্মানি গোল দুটি না পেলে এটা হতো বিগম্যাচ পারফর্মেন্সগুলোর মধ্যে সবচে নিখুঁত।

~শেষকথা~

ফুটবলে ওয়ান ম্যান টিম পাওয়া অসম্ভবের কাছাকাছি একটা ব্যাপার, আর যখন কোন দল প্রকৃতপক্ষেই একজন বা দুইজন খেলোয়াড়ের কাঁধে চেপে কিছু অর্জন করতে চায় তার ফলাফল ভাল হয় না। যদি আর্জেন্টিনা মারাদোনাকে ঘিরে একটা দল গড়ে না তুলে শুধু তার উপর নির্ভর করতো তাহলে ’৮৬-এর বিশ্বকাপ জয় দূরে থাক বেশিদূর এগোনোও দুরূহ হতো।

আর্জেন্টিনা ১৯৮৬ বিশ্বকাপ স্কোয়াডকে তাদের ট্যাকটিকস ও গঠনের জন্য ফুটবলীয় উদাহরণ হিসাবে মনে রাখা উচিত।

মারাদোনার সুবিখ্যাত নৈপুণ্যও তার নিজের মহিমায় অমর হয়ে থাকবে তবে কেউ যদি বলে তিনি একাই তার দেশকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন তাহলে বাকি খেলোয়াড় এবং ম্যানেজারকে অসম্মান করা হবে যাদের কারণে তিনি সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তগুলোর জন্ম দিতে পেরেছিলেন।

 

সুত্র: https://lwosports.com

আরো পড়তে পারেন

একাত্তরের গণহত্যা প্রতিহত করা কি সম্ভব ছিল?

২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানি নরঘাতকেরা যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই এক রাতেই শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় তিন হাজার। এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা একতরফাভাবে….

ভাষা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা

আগের পর্বে পড়ুন— চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল) ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে দুই হাজার মাইল দূরত্বের….

চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল)

আগের পর্বে পড়ুন— বায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ একুশের আবেগ সংহত থাকে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেও। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান এক বিবৃতিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। আওয়ামি লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম কমিটির সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র….

error: Content is protected !!