Author Picture

খণ্ডস্বপ্ন অখণ্ড অন্ধকার

মোসাদ্দেক আহমেদ


প্রথম দিককার দিনগুলো অসহনীয় কাটলেও হেরোইন কেসে আটক হয়ে হিজড়ে নজরুল এখানে আসা ইস্তক জেলখানার জীবন আর খারাপ লাগছে না তেমন। হিজড়ে নজরুলের মেয়েলি ঢঙের চলাফেরা, সবার সঙ্গে গা-ঘেঁষা স্বভাব, রংঢঙের কথাবার্তা চাইকি পাছার কাপড় প্রায় তুলে ওয়ার্ডের মধ্যে ঝাকানাকা ড্যান্সের আসর বসালে কয়েদি ও হাজতিদের বিষণ্ণতা অনেকটাই কাটে। তবে আজ সকাল থেকে নজরুলের সার্ভিস পাওয়া যাচ্ছে না; অদ্যকার সকালে দুই দুইবার ফাইল বসার পর থেকে তার ডাঁটই আলাদা। তা ডাঁট হবে না আবার? স্বয়ং জেলার সাহেবের কাজে বেরিয়ে গেছে সে। জেলার সাহেব কীভাবে যেন সংবাদ পেয়েছেন হিজড়ে নজরুল আচার বানাতে অতিশয় ওস্তাদলোক, তার বানানো আচার মানেই সুপার হিট। সম্ভবত জমাদার সাহেব মারফত এই তথ্য লিক হলে জেলার সাহেবকে খুশি করার এক অভাবনীয় মওকা জোটে; সেই উপচে-পড়া খুশি নজরুলের চোখে-মুখে ঝিলিক মারে, ‘যাই সহাল সহাল কাম ধরি গে। বুঝে দ্যহেন, জেলার সায়েব খাবি আমার হাতের আচার, সুজা কথা না। আপনাগের সাক্ষী রাহে কতেছি- আজ এমুন আচার বানাব যে, জেলার সায়েবের চৌদ্দগোষ্ঠি চোহে দ্যাহে নাই। খায়েই জেলার সায়েব ফিট লাগে যাবি।’ সেই মোতাবেক নজরুল বেরিয়ে যেতে বানাত আলীর মগ্নভাব কাটে, এক পা-দুই পা করে ৪ নং ওয়ার্ডের বাইরে এসে দাঁড়ায়। সামনের ফাঁকা চত্বরে হাজতি ও কয়েদিরা ঢিলেঢালা পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে ঠিকই, তবে নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে যেতে গেলে কারারক্ষীদের পারমিশন লাগে।

এখানকার নিয়মকানুন শিখতে অবশ্য দেরি হয় না। কয়েদিদের মধ্য থেকে মনোনীত ম্যাট-ই সব জানিয়ে দেয়। আরে কারারক্ষীরা তো একপ্রকার নামকাওয়াস্তে রক্ষক, এখানকার আসল চালিকাশক্তিই হচ্ছে এই কয়েদিরা। ডোরাকাঁটা পোশাকের ওপর বেল্ট-পরা কয়েদিরা কি খোদ সরকারি লোক নয়? হাজতিরা যাবে আবার আসবে অথবা কারারক্ষীদেরও নিয়মমাফিক বদলি আছে, কিন্তু কয়েদিরা অনড়। ভেতরকার যাবতীয় রান্নাবান্না থেকে হাজতি-কয়েদিদের ফাইল ধরে গণনা কি অসুস্থদের কারাডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া থেকে নানান কিসিমের দাপ্তরিক কাজ বলো- সব তো করে এই কয়েদিরাই। কয়েদিদের মধ্যে আবার যারা ম্যাট নির্বাচিত, তাদের দাপট আরও বেশি। দ্বিতীয় দিনেই সেটা টের পায় বানাত আলী। পাশের একটি বিছানা দেখিয়ে কার বিছানা জানতে চাইলে অন্য একজন কয়েদি তাজিমের সঙ্গে উত্তর ঝাড়ে, ‘ম্যাট সায়েবের বিছানা।’ দাপট যতই থাক, কয়েদিরা সাধারণত এর অপব্যবহার না; এতে করে তারা ১২ মাসের বছরকে ৯ মাসে নামিয়ে আনার সুবিধাভোগ করে।

৪ নং ওয়ার্ডের লাগোয়া মাঠের একপাশে রান্নাঘর, কিন্তু এখান থেকে হিজড়ে নজরুলকে দেখা যাচ্ছে না, সম্ভবত ভেতরকার কোনো পাকঘরে সে আচার বানাতে ব্যস্ত। পায়ে-পায়ে বানাত আলী রান্ন্াঘরের খোলা অংশের দিকে এসে কয়েদিদের তরিতরকারি কোটা দেখে। প্রায় জনাবিশেক কয়েদিদের সে কী ব্যস্ততা। আলু-পেঁপে-বেগুন-পটলের ছোটখাটো পাহাড় জমে গেছে বললেই চলে। অথচ খাওয়ার সময় যা জোটে তার না-আছে কোনো স্বাদ, না-আছে ঘ্রাণ। ২৮ কি ১১ চালের মোটা ভাত তো সে নিয়মিতই বাড়িতে খায়, কিন্তু কই সে ভাত বাসি হলে তো এমন হালা হয় না; পক্ষান্তরে এখানে ভাত গরমাগরম না-খেলে সবই বিস্বাদ। প্রমাণ সাইজের বঁটিতে পেঁপে কাটতে থাকা-কয়েদির হাতে গ্লাভস পরা দেখে নিকটবর্তী কারারক্ষী হালকা রসিকতা করে, ‘কি হে জলিল, বেশ গ্লাভস পরে পেঁপে কাটছ দেখছি। ভাবের বেলায় তো ষোলোআনা, ফাইভ স্টার হোটেলের বাবুর্চি ফেল।’

পেঁপে কাটায় সামান্য বিরতি দিয়ে জলিল মুচকি হাসে, ‘কী যে কন স্যার, গিলাভস্ পরিছি চোদনে। নালি পেঁপোর কষে কাম সারা; তামান হাতে বড় বড় পচার ঘাউ হয়। তা বুদ্ধিডা ক্যাম্বা স্যার?’
‘দি আইডিয়া। তোমার মাথায় বুদ্ধি হ্যাজ।’ বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে কারারক্ষী কৌতুকে প্রাণ আনে, লম্বা-লম্বা কদমে ডেথ সেলের দিকে হেঁটে যায়। ডেথ সেল এলাকাটি পাকা দেয়াল ও মজবুত লোহার গ্রিল দিয়ে আলাদাভাবে ঘেরা, কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে ওখানকার এক কয়েদির ফাঁসি শীঘ্র হবে বলে তাকে ভিন্ন কোনো জেলার জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কারণ ফাঁসি কার্যকর করার সুয়োগ-সুবিধা এখানে নেই। সরস বাক্যবিনিময় শেষে কারারক্ষী যে পথ দিয়ে চলে গেল, তার বাঁ দিকের মাঠ ধরে বানাত আলী হেঁটে একটা টিন শেডের কাছে এসে দাঁড়ায়। নিচের পাটাতনটি সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো; কয়েকজন কয়েদি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করায় মত্ত; তবলায় সঙ্গত-করা সঙ্গীটি উৎসাহের আতিশয্যে বারবার সামনে ঝুঁকে পড়ছে। তবলা-হারমোনিয়াম-মন্দিরার মিলিত সুরধ্বনিতে চত্বরখানা এতটাই মুখরিত যে, জায়গাটি পুরো জেলখানার সঙ্গে বেমানান; এর সঙ্গে তুল্য কেবল কয়েদিদের সযত্ন চর্চিত বাহারি ফুলবাগান ও জেলখানার আনাচে কানাচে এসে-বসা দলছুট স্বাধীন পাখিগুলো।

পেঁপে কাটায় সামান্য বিরতি দিয়ে জলিল মুচকি হাসে, ‘কী যে কন স্যার, গিলাভস্ পরিছি চোদনে। নালি পেঁপোর কষে কাম সারা; তামান হাতে বড় বড় পচার ঘাউ হয়। তা বুদ্ধিডা ক্যাম্বা স্যার?’
‘দি আইডিয়া। তোমার মাথায় বুদ্ধি হ্যাজ।’ বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে কারারক্ষী কৌতুকে প্রাণ আনে, লম্বা-লম্বা কদমে ডেথ সেলের দিকে হেঁটে যায়। ডেথ সেল এলাকাটি পাকা দেয়াল ও মজবুত লোহার গ্রিল দিয়ে আলাদাভাবে ঘেরা, কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে ওখানকার এক কয়েদির ফাঁসি শীঘ্র হবে বলে তাকে ভিন্ন কোনো জেলার জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কারণ ফাঁসি কার্যকর করার সুয়োগ-সুবিধা এখানে নেই।

হারমোনিয়াম বাজিয়ে পল্লিগীতি ‘ও যার আপন খবর আপনারে হয় না/ একবার আপনারে চিনতে পারলে যাবে অচেনারে চেনা/ ও যার আপন খবর…’ গাইতে-থাকা কালু ডাকাতকে চিনতে পেরে বানাত আলী দারুণ শিহরিত। একজন দুর্ধর্ষ ডাকাতের গলাও কি তবে এত সুন্দর হয়! শিল্পী আব্দুল আলিমের ভাবশিষ্যই বটে। গানের তালে-তালে সে এগিয়ে এসে শানের মেঝেতে বসে পড়ে আলগোছে। আনন্দঘন গায়কী ভঙ্গি দেখে কে বলবে এই কটা দিন কালু ডাকাত বেশ মনমরা ছিল। একই ৪ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা হওয়ায় কালু ডাকাতকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ মিলেছে বইকি। জানা গেছে অনেক অজানা তথ্য: ডাকাতির সময় অন্য কিছু নয়, ডাকাতি করাটাই থাকে মুখ্য; একান্ত বাধ্য না-হলে তারা খুনখারাপির মধ্যে যায় না আর মেয়েছেলেদের হাত ধরে টানাটানি- আরে সে তো অচিন্তনীয়, তওবা-তওবা! অন্য মেয়েছেলেদের সম্মানের চোখে দেখলে হবে কী, কালুর ভাগ্যে পুরস্কারটি জুটেছে নিদারুণ বিপরীত ভঙ্গিমায়। আদালত কালুর জেল ডেকে দেওয়ার পর তার বউ নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ করলেও, সর্বশেষ সাক্ষাৎ-পর্বটি লেজে গোবরে হয়ে গেছে। বউয়ের সঙ্গে যথারীতি ছোটছেলেটাও এসেছিল সাক্ষাৎ-কক্ষে; তিন কি চার স্তরবিশিষ্ট লোহার শিকের এপাশ থেকে কুশল জানতে চাইলে বউয়ের আগে ছোট ছেলেটা কথা বলে ওঠে শিশুসুলভ কণ্ঠে, ‘ভালোই আছি বাজান। মার সাথে আমিও নতুন বাপের বাসায় উঠিছি। জানো, নতুন বাপ না-আমার রোজ মজা কিনে দেয়।’ বিধ্বংসী এই দর্শনপর্বের পর থেকে পাষাণহৃদয় কালু ডাকাত যৎপরোনাস্তি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, ক’দিন তো ভাত পর্যন্ত খেতে পারেনি; ‘সব ঝুট হ্যায়, বিলকুল ঝুট হ্যায়’ বলে সিনেমার কায়দায় ক’রাত দাপালো পর্যন্ত। আজ গান করার সুখে কিনা বলা কঠিন, ডাকাত সর্দার এক্ষণে অনেকটা নির্ভার।

কালু ডাকাতের বউ যা খুশি করুক, বানাত আলী মনে-মনে আশ্বস্ত হল রুবির কথা ভেবে। না, রুবি এমন মানুষই নয় যে, চরম বিপদের দিনে তাকে ছেড়ে যাবে। তার মতো বোকাসোকা লোকের জীবনে বিপদাপদ তো আর কম আসেনি, কিন্তু রুবি বরাবরই তার সমব্যথী; বলতে গেলে তাদের নুন আনতে পান্তা-ফুরানোর সংসারে রুবির ভূমিকাই প্রধান। কারণ বিয়ের প্রথম বছরেই রুবি বুঝে ফেলে তার স্বামীপ্রবরটি নিরেট গোবেচারা, এমন লোকের বিপদ ঘোরে পদে-পদে। বস্তুত তাদের বিয়ের বছরটাই শুরু হয় বালামসিবত দিয়ে, কবুল পড়ার ক’দিনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ লেগে গেল দেশে। রুবিকে তখনও তোলা হয়নি, তোলার আয়োজন চলছে সবে। এরি মধ্যে একদিন পাকসেনারা পাকা সড়কের পার্শ্বস্থিত তাদের পাড়ায় ঢুকে পড়ে সটান। সেদিন অবশ্য বাড়িতে ছিল না সে। আগের দিন হয়তো পরিস্থিতি আঁচ করে বাজান তাকে সোনা ও টাকার পুঁটলি ধরিয়ে দিয়ে দু’গ্রাম পরের গ্রামের আত্মীয়-বাড়িতে চলে যেতে বলে, ‘শোন, তুই হারা গেলি যাবি, কিন্তুক এই টুপলা য্যান না হারায়। খুব সাবধান।’ হা কপাল, পুঁটলি তো গেলই, বাজানও রক্ষা পেল না। পাকা সড়ক ধরে চলাচলকারী জিপের সৈন্যরা মহল্লায় ঢুকে পড়ে সাক্ষাৎ কালবৈশাখী সেজে, বলতে কি আর বছরকার গোর্কির অধিক গোর্কি সেজে।

সেদিন সকাল থেকেই ভাপসা গরম, গাছের একটি পাতাও কাঁপছে না; পাখিরাও মসিবত ঠাওর করে সরে গেছে দূরে। কিন্তু তখনও বোঝা যায়নি খর দাহনের সবে আরম্ভ; সৈন্যদের দেওয়া-আগুনে অগ্নিদগ্ধ বাড়িঘর আর শুকনা খড়ের বিরাট পালাগুলো এমন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে যে, সূর্যের প্রখরতাও হার মেনে যায় আরকি। বাজান ও বড়ভাই মকসেদ বাড়ির উঠানে পাকসৈন্য দেখামাত্র ভয়ের চোটে দরজা বন্ধ করে দিলেও কাজের কাজ কিছু হয় না। শিলকড়–ই কাঠের দরজা ভেদ-করা সৈন্যদের গুলি খেয়ে মারাত্মক আহত অবস্থায় বাপ-বড়ভাই নিঃসাড় পড়ে থাকল বদ্ধ ঘরেই। তাদের চাপ-চাপ রক্তে ভিজে আড়াই মণি ধান ও চৈতালির বস্তাগুলো ওজনদার হতে থাকলেও, সৈন্যদের গতিবিধি বুঝতে না পারায় একজনও বাইরে বেরিয়ে আসার সাহস পাচ্ছে না, রক্ত ক্ষরিত হয়ে-হয়ে ভেতরে মরে পড়ে থাকাটাই শ্রেয়তর মনে হচ্ছে বুঝিবা। কিন্তু এখানেও বাদ সাধে সেই আগুন: দুপাশের লাগোয়া নতুন খড়ের ঘর দুটোর গনগনে আগুনের তাপে তাদের পাকাঘরটি নরকের ন্যায় উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ঘরে-বাইরে বিপদের ভারসাম্য ফিরে আসে। লকলকে আগুনের আঁচে গায়ের চামড়া ঝলসে যাওয়ার উপক্রম হলে যা হয়, মরিয়া বাপ-বেটা হুড়কো খুলে বেরিয়ে আসতে গিয়ে দড়াম করে আছড়ে পড়ে উঠানে; ঝিমানো মাথায় বুঝে উঠতে পারে না সৈন্যদলের কে কোথায় বা আদৌ তারা চলে গেছে কিনা; তবে একটা জিনিস তারা বুঝতে পারে যে, কোনোক্রমে একবার যদি তারা ঘরের পিছন দিককার পুকুরের মধ্যে গিয়ে পড়তে পারে তবে তারা বেঁচে যাবে হয়তো। কিন্তু তাদের হিসাবে ভুল ছিল। কারণ পাকসৈন্যদের দ্বিতীয় দলটি তখনও পুকুরের বাউড়িজুড়ে পায়চারি করায় বিপদের সমীকরণ বাইরের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। ফলে যা ঘটার তা-ই ঘটে। মরণপণ প্রয়াসে জখমি বাপ-বেটা কনুই মেরে হামা দিয়ে ঘরের পেছনকার পুকুরের ঢালে আসতে সৈন্যদের আরেকপ্রস্থ আমোদের উপলক্ষ তৈরি হয়; দ্বিতীয়দফা গুলি খেয়ে বাপ আর কুলিয়ে উঠতে পারে না, কোলাব্যাঙের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ামাত্র চিরনিথর হয়ে যায় আর বড়ভাই মকসেদ পুকুরের পানিতে লাফিয়ে পড়ে শান বাঁধানো ঘাটের সঙ্গে লেপটে থেকে জানে রক্ষা পায় বটে, কিন্তু এর পরের অধ্যায়টি ছিল মৃত্যুযন্ত্রণার অধিক বিভীষিকাময়।

সেদিন সকাল থেকেই ভাপসা গরম, গাছের একটি পাতাও কাঁপছে না; পাখিরাও মসিবত ঠাওর করে সরে গেছে দূরে। কিন্তু তখনও বোঝা যায়নি খর দাহনের সবে আরম্ভ; সৈন্যদের দেওয়া-আগুনে অগ্নিদগ্ধ বাড়িঘর আর শুকনা খড়ের বিরাট পালাগুলো এমন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে যে, সূর্যের প্রখরতাও হার মেনে যায় আরকি। বাজান ও বড়ভাই মকসেদ বাড়ির উঠানে পাকসৈন্য দেখামাত্র ভয়ের চোটে দরজা বন্ধ করে দিলেও কাজের কাজ কিছু হয় না। শিলকড়–ই কাঠের দরজা ভেদ-করা সৈন্যদের গুলি খেয়ে মারাত্মক আহত অবস্থায় বাপ-বড়ভাই নিঃসাড় পড়ে থাকল বদ্ধ ঘরেই।

‘কিডা বানাত আলী না, গান শুনতি চাও ভালো কথা, তা ফাঁকে ক্যা? কোল ঘেঁঁষে বসো।’ গায়ক-কাম-দস্যুসর্দার কালুর আহ্বানে বানাত আলীর অচেতনতা কাটে। কিন্তু বানাতের প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা না-করে কালু ডাকাত পরের গানে চলে যায়, বউয়ের বিশ্বাসভঙ্গের তাপজ্বালাই বুঝি তার কণ্ঠে গান হয়ে ঝরে পড়ে অবিরল। এটা সঠিক যে, ডাকাতি তার পেশা এবং এর সাজাও সে ভোগ করছে, কিন্তু এর বাইরেও কিছু নীতিনিষ্ঠার ব্যাপার থাকেÑসেটা তার বউ কেন একবারও লক্ষ করল না? ইচ্ছে করলে ডাকাতি করার সময় মোমের মতো সাদা খুবসুরত মেয়েছেলেদের ঘাড়ের ওপর তুলে নিয়ে গিয়ে ভোগ করতে পারত, কই সেটা করা তো দূরে থাক, রাত্রিকালীন ঢিলেঢালা অসংবৃত পোশাকে-ঢাকা নারীদেহের দিকে নজর পর্যন্ত দেয়নি কখনও। অথচ তারই বউ কিনা ছেলের হাত ধরে উঠল নাঙের বাড়িতে। বলি এটা কোনো ন্যায়বিচার হল? মিশকালো কালু ডাকাতের মুখ পানে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে বানাত স্মৃতিচ্ছন্ন হয়ে পড়ে কখন। পাকসৈন্যদের দ্বিতীয় দলটি হাঁস-মুরগি ধাওয়া করে এদিক ওদিক চলে গেলেও বড়ভাই মকসেদ ভয়ের চোটে নড়াচড়া করে না পর্যন্ত; ঘাটসংলগ্ন একটি পরিত্যক্ত ঢেঁকি ধরে নাক উঁচিয়ে খুনরাঙা পানিতে ঠায় ডুবে থাকে। অতঃপর অভিশপ্ত দুপুরটি পড়ন্ত বিকেলে গড়ালে হয় কী, বর্জিত ঢেঁকি ধরে থাকার শেষশক্তি লোপ পাওয়ায় কেবলমাত্র মানসিক শক্তির জোরে ডাঙায় উঠে আসে মকসেদ। কী আশ্চর্য, লোকশূন্য লোকালয় তখনও জ্বলছেই! দু চারটে লাশও চোখে পড়ছে। রক্তাক্ত মৃত বাপের পানে কতক্ষণ সে তাকিয়ে ছিল কে জানে, হঠাৎ বাড়ির পোষা কুকুরটি হাজির হয়ে করুণ সুরে বিলাপ শুরু করতে অসারতা কেটে গিয়ে মকসেদের মনের ওপর পুনরায় মৃত্যুভয় চেপে বসে; ঝটিতি উঠে দাঁড়িয়ে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পালানো তো দূরে থাক, মাজার কলে গুলি লাগায় সামান্য নড়াই কঠিন। সে রাতে ছিনাল চাঁদ বোধকরি একটু আগেভাগে উঠেছিল হত্যাযজ্ঞকে উদ্যাপন করতে! যুদ্ধের পুরো নয়মাস ঐ খানকি চাঁদের একটাই ডিউটি ছিলÑজ্যোৎস্নার ফোকাস মেরে-মেরে নরহত্যার উৎসবে বাড়তি রং যুক্ত করা। বেশরম জ্যোৎস্নায় ভিজে সরীসৃপের স্বভাবে বুকে হেঁটে সামনের ফসলি মাঠ ডিঙিয়ে মকসেদ যখন আখখেতে প্রবিষ্ট হয়, তখন তার চেতনা ও দৈহিক সামর্থ্য লুপ্তপ্রায়।
ঢং ঢং ঢং। পেটাঘণ্টায় গুনে-গুনে বারোটি বাড়ি পড়তে চারদিকে একটা তটস্থভাব; ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠছে গোটা জেলখানা। ঠিক দুপুর বারোটায় কয়েদি-হাজতিদের তৃতীয়বারের মতো গোনাগুনতি হবে। অর্থাৎ সবাইকে এক্ষুনি ফিরতে হবে ওয়ার্ডে। ‘এই সবাই যান, এখুন ফাইল ধরবে, ফাইল।’ ম্যাট-কারারক্ষীদের তাগাদায় বাইরে থাকার উপায় নাই; বানাত তাড়াতাড়ি স্বীয় ওয়ার্ডে ফিরে এসে যথাবিহিত ফাইল ধরে। প্রতি গ্র“পে চারজন করে বসে ফাইল ধরতে যা দেরি, কারারক্ষী ওয়ার্ডে ঢুকে ম্যাটের সহযোগিতায় গণনা শেষ করে সহজে। বিকেল পাঁচটায় হবে সর্বশেষ গণনা; দিনের মধ্যে চার চারবার হিসাব মেলানোর বহর দেখে সেদিন এক ঠোঁটকাটা হাজতি বলেই ফেলে, ‘বোজলেন সগলে, জেলে আসে বুঝতি পারলাম যে, আমারে দাম আছে। দাম না-থাকলি কি আর দিনের মধ্যি চারবার গোনে? তাই ভাব মারে বুলতি ইচ্ছে করছেÑআমি হাজতি স্যার, ঠাপ আছে।’

ফাইল ধরা শেষ হতে গোসল সারতে ওয়ার্ডলগ্ন বিরাট চৌবাচ্চার দিকে হাঁটে বানাত আলী। একসারির তিনটে পায়খানার পরেই এই চৌবাচ্চাটা। প্রতিটি পায়খানার দরজা হাফ; অর্ধউন্মুুক্ত এসব পায়খানায় বসা মানে চক্ষুলজ্জার মাথা খাওয়া, প্রথম ক’দিন পায়খানায় ঢুকে তো বানাতের প্রকৃতির ডাক উলটা মাথায় উঠে, কোষ্ঠপরিষ্কারই হত না। আবার এছাড়া পথই-বা কি? এখানে একমুহূর্ত চোখের আড়াল হওয়ার নিয়ম নেই; হাগা-মুতা তাই এমত বিধেয়। চৌবাচ্চার ভিড় কিছু কম, সকালবেলার মতো লাইন না-থাকায় সামান্য অপেক্ষায় জায়গা পেয়ে মগে পানি তুলে ঝটপট গোসল সারতে থাকে সে। পাইপ দিয়ে হরদম পানি ঢুকলেও বন্দীর সংখ্যা দুই কি তিনগুণ বেশি হওয়ায় চৌবাচ্চা ভরাট হওয়ার সুয়োগ পায় না, পানি নিচের দিকে পড়ে থাকে প্রায়শ। ফলে একটু বেশি ঝুঁকে পড়ে পানি তুলতে হচ্ছে সবাইকে। চৌবাচ্চার অপর দিককার দেয়াল ঘেঁষে কাউকে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি, সেখানে তিনজন রাজমিস্ত্রি সিমেন্ট-বালির মসলা মাখাচ্ছে, মেরামতির কাজ আরকি। রাজমিস্ত্রিদের পাশে দাঁড়ানো একজন সুবেশ লোককে দেখতে পেয়ে গোসলের জন্য অপেক্ষমাণ একজন কয়েদি চেঁচিয়ে ওঠে, ‘কিডা, আরে ইসমাইলভাই না? তা কবে ঢোকলেন? শোনেন, এখেনে আমি মেলাদিন আছি, কুনো অসুবিধে হলি আমাক কবেন।’
সুবেশ ভদ্রলোক আমোদে হাসলেন, ‘আরে আকিন্দি যে, যাক শেষতক দেখা হল। আমি আসলে ঢুকেছি এইমাত্র, তবে বেশি সময় থাকব না, ঊর্ধ্বপক্ষে ঘণ্টাতিনেক।’
রাজমিস্ত্রিদের কাজ পর্যবেক্ষণকারী দুজন পুলিশের একজন এবার কথোপকথনে যোগ দেয়, ‘শোনো আকিন্দি, ইসমাইলভাইকে তুমি কী মনে কর? সবাই আেমার মতো চোরছ্যাঁচড় নাকি? ইসমাইলভাই পিডাবলুডির ফাস কিলাস ঠিকাদার, জেলখানার রিপেয়ার ওয়ার্ক করতেই ঢুকেছেন ভেতরে।’

বন্দী আকিন্দি অবশ্য এতে অপ্রতিভ হয় না, ‘বুঝতি ভুল করিছি ইসমাইলভাই, যাক গোস্সা হয়েন না। তা বাড়ির কারু সাত দেখা হলি কবেন আমি ভালোই আছি। হ, একহিসেবে এখেনে ভালোই আছি; খাওয়ার চিন্তে নি, পরার চিন্তে নি, তালি খারাপ বুলি ক্যাম্বা? কষ্ট যা তা রাত্তিরি, খালি ছাওয়ালদুডোর কথা মনে পড়ে! উরা কী খায় না-খায়, ইস্কুলি কি যায় নাকি নামই কাটা পড়্যেেছÑখালি এইসব হাবিজাবি মনে পড়ে। বউটাক পুয়াতি রাখে আসিছি, ডাক্তার সুনো করে বুলিছিল ইবার মিয়া আছে প্যাটে। দুই ছাওয়ালের পর মিয়ার কথা শুনে আমার মুণির মার খুশি দ্যাখে কিডা! কী কব ইসমাইলভাই খালি এসব হাবিজাবি মনে পড়ে…’ বলতে-বলতে কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হলে গোসল না-সেরে আকিন্দি পা চালিয়ে মাঠের অন্য প্রান্তে চলে যায়।
বানাতের গোসল সারা হতে না-হতে খাবারের রিকশাভ্যানটি ঢোকে মাঠের মাঝখানে। অন্য বন্দীদের দেখাদেখি বানাতও থালা হাতে চটজলদি লাইনে দাঁড়ায়। সাপ্তাহিক বরাদ্দমাফিক আজ মাংস বা ডিম দিচ্ছে; একটুকরো শুকনো বিস্বাদ মাংসের বদলে ডিম চেয়ে নেয় বানাত। খাবারের থালা হাতে নিয়ে ওয়ার্ডে ফিরে এসে আর বিলম্ব করে না, গরম-গরম খেয়ে নেয় সে। আজ তুলনামূলক উন্নত খাবার বলে কোথাও উচ্চবাচ্য নেই, একযোগে খেয়ে নেয় বন্দীরা। খাওয়া শেষ করে প্লাস্টিকের বোতলে ঢকঢক করে পানি খায় বানাত। জেলখানার সম্বল ঘটি-বাটি-কম্বল বলা হলে হবে কী, এখানে ঘটির কোনো বালাই নেই, পরিবর্তে প্লাস্টিকের বোতলই সই। খাওয়াদাওয়া সেরে নিয়ে একটি কম্বল মেঝেতে পেতে বাকি কম্বলটি বালিশের মতো ভাঁজ করে বানাত ভাতঘুমের তোড়জোড় করলেও অধিকাংশ বন্দী নাইন তাস কিংবা গল্পগুজবে মশগুল থাকে। নামেই তাসখেলা, মূলত সিগারেটের প্যাকেট বাজি ধরে চলে জুয়াখেলা; পিসি দোকানে জমাকৃত টাকার জোরে চলে এই জুয়াখেলাটি।

শয্যা পেতে বানাত একটু কাত হতে বন্দীরা হঠাৎ শোরগোল করে ওঠে। কী ব্যাপার? জেলার সাহেবের আচার বানিয়ে হিজড়ে নজরুলের ওয়ার্ডে পদার্পণকে স্মরণীয় করে রাখতে ওয়ার্ডবাসীরা যেন উল্লাস প্রকাশ করে। ‘তুরা সব দ্যাখ, হিজলে ঢোকেছে, হিজলে’ বলে কেউ-কেউ সিটি মারে। এমনিতে নজরুল অহর্নিশ নাচের মুদ্রায় থাকে, তদুপরি কর্তাব্যক্তি জেলার সাহেবের আচার বানানোর দেমাকে এখন তার পা মাটিতেই পড়ছে না। স্যাম্পল হিসেবে কয়েক টুকরো আচার ট্যাঁকে গুঁজে এনেছিল, নগদ কৃতিত্ব জাহিরের নিমিত্তে সেগুলো এবার বিলিবণ্টন করে নজরুল, ‘খায়ে দ্যাহেন কী মাল বানাইছি একহান, জেলার সায়েবের চৌদ্দগোষ্ঠির কেউ এব্যে আচার চোহে দ্যাহে নাই। হ ভাই, কঠিন আচার, একবার মুহি দিলি খালি খারেরই ইচ্ছে করবি।’ নজরুলের লেকচার যেন থামতে চায় না। আচারের এককোনা বানাতও চেখে দেখে, কিন্তু তেমন কোনো স্বাদ-গন্ধের নাগাল পায় না। হতে পারে আচার ঠিকই আছে, দোষটা তার নিজের, জেলখানার বদ্ধ পরিবেশে একটানা থাকার ফলে তার ইন্দ্রিয়শক্তি হয়তো ভোঁতা হয়ে গেছে। তাই কোনো মতামত ব্যক্ত না-করে আবারো সে শোয়ার আয়োজন করে, কিন্তু ভরাহাটের মতো হৈ-হল্লা বিশেষ করে থেকে-থেকে নজরুলের নাচ-গানের দৌরাত্ম্যে সে তো সে, স্বয়ং কুম্ভকর্ণ ঘুমাতে পারবে কিনা সন্দেহ। হৈচৈ যখন চরমে তখন জমাদার সাহেব সটান এসে হাজির। ঘটনা কী? আচার খেয়ে জেলার সাহেব নজরুলকে এক্ষুনি তাঁর খাসকামরায় তলব করেছেন। এরূপ ডাক পেয়ে নজরুল খুশিতে আটখানা, নর্তনের ভঙ্গিতে কেবল শরীর মোচড়াতে থাকে; পারলে জমাদার সাহেবের মোছুয়া গালে চার দু গুনা আটটা চুমু খায়। কিন্তু জমাদার সাহেবের খটমটে বদনখানির দিকে চোখ পড়তে কেন জানি নজরুল চুপসে যায়: কোনোরকম নাটকীয়তায় না-গিয়ে জমাদার সাহেবের পেছন-পেছন বেরিয়ে যায় সুবোধ বালকের চালে। সেই ফাঁকে দিব্যি একঘুম পাড়ে বানাত; দিবাস্বপ্নে বাজান এসে হাল করে বারবার। কোনোপ্রকার কাফন-জানাজা ছাড়া বাপকে সে মাটিচাপা দিয়েছিল বলেই কি এমনটি হচ্ছে এই অসময়ে? অসম্ভব কী, হতে পারে। যে-মানুষ কোনোদিন নামাজ কাজা করে নাই, দেখ তার কপালেই কিনা জানাজা দূরের কথা, কাফনের সস্তা মার্কিন কাপড়টুকুও জুটল না! বাপ কি তবে ক্রুদ্ধ? ঘুমের ঘোরে আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়ে বানাত। খোয়াবের মধ্যে বাপকে এখন সে বোঝায় কী করে যে, ওই সামান্য মাটিচাপাটুকুই তখন অগণন শহীদের ভাগ্যে জোটেনি! শবভোজী শকুন-শেয়াল ও কুকুর ছাড়া এদেশে আর কেউ ভালো ছিল না তখন। সকলের নিষেধ ও মৃত্যুঝুঁকি উপেক্ষা করে পরের দিন একমাত্র সে ছাড়া আর কে বাড়িতে গিয়েছিল শুনি। কই বাপ বা বড়ভাই মকসেদের খোঁজে অন্য ভাইরা তো একবার উঁকিও দিল না সেখানে। অবশ্য এর জন্য অন্য ভাইদের দোষারোপ করাটাও ঠিক হবে না; কারণ সদর সড়কের পার্শ্বস্থ তাদের মহল্লায় ঢোকা মানেই মরণ ঠোঁটে করে ঢোকা।

শয্যা পেতে বানাত একটু কাত হতে বন্দীরা হঠাৎ শোরগোল করে ওঠে। কী ব্যাপার? জেলার সাহেবের আচার বানিয়ে হিজড়ে নজরুলের ওয়ার্ডে পদার্পণকে স্মরণীয় করে রাখতে ওয়ার্ডবাসীরা যেন উল্লাস প্রকাশ করে। ‘তুরা সব দ্যাখ, হিজলে ঢোকেছে, হিজলে’ বলে কেউ-কেউ সিটি মারে। এমনিতে নজরুল অহর্নিশ নাচের মুদ্রায় থাকে, তদুপরি কর্তাব্যক্তি জেলার সাহেবের আচার বানানোর দেমাকে এখন তার পা মাটিতেই পড়ছে না।

সারাদিন পাকা সড়ক ধরে মিলিটারি গাড়িগুলো টহল মারছে তো মারছেই; অধিকন্তু গোটা মহল্লা পুড়ে খাক হয়ে যাওয়ায় লুকানোর আবডাল পর্যন্ত নেই। শুধুমাত্র কর্তব্যবোধের তাড়নায় সে যে ছুটে গিয়েছিল, তা নয়। একটুখানি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীও কি সে নয়? বউ রুবির কথাই বোধহয় ঠিক, ‘তুমার আক্কেলজ্ঞান আর হবি নে কুনোদিন। কী আছে আমার বরাতে কিডা জানে?’ রুবির আক্ষেপধ্বনির অবশ্য ভিত্তি আছে। না-সে চালাক, না-সে সতর্ক। আড়ালে-আবডালে তাকে জড়বুদ্ধিও কি বলে না-কেউ কেউ? কী আর করা, যার যা খুশি বলে বলুক। আজ মধ্যবয়সে এসে নিজেকে বদলানো কি এত সহজ? আপনাকে বদলানো যখন অসম্ভব, তখন বউ বা দু’কন্যার তরে আহাজারি করে কোনো লাভ আছে? বড়মেয়েটা ভরাপোয়াতি, এই সময়ে মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়িতে এসে থাকে। রুবির একার পক্ষে কি এখন এই গুরুদায়িত্বপালন করা সম্ভব? এদিকে ছোটমেয়ের অবস্থা আরও খারাপ; এ বছর ছোটমেয়ের বিয়েটা ভালোয়-ভালোয় দিলে হবে কী, পণের টাকা ও মাঠান জমি বেচার টাকায় ছোটজামাই দুমাস আগে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে পড়েছে মস্ত বিপদে; চাকরি পাওয়া তো দূরের বিযয়, উলটো জালিয়াত চক্রের শিকার হয়ে জেল খাটছে মালয়েশিয়ার এক বন্দীশালায়; এ অবস্থায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হলেও চাই মেলা টাকা। এত সব ঝক্কি এখন রুবি একাকী সামলায় কী করে? রুবির আরেকটি মন্তব্যও বুঝি বাস্তবানুগ, ‘শোনো, তুমি আর তুমার বড় মকসেদভাই হচ্ছ এক কিসিমির; হ, তুমরা দুইজনই সুমান বেআক্কল। তুমার হাতে পড়ে আমার জীবনডা জ্বলে গেল।’ রুবির লিস্টে আরও একটি নাম যোগ করা যায়: তার বাপ। নইলে সকলকে সরিয়ে দিয়ে তারাই-বা সেদিন বাড়িতে থাকতে যাবে কেন? এটা কি একপ্রকার স্বেচ্ছামরণ নয়? না, না, কথাটা ভুল হচ্ছে। চারদিকে একটা জনশ্র“তি রটে গিয়েছিল যে, বাড়িঘরে মানুষজন না-থাকলে খানসেনারা কুপিত হচ্ছে, জ্বালিয়ে দিচ্ছে গৃহ। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, জনশ্র“তি অনুযায়ী বাপের বাড়িতে থেকে যাওয়া কি ঘরের দেয়ালে বড়-বড় ইংরেজি হরফে লেখা ‘মুসলিম’ পরিচয়চিহ্ন কিংবা শেষমুহূর্তে খানদের দেখে বাপের আত্মরক্ষামূলক স্লোগান ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ/ কায়দে আজম জিন্দাবাদ’-এর কোনো পদ্ধতিই ফলপ্রসূ হয়নি না শেষমেশ। তবে বাপ কিন্তু মরে গিয়ে প্রকারান্তরে বেঁচে গেল! কেননা তখনকার অবস্থা এত খারাপ ছিল যে, জীবিতরা কেবল মৃতদেরকেই হিংসা করেছে বললে অত্যুক্তি হয় না। এর অকাট্য প্রমাণ বড়ভাই মকসেদ আলী স্বয়ং; ফোকাস-মারা বেহায়া জ্যোৎস্নারাতে সরীসৃপের ভঙ্গিমায় হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করতে-করতে একসময় আখখেতে পৌঁছালে হবে কী, চলৎশক্তি হারিয়ে সাংঘাতিক আহত অবস্থায় পাক্কা তিনদিন বড়ভাই পড়ে থাকল সেখানে; পাশে পড়ে-থাকা নারকেলের খোলে বৃষ্টির পানিটুকুই ছিল ক্ষুৎপিপাসা নিবারণের একমাত্র সম্বল আর সহায় ছিল বাড়ির সেই পোষা কুকুরটি; নচেৎ তাগড়া শেয়ালের দল কি তাকে আস্ত রাখত, খেয়ে ফেলত জ্যান্তই। তিনদিন বাদে একজন রাখালের সহায়তায় যদিও-বা সে পাশের গ্রামে আশ্রয় পেল, কিন্তু পরিস্থিতির নাটকীয় মোড় নিতে বিলম্ব হয় না।

ঠিক এই জায়গায় এসে খোয়াবের আবেশ ভেঙে যায় বন্দীদের সম্মিলিত হট্টগোলে। ব্যাপার কিছু না, জেলার সাহেবের মুলাকাত সেরে হিজড়ে নজরুল ওয়ার্ডে প্রবেশ করতে বন্দীরা হৃদয়োল্লাসে মেতে ওঠে। কিন্তু চিরপ্রফুল্ল নজরুলের মুখে কোনো হাসি নেই, মুখখানি বেজায় থমথমে। পছন্দ তো পরের কথা, আচার খেয়ে জেলার সাহেব রেগে কাঁই; জিবের সুখ মিটিয়ে ‘এই শালা হিজলের বাচ্চা হিজলে, একে কি আচার বলে? তেল-আমের ভর্তাও তো এর চেয়ে ভালো। শালা খালি গপ্পো মারো, আবার জমাদারেরও বুদ্ধির বলিহারি। এদিকে নিজেকেই-বা কী বলি, নইলে তার কথায় আমি কান দিতে যাব কেন? না, ভুল আমারই হয়েছে। আমার এতগুলো টাকাই জলে গেল। শোন, মাগিপাড়ায় বসে হেরোইন বেচা আর আচার বানানো এক জিনিস নয়। আমার মতো জেলারের সঙ্গে চিটারি, দূর হ শালা হিজলে চুদা’ গালাগালি করার ফাঁকে জেলার সাহেব যে তার মেয়েলি নরম পাছার ওপর রাম লাথি ঝাড়েনি এই যেন বিরাট ভাগ্যি। তবে জেলার সাহেবের বাক্যবাণ এতটুকুই, নাকি আরও অশ্রাব্য ঝাঁজালো কটুক্তি ছিলÑএই প্রশ্নের জবাবে নজরুল নীরব থাকে; তার চোখ দুটো ছলছল করে সহসা; বাইরে তাদের যেমন অনাদর, জেলখানার ভেতরেও তেমনি; সর্বদাই ঠাট্টা-উপহাসের পাত্র। বিমর্ষ হৃদয়ে বসে থাকতে-থাকতে নজরুলের বাড়ির কথা মনে পড়ে। তার ছোটবোনটার বিয়ের তারিখ ধার্য ছিল গত পরশু। পূর্বওয়াদামাফিক ভ্যানচালক বাপকে কিছু টাকা দেওয়ার কথা ছিল; বাপ-মাও আশায় বুক বেঁধে ছিল। কিন্তু বিয়ের আগে এই কা-, কে জানে পণ পরিশোধের ব্যর্থতায় ছোটবোনের বিয়ে ভেঙে গেছে কিনা, কিংবা এমনও হতে পারে বিয়েটা বাঁচাতে বাপকে হয়তো শেষসম্বল রিকশাভ্যানটাকেই বেচে দিতে হয়েছে। মনের অস্থিরতা অবশ্য বেশিক্ষণ দাবিয়ে রাখতে পারে না নজরুলকে; প্রকৃতপক্ষে সে চুপচাপ বসে থাকার পাত্রই নয়। ‘ইন্দুর পালাইছে গরমে…’ নামীয় গরম মসল্লামার্কা গানের সঙ্গে ঝুমুর-ঝুমুর নৃত্য জুড়ে দিয়ে ফের আসর গুলজার করে নজরুল। গা গরম-করা গানের উত্তেজনায় নাকি নজরুলের বাঁকসমৃদ্ধ আকর্ষণীয় নিতম্বের জাদুতে বলা কঠিন, ওয়ার্ডের অপর প্রান্ত থেকে ডাক ছাড়ে এক ফুর্তিবাজ কয়েদি, ‘বন্ধু ইধার আউ। গাটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে, তোমার কোমল হাতে একটু টিপে দাও বন্ধু।’ নজরুলের তো এসবই পছন্দ, উপরন্তু স্বাস্থ্যবান কয়েদিটি বয়সে তরুণ। শুধু স্বাস্থ্যবান কয়েদিটি কেন, অনেক বন্দীই তলে-তলে মুখিয়ে আছে নজরুলের জন্য; নারীবর্জিত জীবনে নজরুলই যে ঢের। তবে এ-ব্যাপারে কারাকর্তৃপক্ষ শতভাগ হুঁশিয়ার, তাই রাত্রে নজরুলকে এখানে রাখা হয় না, পাশের একটি প্রায় ফাঁকা কিশোর ওয়ার্ডে চালান করে দেওয়া হয় যথারীতি।

হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যেই বানাতের স্মৃতিকাতর চোখের পাতায় আরেকদফা ঘুম নামে। আর অমনি ঘুমের মধ্যে সুড়–ত করে ঢুকে পড়ে বড়ভাই মকসেদ আলী। সেই কিশোর রাখালের কর্মতৎপরতায় মকসেদ পার্শ্ববর্তী গ্রামের একটি বাড়ির কাছারিতে আশ্রয়লাভ করামাত্র কথাটা চাউর হতে সময় লাগে না। গ্রামের রাজাকার মাতব্বর লোকমুখে খবর পেয়ে নতুন প্যাঁচ কষে; মকসেদকে শুধু আশ্রয়চ্যুত করা নয়, আরও কঠিন ফন্দি আঁটে, ‘তুমরা সব করিছ কি? আহত লোককে সাহায্য করার মানে বোঝ? পেয়ারা পাকিস্তানের আর্মির হাতে কিডা গুলি খায় জানো না? তারা একবার সম্বাত পালি কাউক থুবি নে। শালা মুক্তি হ্যায়- বুলামাত্র আমারে গিরাম জ্বালা দিবি, আর্মি ভাইরা সব চুয়া করে ছাড়বি।’ ব্যস, দৃশ্যপট এমন আমূল পালটে যায় যে, সহৃদয় গৃহস্বামীর কাছারিটি রাতারাতি পরিণত হয় জতুগৃহে। এশার নামাজের পর পরই কারা যেন কাছারির চারপাশে ঘুরঘুর করতে থাকে খসখস শব্দ তুলে। অশুভ পদশব্দগুলো একবার কাছে আসে তো আবার মিলিয়ে যায় দূরে।

হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যেই বানাতের স্মৃতিকাতর চোখের পাতায় আরেকদফা ঘুম নামে। আর অমনি ঘুমের মধ্যে সুড়–ত করে ঢুকে পড়ে বড়ভাই মকসেদ আলী। সেই কিশোর রাখালের কর্মতৎপরতায় মকসেদ পার্শ্ববর্তী গ্রামের একটি বাড়ির কাছারিতে আশ্রয়লাভ করামাত্র কথাটা চাউর হতে সময় লাগে না। গ্রামের রাজাকার মাতব্বর লোকমুখে খবর পেয়ে নতুন প্যাঁচ কষে; মকসেদকে শুধু আশ্রয়চ্যুত করা নয়, আরও কঠিন ফন্দি আঁটে, ‘তুমরা সব করিছ কি? আহত লোককে সাহায্য করার মানে বোঝ? পেয়ারা পাকিস্তানের আর্মির হাতে কিডা গুলি খায় জানো না? তারা একবার সম্বাত পালি কাউক থুবি নে।

পায়ের আওয়াজ যে খুব জোরালো তা নয়, কিন্তু সেটাই গুলিবিদ্ধ মকসেদের কানে হাতুড়ির বাড়ি হয়ে বাজে; ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে বুঝতে বাকি থাকে না যে, মৃত্যুদূত দুয়ারে প্রস্তুত, ঘুমিয়ে যাওয়ামাত্র স্রেফ খুন করে ফেলা হবে তাকে। প্রায় রক্তশূন্য জ্বরতপ্ত শরীরে বারংবার ঘুম ঝেঁপে নামলেও বাড়ির সেই প্রভুভক্ত কুকুরটি আবারো প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, সারারাত অবিশ্রান্ত ঘেউ ঘেউ ডেকে তাকে সজাগ রাখে। ফলে খুনিদের পরিকল্পনা ভ-ুল হয়ে যায় ওই রাতের মতো, তারা পরবর্তী রাতটির অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু আরেকটি মৃত্যুগন্ধী রাত নামার আগে ওই দিন সকালেই বানাত আলী ঠিক খুঁজে-খুঁজে হাজির হয় ভাইয়ের ঠিকানায়। গুরুতর আহত বিপজ্জনক বড়ভাইকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে ফের সে একাকী চেষ্টা করে; কই অন্য ছয়ভাই তো ভুলেও সাহায্যার্থে এগিয়ে এলো না। বোকাসোকাই সে বটে; চটের ছালা কেটে বাঁশের সাথে বেঁধে খাটিয়া মতো বানিয়ে বড়ভাইকে দূর গ্রামে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি অবলীলায় যে নিতে পারে, সে নিরেট বোকা ছাড়া আবার কী! কেবল একাত্তরের নয় মাস কেন, যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের কালপর্বটিও একই কারণে প্রাসঙ্গিক। বাপের বেটা মজিবর চেয়েচিন্তে ত্রাণসামগ্রী তো আর কম আনেনি; কিন্তু কই, তাদের ভাগের টুকু কই, জোটেনি যে তেমন কিছু। যারা রিলিফ দেবে তাদের এক বচন, ‘তোমারে তো জমিজুমা আছে, তোমারে আবার রিলিফ কীসির?’ এদিকে জিনিসপত্রের ত্রমাগত ঊর্ধ্বগামী দামের সঙ্গে কোনোভাবে তাল মেলানো যাচ্ছে না; চিঁড়েচ্যাপটা হওয়ার উপক্রম আরকি। এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বাররা অবশ্য তাদের বাড়িতে এসেছিল একবার। যে-সব পরিবারের সদস্যরা যুদ্ধে শহীদ, তাদের তালিকা করতেই চেয়ারম্যান-মেম্বারদের আসা; মূল উদ্দেশ্য অর্থসাহায্য করা। কিন্তু সেই নগদ অর্থ হস্তগত করার জন্য যে দৌড়ঝাঁপের প্রয়োজন, সেটাও করা হইনি বড়ভাই মকসেদের একটিমাত্র উক্তিতে, ‘থাক অম্বা সাহায্য আমারে লাগবিনে। মরা বাপেক বেচে ওই ট্যাকা আমরা হাতে নিতি পারব না।’ তবে তার জীবনের চূড়ান্ত বোকামির ঘটনাটি ঘটে স্বাধীনতার ঠিক বছর দেড়েকের মাথায়।

‘কি মিয়া কেবল বেভোরে ঘোম পাড়লি হবি, ওঠ ওঠ। ইট্টু পর ধূপধুনো দিবি। ওঠ দিনি।’ ম্যাটের ডাকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসতে বানাত দেখে ওয়ার্ড প্রায় ফাঁকা। সিংহভাগ বন্দী বাইরে, যদিও হিজড়ে নজরুলকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ওয়ার্ডের ঘড়িতে তখন বিকেল সাড়ে চারটে; বিকেল সাড়ে চারটা থেকে পাঁচটা অব্দি এই আধঘণ্টা সময়সীমাটি দিনমানের সর্বশেষ কর্মমুখর সময়। দুজন কয়েদি ধূমায়িত ধূপচি হাতে ওয়ার্ডে প্রবেশ করতে বানাত বাইরের মাঠে বেরিয়ে আসে। ধূপ দেওয়া শেষ হলে নিñিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্য দুজন কয়েদি মোটা লোহার রড ঘষে দুপাশের জানালার শিকগুলো পরীক্ষা করছে আখেরিবারের মতো। ইত্যবসরে খাবারের রিকশাভ্যান খোলা মাঠে প্রবেশ করলে রাতের খাবার সংগ্রহ করে যার যার ওয়ার্ডে চলে যায় বন্দীরা। ওয়ার্ডের দরজায় ভারী তালা পড়ার আগে চতুর্থবার গণনার কাজ নিষ্পন্ন করা হয় যথানিয়মে। এখন থেকে আর বাইরে বেরুনোর সুযোগ নেই; জেলখানার রাত নামে তাই বেশ আগেভাগে অর্থাৎ বিকেলসহ জেলখানার রাত বড় বেশি দীর্ঘ।
বিকেলের পড়ন্ত আলোয় বেশির ভাগ বন্দী খেয়ে নিলেও ঘোরগ্রস্ত বানাতের খেতে ইচ্ছে করছে না একদম। পুরনো কথা এত হাল করলে বুঝি খাওয়া যায়? তার আড়ষ্টতা লক্ষ করে পাশের বিপ্লবী নেতা শহীদুল হক বলে, ‘ওহে বানাত, খাচ্ছ না যে। বাড়ির কথা ভেবে কি মনখারাপ?’

ভিন্ন উত্তর দিলে মিথ্যে বলা হয় ভেবে বানাত চুপচাপ থাকে। একবার ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নেয় কেবল। শহীদুল হক লোকটা বেশ, সর্বদা দুটো মিষ্টি কথা বলে সাহস যোগায়। শ্মশ্র“ম-িত শহীদুল হকের গ্রেফতারপর্বটি চমকপ্রদই বটে। প্রথমবার গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ যখন জাল ছোট করে আনছে, তখন পলায়মান শহীদুল হককে মুখোমুখি পেয়েও পুলিশ চিনতে পারে না, উলটা তাকেই জিজ্ঞেস করেছিল শহীদুল হককে সে চেনে কিনা। জবরদস্ত মুসল্লির মতো তার চাপদাড়ি ও তুলনামূলক বেশি বয়স দেখে পুলিশরা হয়তো বিভ্রান্ত হয়। তবে পরের কিস্তিতে পুলিশদের ভুল হয় না, এক বিকেলবেলা অজপাড়াগাঁয়ের একটা মিষ্টির দোকান থেকে তাকে পাকড়াও করে ফেলে। বানাতকে নিরুত্তর দেখে শহীদুল হক একগাল হাসে, ‘না, তুমি দেখছি একেবারে ছেলেমানুষ। তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। আমাদের জেলখানা কি আর আশ্রম যে, ভাত বাসি হলেও খেতে পারবে; নাও, চটপট খেয়ে নাও।’
‘হ, খাই। বসে ইট্টু দম নিতিছি।’ বলে বানাত খাওয়ার ব্যাপারে পূর্ববৎ গড়িমসি করে। আচ্ছন্নতা কাটিয়ে খেতে বসতে না-বসতে সন্ধ্যার লোডশেডিং শুরু হয়। লোহার শিকের মজবুত দরজার বাইরে ওয়ার্ডের বারান্দায়-রাখা হারিকেনের আলো তার পর্যন্ত আসার আগে ফিকে হয়ে গেছে। আলো-আঁধারিতে খাওয়ার উদ্যোগ নিলে শহীদুল হক তার লাইটার এগিয়ে দেয়, ‘আহা, অন্ধকারে খাবে কী করে? লাইটারের ছোট্ট আলো জ্বালিয়ে দিচ্ছি। দেখেশুনে খেয়ে নাও।’

লাইটারের একচিলতে আলোয় কোনোমতে খেয়ে বানাত খানিক জিরিয়ে নিয়ে অবশিষ্ট সিগারেটটি ধরায়। গতকাল তাকে তিনটে সিগারেট দিয়েছিল হিজড়ে নজরুল; যা-ই কও না-কেন, মেয়েলি স্বভাবের কারণেই নজরুলের মনটা মায়াদয়ায় ভরা; হয়তো এ জন্যে নজরুলের পক্ষে কিশোর ওয়ার্ডে রাত্রিবেলা একাকী সময় কাটানো কষ্টকর; কঠিন হলেও বেশিদিন হয়তো নজরুলকে আটক থাকতে হবে না। বেশ্যাপাড়ার হর্তাকর্তা অথবা থানের বাদবাকি হিজড়েরা বিশেষ করে গুরুমা নিশ্চয় হাত গুটিয়ে বসে নেই। কোর্ট থেকে নজরুলের জামিনের কাগজ আসা তাই সময়ের ব্যাপারমাত্র। কিন্তু তার বেলায়? তার মুক্তির যাবতীয় পথ কি ইতোমধ্যে রুদ্ধ হয়ে যায়নি! বিচলিত ভঙ্গিতে সিগারেট ফুঁকতে থাকে লম্বা-লম্বা টানে।
পাক্কা দু’ঘণ্টা বাদে কারেন্ট এলে ধুম আড্ডার পাশাপাশি জুয়ার তাস বাটতে থাকে বন্দীরা। অন্যান্য ওয়ার্ডে টিভি থাকলেও তাদের ওয়ার্ড কানা; বিনোদনের বালাই নেই। তবে আশার বাণী এই যে, ৪ নং ওয়ার্ডের একজন অর্থশালী হাজতি অচিরে মুক্তি পেতে যাচ্ছে; জামিন লাভ করামাত্র সে একটা টিভি দান করার ব্যাপারে প্রতিশ্র“তিবদ্ধ। বারবার মশা হুঁল ফোটাচ্ছে দেখে গায়ের ওপর কম্বল টেনে নেয় বানাত। ধূপধুনোয় কোনো কাজ হয়নি। মশারি খাটানোর নিয়ম না-থাকায় মশাগুলো ক্রমশ পরাক্রমশালী হয়ে উঠছে। মশার কামড়ে অতিষ্ঠ সেই কালু ডাকাতকে এবার খিস্তি করতে দেখা যায়, ‘শালার চুদির ভাই মশা। তোর মারে বাপ…’

‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলেও তার বাপ যেমন বাঁচতে পারেনি, তার অবস্থাও কি তবে তদ্রুপ? নাকি তার দশা গুলিবিদ্ধ বড়ভাই মকসেদের সমতুল্য? তখন পরিত্রাণের আশায় কি সে যুদ্ধদিনের সেই প্রভুভক্ত কুকুরের কোনো বংশধরকে ইতিউতি খোঁজে? নাকি স্রেফ বোধশূন্য হয়ে যন্ত্রচালিতের মতো সে তাদের হুকুম পালন করে মাত্র? মানসিক প্রতিক্রিয়া যা-ই হোক, আশঙ্কা সত্য হতে সময় লাগে না; একপর্যায়ে জানতে পারে তাকে একটি ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার আসামি হিসেবে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

এতক্ষণ গপসপ কিংবা তাস পেটা যা-ই চলুক, রাত দশটা বাজতে সবাইকে বাধ্যতামূলক শুয়ে পড়তে হয়। দুই একজন ঘাড় উঁচু করতে ম্যাটের সতর্কবার্তা ভেসে আসে, ‘শুয়ে পড়েন সগলে। মাথা তোলবেন না।’ সবাই নিঃসাড় হয়ে শুয়ে পড়লেও ওয়ার্ডের জোরালো বাল্বগুলো কিন্তু ঘুমাবে না, সারারাত একভাবে জ্বলবে। চোখের ওপর ডান হাত তুলে দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করে বানাত। কিন্তু স্মৃতি রোমন্থনের দাপটে ঘুম আসে না, স্মৃতিচিহ্নিত দিনগুলো শোল মাছের ঝাঁকের মতো এসে ভিড় করে। স্বাধীনতার বছরদেড়েকের মাথায় বালসুলভ কৌতূহলের যে ভয়ঙ্কর খেসারত সে দেয়, সেটাই ঘুরেফিরে মনে পড়ে। তাদের বাড়ির নিকটবর্তী সদর সড়কটির অপর পার্শ্বের মাঠে পড়ে-থাকা একটা আপাত অকেজো মর্টারের লম্বাটে গোলাকে ফুটবল বানিয়ে পাড়ার রাখালসকল প্রতিদিন খেলতে শুরু করলে হয় কী, বস্তুটির প্রতি ভীতি তো থাকেই না, উপরন্তু ভিতরে কী আছেÑসেটা দেখার এক অদম্য আগ্রহ পেয়ে বসে উঠতি যুবক বানাতের। যা ভাবা সে-ই কাজ, আছড়ে গোলাটি ভেঙে ফেললে এক চৌকো ওজনদার ধাতব বক্স বেরিয়ে আসে। বক্সটির চারকোণে স্ক্রু সাঁটা, কাস্তের ডগা দিয়ে একপাক ঘোরাতে একটি স্ক্রু আলগা হয়ে উঠে আসে। অতঃপর ওই আলগা স্ক্রুটিকে যতবার ঠেসে বসাতে চায়, ততবারই স্ক্রুটি ¯িপ্রংয়ের মতো উঠে এলে দারুণ রোখ চেপে যায় বানাতের। জেদের বশবর্তী হয়ে ভাঙা ইটের ওপর বক্সটা বসিয়ে আরেকটি ইট দিয়ে সজোরে আঘাত করতে বিস্ফোরণের বিকট শব্দে আশপাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। বানাত প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারে না, একটু ধাতস্থ হতে দেখে বিস্ফোরণের তা-বে পাশের একটি ইটের দেয়াল সম্পূর্ণ ধসে গেছে গোড়া থেকে। কিন্তু তখনো সে জানে না প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। ত্রস্ত পায়ে ঘুরে দৌড় মারতে গিয়ে বানাত যারপরনাই স্তম্ভিত; তিনটে আঙুলসহ বাম হাতের তালুর একটা অংশই উড়ে গেছে বোমার আঘাতে। ফিনকি দিয়ে-ছোটা রক্তধারার কথাটুকু শুধু মনে আছে, কেননা স্পটেই জ্ঞান হারায় সে; গুনে গুনে দেড় মাস হাসপাতাল বাস করা সত্ত্বেও সারা শরীরের স্পি­ন্টারগুলো বের করা সম্ভব হয় না। পরে অবশ্য বহু স্পি­ন্টার আপনাআপনি পেকে-পেকে বের হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু কে জানত সেই ক্ষতচিহ্ন একদিন অশনিসংকেত হয়ে উঠবে, যার জের ধরে আজকের এই মোক্ষম বিপদ উপস্থিত হবে পায়ে-পায়ে।

‘৪ নম্বর ওয়ার্ড ঠিক আছে তো?’ টহলরত কারারক্ষীর প্রশ্নের জবাবে ভেতর থেকে ম্যাট প্রতিউত্তর হেঁকে আশ্বস্ত করে, ‘ঠিক আছে ৪ নম্বর।’ লোহার পুরু শিকের দরজা থেকে কারারক্ষী সরে গেলে বানাতের স্মৃতিকাতর মন ফের সচল হয়। বাইরে এখন কত রাত কে জানে? নিশুতি রাতের চাপ-চাপ অন্ধকার বুকের ওপর চেপে বসে যেন। এতকাল সাপলুডুর ছোট বড় সাপ গিলে খেলেও অজগরটির খপ্পরে পড়েছে সে একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে, এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যাবেলায়; টানা বর্ষণের পর বৃষ্টি ধরে এসেছে কি আসেনি, কাছেকোলের বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিল সে উড়াল পায়ে, এমন সময় কয়েকজন সুঠামদেহী রাগী লোক ভোজবাজির মতন উদয় হয়ে তার গতিরোধ করে, ‘তা সোনা যাদু, হনহনিয়ে যাচ্ছ কোথায়? তোমাকেই তো আমরা খুঁজছি। চট করে জিপে ওঠ। না, কোনো প্রশ্ন নয়, আমাদের সঙ্গে একটিবার তোমায় যেতে হবে।’
কী তার অপরাধ আর কেনই-বা তাকে যেত হবে- এসব কিছুই জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠে না; বস্তুত সে বাকরুদ্ধপ্রায়। ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলেও তার বাপ যেমন বাঁচতে পারেনি, তার অবস্থাও কি তবে তদ্রুপ? নাকি তার দশা গুলিবিদ্ধ বড়ভাই মকসেদের সমতুল্য? তখন পরিত্রাণের আশায় কি সে যুদ্ধদিনের সেই প্রভুভক্ত কুকুরের কোনো বংশধরকে ইতিউতি খোঁজে? নাকি স্রেফ বোধশূন্য হয়ে যন্ত্রচালিতের মতো সে তাদের হুকুম পালন করে মাত্র? মানসিক প্রতিক্রিয়া যা-ই হোক, আশঙ্কা সত্য হতে সময় লাগে না; একপর্যায়ে জানতে পারে তাকে একটি ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার আসামি হিসেবে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। ‘আপনেরা কী কচ্ছেন, না-কচ্ছেন আমি বুঝতি পারছি নে। গেরেনেড কী জিনিস আমি বুলতি পারি নে স্যার। কিরে কাটে কচ্ছি স্যার, অম্বা জিনিস আমি চোখিই দেখিনি। আপনারে দুহাই লাগে, আমার ছাড়ে দেন’ বলে কম অনুনয়-বিনয় করেনি বানাত। কিন্তু মর্টারের গোলার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত বাম হাতখানিই ঘরের শত্র“ বিভীষণ হয়ে দাঁড়ায়, তাকে বলা হয়, ‘শোন, এসব ফালতু প্যাঁচাল পেড়ে লাভ নেই। তুই কত বড় সাধুপুরুষ তার বড় প্রমাণ তোর জখমি এই বাম হাতখানা। এর অধিক প্রমাণের দরকার আপাতত নেই। তবে আমরা থাকতে তোর ভয় নেই, যা বলছি শোন। রাজসাক্ষী হয়ে যা! তাহলে সন্দেহের তীর লক্ষ্যভেদ করতে পারবে না, উলুখাগড়ার দিকে ঘুরিয়ে দেয়া গেল। তার পর তোকে আমরা বাঁচিয়ে দেব; চাইকি তোর পরিবার নিয়মিত মাসোয়ারাও পাবে। কেন তোকে বাঁচাব না বল? আমরা কি অকৃতজ্ঞ? তুই কি আমাদের কম উপকার করছিস?’ প্রথমে সে তীব্রভাবে অস্বীকার কাটলেও একসময় সে হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়; বলতে দ্বিধা নেই, উপরঅলার নির্দেশমাফিক এগুচ্ছে সবকিছু। এতদিনে যা জানার সমস্তই জেনে গেছে রুবি; সবকিছু জানার পর গোটা বিষয়টিকে না-জানি সে কীভাবে নিচ্ছে? মর্টারের গোলায় আহত হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে পাগলিনির বেশে রুবি যে-ভাবে সদর সড়ক পেরিয়ে অকুস্থলে ছুটে এসেছিল, নির্ঘাত ততোধিক ভেঙে পড়েছে এবার। ক্রন্দসী রুবি ও কলিজার টুকরো দুই মেয়ের মায়াময় মুখ মরীচিকার মতো টলোমলো করতে-করতে একসময় মিলিয়ে গেলে বানাতের দুচোখ ঝেঁপে ঘুম নামে।

পরদিন ভোরবেলা ঘুম ভেঙে উঠে দু-দুবার নিয়মমাফিক ফাইল ধরলে হবে কী, আজ কিন্তু নাস্তা করার ছুটি মেলে না; খোদ জেলার সাহেব পরিদর্শনে আসবেন বলে গোটা ওয়ার্ড তটস্থ। পরিপাটি ভাঁজ-করা কম্বলের ওপর কার্ড বিছিয়ে ও একপাশে খাবারের খালি থালাটি রেখে বন্দীরা সারিবদ্ধ বসে আছে আদবের সঙ্গে। পরিদর্শনকালে কেউ যাতে বেফাঁস কিছু বলে না-ফেলে সেই কর্তব্যবোধের কথা ম্যাট আজও স্মরণ করিয়ে দিতে ভুল করে না, ‘কুনো অসুবিধার কথা জেলার সায়েবকে বুলার দরকার নাই, বোঝেছেন তো।’
একনিষ্ঠ ভক্তি সহকারে বন্দীরা বসে আছে তো আছেই, তবু কেউ উসখুস করে না। জেলার সাহেবের আসতে-আসতে সেই সাড়ে দশটা কি এগারোটা; ‘বন্দীরা সাবধান’ বলে এক কারারক্ষী চিৎকার করে উঠতে মাননীয় জেলার সাহেবকে ওয়ার্ড আলো করে ঢুকতে দেখা গেল। সমবেত কণ্ঠে বন্দীরা সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানায়, ‘আস্সালামু আলাইকুম।’ ওয়ার্ডের এ-মাথা থেকে ও-মাথা হেঁটে যাওয়ার কালে জেলার সাহেব নিয়মমতো বন্দীদের কুশল জানতে চান, একটি-দুটি উপদেশমূলক কথাও বলেন সন্তুষ্টচিত্তে; অতঃপর তিনি বিদায় নিতে নাস্তা করার ফুরসত মেলে বন্দীদের। নাস্তা খেয়ে রোজকার মতো বানাত রান্নাঘরসংলগ্ন মাঠে অনির্দিষ্ট পায়চারি করে। রান্নাঘরে কর্মরত কয়েদিদের নানান কথাবার্তা কানে আসে। পাকঘরের দিকে একচক্কর ঘুরে আসার কথা যখন ভাবছে, তখন ৪ নং ওয়ার্ডের ম্যাট এসে সামনে দাঁড়ায়, ‘তুমি বানাত আলী না? সাক্ষাৎ-ঘরের দিক একপাক যাও। তুমার সাথ দেখা করতি লোক আসেছে।’

খবরটি শুনে বানাত অভিব্যক্তিহীন মুখে তাকালে ম্যাট একটু অবাক হয়, ‘কি গো, কথাখান বুঝতি পারনি? তুমার বাড়ির লোক আসেছে দেখা করতি। টপ করে যাও।’
সাক্ষাৎ-ঘরের দিকে হেঁটে যেতে-যেতে খুশির বদলে একধরনের জড়তা পেয়ে বসে; রুবির উদ্বেগাকুল সম্ভাব্য প্রশ্নের জবাবে এখন সে কী বলে? ইতোমধ্যে অবশ্যম্ভাবী যা ঘটার ঘটে গেছে। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর পাশের কামরায় বসে যে একপ্যাকেট সুস্বাদু বিরিয়ানি সে খেয়েছিল, আজ হঠাৎ সেই চোঁয়া ঢেকুর গলার কাছে এসে বেজায় অস্বস্তিতে ফেলে। অনুমান হয়, রুবির সঙ্গে খানসেনাদের গুলিতে ল্যাংড়া হয়ে-যাওয়া বড়ভাই মকসেদ আলীও এসেছে ছোটভাইকে একনজর দেখার আশে। প্রাণাধিক মেয়ে দুটোও এসেছে নিশ্চয়, বাপকে দেখামাত্র তারা যে বিলাপ করে কেঁদে উঠবে এতে আর আশ্চর্য কী! এমতাবস্থায় বাড়ির সবাই যত আহাজারিই করুক না-কেন, তাদের প্রবোধ দেওয়া আবশ্যক। কিন্তু তার গলা দিয়ে একবর্ণ সান্ত্বনাসূচক বোল বেরুবে কিনা সন্দেহ। এখন ভরসা কেবল তার হাত দুটো। সমস্যা কিন্তু এখানেও। স্বাধীনতার মাত্র বছরদেড়েকের মাথায় মর্টারের পরিত্যক্ত গোলায় বাম হাতখানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তার ড্যাবরা-স্বভাব আজতক বহাল আছে। ভাবতে গিয়ে হাঁটার গতি শ্লথ হয়ে আসে, একপলক বাম হাতের পানে তাকায়; বিকলাঙ্গ কুৎসিত বাম হাত তুলে বাড়ির সকলকে এখন সে বুঝ দেয় কী করে? বিশেষ করে পুরো ঘটনাপ্রবাহের একমাত্র অকাট্য আলামত হিসেবে খুঁতো বাম হাতখানি যেখানে ইতোমধ্যেই নথিভুক্ত; ফলে হয় কী, সাক্ষাৎ-ঘরের দিকে হেঁটে যাওয়ার কালে একরাশ ছেলেমানুষি আনন্দ কিংবা প্রাপ্তবয়স্কদের ক্রোধে কেবলই হয়রান হয় বানাত আলী!

আরো পড়তে পারেন

মহামায়া (পর্ব-২)

পড়ুন—  মহামায়া (পর্ব-১) ৩. কাঁচা রাস্তায় উঠতে উঠতে কাপড় ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে। পায়ের সাথে কাপড় জড়িয়ে যাচ্ছে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। সবার আগে মনিশঙ্কর হাঁটছে। তার হাতে মাথায় খাবারের টিন। একটা কাপড়ের ট্রাঙ্ক। সকলের হাতেই কাপড়ের পুটুলি। এতটুকু আসতেই হাপিয়ে উঠেছে। আরো অনেকটা দূর যেতে হবে হেঁটে। তারপর নৌকায় সীমানার কাছাকাছি কোনো একটা জায়গায়।….

মহামায়া (পর্ব-১)

১. সূর্য উঠতে এখনো অনেকটা দেরি। আকাশে কোনো তারা নেই। পুরোটা আকাশ মেঘে ঢাকা। রাতের অন্ধকারটা আজকে আরও বেশি চোখে লাগছে। বাতাস হচ্ছে। মাঝে মাঝে মেঘের আলোতে দেবীপুর গ্রামটা দেখা যাচ্ছে। মুহুর্তের জন্য অন্ধকার সরে আলোয় ভেসে যাচ্ছে। রাধাশঙ্করের ভিটাবাড়ি, ধান ক্ষেত, বাঁশঝাড় হাইস্কুল আলোয় ভেসে যাচ্ছে মুহূর্তের জন্য। মহামায়া আর মনিশঙ্করের ঘরে হারিকেন জ্বলছে।….

স্বর্ণবোয়াল

মোবারক তার কন্যার পাতে তরকারি তুলে দেয় আর বলে, আইজ কয় পদের মাছ খাইতেছ সেইটা খাবা আর বলবা মা! দেখি তুমি কেমুন মাছ চিনো! ময়না তার গোলগাল তামাটে মুখে একটা মধুর হাসি ফুটিয়ে উল্লসিত হয়ে ওঠে এই প্রতিযোগিতায় নামার জন্য। যদিও পুরষ্কার ফুরষ্কারের কোন তোয়াক্কা নাই। খাবার সময় বাপবেটির এইসব ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ খেলা আজকাল নিয়মিত কারবার।….

error: Content is protected !!