Author Picture

স্মৃতিসিন্দুকের গুপ্তধন

মঞ্জু সরকার

চাঁদনি রাতে মরা নদীর বিস্তীর্ণ বুক এতটা মায়াবী হয়ে ওঠে, বানবর্ষার পানি ছাড়াই গ্রীষ্ম-বসন্ত— ও শরত-হেমন্তে চাঁদের আলোয় মরা নদীর যৌবন এতটাই উছলায় যে, এক সন্ধ্যায় পূর্ণিমার চাঁদ দেখে পাগল হয়ে যায় বসির। তখন নবীন যৌবন তার। তার উপর গাঁয়ের সেরা বাউন্ডুলে। গ্রামের বদ্ধ জীবন ভাল লাগে না বলে শহরে গিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছে। মেসে থেকে কলেজে পড়ে। বাইসাইকেল দাবড়ে শহরের পাকা রাস্তায় অকারণে ঘুরে বেড়ায়। প্রতি সপ্তাহে সিনেমা দেখে। ছুটিছাটায় বাড়িতে এলেও তিস্তায় মাছ ধরা কি আনন্দ-ফুর্তির খোঁজে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানোই বড় কাজ।
পাকা রাস্তা ও কারেন্টের তার তখনো আসেনি ঠ্যাংভাঙা ঘাট অবধি। সন্ধ্যাবেলা হারিকেন জ্বালিয়ে গাঁয়ের গেরস্ত ঘরের ভাল ছেলেমেয়েরা পড়তে বসে। মাটির চুলায় রান্নাবাড়ি কি ধান সেদ্ধ করার আগুন জ্বলে। ঘর-গেরস্থালীর এইসব আলো-আগুনের বুদবুদ ঠ্যাংভাঙার আদিম অন্ধকার কতটুকুই আর তাড়াতে পারে। ঋতু পরিক্রমায় ঠ্যাংভাঙার নীল আকাশে ফিরে আসে তাই পূর্ণিমা তিথির গোল চাঁদ। তখন রাতের কালো শাড়ি খুলে ধু-ধু নদীপ্রান্তর কারো সঙ্গে মিলন প্রত্যাশায় উন্মুখ হয়ে ওঠে।

বাঁধের রাস্তায় উঠে আকাশের কোণে গোল চাঁদ দেখে বসিরও আজ থমকে দাঁড়ায়। শৈশবে চাঁদকে দেখা ও ডাকাডাকির ইতিহাস বাদ দিলে, স্মরণকালে চাঁদের দিকে এভাবে তাকায়নি সে। সময়ও পায়নি। কী যে হয়, কেমন যে লাগে বোঝার জন্যই যেনবা সে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে। চাঁদের নিচে চর ও নদীসহ ঠ্যাংভাঙার প্রকৃতি, যা কিনা মনে হয় পৃথিবীর শেষ প্রান্ত অবধি বিস্তৃত, সান্ধ্য পোশাক খুলে নগ্ন হতে শুরু করেছে। উদম প্রকৃতি জ্যোৎস্নায় ভিজবে বলে স্তব্ধতার শরীর ফুঁড়ে রিরি আওয়াজ উঠছে। বসির নিজের রক্তেও শিহরণ অনুভব করে, যেন অলৌকিক কিছু একটা ঘটবে আজ।
সন্ধ্যায় গোয়ালে গরু তোলার পর গাঁয়ের গেরস্তচাষীদের রাতে তেমন কাজ থাকে না। রাতের খাওয়ার পর, ঘুমানোর আগে বাঁধরাস্তায় বসে গল্পগুজব করে তারা, বিশেষ করে গরমের দিনে। গরম পড়েনি বলেই আজ কাউকে চোখে পড়ে না তার। পড়শি ভুঁদু বাঁধ ধরে যাচ্ছিল কোথাও। বসিরের চন্দ্রাহত ঘোরলাগা দশা ঘোচাতে বলে সে, বটের গাছের ভূতে ধরিল নাকি রে? খাড়ায় খাড়ায় আসমানে কী দেখিস? কিছু না, জবাব দিয়ে বসির বটতলায় দিকে হাঁটতে থাকে। আড্ডা দেয়ার জন্য বন্ধুবান্ধব কাউকে যদি না পায়, বোল্ডারের পাড়ে বসে আজ সে গলা ছেড়ে গান ধরবে, এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়, একি বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু!
কণ্ঠে গুণগুণ গান নিয়ে বটতলায় কাছে এসে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা পেরিয়ে ডাকাতের মেয়ে দুলালিকে দেখে গান থামে, পূর্ণিমার চাঁদ দেখার মতো চমকে ওঠে আবার। দুলালি অবশ্য পূর্ণিমার চাঁদের মতো পূর্ণ হয়ে ওঠেনি এখনো। হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছে, ঢিলেঢালা ফ্রকের নিচে হাফপ্যান্ট পরে থাকে, বুকে ওড়নাও থাকে না সব সময়। ফলে বুকের দিকে তাকালে তার বড় হয়ে ওঠার লক্ষণ পষ্ট হয়ে ওঠে। দুলালির বয়সী সোমত্ত মেয়েরা সাধারণত সাঁঝের পর বাড়ির বাইরে একা বেরয় না গ্রামসমাজে। নির্জন প্রকৃতির মাঝে কিশোরী কি যুবতী কাউকে একলা পেলে শিকারি বাঘের মতো হামলে পড়ার কামনায় ধকধক করতেই পারে যে কোনো যুবকের বুক, কিন্তু বসিরের বুকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জাগার আরো কারণ আছে।

বসিরের চন্দ্রাহত ঘোরলাগা দশা ঘোচাতে বলে সে, বটের গাছের ভূতে ধরিল নাকি রে? খাড়ায় খাড়ায় আসমানে কী দেখিস? কিছু না, জবাব দিয়ে বসির বটতলায় দিকে হাঁটতে থাকে। আড্ডা দেয়ার জন্য বন্ধুবান্ধব কাউকে যদি না পায়, বোল্ডারের পাড়ে বসে আজ সে গলা ছেড়ে গান ধরবে, এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়, একি বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু!

দুলালির ডাকাত বাপ জেলে গেছে। খাজা ডাকাত ধরা পড়ে জেলে যাওয়ার পর স্বস্তি এসেছে ঠ্যাংভাঙার অবস্থাপন্ন গেরস্তবাড়িতে। বসিরের ভাইয়েরা খুশি হয়েছে বেশি। অন্যদিকে দুর্গতি বেড়েছে ডাকাতের পরিবারে। চার ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসারের হাল ধরেছে ডাকাতের বউ। পয়সা রোজগারের জন্য পুরুষ কামলা-কিষাণদের মতো ক্ষেতের কাজ করতেও দ্বিধা করে না। ঘর-সংসার সামলাতে দিনেরাতে খাটে মেয়েমানুষটি, আবার স্বামীকে জেল থেকে মুক্ত করার জন্য মামলাও চালায়। স্কুলে যাওয়ার পাশাপাশি বড় দুলালি মাকে সব কাজেই সাহায্য করে। গোপনে পুলিশকে খবর দিয়ে খাজাকে ধরিয়ে দেয়ার পর ডাকাতের পরিবারকেও গ্রামসমাজে একঘরে করার উদ্যোগ নিয়েছে বসিরের ভাইয়েরা। কিন্তু গোপনে ডাকাতের বউবাচ্চাকে সাহায্য করার জন্য খাজার সমর্থক ও দলের লোকজন তৎপর। এমনকি খাজাকে জেলমুক্ত করার জন্য প্রকাশ্যে উকিলের মতোই কাজ করে যাচ্ছে গাঁয়ের নবীন মোড়ল মহির মেম্বার। উকিলখরচ যোগানো ছাড়াও, জেলখানায় ডাকাতের সঙ্গে তার পরিবারের দেখাসাক্ষাতের ব্যবস্থাও করে দিয়েছে সে। সমাজের শত্রু ঘৃণিত ডাকাতের জন্য মহির মেম্বারের দরদ এবং তাকে মুক্ত করার জন্য চেষ্টা-তদ্বিরের কারণ কি? ডাকাতকে হাত করে চেয়ারম্যানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের শিক্ষা দেয়ার পলিটিক্স তো আছেই, তার উপর খাজা ডাকাতের অবশিষ্ট চরের জমি এবং রাস্তার ধারের বাড়িভিটেটুকু দখল করার জন্য মহির মেম্বারের গোপন মতলব আবিষ্কার করেছে অনেকেই। তবে ডাকাতের পক্ষ নেয়ার মতলব যাই হোক, ডাকাতের পরিবারকে আগলে রাখার দায়িত্বের মূলে আসল কারণটা হাতেনাতে ধরতে পেরেছে ঝগড়ি মালেকা প্রথম এবং পরে বসিরের মেজভাবি।

মহির মেম্বার বটতলায় এলে কিংবা চরে যাওয়ার সময় প্রায় দিনেই ঢুঁ মারে ডাকাতের বাড়িতে। ডাকাতের মামলা নিয়ে দুলালির মায়ের সঙ্গে জরুরি কথাবার্তা ছাড়াও আর কী বিষয়ে দু’জনে ফিসফাস কথা বলে, তা শোনার জন্য ডাকাতের বাড়িতে কেউ যায় না সাধারণত। দুলালিসহ তার ভাইবোনেরা থাকে স্কুলে কিংবা বটের তলে খেলতে যায়। কিন্তু একদিন দুলালির স্কুল বন্ধের দিনেও দুলালির মা যখন চরের জমিতে ঘাস নিড়াতে গেছে, তখনও মেম্বার বাড়িতে ঢুকে দুলালির সঙ্গে কী এত কথা বলে? অদম্য কৌতূহল নিয়ে দুলালির বান্ধবী মালেকা ডাকাতের বাড়িতে ঢুকে যা দেখেছে, তা প্রথম ফাঁস করেছে বসিরের মেজভাবীর কাছে। বসিরদের বাড়ির কেউই ডাকাতের বাড়িতে যায় না। ডাকাতের পরিবারের জন্য নিষিদ্ধ বসিরদের বাড়ি। শোনা কথা, খাজা ডাকাত জেলে বসে শপথ করেছে মুক্তি পেয়েই বসিরের ভাই নসিরকে খুন করবে। এই অবস্থাতেও দেবর সম্পর্কিত মহিরের ডাকাতপ্রীতির কারণ আবিষ্কার করতে চুপিচুপি দুলালিদের একমাত্র টিনের ঘরটির বেড়ার ফুটোয় চোখ রেখেছিল বসিরের মেজভাবী। তারপর বদ্ধ ঘরে যা দেখেছে, তার বিবরণ বিশদ না শুনেও ডাকাতের পরিবারের সঙ্গে মহিরের সম্পর্কের স্বরূপ কল্পনা করার জন্য দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লোকের অভাব নেই গ্রামে। কিন্তু শিকারি মহিরের থাবার নিচে ডাকাতের বউ নাকি মেয়ে, ঠিক কাকে দেখেছে মেজভাবী? নিশ্চিত হওয়ার জন্য একদিন মেজভাবীকে জিজ্ঞেস করেছে বসির। মেজভাবী চাপা খুশির ঝলক নিয়ে জবাব দিয়েছে, মা ও বেটি দুইটাই খারাপ। টাকা পাইলেই কাপড় তুলিয়া আগায় দেয়। নিজের পরনের শাড়ি একটুখানি তুলে, ডাকাতের স্ত্রী-কন্যার নির্লজ্জ বেশ্যাগিরির প্রমাণ দিয়ে দেবরকে সতর্ক করেছিল মেজভাবী, তুই ভুলেও ডাকাইতের বাড়ির ছায়ায় পা রাখবি না।

ডাকাতের বাড়িতে মহিরের অভিনব ডাকাতির খবরে গাঁয়ে বসিরের বয়সী ছেলেরা এতটাই কৌতূহলী হয়ে ওঠে যে, অনেকেই ডাকাতের বাড়ির চারপাশে ঘুরঘুর শুরু করে। আড়ালে আলোচনাও হয় দুলালিকে নিয়ে। দুলালির বুকের দিকে তাকিয়ে এক চ্যাংড়া তা মেপে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলে দুলালি নাকি বলেছিল, বাবা জেল থাকি বারাইলে তোর হাত কাটি দেবে।

ডাকাতের বাড়িতে মহিরের অভিনব ডাকাতির খবরে গাঁয়ে বসিরের বয়সী ছেলেরা এতটাই কৌতূহলী হয়ে ওঠে যে, অনেকেই ডাকাতের বাড়ির চারপাশে ঘুরঘুর শুরু করে। আড়ালে আলোচনাও হয় দুলালিকে নিয়ে। দুলালির বুকের দিকে তাকিয়ে এক চ্যাংড়া তা মেপে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলে দুলালি নাকি বলেছিল, বাবা জেল থাকি বারাইলে তোর হাত কাটি দেবে। আর একজন দশ টাকা দিয়ে তাকে নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ার আহ্বান জানালে, মহির চাচাকে বিচার দেয়ার ভয় দেখিয়েছে দুলালি।
চাঁদনি রাতে বটতলায় নিষিদ্ধ দুলালিকে একলা দেখে চকিতে বসিরের এতসব কথা মনে পড়ে বলেই বুক বেজায় ধকধক করে। সেই সন্ধ্যাতেই বসির প্রথম আবিষ্কার করে যেন, দুলালি বড় হয়নি শুধু, রহস্যময় যুবতীর মতো অসম্ভব সুন্দরও হয়ে উঠেছে। আশপাশ তাকিয়ে প্রথম কথা বলে বসির।
কী রে দুলালি, তুই এখানে কেন?
চাচা, হামার কালো ছাগলের বাচ্চাটা তোমার বাড়িতে দেখছেন? কোনোঠাঁই উটকায় পাই না।
হামার বাড়িতে তো যায় নাই। কোণ্ঠে হারাইল তোমার ছাগল?
তোমার ভাইয়েরা ধরিয়া খোঁয়াড়ে দিছে নাকি?
আরে না, আমি তো সারাদিন বাড়িতেই ছিলাম। আমার মনে হয় চরের দিকে গেইছে, কোণ্ঠে যেন ম্যাঁহম্যাঁহ আজয়াজ শুনলাম।
ছাগল সন্ধানী আগ্রহী কথাবার্তার মাঝে বসিরের দৃষ্টি দুলালির দিকে একাগ্র থাকে। সাঁঝের আঁধার আর চাঁদনির আলো ফিনফিনে এক ওড়না ভেদ করে আছে দুলালির উদ্ধত বুক, হাফপ্যান্ট পরায় দুলালির নগ্ন পায়ের গোছাও আজ যুবতীর পায়ের মতোই পরিপুষ্ঠ আর মায়াবী মনে হয়।
কোনপাকে ম্যাঁম্যাঁ আওয়াজ শুনলেন?
বটের তলে। আমার মনে হয়, তোমার কাল হাইলন ছাগলটাকে বটগাছের গর্তে কেউ বাঁধিয়া রাখছে দুলালি। খুঁজে দেখ গিয়া।
মিছে কথা কন!
হারাম, মিছা কথা নয়। যা, ঝুড়ির গর্তে খুঁজে দেখ।
আমার ভয় লাগে, আপনি চলেন তো চাচা, বটের ঝুড়িতে কেউ বাঁধি রাখছে নাকি দেখি।
বট গাছের গোড়ায় ঝুলন্ত শিকড়ের ফাঁকে যে গোপন ও প্রাকৃতিক খেলাঘর, সেখানে দিনের বেলায় লুকালেও কেউ দেখতে পায় না ঠিক, কিন্তু তেনাদের খপ্পরে পড়ার ভয় আছে। খেলতে গিয়ে সত্যই তেনাদের আছড় লেগেছে বেশ কয়েকটি ছেলের উপর, গলায় বড় তাবিজ ঝুলিয়েও সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারেনি একজন। জনৈক দুষ্টু শিরোমণি বটের গর্তে পায়খানা করে রেখেছিল বলে জায়গাটায় দুর্গন্ধ, খেলার আগ্রহ কমিয়েছে ছেলেদের। দুলালির ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বসির ইতিউতি তাকিয়ে, দুলালির হাত ধরে যখন বটতলায় আসে, তখন নদীর দিকে জ্যোৎস্না আরো উজ্জ্বল হতে শুরু করেছে। বটগাছের একদিকে আলোছায়া। শিকড়ের ফাঁক দিয়ে বসির যখন দুলালির হাত ধরে অন্ধকার গর্তের মধ্যে ঢোকে, দুলালির কণ্ঠে ভয় আবার কম্পন তোলে।
কই, কোণ্ঠে ছাগল?
চুপ, একদম কথা বলবি না। তাইলে তোকেও ভূতে ধরবে। ওই শোন কিসের আওয়াজ!
হালকা বাতাসে বটের পাতায় সরসর আওয়াজ ওঠে। বিপদে একমাত্র পরিচিত মানুষ বসিরের উপর নির্ভর না করে উপায় কি দুলালির? আরো শক্ত করে চেপে ধরে তার হাত। গর্তের আড়ালে বসিরই তাকে প্রথম জাপ্টে ধরে সাহস দেয়। যে নারীশরীরে আশ্রয় লাভের বাসনায় যখন তখন অসহ্য উত্তাপে ফেটে পড়ার দশা হয় শরীর ও মনের, অকস্মাৎ সেই নারীকে সর্বাঙ্গে অনুভব করে বসির মুহূর্তের জন্য দিশেহারা বোধ করে। একদিকে শিকড়ের ফাঁক দিয়ে এক ফালি জ্যোৎস্না দুলালির ফ্রকটার উপর খেলা করে। ফ্রকটার গলায় হাত ঢুকিয়ে এই প্রথম কোনো নারীর স্তন স্পর্শ-অনুভবের স্বাদ পাওয়ার সুযোগ। ও দুটির আকার, সৌন্দর্য, কোমলতা, কাঠিন্য, উষ্ণতা সবকিছুই একই সঙ্গে বোঝার জন্য মুঠো খোলে ও বাঁধে, নাকি ও দুটি নিজেই তার হাতের মুঠোয় খেলতে শুরু করে, বুঝতে না পেরে ভূতের মতো খোনা গলায় বলে বসির, তুই খুব সুন্দর রে দুলালি!

পূর্ণিমার সেই চাঁদের মতো যেন পূর্ণ হয়ে উঠেছে দুলালি। বসিরকে দেখার সময়ে তার চোখেও ছলকে উঠেছে নিষিদ্ধ খেলাঘরের স্মৃতি, এখন গোপন স্মৃতিভান্ডার ঘিরে রাখা হিংস্র সাপ ছোবল দিতে ফণা তুলবে, নাকি বাতাসের মর্মর ধ্বনির সঙ্গে বেরিয়ে আসবে অপূর্ব সৌরভ? দুলালির দিকে আর তাকাবার সাহস হয় না বসিরের।

হাত নামিয়ে প্যান্টটা খুলতে গেলে নিঃশব্দে বসিরের দু’হাত চেপে ধরে রাখে দুলালি। বসিরের আঙুল ততক্ষণে বটের প্রাকৃতিক খেলাঘরে কচি দুর্বাঘাসে ঢাকা রহস্যময় স্বর্গদরজার সন্ধান পেয়েছে যেন। দুলালির শরীরী প্রতিরোধ মুহূর্তেই চূর্ণ করে তাকে বটের গর্তে শুইয়ে দেয়। নিজের পুরো শরীর দিয়ে তাকে ঢেকে রাখে বসির। দুলালির শরীর ভেদ করে হলেও দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছার সময়টায় নাকে পাঁঠার গায়ের কিংবা পাকা তালের বোঁটকা গন্ধ এবং কানে বটপাতার পরিচিত মর্মর ধ্বনিটাও প্রবল হয়ে ওঠে।
অতপর দুলালির কান্না, নাকি দুলালির মায়ের ডাক, কোনটা আগে শুনতে পায়, বসির ঠিক মনে করতে পারে না। জীবনে প্রথম নারীসঙ্গমের ক্লান্তি নিয়ে সে দুলালিকে সতর্ক করে, এ কথা কিন্তু জীবনেও কাউকে বলিস না। তোকে অনেক টাকা দেব আমি। নুতন ছাগল কিনতে পারবি।
মোর প্যান্ট কই?
প্যান্ট খুঁজতে গিয়ে বসির দুলালির ঊরুসন্ধিতে ভেজা উষ্ণ তরল আঙুলে ছোঁয়, অন্ধকারে তার রঙ দেখা যায় না বলে নাকে নিয়েও শোঁকে। ঠিক এ সময় দুলালির মায়ের কণ্ঠ বটের তলে ধেয়ে আসে যেন। হারাজমাদি ছাগল উটকাইতে কই গেলু? ও দু-লা-লি!
দুলালিকে রেখেই বসির গর্ত থেকে বেরয়, দুলালির মা ও গ্রামসমাজের চোখে ধরা পড়ার ভয় নিয়ে নির্জন বটতলা ছেড়ে জ্যোৎস্নাধোয়া ধু-ধু চর ভেঙে নদীর দিকে হাঁটতে থাকে।

দুলালির সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হতে পরদিনই গ্রাম ছেড়ে শহরে গেছে বসির। অতপর দেশ ছেড়ে বিদেশ যাওয়ার ধান্ধায় এতটা ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে, বটগাছের প্রাকৃতিক খেলাঘরে সেই নিষিদ্ধ ঘটনা দুলালির জীবনে ও ডাকাতের পরিবারে কী প্রতিক্রিয়া এনেছে জানার চেষ্টা করেনি সে। দুলালির সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয়নি আর। বিদেশে চলে যাওয়ার পর ডাকাতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু প্রবাসের নিসঙ্গ অবসরে দেশের কথা ভাবলে বটতলার চাঁদনিরাতের ঘটনা অসংখ্যবার মনে পড়েছে। বারংবার স্মরণ করার কারণেই সম্ভবত জীবনের প্রথম সফল সঙ্গমের ঘটনাটি স্মৃতির আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠেছে, যা প্রশ্ন জাগিয়েছে অনেক সময়, দুলালিকে নিজের অজান্তে বসির ভালবেসেছে বলেই কি ভুলতে পারে না তাকে? সেই পাগলকরা জ্যোৎস্নারাতে ছাগল খোঁজার নামে প্রেমিক খুঁজতেই কি দুলালি আসে বটতলায়? বসিরকে মনে মনে পছন্দ করত বলেই কি রহস্যময় কিশোরী ধরা দেয় অত সহজে? বিদেশে বসে এসব প্রশ্নের সদুত্তর পাবার উপায় ছিল না। তবে দেশে ফেরার আগেই খাজা ডাকাতের খবর কিছুটা জানতে পেরেছিল সে বাড়ির লোকজনের কাছে।

জেল খাটার পর খাজা ডাকাতি পেশা ছেড়ে দিয়েছে। বটতলার কাছেই পাকা রাস্তার ধারে তার বাড়ি। বাড়ির সামনেই দোকান দিয়েছে একটা, মনিহারি-বনাম চায়ের দোকান। অন্যদিকে স্কুল ফাইনাল পাশ করেও দুলালির বিয়ে হয়নি এখনো। জেলখাটা ডাকাত ও চরিত্রহীনা মেয়েকে কে করবে বিয়ে? বাপের দোকানে নিজেও মনোহারি মালের মতো বসে বসে দোকান চালায় এখন।
দশ বছর পর গ্রামে ফিরে বটতলায় এসে স্মৃতির উজ্জল রত্নটিকে হাতেনাতে ছুঁয়ে দেখার উত্তেজনা অনুভব করে বসির। বটতলা থেকে দেখা যায় ডাকাতের দোকান, দোকানের বারান্দায় পাতা বাঁশের বেঞ্চিতে বসে লোকজন চা পান খাচ্ছে, দাঁড়িয়ে সদাই কিনছে কেউবা, আর দোকানের ভিতরে বসে আছে খাজা ডাকাত, বাপের পাশে বসা দুলালিও। ডাকাত কন্যার সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার অনিবার্যতায় উত্তেজিত বসিরের ভিতরে গোপন স্মৃতি ঘিরে রাখা হিংস্র কালনাগিনীটিকে দেখতে পায় যেন, ভয়ে কেঁপে ওঠে বসির। গোপন ভয়কে জয় করেই দোকানের দিকে এগিয়ে যায় সে। বিদেশ-ফেরত বসিরের দিকে মনোযোগী হয়ে ওঠে দোকানের ভিড়।
বসির পড়শি সম্পর্কে বড় ভাই খাজা ডাকাতকে সালাম দিয়ে কথা বলে প্রথম, কেমন আছেন ভাই? বিদেশে বসেই অবশ্য আপনার মুক্তি পাওয়া ও দোকান করার কথা শুনেছি।
খাজা ডাকাত জবাব দেয়, কেমন আছি গ্রামে কয়দিন থাকলে নিজের চক্ষে দেখতে পাবি। তা তোর ভাইয়েরা কয়, তুই নাকি আমার ভয়ে বাড়িতে টাকা পাঠাইস নাই, নিজেও আসিস নাই। তা এত বছর বাদে দেশে ফিরলি যে!
দেশের টান আর মায়া কি ভোলা যায় ভাই?
দেশের টান ও মায়ার সত্যতা বোঝাতে বসির উপস্থিত গ্রামবাসীর মুখের দিকে তাকায়, স্মৃতি-সম্পর্কের সূত্র ধরে সকলের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করে, এরই ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে দোকানে বসা দুলালির দিকে তাকিয়ে বলে, দুলালিও দেখি বেশ বড় হয়ে গেছিস! তা লেখাপড়া শেষ করি এখন তুইও সারাদিন দোকানদারি করিস?
দুলালি কোনো জবাব দেয় না, মাথা নিচু করে চা বানায়। কাপে দুধ চিনি মেশাতে চামচের ঘটঘটানি আওয়াজটা প্রবল হয়ে ওঠে।

তবে প্রশ্ন করার সময় দুলালির সঙ্গে বসিরের সেকেন্ডেরও ভগ্নাংশ সময়ের জন্য যে চোখাচোখি হয়, তা কারেণ্ট-শকের মতো কাঁপিয়ে দেয় বসিরের অন্তরাত্মা। পূর্ণিমার সেই চাঁদের মতো যেন পূর্ণ হয়ে উঠেছে দুলালি। বসিরকে দেখার সময়ে তার চোখেও ছলকে উঠেছে নিষিদ্ধ খেলাঘরের স্মৃতি, এখন গোপন স্মৃতিভান্ডার ঘিরে রাখা হিংস্র সাপ ছোবল দিতে ফণা তুলবে, নাকি বাতাসের মর্মর ধ্বনির সঙ্গে বেরিয়ে আসবে অপূর্ব সৌরভ? দুলালির দিকে আর তাকাবার সাহস হয় না বসিরের। উপস্থিত গ্রামবাসীদের চা-পানের আমন্ত্রণ জানিয়ে ডাকাতের দোকানের খদ্দের হতে আগ্রহ দেখায়, দেন ভাই, আমাকে সহ উপস্থিত সবাইকে চা-পান খাওয়ান।

আরো পড়তে পারেন

মহামায়া (পর্ব-২)

পড়ুন—  মহামায়া (পর্ব-১) ৩. কাঁচা রাস্তায় উঠতে উঠতে কাপড় ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে। পায়ের সাথে কাপড় জড়িয়ে যাচ্ছে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। সবার আগে মনিশঙ্কর হাঁটছে। তার হাতে মাথায় খাবারের টিন। একটা কাপড়ের ট্রাঙ্ক। সকলের হাতেই কাপড়ের পুটুলি। এতটুকু আসতেই হাপিয়ে উঠেছে। আরো অনেকটা দূর যেতে হবে হেঁটে। তারপর নৌকায় সীমানার কাছাকাছি কোনো একটা জায়গায়।….

মহামায়া (পর্ব-১)

১. সূর্য উঠতে এখনো অনেকটা দেরি। আকাশে কোনো তারা নেই। পুরোটা আকাশ মেঘে ঢাকা। রাতের অন্ধকারটা আজকে আরও বেশি চোখে লাগছে। বাতাস হচ্ছে। মাঝে মাঝে মেঘের আলোতে দেবীপুর গ্রামটা দেখা যাচ্ছে। মুহুর্তের জন্য অন্ধকার সরে আলোয় ভেসে যাচ্ছে। রাধাশঙ্করের ভিটাবাড়ি, ধান ক্ষেত, বাঁশঝাড় হাইস্কুল আলোয় ভেসে যাচ্ছে মুহূর্তের জন্য। মহামায়া আর মনিশঙ্করের ঘরে হারিকেন জ্বলছে।….

স্বর্ণবোয়াল

মোবারক তার কন্যার পাতে তরকারি তুলে দেয় আর বলে, আইজ কয় পদের মাছ খাইতেছ সেইটা খাবা আর বলবা মা! দেখি তুমি কেমুন মাছ চিনো! ময়না তার গোলগাল তামাটে মুখে একটা মধুর হাসি ফুটিয়ে উল্লসিত হয়ে ওঠে এই প্রতিযোগিতায় নামার জন্য। যদিও পুরষ্কার ফুরষ্কারের কোন তোয়াক্কা নাই। খাবার সময় বাপবেটির এইসব ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ খেলা আজকাল নিয়মিত কারবার।….

error: Content is protected !!