Author Picture

সমুদ্র অর্থনীতি

গোলাম শফিক  


সমুদ্র সম্পদে সমৃদ্ধ স্বদেশ- এ অনুপ্রাসে একটুও অতিশয়োক্তি করা হয়নি। সমুদ্রের এ সমৃদ্ধির পশ্চাতে যা সেটি হচ্ছে সমুদ্র অমীয় শক্তির এক বিশাল আধার। সম্প্রতি ‘মনোরহ্যাফিশ শুনি’ প্রজাতির যে স্পঞ্জটির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে সেটি বেঁচে আছে ১১ হাজার বছর যাবৎ। জানিয়েছেন প্রাণি গবেষক মারাহ জে হার্ডট। স্থলচর কোনো প্রাণিরই এ ক্ষমতা নেই। আমাদের শারীরিক ক্ষমতা খুবই সীমিত। তবে আশা করা যায় এ প্রণিটির জিন মানবদেহে প্রবিষ্ট করানো সম্ভব হলে মানুষও বাঁচবে কয়েক হাজার বছর। দুনিয়াটাকে নরক বানাতে ভবিষ্যতে এ চেষ্টা কেউ করতেও পারেন। সমুদ্র সম্পদে সমৃদ্ধ স্বদেশ- এ অনুপ্রাসে একটুও অতিশয়োক্তি করা হয়নি। সমুদ্রের এ সমৃদ্ধির পশ্চাতে যা সেটি হচ্ছে সমুদ্র অমীয় শক্তির এক বিশাল আধার। সম্প্রতি ‘মনোরহ্যাফিশ শুনি’ প্রজাতির যে স্পঞ্জটির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে সেটি বেঁচে আছে ১১ হাজার বছর যাবৎ। জানিয়েছেন প্রাণি গবেষক মারাহ জে হার্ডট। স্থলচর কোনো প্রাণিরই এ ক্ষমতা নেই। আমাদের শারীরিক ক্ষমতা খুবই সীমিত। তবে আশা করা যায় এ প্রণিটির জিন মানবদেহে প্রবিষ্ট করানো সম্ভব হলে মানুষও বাঁচবে কয়েক হাজার বছর। দুনিয়াটাকে নরক বানাতে ভবিষ্যতে এ চেষ্টা কেউ করতেও পারেন।

ধরিত্রীর মোট আয়তনের ৭১ ভাগই সমুদ্র। এ সমুদ্র এক শক্তির নাম। এ শক্তিই মাতৃবৎ ২৯ ভাগ ভূখ-কে অহর্নিশ শীতল রাখে। সমুদ্রশক্তির দখল নেয়ার জন্য এ যাবৎ পৃথিবীতে বড়ো বড়ো যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে (“গ্রিক পুরাণ যদি বাদ দেই তাহলে ত নিশ্চিত জানি/নারী নয়, সমুদ্রের উপর প্রভুত্ব বিস্তারই ছিল/ট্রোজান যুদ্ধের মূল কারণ”, শান্তনু কায়সার, রাখালের আত্মচরিত)। সমুদ্র ও নদী অতি প্রাচীনকাল থেকেই মানব সভ্যতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সমুদ্র-নদীতীরেই গড়ে উঠেছে আধুনিক শহর, বন্দর, বসতি ও সভ্যতা। নদী ও সমুদ্রের এ বিশাল জলরাশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ ও বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে অপরিহার্য। বিশ্ববাণিজ্যের ৮০% পরিবহনই সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। বৈশ্বিক শিল্প ও প্রকৃতিভিত্তিক পর্যটন সম্প্রসারণে সমুদ্র ও উপকূলীয় পরিবেশ একটি অন্যতম উপাদান। বিশ্বের ৩২% হাইড্রোকার্বন শক্তি (তেল, গ্যাস, অন্যান্য জ্বালানি) বিস্তৃত সমুদ্র তলদেশে থেকে আসে। সমুদ্র তলদেশের খনিজ সম্পদের উপস্থিতি সাগরে অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। নবায়নযোগ্য ‘নীল শক্তি’ বায়ু, তরঙ্গ, জোয়ার, তাপ এবং জৈববস্তুপুঞ্জের উৎস থেকে উৎসারিত।

“কি কথা শুনাতে চাও, কাকে কি কহিবে বন্ধু তুমি?
প্রতীক্ষায় চেয়ে আছে ঊর্ধ্বে নীলা নিম্নে বেলা-ভূমি।’’
কাজী নজরুল ইসলাম-এর ‘সিন্ধু’ কবিতার প্রথম তরঙ্গে এভাবেই ফুটে উঠেছে সমুদ্রের পরিচয়। সমুদ্র এক রহস্যের আধার, সে আকাশের নীল রঙ নিয়ে নিজের জলকে নীলাম্বর করেছে। ঊর্ধ্বে আকাশ, নিম্নে বালুকারাশি যাকে আশ্রয় করে মাঝখানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে অশান্ত সমুদ্র। কিন্তু সে যেন কী বলতে চায় তার রহস্য, প্রাণপ্রাচুর্য আর ঐশ্বর্য সম্পর্কে। পুরাণও সমুদ্রের অন্তহীন প্রাণ-ঐশ্বর্য সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়, “মন্থন-মন্দার দিয়া দস্যু সুরাসুর/মথিয়া লুন্ঠিয়া গেছে তব রত্নপুর (সিন্ধু, তৃতীয় তরঙ্গ)।’’ সমুদ্র যে সর্বকালেই ধনরত্নে ভরপুর ছিল এ বিষয়ে আমরা নিঃসন্দেহ। পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ এ রহস্যাধারে প্রাকৃতিক উপাদানের পাশাপাশি ক্রমে যুক্ত হয়েছে মনুষ্যসৃষ্ট উপাদান। সেটিও নজরুল-সাহিত্যে সুনিপুণ দক্ষতায় প্রতিফলিত হয়েছে:

উড়ে চলে মেঘের বেলুন,
“মাইন’’ তোমার চোরা পর্বত নিপুণ।
হাঙ্গর কুম্ভীর তিমি চলে “সাব্মেরিন’’,
নৌ-সেনা চলিছে নীচে মীন!
সিন্ধু-ঘোটকেতে চড়ি’ চলিয়াছ বীর
উদ্দাম অস্থির!
(দ্বিতীয় তরঙ্গ)

কিন্তু এ ঐশ্বর্যাধারকে চিনতে আমরা অনেক বিলম্ব করে ফেলেছি। পৃথিবীর দেশে দেশে, সমুদ্র সম্পদ আহরণ করে নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের যাত্রা শুরু হয়েছে বহু পূর্বেই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতই এ কাজে হাত দিয়েছিল আনুমানিক ২ দশকেরও পূর্বে। ২০১২ সালে যে মিয়ানমারের সাথে আমরা ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র জয় করেছি তারাও এ কাজে যথেষ্ট পুরনো। ক্রমান্বয়ে তাদের গবেষণা সমাপ্ত করে এখন তারা সমুদ্রের তলদেশ থেকে জ্বালানি আহরণের কাজে ব্যস্ত। অথচ আমরাও শুনতাম ৩ দশক পূর্বেই যে, তেল-গ্যাসের উপর ভাসছে বঙ্গোপসাগরের জল। কিন্তু কারিগরী জ্ঞানের অভাব, ব্যয় বাহুল্য, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও যথাযথ উদ্যোগের অভাবে এসব বিষয়ে কোনো আশার সঞ্চার হয়নি। তবে বর্তমান সরকারের অধীনে দেশের কিছু কিছু ক্ষৈত্রিক (sectoral) উন্নতির প্রেক্ষাপটে সময় ক্রমান্বয়ে পাল্টে যাচ্ছে।

কিন্তু এ ঐশ্বর্যাধারকে চিনতে আমরা অনেক বিলম্ব করে ফেলেছি। পৃথিবীর দেশে দেশে, সমুদ্র সম্পদ আহরণ করে নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের যাত্রা শুরু হয়েছে বহু পূর্বেই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতই এ কাজে হাত দিয়েছিল আনুমানিক ২ দশকেরও পূর্বে। ২০১২ সালে যে মিয়ানমারের সাথে আমরা ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র জয় করেছি তারাও এ কাজে যথেষ্ট পুরনো। ক্রমান্বয়ে তাদের গবেষণা সমাপ্ত করে এখন তারা সমুদ্রের তলদেশ থেকে জ্বালানি আহরণের কাজে ব্যস্ত। অথচ আমরাও শুনতাম ৩ দশক পূর্বেই যে, তেল-গ্যাসের উপর ভাসছে বঙ্গোপসাগরের জল।

সরকারি উদ্যোগের অনুপুংখ আলোচনার পূর্বে বিশ্বব্যাপী Blue Economy বা  নীল অর্থনীতির উদ্যোগটি কীভাবে রচিত হয় সে সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এটি আসলে এক বিকল্প অর্থনীতি যা কোনো জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অপূর্ণতা ঘোচাতে সক্ষম। সমুদ্রের উপর নির্ভরশীলতার এ বিকল্প পথেই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। ব্লু ইকোনমির মূল উপাদান মৎস্য ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণি, সমুদ্র তলদেশের তৈল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ, সমুদ্রনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য (Meritime Trade), পর্যটন ইত্যাদি। ২০১০ সালে Gunter Pauli’র ‘The Blue Economy: 10 years, 100 innovations, 100 million jobs’ গ্রন্থের মাধ্যমে নীল অর্থনীতি ধারণাটি জনপ্রিয় হতে থাকে, পূর্বের সবুজ অর্থনীতি নীল অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়।

তৎপরবর্তীতে ২০১২ সালে রিও ডি জেনেরোতে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development) সংক্রান্ত যে ধরিত্রী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তাতে এটিকে বলা হয়েছিল ‘নীল সমুদ্র অর্থনীতি’। তখন নেতৃবৃন্দ এর লক্ষ নির্ধারণ করেছিলেন নিম্নরূপভাবে: “Improvement of human well-being and social equity, while significantly reducing environmental risk and ecological scarcities.” সম্মেলনউত্তর গৃহীত দলিলকে জাতিসংঘ শিরোনাম দিয়েছিল ‘Future We Want..’ এতে জাতিসমূহের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সমুদ্রের অবদান বিধৃত হয়েছিল। প্রতিবেদনের এ সংক্রান্ত সারবস্তু ছিল, “We stress the importance of the conservation and sustainable use of the oceans and seas and of their resources for sustainable development.” পরে এ বিবৃতিকেই ঈষৎ পরিবর্তন করে এসডিজির ১৪ নম্বর লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। পরিবেশের অবনতিকে প্রতিরোধ করে যে উন্নয়ন পরে সেটিই এ প্রক্রিয়ার মূল উপজীব্য হয়ে দাঁড়ায়। ঐদিকে বিশ্বঅর্থনীতির অন্যতম নিয়ন্তা European Commission এক ধাপ এগিয়ে আসে। তারা নীল অর্থনীতির একটি সংজ্ঞা নির্ধারণের চেষ্টা করেন এভাবে, “All economic activities related to the oceans, seas and coasts. This includes the closest direct and indirect supporting activities necessary for the functioning of these economic sectors, which can be located anywhere, including in landlocked countries.” এ সংজ্ঞা অনুসারে আফগানিস্তান, ভুটান, লাও পিডিআর, আর্মেনিয়া, কাজাকিস্তান, মঙ্গোলিয়া, আজারবাইজান, কিরগিস্তান, নেপাল এসব দেশও নীল অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সাথে যুক্ত হতে পারবে যাদের কোনো সমুদ্রসংযোগ নেই।

২০১২ এবং ’১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে বাংলাদেশ প্রতিবেশি মিয়ানমার ও ভারতের সাথে বিবাদ মিটিয়ে বিপুল পরিমান সমুদ্রাঞ্চল জয় করে। এ বিজিত সমুদ্রাঞ্চলের পরিমান ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার যার মধ্যে এখন Exclusive Economic Zone অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আমাদের মোট সমুদ্রসীমার ২০% ভাগ উপকূলীয়, ৩৫% ভাগ অগভীর (shallow shelf sea), বাকি ৪৫% ভাগই গভীর সমুদ্র। প্রতিবেশিদের সাথে আমাদের সমুদ্র বিজয়ের পূর্বে মোট সমুদ্রাঞ্চলের পরিমান ছিল মাত্র ২,২৯৭ বর্গকিলোমিটার। এ বিপুল পরিমান প্রাপ্ত জলরাশির ৪৫% ভাগ গভীর জল থেকে আমরা এখন পর্যন্ত তেমন কিছুই উত্তোলন করতে পারছিনা, ফলে দেশ মারাত্মকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে (উল্লেখ্য যে, বিজিত সমুদ্রসীমাসহ মোট সমুদ্রের পরিমান বাংলাদেশের প্রায় সমান। মাত্র ২৬,৪৬০ বর্গকিলোমিটার কম)। কারিগরী জ্ঞান ও উপযুক্ত নৌযানের অভাবে এবং সঠিক নেতৃত্বের উদ্যোগের অনুপস্থিতিতে আমরা যুগের পর যুগ কেবল বঞ্চিত হচ্ছি। কিন্তু সরকার এ বঞ্চনার অবসান করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সমুদ্র সম্পদের বিপুল সম্ভাবনার সুষ্ঠু ব্যবহার এবং এ থেকে জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনই এখন ব্লু ইকোনমির মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সমুদ্রের মতোই এ অর্থনীতির ক্ষেত্র অনেক ব্যাপক, গভীর এবং হ্রাস-বৃদ্ধির সম্ভাবনাযুক্ত। সংক্ষেপে ক্ষেত্রগুলোর পরিচয় তুলে ধরা হল:

১. মৎস্য, একুয়াকালচার, মেরিকালচার, ইকোসিসটেম সেবা
 মৎস্য ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণি আহরণ ও প্রক্রিয়াকরণ
 একুয়াকালচার ও সামুদ্রিক একুয়াটিক পণ্য (Product)
 খাঁচায় মাছ, সামুদ্রিক শামুক, ঝিনুক, মুক্তা চাষ এবং সমুদ্রে শৈবাল চাষের প্রবর্তন
 লবণাক্ত জমির কৃষি
 কার্বন (Carbon Sinks) হিসেবে শ্বাসমূল বৃক্ষ
 
২. সামুদ্রিক জৈবপ্রযুক্তি
 ঔষধ, রাসায়নিক, সামুদ্রিক উদ্ভিদ উত্তোলন-পণ্য উৎপাদন এবং সামুদ্রিক বায়োপ্রডাক্ট
 
৩. জ্বালানি ও খনিজ
 তেল, গ্যাস, সমুদ্র তলদেশের খনিজ (তলদেশের বিরল ধাতব পদার্থ ও জ্বালানি উত্তোলন)
 নবায়নযোগ্য জ্বালানি- সামুদ্রিক বাতাস, ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাস থেকে শক্তি উৎপাদন
 
৪. সামুদ্রিক পণ্যাদি উৎপাদন
 সমুদ্র উপযোগী নৌকা, পাল, জাহাজ ও জাল উৎপাদন
 মেরিন যন্ত্রপাতির উৎপাদন ও মেরামতকরণ
 একুয়াকালচার প্রযুক্তি, সামুদ্রিক শিল্প প্রকৌশল
 
৫. নৌ-চলাচল, বন্দর ও মেরিটাইম লজিস্টিক
 জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতকরণ, জাহাজ পরিচালন ও মালিকানা নির্ধারণ, শিপিং এজেন্ট ও মধ্যস্থতাকারী (broker) ব্যবস্থাপনা, জাহাজ ব্যবস্থাপনা, লাইনার ও পোর্ট এজেন্ট, পোর্ট কোম্পানী
 জাহাজ সরবরাহ, কনটেইনার শিপিং সেবা, মাল বোঝাই ও খালাসকরণ কর্মী (Stevedore), মালামাল উঠা-নামানোর তৎপরতা
 শুল্ক পরিশোধ, freight forwarding, নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ
 অভ্যন্তরীন জল পরিবহন
 যাত্রী পরিবহনের ফেরিসেবা
 
৬. সামুদ্রিক পর্যটন
 উপকূলীয় পর্যটন, নৌবিহার পর্যটন, মেরিটাইম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণ/পরিদর্শন
 বড়শিতে সামুদ্রিক মৎস্য শিকার, পালতোলা ও ইঞ্জিন নৌকায় সমুদ্র ভ্রমণ, Water skiing, Jet skiing, সার্ফিং, স্নোরকেলিং, স্কুভা ডাইভিং ও সমুদ্রে সাঁতার
 উপকূলীয় অঞ্চলে পাখি পর্যবেক্ষণ, তিমি ও ডলফিন পর্যবেক্ষণ, উপকূলীয় প্রাকৃতিক স্থাপনাসমূহে পরিভ্রমণ, সমুদ্র সৈকত, নদীতীর ও দ্বীপ পরিভ্রমণ
 
৭. নির্মাণাদি ও সামুদ্রিক বাণিজ্য
 সামুদ্রিক নির্মাণাদি (Marine Construction) ও প্রকৌশল
 সামুদ্রিক আর্থিকসেবা, সামুদ্রিক আইনগত সহায়তা, সামুদ্রিক বীমা, জাহাজ অর্থায়ন ও প্রাসঙ্গিক সেবা, চুক্তিতে জাহাজ ভাড়া, গণমাধ্যম এবং প্রচার-প্রকাশনা
 
৮. মেরিন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি
 মেরিন প্রকৌশল পরামর্শ সেবা, আবহাওয়া বিষয়ক পরামর্শ সেবা, পরিবেশ বিষয়ক পরামর্শ, hydro-survey consultancy, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শসেবা
 ICT solutions, geo-informatics services, yatch design, submarine telecom etc.
 
৯. সবুজ পরিবেশ উপাদান সমূহ
 জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি
 বর্জ্য ও সমুদ্র দূষণ
 দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
 ধ্বংসোন্মুখ জীববৈচিত্র্য
 Unsustainable Fisheries
 নদীশাসন ও ড্রেজিং
 উপকূল রক্ষা ও কৃত্রিম দ্বীপ উন্নয়ন
 উপকূলীয় সবুজায়ন
 শ্বাসমূল বন রক্ষা
 
১০. নিরাপত্তাজনিত উপাদানসমূহ
 স্টেকহোল্ডারদের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা
 Maritime surveillance (search and rescue)-এর মাধ্যমে পরিবীক্ষণ ও সমুদ্র এলাকা রক্ষা করা
 উদ্ধার অভিযান পরিচালনা
 অবৈধ মাছ ধরা প্রতিরোধ করা
 
১১. শিক্ষা ও গবেষণা
 শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়ন
 সমুদ্রবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও উদ্ভাবন
 
১২. অন্যান্য বিষয়
 সমুদ্র সুশাসন (Ocean Governance)
 মানব সম্পদ উন্নয়ন
 সুশাসন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
 সমুদ্রনির্ভর কর্মসংস্থান।
খাদ্য নিরাপত্তা, সামুদ্রিক বাণিজ্য, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, জাহাজভাঙ্গা-নির্মাণ-মেরামত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন, সামুদ্রিক পর্যটন, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এসব সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশে এখন আর নীল অর্থনীতির কোনোই বিকল্প নেই। এসব সম্ভাবনার কিঞ্চিৎ পরিসংখ্যান উপস্থাপন করলে বিষয়টি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন সম্ভব হতে পারে:
 
খাদ্য নিরাপত্তা
আমরা জানি যে, বঙ্গোপসাগর হচ্ছে জীববৈচিত্র্যের এক অমিত সম্ভাবনাময় আধার, এসবের মধ্যে প্রধান হচ্ছে রকমারি মাছ, চিংড়ি, ছোটবড় খোলস-প্রাণি, কাঁকড়া, স্তন্যপায়ী প্রাণি ও সমুদ্রউদ্ভিদ। বর্তমান পৃথিবীতে ৫০-৬০% ভাগ ইলিশ মাছ বাংলাদেশেই ধরা পড়ে। প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন্সে মোট ২৩৪ প্রজাতির মাছ সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে যেসবের ৯৮ প্রজাতি প্রবালসংশ্লিষ্ট। যদি এসব প্রজাতির মাছ উন্নত পদ্ধতিতে ধরা এবং সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় তবে বাংলাদেশে বিকল্প ধারায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
 
সামুদ্রিক বাণিজ্য
বাংলাদেশে নৌ-পরিবহন ও উপকূলীয় সংস্কৃতি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এ সংস্কৃতি হাজার বছরের পুরনো যা অদ্যাবধি বহমান রয়েছে। ২০১৩-২০১৪ সালে সমুদ্রপথের আমদানি-রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের মাত্র ৩টি জাহাজ রয়েছে বিধায় বিদেশী জাহাজের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় অধিকাংশই বিদেশ চলে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন সম্প্রতি ৬টি জাহাজ ক্রয়ের পরিকল্পনা করছে।
 
জাহাজভাঙ্গা, নির্মাণ, মেরামত
জাহাজভাঙ্গা ও নির্মাণ শিল্প বর্তমানে নীল অর্থনীতিতে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে। দেশে এ খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তবে এ ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প পৃথিবীতে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১২৫টি জাহাজভাঙ্গা চাতাল রয়েছে, এসব থেকে বার্ষিক আয় হয় প্রায় ২.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
 
সামুদ্রিক পর্যটন
বাংলাদেশে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ পর্যটন এতো বৃদ্ধি পেয়েছে যে, পর্যটন মৌসুম বিশেষত শীতকালে সুন্দরবন, সেন্টমার্টিন্স, কক্সবাজার, পতেঙ্গা ও কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত এবং এসবের আশেপাশের হোটেল, মোটেল ও অতিথিশালাসমূহে তিল ধারণের ঠাঁই থাকেনা। সে কারণে এসব স্থাপনায় ব্যাপক কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে।
মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা জয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আইনগত লড়াই চালিয়ে যেতে সম্পূর্ণভাবে সক্ষম ছিল। বিষয়গুলো দেখভাল করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের Maritime Affairs Unit এ ইউনিটের দায়িত্বে আছেন একজন সচিব, যিনি নৌবাহিনীর অভিজ্ঞ ও অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার এডমিরাল (জনাব মো. খোরশেদ আলম, এনডিসি, পিএসসি)। এ ইউনিট দীর্ঘদিন ব্যাপক আইনগত ও কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে। এ গতিশীল তৎপরতার ফলে সমুদ্র জয়ের পর কূটনৈতিক বিষয়গুলোকে ছাপিয়ে বর্তমানে আর্থিক বিষয়াদি মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমতাবস্থায় সরকার অনুধাবন করেছে যে, ব্লু ইকোনমি সংক্রান্ত আর্থিক বিষয়াদি প্রক্রিয়াকরণ, নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়ের জন্য এ বিষয়ে পৃথক সেল গঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, যার ফলে এক সরকারি আদেশে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আওতায় সৃষ্টি হয় ‘ব্লু ইকোনমি সেল’। জার্মানিতে অবস্থিত International Tribunal for the Law of the Sea (ITLOS)-এর এক রায়ের মাধ্যমে ২০১২ সালের ১৪ মার্চ বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছ থেকে অন্য একটি সামুদ্রিক বাংলাদেশ জয় করে। এর ফলে বাংলাদেশ ২০০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে Exclusive Economic Zone Ges এবং মহিসোপানে ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে যাবতীয় প্রাণিসম্পদ ও অপ্রাণি সম্পদের উপর সার্বভৌম অধিকার লাভ করে। অনুরূপ বিজয়ের পথ ধরে ২০১৪ সালের ০৭ জুলাই Permanent Court of Arbitration-এর আর এক আন্তর্জাতিক রায়ে মহিসোপানে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল বর্ধিতাংশে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে সমুদ্র জিতে নেয় এবং বিজিত সমুদ্রাঞ্চলের সকল জীবিত ও খনিজ সম্পদের উপর একচ্ছত্র অধিকার লাভ করে। বাংলাদেশের ১৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বার্ষিক জিডিপি যা বিশ্বে ৪৪তম, তাতে সমুদ্র সম্পদের বিরাট ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা
২০১৪ সালের ১লা সেপ্টেম্বর ব্লু ইকোনমির উপর ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কর্মশালায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতির উপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, সমুদ্রনির্ভর কর্মকা- বাংলাদেশের উন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আমাদের তৃতীয় প্রতিবেশি। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ৯০% ভাগ সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। নীল অর্থনীতি বিষয়ক উক্ত কর্মশালায় প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছিলেন যে, এতোদিন প্রতিবেশি দেশসমূহের সাথে আমাদের সমুদ্রসীমা বিভাজিত ছিলনা বিধায় আমরা সমদ্রসম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণে সক্ষম ছিলাম না। সে করণে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ব্লু ইকোনমির ধারণাটি অনেক বিকশিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেছে।

সরকারের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় এ সংক্রান্ত যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তাতে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ব্লু ইকোনমির সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কাজ সমন্বয় করবে। আর এ উদ্দেশ্যে উক্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে সৃজিত হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্লু ইকোনমি সেল। এ সেল সময়ে সময়ে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মাধ্যমে অর্জিত অগ্রগতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবহিত করবে। তাছাড়া নির্দিষ্ট সময়ান্তর বিভিন্ন সভা ও সম্মেলন আহ্বানের দায়িত্বও এ সেলের উপরই বর্তেছে।

এর পূর্বেই ২০১৪ সালের ২০ আগস্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভার সিদ্ধান্তের অনুবৃত্তিক্রমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধি সমন্বয়ে ‘সমুদ্র সম্পদ আহরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা বিষয়ক’ ২৫ সদস্যের একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হচ্ছেন এ কমিটির সমন্বয়কারী যে কমিটির মূল কাজ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাসমূহের স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন মনিটর করা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের ৩০ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাসমূহকে তিনমাস অন্তর সময়াবদ্ধ (স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি) কর্মপরিকল্পনা পেশের নির্দেশনা প্রদান করা হয়। বর্তমানে সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে সরকারের পক্ষে ব্লু ইকোনমি সেল সকল মন্ত্রণালয়ের সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা সমন্বয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত আছে। এ সেলের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৭ সালের ০৫ জানুয়ারি যেটির উদ্বোধন করেছিলেন বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, এমপি। উল্লেখ্য যে, মন্ত্রী হিসেবে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। সে কারণে পুরো খাতের সার্বিক কর্মকা-ই পরিচালিত হচ্ছে তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বের ছায়াতলে। বর্তমানে এসডিজির ১৪ নম্বর লক্ষ্য বাস্তবায়নের অগ্রগতি তদারকিসহ ব্লু ইকোনমির সার্বিক কর্মকা-ই নিয়মিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মনিটর করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ব্লু ইকোনমির কার্যক্রম সমন্বয় সংক্রান্ত যে ১৫টি সিদ্ধান্ত ইতোপূর্বে প্রদান করা হয়েছিল সেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ গুলোকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী কার্যক্রমসমূহ পরিচালিত হচ্ছে। বিষয়াটি সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা প্রদানের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে এগুলো উল্লেখ করা হল:

ক) সমুদ্রসীমা অর্জনের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা শীঘ্র স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। এসকল কার্যক্রম মনিটরিং করার লক্ষ্যে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে এটা সমন্বয় করা হবে।
 
খ) সমুদ্রের কোন কোন এলাকায় কী কী খনিজ সম্পদ, মূল্যবান অন্যান্য সম্পদ ও মৎস্য সম্পদ ইত্যাদি রয়েছে তা দ্রুত সার্ভে করার লক্ষ্যে প্রয়োজনে নিজস্ব জাহাজের পাশাপাশি ভাড়ায় জাহাজ সংগ্রহের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। একই সাথে সমুদ্র সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও আহরণের জন্য গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর বিভিন্ন সংস্থার অনুকূলে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ প্রদান করবে।
 
গ) সমুদ্র সম্পদ রক্ষা, সমুদ্রের উপকূলীয় এলাকা ও গভীর সমুদ্র এলাকার নিরাপত্তা বিধানের জন্য বাংলাদেশ কোস্টগার্ড বাহিনী ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
 
ঘ) সমুদ্র ও নদীর মোহনা এলাকায় জেগে উঠা নতুন চর স্থায়ী করার লক্ষ্যে বনায়ন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। সমুদ্রের কাছাকাছি/নিকট দূরত্বে জেগে উঠা চরসমূহকে ভূমি পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মাধ্যমে একত্রীকরণ করতে হবে।
 
ঙ) সন্দীপ এলাকায় ক্রস ড্যাম নির্মাণ করা যাবে কিনা এবং ক্রস ড্যাম নির্মাণ করলে ভোলা জেলায় এর কোন প্রভাব পড়বে কীনা সে বিষয়ে স্টাডি করতে হবে।
 
চ) বাংলাদেশ-ভারত-শ্রীলংকা-মালদ্বীপ এই চারটি দেশের সমন্বয়ে সী ক্রুজের/কোস্টাল ট্যুরিজমের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে নৌ প্রটোকল, আইন ইত্যাদি রিভিজিট করা যেতে পারে।
 
ছ) বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার তেল, গ্যাস, মূল্যবান খনিজ সম্পদ, মৎস্য সম্পদ আহরণ ইত্যাদির জন্য দক্ষ জনবল তৈরী করতে হবে।
 
জ) বিভিন্ন সরকারী বিশ^বিদ্যালয়ে সমুদ্র বিজ্ঞান বিষয়ক কোর্স চালু করতে হবে।
ঝ) দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষত বরগুণা জেলা শিপ বিল্ডিং এবং শিপ রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে তুলতে হবে। সমুদ্র বন্দর থেকে নদীপথে কন্টেনার পরিবহন করতে হবে যাতে মহাসড়কের ওপর চাপ কম পড়ে।
 
ঞ) সমুদ্র থেকে তেল, গ্যাস আহরণের সময় প্রকৃতি সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্রে ক্ষতির পরমাণ সর্বনি¤œ পর্যায়ে রাখতে হবে। গভীর ও অগভীর সমুদ্রের তেল গ্যাস ব্লকসমূহ কোন একক কোম্পানীর নিকট লীজ দেয়া যাবে না। দেশের জনগণের কল্যাণ ও জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তেল গ্যাস আহরণের জন্য ব্লক লীজ দিতে হবে।
 
ট) দেশের সমুদ্রসীমায় বিদেশী ট্রলার/জাহাজের অননুমোদিত ফিশিং এবং অবৈধ ট্রলার/জাহাজের অনুপ্রবেশ রোধে মনিটরিং ও সার্ভেল্যান্স কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। গভীর সমুদ্রে মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প স্থাপন করতে হবে।
 
ঠ) কক্সবাজার-টেকনাফে ৪(চার) লেন বিশিষ্ট মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ করতে হবে। মেরিন ড্রাইভ এবং সাগর তীরের মধ্যে কোন হাইরাইজ ভবন নির্মাণ করা যাবে না।
 
ড) কক্সবাজার থেকে সমুদ্রতীর হয়ে পতেঙ্গা পর্যন্ত যাতায়াতের লক্ষ্যে সড়ক নির্মাণের বিষয়ে ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি করতে হবে।
 
ঢ) প্রতি বছর রুটিন করে আমাদের নদীগুলো ড্রেজিং করতে হবে। নদী শাসন ও নদী ড্রেজিং করে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
 
ণ) নতুন সমুদ্রসীমা অর্জনের প্রেক্ষিতে আইন, বিধি এবং প্রটোকলে কী পরিবর্তন করতে হবে তা’ লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ পরীক্ষা করে পদক্ষেপ নেবে।

এর পূর্বেই ২০১৪ সালের ২০ আগস্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভার সিদ্ধান্তের অনুবৃত্তিক্রমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধি সমন্বয়ে ‘সমুদ্র সম্পদ আহরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা বিষয়ক’ ২৫ সদস্যের একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হচ্ছেন এ কমিটির সমন্বয়কারী যে কমিটির মূল কাজ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাসমূহের স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন মনিটর করা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের ৩০ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাসমূহকে তিনমাস অন্তর সময়াবদ্ধ (স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি) কর্মপরিকল্পনা পেশের নির্দেশনা প্রদান করা হয়। বর্তমানে সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে সরকারের পক্ষে ব্লু ইকোনমি সেল সকল মন্ত্রণালয়ের সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা সমন্বয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত আছে। এ সেলের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৭ সালের ০৫ জানুয়ারি যেটির উদ্বোধন করেছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, এমপি। উল্লেখ্য যে, মন্ত্রী হিসেবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। সে কারণে পুরো খাতের সার্বিক কর্মকা-ই পরিচালিত হচ্ছে তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বের ছায়াতলে। বর্তমানে এসডিজির ১৪ নম্বর লক্ষ্য বাস্তবায়নের অগ্রগতি তদারকিসহ ব্লু ইকোনমির সার্বিক কর্মকা-ই নিয়মিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মনিটর করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ব্লু ইকোনমির কার্যক্রম সমন্বয় সংক্রান্ত যে ১৫টি সিদ্ধান্ত ইতোপূর্বে প্রদান করা হয়েছিল সেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ গুলোকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী কার্যক্রমসমূহ পরিচালিত হচ্ছে। বিষয়াটি সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা প্রদানের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে এগুলো উল্লেখ করা হল:

ব্লু ইকোনমির কার্যক্রমে মৎস্য খাতের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু আমরা গভীর সমুদ্র থেকে এখনও কোনো মৎস্য আহরণ করতে সক্ষম হইনি যেভাবে সক্ষম হয়েছে ভারত, শ্রীলংকা, মালদ্বীপের মতো দেশগুলো। বর্তমানে ‘মীন সন্ধানী’ নামক জাহাজটি সীমিত পরিসরে মৎস্য অনুসন্ধানের কাজে ব্যাপৃত রয়েছে। আশা করা যায় শীঘ্রই তারা টুনামাছসহ অন্যান্য গভীর জলের মাছ ধরতে সক্ষমতা অর্জনের কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করবে। ইতোমধ্যেই ‘সামুদ্রিক মৎস্য আইন ২০১৭’ মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে। তাছাড়া পিরোজপুর, পটুয়াখালী, মংলা ও লক্ষীপুরে সামুদ্রিক মাছ প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও রপ্তানিকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সমুদ্র থেকে তৈল-গ্যাস আহরণের সম্ভাবনা যেমন অপার, তেমনি এটি দীর্ঘদিন যাবৎ এক গণদাবী হিসেবে বিরাজ করছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এখনও আমাদের সক্ষমতা অর্জিত হয়নি। এ সক্ষমতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর এবং পেট্রোবাংলা কর্তৃক গবেষণা জাহাজ/ভেসেল ক্রয়ের উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। জিএসবি একটি Dynamic Positioning Research Vessel সংগ্রহের উদ্দেশ্যে একটি ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। প্রস্তাবিত এ গবেষণা জাহাজটি ভূতাত্ত্বিক জরিপ, Seismic survey, seabed mapping I database তৈরির কাজে ব্যবহৃত হবে।

অন্যদিকে ব্লু ইকোনমির সার্বিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সমুদ্র গবেষণার উদ্দেশ্যে পেট্রোবাংলাও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে একটি জাহাজ ক্রয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রয়োজনে ২০১০ সালের ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ এর অধীনে এ জাহাজ সংগ্রহ করা হবে। প্রস্তাবিত এ জাহাজ বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, পেট্রোবাংলা, বাপেক্স ও জিএসবি সম্মিলিতভাবে এবং প্রয়োজনানুযায়ী সময়ে সময়ে ব্যবহার করবে। সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন সরকারের আমলে ইতোমধ্যেই যে দীর্ঘ অলস সময় ব্যয় করে ফেলেছে সেটির কথা স্মরণ রেখে এ সংক্রান্ত চাহিদা নিরূপন কমিটি অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে তার প্রতিবেদন দাখিল করেছে। একটি মাল্টিরোল ওশানোগ্রাফিক জাহাজ (off the shelf/new) ক্রয়ের লক্ষ্যে জিএসবি, বাপেক্স ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে চাহিদা সংগ্রহের জন্য এ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে যে, ব্লু ইকোনমির স্বপ্ন ও উদ্যোগ বাস্তবায়নের গতি এবং চেতনার সাথে সঙ্গতি রেখে সবাই কর্মতৎপর রয়েছেন।

উল্লেখ্য যে, ১৬ মার্চ (২০১৭) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ ও বিজ্ঞান গবেষণা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের জাহাজ সংগ্রহের ইচ্ছে পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ব্লু ইকোনমির উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কারিগরী জ্ঞানের সবিশেষ ভূমিকা রয়েছে। সে কারণে নৌবাহিনীর কারিগরী সেবা গ্রহণ ও এর সাহসী ভূমিকার বাস্তব প্রতিফলন ঘটানোর জন্য সকল বিভাগই তৎপর রয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এতোদিন কোনো সাব্মেরিন ছিলনা। কিন্তু সম্প্রতি নৌবাহিনীর দৈনন্দিন কার্যক্রমের সাথে দুটি সাব্মেরিন যুক্ত হয়েছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় ৯১ বছর পূর্বে (৩১-০৭-২৬) চট্টগ্রামে বসেই লিখেছিলেন তাঁর কালজয়ী ‘সিন্ধু’ কবিতা যাতে তিনি সাব্মেরিনের কথা উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু এতো বছর পর আমাদের নৌবাহিনী সাব্মেরিনের মালিকানা অর্জন করলো। এ অর্জন নিঃসন্দেহে নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রভূত অবদান রাখবে। এ সংযোজন ব্লু ইকোনমির জন্যও ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। এমতাবস্থায় আশা করি বর্তমান সরকারের গতিশীল নেতৃত্বে সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগ ও সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ব্লু ইকোনমির কর্মসূচী বাস্তবায়নে জাতি কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হবে। সম্প্রতি (১৪ মার্চ) বাংলাদেশ সরকার কোরিয়ার পোসকো-দাইউর সাথে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে তা এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ বলেই আমাদের বিশ্বাস।

 

গোলাম শফিক: লেখক, কবি, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক। সরকারের অতিরিক্ত সচিব (সেল চীফ, ব্লু ইকোনমি সেল), বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।

 

আরো পড়তে পারেন

ঝালকাঠি জেলার পেয়ারা বাগান ও এশিয়ার একমাত্র ভাসমান হাট বাজার

‘এখানে প্রাণের স্রোত আসে যায় -সন্ধ্যায় ঘুমায় নিরবে / মাটির ভিটের পরে— লেগে থাকে অন্ধকার ধুলোর আঘ্রান/ তাহাদের চোখে মুখে’— জীবনানন্দ দাশের এই কবিতার মতো ঝালকাঠির নিভৃত পল্লীর পেয়ারা গ্রাম। ব্যবসা বাণিজ্যে ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অগ্রণী ঝালকাঠিকে ‘দ্বিতীয় কলকাতা’ বা ‘ছোট কলকাতা’ বলা হতো ব্রিটিশ আমলে। সেই অতীত ঐতিহ্যের সাথে ঝালকাঠির পেয়ারা বাগান, পেয়ারার ভাসমান….

একাত্তরের গণহত্যা প্রতিহত করা কি সম্ভব ছিল?

২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানি নরঘাতকেরা যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই এক রাতেই শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় তিন হাজার। এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা একতরফাভাবে….

ভাষা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা

আগের পর্বে পড়ুন— চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫৩-১৯৫৬ সাল) ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ও একটি সার্থক গণআন্দোলন। এই গণআন্দোলনের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো দেশপ্রেম থেকে জাত সেই অনুভূতি, যার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ রয়েছে। আর, বাঙালি জাতিসত্তাবোধের প্রথম রাজনৈতিক প্রকাশ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে দুই হাজার মাইল দূরত্বের….

error: Content is protected !!