Author Picture

এ প্রেম সে প্রেম

মোসাদ্দেক আহমেদ

রিপন বরাবর খুঁতখুঁতে স্বভাবের। শার্ট বা প্যান্ট কিনতে গেলে বিপদের একশেষ, সহজে পছন্দ হয় না। আজও ব্যতিক্রম নয়। শপিংমলের একটা নামকরা দোকানে ঢুকে যেই না একটা শার্ট মনঃপূত হল, অমনি রাজ্যের বিভ্রম। শেষে শার্টের প্যাকেটসহ সটান ঢুকে পড়ে দোকানের ড্রেসিংরুমে। নতুন জামাটি গায়ে চড়াল। বেরিয়ে এসে আবার দাঁড়াল দোকানের আয়নায়। ঘুরিয়ে ফুরিয়ে নিজেকে যখন দেখছে, তখন ম্যাজিক; নারীকণ্ঠের প্রশংসাবাক্য ভেসে এলো, ‘দারুণ কিন্তু। নেভি ব্লু শার্টটা সত্যিই চমৎকার।’ কে এই প্রশংসাকারিণী? ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে রিপন মুগ্ধ। কাউন্টার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি তারিফ করার উপযুক্ত সুন্দর, আর যে সপ্রশংস চাহনিতে মেয়েটি তাকিয়ে তা তুলনারহিত।

মেয়েটির সমর্থনে সেলসম্যান এগিয়ে আসে, ‘তা যা বলেছেন বিউটিআপা, শার্টটার জবাব নেই। মডেলদের মতো মানিয়েছে।’
না, এরপর দ্বিধা প্রকাশের সুযোগ কই। বরং তার চওড়া বুক আরও দুই ইঞ্চি প্রসারিত প্রিয়দর্শিনীর স্তুতিবাক্যে। প্রসারিত বুকটা সংকুচিত হওয়ার আগেই রিপন সোজা হেঁটে এসে অচেনা মেয়েটির সামনে দাঁড়ায়, ‘থ্যাংক্স ফর ইয়োর নাইস কমপ্লিমেন্টস। শার্টটা আমি নিচ্ছি। আর বাড়তি একটু যা বলা, আনন্দে আমার বুকের পাটাও বেড়েছে দুই ইঞ্চি। ফিতা ধরলে তিন ইঞ্চিও হতে পারে। যদিও একটু কম করেই বললাম। বুঝলেন না, সাবধানের মার নেই।’
দোকানের তিনজন সেলসম্যান, গুটিকয়েক ক্রেতাসহ রূপসী মেয়েটি হো হো হেসে উঠল। এবার সংশ্লিষ্ট সেলসম্যানটি হাসে, ‘টেপ ধরে মাপার দরকার কী। আমি দেখেই বুঝতে পারছি, বুকের সঙ্গে আপনার দিলও চওড়া হয়ে গেছে।’ হাসাহাসি হল, যেন ক্ষণকালের ভরাহাসির হাট।
আমোদিত রিপন নিজের পরিচয় জানায়, ‘নাইস টু মিট ইউ ম্যাম। আমি রিপন।’
‘আমি বিউটি।’
‘উঁহু, শুধু বিউটি নন, আপনি বিউটিকুইন। ভাগ্যগুণে দেখা, ভাগ্যে থাকলে ফের দেখা হবে।’
‘বাব্বা। এমন বলায় ঝুঁকি থাকে। দেখা নাও হতে পারে।’ বিউটির চোখেমুখে মিটিমিটি হাসি।
‘বালাইষাট। এমন বলবেন না। এটা চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতা।’ প্রথম দেখার পর্ব এমতই শেষ হয়।

রিপন আহ্লাদিত, ‘ইয়াহু, ঘাবড়াও মাত। টাইমিংটা আমাদের পক্ষে। ভরসা এখানেই। দুজন তো আর একসাথে পাগল হচ্ছি না। আপনার শীতকাল আমি সামলাব আর আমার গরমকাল আপনি, মানে তুমি সামলাবে। সংসার সুখের হবে টাইমিংয়ের গুণে।’

রিপন বাসায় ফিরে এলে বাহবা জোটে; শার্টটা বাড়ির সবার, বিশেষত দুলাভাই ও রিতাআপুর ভারি পছন্দ। মায়ের মুখেও অনুমোদনের হাসি। শার্টটা নেড়েচেড়ে দুলাভাই উৎফুল্ল, ‘শালাবাবু, একটা জিজ্ঞাস্য আছে। আমার চোখের দিকে তাকাও। হলফ করে বলো, এটা কার পছন্দে কেনা। ডালমে কুছ কালা হায়।’
সন্দেহের পালে হাওয়া দিতে রিতা আপুর জুড়ি নেই, ‘রাইট। আমারও তেমন অনুমান। রিপনের দৌড় আমাদের জানা। নেপথ্যে কেউ না কেউ আছে। এটা মিলিয়ন ডলার ক্যোস্চেন। কে সে?’
ছেলের স্বপক্ষে এগিয়ে আসেন মা, ‘এই, তোমরা সব কী। আমার ছেলের পেছনে লেগেছ কেন? যদি তেমন কেউ থাকে আমি খুশি।’
‘মা, তুমিও। থাকল শার্ট, আমি ভাগলাম।’ রিপন হাসতে হাসতে নিজের ঘরে এসে ঢোকে। পেছন পেছন রিতাআপুও, আপুর চোখ ফাঁকি দেয়া শক্ত। ফলে সবটাই গড়গড় করে বলে দিতে হয়। রিতা আপু মুচকি হাসেন, ‘বটে, তোর দুলাভাই ঘাগু মাল, ঠিক ধরেছে।’
‘দুলাভাই ঘাগু মাল সাধে হয়নি। যে টাঙ্কিটা মেরেছে বিয়ের আগে, বাড়ির সামনে রোজ দুই চক্কর, তাও বাইসাইকেলে, যে কেউ পাকা হতে বাধ্য।’
‘পাকামো হচ্ছে না। শোন, মেয়েটাকে ফোন দে।’
রিতা আপুর উৎসাহে পানি ঢেলে রিপন বলল, ‘মোবাইল নাম্বার থাকলে তো ফোন দেব? প্রথম দেখায় জড়তা ছিল, চাওয়া হয়নি।’
‘সমস্যা নাই। দোকানে গেলেই মুশকিল আসান। মেয়েটার সন্ধান হয়ে যাবে। আমি নিশ্চিত, খোঁজ হবেই।’

পরিকল্পনামাফিক পরের দিন সাহসে কুলালো না, দুইদিন পর রিপন দোকানটায় গেল, সেই সেলসম্যানকে পেতেই হাসল, ‘চলে এলাম। আপনাকে বলা যায়, তাই চলে এলাম।’
‘আমি জানি কী বলবেন? বিউটি আপুর কথা তো? সে আমাদের মালিকের ছোটবোন। কিন্তু খবর ভালো নয়, আপনার জন্য দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে।’ সেলস্ম্যান বিষণ্ণ।
‘কী দুঃসংবাদ?’
‘বিউটি আপুর মাথার দোষ আছে। শীতকালে পুরো পাগল থাকে, পাক্কা দুমাস। অবশ্য বাকি দশমাস নো প্রবলেম। পুরোদস্তুর সুস্থ।’
‘বলেন কি!’
‘আরও আছে। বিউটি আপুর একটা বিয়েও হয়েছিল। টেকেনি, এ কারণে।’ বিষাদে কাতর সেলস্ম্যান।
ধাক্কাটা সামলে নেয়া মুশকিল, উদাস চোখে রিপন তাকায় চারদিকে। হিসেব কষে দেখল, শীতকাল কেবল শেষ হয়েছে, তার মানে বিউটির সুস্থতার সবে শুরু, ফলে তার অসুস্থতা ফুটে ওঠেনি সেদিন। নিজের মাথাটাই যখন আউলা লাগছে, ঠিক তখন হাস্যোজ্জ্বল বিউটিকে দোকানে ঢুকতে দেখা গেল, ‘বাহ, আপনি দেখছি। তা আজও শার্ট কিনতে বুঝি?’
মনোবেদনা গোপন করে রিপন হাসে, ‘আপনাকে দেখার আশ্বাস থাকলে কোনো ব্যাপার না। শার্ট কিনতে রোজ আসা যায়।’
‘তবে তো প্রতিদিন দোকানে আসতে হয়। ফাঁকতালে ভাইয়ার দোকানের বিক্রিবাট্টা বাড়ল।’
‘তাই! আই মিন, সেই রথ দেখা আর কলা বেচার গল্পের আধুনিক সংস্করণ। আচ্ছা, এভাবে কি গল্প জমে। এর চেয়ে বরং কোথাও যেয়ে বসি। কফিশপে ঢুঁ মারলে কেমন হয়।’
সম্মতি জানায় বিউটি, ‘গুড আইডিয়া। এই ফ্লোরের শেষেই একটা কফিশপ, চলুন।’

‘বলেন কি! আপনি দেখছি আমার মতোই সিজেনাল পাগল। তবে সময়ের তারতম্য আছে। আমি শীতকালের। আমার বরও মানতে পারেনি। ডিভোর্সি হই। তা যা বলেছেন, দুজনার মিলটাই বেশি।’

কফিশপটা তেমন দূরে নয়, কথায় কথায় চলে এলো, একটা নিরিবিলি টেবিল বেছে নিয়ে বসে পড়ে দুজন, ‘জানেন, শার্টটা বাড়ির সবার পছন্দ। আপনার কথা বলতে সকলে উচ্ছ্বসিত।’
কথার মাঝখানে রিপন উঠে গিয়ে দু মগ কফি নিয়ে এসেছে। কফিতে চুমুক দিতে দিতে বিউটি অনুযোগ জানায়, ‘মিছেমিছি আমার কথা বলতে গেলেন যে?’
‘বাধ্য হয়ে বলা, আমার পছন্দে তাদের আস্থা নেই। দুলাভাই-আপু ধরে ফেলল হাতেনাতে।’
আলাপে মজা পাচ্ছে বিউটি, ‘ফাউ ক্রেডিট পেয়ে গেলাম দেখছি। সবটা তো আপনিই করেছিলেন, পছন্দ আপনিই করেছিলেন, আমি কেবল ফিনিশিং টাচ দিয়েছি।’
‘আপনি চাইলে আরেকবার দিতে পারেন। চাইকি পুরোটাই ফিনিশ করতে পারেন, এই যেমন …’
উত্তেজনার বশে জোরে চুমুক দিয়ে ফেলে বিউটি, ‘তা থামলেন কেন? বেশ তো বলছিলেন।’
‘অভয় দিচ্ছেন, তাহলে বলেই ফেলি…’ বলতে গিয়ে থামে, চিরাচরিত সংশয় ঝরে পড়ে, মস্তিষ্কে আনন্দস্রাব হচ্ছে, রিপন সাহসী হয়, ‘আপনার সঙ্গে কিন্তু অমিলের চেয়ে আমার মিলই বেশি।’

এবারো কফিতে জোরে চুমুক দিলে বিউটির জিব জ্বালা করে, ‘একটু আন্দাজ করছি, দোকানে এসে আমার বায়োডাটা নিচ্ছিলেন বুঝি। নিশ্চয় হত্যোদম হয়েছেন। মৌসুমি পাগলদের বায়োডাটা মোটেও সুবিধাজনক হয় না।’
‘কী যে বলেন। হত্যোদম হব কেন। তবে মিথ্যে বলব না, শুরুতে হয়েছিলাম। পরে ভেবে দেখলাম, কীসের অসুবিধা। বললাম না, অমিলের চেয়ে আমাদের মিলই বেশি। আগে আমিও একটা বিয়ে করেছিলাম। বছরখানেকও টেকেনি, জুন আসতেই বিয়েটা ভেস্তে গেল।’
‘ভেরি স্যাড। তা বিয়েটা জুনে ভাঙল কেন?’ বিউটি দুঃখিত।
‘এই জুন-জুলাই মাস দুটোই যত গোলমেলে। জুন এলেই মাথায় কুয়াশা জমে। আস্তে আস্তে মনও ঝাপসা হয়। জুন টু জুলাই-এই দুই মাস আমি পাগল থাকি।’
‘বলেন কি! আপনি দেখছি আমার মতোই সিজেনাল পাগল। তবে সময়ের তারতম্য আছে। আমি শীতকালের। আমার বরও মানতে পারেনি। ডিভোর্সি হই। তা যা বলেছেন, দুজনার মিলটাই বেশি।’
‘আপনি চাইলেই কিন্তু ফিনিশার হতে পারেন। এই মিলটাকে বাস্তব রূপ দেয়া যায়।’
বিউটি জিজ্ঞাসুনেত্রে তাকিয়ে, ‘কী রকম? কেমন ধোঁয়াশা ঠেকছে।’
‘ধোঁয়াশা কাটতে কতক্ষণ। লালনের গানটাই যদি বলি-তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে…। নদে মানে নদীয়া, আর ওই তিনের একজন তো চৈতন্যদেবই। প্রেমবাণীর অবতার। এখন কথা হচ্ছে, আমরা দুই পাগল মিলে তেমন না হোক, একটা সাংসারিক জুটি তো বাঁধতেই পারি। কী বলেন? নাই-বা হল ভাবের হাটবাজার, রুপালি সংসার তো হয়।’
‘আরে বাস! তলে তলে এত। বলতে কি শুনে ভয়ও পাচ্ছি, আবার আপ্লুতও কম নই। ভাইয়াকে বলে দেখতে পারেন। ভাইয়ার সম্মতি পাওয়া কঠিন। বুঝলেন না, আমরা দুজনাই সিজেনাল পাগল। দুই পাগলের ঘর-সংসার। পুনরায় না গাড্ডায় পড়ে।’

রিপন আহ্লাদিত, ‘ইয়াহু, ঘাবড়াও মাত। টাইমিংটা আমাদের পক্ষে। ভরসা এখানেই। দুজন তো আর একসাথে পাগল হচ্ছি না। আপনার শীতকাল আমি সামলাব আর আমার গরমকাল আপনি, মানে তুমি সামলাবে। সংসার সুখের হবে টাইমিংয়ের গুণে।’
ব্রীড়ার লালে বিউটি আরক্তিম, ‘রিয়েলি! চিয়ার্স। হা, হা।’

আরো পড়তে পারেন

মহামায়া (পর্ব-২)

পড়ুন—  মহামায়া (পর্ব-১) ৩. কাঁচা রাস্তায় উঠতে উঠতে কাপড় ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে। পায়ের সাথে কাপড় জড়িয়ে যাচ্ছে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। সবার আগে মনিশঙ্কর হাঁটছে। তার হাতে মাথায় খাবারের টিন। একটা কাপড়ের ট্রাঙ্ক। সকলের হাতেই কাপড়ের পুটুলি। এতটুকু আসতেই হাপিয়ে উঠেছে। আরো অনেকটা দূর যেতে হবে হেঁটে। তারপর নৌকায় সীমানার কাছাকাছি কোনো একটা জায়গায়।….

মহামায়া (পর্ব-১)

১. সূর্য উঠতে এখনো অনেকটা দেরি। আকাশে কোনো তারা নেই। পুরোটা আকাশ মেঘে ঢাকা। রাতের অন্ধকারটা আজকে আরও বেশি চোখে লাগছে। বাতাস হচ্ছে। মাঝে মাঝে মেঘের আলোতে দেবীপুর গ্রামটা দেখা যাচ্ছে। মুহুর্তের জন্য অন্ধকার সরে আলোয় ভেসে যাচ্ছে। রাধাশঙ্করের ভিটাবাড়ি, ধান ক্ষেত, বাঁশঝাড় হাইস্কুল আলোয় ভেসে যাচ্ছে মুহূর্তের জন্য। মহামায়া আর মনিশঙ্করের ঘরে হারিকেন জ্বলছে।….

স্বর্ণবোয়াল

মোবারক তার কন্যার পাতে তরকারি তুলে দেয় আর বলে, আইজ কয় পদের মাছ খাইতেছ সেইটা খাবা আর বলবা মা! দেখি তুমি কেমুন মাছ চিনো! ময়না তার গোলগাল তামাটে মুখে একটা মধুর হাসি ফুটিয়ে উল্লসিত হয়ে ওঠে এই প্রতিযোগিতায় নামার জন্য। যদিও পুরষ্কার ফুরষ্কারের কোন তোয়াক্কা নাই। খাবার সময় বাপবেটির এইসব ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ খেলা আজকাল নিয়মিত কারবার।….

error: Content is protected !!