Author Picture

নদী ও মানুষের গল্প

ইউসুফ শরীফ

লোকটার অস্বাভাবিক দীর্ঘছায়া কাত হয়ে পড়ছে বালির চরে। চাঁদটা তার হাঁটার ভঙ্গিতে অসম্ভব তাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢেউ ভাঙছে যেন ভরাবর্ষার এক নদী। নদীর উত্তাল ঢেউ ভাঙার শব্দ বুকের ভেতর ধারণ করে নির্জন বালির চরে লম্বা পা ফেলে সে এগোচ্ছে, না দৌঁড়াচ্ছে? দৌঁড়ানোর একটা ছন্দ থাকে। একেকটা মানুষের জোর পদক্ষেপে মনের আর পায়ের মিলে সেই ছন্দ তৈরি হয়। ও রকম এক ছন্দই তাতে লীলায়িত হয়ে উঠেছে। একটা লক্ষ্য স্থির করে হাঁটা বা দৌড়ানো- যাই বলা হোক, অভ্যাসটা তার আজ প্রথম প্রহর অতিক্রান্ত এই জ্যোৎস্না-তরঙ্গঢালা রাতে এলোমেলো হয়ে পড়ছে। ছন্দপতন ঘটছে। দৌড়ের দৃশ্যটি ধারণ করলে স্পষ্ট হবে, তার মন কতটা লক্ষ্যহীন। যত এগিয়ে যাচ্ছে, দৌড়ানোর আগ্রহটাই বড় হয়ে উঠছে মাত্র, দৌড়ানো নয়। দৃশ্যগ্রাহ্য সীমা-সরহদ্দ পার হয়ে যাওয়ার মতো হলে দৌঁড় ওই ছন্দ পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না- দেহ ও মন একই সমতলে থিঁতু হতে পারে না।

একাকী লোকটা যাচ্ছে কোথায়- নির্জন এই বালির চরে থরে থরে কুঁচানো শুকনো বালি ভেঙে এবং এক সময় এ প্রশ্নও জাগবে, এই লোক যাবেই বা কতদূর? তার দৃষ্টি কড়কড়ে বালিতে, না বালি ছাড়িয়ে অন্য কোথাও! নদীচরের মোটা সাদা বালি মরা জ্যোৎস্নার আলোয় চিকচিক করে মরীচিকার মতো- চৈতন্যে দুলে ওঠে নিথর পানি সেই পানিতে নৌকার গলুই তীরের মতো বিদ্ধ করে নিস্তরঙ্গ নদীর যৌবন-সম্পদ! লোকটার ভেতর থেকে একটা শ্বাস থেঁতলে থেঁতলে বেরিয়ে আসতে গিয়েও আটকে যায়- বুকটা আইঢাই করে ওঠে। দৌড়ানোর শ্রমসিক্ত শ্বাস-প্রশ্বাস যে রকমটা হয়, এ তা নয়। কড়কড়ে বালিতে তার দ্রুততর দৃষ্টি এই মরা আলোয় আদৌ কিছু খুঁজছে কি? জ্যোৎস্নার মরাটে জ্যোৎস্নায় দিগন্ত বিস্তৃত বালিচরের চারদিক ছাইরঙের স্বচ্ছতায় অনেকটাই ঝরঝরে। বহুদূর পর্যন্ত সচল বস্তু বা প্রাণী ছায়ার মতো হলেও স্পষ্ট চোখে পড়ে- নাউভাঙা আর ভোলারচর যেখানটায় মিশেছে, সেখানে নিঃসঙ্গ বটগাছের সবুজ পত্র-পল্লব মরা আলোয় কালশিটে হয়ে আছে আকাশের গায়ে। আকাশটা হতবুদ্ধি আর লোকটার পায়ের তলায় ছড়িয়ে যাওয়া বালির চারপাশের রঙ ঘোলা কাঁচের মতো ঈষৎ বাদামি। জ্যোৎস্নার ওই আলোটুকু বিছানো না থাকলে বালির কুঁচানো হাজারও তরঙ্গ হতো কৃষ্ণগহ্বরের ওপর-কাঠামোর মতো। কৃষ্ণগহ্বর শব্দটি নেতিবাচক অনেক কিছুরই ইঙ্গিত বহন করে। আমরা তাতে যাচ্ছি না। সাধারণভাবে সর্বাধিক আলোচিত ইঙ্গিতটি- মৃত্যুর ঘের- ঘের শব্দটি তাকে নিয়ে যাবে ঘেরজাল টানায় বালক বয়স থেকে তার হাতের কব্জির জোর আর পানি ভাঙার প্রশংসনীয় ক্ষিপ্রতার স্মৃতিতে। কৃষ্ণগহ্বরের কোনো ব্যাখ্যা হয়তো জানা নেই লোকটার। জানা থাকলে জ্যোৎস্নায় তার হাড্ডিসার ছায়া তালগাছের মতো দীর্ঘ হয়ে ধু ধু এই বালির চরটা খামচে ধরার জন্য কী অতটা উদগ্রীব হতো? এই চরের লাখ লাখ টন বালি। হিমালয়ের প্রাত্যহিক বর্জ্য সরিয়ে ফেললেই বরফগলা উত্তাল পানি অপ্রতিহত স্রোতে সমুদ্রমুখী হতো- হতে পারত?

বালিতে দেবে যাচ্ছে তার শিথিল পা। এক পা তোলে আরেক পা দেবে যায়। বালিচরে হাঁটতে গিয়ে এরকম বেকায়দা দশা যে কারও হতে পারে, হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা একটু লক্ষ্য করলে দেখব, লোকটার জন্মের পর যার একটা নাম রাখা হয়েছিল- অর্থবোধক নাম- কেষ্টর আড়ালে সেই শৈশবেই হারিয়ে গেছে ওই পোশাকি নাম- যা হোক, আমরা নদীজীবী কতজনের নাম উল্লেখ করব? দু’পা দেবে যাওয়ার ভঙ্গি অন্যরকম- এ যেন আকাশের ঠিক মধ্যখানে হাত-পা ছেড়ে দিয়ে তার আর বালিচরের এ নির্জন শূন্যতার যুগলযাত্রা, যে যাত্রার শেষ কোথায় জানে না- তবে অগম্য নয় কৃষ্ণগহ্বর।
নামাখিলার পূর্বে গিরিধারি গ্রাম থেকে বিকালে হাঁটা শুরু- পায়ে হেঁটে চলায় কোনো অসম্মান নেই- যাকে নিয়ে যাচ্ছে, তাকে হাঁটিয়ে নেয়ার চল না থাকলেও উপস্থিত বাস্তবতায় কেউ কিছু মনে করেনি। ছোট সরকারের ছেলের বিয়ের খ্যাপে চার বেহারার পালকি নিয়ে বলাসপুরে চলে গেছে এলাকার বেহারা দাওরা আর তিন পোলা। দুই বেহারার মাপা বাড়ির উঠান ছাড়িয়ে গাঙপাড়ের হিজল গাছে কাত হয়ে পড়ে থাকলেও দাওরার ভাতিজা গনু জ্বরের বাহানা ধরে কোনোভাবেই সওয়ারি বইতে রাজি হয়নি। বিয়ের সওয়ারি বইতে তার যত বিরক্তি। তার নিজের বিয়ে নিয়ে বাবা-মা স্বজনরা কেউ এখনও ভাবছেই না কেন। এ প্রশ্নে তার দেহ-মন উথাল-পাথাল।

লোকটা তখন ঠিক ছিপছিপে এই লোক নয়, গাট্টাগোট্টা তরুণ- আলকাতরা লাগানো নায়ের তলার মতো চেতানো বুক, হাত-পায়ের মাংসপেশি যেন ষাঁড়ের গ্রীবা। তার গা ঘেঁষে চারখানা খতের লাল মুর্শিদাবাদি সিল্কের শাড়ি মোড়ানো টসটসে এক পোঁটলা। এই পোঁটলা শব্দটা মহার্ঘ্য কোনো বস্তু বহনের জন্যই যুতসই, যেমন কাবুলিওয়ালার থাকে। তার কাছে সেটা নিছক বস্তু ছিল না, ছিল জীবনের অপরিহার্য খুঁটিস্বরূপ। এখনকার মতো প্রশস্ত না হলেও ব্রহ্মপুত্রের পূর্বপাড়ে বালিরচর ছিলই। পা দেবে গিয়ে তুলতে না পেরে আচমকা সেই পোঁটলার ভেতরকার বস্তুটি গড়িয়ে পড়ে তার বুকের ওপর। দু’হাত বাড়িয়ে জাপটে ধরে। অদ্ভুত কোমলতায় গেঁথে বসে তার সটান শরীর-মাংসপেশি। মোটা নাকের ছিদ্রপথে সুবাসিত তেলসিক্ত চুলের ভেজা ঘ্রাণ ঢুকে পড়ে। সেই নরম আরাম আর পরিবেশ ভুলানো ঘ্রাণে তলিয়ে যেতে যেতে সচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেও জীবনে এই প্রথম পাওয়া কোমল স্পর্শজাত অজানা আবেশ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। কোমলতার এই আবেশ প্রতি ভোররাতে তার নদীফেরত শরীরের সব ক্লান্তি-অবসাদ নিঃশেষে শুষে নিত। কী গোপন-মোহন জাদুময় সেসব ভোর।

লোকটার ছায়া পশ্চিমদিকে দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে, এই নির্জন চরে নৈঃশব্দের মাঝখানে তার ওই ছায়ার ভেতর অসম্ভব এক শক্তি ঘুরপাক খাচ্ছে। ছোটবেলায় শোনা ব্রহ্মদৈত্যর কথা মনে পড়ে, যার এক পা থাকত স্কুল-বোর্ডিংয়ের রান্নাঘরে, আরেক পা থাকত পাঁচ মাইল পূর্বে ভোলারচরের বুড়ো বটগাছে। রাতে মাছ ধরতে ধরতে ওর বাবা ওই বুড়ো বটগাছটাকে সব সময় খেয়ালে রাখত। কৈশোর উত্তীর্ণ হওয়ার পর ওকেও খেয়াল রাখার কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। বর্ষার বিশাল ব্রহ্মপুত্রে, এ ছাড়া দিক ঠিক রেখে জাল-বাওয়া। মাছধরা সত্যই কঠিন ছিল। ওই বটগাছের কাছাকাছি গিয়ে আচমকা বিপদে পড়ার গল্পও শুনিয়েছেন বাবা।

একাকী লোকটা যাচ্ছে কোথায়- নির্জন এই বালির চরে থরে থরে কুঁচানো শুকনো বালি ভেঙে এবং এক সময় এ প্রশ্নও জাগবে, এই লোক যাবেই বা কতদূর? তার দৃষ্টি কড়কড়ে বালিতে, না বালি ছাড়িয়ে অন্য কোথাও! নদীচরের মোটা সাদা বালি মরা জ্যোৎস্নার আলোয় চিকচিক করে মরীচিকার মতো- চৈতন্যে দুলে ওঠে নিথর পানি সেই পানিতে নৌকার গলুই তীরের মতো বিদ্ধ করে নিস্তরঙ্গ নদীর যৌবন-সম্পদ! লোকটার ভেতর থেকে একটা শ্বাস থেঁতলে থেঁতলে বেরিয়ে আসতে গিয়েও আটকে যায়- বুকটা আইঢাই করে ওঠে

দক্ষিণে ফুলপুরের ডোবা আর উত্তরে নলগড়ের ডোবার ঠিক মাঝখানে ঝিনুকের পানির মতো একটুখানি পানি। ম্লান সেই পানির হাহাকারে চারপাশে বালি ওড়ে। মৃদু সেই বালির ওড়াউড়িতে আত্মীয়-পরিজনহীন এই প্রৌঢ় পানি বড় অসহায়, দুঃখী, স্থির, অচল পানি তো আর নদীর জ্যান্ত পানি নয়। নদীর পানি সব সময় চলমান। উৎস থেকে সাগরে প্রবহমান না হলে সে তো বদ্ধ জলাশয়।
এক রাতে লোকটা সেই বদ্ধ পানি থেকে এক আঁজলা তুলে গায়ে মাখতে গিয়ে থেমে যায়। তখনই চিকন সুরে অবিচ্ছিন্ন কান্না ভেসে আসে। কোথা থেকে আসছে কান্নাটা! সে ওইটুকু পানির ওপর কান পাতে। গভীর কান্না উথলে উঠছে পানি এবং বালির সংযোগস্থল থেকে। মৃতপ্রায় নদী থেকে উত্থিত কান্না মিশে যাচ্ছে তার ভেতর জমাট হাহাকারে।
আঁজলার পানিটুকু আস্তে করে নামিয়ে রাখে। এতটাই আস্তে যেন ওই পানিটুকুও টের না পায়। তারপর অনেকক্ষণ বসে থাকে। তার দীর্ঘশ্বাসেও কি বালি ওড়ে! হয়তো ওড়ে, কিংবা ওড়ে না। তার বুকের ভেতর কঁকিয়ে ওঠা বেদনা এবং পানি আর বালির মিলনস্থলে গভীর কান্নার মতো মৃদু প্রবাহের শব্দ চরজুড়ে স্তব্ধ শূন্যতায় তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

নদীর এই ক্রন্দনধ্বনি জগৎ-সংসারে কোনোই বিচলন সৃষ্টি করতে পারছে না, লোকটা তা ভেবে হতভম্ব। বর্ষায় তিন-চার মাইল ওর বাবা দেখেছেন পাঁচ-ছ’মাইল দীর্ঘ পাড়ির সেই নদে সাগরের মতো ঢেউ ভেঙে, ঘূর্ণিঝড়ের মতো স্রোত ডিঙিয়ে রুপালি ফসল তুলে আনা, ফসলের ছটফটানি। ছলকানো জলে চোখ-মুখ-বুক ভিজে যাওয়ার সেই হিরন্ময় সময়, সেই স্মৃতি আর তা থেকে লাফিয়ে ওঠা রুই-কাতলা-মৃগেল, বোয়াল-চিতল, কালি বাউস, গইন্যা, সরপুঁটি, আইড়, গুজি, গলদা চিংড়ি- কত কত মাছ- সুস্বাদু মাছ- রুপালি জলের মাছদের শরীরে একদিন হাত না পড়লে তার মনে হতো, সে নেই- পানি নেই- নদী নেই এবং কোথাও কিছু নেই- উত্তাল তরঙ্গ-তীব্র স্রোত-ঘূর্ণিবায়ু- কত বৈরিতার সঙ্গে ডিঙ্গি নৌকা আর বৈঠার লড়াই- বিভিন্ন বাঁকে-ডোবায় মাছধরার বিচিত্র সব স্মৃতির টুকরা। যেসব কিছুদিন আগেও এতটা মনে পড়ত না, এখন জ্বলজ্বল করছে ছায়াবাণী-অলকা হলে উত্তম-সুচিত্রা আর দীলিপ-বৈজয়ন্তীমালার অভিনয় করা ছায়াছবি। ম্যাটিনি শো-তে অনেক বায়োস্কাপ দেখেছে- বহু গান তার কণ্ঠস্থ ছিল- সুর ছিল তার গলায়।
আমরা এই লোকটার আরও অনেক কথাই বলতে পারি- মালো-জীবনে নেমে আসা স্তব্ধতা, আর্থিক দৈন্য- জীবন ধারণের সংকট, স্ত্রী-পুত্র-কন্যার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন এবং পাড়া-প্রতিবেশীর তুচ্ছতাচ্ছিল্য, নানা অপমান-গ্লানি-পীড়ন। কিন্তু হবে কী সেসব বলে! ব্যক্তি বিশেষের হাহাকার-আর্তির কথা, পরিবার। গোষ্ঠীর বেদনাভারের কথা কতই তো লেখা হয়েছে-হচ্ছে? একটা বিশাল নদীই যেখানে মরে পড়ে আছে, সেখানে নিবর্গীয় কিছু মানুষের কথা কে আর গুরুত্ব দিয়ে ভাববে, কেন ভাববে?

ব্যর্থতার হাহাকারে ধূসর কষ্টে ডুবে যাওয়া কেষ্ট নামের লোকটার লম্বা পা ফেলে দক্ষিণ থেকে উত্তর, আবার উত্তর থেকে দক্ষিণে হেঁটে যাওয়া ছাড়া আর কিইবা করার আছে! নির্জন রাতে জনমানবহীন নদীর এই বালিময় চর, তার পাশ ঘেঁষে অতি ক্ষীণ চিকন জলের রেখা কোথাও আছে, কোথাও নেই- রাত্রিকালে এইটুকুই যেন তার একান্ত আপন। নদীর উদ্দাম তরঙ্গ-স্রোত আর রুপালি শস্যের মাঝখানে তার তারুণ্য ছিল খরসূর্যের মতো উজ্জ্বল আর নদীজলে মাছদের মতো স্বচ্ছন্দ। দিনের বেলা সে কখনও নামে না বালির চরে বা যায় না ক্ষীণকায় স্রোতের ধারে কাছেও। জ্যোৎস্না রাতে মরাগাঙে অলৌকিক তরঙ্গ দেখে। তরঙ্গে তরঙ্গে প্রসারিত দেখে তার জীবনের অতীত অধ্যায়।

বালি গিলে খেয়েছে জলদ কোরাসের গীতল লহর, যা ছিল ঘেরজাল-ছুটাজালে-বৈঠায় প্রাণবন্ত নদীর যৌবন। নদী-জলের সুরেলা ধ্বনিপুঞ্জ রাতের নির্জনতায় জলের প্রবাহের মতো আকাশে উঠে যেতে দেখেছে সে- দূরে কাশবনের তুলার মতো সাদা ফুল আর আকাশ সে রাতে একাকার হয়ে গেছিল। ওর মেজোকাকার বড় ছেলে নৌকার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে যে মুহূর্তে জাল ছুড়ে মারছিল ঘোলা জলে, ঠিক তখনই তার মাথা আর জাল ছুঁই ছুঁই করে নদীর গীতল কথামালার ঊর্ধ্বগমনের ওই দৃশ্যটি সে দেখে- তার বৈঠা থেমে গিয়েছিল। দাদা ধমকে ওঠে, ওই কেষ্টা, ঘুমাইতাছস নাহি? সচকিত কেষ্ট আবার বৈঠা মারে, দাদাকে কিছু বলে না। কৈশোরে আরও কত অবিশ্বাস্য দৃশ্যই না সে দেখেছে এই বিশাল নদীর। টিপ টিপ বৃষ্টিতে জাল ছুড়তে গিয়ে জালের ওপর দিয়ে মৎস্যকন্যাকে গড়িয়ে পড়তে দেখেছে। সেদিন নদীর রুপালি ফসলের ভারে জাল ভরে উঠেছে, আঙুলে পেঁচানো রশিতে আকাঙ্খিত টান দুই হাতে জাল গুটানোর তীব্রতা। কৈশোর ও প্রথম যৌবনের সেসব মুহূর্ত ধূসর এই বালির তলায় চাপা পড়ে গেছে। আর কোনোদিনও যা প্রকাশিত হবে না। জলজীবী মানুষ আর কোনোদিন জালভরা জলের ফসল তুলে নিতে পারবে না। শুধু থাকবে শূন্যতা-কষ্ট-হাহাকার আর হাজার হাজার বছরের পেশা তামাদি হয়ে যাওয়ার অন্তহীন কান্না।
ডিঙ্গি নৌকার ছোট্ট ছইয়ের তলায় লম্বা হাতলযুক্ত পাটকাটা দা গুঁজে রাখা হতো। নদীতে তখন কোনো দস্যু-তস্কর ছিল না, তারপরও এই দা কেন? প্রশ্নটা কৈশোরে তাকে বেশ আলোড়িত করত। অমাবস্যার পরের রাত মধ্যভাগের ঠিক আগ মুহূর্তে জালে আটকে গেল একটা কুমির। বাবা দ্রুতই ওই লম্বা হাতলের দা দিয়ে জালটা কেটে দিলেন। কুমিরও হাঁফ ছেড়ে বেঁচে সাপের মতো সোজা সাঁতারে ভাটিতে ভেসে গেল। রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ল, নদীতে কুমির এসেছে।

কিশোর কেষ্ট জাল কেটে দেয়ার মূহূর্তে অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছে, জালখান কাটলা ক্যান বাবা? বাবা নিরুত্তর।
অনেকদিন পর বাবার কাছে জানতে পারে, জাল কেটে না দিলে একটানে নৌকা ডুবিয়ে কাউকে না কাউকে গিলে ফেলত ওই কুমির। এ-ও জানল, কুমির বিপদে না পড়লে সাধারণত সোজা চলে না আর সাপ ডাঙ্গায় এঁকেবেঁকে চললেও নদীতে স্রোতের কারণে চলে একদম সোজা।
লোকটা তার নিজের ভাষায় ভাবে, সত্যই কী আর কোনো উপায় নেই জলজীবী মানুষের জলে বিচরণের? জলের রুপালি ফসল আহরণের অধিকার কী সত্যই গায়েব হয়ে যাবে? এরপর আর কিছু ভাবতে পারে না সে। তার ভাবনা জালে গেঁরো লাগার মতো দশা, যা না কেটে কিছুতে ছাড়ানো যায় না।
শেষ পর্যন্ত বালিচরে উবু হয়ে বসে পড়ে, নিঃশব্দ চিৎকারে আকাশ-বাতাস ফাটায়, ভগবান, তুমি এই গাঙের জল কোথায় নিলা, কোথায় গেল জলের ফসল- আমগর ফসল?

লোকটার ছায়া পশ্চিমদিকে দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে, এই নির্জন চরে নৈঃশব্দের মাঝখানে তার ওই ছায়ার ভেতর অসম্ভব এক শক্তি ঘুরপাক খাচ্ছে। ছোটবেলায় শোনা ব্রহ্মদৈত্যর কথা মনে পড়ে, যার এক পা থাকত স্কুল-বোর্ডিংয়ের রান্নাঘরে, আরেক পা থাকত পাঁচ মাইল পূর্বে ভোলারচরের বুড়ো বটগাছে। রাতে মাছ ধরতে ধরতে ওর বাবা ওই বুড়ো বটগাছটাকে সব সময় খেয়ালে রাখত। কৈশোর উত্তীর্ণ হওয়ার পর ওকেও খেয়াল রাখার কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন

২.
মুর্শিদাবাদি শাড়ি পরে নরম পোঁটলার মতো তার ঘরে আসা বউ সাবিত্রী এখন মাঝে মধ্যে কথা বলে আপন মনে, কার সঙ্গে বলে তা যারা শোনে সবাই বোঝে, বোঝে না শুধু যাকে উদ্দেশ্য করে এসব ঘোরানো-প্যাঁচানো কথা, সেই লোকটা।
বউ বলে, মানুষটা যে হারারাইত গাঙে থাকে, গাঙ তো নাই, বালুরচরে কার লগে কুস্তাকুস্তি করে? এই দিকে মাইয়াডার কী দশা। ছোট পোলাডায় করে কী। হেই খবর কেডায় রাখে? বড় মাইয়া দুইডা মইরা না গেলে অহন কি হইতো, কেডায় জানে। বাঁচনের লাগি মানুষে কতকিছু করতাছে। একটা কিছু তো করন যায়, কেডায় হুনে কার কতা- লোকটা চুপ করে থাকে। তার বাবা বলতেন, বোবার শত্রু নাই। সে বোবা-কালা-অন্ধ ও লাচার হয়ে গেছে। এই মরা গাঙের মতো হয়ে গেছে। গাঙের মতো হওয়া ছাড়া তার তো আর কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। লোকটা বোবা হয়ে থাকলেও এখন আর বউ থামে না। সংসারের কার্নিশে দাঁড়িয়ে কেউ থেমে থাকতে পারে না।

লোকটার তারুণ্যের মাঝামাঝি সময়েই নদীতে মাছের আকাল দেখা দেয়। এখন প্রৌঢ়ত্বে রোজগারের দুর্বলতা ঘরে থাকতে দেয়নি কিংবা সে পালিয়ে বাঁচতে চায়। নদীকে সে ভালোবেসেছে, ভেবেছে নদী কখনও মুখ ফিরিয়ে নেবে না, নিতে পারবে না, কারণ তাকে বইতে হবে। প্রবহমানতাই নদীর জীবন। সেই নদীই তার চোখের সামনে মরে গেছে। পানিই যদি না থাকবে, তো সে আর নদী হবে কী করে! বিশাল এই নদীরই যৌবন যেখানে শেষ, সেখানে তার যৌবন? অসম্ভব নরম আর ভেজা ভেজা ঘ্রাণের শরীর নিয়ে অভ্যাসমত ভোররাতের দিকে তার বউয়ের ভেতরটা কি রকম তোলপাড় করে সে কি জানে?
জিতেন মাস্টার বলতেন, জানো প্রায় শ’বছর আগে আসামে যে বড় ভূমিকম্প হয়, তাতে ব্রহ্মপুত্রের মূলধারা সংকুচিত হয়ে বেশিরভাগ পানি বইতে থাকে যমুনা খাল দিয়ে। সেই যে শুরু মূলধারার মরণদশা, তার আর শেষ নাই। বিশাল এ নদের জীবনবৃত্তান্ত, হিমালয়ের নিষ্কাশন খাল- বিশ্বে সর্বাধিক পলি বহন, উপত্যকায় উর্বর জমিন, কৃষি সভ্যতায় অবদান- ব্রহ্মপুত্র- সভ্যতা এখন ধূসর ইতিহাসের তলে হাঁসফাঁস করছে। এসব কিছু কিছু শুনেছে মাস্টারের কাছে। স্কুলের দক্ষিণে খোলা মাঠে ওরা জাল মেরামত করত, সেখানে এসে মাস্টার ওদের খোঁজ-খবর নিতেন, কথাবার্তা বলতেন। ছেলেপিলেদের কিছু লেখাপড়া করাতে বলতেন। কেষ্টই বাবাকে উৎসাহিত করে ছোট ভাইটিকে জিতেন মাস্টারের হাতে তুলে দিয়েছিল। মেট্রিক পাস করার পর উড়–উড়– মন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। একদিন বলে বসে, মধুপুরে এক মেয়েকে বিয়ে না করালে গলায় দড়ি দেবে। বৃদ্ধ বাবা কেষ্টকে বলেন, দেখছস বিদ্যাশিক্ষার ফল কী?

সেই ভাইটি বিয়ের পর শ্বশুরের শলা-পরামর্শে ভারতের কুচবিহার চলে যায়। একটা মাত্র ধানিজমি, তাও খোরাকি দিয়ে ওকে টাকা দিতে হয়। সেই ক্ষেত আর ছাড়ানো যায়নি। আয়-উপার্জন নেই। আর কোনো সম্বল নেই। শেষ পর্যন্ত ওই ক্ষেত সাফ-কাবলা করে দিতে হয় নবে বেপারির সুদখোর ছেলেকে।
নদীতে পানি নেই- মাছ নেই। যেখানে ডোবায় কিছু পানি আছে, স্রোতহীন শুষ্কপ্রায় ধারায়, সেখানে কিছু পানি থাকে, কিন্তু মাছ নেই। আর আছে কয়েকটা বদ্ধ ডোবা-নালা- সেসবে জাল দিয়ে আটকে ডালপালা ফেলে রাখা হয়, যার নাম- মাছচাষ। লাঠির জোর আর ক্ষমতা যাদের, অবশিষ্ট এই নদীটুকু এখন তাদের কব্জায়।
নদীর যেখানটায় কিছু পানি আছে, সেখানে নামতে পারে না জেলেরা। জেলেদের হাত খুব শক্ত। উড়াজাল ফেলে আর ঘেরজাল টেনে হাত শক্ত হলেও লম্বা নয়। লম্বা প্রভাবশালীদের হাত। ঢাকায় বসে থেকে তারা যতটুকু জল আছে, হোক সে বদ্ধ, তাও নিজেদের মধ্যে ভাগ করে। এসব কথাবার্তা লোকটার মাথায় তার ভাষায় তার মতো করে ঘুরপাক খায়- তবে একটা শব্দও উচ্চারিত হয় না। এ নিঃশব্দ কথাবার্তা মৃতপ্রায় নদীর বুকে কোনোই আঁচড় কাটতে পারে না।

লোকটার কাকা নরু বলে, জাউল্যারা অহন মাছমারা ছাইড়াই দিছে। ভদ্দরলোকেরা যহন মাছচাষে নামছে- নিজেরাই মাছ ধরে-বেচে, তহন জাউল্যাগর আর উপায় কী- এ প্রশ্নের জবাব নেই, তবু এই লোকটা বুঝতে চায় না- সে নিঃশব্দে গলা ফাটায়, ভগবানে গাঙ দিছে, খাল-বিল দিছে, হেইসবে পানি দিছে জোয়ার-ভাটা দিছে- মাছ দিছে, পানির আরও নানান জীব দিছে। এসব জায়গায় মাছ ধরনের অধিকার দিছে কৈবর্ত্যগরে। এই অধিকার গাঙ শুকাইয়া, ফিশারি আইয়া রদ হইয়া গেল। কেন গেল? অতগুলান মানুষ বাঁচবো ক্যামনে? কেডায় দেব এর জবাব? ইলিকশনের সময় কত মায়া কইরা ভালা নামখান জিগাস করে। পান-সিগারেট-চা দিয়া খাতির-যতœ করে। তারপরে চিনে না। গাঙেও পানি আসে না- মানুষ বাঁচে ক্যামনে?
উত্তরে দু’পাশে উঁচু বাঁধ দিয়ে ডিপ-টিউবওয়েলের পানি দিয়ে জলাশয় বানিয়ে মাছচাষ করছে প্রভাবশালীরা। দক্ষিণে যেখানে অল্প পানি অবশিষ্ট আছে, সেখানেও যার যার শক্তি ও প্রভাবমতো বানা দিয়ে আটকে মাছচাষ হচ্ছে। এখানে মাছ বাড়ে দ্রুত। নদীর আগেকার মাছের স্বাদ পাওয়া যায় চাষের মাছেও। বেশি দামে বিক্রি হয়। রাজধানীতে নদী-নালা, খাল-বিলের মাছের কদর-দামও বেশি। লোকে বলে, অমুক অমুক ইজারা নিয়েছে প্রশাসনের কাছ থেকে।

লোকটার মনে বরাবরের প্রশ্ন, প্রশাসন নদী ইজারা দেয় কি করে। নদী তো সবার জন্য উন্মুক্ত। জেলে, চাষী, বিত্তবানে কোনো ভেদাভেদ নেই। কেউ এই কথাটা জোরেশোরে বলে না কেন? এ প্রশ্নেরও কোনো জবাব খুঁজে পায় না কর্মহীন এই লোকটা। ছোটবেলায় শুনত, গাঙের মালিক নাই। গাঙের মালিক দেশ। দেশের বেবাক মানুষ।
কেষ্টজেলের দীর্ঘশ্বাস বেরোয়, হায়! আগেরকালের মানুষ কতই না অবুঝ আছিল- পশ্চিমদিকে মাইল দুয়েক দূরে একটা বিল ছিল, প্রচুর জিয়লমাছের ওই বিল এখন কিছু দিয়ে- কিছু না দিয়ে মোড়লবাড়ির প্রভাবশালী লোকেরা পুরাটা দখলে নিয়েছে। বিলে লাইন বেঁধে পুকুর- মাছচাষ হয় তাদের ফিশারিতে। চারদিকে বন্দুকধারী পাহারাদার। জেলেদের জাল নিয়ে নামার জায়গা কোথায়?

বাবা বলেন, দূর বেক্কল, এইডা কলিকাল, বেবাককিছু উল্টাইয়া যাইতাছে। বাবুরা অহন মাছ পালতাছে, ধরতাছে। ওই যে কি কয় ফিশারি। মাছ ধরা নয়, মাছ চাষ অহন জীবিকা। এই লাগি নদীর দখল চাই, পুকুর-দীঘির মালিক হওন চাই। জলে-নদীতে, জমিতে কুরু-পা বের লড়াই হইবো- কেষ্ট বিস্ময়ে থ’, বাবা তুমি লেখাপড়া জানা মানুষের লাহান কতা কইতাছো!
বাবা হাসেন, আরে বেডা মরণের পরে সবাই সমান। কারও অজানা কিছু নাই, কারও কোনোকিছুতে বাধা নাই। সব দেখা যায়, সব বোঝা যায় এইখানে- আচমকা কুয়াশা পাতলা হতে হতে স্কুলের মাঠ-কদমগাছ-হিজলগাছ সব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোথাও আর কেউ নেই। চারদিকে ধু ধু শূন্যতা। অপরিসীম শূন্যতা। বাবার কণ্ঠ, ওইসব কথাবার্তা সত্যই কী বাবার নাকি শোনার ভুল তার। সহসা বুঝতে পারে না মালোপাড়ার কেষ্টা জেলে। তখনই মনে পড়ে মালোপাড়ার শত বছরের নেইন্যাবুড়োর কথা। ভাঙাঘরের আরও নুয়েপড়া উসারায় বসে থাকে বুড়ো। যার পায়ের শব্দ পায়, তাকেই ডেকে বসিয়ে বলে, চক্ষে দেখি না, প্রভাত ডাক্তারে কয়, ছানি পড়ছে, কিন্তুক মগজটায় ছানি পড়ে নাই গো। গোটা জেলেপাড়া বিরাণ হইয়া যাইতাছে। গাঙে জল নাই, জলের ফসল নাই- গাঙে জলের আশায় কতকাল নিষ্কর্মা থাকবো জেলেপাড়ার বেটাছেলেরা। এই পর্যন্ত বলে ঝিম মেরে থাকে নেইন্যাবুড়ো।

লোকটার মনে বরাবরের প্রশ্ন, প্রশাসন নদী ইজারা দেয় কি করে। নদী তো সবার জন্য উন্মুক্ত। জেলে, চাষী, বিত্তবানে কোনো ভেদাভেদ নেই। কেউ এই কথাটা জোরেশোরে বলে না কেন? এ প্রশ্নেরও কোনো জবাব খুঁজে পায় না কর্মহীন এই লোকটা। ছোটবেলায় শুনত, গাঙের মালিক নাই। গাঙের মালিক দেশ। দেশের বেবাক মানুষ

অনেকক্ষণ পর তার অস্পষ্ট স্বর বাতাসে কাঁপে, কিন্তু জলদাস- কলিকালে এই জলদাসের কি হইবো ফয়সালা। গাঙে জল নাই, জলদাস আছে নিত্য উপবাস। এ কোন ফয়সালা ভগবান তুমিই ভালা জানো!
অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। বয়সের ভারে শরীর চলে না, মাথাটা অবিরত কাঁপে, কণ্ঠও কাঁপে, আজকাইল কালিবাউস আর কমলা রঙের ডিমওয়ালা ছটকা ইচামাছ কি আগের মতোনই আছে রে? ছটকা চিংড়ি আর কালিবাউসের কথাটা নির্দিষ্টভাবে কারও কাছে বা সবার কাছে বলে না, বলার ভঙ্গিটাও সরল নয়- তা সবাই না হলেও কেউ কেউ বোঝে। অসহায় এই লোকটা বোঝে। এই দুই প্রকারের মাছ ছাড়াও কত সুস্বাদু মাছ এক সময় প্রতিদিনই প্রচুর পরিমাণে শতায়ু এই মানুষটির জালে ধরা পড়েছে। অতি সাধারণ মাছের জন্য এই বৃদ্ধের কতটা আকুলতা, তা-বুঝেও কিছুই করার নেই এই লোকটার- জেলেপাড়ায়- মুসলমান গৃহস্থপাড়ায় প্রবহমান নদী নেই। তার জীবনও নদীর মতো বয়ে যায় না। নদী নেই তো তার জীবন কোথায়? গাঙের পানি কমতে থাকে- মাছ কমতে থাকে- কোথায় যায় মাছ, সে জানে না। সে দেখছে, আয়-উপার্জন নেই- দিনে আধপেটাও খাবারের জোগাড় নেই। এসবের সঙ্গে সঙ্গে তার অজান্তেই … কমতে থাকে। বউ নানাভাবে আভাসে তার ইচ্ছার কথা জানালেও তার কোনো সাড়া নেই। সে বুঝতে পারেনি, এভাবে তার দেহযন্ত্রও নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। সে ভেবেছে, অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠে সেই প্রথম যৌবনের মতো মুক্তমনে আদর-সোহাগের কথা ভাববে।
আকাশে চাঁদ থাকুক বা না থাকুক, লোকটা মতির চায়ের দোকানের পেছন থেকে বের হবেই- বিকাল থেকে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত ওখানেই থাকে- মতির পোলা এখনও চায়ের কাপ বাড়িয়ে দেয়, নেও কিনুকাহা, চা খাও- প্রথমদিকে বউ বাগড়া দিত- বের হওয়ার জন্য রাগ বা ঝগড়ামতো করতে হতো।

এখন বউ উদাস কণ্ঠে বলত, বাইরে গেলে যাও, তয় তাড়াতাড়ি আইতে অইবো। রাইত-বিরাত মরাগাঙে ঘুরন আজাইরা গাছের ডাইলে শুইয়া থাকনডা ভালা না- লোকটার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তার বাবার অন্তিম সময় সে দেখেছে, কীভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস ছোট হতে হতে এক বিরল মুহূর্তে চরাচরে মিশে গেল। মরিচার চরে একগোছা ঝাউ গাছে চাঁদ সে রাতে অসম্ভব জ্যোৎস্না ঢেলেছিল। চারদিকে জ্যোৎস্নার করতালিতে রাতটাই ফেটে পড়ছিল। বাবার অন্তিম সময়ে জোয়ার ছিল। জোয়ারে মাছ ছিল, বাবা বলতেন, ফসল। জেলেদের নদী-জমির সেই ফসল। বাবা নদীর জোয়ারকালে। ফসলের সুদিনকালে চলে গেছেন। বাবার চিতা-ছাইভস্ম চলমান জলের ধারার মিশে সাগরে শয্যা পেতেছে। সেই অনন্তশয্যার কথা বাবা বলতেন। হাতে ব্রহ্মপুত্রের জল তুলে ধীরে ধীরে সেই জল স্রোতে মিশিয়ে দিতে দিতে বলতেন, আমার যেন মরণ হয় ক্ষেতে। রুপালি শস্যের এই ক্ষেতে। তাই হয়েছিল, সেদিন ছিল আষাঢ়ী পূর্ণিমা। বাবা অহিংস নীতিতে বিশ্বাস করতেন। গৌতম বুদ্ধ নিয়ে তার কোনো পড়াশোনা ছিল না। সুরেশ প-িতের টোলে মাত্র ছ’মাস হাজিরা দিয়েছিলেন। তবে তার হস্তাক্ষর ছিল গোল গোল নিটোল, যাকে বলা হয় মুক্তার মতো।

৩.
দক্ষিণে যেখানটায় শেষ মাথা ছিল, সেটা এখন আর শেষ মাথা নয়, আরও দক্ষিণে বহুদূর বিস্তৃত হয়ে গেছে বালিচর। ছোটবেলায় চরের শেষ মাথা যেখানটায় ছিল, সেই ফুলপুর ঘাটের উল্টোদিকে তিরতির করে কিছু এখনও পানি বইছে। সংকীর্ণ নালায় কোথাও একহাত, কোথাও আধহাত পানির প্রবাহে হঠাৎ হঠাৎ কিছু দারকিনা মাছ উজান ঠেলে এগোবার চেষ্টা করছে। লোকটা ভেজা বালিতে হাঁটু মুড়ে বসে দারকিনা মাছের চলাচলের চেষ্টা লক্ষ্য করছে। তার দৃষ্টিতে দারকিনার চোখ বড় হয়ে ওঠে। আরও বড় হয়ে ওঠে ওদের চোখের ভেতর জমে থাকা কষ্ট।
এখানটাতেই তার দেখা হয় লতু ডুবুরির সঙ্গে। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় তারও আর কোনো কাজ নেই। আগে ভাঙতিরবাজার ঘাট থেকে ফুলপুর ঈদগাঁ মাঠ হয়ে ভাবখালির বাজারঘাট পর্যন্ত শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত রিঠামাছ ধরে বিক্রি করে কানাইয়ের দোকান থেকে চাল-ডাল কিনে- কখনও কখনও বাড়তি একটা রিঠামাছ নিয়ে ঘরে ফিরত। এখন গভীর পানি নেই, রিঠামাছও নেই- নির্বাক কেষ্ট আর লতু শেখ। অলস পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বালিচরের উত্তরপ্রান্তে সদু বেপারির কদমগাছ তলে যায়, যেখানে মরাগাঙে শূন্যদৃষ্টি মেলে বালিতে বসে আছে ডেউকি। তিনজনের কথা মানে দুয়েকটা ভাঙা ভাঙা বাক্য- যাতে প্রশ্ন থাকলেও জবাব নেই আর জবাব থাকলে প্রশ্ন নেই। অর্থাৎ প্রশ্ন ও জবাব- কোনোটাই তাদের নেই। অনেকটা নিজের সঙ্গে নিজেরই কথা বলার মতো। তারপরও তিনজনের এসব নিঃশব্দ-সশব্দ কথাবার্তা প্রতিক্রিয়াহীন বিক্ষিপ্ত শব্দ মাত্র নয়। নৈরাশ্য-হাহাকার- অস্তিত্বের অন্তহীন সংকটে কান্নার রেশ ব্রহ্মপুত্রের ক্ষীণ রেখায় বিশাল পশ্চিম প্রান্তজুড়ে বিস্তীর্ণ বালুকারাশিতে প্রবাহিত হয়। জ্যোৎস্নায় ঝিকমিকিয়ে ওঠা বালিতে মাজা ডুবিয়ে বসে থাকা তিনটি নিথর ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে মৃত নদীর শরীরের ওপর কালসিটে দাগের মতো সেঁটে থাকে।

কেষ্টর চোখে ভেসে ওঠে ওই পোংটা লোকটার শরীরের তলায় সাবিত্রীর পোক্ত নরম শরীরের ঝাপটানি।… সে কতদিন-কতকাল, মনে হয় সময়টা আকাশ পার হয়ে কোথাও গায়েব হয়ে গেছে। আহা, সেই সময় কী আর ফিরে আসবে! এরকম গোপন যন্ত্রণা কী ডেউকির, লতুরও আছে? কেষ্ট ভাবে, জীবনধারণ ছাড়াও দুঃসহ এরকম যন্ত্রণায় তারাও হয়তো কাতর। ডেউকির বউ তাকে ছেড়ে চলে গেছে। যুবতী বউ লছমি সম্পর্কে প্রৌঢ় ডেউকি বলত, আহা, হামার বহু কইতরের ছানা।
ডেউকির সুদিনের এসব কথা কেষ্টর যখনই মনে পড়ে, নিঃশব্দে বলে, আহা বেচারা ডেউকি! ডুবুরি লতু কানার বউ শহরে বাসায় ঝিয়ের কাজ করে। স্বাস্থ্যবতী ঝিদের কি দশা কে জানে! লতু কানা যখন বলত, আমার বউয়ের শরীর-স্বাস্থ্য মাশাল্লাহ। একটুখানি পরপর পান খায়। থাকি থাকি হাইসা ভাইঙ্গা পড়ে। খোদায় তো আমারে দেখনের লাগি চক্ষু দেয় নাই। ভাবিছাবরা কয়। বউয়ের এই রূপের বিবরণ দিতে গিয়ে লতু কানার অট্টহাসি ব্রহ্মপুত্রের উত্তাল ঢেউয়ে গড়িয়ে পড়ত।
ব্রিটিশ আমলে ছত্তিশগড় থেকে আসা গুদারা নায়ের মাঝি ডেউকি আর গভীর পানিতে ডুবিয়ে ডুবিয়ে তলদেশের গর্ত থেকে সুস্বাদু রিঠামাছ তুলে নিয়ে আসা লতু কানার আত্মতৃপ্তির সেসব উথালপাথাল স্রোত আর প্রবাহিত হয় না বুকভরা বালির চাপে আধমরা এই ব্রহ্মপুত্রে।
প্রতিরাতে মরা নদীর বালুচরে তাদের নিঃশব্দ অবস্থা। কেউ কারও দিকে না তাকিয়েও পরস্পরকে সঙ্গ দেয় তারা। ওদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠা কষ্ট-যন্ত্রণার রক্তক্ষরণ কেষ্টজেলে পাঠ করতে চায় অন্ধকারে বা মেটে জ্যোৎস্নায় কিংবা পূর্ণিমার মখমলের মতো আলোয়। কিন্তু পাঠ শেষ করার আগেই ওই ভোরের দৃশ্যটি তাকে বিব্রত করে তোলে। তার কী আর অধিকার আছে অন্যের মনের ভেতরের ভাষা পাঠের? ওদের সঙ্গে দেখা হয়, কথা বিশেষ হয় না। কী কথা হবে, সবই তো সবার জানা। শুধু হতাশা আর যন্ত্রণার জ্বালা বড় হয়ে উঠছে আর তার ভেতরে এই তিন নদী-মানুষ প্রতিদিন খর্ব থেকে আরও খর্ব হচ্ছে- এই তিনজনের নৈশবিচরণ এলাকার সবাই জানে এবং এদের প্রসঙ্গ আধপাগল বলে দূরে সরিয়ে রাখে।

সারা জনপদ যখন ঘুমের প্রান্তিক আমেজে নিমজ্জিত, ভোরের স্বচ্ছ নিষ্কলুষ আলো-বাতাসে পবিত্র অনুভূতিমাখা সেই মুহূর্তে ঘরের দরজা টান দিতেই এক বীভৎস দৃশ্য উন্মোচিত হল। সেই সুবাসিত শরীরের অদ্ভুত কোমলতা দলিত-মথিত হয়ে সুখদ শব্দে থরথর কাঁপিয়ে তুলছে তার ছোট্ট ঘর

ডেউকি এবং লতুর কষ্ট-হাহাকার-নিপীড়নের কথাও আরও বাড়ানো যেত। তাদেরও এমন অনেক জরুরি-গোপন গল্প-কথা আছে, যা শোনার জন্য পাঠকের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। তবে সেসব কথার ধরন কমবেশি একই, বিশেষ বৈচিত্র্য নেই। কারণ যখন উপার্জন থাকে না, পেটে ভাত থাকে না, তখন অদ্ভুত সব অঘটন একই প্রক্রিয়ায় ঘটতে থাকে। অসহায়ের মতো সেসব বহন করা, হজম করা এবং দলিত-মথিত হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না এই সব প্রান্তিক মানুষের। কেষ্টজেলে, ডেউকি মাঝি, লতু ডুবুরিরা এ সত্যটা বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে।
লোকটা তার নিজের ভাষায় এখন নিঃশব্দ উচ্চারণে যা বলছে, তা তার নিজের আবেগে-আকুলতায় তুলে ধরা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু নিশাকালীন বিশাল বালিচরের আরও বিশাল শূন্যতা থেকে তার কিঞ্চিৎ ইঙ্গিতই আমি তুলে আনতে পারি, এর বেশি কিছু নয়।
চৌদ্দ পুরুষের পেশা ছেড়ে দেবো কেন? হাজার বছরের এই পেশার প্রয়োজনীয়তা কী সমাজে ফুরিয়ে গেছে? এই পেশা আমার অধিকার। আমার বাঁচার অধিকার। ভগবান যে জীবন দিয়েছেন, তা রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। কেন এই দায়িত্ব পালন করা যাবে না? কেন বাধাগ্রস্ত করা হবে? তার সমগ্র অস্তিত্বজুড়ে খচিত এসব নিঃশব্দ প্রশ্নের কোনো জবাবই আমি দিতে পারবো না, পারা সম্ভবও নয়।
বউ বালিতে পা ফসকে সেই যে গড়িয়ে পড়ার সময় বুকে তুলে নিয়ে জীবনের নতুন আস্বাদ ও মানে খুঁজে পায়, তা তার কর্ম উদ্দীপনা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। রাতভর নৌকা বাওয়া বা জালফেলা-জালটানার পর সবাই যখন পরিশ্রান্ত-ক্লান্ত লোকটা তখন সবার অলক্ষ্যে শরীরে মধুর এক তেজ ও উদ্যামতা নিয়ে বাড়ি ফিরত। তার কাছে ভোর ছিল প্রাণবন্ত সময় গোপন-মোহন সময়। সাবিত্রীও কি ঘুমের ঘোরে তারই মতো আকুলতায় দেহ-মন এক করে অপেক্ষায় থাকত না!

সারা জনপদ যখন ঘুমের প্রান্তিক আমেজে নিমজ্জিত, ভোরের স্বচ্ছ নিষ্কলুষ আলো-বাতাসে পবিত্র অনুভূতিমাখা সেই মুহূর্তে ঘরের দরজা টান দিতেই এক বীভৎস দৃশ্য উন্মোচিত হল। সেই সুবাসিত শরীরের অদ্ভুত কোমলতা দলিত-মথিত হয়ে সুখদ শব্দে থরথর কাঁপিয়ে তুলছে তার ছোট্ট ঘর। নারীর বিশ্বাসভঙ্গ চিত্র তার হৃদয়ের গোপন-মোহন সব স্বপ্ন, ব্রহ্মপুত্রে আষাঢ়ি বানের মতো পৌরুষ, কষ্টকর জীবন এই সবই এক মুহূর্তে পচিয়ে-গলিয়ে বিকট গন্ধ ছড়িয়ে দিল। লোকটা বুঝে ফেলল, এর চেয়ে মৃত্যু ঢের ভালো তার মতো এক পুরুষের।
গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে জাল কাঁধে ঘুরে মানুষের পুকুরে মাছ ধরে দিয়ে উচ্ছিষ্ট কিছু মাছ নিয়ে শেষ মোড়ের এক কোণে বসে বিক্রি করে এক কেজি চাল, আধপোয়া ডাল আর একমুঠো পুঁইয়ের ডাঁটা নিয়ে ঘরে ফেরাতে কোনো গ্লানি ছিল না- মৃত্যুর মতো অশেষ কষ্টও ছিল না।

মরে বেঁচে থাকার কষ্ট নিয়ে এখন রোজ রাতে ব্রহ্মপুত্রের এই বিস্তীর্ণ বালিচর জীবনের সমান আক্রোশে খামচে বেড়ায় এই লোক। তার অভিমান, তার ক্ষোভ, তার আক্রোশ, সবকিছু গলার কাছে হাড্ডির মতো আটকে আছে। তার ওপর পেন্ডুলামের মতো ঝুলছে ওই দৃশ্যটি। যে কারণে সে তার ক্ষোভ-আক্রোশও প্রকাশ করতে পারে না। মিষ্টি কোমল সাবিত্রী বালার সুবাসিত নরম শরীরটাকে পচে-গলে যেতে দেখেছে সে নিজের চোখে। দু’জনের সম্পর্কের পচা-গলা লাশের মতো গন্ধ এখনও তার নাকে সেঁটে রয়েছে। পবিত্র এই নদীর সীমিত জলে অসংখ্যবার নাক ডুবিয়েছে। দু’হাতে ডলেছে, ডলতে ডলতে চামড়া ছড়ে গেছে। ওই বীভৎস গন্ধ দূর করা যায়নি।
এখন মেনে নিয়েছে, এই গন্ধ একবার নাকে লাগলে বুকের ভেতরে ঢোকে এবং চিতায় জ্বলার আগ-পর্যন্ত আর ওই গন্ধ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় নেই। তবে গন্ধটা যে শবদেহের, এটা এখনও ঠিক ঠিক মনে করছে না লোকটা। তার কৈশোরকালে মরিচারচরে গলুইভাঙা ডোবায় মাছ মারতে গিয়ে সন্ধ্যারাতে ভাটিতে নৌকা বেঁধে ঘুমিয়েছিল তারা। শেষ নৌকায় তার পাশে শুয়েছিল সত্তর বছরের সুরুজ্যাঠা। পূর্বদিক থেকে বড় তারাটা যখন কাত হয়ে দক্ষিণে সরে যায়, তখনই জাল ফেলা শুরু হয়। সময় মতো জ্যাঠাকে তুলতে গিয়ে দেখে তার শরীর ঠা-া। অজানা এক ভীতি তার কণ্ঠে চিৎকার হয়ে ফেটে পড়ে ঘোলা নদীজল-ছাইরঙা আকাশ-ঠাণ্ডা বাতাসে। চারপাশের নৌকা থেকে লাফিয়ে নেমে এল অন্যরা।

সে জানাল, জ্যাঠা উঠতাছে না- জ্যাঠার শরীর ঠাণ্ডা-শীতল। সবাই বুঝলো শোয়ার পরই মৃত্যু হয়েছে তার। মরা মানুষের পাশে প্রায় আধারাত শুয়ে থেকেও কিশোর বয়সে লোকটা তা বোঝেনি- এখনও কী বোঝে! তার তো মনে হয়, বাঁচা-মরার মধ্যে পার্থক্যটা সুঁইয়ের মাথার মতো এত সরু যে, শুরুতে এটা ঠাহরই করা যায় না।
স্ত্রীর সঙ্গে পরপুরুষের সম্ভোগ এক সময় তাকে নির্বিকার করে তোলে। সে বাঁচবে- না বেঁচে থাকবে না, এমন দোটানার মাঝখানে তার ভাবনাগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে। সাবিত্রীকে মেরে নিজে মরার ভাবনাও তাকে আচ্ছন্ন করেছে এবং এই ভাবনা আরও এগিয়ে নিতেও একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছে। এখন লোকটার মতো আমাদেরও সঙ্গত প্রশ্ন জাগে, ভগবান তাহলে তার কোনো উদ্দেশ্য পূরণের কারণে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়! তাহলে কী আবার নদীতে পানি আসবে, মরা গাঙে উদ্যাম তরঙ্গ জাগবে, আর তার পরতে পরতে জলের রুপালি ফসল স্বচ্ছন্দে খেলে বেড়াবে? জেলেদের জাল ভরে উঠবে সেই ফসলে এবং দুবেলা দুমুঠো ডাল-ভাত খেয়ে ও মোটা কাপড় পরে বাঁচবে বংশ পরম্পরায় নদীজীবী এসব হতভাগ্য মানুষ! এর জবাব যে লোকটার কাছে স্বপ্নের মতো, এতক্ষণ ধরে তাকে দেখার পর আমাদের এটা মনে হতেই পারে।

৪.
স্ত্রীর সঙ্গে পরপুরুষের দৈহিক সম্পর্ক, অন্যের প্রতি স্ত্রীর দুর্বলতা, সবই সে জেনে ফেলেছিল। না জানলে কী হতো? সম্পর্ক নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হতো না। বহু মানুষের জীবনে স্ত্রী বা স্বামীর গোপন একান্ত দুর্বলতা বা স্খলন-পতন কোনো জটিলতাই তৈরি করে না। ঘটনা বা কর্ম কিংবা নিষিদ্ধ সম্পর্ক কোনো কারণে অজানা থেকে গেলে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যা থেকে যায়- কোনো জটিলতাই দাম্পত্য জীবন বিচলিত করে না। ব্রহ্মপুত্রের নির্জন বালুচরে নিঃসঙ্গ কেষ্টজেলেকে নিজেকে নিজেরই এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে, এই জানাটা তার ক্ষেত্রে যদি না-ই ঘটত, তাহলে জগৎ-সংসারে সত্য প্রকাশে কী এমন ঘাটতি পড়ে যেত, যা দিবারাত্রি চক্রে বিপর্যয় সৃষ্টি করত?

নারী-পুরুষের স্খলন-পতনের কথা ভাবতে ভাবতে সে পাড়ের দিকে হাঁটতে লাগল। অন্য রাতের মতো বটগাছ তলে এসে নদীর বিস্তীর্ণ বালুচরের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গত কয়েক বছর যা করে না, তাই করল। সরকার বাড়ির মরিচ ক্ষেতের পাশের গোপাট ধরে দ্রুত বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তার পাশে ব্রিটিশ আমলের বিরাট জামগাছের ছায়াচ্ছন্ন জায়গাটা পার হয়ে মেটে জ্যোৎস্নায় নিজের বামন ছায়া দেখল। মাথার ওপর দেরি করে ওঠা ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ তার ছায়াটাকে ক্ষীণ করে তুলেছে। সড়ক ধরে ধীরলয়ে প্রবাহিত মৃদু বাতাসের ছোঁয়ায় দূরাগত ভোরের পরশ টের পেল। জীবনের বহু রাত এই সময়টায় সে বাড়ি ফিরেছে। স্রোতের-তরঙ্গের উল্লাসধ্বনি যত দূরে সরেছে, তত চরাচর-জনপদের নিস্তব্ধতা তার দেহমনে স্নিগ্ধ প্রশান্তি বিস্তার করেছে- বাড়ির উত্তর-পশ্চিম কোণে হামা দিয়ে থাকা তার ঘরে বাঁশের দরজার আলতো ছোঁয়া মাত্র দরজার আড়কাঠি খুলে সরে দাঁড়িয়েছে সাবিত্রী। জালের ছেঁড়া ন্যাকড়ায় বাঁধা দুয়েকটা বেলে বা অন্য কোনো মাছ বউয়ের হাতে ধরিয়ে দিত। বউ বরাবর বলত গুঁড়ামাছ আনতে। দাম কম, লোকসানটা কম হয়। ছোট মাছ, যাকে বাজারে লোকে বলে গুঁড়ামাছ, সে জাল থেকে নৌকায় নয়, জলে ফেলে দেয়ার মতো নয়, জলে আলগোছে নামিয়ে রাখার মতো ছেড়ে দেয়। না, দেয় বলাটা ঠিক হবে না, ছেড়ে দিত। দিতটাই সঠিক। বউ খাবার সামনে দিয়ে তালপাতার পাখা নেড়ে বাতাস করেছে। শোয়ার পর মেটে তেলের শিশি নিয়ে পাশে বসে মালিশ করে হাতে-পায়ের সাদাটে হয়ে ওঠা রঙ স্বাভাবিক করে তুলেছে। তারপর সাবিত্রীর নরম শরীর নিয়ে সে আদরে মেতে উঠেছে। শরীরের ঝড় থেমে যাওয়ার পর কেষ্ট নাক ডাকতে শুরু করেছে।
তার শরীরে মাছের আঁশটে গন্ধ শুঁকে শুঁকে সাবিত্রীরও চোখ লেগে এসেছে। সাবিত্রী বিয়ের পর থেকে তার সঙ্গে সংসার চালানোর লড়াইয়ে তাল মিলিয়ে হাত-পা চালিয়েছে। সকাল সকাল ঘরের কাজ সেরে সাহাবাড়িতে ধান ভেনেছে। তার

সে জানাল, জ্যাঠা উঠতাছে না- জ্যাঠার শরীর ঠাণ্ডা-শীতল। সবাই বুঝলো শোয়ার পরই মৃত্যু হয়েছে তার। মরা মানুষের পাশে প্রায় আধারাত শুয়ে থেকেও কিশোর বয়সে লোকটা তা বোঝেনি- এখনও কী বোঝে! তার তো মনে হয়, বাঁচা-মরার মধ্যে পার্থক্যটা সুঁইয়ের মাথার মতো এত সরু যে, শুরুতে এটা ঠাহরই করা যায় না

সন্তানের জন্ম দিয়েছে- লালন-পালন করেছে। মুহূর্তের স্খলন জীবনের পুরো কর্মক্রিয়া বিনষ্ট করে দিলে পূর্ণজীবন আর থাকে কোথায়!
লোকটার দিক থেকে আমরা যদি তার স্ত্রীর দিকে দৃষ্টি দিই- কান পাতি, তাহলে শুনবো- সাবিত্রী নিঃশব্দে কতবার উচ্চারণ করেছে, মনুরবাপ আমি শরীরের ক্ষুধার বশ হইয়া গেছি, মুহূর্তের হতবুদ্ধিদশায় ওই পোংটা লোকটা আমার শিথিল শরীর জাগাইয়া দিছে। অনেক চেষ্টা কইরাও ওর কব্জা থাইকা ছাড়া পাই নাই। ওই অবস্থাটাই তুমি দেখছো, ওই হারামিরে ঠেকাইবার লাগি আমার যুদ্ধখান দেখ নাই…
বিশ্ববিদ্যালয়ের নাইটগার্ডের চাকরির কথা বলেছে মালোপাড়ার ওই লোক। চাকরি করে পয়সা-কড়ি করেছে। এখন সুযোগ পেলেই পাড়ার বউ-ঝিদের পেছনে ঘুর ঘুর করে। কেউ জোর দিয়ে কিছু বলতে পারে না, কারণ ঠেকা-বেঠেকায় ওর কাছে ধারের জন্য হাত পাততে হয়। কেষ্টরও ধার আছে, যা শোধ করা কি করে সম্ভব, তা সে জানে না। ধার শোধের প্রসঙ্গ তুলেই সে ওই চাকরির কথা বলেছে। সে বাপ-ঠাকুর্দার পেশা ছাড়তে চায়নি। রাতের ডিউটিতে যাবে আর ওই বেজন্মা এসে তার বিছানায় শোবে- তার বউয়ের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করবে…
আজ প্রশ্ন জাগছে, নদীকে অভিসম্পাত করে, সমাজের সুবিধাবাদীদের গালিগালাজ করে আর কতকাল অপেক্ষা করবে? কে তাদের দুমুঠো ডাল-ভাতের সুযোগ করে দেবে? কেষ্টজেলের ভালো নামটা কাজে লাগে নির্বাচনের সময়। জলজীবী মানুষ ভোট দেয়, কিন্তু নদীতে পানি আসে না। পানি না থাকলে মাছেরা ঘর-বসতি বাঁধতে পারে না। তাদের সংসার হয় না। যেটুকু পানি আছে, তা সবার জন্য। পানিনির্ভর জীবিকাধারীদের জন্য রক্ষা করে না কেউ। মালোপাড়া-জেলেপাড়া বলে আর কিছু নেই- পাড়াটা দেখলে মনে হবে, দেড়-দু’হাজার আগের কোনো জনপদের ধ্বংসাবশেষ। এখন প্রতœতত্ত্ব বিভাগের সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিলেই হয়। এ পাড়ার ভাগ্যবান কেউ কেউ অন্য কোনো পেশা আঁকড়ে ধরার সুযোগ পেয়ে ধুকপুক করে বাঁচছে। অন্যরা নানাভাবে মরে বেঁচে আছে।

তার মেয়েটা নাটকে নাম লিখিয়েছে। বিকালে শহরে চলে যায়, ফেরে গভীররাতে। কোনো কোনো রাতে ফেরে না। ছেলেটার কোনো খবর নেই গত ছ’মাস। ওর শরীর-স্বাস্থ্য লোকটার যৌবনের ফটোকপি। সর্বশেষ যে খবর, তাতে সে নিশ্চিত- ম্যাসলম্যানদের পাল্লায় পড়েছে। এসব সে দেখে না, সে তো বাড়িতে ফেরে না, গাঙপাড়ে ওই বুড়ো বটগাছের কাত হয়ে থাকা ডালটায় ভোররাতের দিকে চর থেকে এসে শোয়। বটগাছে অজগর থাকে, ব্রহ্মদৈত্যের পা থাকে, ছোটবেলায় শোনা আরও অনেক কথার মতো এসব কথাও ডাহা মিথ্যা বলেই- সে সাপের কামড়ে মরছে না, অজগরের পেটেও যাচ্ছে না, ব্রহ্মদৈত্যের কবলেও পড়ছে না। সে তো মরতেও চেয়েছে। কিন্তু নিজে নিজের জীবন নিতে চায়নি, ওটা পারবেও না। ভগবান এ রকম মৃত্যুর জন্য মানুষ তৈরি করেনি, সময় হলে ভগবানই নেবে। তার ওপর, তার কাজে হাত দেয়া মানুষের কাজ নয়। এই বোধ সে নিজের মতো অনুভব করেছে কৈশোরকালেই- যখন বউ চলে যাওয়ায় উজানবাড়ির কাশীরাম গলায় দড়ি দিয়েছিল।
দড়ি দিয়েও বেঁচে যাওয়া ওই মানুষটাকে কৌতূহল বশে সে জিজ্ঞেস করেছিল, কাকু মরণের আগখানে ক্যামুন লাগে?
সেই বর্ষণমুখর দিনে কাশীর ভাইপোর জ্বর থাকায় কেষ্টকে তার নৌকা বাইতে হয়। মুষল বৃষ্টির মধ্যে মাথায় ভেন্নাপাতা বেঁধে বৈঠা মেরে এপার থেকে ওপারে যায়। ছনক্ষেতের কাছে গিয়ে কাশীরাম নৌকা ভেড়াতে বলে, ছনে নৌকা প্যাঁচ দিয়ে বসেছিল যুতসই ক্ষেপ মারার জন্য, তখন কেষ্টর ওই প্রশ্ন তার একাগ্রতা নষ্ট করে দেয়।
সে বলে, ক্যামুন লাগছিল, এই কতাখান হুনবি না, হুনলে বেআক্কেলের লাহান কামখান কইরা ফালানির জোশ আইবার পারে।

ওই কথাটা মনে পড়ে আত্মহত্যার কথা মনে হলেই। তার মনে হয়, যতদিন ওই কথাটা মনে পড়বে, ততদিন সে আর আত্মহত্যা কিংবা বউকে হত্যা- কোনোটাই করতে পারবে না। তাহলে করবে কী?
বউয়ের বিলাপধ্বনি অনেক দূর থেকে ভেসে আসে। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়, কালাচান পুংটায় কইছে, চাকরিখান অহনো বলে হইবার পারে। সব মিইলা তিন হাজার ট্যাকা মাইনা। পাকা হইলে আরও হাজারখানেক ট্যাকা বাড়বো। দুইডা পেট চলবো ডাইল-ভাত খাইয়া। পোলা গেছে, মাইয়া নষ্ট হইছে কি না কইবার পারি না, তয় বুঝি হে-ও যাইবার পথে- হারাদিন মোবাইলে কতা কয়। হি-হি-হি কইরা হাসে। শরীল নাচাইয়া ফুরফুর কইরা ওড়ে। মনে কয় কুনু খেয়ালে আছে- ঘরে তিনদিন এককণা চাউল নাই, শহর থাইক্যা ফল কিইনা আনে মাইয়া। কেডায় মুখে দিবো, কেন দিবো?
কেষ্ট ভাঙা দরজায় হাত রাখে। সাবিত্রী দরজা খুলে সামনে দাঁড়ায়। কেষ্ট সাবিত্রীর চোখে চোখ রাখে। সাবিত্রী চোখ নামায় না। সংসারের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে সেও কেষ্টর ভেতরটা দেখতে চায়। কেষ্ট সাবিত্রীর ভেতর কোনো রাখঢাক দেখে না। তার এই স্খলন-পতন তো কেষ্টর জন্য নয়। সাবিত্রীর জন্যও নয়। এ তো অভাবের জন্য, আর অভাব কেষ্টজেলের কর্মহীনতার জন্য। আর তা নদীতে জল এবং জলের ফসল না থাকার জন্য। নদী মরে যাওয়ার দায় কার ওপর চাপাবে কর্মহীন কেষ্টজেলে?

মরাগাঙের বিশাল বালিচর। বিশাল-শূন্যতায় হেঁটে হেঁটে অবসন্ন অসহায় কেষ্ট ধীরে অস্পষ্ট কণ্ঠে বলে ওঠে, করবাম, চাকরি করবাম, তর শরীলের সুখ দিবার পারি বা না পারি, পেটে চাইরটা ভাত দেওনের ব্যবস্থা করন লাগবো। বাপ-ঠাকুর্দার পেশা, গাঙে জল নাই, জলের ফসল নাই, তরে লইয়া কানাঘুষা হয়। মেয়েটা বানে ভাইস্যা যাইতাছে। ছেলেটা অপকর্মে জড়াইয়া পড়ছে। হেই নিয়া কতা হুনতে অয়। তারপরেও পেট তো আছে, পেটের জ্বালা আছে। অনেক চেষ্টা কইরাও মরবার পারি নাই। তরে মাইরা মরবার চাইছি, তা-ও পারি নাই। কইয়া দে ওই পোংটারে, আমি রাজি।

আরো পড়তে পারেন

মহামায়া (পর্ব-২)

পড়ুন—  মহামায়া (পর্ব-১) ৩. কাঁচা রাস্তায় উঠতে উঠতে কাপড় ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে। পায়ের সাথে কাপড় জড়িয়ে যাচ্ছে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। সবার আগে মনিশঙ্কর হাঁটছে। তার হাতে মাথায় খাবারের টিন। একটা কাপড়ের ট্রাঙ্ক। সকলের হাতেই কাপড়ের পুটুলি। এতটুকু আসতেই হাপিয়ে উঠেছে। আরো অনেকটা দূর যেতে হবে হেঁটে। তারপর নৌকায় সীমানার কাছাকাছি কোনো একটা জায়গায়।….

মহামায়া (পর্ব-১)

১. সূর্য উঠতে এখনো অনেকটা দেরি। আকাশে কোনো তারা নেই। পুরোটা আকাশ মেঘে ঢাকা। রাতের অন্ধকারটা আজকে আরও বেশি চোখে লাগছে। বাতাস হচ্ছে। মাঝে মাঝে মেঘের আলোতে দেবীপুর গ্রামটা দেখা যাচ্ছে। মুহুর্তের জন্য অন্ধকার সরে আলোয় ভেসে যাচ্ছে। রাধাশঙ্করের ভিটাবাড়ি, ধান ক্ষেত, বাঁশঝাড় হাইস্কুল আলোয় ভেসে যাচ্ছে মুহূর্তের জন্য। মহামায়া আর মনিশঙ্করের ঘরে হারিকেন জ্বলছে।….

স্বর্ণবোয়াল

মোবারক তার কন্যার পাতে তরকারি তুলে দেয় আর বলে, আইজ কয় পদের মাছ খাইতেছ সেইটা খাবা আর বলবা মা! দেখি তুমি কেমুন মাছ চিনো! ময়না তার গোলগাল তামাটে মুখে একটা মধুর হাসি ফুটিয়ে উল্লসিত হয়ে ওঠে এই প্রতিযোগিতায় নামার জন্য। যদিও পুরষ্কার ফুরষ্কারের কোন তোয়াক্কা নাই। খাবার সময় বাপবেটির এইসব ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ খেলা আজকাল নিয়মিত কারবার।….

error: Content is protected !!