Author Picture

জাতি ও শ্রেণি প্রশ্নে চিন্তা ও দুশ্চিন্তা: উপমহাদেশে, বাংলাদেশে (পর্ব-৩)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ব্রিটিশ শাসকদের জন্য ভারতবর্ষীয় জাতীয়তাবাদীরা মিত্র ছিল না ঠিকই, তাই বলে তারা আপোসহীন শত্রু যে ছিল তা নয়। ব্রিটিশ শাসকদের আসল শত্রু ছিল সমাজতন্ত্রীরা, রুশ বিপ্লবের দ্বারা যারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল। ব্যক্তিমালিকানার ব্যবস্থাকে ভেঙে যারা সামাজিক মালিকানা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা ১৯২০ সালে, ভারতের বাইরে, তাসখন্দে; বলশেভিক বিপ্লবের প্রত্যক্ষ প্রভাবে কেবল নয়, বলশেভিকদের অর্থসাহায্যেও বটে। যে বিপ্লবের ভয়ে ব্রিটিশ শাসকেরা প্রথমে কংগ্রেস ও পরে মুসলিম লীগকে গঠিত হতে উৎসাহ দিয়ে বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রাচীর খাড়া করতে সচেষ্ট হয়েছিল, দেখা গেল সেই বিপ্লবই এগিয়ে আসতে চাইছে। টোকা দেবে মনে হয় দরজায়। সশস্ত্র বিপ্লবীদের মোকাবিলা করা গেছে, কারণ তারা ছিল একদিকে অসংগঠিত, অন্যদিকে জনবিচ্ছিন্ন। কিন্তু কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা ভিন্ন, তারা সংগঠন গড়ে তুলবে, এবং মেহনতী মানুষদেরকে, সংখ্যায় যারা শতকরা ৯০ জন, তাদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলবে। হিন্দু মুসলিম যুদ্ধ তো পরের কথা, বিরোধই থাকবে না, দুই সম্প্রদায় একাট্টা হয়ে যাবে। এ বিপ্লব ফরাসী বিপ্লবের চাইতেও ভয়ঙ্কর হবে, কেননা স্থানীয় হলেও এর সংযোগটা হবে আন্তর্জাতিক, ভেতরের সংগঠনটা হবে অত্যন্ত মজবুত এবং বাইরে থেকে আসবে সাহায্য ও অনুপ্রেরণা। সর্বোপরি সামাজিক মালিকানার যে আদর্শে এই বিপ্লব উদ্দীপ্ত তা জাতীয়তাবাদের প্রাচীরটা তো ভাঙবেই, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকেও চিরতরে বিদায় করে দেবে। ফরাসী বিপ্লব ব্যক্তিমালিকানার অবসান ঘটায় নি, এই বিপ্লব সেটা ঘটিয়ে ছাড়বে।

সাম্রাজ্যবাদীদের চোখে তাই কমিউনিস্টরাই অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতিতে প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। কমিউনিস্ট চিন্তাধারা ও রাজনৈতিক সংগঠন যাতে শক্তি সঞ্চয় করতে না পারে সে জন্য দমনমূলক ব্যবস্থা নিতে তারা কোনো প্রকার কার্পণ্য করে নি। নিষিদ্ধকরণ ও দমন সমানে চালিয়েছে। দেশের বাইরে থেকে নবগঠিত কমিউনিস্ট পার্টি পত্রিকা ও বই পাঠাতে চেষ্টা করতো, দূতও পাঠাতো, কিন্তু সরকার প্রবেশাধিকার দিত না। দেশের ভেতরে কমিউনিস্ট পার্টি যখন এমনকি নিজ নামেও আত্মপ্রকাশ করে নি, বিক্ষিপ্ত ভাবে কমিউনিজম পন্থীরা ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি নামে কাজ করছেন তখন থেকেই তাঁদেরকে মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা শুরু হয়েছে। ১৯২৯ সালে মীরাট বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলার জাল ফেলে ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেছে বেছে ৩১ জন কমিউনিস্ট নেতাকে তারা গ্রেফতার করে, এঁদের ভেতর তিনজন ইংরেজও ছিলেন। উদ্দেশ্য অঙ্কুরেই বিনাশসাধন। মামলাটি চলে বিশেষ আদালতে, চলে চার বছর ধরে এবং যাবজ্জীবন থেকে বিভিন্ন মেয়াদে সকলকেই শাস্তি দেওয়া হয়। এরপর ১৯৩৪ সালে তো কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধই করে দেওয়া হলো। জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসের নেতারা জেল খেটেছেন, কিন্তু তাঁদের সংগঠন স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয় নি। আর জাতীয়তাবাদী মুসলিম লীগের নেতাদেরকে তো জেলের ভাত কখনোই খেতে হয় নি, এবং তাদের সংগঠনও নিষিদ্ধ হয় নি।

ছিলেন উদারনীতিকেরা। তাঁরা সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা করতেন, সংস্কার চাইতেন, কিন্তু ছিলেন বিপ্লববিরোধী। বস্তুত ঘোষিতভাবে না হলেও তাঁদের তৎপরতা ছিল ছাড় দিয়ে, আপোস করে বিপ্লবকে প্রতিহত করা। মূল ব্যাপারটা হলো এই যে তাঁরা অনেককিছুই চাইবেন, একালের এনজিও’রা যেমন চান, চাইতেই থাকবেন, কিন্তু একটা জিনিস চাইবেন না, সেটা হলো ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ। অর্থাৎ শ্রেণী থাকবে, কিন্তু শ্রেণী শোষণ থাকবে না; বাস্তব ক্ষেত্রে যেটা ছিল অসম্ভব। কংগ্রেসের ভেতরও সোস্যালিস্টরা ছিলেন, তাঁরা সমাজতন্ত্র চাইতেন, কিন্তু বলতেন সেটা মার্কসীয় হবে না, হবে ভারতীয়; শ্রেণী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে আসবে না, আসবে শ্রেণী সমন্বয়ের মধ্যস্থতায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে বাংলায় যে আধুনিক কবিরা বেশ একটা হৈ চৈ ফেলেছিলেন তাঁদের কেউ কেউ ছিলেন উদারনীতিক এবং তাঁদের একজনের, অমিয় চক্রবর্তীর, একটি রচনায় উদারনীতির কেন্দ্রীয় বক্তব্যটির চমৎকার প্রতিফলন আছে। ‘সংগতি’ নামের পাঠকপ্রিয় কবিতাটিতে তিনি লিখেছেন, ‘মেলাবেন তিনি ঝড়ো হাওয়া আর/ পোড়ো বাড়িটার/ ঐ ভাঙা দরজাটা/ মেলাবেন।’ ঝড়ো হাওয়া এসেছে, যেমন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের তেমনি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের, কিন্তু তবু তিনি মেলাবেন। পোড়ো বাড়িটার দরজা ভেঙে পড়েছে, কিন্তু বাড়িটা শেষ পর্যন্ত টিকে যাবে। বাড়িটা হচ্ছে ব্যক্তিমালিকানার। তা মিলটা কে ঘটাবেন? ঈশ্বর নিশ্চয়ই নন।

ব্যাপারটা সাহিত্যেও প্রতিফলিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে বাংলায় যে আধুনিক কবিরা বেশ একটা হৈ চৈ ফেলেছিলেন তাঁদের কেউ কেউ ছিলেন উদারনীতিক এবং তাঁদের একজনের, অমিয় চক্রবর্তীর, একটি রচনায় উদারনীতির কেন্দ্রীয় বক্তব্যটির চমৎকার প্রতিফলন আছে। ‘সংগতি’ নামের পাঠকপ্রিয় কবিতাটিতে তিনি লিখেছেন, ‘মেলাবেন তিনি ঝড়ো হাওয়া আর/ পোড়ো বাড়িটার/ ঐ ভাঙা দরজাটা/ মেলাবেন।’ ঝড়ো হাওয়া এসেছে, যেমন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের তেমনি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের, কিন্তু তবু তিনি মেলাবেন। পোড়ো বাড়িটার দরজা ভেঙে পড়েছে, কিন্তু বাড়িটা শেষ পর্যন্ত টিকে যাবে। বাড়িটা হচ্ছে ব্যক্তিমালিকানার। তা মিলটা কে ঘটাবেন? ঈশ্বর নিশ্চয়ই নন। না, পুরাতন ঈশ্বর পারবেন না, তিনি পলায়ন করেছেন, মেলাবেন নতুন ঈশ্বর, নাম যার উদারনীতি।

কবিতায় তখন উদারনীতিকদের নানা সুর ও স্বর শোনা যাচ্ছে। কবিদের কণ্ঠে আশার কথা কিছুটা আছে ব্যক্তিগত সম্পর্কে, প্রেমে ও বন্ধুত্বে। তবে খুব একটা ভরসা নেই। যেমন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত দেখেছেন চতুর্দিকে নৈরাশ্য। কোথাও নরক, কোথাও মরুভূমি। ধুধু মরুভূমির দিগন্তে মরীচিকা পর্যন্ত নেই। ‘উটপাখি’ নামের কবিতায় সুধীন্দ্রনাথ তাঁর একান্ত আপনজনকে বলছেন, ‘ফাটা ডিমে আর তা দিয়ে কী ফল পাবে?/ মনস্তাপেও লাগবে না ওতে জোড়া’। বলছেন, ‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?’ জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্র মহাভারতের প্রলয় বিষয়ে অবহিত ছিলেন, কিন্তু অসহায় তিনি, প্রলয় থামাতে পারেন নি। এই মহাসঙ্কটে ব্যক্তির কিই বা করার আছে? অতএব এসো বন্ধু সন্ধি করি আমরা, ‘প্রত্যুপকারে বিরোধী স্বার্থ সাধি;/ তুমি নিয়ে চলো আমাকে লোকান্তরে,/ তোমাকে বন্ধু আমি লোকায়তে বাঁধি।’ সুধীন্দ্রনাথের উদারনীতি অঙ্গীকারবদ্ধভাবেই সমাজতন্ত্রবিরোধী। তাঁর মতোই বুদ্ধদেব বসুও অত্যন্ত আধুনিক ছিলেন, নিজেকে বন্দী অবস্থায় দেখতে পেয়েছেন, তবে সমাজের হাতে নয় আপন যৌবনের হাতে; অনুপ্রাণিত হয়েছেন বদলেয়ার ও ডিএইচ লরেন্স দ্বারা, যাঁরা পরস্পরবিরোধী ছিলেন, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ ছিলেন রক্ষণশীলতায়। বুদ্ধদেবের রচনা সরকার নিষিদ্ধ করেছে, তবে বিপ্লবী মত প্রকাশ করার দায়ে নয়, যেমন করেছে কাজী নজরুল ইসলামের রচনা; নিষিদ্ধ করেছে অশ্লীলতার সন্দেহে।

বুদ্ধদেব বসু নিজেও রক্ষণশীল বটে, বন্দেমাতরমকে জাতীয় সঙ্গীত করার পক্ষে তিনি লিখিত অবস্থান নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের অবস্থানের বিরুদ্ধে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপ্লবী উপন্যাস পথের দাবীতে প্রচণ্ড সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা রয়েছে, কিন্তু তিনি তাঁর নায়ক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পক্ষে নয়, পক্ষে ভদ্রলোকের বিপ্লবের। অর্থাৎ ইংরেজকে তাড়ানো চাই, রাষ্ট্রক্ষমতা যাতে শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণীর হাতে আসতে পারে।
চিন্তার ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে যাঁরা বলশেভিক বিপ্লবের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন তাঁদেরও কেউ কেউ থেমে গেছেন লেনিনবাদের দ্বারপ্রান্ত পর্যন্ত গিয়ে। যেমন ধরা যাক শিবরাম চক্রবর্তীর কথা। হাস্যকৌতুকের লেখক তিনি, খুব মজা করে ঠাট্টা করেছেন ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনবাদীদের তাঁর মস্কো বনাম পন্ডিচেরী (১৯২৯) বইতে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে মস্কো অবশ্যই ভালো কিন্তু তারও চেয়ে ভালো গান্ধীজির মতবাদ। ধরা যাক আবুল হুসেনের কথাও। বেঁচে ছিলেন মাত্র ৪২ বছর, এরই মধ্যে তিনি নানা বিষয়ে লিখেছেন যাদের ভেতর রয়েছে, ১৯২৫ সালে লেখা বাংলার বলশী নামের বই; বইটিতে প্রবন্ধ রয়েছে ‘কৃষকের আর্তনাদ’, ‘কৃষকের দুর্দশা’, ‘কৃষিবিপ্লবের সূচনা’ নামে। কিন্তু তিনি বাংলায় বলশেভিক বিপ্লবের পক্ষে যে বলছেন তা কিন্তু নয়, জমিদার ও মহাজনদের তিনি সতর্ক করে দিচ্ছেন এই বলে যে কৃষকের দুর্দশার দিকে তাকাতে হবে, নিজেদেরকে সংশোধিত করতে হবে, নইলে বাংলায় রক্তাক্ত বিপ্লব ঘটবে। তখনকার সময়ে বলশেভিক বিপ্লবের পক্ষে বলাটা অবশ্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ঝুঁকি না থাকলেও আবুল হুসেনের পক্ষে যে সমাজবিপ্লবের পক্ষে দাঁড়ানো সম্ভব হতো এমন নয়। উদারনীতির সীমানাটা মোটেই মিথ্যা নয়।

বুদ্ধদেব বসু নিজেও রক্ষণশীল বটে, বন্দেমাতরমকে জাতীয় সঙ্গীত করার পক্ষে তিনি লিখিত অবস্থান নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের অবস্থানের বিরুদ্ধে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপ্লবী উপন্যাস পথের দাবীতে প্রচণ্ড সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা রয়েছে, কিন্তু তিনি তাঁর নায়ক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পক্ষে নয়, পক্ষে ভদ্রলোকের বিপ্লবের। অর্থাৎ ইংরেজকে তাড়ানো চাই, রাষ্ট্রক্ষমতা যাতে শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণীর হাতে আসতে পারে।

ঢাকার কামরুদ্দীন আহমদও ছিলেন অগ্রসর চিন্তার মানুষ। পাকিস্তান আন্দোলনের সময়ে মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের কর্মী ছিলেন তিনি; ১৯৪৭-এর পর উপলব্ধি করেন যে মুসলিম লীগের ভেতরে থেকে সমাজে কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। সমমনা তরুণদেরকে সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি গণ-আজাদী লীগ নামে সমাজতান্ত্রিক আদর্শভিত্তিক একটি রাজনৈতিক সংগঠন গড়বার উদ্যোগ নেন। পেশায় ছিলেন আইনজীবী, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যোগ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগে; ১৯৫৪-র নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জয়ের জন্য অসম্ভব পরিশ্রম করেছেন। শ্রমিক সংগঠনেও ছিলেন, গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলন ও সমাজ বিকাশের ওপরে। একাত্তরে হানাদারেরা তাঁকে আটক করে, তাঁর কনিষ্ঠপুত্র যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হন। কিন্তু তাঁকেও মেনে চলতে হয়েছে উদারনীতির সীমানা-কাঠামো, যে জন্য গণ-আজাদী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে দাঁড়ায় নি, তিনি নিজেও আইন পেশাতেই থেকেছেন, মাঝখানে রাষ্ট্রদূতও হয়েছিলেন। এঁরা সবাই উদারনীতির সীমাটাকে নিজেদের মতো করে চিহ্নিত করে দিয়ে গেছেন।
মুসলিম লীগের মূল নেতৃত্ব উদারনৈতিক নয়, ছিল কট্টর পুঁজিবাদী। তবে সেখানেও উদারনীতির একটা ধারা ছিল। পাকিস্তানের দার্শনিক স্বপ্নদ্রষ্টা মোহাম্মদ ইকবাল উদারনৈতিক ধারারই মানুষ। তিনি সমাজতন্ত্র চাইতেন, গরীব ভুখাদের জাগিয়ে দেবার পক্ষে তিনি কবিতা লিখেছেন, বলেছেন ক্ষেতের শস্য যদি চাষী না পায় তবে তা জ্বালিয়ে দাও। তিনি লেনিনের অনুরাগী ছিলেন। লেনিনকে নিয়ে কবিতাও লিখেছেন। কিন্তু লেনিনপন্থী যে হবেন এটা সম্ভব হয় নি। প্রধান কারণ লেনিন ছিলেন বস্তুবাদী, ইকবাল যা নন। ইকবাল মনে করেন ইসলামের ভেতরই সামাজিক বৈষম্যের সমাধান আছে, অন্যত্র না গেলেও চলবে।

এই সমাধানের কথা বাংলার মুসলিম লীগের আবুল হাশিমও বলেছেন। প্রাদেশিক মুসলিম লীগকে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির আদলেই সুগঠিত ও সুশৃঙ্খল ধারায় নিয়ে এসেছিলেন, পাকিস্তান দাবীকে নিয়ে গিয়েছিলেন জনগণের দ্বারপ্রান্তে; কিন্তু আবার ইসলাম ধর্মের বৈপ্লবিক চরিত্রেও বিশ্বাস করতেন। অর্থাৎ সম্পত্তি ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটবে না আবার সামাজিক বৈষম্যও দূর হবে- এই ছিল ধারণা। তাঁর প্রভাবে সমাজতন্ত্র বিশ্বাসী তরুণরা অনেকেই মুসলিম লীগের কর্মধারায় যুক্ত হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে মোহাম্মদ তোয়াহা একজন। পরবর্তীতে তোয়াহা সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টিতে চলে যান। পেছনের দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হয়েছে যে আবুল হাশিমের প্রভাবে সমাজপরিবর্তনে-উন্মুখ শিক্ষিত তরুণরা যে মুসলিম লীগের পতাকা তলে সমবেত হয়েছিল তাতে লীগের লাভ হয়ে কিছুটা, তুলনায় কমিউনিস্ট পার্টির লোকসান হয়েছে অনেক বেশী। ওই তরুণদের যাবার কথা ছিল কমিউনিস্ট পার্টিতে, তারা যেতে পারে নি। মুসলিম লীগের লাভের ভেতরেও ক্ষতির একটা দিক ছিল। সেটা হলো এই যে ঘরের ভেতরে প্রগতিশীলদের তৎপরতা দেখে প্রতিক্রিয়াশীল অংশটি নিজেদের শক্তিকে সংহত করেছিল। অপরদিকে মুসলমান তরুণরা না-থাকায় কমিউনিস্ট পার্টি যে কেবল কর্মী হারিয়েছে তা নয়, পার্টির ভাবমূর্তিতে হিন্দু-প্রাধান্যের দৃশ্যমানতা ঘটেছে। যার ফলে কমিউনিস্টদের ‘নাস্তিক’ বলার পাশাপাশি হিন্দু বলাটাও সহজ হয়েছে।৪   আর সামগ্রিক ভাবে কমিউনিস্ট পার্টি দুর্বল হওয়াতে কংগ্রেসের ভেতরকার হিন্দু মহাসভাপন্থীরা সবল হওয়ার মওকা পেয়ে গেছে।

আবুল হাশিমের বৈপ্লবিক ইসলামী চিন্তার ব্যাপারে অত্যন্ত উৎসাহী ছিলেন তরুণ শামসুল হক। তিনি অনেক চিন্তা করতেন, দক্ষ সংগঠক ছিলেন। ১৯৪৯ সালে পূর্ববঙ্গের প্রথম যে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে তিনি ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ প্রার্থীকে হারিয়ে দেন; পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। আবুল হাশিমের দি ক্রীড অব ইসলাম নামের বইয়ের অনুসরণে বৈপ্লবিক দৃষ্টিতে ইসলাম নামে একটি বইও লেখেন। দেশে ইসলামী বিপ্লব হবে, সেই বিপ্লবে তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকবে, এ ধরনের একটা কল্পলোকে বসবাস করতেন; পেটি বুর্জোয়া অস্থিরতায় ভুগতেন, নিজেকে খুব বড় করে দেখতেন। সব মিলিয়ে এমন অবস্থা দাঁড়ালো যে তিনি মানসিক ভারসাম্যই হারিয়ে ফেললেন। এবং একসময়ে নিজেও হারিয়ে গেলেন।

…মওলানা ভাসানী প্রকাশ্যে বিচ্ছিন্নতা দাবী করিয়াছেন এবং এই ধারণা জনপ্রিয় করার জন্য গোটা পূর্ব পাকিস্তান সফর করেন। …বিচ্ছিন্নতার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু যারা প্রকাশ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাদের তো গ্রেফতার করা হয় নি।”৮   তিনি অবশ্য জানতেন না যে হানাদারদের হাতে গ্রেফতার হওয়ার জন্য মওলানা ভাসানী অপেক্ষা করেন নি, এপ্রিলেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।

এই যে ইসলামে বৈপ্লবিক ভূমিকা নিয়ে রাজনীতিতে এগুনো একে কট্টরপন্থী ধর্মীয় মৌলবাদী বলা অন্যায় হবে ঠিকই, কিন্তু এ যে উদারনৈতিক হলেও মৌলবাদী সেটা কিন্তু মানতেই হবে। বিপ্লবের আওয়াজ তোলে, কিন্তু আসল বিপ্লবটা যে সমাজের ভেতরকার শ্রেণীসম্পর্কের ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনার সে-ব্যাপারটাকে আওয়াজের আড়ালে ঢেকে দেয়। যেমন তমদ্দুন মজলিসের ঘটনাটা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই সেপ্টেম্বর মাসের এক তারিখেই ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করা হয় পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিসের। মূল উদ্যোক্তা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের তরুণ অধ্যাপক আবুল কাসেম। ওই সংগঠনটিই সর্বপ্রথম সাংগঠনিক ভাবে বাংলা ভাষার দাবী তুলে ধরে।৫   সংগঠনটি ছিল আধা-রাজনৈতিক আধা-সাংস্কৃতিক। তারা একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করে, নাম রাখে সৈনিক। কমিউনিস্ট পার্টির আদলে পুস্তিকা ও প্রচারপত্র প্রকাশ করে; তাতে সরকারের সমালোচনা করা হয়, জনগণের বাঁচার দাবীও তুলে ধরা হয়, কিন্তু মূল লক্ষ্যটা থাকে ইসলামী সমাজব্যবস্থা কায়েম করা। যার অর্থ ধর্মনিরপেক্ষতা চলবে না, এবং সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানায় হাত না দিয়ে ইনসাফ ও শোষণমুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এদিক থেকে সংগঠনটি আবুল হাশিমের চিন্তার নিকটবর্তী, যে জন্য পরবর্তীতে দেখা গেছে হাশিম সাহেবকে সভাপতি করে এঁরা খেলাফতে রব্বানী পার্টি প্রতিষ্ঠা করছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনাতে ভূমিকা রাখলেও ১৯৫২-তে আন্দোলন যখন মফস্বলের গ্রামে গঞ্জে পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়ে রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করল তমদ্দুন মজলিস তখন আর তাল রাখতে পারে নি, পিছিয়ে পড়েছে। মূল কারণ ভাষা আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণরূপে ধর্মনিরপেক্ষ, আর এঁরা ছিলেন ইসলামী জীবনদর্শনের প্রচারক। আন্দোলন থেকে পিছিয়ে যাওয়ার পর তমদ্দুন মসলিসের একটা বড় কাজ হয়ে দাঁড়ালো তারাই যে আন্দোলনের উদ্যোক্তা সেটা বলার পাশাপাশি কমিউনিস্ট পার্টি যে আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল এটা প্রচার করা।৬   বোঝা গেল পুঁজিবাদীরা নয়, কমিউনিস্টরাই ছিল তাদের চূড়ান্ত শত্রু।

শুরুতে জামায়াতে ইসলামী বিশেষ সুবিধা করতে পারে নি। সংগঠনটি পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করে নি। তাদের যুক্তি ছিল এই যে ইসলাম ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ মানে না। তবে পাকিস্তান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা মওদুদী লাহোরে চলে আসেন এবং গোড়া ও জঙ্গি ধরনের তৎপরতা শুরু করে দেন। প্রথম দিকে পূর্ব পাকিস্তানে তারা বিশেষ সুবিধা করতে পারে নি, তবে পরে বেশ জোরদার হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গোলাম আজমকে দলে পেয়ে। গোলাম আযম ভালো সংগঠক ও বক্তা ছিলেন, এবং কমিউনিস্ট-বিরোধী কর্মে তিনি শত্রুপক্ষ কমিউনিস্টদের কৌশল ও নিষ্ঠা নিয়েই কাজ করেছেন। একাত্তরের পূর্ববঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা সুবিদিত। যুদ্ধকালে ২০ জুন লাহোরে দলীয় অফিসের এক সাংবাদিক সম্মেলনে গোলাম আযম বলেছেন যে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলীর আসল কারণ পাকিস্তানের ইসলামী আদর্শের প্রতি নেতাদের বিশ্বাসঘাতকতা। তিনি বিশেষ ভাবে দায়ী করেছেন আইয়ুবী শাসনকে, যার স্বৈরাচারের দরুন ‘সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্টসুলভ মনোভাব শিকড় গাড়িয়াছে এবং জনগণ পাকিস্তানী আদর্শ হইতে সরিয়া গিয়ছে।’৭ এদের চোখে মূল বিপত্তিটা হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্টসুলভ মনোভাবের বিকাশ। সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি আরও যা বলেন তা কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। বলেন, “শেখ মুজিবুর রহমান হয়ত বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব পোষণ করিতেন, কিন্তু তিনি কখনও প্রকাশ্যে স্বাধীনতার কথা বলেন নাই।

…মওলানা ভাসানী প্রকাশ্যে বিচ্ছিন্নতা দাবী করিয়াছেন এবং এই ধারণা জনপ্রিয় করার জন্য গোটা পূর্ব পাকিস্তান সফর করেন। …বিচ্ছিন্নতার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু যারা প্রকাশ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাদের তো গ্রেফতার করা হয় নি।”৮   তিনি অবশ্য জানতেন না যে হানাদারদের হাতে গ্রেফতার হওয়ার জন্য মওলানা ভাসানী অপেক্ষা করেন নি, এপ্রিলেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। দেখা যাচ্ছে ২৭ নভেম্বর, পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ শুরুর যখন কয়েকদিন মাত্র বাকি, গোলাম আযম তখনও ভাসানীকে ভুলতে পারেন নি। রাওয়াল পিণ্ডিতে আইনজীবী সমিতির এক সভাতে ‘দেশেপ্রেমিক জনগণ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত’ ঘোষণা দিয়ে তিনি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ তৎপরতার জন্য প্রধানত মওলানাকেই দায়ী করেছেন।৯   এর পরে অবশ্য তিনি পূর্ববঙ্গে আর ফেরেন নি, ইসলামের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধও করেন নি, যুদ্ধশেষে পাকিস্তানেই থাকেন নি, তার চেয়েও অধিক জাতীয়তাবাদী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ভয়ে অত্যন্ত দ্রুত বেগে পিণ্ডি ছেড়ে সৌদি আরবে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।

হিন্দু মৌলবাদীদের গোঁড়ামি, শ্রেণী-বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নিম্নবিত্তদেরকে উত্ত্যক্ত করেছে, উঠতি মধ্যবিত্ত মুসলমানদেরকে উৎসাহিত করেছে পাকিস্তান দাবীর পক্ষে অবস্থান নিতে। গান্ধীজি নিজে অচ্ছ্যুৎ প্রথার বিরুদ্ধে জীবনভর সংগ্রাম করেছেন, কিন্তু বর্ণভেদ উচ্ছেদের দাবীতে কখনোই সরব হন নি। বর্ণভেদ যে আসলে শ্রেণীবিভাজনই, ধর্মের আচ্ছাদনে সে যে নিজেকে স্থায়ী করে রাখতে চায়, এটা কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে যাঁরা মানতেন তাঁরাও নিজেদের বস্তুগত স্বার্থে এর বিরুদ্ধে বলতে চান নি।

ধর্মকে ব্যবহার করে যারা জাতীয়তাবাদীর রাজনীতি করেছে তাদের মধ্যে ছিল নেজামে ইসলাম পার্টি। এটির আবির্ভাব ঘটে ১৯৫৪-র নির্বাচনের সময় এ কে ফজলুল হকের হাত ধরে। হক সাহেবের নিজের পার্টি বলতে তখন তেমন কিছু ছিল না, তাই ভুঁইফোড় ওই দলটিকে পেয়ে তাঁর খুশি হবারই কথা; ওদিকে নেজামে ইসলামও দেখেছে আত্মপ্রকাশের জন্য হক সাহেবের হাত ধরতে পারাটা হবে মস্ত সুযোগ। ওই মহাসুযোগের তারা পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছে। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে ক্ষোভের সঙ্গে লিখছেন, “নামও শুনি নাই এমন দলের আবির্ভাব হল। হক সাহেব খবর দিলেন ‘নেজামে ইসলাম পার্টি’ নামে একটা পার্টির সাথে দস্তখত করেছেন। তাদেরও নিতে হবে।” এভাবে তারা ঢুকে গেল। শুধু ঢুকল না, এর পরে যা করল তা আরও চাঞ্চল্যকর। শেখ সাহেবের বর্ণনায় : “নেজামে ইসলাম দল কয়েকজন মওলানা সাহেবের নাম নিয়ে এসেছে, তারা দরখাস্তও করে নাই। তাদের সব কয়েকজনকে নমিনেশন দিতে হবে। এই দল একুশ দফায় দস্তখত করে নাই। তবে এই দলের প্রতিনিধি একটা লিস্ট দাখিল করলেন যাদের নমিনেশন দেওয়া যাবে না। কারণ তারা সকলেই নাকি কমিউনিস্ট।”১০ তাঁদের মওলানা সাহেবদের তো নিতে হবেই, সন্দেহভাজন কমিউনিস্টদেরকেও তাড়াতে হবে। একটা নয় দু’টি আবদার। বলাবাহুল্য দু’টি আবদারই মেনে নেওয়া হয়েছিল। মওলানা সাহেবরা নমিনেশন পেয়েছেন, এবং তাঁদের দৃষ্টিতে যাঁরা কমিউনিস্ট তাঁরা পান নি।

ঘটনা অবশ্য আরও একটা ঘটেছে। সেটা হলো একুশ দফার মূলনীতিতেই পরিবর্তন আনা। একুশ দফাতে দস্তখত না-করলেও নেজামে ইসলামের চাপেই একুশ দফার তালিকায় মাথার ওপরেই লেখা হয়েছিল, ‘কোরান ও সুন্নার মৌলিক নীতির খেলাপ কোনো আইন প্রণয়ন করা হইবে না এবং ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে নাগরিকদের জীবনধারণের ব্যবস্থা করা হইবে।’ অথচ একুশ দফার প্রথম দাবীই ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার, এবং বাকি সব দাবীও ছিল এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণরূপে রাজনৈতিক চরিত্রে ধর্মনিরপেক্ষ, আদর্শগত ভাবে ইহজাগতিক। শিরোধার্য নীতিটি এসব দাবীর বরখেলাপ বৈকি।

উপমহাদেশে মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুদের সংখ্যা ছিল তিনগুণ, এবং তাদের একাংশের মৌলবাদী তৎপরতা ছিল আরও প্রবল। এর প্রকাশ রাজনৈতিক ও সামাজিক উভয় দিক দিয়েই ঘটেছে। সমাজ থেকেই উঠে এসেছে রাজনীতিতে, আবার রাজনীতির থেকে চুঁয়ে পড়েছে সমাজে। সামাজিক তৎপরতাটি ছিল বর্ণবাদী। হিন্দু ব্রাহ্মণরা মুসলমানদের তো বটেই, নিম্নবর্ণের হিন্দুদের প্রতিও নির্মম বিদ্বেষ প্রকাশ করতো, ছুঁলে জাত যাবে এমন মনোভাব কেবল ধারণ করতো না, প্রকাশও করতো। শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণ করেছেন যে ছেলেবেলায় তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল ননীকুমার দাসের সঙ্গে। ননী তাঁদের বাসায় আসত, কখনো কখনো একসাথে খেতও। নিজে থাকতো সে তার কাকার বাসায়। একদিন ননী কিশোর মুজিবকে বাসায় নিয়ে নিজের ঘরে বসায়, আর তাতেই প্রলয় কান্ড ঘটে। ননীকে তার কাকীমা খুব করে বকেছেন, নিজে ঘর পরিষ্কার করেছেন, ননীকে দিয়ে ঘর ধুইয়ে তবে ছেড়েছেন।১১ এমন ঘটনা যে ব্যতিক্রম ছিল তা নয়, সেকালের মানুষদের জন্য এ ধরনের অভিজ্ঞতা ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। বর্ণহিন্দুরা নিজেদেরকে স্বতন্ত্র জাতি বলেই মনে করতো।

এই যে ইসলামে বৈপ্লবিক ভূমিকা নিয়ে রাজনীতিতে এগুনো একে কট্টরপন্থী ধর্মীয় মৌলবাদী বলা অন্যায় হবে ঠিকই, কিন্তু এ যে উদারনৈতিক হলেও মৌলবাদী সেটা কিন্তু মানতেই হবে। বিপ্লবের আওয়াজ তোলে, কিন্তু আসল বিপ্লবটা যে সমাজের ভেতরকার শ্রেণীসম্পর্কের ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনার সে-ব্যাপারটাকে আওয়াজের আড়ালে ঢেকে দেয়।

আশরাফ আতরাফে ব্যবধানটা মুসলমান সমাজেও ছিল বৈকি, কিন্তু বর্ণভেদের তুলনায় সেটা সামান্য ব্যাপার। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক অজিত কুমার গুহের একটি বক্তব্য স্মরণীয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় মোহাম্মদ তোয়াহাদের সঙ্গে তিনি কারাগারে ছিলেন। আলোচনা প্রসঙ্গে একদিন তিনি বলেছিলেন- দেখ তোয়াহা, শ্রেণীভিত্তি এক হলেও গরীব ভিখারীর প্রতি মুসলমান বিত্তবান এবং হিন্দু বিত্তবানদের মধ্যে এ্যাপ্রোচ-গত পার্থক্য আছে। যদি তুমি লক্ষ্য করে থাক তবে দেখবে, একজন ধনী মুসলমান কোনো ভিখারীকে সাহায্য দানে অপারগতা প্রকাশ করতে গেলে বলল : মাফ কর বাপু; আর একজন হিন্দু ভদ্রলোক বললে : ভিক্ষা-টিক্ষা নাই যাও। পুনরায় ভিক্ষার কথা উচ্চারণ করলে বলবে : বেরিয়ে যাও, বেরিয়ে যাও।১২  

হিন্দু-মুসলমান বিরোধটাকে এমন ভাবে শক্তিশালী করে তোলা হয়েছিল যে এমনকি অত্যন্ত উচ্চ মেধার মানুষকেও তা রেহাই দেয় নি, যে জন্য বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, যিনি উদারপন্থী ছিলেন, তিনিও জীবনের প্রথম দিকে কিছু দিনের জন্য হলেও হিন্দু মহাসভাতে যোগ দিয়েছিলেন। কামরুদ্দিন আহ্মদের সুযোগ হয়েছিল এ বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করার। মেঘনাদ সাহা তাঁকে বলেছিলেন যে স্কুল খোলার প্রস্তাব নিয়ে তিনি স্থানীয় এক মুসলমান জমিদারের কাছে গেলে যেভাবে অপমানিত হয়েছিলেন তাতে তাঁর মনে হয়েছিল যে হিন্দুর প্রতি মুসলমানদের ঘৃণা-বিদ্বেষ রয়েছে। কামরুদ্দিন আহ্মদ তাঁকে বলেছিলেন যে ব্যাপারটা হিন্দু-মুসলমানের নয়, জমিদার ও অজমিদারের। স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে স্কুল খোলার জন্য সাহায্য চাইতে গিয়ে বেগম রোকেয়াও ওই মুসলমান জমিদারটির কাছ থেকে ঠিক একই ব্যবহার পেয়েছিলেন।১৩   কিন্তু অনুভূতি তো যুক্তি মানে না।

হিন্দু মৌলবাদীদের গোঁড়ামি, শ্রেণী-বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নিম্নবিত্তদেরকে উত্ত্যক্ত করেছে, উঠতি মধ্যবিত্ত মুসলমানদেরকে উৎসাহিত করেছে পাকিস্তান দাবীর পক্ষে অবস্থান নিতে। গান্ধীজি নিজে অচ্ছ্যুৎ প্রথার বিরুদ্ধে জীবনভর সংগ্রাম করেছেন, কিন্তু বর্ণভেদ উচ্ছেদের দাবীতে কখনোই সরব হন নি। বর্ণভেদ যে আসলে শ্রেণীবিভাজনই, ধর্মের আচ্ছাদনে সে যে নিজেকে স্থায়ী করে রাখতে চায়, এটা কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে যাঁরা মানতেন তাঁরাও নিজেদের বস্তুগত স্বার্থে এর বিরুদ্ধে বলতে চান নি। হিন্দু মহাসভার বক্তব্য ছিল হিন্দুস্থান হচ্ছে হিন্দুদের দেশ, মুসলমানেরা এখানে বহিরাগত। তারা মানতে চায় নি যে মুসলমানদের ধর্ম বাইরে থেকে এসেছে ঠিকই কিন্তু মুসলমানরা স্থানীয়। হিন্দু মহাসভাপন্থীরা কেবল যে নিজেদের সংগঠনে ছিল তা নয়, ছিল তারা কংগ্রেসের ভেতরেও। বেশ ভালো ভাবেই ছিল। দেশভাগের উচ্চ চাপটা এরাই তৈরী করেছিল, পরিণতি কী দাঁড়াবে তা নিয়ে মাথা ঘামায় নি। এরা এখনও আছে। কেবল যে আছে তা-ই নয়, বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতাই দখল করে রয়েছে। যার দরুন জাতি ও শ্রেণী কোনো সমস্যা সমাধানের পথেই অগ্রগতি নেই।

 

তথ্যসূত্র: 
৪. মোহাম্মদ তোয়াহা, স্মৃতিকথা, ঢাকা, ২০১৬, পৃ ৪৭
৫. আহমদ রফিক, ভাষা-আন্দোলেনর ইতিহাস বিকৃতি : তমদ্দুন মজলিস ও কমিউনিস্ট পার্টি, ঢাকা, ২০১৭, পৃ ৩৫
৬. ঐ, নানা পৃষ্ঠায়
৭. সংবাদপত্রে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা, সম্পাদক দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস, ঢাকা, ২০১৩, পৃ ৩৭২
৮. ঐ, পৃ ২০২
৯. ঐ, পৃ ২৩৮
১০. শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ঢাকা, ২০১২, পৃ ২৫২-৫৩
১১. ঐ, পৃ ২৩
১২. মোহাম্মদ তোয়াহা, প্রাগুক্ত, পৃ ৩৯
১৩. কামরুদ্দীন আহ্মদ, বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ, ঢাকা ১৯৭৫, প্রথম খ-, পৃ ৮৮-৮৯

আরো পড়তে পারেন

একাত্তরের গণহত্যা প্রতিহত করা কি সম্ভব ছিল?

২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানি নরঘাতকেরা যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই এক রাতেই শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় তিন হাজার। এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা একতরফাভাবে….

ভাষা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা

আগের পর্বে পড়ুন— চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল) ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে দুই হাজার মাইল দূরত্বের….

চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল)

আগের পর্বে পড়ুন— বায়ান্নর ঘটনা প্রবাহ একুশের আবেগ সংহত থাকে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেও। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান এক বিবৃতিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। আওয়ামি লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম কমিটির সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র….

error: Content is protected !!