Author Picture

লিঙ্গনাশা

জাহেদ সরওয়ার

তামান্নার বাবা নাই। সে সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফেরে নাই। এই গ্রামে এইরকম অনেক মানুষ আছে। আবার সমুদ্রে না গিয়াও তাদের কোনো উপায় নাই। তারা জানেই এই একটা কাজ, মাছধরা। বঙ্গোপসাগরের পাশেই ঘটিভাঙ্গায় তামান্নাদের বাড়ি। তার ছোট দুইভাই। ছেলে মেয়ে তিনজনকে নিয়ে দুশ্চিন্তার সমুদ্রে ডুবে যায় তামান্নার মা কালাখাতুন। দিন চলমান, সে কারো জন্য বসে থাকে না। তামান্নার বাবা যে বছর মারা যায় সে বছর তামান্না মাধ্যমিক স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ত। আজ প্রায় তিনবছর হয়ে গেল। তামান্না এখন দশম শ্রেণির ছাত্রী। কালাখাতুন ভেবেছিল বড়টা ছেলে হলে লেখাপড়া বন্ধ করে কারো বোটে মাছ ধরতে পাঠিয়ে দিত। কিন্তু তামান্না মেয়ে হওয়ায় সে তো আর ইনকাম করতে পারবে না। তাই বাধ্য হয়ে সে পড়তে থাকে। পড়ার খরচের জন্য এদিক ওদিক হাত পাততেই হয়। গত দুইবছর ধরে তামান্না তাদের মাধ্যমিক স্কুলের কাছেই তার মামার বাড়িতে থাকে। মামাও মাছের ব্যবসা করে। কোন প্রকারে দিন চলে যায়। তামান্না রান্নাবান্নায় মামীকে সাহায্য করে। আর ছোট বাচ্চাটাকে দেখাশোনাও করে। তামান্না ক্লাস এইটের সময় এসেছিল মামা বাড়ি, এখন সে ক্লাসটেনে। তার মধ্যে একটা গভীর বেদনাবোধ কাজ করে। বাবাকে হারিয়ে সে মেয়ে হিসাবে সংসারের কোনো রকম কাজেই আসতে পারছে না। নিদেনপক্ষে সে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। এখন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদেরও বেতন বেশি আবার পেনশনের ব্যাপারও আছে ,আবার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা মেয়েকে যে কেউ বিয়ে করতে চায়। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকারা বেশিরভাগ প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদেরকেই বিয়ে করে। সে পড়ালেখার প্রতি মনোযোগী।

ক্লাস টেনে ওটার পরই সমস্যাটা দেখা দিতে থাকে। স্থানীয় মেম্বারের ছোট ছেলে খালেদ যে এখন ক্ষমতাসীন পার্টির ওয়ার্ড সভাপতি, তার চোখ পড়ে তামান্নার ওপর। এখন ছেলেদের চোখ পড়তে মেয়েদের উর্বর হতে হয় না। কারণ দেশে জনসংখ্যা বেশি, অধিকাংশ যুবকই বেকার। সারাদিন দলে দলে ছেলেপিলে গুলো গ্রামের রাস্তায় পিলপিল করে। মেয়ে দেখলেই সিটি বাজায়। তাদের হাতে এখন মোবাইল। মোবাইলে ইন্টারনেট। ইন্টারনেটে পর্ণ ছবি। ফলে নয় দশ বছরের মেয়ে থেকে শুরু করে চল্লিশ পঞ্চাশ বছরের মেয়েরাও তাদের আগ্রহের আওতায়। বাংলা, হিন্দি, তামিল, তেলেগু সিনেমায় ঠাসা পাড়ার কম্পিউটারের দোকান। সব সিনেমাতেই মেয়েদের পিছনে লম্পট ছেলেদের পাল। ভালবাসা আর ভালবাসা। গান আর গান। ভিলেনের ধর্ষণ আর ধর্ষণ। নায়ক যে কখন ধর্ষক হয়ে যাচ্ছে আর ধর্ষক যে কখন নায়ক হয়ে যাচ্ছে তার ইচারবিচার নাই।

প্রথমদিকে নিরুপায়ের মত চিৎকার করত তামান্না। তখন তার মুখ আর চোখ বেঁধে ফেলা হয়। তার স্বপ্নগুলো ক্রমশ ভাঙ্গতে থাকে। মানবজন্ম সম্পর্কে তার ধারণা নোংরা হতে থাকে। পুরুষ সম্পর্কে তার ঘৃণা, ক্ষমতা সম্পর্কে তার ঘৃণা জন্মাতে থাকে। সর্বক্ষণ খালেদ নোংরা গালাগালি করতে থাকে। সারাক্ষণ ছোরা আর বন্দুক হাতে ভয় দেখায়। খালেদ বলে তোর কান্না এখানে আর কেউ শুনতে পাবে না।

তামান্নাকে কেউ খেয়াল না করলেই সে খুশি। কিন্তু খালেদ প্রতিদিন আটটায় স্কুলে যাবার পথে নিয়ম করে পাড়ার দোকানের সামনে দাঁড়াচ্ছে। তামান্না কাছে গেলেই গলাখাকারি দেয়, কাশি দেয়, কফ ফেলার ভান করে। তামান্না জানে তাকে গিলে খাচ্ছে খালেদের চোখ। সে কখনোই ফিরে তাকায় না। খালেদের বাবা ভিলেজ পলিটিশিয়ান ছিল, রমিজ মেম্বার। দীর্ঘদিন ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ছিল। তার মৃত্যুর পর তার খালেদের মা জোহরাই এখন পরিষদের মেম্বার। আটদশভাই খালেদরা। পাড়ায় কিছু হলেই রামদা নিয়ে সবাই হাজির হয়। পাড়ার সবাই ভয় পায় তাদের। একেক ভাই একেক রাজনীতি করে। এই তাদের পেশা। খালেদ সিক্সসেভেন পর্যন্ত পড়েছিল। এরপর থেকেই সে ছাত্রসংগঠনের সাথ যুক্ত। আরেক ভাই ছাত্র শিবির করে। আরেকভাই ছাত্রদল করে। বাকীগুলো কেউ আওয়ামীলীগ কেউ জামাত কেউ বিএনপি করে।

খালেদের উদ্দেশ্য তামান্নার সাথে প্রেম করা নয় বা তামান্নাকে বিয়ে করা নয়। তামান্না গরীব ও অনাথ, ফলে তামান্নার মত মেয়েকে ভোগ করা খুব সহজ। এই থেকেই সে তামান্নার পিছু নিয়েছে। খালেদের বড় তিনচার ভাই এখনো অবিবাহিত। সেটা তামান্নাও বুঝতে পেরেছে। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় খালেদকে দেখলেই তামান্নার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। দিনের পর দিন বিষয়টা জটিল হয়ে যাচ্ছে তামান্না বুঝতে পারে। একেকদিন খালেদ একেক ডায়লগ দেয়। একদিন ছোট একটা ইটের কংকর ছুড়ে মারে তামান্নার পশ্চাদদেশ লক্ষ্য করে। সেদিন তামান্না লেখাপড়ায় মন বসাতে পারে না। তার মুখে খাবার ওঠে না। তামান্না ভেবেছিল আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু এখন সব জটিল হয়ে যাচ্ছে। স্কুলের কয়েকজন মেয়ে জানে ব্যাপারটা। ওরা ভয়ে তামান্নাকে এড়িয়ে চলে।

তামান্না তার মামিকে বলে বিষয়টা। মামি তার মামা ইসহাককে বলে। ইসহাক বিপদের গন্ধ পায়। তার মনে হয় মেয়ে মানেই সমস্যা। তাকে নিয়ে একটা না একটা সমস্যা হবেই। এইজন্য জাহেলিয়াত যুগে মেয়ে শিশুদের জ্যান্ত কবর দিত। জন্মের পর পরই মেয়েশিশুদের কবর দিলে ভবিষ্যতে অভিভাবকদের আর এই ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় না। মেয়ে যত বড় হতে থাকবে সমস্যা তত বাড়তে থাকবে। তার মনে মনে খুব খারাপ লাগে। পিতৃহারা ভাগিনি তার বাসায় থেকে লেখাপড়া করে। খালেদের বিরুদ্ধে তার বলার মত কিছু নাই। ছেলেটা খুবই দুর্ধর্ষ। সে উল্টো তাকেই অপমান করবে। সেও দেখা যাক কি হয় টাইপের ভাব করে।
তামান্নার ইচ্ছে করে মায়ের কাছে চলে যেতে। কিন্তু ওখানে কোনো স্কুল নাই। তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে। তার বিয়ে হয়ে যাবে। তার শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন পূর্ণ হবে না। সে তার পরিবারের কোনো কাজেই লাগতে পারবে না। তাই সে মায়ের কাছে যায় না। তার প্রধান শিক্ষককে বলতে ইচ্ছে হয় কিন্তু প্রধান শিক্ষকের চাহনিটা তার ঠিক ভাল লাগে না। সে ভেবে কোনো কুল কিনারা পায় না। তার মামা ইসহাকই একদিন প্রধান শিক্ষককে বলে বিষয়টা। প্রধান শিক্ষক একটা অদ্ভুত কথা বলেন। তিনি বলেন, স্কুলের সীমানার ভেতর হলে তিনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন। এর বাইরে তার কোনো ক্ষমতা নাই।

এদিকে খালেদের অশালীন অঙ্গভঙ্গি, টিটকারি, ডায়লগ, পশ্চাদদেশ লক্ষ্য করে কংকর নিক্ষেপ, আর দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তাব চলতেই থাকে। ইসহাক সুযোগ পেয়ে খালেদের মা জোহরা মেম্বারকে একদিন বলে বিষয়টা। জোহরা মেম্বার ক্ষেপে যান। তিনি বলেন তার ছেলে সম্পর্কে এই ধরনের বাজে কথা যেন সে না রটায়। সে ওয়ার্ড সভাপতি। খালেদ আবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানেরও ফাইফরমাশ খাটে। যদি সেরকম কিছু হয় তাহলে সেটা তিনি দেখবেন বলে কথা দেন ইসহাককে জোহরা মেম্বার। খালেদকে দুএকদিন দেখা যায় না। তামান্নার মনে হয় সে এ যাত্রায় মনে হয় বেঁচে গেল। কিন্তু তৃতীয় দিন সে রণমূর্তি ধারণ করে। তামান্নার পথ আগলে ধরে। ইসহাক তার মাকে বিচার দেয়ায় সে ক্ষেপে যায়। সে চিৎকার করে বলতে থাকে, তোর মত রান্ডিকে আমি রাস্তায় চুদলেও কেউ কিছু বলতে আসবে না আমাকে, কত বড় সাহস আমার নামে বিচার দিস। আমি যে তোর সাথে প্রেম করতে চাই সেটা তোর চৌদ্দগোষ্ঠীর ভাগ্য। তামান্না নীরবে কাঁদে। চুপচাপ চলে যায়। পরদিন ইসহাককেও রামদা নিয়ে মারতে যায় খালেদ।

আজ প্রায় দুইতিন দিন হয়ে গেল তামান্না অপহৃত। তামান্নার মা আসে তার ভাইয়ের বাড়ি। সবাই মিলে যায় মহিলা মেম্বারের বাড়ি। বাড়িতে মহিলা মেম্বারের ছেলেরা হাজির। খালেদও আছে। উল্টো তারাই লজ্জা পায়। ওখানে সবাই বলে তামান্না কারো সাথে পালিয়ে গেছে। এরাইতো থানা আর চেয়ারম্যানকে নিয়ন্ত্রণ করে। ওরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আল্লাকে বিচার দেয়।

বিষয়টা এলাকায় জানাজানি হয়ে যায়। তামান্নার মা আসে মামা বাড়ি। মামা ইসহাকের সাথে পরামর্শ করে যে তামান্না বড় হয়ে গেছে তাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু গরীব ঘরের মেয়ে। ভাল পাত্রতো আসবে না। কালাখাতুন একটা প্রস্তাবের কথা বলে ছেলেটা একটা বোটের মাঝি। কিন্তু তামান্না কাঁদতে থাকে। কারণ সে দেখতে পায় একজন মাঝিকে বিয়ে করলে তার জীবনের কি হাল হবে। তার মায়ের জীবনেরই পুনরাবৃত্তি করবে সে। সে ক্লাস টেন পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। আর একবছর পরই সে কলেজে যাবে। কলেজ পাশ করেই সে চাকরির জন্য আবেদন করতে পারবে। তার স্বপ্ন ছুঁতে আর বেশিদিনতো নাই। এভাবেই অমিমাংসিতভাবে চলতে থাকে। তামান্না মাঝে মাঝে নিজেকে খুবই অসহায় ভাবে। তার সমস্যার কথা শোনার জন্য কোনো মানুষ নাই দুনিয়ায়। সে নামাজ আর কোরান পড়ে শুধু আল্লার কাছে মোনাজাত করে। আল্লা আমাকে এই সমস্যা থেকে বাঁচাও। একটা বজ্রপাত দিয়ে খালেদকে নিশ্চিহ্ন করে দাও। কিন্তু খোদা তার কথা শুনে কিনা সে জানে না। খালেদ বহাল তবিয়তেই থাকে। বিপদে পড়লে মানুষ অনেক কিছুই ভাবে, সে একবার ভাবে চেয়ারম্যানের কাছে যাবে। কিন্তু চেয়ারম্যানের সাথে খালেদের পরিবারের ঘনিষ্ট সম্পর্কের কথা সবাই জানে। তামান্নার মত একটা চুনোপুটির পক্ষে কেউ থাকবে না। তামান্না নিদেনপক্ষে স্কুলে যাবার সময় একটা ছুরি নিতে চায় ব্যাগে কিন্তু মামির রান্না ঘরের ছু্িরটা বেশি বড়। এভাবেই দুশ্চিন্তায় ক্ষয়ে ক্ষয়ে তামান্না স্কুলে যাওয়া আসা করে। শুকিয়ে যায়, খিটখিটে হয়ে যায়। নারীজন্মে তার ঘৃণা হয়। তার পেটে কোনো মেয়ের জন্ম না দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে।

আবার ভাবে দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী। বিরোধী দলীয় নেত্রীরাও নারী। খালেদের মাও নারী। তবু দেশে নারীদের কেন এত দুর্ভোগ। খালেদ ও খালেদের ভাইয়েরা এই নারীদেরই প্রতিনিধি। এই নারীদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তারা রাতদিন শ্রম দিচ্ছে। দিবসে দিবসে সেজেগুজে ভাড়াকরা লোকজন নিয়ে তারা সদরে ব্যানার টাঙিয়ে মিছিল করে ক্ষমতার জানান দিচ্ছে নিয়ত। চেয়ারম্যানের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে খুন করতে হলেও এরাই করছে। ফলে চেয়ারম্যান এদের বিরুদ্ধে কোন অ্যাকশনই নিতে পারে না। তামান্নার মত হাজার হাজার ভাসমান কিশোরী তরুণীর কোনো মূল্য কি আদৌ আছে সমাজের কাছে? সে ভেবে কূলকিনারা পায় না।
স্কুলে গরমের ছুটি হয়ে যায় বেশ কয়েকদিন। ছুটির পরের দিনই তামান্না চিন্তা করে সে মায়ের কাছে চলে যাবে। ছুটি পর্যন্ত মায়ের বাড়িতে গিয়ে থাকবে। পরেরদিন বিকালে সে একটা টমটমে ওঠে। টমটমটা তাজিয়াকাটা বেড়িবাধের মাঝামাঝি নির্জন জায়গায় আসতেই দুটো মটরসাইকেল টমটমের গতিরোধ করে। খুব দ্রুত খালেদ মটর সাইকেল থেকে নেমে হাত ধরে তামান্নাকে গালাগালি করতে করতে টেনে হিঁচড়ে টমটম থেকে বের করে মটর সাইকেলে তুলে নেয়। তামান্নার কান্না, ব্যাগের ছিটকে পড়া, হাত ছিলে যাওয়া সবই নিথর হয়ে যায়। মটর সাইকেল চালাচ্ছিল একজন। মাঝখানে তামান্নাকে বসিয়ে ঝাপটে ধরে পিছনে বসে খালেদ, তারপর হুংকার দেয় চালা গাড়ি। দেখি কোন শালায় বাঁচায় চোদানিরে। মটর সাইকেল দুটি ধুলো উড়িয়ে হাওয়া হয়ে যায়।

আজ প্রায় দুইতিন দিন হয়ে গেল তামান্না অপহৃত। তামান্নার মা আসে তার ভাইয়ের বাড়ি। সবাই মিলে যায় মহিলা মেম্বারের বাড়ি। বাড়িতে মহিলা মেম্বারের ছেলেরা হাজির। খালেদও আছে। উল্টো তারাই লজ্জা পায়। ওখানে সবাই বলে তামান্না কারো সাথে পালিয়ে গেছে। এরাইতো থানা আর চেয়ারম্যানকে নিয়ন্ত্রণ করে। ওরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আল্লাকে বিচার দেয়।

মটর সাইকেলে তুলে নেয়ার পর তামান্না প্রায় অচেতন হয়ে পড়েছিল। মনে হচ্ছিল তার মৃত্যু হয়েছে। ভয়ে, ক্ষোভে, অপমানে, শক্তিহীনতার একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সন্ধ্যা পর্যন্ত তাকে একটা চিংড়িঘেরের বাসায় বন্দি করে রাখে খালেদ। রাত হতেই সাঙ্গপাঙ্গদের সহায়তায় তাকে একটা নৌকায় তোলা হয়। এই নৌকা নিয়ে কিছুদূর গিয়ে আবার একটা ট্রলারে তোলা হয়। এরপর কোথায় তাকে নিয়ে আসা হয় সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নাই। প্রথমদিকে নিরুপায়ের মত চিৎকার করত তামান্না। তখন তার মুখ আর চোখ বেঁধে ফেলা হয়। তার স্বপ্নগুলো ক্রমশ ভাঙ্গতে থাকে। মানবজন্ম সম্পর্কে তার ধারণা নোংরা হতে থাকে। পুরুষ সম্পর্কে তার ঘৃণা, ক্ষমতা সম্পর্কে তার ঘৃণা জন্মাতে থাকে। সর্বক্ষণ খালেদ নোংরা গালাগালি করতে থাকে। সারাক্ষণ ছোরা আর বন্দুক হাতে ভয় দেখায়। খালেদ বলে তোর কান্না এখানে আর কেউ শুনতে পাবে না। তামান্না ভয়ে নীল হতে থাকে। কী হতে যাচ্ছে সে কল্পনাও করতে পারে না।

প্রচণ্ড চিৎকার করে মেঝেতে গড়াগড়ি করতে থাকে। পাশে রাখা টর্চটা দ্রুত হাতিয়ে নেয় তামান্না। টর্চের আলোয় সে ছোরা আর বন্দুকটা দেখতে পায় এবং খুব দ্রুত সে সব হাতিয়ে নিয়ে ওঠে দাঁড়ায়।

একসময় ট্রলারের ইঞ্জিনের শব্দ বন্ধ হয়ে যায়। তামান্নাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তামান্না ওরা তিনজনের অস্তিত্ব বুঝতে পারে। গভীর অন্ধকারে আগে আগে একজন টর্চ নিয়ে হাঁটছে। পেছনে তামান্নাকে ধরে এগুচ্ছে খালেদ। অনেক্ষণ হাঁটার পর তারা কোথাও পৌঁছুয়। তামান্নাকে একটা ঘরের ভেতর ছুঁড়ে মারে খালেদ। তারপর দরজা বন্ধ করার শব্দ। দরজায় তালা লাগানোর শব্দ। একটু দূরেই ওরা বসে ফিসফাস করছে। টর্চের আলোর অস্তিত্ব বুঝা যাচ্ছে। তামান্না ধারণা করছে ওরা মদ আর ইয়াবা খাচ্ছে। এর ঘণ্টাখানেক পরই খালেদ ফিরে আসে। তালা ও দরজা খোলার শব্দ টের পায় তামান্না। তামান্নার খুব ক্ষিধে পেয়েছে। খালেদের এগিয়ে আসার শব্দ পেয়েই তামান্না আবারও কেঁপে ওঠে। সে তামান্নার হাতের বাঁধন খুলে দেয়। মুখের বাঁধন খুলে দেয়। চোখের বাঁধন খুলে দেয়। এরপর একঝটকায় তামান্নার সালোয়ার টেনে ছিড়ে ফেলে। এরপর তামান্না প্রতিরোধ করতে চাইলে তামান্নার মুখ লক্ষ্য করে ঘুষি মারতে থাকে। খালেদ তামান্নার স্তনে নিতম্ব মর্দন করতে তাকে। এরপর নিচে খসখসে নার্কেল গাছের পাতার ওপরেই তামান্নাকে ফেলে ধর্ষণ করে। খালেদের পর বাকী দুইজনও একইভাবে তাকে ধর্ষণ করে। তামান্না বেহুশ হয়ে গেলে ওরা তিনজনই বাইরে চলে যায়।

অনেক্ষণ পর অন্ধকারের ভেতর তামান্নার হুশ ফেরে। তার নিম্নাঙ্গে প্রচুর ব্যাথা। নিম্নাঙ্গ থেকে নিচের দিকে পুরো ভিজে গেছে। রক্ত না ধর্ষকদের বীর্য সে ঠাহর করতে পারে না। তার গাল, বুক ও নিতম্ব জ্বলছে। মনে হচ্ছে ছুরি দিয়ে কেউ একে দিয়েছে সেখানে। সব কিছুর ওপরে তার প্রচণ্ড ক্ষিধা পেয়েছে। সে ওঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে আবার পড়ে গেল। তামান্নার জিহ্বায় এখন ধাতব স্বাদ। তার মনে হচ্ছে তার সারাদেহে লবণ। তামান্না কতক্ষণ বেহুশ হয়ে পড়েছিল তার খেয়াল নাই। সে ওঠে দাড়ানোর জন্য কোনো কিছু ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু অন্ধকারের ভেতর কিছুই ধরতে পারে না।

একটু পরেই খালেদ ফিরে আসে। বাকী দুজন বাইরে একটু দূরে কথা বলতে থাকে। তামান্না কাঁদতে চেষ্টা করে কিন্তু তার মুখ থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ আর গোঙানি বের হয়। খালেদ টর্চ ফেলে দেখে তার সারা শরীর। সে তার পকেট থেকে স্মার্টফোন বের করে তামান্নার মুখের কাছে নামিয়ে আনে। ওখানে পর্ণ সিনেমা হচ্ছে। কিন্তু তামান্নার প্রচণ্ড পিপাসা পায়। সে পানি চায়। খালেদ কি মনে করে বাইরে একজনকে লক্ষ্য করে পানি আনতে বলে। একটু পরেই ছোট একটা বোতলে করে পানি আসে। পুরোটাই তামান্না পাগলের মত গলায় ঢেলে দেয়। কিন্তু তার তৃষ্ণা মেটে না। সে বলে তার ক্ষিদে পেয়েছে। তখন খালেদ বলে একটু পরে তার আর কোনোদিন ক্ষিধে পাবে না। এটুকু যেন সে সহ্য করে। তামান্না বুঝতে পারে এই ইঙ্গিত। তামান্না বুঝতে পারে ওরা তাকে মেরে ফেলবে। পানিটা গিলে তামান্নার খানিকটা চাঙ্গা লাগে। খালেদ তার প্যান্টটা হাটুর কাছে নামায়। তারপর তামান্নার মুখের ভেতর তার শিশ্নটা গুজে দেয়ার চেষ্টা করে। তামান্নার প্রথমে ঘিনঘিনে অনুভূতি হয়। কিন্তু একটু পরেই সে স্বতস্ফূর্তভাবে সেটা মুখে নেয়। চুষতে থাকে। খালেদের মুখে সুখের গোঙানি। এরপরই সম্ভবত তামান্নার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে থাকে। সে তার সমস্ত শক্তি মুখে নিয়ে আসে। সজোরে কামড় বসায় খালেদের শিশ্নে। কিন্তু প্রথম কামড় দিতেই খালেদ মাগো বলে চিৎকার করে তার হাতে থাকা স্মার্টফোনটা দিয়ে তামান্নার মাথায় আঘাত করে। কিন্তু তখন তামান্না মরিয়া। সে মুখে শিকারের মাংস ধরা কুকুরের মত শিশ্নটা দাঁতে ধরে ডানে বামে মুখ নেড়ে একঝটকায় সেটা ছিড়ে ফেলে। তারপর থু করে সেটা অন্ধকারের ভেতর ফেলে দেয়। সেই অবস্থাতেই খালেদ অন্ধকারে পড়ে যায়। প্রচণ্ড চিৎকার করে মেঝেতে গড়াগড়ি করতে থাকে। পাশে রাখা টর্চটা দ্রুত হাতিয়ে নেয় তামান্না। টর্চের আলোয় সে ছোরা আর বন্দুকটা দেখতে পায় এবং খুব দ্রুত সে সব হাতিয়ে নিয়ে ওঠে দাঁড়ায়।

আরো পড়তে পারেন

মহামায়া (পর্ব-১)

১. সূর্য উঠতে এখনো অনেকটা দেরি। আকাশে কোনো তারা নেই। পুরোটা আকাশ মেঘে ঢাকা। রাতের অন্ধকারটা আজকে আরও বেশি চোখে লাগছে। বাতাস হচ্ছে। মাঝে মাঝে মেঘের আলোতে দেবীপুর গ্রামটা দেখা যাচ্ছে। মুহুর্তের জন্য অন্ধকার সরে আলোয় ভেসে যাচ্ছে। রাধাশঙ্করের ভিটাবাড়ি, ধান ক্ষেত, বাঁশঝাড় হাইস্কুল আলোয় ভেসে যাচ্ছে মুহূর্তের জন্য। মহামায়া আর মনিশঙ্করের ঘরে হারিকেন জ্বলছে।….

স্বর্ণবোয়াল

মোবারক তার কন্যার পাতে তরকারি তুলে দেয় আর বলে, আইজ কয় পদের মাছ খাইতেছ সেইটা খাবা আর বলবা মা! দেখি তুমি কেমুন মাছ চিনো! ময়না তার গোলগাল তামাটে মুখে একটা মধুর হাসি ফুটিয়ে উল্লসিত হয়ে ওঠে এই প্রতিযোগিতায় নামার জন্য। যদিও পুরষ্কার ফুরষ্কারের কোন তোয়াক্কা নাই। খাবার সময় বাপবেটির এইসব ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ খেলা আজকাল নিয়মিত কারবার।….

প্রতিদান

‘আমাকে আপনার মনে নেই। থাকার কথাও নয়। সে জন্য দোষও দেব না। এত ব্যস্ত মানুষ আপনি, আমার মত কত জনের সঙ্গেই হঠাৎ চেনা-জানা। কেনইবা মনে রাখবেন তাদের সবাইকে?’ বেশ শান্ত গলায় বললেন মিসেস অঙ্কিতা। টেবিল থেকে কি যেন একটা নিলেন তিনি। পিটপিট করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো সাফরাব। একটা ইনজেকশন, একটা ছোট টেস্টটিউবের মতো ভায়াল,….

error: Content is protected !!