Author Picture

আতইরা

রুহুল আমিন বাচ্চু


মার সঙ্গে আজই প্রথম ঢুকল আতর আলী।
এত সুন্দর বাইত্তে মা কাম করে কোনোদিন কিন্তুক কয় নাই। কত বড় রুম, বস্তির মাডের হমান না অইলেও কাছাকাছি। হের লাইগা একটা গোস্বা পয়দা অইতাছে পেডে। দাদি থাকলে ঠিকই রসায়া রসায়া কইতো, কইতো রূপকথার স্বপ্নপুরী। বাত্তি ছাড়া আলো জ্বলে, মণি-মুক্তার ঝকমইক্যা আলো। লাল-নীল-সবুজ, কতো কিসিমের আলোর নাচন। আয়নার বাক্সে রাজারানীর চকমইক্যা আলখেল্লা। তাকের ওপর রাজমুকুট। নিচে জোড়ায় জোড়ায় সাজাইন্যা সোনার জুতা। ঘণ্টায় ঘণ্টায় জুতা বদল, আলখেল্লা বদল; কিন্তু মুকুট একখানই। মুকুটের মধ্যে বসাইন্যা লাল মণির দাম এক রাজত্বের হমান।
এ বাইত্তে ঢুকনের পর থেইক্যা মাথায় তার চিলিক চিলিক ভাব। চোখ মেইল্যা একটার পর একটা দেইখ্যা মনের মইধ্যে স্বপ্নের পাত্তি মারতাছে। এক্কেরে ফিলিমের রাজা-বাদশাগো দরবারের লাহান। চেয়ারগুলান য্যান একেকটা সিংহাসন। সোনার রঙে লতাপাতার কামে ভরা। নিজেরে পাগড়ি পরা খানসামা ভাবতে ভাবতে এক সময় তার মাথা নিচু হয়ে যায়।
ডান বুুকে বাম হাত রেখে ডান হাত দুলিয়ে কুর্নিশ করে আলখেল্লাকে।
মা-ডা য্যান কেমুন অইয়া গেছে। ভালা কইরা কথা কয় না। সব কথার মইধ্যে দরকারি দরকারি ভাব। বাজান মরলো অহনো বছর ঘুরে নাই, এর মইধ্যে কেমন বদল ধরছে। মাঝে মইধ্যে মনে অয়, হে য্যান আপনা মা-না। একটা মাত্র পোলা, হের লগে কথা কইতে ছেচড়ামি। দুর ভাল্লাগেনা। বাজানে ছোডকালে কইতো তোমার পোলা অইছে তোমার লাহান। নাকখান সোজা, হাত-পায়ের আঙ্গুলগুলান লম্বা লম্বা। কথাডা মনে অইতেই আরাম পায়। আপনা মা না অইলে এসবের মইদ্যে অমিল থাকতেও পারত।

বিয়ানের রইদ পূব জানালা দিয়া ঢুইক্যা পশ্চিমের দেয়ালে লেইপ্যা রইছে। এতোক্ষণে আতরের নজরে পড়ে সাগরপাড়ের ছবি একখান পশ্চিমের পুরা দেয়ালে লাগাইন্যা। মনে অইতাছে ছবির বিরাট নাইরকেল গাছটা আসল। মনডায় চাইতাছে গামছায় গিঁটমাইরা হেই গাছে উইঠ্যা দুগা ডাব পাড়ে।
পাকঘর থেইক্যা মা ফিরা আসে। এক জায়গায় আতররে খাড়ায়া থাকতে দেখে আঁচলে হাত মুইচ্যা একটা হাসন মারে। বহুৎ দিন পর মায়ের হাসি দেখল আতর। আসলে সুন্দর জায়গায় থাকলে মানুষের মনডার মইধ্যে একটা বেহেশতি ভাব পয়দা অয়। মার হাসিডা য্যান হেই রকম।
তার নিজের মইধ্যেও ক্যামুন য্যান ভালা ভালা ভাব ফুরুৎ ফুরুৎ মারতাছে। নইলে চিরিং বিরিং তিরিং আতইরা এতোক্ষণ এক জায়গায় থাকত! উল্টাইয়া পাল্টাইয়া বেবাক জিনিস গবেষণা কইরা ফালাইতো না!
মার হাত মোছা শেষ অইলে আতরের ডাইন হাতের কব্জি ধইরা টান মারে। রাজা-বাদশাগো দামি কার্পেট পা দিয়া চাপাইয়া কেমতে যাওন লাগে মায়ে হিগায়া দেয়। এত সুন্দর কার্পেট যে পাড়াইন্যা জিনিস আতর বুঝতে পারে নাই। একটু হুইয়া দেখতে মন চায়। আহ্ কেমন তুলতুইল্যা, এ্যাক্করে বিলাইর গায়ের লাহান। তিন কদম মারতেই একটা হাই আইসা যায়। কার্পেটের মাঝ চক্করে মাথা খালি হোয়াইতে পারলেই স্বপ্নের ঘুম। আহ্ রাজকুমারী ভানুমতি পায়ের কাছে বইস্যা থাকত যতক্ষণ না কুমারের ঘুম ভাঙে। হেরপর ফুলবনে স্বপ্নকুমারের লগে গান আর ঝুমুর ঝুমুর নাচ।
আরেক কদম বাড়াতেই নিজের পায়ের দিকে চোখ পড়ে।
মার কথামতো স্যান্ডেল পইরা আইছে, হেরপরেও এডটু বালি কিসিমের ময়লা পায়ের সাইড লাইনে দেখা যায়। মায়ে লগে না থাকলে ঠিকই জামাডা দিয়া মুইচ্যা ফালাইতো। আবার নিজে নিজে ভাবে ঠ্যাংতো ঠ্যাংই। কামের লাইগ্যাই আল্লা ফিট কইরা দিছে। আর কাম করলে ঠ্যাংয়ে ময়লা ধরবই।
-আয়।
মার পিছে পিছে আতর এবার ঢুকে খাওনের ঘরে।

মা-ডা য্যান কেমুন অইয়া গেছে। ভালা কইরা কথা কয় না। সব কথার মইধ্যে দরকারি দরকারি ভাব। বাজান মরলো অহনো বছর ঘুরে নাই, এর মইধ্যে কেমন বদল ধরছে। মাঝে মইধ্যে মনে অয়, হে য্যান আপনা মা-না। একটা মাত্র পোলা, হের লগে কথা কইতে ছেচড়ামি। দুর ভাল্লাগেনা। বাজানে ছোডকালে কইতো তোমার পোলা অইছে তোমার লাহান।

হেভি গ্লাসের ঢাকনি মারা নকশি টেবিল। গাছ, লতা-পাতা জীব-জন্তুর কাটিং কাঠের টেবিলে। পাশের চেয়ার আধা হামান্যা। বেবাক নকশা দেখতে বহুৎ টাইমের কাম। খালি চোখ ফালাইয়া মার পাছ ধরে।
টেবিলের মধ্যিখানে সাজাইন্যা নানান কিসিমের খাওন। দুই-তিন রকমের পাউরুটি। লগে রইছে পাউরুটিতে মাখাইন্যা নানান সাইজের বৈয়ামভর্তি কত কি। এতকিছুর নাম আতর জানে না। তয় কলা, আপেল, আঙ্গুর, বেদানা তো আছেই। টেলিভিশনে দেখছে জ্যাম-জেলি নায়িকারা ছুরি দিয়া পাউরুটিতে ডলা দিয়া বাম হাতে-মুখে হান্দায়। হের নাকে একটু টক মিষ্টি সোয়াদের গন্ধ আইসা ঠেস্ মারে। য্যান, গরিব আতইরার লগে এক কিসিমের বিটলামি আর কি!
এ সময়তে শব্দ কইরা মায়েরে কিছু জিগাইতে ডর লাগে। ঘরে অহনতরি কোনো মানুষ দেহে নাই, তবুও ডর। মা য্যান এ ঘরের কেউ, আর হে আতর আলী, মরা বাপের পোলা আতইরা। এক কথায় বাদাম্যা আতইরা, নেংটা বস্তিতে থাকোইন্যা মানুষ। মনে অইতাছে ধোয়া জামাডার মইধ্যেও বস্তির সোঁদা গন্ধ রইছে। এক বাটি ফিন্নির মইধ্যে একটা ভাসাইন্যা গোলগাল কিসমিস য্যান তারে চোখ মারতাছে। আর ফিন্নির দুধালো বাতাস আতরের নাকে-মুহে য্যান খেইল খেলাইতাছে। আতরের জিহ্বা খালি রস ছাড়তাছে। মায়ে যে ক্যান অহনো কয়না, বাজান পেট মাইরা খাইয়া ল’।
-বুয়া, বুয়া।
-জ্বে আম্মা।
ডাইনের ঘর থাইক্যা বাড়ির আম্মা বারাইয়া আসে। আতর উপচে আসা জিহ্বার জল ঘড়াৎ করে ভেতরে চালান দেয়। আতররে বাড়ির আম্মা একনজর দেইখ্যা লয়।
-জ্বে আম্মা, এর কথাই কইছিলাম।
এডটু পতন অইতাছে আতরের। আম্মার কাছে তার কথা! ভয়ে-ডরে তার পা কাঁপতে থাহে। মায়েতো আগে কিছু কয় নাই। খালি কইছে ধোয়া জামাডা পইরা স্যান্ডেল পায়ে দিয়া আইস। অহন মনে অইতাছে মায়ে হেরে কোরবানি দেওনের লাইগ্যা আইতে কইছে।
-ওকে আগে খেতে দাও।
আম্মা পেপারের ভাঁজ খুলে ঘুরে খাড়ায়। আতর দেখে সুন্দর গোলগাল ম্যাক্সি পরা ভারি শইল্যের বাড়ির আম্মা আরেকটা পর্দা টাঙানো রুমের দিকে গেলোগা।
হ, খাওনের আগে দুইন্যাইত কিছু নাই। ফাঁসির আসামিরেও রশি গলায় দেওনের আগে জিগায় কি খাইতে চাও। কিন্তুক মায়ে যে তারে রান্না ঘরের দিকে নিয়া যায়, খাওন তো বেবাক টেবিলে, ব্যাপারটা তার বুঝে আহে না।

মায়ের আচরণ আতরের কাছে পরপর কিসিমের মনে অইতাছে। হেরে রান্নাঘরের এক কোনায় বসায়া মা প্লেট ধুইতাছে। এক মিনিট দুই মিনিট, তার মনে অইতাছে মা বাড়ির বড় আম্মার কথা হুনে নাই।
অল্প শব্দে মায়েরে জিগায়, মা কি অইলো?
-এডটু ব’ বাজান।
মনে মনে কয়। মহব্বত কইরাতো বাজান কইলা, খাওন দিতাছ না ক্যান! এই যে বেহেশতি খাওন দেখাইছো, তোমার বাজানেনি খাইছে কোনোদিন! না দেখছে!
কিন্তু স্বর ফোটে না তার গলায়। একটা কঠিন পরীক্ষায় যেন আতর।
এ বাইতে ঢুকনের পর খিদা বহুৎ বাড়ছে। সেই বিয়ানে কিছু মুখে না দিয়াই এ বাইতে ঢুকছে। অহন বেলা এগারোটা। ঘরে থাকলে তো দুগা মুড়ি-চিঁড়া জুটতো।
-বুয়া! বুয়া! ডাকতে ডাকতে একটা তরুণী রান্নাঘরের কাছাকাছি আসে। তারে দেইখ্যাই আতর খাড়ায়া যায়।
-মিনি আপা আমার পোলা আতর, আতর আলী।

আম্মা পেপারের ভাঁজ খুলে ঘুরে খাড়ায়। আতর দেখে সুন্দর গোলগাল ম্যাক্সি পরা ভারি শইল্যের বাড়ির আম্মা আরেকটা পর্দা টাঙানো রুমের দিকে গেলোগা।
হ, খাওনের আগে দুইন্যাইত কিছু নাই। ফাঁসির আসামিরেও রশি গলায় দেওনের আগে জিগায় কি খাইতে চাও। কিন্তুক মায়ে যে তারে রান্না ঘরের দিকে নিয়া যায়, খাওন তো বেবাক টেবিলে, ব্যাপারটা তার বুঝে আহে না।

প্যান্ট-শার্ট পরা মিনি আপা সিনেমার নায়িকাগো স্টাইলে একটা ঘূর্ণি দিয়া ফালায়। তারপর আতরের নাম শুনে বলে, পচা।
জ্বে না, এম্নে রাহি নাই আপা। হের জন্মের সময় হারা বাড়ির মানষে আতরের গন্ধ পাইছিল। হ’ বাড়ির বেবাকতেই কইছে।
হুম! মিনি আপা যাইতে যাইতে কয়, ওকে ক্রিমির ওষুধ খাইয়ে দাও।
-জ্বে, আম্মায়ও কইছিল। কাইলই খাওয়ায়া হেরপর এ বাইতে আইতে কইছে। কিরে বাজান খাইছস্ না?
জবাব হুননের দরকার মনে করে না মিনি আপা। নিজের রুম থেইক্যা একটু পরে ফিইর‌্যা আইসা আতরের পিট চাপড়াইতে গিয়া হাত ফিরাইয়া লয়। পরে বাম হাতের ডাইরি দিয়া তার পিঠে আস্তে একটা গুঁতা মাইরা কয়, নখ ছোট রাখবি। কাল থেকে তুই আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। অ্যাসিস্ট্যান্ট বুঝিস?
-জ্বে, কামের মানুষ।
-রাবিশ। আমি না ডাকলে আমার রুমে কক্ষনো ঢুকবি না। কটমট শব্দে পা বাড়ায় মিনি আপা।
বাড়ির আম্মার গলার আওয়াজ শোনা যায়, মিনি নাশতা খেয়ে যাস্।
-সময় হবে না।
কয় কি! এতো বেহেশতি খাওন থুইয়া যায়গা। হেরা কি মানুষ না ফেরেশতা। ফেরেশতারা নাহি খাওন-দাওন করে না, খিদাও লাগে না।
ফিন্নির ঘ্রাণ আতরের নাকে ঠোক্কর মারতেই থাহে। লম্বা দম নিয়া আতর হেই ঘ্রাণ ফুসফুসে চালান দেয়। ফিন্নির বাটির চোখতোলা কিসমিসটা য্যান তারে ডাকতাছে। ঝুপ কইরা কয়েক ফোঁটা রস ঢাইল্যা দেয় তার জিহ্বা।
আহ্হারে মায় য্যান কি, অহনো কয় না বাজান ধর, খা-
আতরের মনের অবস্থা মা বুঝতে পারে।

আঁচলে হাত মুইছ্যা ডাইনিং টেবিলের সামনে খাড়ায়। দুইফালি পাউরুটি পোলার দিকে বাড়ায়া ধরে। হেরপর নিশ্চয় ফিন্নির বাটিডা মায়ে মহব্বতের সাথে তুইল্যা দিব। আহ্ কি সুখের জিন্দেগির লগে বেহেশতি খাওন।
আতরের ভাবনায় ফাটল ধরে যখন দেখে মা একটা গ্লাসে পানি ঢাইল্যা নিজেই ঢক ঢক মাইরা খায়।
রুটির টুকরা দুইখান য্যান ফিলিমের ভিলেনের লাহান আতরের হাতে হাইস্যা ওঠে। আতর পায়ের তলে ফালাইয়া দুইডারে ফিনিশ করতে পারলেই হা-হা-কইরা হাসতে পারে নায়কের লাহান।
কিন্তুক মায়ের চোখের সাবধানী ভাষা, বস্তির মেজাজ এইখানে চলব না। তার ভেতরের গোস্বা নোনা পানি অইয়া চোখ দিয়া বারায়া যায়।
মা তার মাথায় হাত দিয়া মুইছা দেয়। বাজানরে, আমাগো রেজেক বড় কম। আল্লাই বাইট্যা দিছে। এইডার লগে বেইমানি করলে শূন্য অইয়্যা যাইব যে বাজান!
আতর মনে মনে কয় ফিন্নির বাডিটাতো আপায় ফেলাইয়া গেছে, হেইডা ধরায়া দিলে কি অইতো?
বাড়ির আম্মা রুম থেইক্যা বারায়া আসে। মা হাতের ঝাড়ুডা ফেলায়া ফরমাশ হুননের লাইগা অ্যাটেনশন অইয়া থাকে।
-কেনাকাটা করতে পারবি?
-জ্বে আম্মা, পারব। তয় দামি কিছু না-
পাঁচশ’ টাকার একটা নোট লিস্টসহ আম্মা ধরায়া দেয় আতরের হাতে।
-না আম্মা, এত বড় টেকা দিয়েন না। হারায়া ফালাইব।
ও, বলে আম্মা শ’ টাকার একটা নোট দিয়ে ডিম চা পাতা আনতে কয় আতররে। আতরের মা দৌড়াইয়া রসুইঘর থেইক্যা চা পাতার একটা খালি প্যাকেট আইন্যা কয়, বাজান এইডার লাহান। বাড়ির আম্মা রুমে ঢুকে। আতর দেখে হের মা টেবিলের খাওন গুলান একটা একটা কইরা সাইডের ফ্রিজে ভাঁজ কইরা রাখে।
হালার খাওন! কথাডা আতরের জবান দিয়া বাইর অইয়া যায়। মায়ের লম্বা শ্বাসের শব্দ তার কানে বাড়ি দিয়া যায়।
গেটের বাইরে বাইর অইয়া হন্ হন্ কইরা ডাইনের রাস্তা ধরে। পকেট থেইক্যা বাইর করে রুটির টুকরাগুলান। হে জানে মায়ে পেছন থেইক্যা চাইয়া রইছে। রুটির টুকরাগুলান একমুঠি কইরা ড্রেনে ছুইড়া মারে। এক ঝাঁক মশা উড়াল দিয়া আবার বহে ড্রেনের কালা পানিতে।

মনে কয় গেরামের বাড়ি ফিইর‌্যা যাইতে। হেইখানে কেউ আপন কেউ পর অইলেও বেবাকেরে আপনা আপনা লাগে। মনে হয় নিজের মাডি, নিজের বাতাস আর শইল্যের মইধ্যেও শক্তি শক্তি ভাব আহে। ছুইট্যা চলতে মন চায়। এইহানে তো একটা দৌড় দিলেই হালার পাবলিকে কয় ধর ধর। আর ধরতে পারলে হুদাহুদি মাইর। পাক্কা ফাইটিং না দিতে পারলে জানে বাঁচনডাই মুশকিল।

পেছনে চায় আতর। সত্য সত্যই মা চাইয়া রইছে পোলার দিকে। পায়ের সামনে থাকা একটা নাইরকেলের গোটারে কিক্ মারে আতর। তিড়িং তিড়িং কইরা গোটাডা বহুদূর গিয়া ড্রেনে পইড়া ভাসতে থাকে। ডাইন স্যান্ডেলের ফিতাডা খুইল্যা যায়। স্যান্ডেলডা হাতে তুইল্যা বোটাডা ছেদা দিয়া হান্দাইয়া দেয়।
ঠিক সময়ের মইধ্যে ফিরা আহে সে। রান্নাঘরে দেয়ালে ঠেশ্ মাইরা বইসা থাকে, দেখে মায়ের কাজকাম। মা আনাজপাতি কাইট্যা ধুইয়া রেডি করে। বড় আম্মার ডাক শুইন্যা দৌড়ায়, বাথটাবের পানির কল ছাড়ার লাইগা।
মার যে ক্যান এত ডর আতরের বুঝে আহে না। আর ক্যান যে তারে আইন্যা বন্দি কইরা রাখছে তাও বুঝ পায় না। ডান্ডা-গুল্লি পিটাইন্যা আতর য্যান বন্দি পাখি।
মা কানে কানে মন্ত্র দিয়া যায়, বাজান কয়দিন ভালা কইরা কাম কর। সাবেরে ধইরা অফিসের কামে লাগায়া দিমু।
অফিসের কাম! মনের মইধ্যে সাব সাব অওনের ভাব আহে। কিন্তুক, লেহাপড়া তো মাত্র ফোর কেলাস। হেরপর ভাগলপুর। ওইসব বই-খাতা আর পথশিশুর ফাঁকাবাজি ইশকুল তার মোডেও ভাল্লাগেনা। হেরপর খাচ্চর খাচ্চর পোলাপানগো লগে এডটুও বনে না। হালারা খালি বাপ-মা তুইল্যা গাইল পারে।

মনে কয় গেরামের বাড়ি ফিইর‌্যা যাইতে। হেইখানে কেউ আপন কেউ পর অইলেও বেবাকেরে আপনা আপনা লাগে। মনে হয় নিজের মাডি, নিজের বাতাস আর শইল্যের মইধ্যেও শক্তি শক্তি ভাব আহে। ছুইট্যা চলতে মন চায়। এইহানে তো একটা দৌড় দিলেই হালার পাবলিকে কয় ধর ধর। আর ধরতে পারলে হুদাহুদি মাইর। পাক্কা ফাইটিং না দিতে পারলে জানে বাঁচনডাই মুশকিল।
দুই বছর আগেও আছিল গেরাম্যা পোলা। বাবার নিজের ভিটি। দোচালা ঘরের সামনে সাইডে পাউপা আর কালা মরিচ গাছ। হেরপর কলা গাছে গাছে বাড়ির ঘের। ঘের পার অইলেই কত্তো বড় দুনিয়া গেরামে। ধানক্ষেতের শেষ নাই, হাওরের শেষ নাই। বর্ষাকালে তো হাওর য্যান একখান সাগর। ঢেউ আছড়াইয়া পড়ে বান্দের মাজায়। দুপুরে পুকুরের কাদাপানিতে দাপাদাপি। তিন বছরের মাথায় বাজানের কোলে বইয়া সাঁতার শিখছে। হেরপর কলাগাছ ধইরা পুকুরের মধ্যিখানে। পানি খাইয়া পেড ভরলেও ডুবে নাই কোনোদিন।
চাইর বছর বয়সে সাঁতরাইয়া পাড়ি দিছে বড় পুকুরটা। কম কইরা অইলেও হাজার হাতের লম্বা পুকুর। বাজান পাড়ে খাড়ায়া সাব্বাস দিছে। হেরপর বিরাট খিদা লইয়া বাপ-পুতে আইসা কইতো খাওন দেও। মাদুর বিছাইতে যতক্ষণ দেরি। মায়ের থালা-বাসন রেডি। বাপ-পুতে খাইয়া পেডডারে ঢোলবানায়া ফালাইতো। কচুর লতি, ঢেঁকি শাক, কলমি বেবাক মিলায়া মাছের সালুন। এক্কেরে থকথইক্যা, লগে কড়া মরিচের ঝাল। আহ্ সোয়াদ কারে কয়। হেরপর বাপ-বেটা এক মাদুরে ঘণ্টাখানেক ঘুম। মায়ে উডানের আমগাছটার তলে বইসা বইসা কাঁথা সেলাইতো আর য্যান তাগোরে পাহারা দিত। মাঝে মইধ্যে ঘামায়া গেলে নকশি পাখায় বাতাস মাইরা দিত।

বিকেলে ক্ষেত থেইক্যা টন কচু তুইল্যা টুকরি কইরা হাডে। বাজানের কান্দে থাকত ঝুলান্যা দুই জোড়া নাইরকেল। বাজানের লগে কাঁচাবাজার ঘুইরা ক্ষেতের আনাজপাতি বেইচ্যা ফিরত। বাজানের হাতে ডাইল-নুন-মরিচ আর আত কান্দে দুই টুকরা আখ ফালাইয়া লেফট্ রাইট্ কইরা সইনধ্যার আগে বাড়ি ফিরত। আখ খাওন শেষ না অওন পর্যন্ত মনের মধ্যে একটা অ্যাটেনশন ভাব জাইগ্যা থাকত।
কিয়ের মইধ্যে য্যান কি! হঠাৎ বাজানের অসুখ অইল। কবিরাজ থেইক্যা বড় ডাক্তার। বাজান বেবাক বেইচা অইল ফহির, মা অইল ফহিরনী আর আতর অইল ফহিরনীর পুত।
ঢাকা শহরে বাজান বেশিদিন টিকল না। বছর না ঘুরতেই রিকশাওলা বাজানেরে ট্রাকের নিচে দেইখ্যা ইন্নালিল্লাহ্ পড়তে অইল।
গ্যারেজের সামনে বসা আতর। একটা ঝাউগাছের দিকে চাইয়া চাইয়া কোন সময় যে ভাবুক অইয়া গেছে টের পায় নাই।
আবুল ড্রাইভার বাজার সাইরা হেরে ডাইক্যা না পাইয়া এক্কেরে দুই কদমের কাছ থাইক্যা হাঁক মারল, আবে হালার পো, শইল্যে তো জং ধরায়া ফালাইছস?
আতর তো ঢইল্যাই পড়ছিল পেরায়। আবুল্যারে তার মোডেও সহ্য হয় না। হারাদিন খালি ডাকাডাকি করে। য্যান হে-ই এ বাড়ির ইট-রডের মালিক। হাত মাইরা খালি অর্ডার মারে। দেরি করলে গাইল পারে।
আবুল একটা থাপ্পড় বাড়ায় আওগাইতেই মার গলার ধমক।
-আবুল্যা, হাত নামা কইলাম।
আবুল্যা হাত নামাইয়া ফেলায়। বাজার-সদাই নিজেই নিয়া যায় রান্নাঘরে। মার কাছে ধরা সে। বে-তাল করলে এক্সট্রা কাপ চায়ের অর্ডার বাতিল। চা বাতিল তো ফুল ঝিমানি। আর বেগম সায়েবা ঝিমানি দেখলে দিব কাঁচা ধমক। এমনেই এক ঝিমানিতে গাড়ি পড়ছিল মিরপুরের দশ নম্বর গোল চক্করে ড্রেনে। চাকরিটা তখনই চুবানি খাইছিল পেরায়।
বিয়ান রাইতে ঘুম ভাঙে আতরের। মায়েরে ডাক পাইরা তোলে। হাঁপাইতে হাঁপাইতে কয় বাজানেরে স্বপ্নে দেখছে, দেখছে পুকুর ঘাটে খাড়ায়া একটা পাকনা তাল হাতে লইয়া বাজান তারে ডাকতাছে। সেতো তখনো মাইজপুকুরে সাঁতার কাটতাছে। বাজানের ডাকে সাঁতরাইয়া আইতে আইতে হয়রান অইয়া যায়। তালগাছের ঘাটে উইঠ্যা দেহে বাজান নাই। ঘুমডাও চইলা গেছে। মায়ের লগে জেদ ধরে অহনই আজিমপুরে যাইতে অইবো, বাজানের কবর জেয়ারত করবো। মায়ে অনেক বুজাইয়া রাইতটা কাবার করতে কইল। এর মইধ্যে চেরাগ জ্বালায়া পাঞ্জাবিটা বাইর কইরা লইছে। বাজানের গোল টুপিডা এক্কেবারে কান পর্যন্ত ঢাইক্যা ফালাইছে। আমেরিকান আর্মি আর্মি ঠেকতাছে নিজেরে।

বিকেলে ক্ষেত থেইক্যা টন কচু তুইল্যা টুকরি কইরা হাডে। বাজানের কান্দে থাকত ঝুলান্যা দুই জোড়া নাইরকেল। বাজানের লগে কাঁচাবাজার ঘুইরা ক্ষেতের আনাজপাতি বেইচ্যা ফিরত। বাজানের হাতে ডাইল-নুন-মরিচ আর আত কান্দে দুই টুকরা আখ ফালাইয়া লেফট্ রাইট্ কইরা সইনধ্যার আগে বাড়ি ফিরত। আখ খাওন শেষ না অওন পর্যন্ত মনের মধ্যে একটা অ্যাটেনশন ভাব জাইগ্যা থাকত।

ফজরের আজানের পর রেললাইন ধইরা অনেকদূর হাঁটতে অইল। রিকশা তহনো বেশি বাইর অয় নাই। দুই চাইরডা যে বাইর অইল দরে বনে না। সুরুজ উডনের অনেক আগেই আজিমপুরে নামে। মায়ে জিগায়, চিনবিনি তোর বাপের কব্বর?
-কও কি! এক্কেরে মুখস্থ। ভেতরের পাকা রাস্তার চৌমুনা থেইক্যা পাক্কা দশকদম উত্তরে। মহিলাদের নামাজ ঘরে মায়েরে থুইয়া আগায় আতর। দুই চাইরজন কইরা মুসল্লি ঢুকতাছে কবরস্থানে।
এর মধ্যে পাঁচ-ছ’জনের লাশ আইসা গেছে গেটে। কবর খুড়–ন্যারা কোদাল কান্দে হাজির। বাঁশ-চাটাই তৈয়ার করতাছে আরেক দল। এডটু ভয়ভয় লাগলেও আতর জানে কবরস্থানে ভূত থাকে না। আতর লোবানের গন্ধ ভুর ভুর করতাছে।
এ গন্ধটারেই আতরের বড় বেশি ভয়।
বাপ মরণের পর আতর লোবানের গন্ধে হে বমি করছিল বারবার। একদল মুসল্লির পেছন পেছন যায় আতর। এদিক-ওদিকে খালি কব্বর আর কব্বর। কবরস্থানের বাতি এরিমধ্যে নিব্যা গেছে। একটা লাল আভা ছড়ায়া পড়ছে চাইরদিকে। আতরের মনে অইতাছে লাল আভায় রহমতের ফেরেশতারা মুসল্লিগো চিন্যা নেয় আর তাগো মরা আত্মীয়ের লাইগা আল্লার কাছে দোয়া মাঙ্গে।
মুসল্লিগো ছোট্ট মিছিলটা খাড়ায়া পড়েছে তার বাজানের কব্বরের সামনে।
আতর মনে মনে খুব খুশি হয়। হঠাৎ তার মনে হয় এরা মুসল্লি না, রহমতের ফেরেশতা।
ভোর রাইত্তে বাজানের স্বপ্নের লগে লগে আল্লায় য্যান হেগোরে ডাইরেক্ট পাডায়া দিছে। যা, আতরের বাজানের কব্বর জিয়ারত কইরা আয়। তাগো লগে দোয়ায় শামিল হয় আতর। ছোডকালে বাজানে আমসিপারা পড়াইছিল। আলহামদুলিল্লাহ্ থেইক্যা লেঈলাফে পর্যন্ত অহনো মুখস্থ আছে। তিন চাইরডা সূরা পড়ার পর মোনাজাতে শামিল অয়। বাজানের লাইগা চোখ বন্ধ কইরা দোয়া করে।
বাজানে কইতো নাবালক পোলাপানের দোয়া আল্লায় বেশি কবুল করে। হেরা মাসুম বাচ্চা। তাগো বাপের মাগফিরাতের লাইগা হেগো দোয়া আল্লাহর সিংহাসনে ধাক্কা মারে। আল্লায় তহন ফেরেশতাগোরে পাডায়। কয়, দেইখ্যা আয় কোন মাসুম হের বাপ-মার লাইগা দোয়া মাংতাছে।

দোয়া শেষ অইলে মুসল্লিরা ফিইর‌্যা যায়। আতর এবার চোখ মেইল্যা তাকায় তার বাজানের কব্বরের দিকে। এতটুক সন্দেহ সন্দেহ লাগে। চৌমুনা থেইক্যা দশ কদম মাইপ্যা আবার খাড়ায়। ঠিকই তো আছে। একবার ডাইনে আবার বামে যায়। হেই মাথার খেজুর গাছটা বরাবর করে। ঠিকই বাজানের কব্বরের ওপর নয়া কব্বর।
ডাইনে বামে চায় একই অবস্থা। বেবাক নয়া কব্বর। বাজানের কব্বরের বরাবর একটা বরই গাছের কাঁচা ডাল পোতান্যা। নিশ্চয় গতকালকার কব্বর। মনডা তার খারাপ অইয়া যায়। মাথার টুপিডা পকেটে ঢুকায়। লাইন ধইরা লাশের মিছিল ঢুকতাছে। আশহাদুয়াল্লাহ ইলাহা … তার জবানেও আইসা যায়।
মার কাছে ফিরতেই মা তারে জড়ায়া ধরে।
একটু কান্দন কান্দন ভাব। বাজান ঠিক পাইছ্স! জবাব নাই আতরের। মা রিকশা থেইক্যা কামের বাড়িতে নাইম্যা যায়। যাইতে যাইতে আতররে একটু বেলা কইরা ঘুমাইয়া আইতে কয়।
আতর এক ঘুম দিয়া দু’গা মুড়ি পানি দিয়া পেড ভাসায়া আবার হুইয়া পড়ে। সইনধ্যার লগ ধইরা মা ফিইর‌্যা আসে। আঁচলের তল থেইকা সাবধানে বাইর করে এক বাটি ফিন্নি। মৌ মৌ ঘেরাণে আতরের খালি পেডের মইধ্যে হাম্বা হাম্বা ডাক ওঠে। আহ্ বেহেশতি খাওন!
কিয়ের হাত-মাত ধোওন। ঘপাঘপ কয়েক লোকমা পেডে চালান কইরা দেয়। আতকা খাওন বন্ধ কইরা মার চোক্ষে চায়, চুরি কইরা আনছস?
মার চোক্ষে চুন্নি চুন্নি ভাব। বুঝতে পারে আতর।
-এমনে কইলেই তো দিত।
-দেয় নারে বাজান।
-হেই দিন না কইলো আমারে নাশতা দিতে। আর তুই দিলি দুইখান ভাঙা রুটির টুকরা।
-কওনের কালে কইছে, দিলে আবার হিসাব চাইত। হেরাতো শিক্ষিত মানুষ, হিসাবে পাক্কা।
-অহন যে চুরি করলি, ভালো অইলো!
-খাইয়া ল’।
-কালকা মাফ চাইয়া লইবি।
হেরা ক্ষেমা করতে জানে না। কইবো আইজ এইডা নিছস তো কাইল বাড়িডাই লইয়া যাইবি। আমারও তো মনডা চায় আমার পোলারে ভালা-মন্দ …
অইছে, ক্ষেমা দে।

অফিসে চাকরি অইবো। মা সায়েবরে কইছে। এ ভরসায় আতর রাত-দিন বনানীর একশ’ তের নম্বর বাড়িতে অ্যাটেনশন। কোনো কামে তার নো নাই। এমনকি আবুল্যার ঠ্যাং টিপা পর্যন্ত।
কিন্তু ওই হালার পো মাঝে মইধ্যে য্যান কি ভাঙবার চায়। আতর না বোঝনের ভাও করলেও বোঝে। খচ্চর হালার পো। ঠেকায়া রাখছে, কয় সাবের কাছাকাছি থাকে। ভালো-মন্দ দুই-চাইর ডায়ালগ পুচ্ করলে চাকরিডা তাড়াতাড়ি অইবো। বয় পিয়ন, মাথার মইধ্যে ক্যাপ, হাতের কান্দে ব্যাজ, রঙিন ফুল প্যান্ট আর ইন সাটের লগে মোটা বেল্ট, মনের মইধ্যে ডাটফাট কুতকুতি মারে।
তিন মাস তেরোদিনের মাথায় আপার কাছে সাবের অফিসের ঠিকানা চায়। আপা যে খেইপ্যা রইছে আতর বুঝবার পারে নাই।
-কাল দেরি করলি কেন?
ইশশিরে ধরা খাইয়া গেল। আপায় তো ঘুম থেইক্যা ওঠে সাড়ে দশটায়। কালকা এগারোটায় আইস্যা দেহে আপা নাই। আপায় তো সাড়ে এগারোটার আগে কোন কামই দেয় না।
না, হাছা কথাডা পেশ করন ভালা। জ্বে-সকালে মিছিলে গেছিলাম।
-মিছিল, কিসের মিছিল?
আমাগো বস্তির দোকানদার কদম ভাইরে সন্ত্রাসী কালা শাজাইন্যা চাক্কু মারছে, হের লাইগা থানা ঘেরাও করছিলাম। আইছ্যা আপা, ডাইরেক্ট অ্যাকশন কী?
আপার হাতে বাম গালে চড় খেয়ে আতর ভচকাইয়া যায়। আতরের মা দৌড়াইয়া আসে। পোলার গালে হাত বুলাইয়া কয়, আপা অপরাধ করলে আমারে কন, আমি…
-তোমার ছেলে ডাইরেক্ট অ্যাকশন কি জানতে চেয়েছিল, শিখিয়ে দিলাম, যা বারান্দার টবগুলো রোদে রেখে আয়।
মা যায় রান্না ঘরে। আতর একটা একটা কইরা টব নিয়া রইদে থোয়। এর মধ্যে আবুল্যা আইসা তার পাছায় খোঁচা মারে। একটা টব হাত থেইক্যা পইড়া পটাশ শব্দ মারে। নিজ রুমের দিকে দৌড় মারে আবুল্যা। মিনি আপাও আসে, লগে বাড়ির আম্মাও। দুগা চড় দেয়ার পর মিনি আপার হাত থামে বড় আম্মার কথায়।
হয়েছে, বেতন থেকে দাম কেটে রাখব।
-কিন্তু, আমার শখের নাইট কুইন!
-মালীকে বলে দাও, টব বদলে দিবে।

দূরে মানুষজনের গমগম শব্দ কানে আহে। বেড়ার ফাঁক দিয়া দেহে বস্তির মানুষের কান্দে একটা মরা মানুষের খাটিয়া। আশহাদুয়াল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু … শব্দটা কানে বাজতেই তড়াক কইরা ওঠে। পেটের ব্যথা, মাথা ধরা বেবাক য্যান ছাড় দিছে।

মিনি আপার জন্মদিনে বন্ধুরা আইবে। সারা বাড়িতে ফুর্তি ফুর্তি ভাব। বাজার-সদাই থেইক্যা বাড়ি সাজানি বেবাক কাম আপার বন্ধুগো, আর ইয়েস নো’র ঠেলায় কাতর আতর। এইটা চাই, ওইটা নাই, আনন লাগব, হয় নাই। এইসব নিয়া বেশি ব্যস্ত জিঙ্কু ভাই। গাড়ি নিয়া ঘণ্টায় ঘণ্টায় ঢুশ-ঢাশ। দারোয়ান ব্যাটার এক্সট্রা ঠ্যাং জরুরি। আবুল্যা পুরা টাইট।
বেলুন আর তাজা ফুল দিয়া পুরা বাড়ি সাজাইতে অইবো। শাহবাগের বেবাক ফুলের দোকানে বুকিং। জিঙ্কু ভাই খবর দিল কাইল ফরিদপুর থেইক্যা পাঁচটনি এক ট্রাক রজনীগন্ধা বিয়ানেই আইব।
চড়–ই-চড়–ই, ফুরুত-ফারুৎ বন্ধুগো চা-নাশতা, এইটা, ঐটা দিতে দিতে মার অবস্থা এক্কেরে পাতলা ডাইল। মার চোক্ষে চাইতে পারে না আতর। উঠতে-বসতে মার চাপানো কু-ক্যা শব্দ তার কানে আহে।
রাইতে মার জ্বর আহে, ঠেলা মারা জ্বর। আতর মায়ের কপালে জলপট্টি মাইরা কোনোমতে রাইত কাবার করে। বিয়ানে আতর একটু কাইত অইতেই মা পালায়। ঘুম থেইক্যা উইঠ্যা তার মেজাজটা খারাপ অইয়া যায়। বাডিতে দু’গা মুড়ি আর দু’গা কলা সাজায়া রাখছে মায়ে।

বান্দির ঝি আজকা কামে না গেলে কি অইতো! মেজাজডা খারাপ অইয়া যায়। আনন্দের রাইত যত লম্বা হয় মার যন্ত্রণা তত বাড়ে। কিন্তুক মুখে রা নাই। অনেক রাইতে বস্তিতে ফিরে মা-ছেলে। মার হাতে ভাঁজকরা একখানা নয়া শাড়ি আর আতরের গতরে নয়া শার্ট। একশ’ তেরো নম্বর বাড়ির আনন্দে মা-পুত শরিক অইতে পারে নাই। খালি দোয়া করছিল য্যান ত্বরা ত্বরি তাগো নাচন-কুদন-খাওন শেষ অয়। শেষ রাইতে মার রক্তবমি, আতর দিশেহারা। পাশের ডেরার ময়না খালারে ডাকে। খালা ওজু কইরা তসবিহ হাতে কয় আল্লা আল্লা কর বাজান।
তিনদিন পর কামের বাড়ি যায় আতর। বাড়ির আম্মায় জিগাইলে কয় মা ভালা আছে। আসল খবরটা আম্মায়ও জানে। গতকাইল ড্রাইভার গেছিল মায়েরে কামে আনতে। অবস্থা দেইখ্যা কিছু কয় নাই। তয় খবর দিছে কবিরাজ থুইয়া বড় ডাক্তার দেখাইছে। ভিজিট তিনশ’ টেকা। দুইশ’ বিশ টেকার অসুদ। ডাক্তার কইছে সাইরা যাইব। মায়ে, না অসুখ সারব ডাক্তার ভাইঙ্গা কয় নাই। হাসপাতলে নেওনের কথাও কয় নাই। দামি রোগী অইলে নিশ্চয়ই কইতো ক্লিনিকে ভর্তি জরুরি। ডাক্তার তো রোগীর প্রেসারের লগে টেকার প্রেসারও মাপে। বাইল মতোন না অইলে তিন কথায় বেশির জবানে ছাড়ে না। ধাঁধার মইধ্যে রাহে। আতরের এসব জানা আছে।
আবুল্যা আম্মার কানে কানে জানান দেয় লিভার সিরোসিস। পনেরোদিন বাঁচলেও বাঁচতে পারে। তয় কামে আর আইতে পারব না। এ বাইতে অহন আতর ক্যান যে আইলো কইতে পারে না। টেকা পাইলে মায়ে আইবো, হেরেতো আইতে কয় নাই। দূর, কইয়া নিজে ফিরনের আগেই আম্মা শ’ টেকার একখান নোট তার হাতে ধরায়া দেয়। এইডা মায়ের পাওনা টেকা না ভিক্ষা বুঝতে পারে না আতর।
-ভালো চিকিৎসা দিবি। ভালো খাবার খেতে দিবি।
এইবার বুঝবার পারে ভিক্ষার টেকা। জিহ্বার মইধ্যে একদলা থু আইলে গিল্যা ফেলায়। শ’ টেকার নোটের অনেক দাম বাড়ির আম্মার কাছে। হাঃ হাঃ কইরা নায়কের লাহান হাসতে মনডা চাইল। দুঃখিত মনে দুঃখের হাসিও জাগাইতে পারল না।

গুলশান একনম্বর থেইক্যা একটা ৬নং বাসে উঠে আতর। গুলশান-মতিঝিল। বাস বদলায়, মতিঝিল-মিরপুর। আবার সাভার গিয়া ফিইর‌্যা আসে এক নম্বরে। হাতের শেষ দুই টেকার নোট। পেডে দানা-পানি নাই। মনের মইধ্যে পয়দা হওয়া গোস্বা দুঃখের নোনাজলেও ভাসাইতে পারল না। হালায় মনডা যে ক্যান এত হাড্ডির লাহান শক্ত অইয়া রইছে, বুঝতে পারে না।
মার কথা মনে অইতেই কইলজায় কাঁপানি আহে। মা তো মা। মা তো একখান ভরসা, মা তো আঁচল, মা তো ভাতের পাতিল, মা তো ঘরের চাইরখান বেড়া আর একখান দরজা। মায়ে মরব ক্যান! কি মনে কইরা গোত্তা দিয়া ঢুকে একশ’ তেরো নম্বর বাইতে।
মনে অইতাছে বাড়িডা ফাঁকা। দারোয়ান গেটের টেবিলে বইসা ঢুলতাছে, আবুল্যা গাড়ির সিটে কাইত, মিনি আপার রুমে ঢুইক্যা পড়ে আতর। টেবিলের ওপর গিফটের ঘড়ি, আংটি, শোপিস, কত্তো কি! আতরের ঠ্যাং কাঁপে, মাথায় ঘূর্ণি মারে। মনডায় চিৎকার মারে, না… মায়েরে বাঁচাইতে অইব।
টেবিলে খাবলা মারতেই কাচের গ্লাসটা নিচে পইড়া সাইরেনের আওয়াজ তোলে। আধা উদলা মিনি আপা কাপড় সামলাইতে না পাইরা ভূতের লাহান চিৎকার মারে। দারোয়ান আর আবুল্যা ঘিরা ফালায় আতররে।
আতর ফিলিমের হিরোর লাহান লাফ মাইরা তাগো মাথার ওপর দিয়া পালাইতে পারে না। দু’গা ডিসিম ডিসিম মাইরও তার হাতে কায়দা কইরা আহে না। এক্কেরে মরা পুতুলের লাহান শত্রুর হাতে নিজেরে তুইল্যা দেয়।
শুরু করে হেরা দু’জনে ডাইরেক্ট অ্যাকশন। আবুল্যা আর দারোয়ানরে মাঝে মইধ্যে মনে অইতো নিজেগো মতোন আধ-খাওইন্যা মানুষ। আপনা না অইলেও কাছাকাছি আপনা মানুষ। না, হেরা যে টিপু সুলতান সিরিয়ালের ইংরেজের ভারত বাহিনী। নিজেগো জাতের মানুষের লগে বেইমানি। গরিব মায়েগো নম্বরি শুরু। ঢাল-তলোয়ারবিহীন আতর কিল-ঘুষা, ডান্ডাবাড়ি কিছুই খাইতে বাদ রাহে নাই। শেষমেশ মায়ের লাহান রক্তবমি করলে হেরা ক্ষান্ত দেয়।

বাড়ির আম্মার নির্দেশে ঢাকা মেডিকেলে হেরে ফেলাইয়া আসে আবুল্যা। ময়না খালার নজরে আহে আতরের নিস্তেজ শইলডা। আতরের নিয়া যায় ডাক্তারের টেবিলে।
বিকেলের সুরুজটার তেছড়া আলো বেড়ার ফাঁক দিয়া মার চোখে পড়ে। মাথা সরাইতে গিয়া পেডের ব্যথায় কু-ক্যুা শব্দ বাইর হয় গলা দিয়া। কোনো মতে অষুদের প্যাকেটটা পাইলেও মনে পড়ে সারাদিনেও কিছুই খায় না। পোলাডা যে গেল কই! মুড়ির ডিব্বাও খালি। বইতে গিয়া উঠতে পারে না।
আবার মাথা ফেলাইয়া দেয় বালিশে। চক্ষু দুইডা বন্ধ হইয়া আসে।
দূরে মানুষজনের গমগম শব্দ কানে আহে। বেড়ার ফাঁক দিয়া দেহে বস্তির মানুষের কান্দে একটা মরা মানুষের খাটিয়া। আশহাদুয়াল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু … শব্দটা কানে বাজতেই তড়াক কইরা ওঠে। পেটের ব্যথা, মাথা ধরা বেবাক য্যান ছাড় দিছে।
খাটিয়া নামে তার ডেরার সামনে। ময়নাবু হাউমাউ কইরা আগায়া আসে। বাঁশের দরজাটা খুলতেই আতর লোবানের গন্ধের একটা ঢেউ য্যান তার ডেরা দখল করে। দরজা দিয়া মাথা বাইর করে আতরের মা। কেডায় য্যান গোলাপ জলের বৃষ্টি ছিটাইয়া দেয়। দুই ফোঁটা গোলাপ জল ফরিদা বিবির চোক্ষের পাতায় ভাইস্যা থাকে অনেক সময়।

আরো পড়তে পারেন

মহামায়া (পর্ব-২)

পড়ুন—  মহামায়া (পর্ব-১) ৩. কাঁচা রাস্তায় উঠতে উঠতে কাপড় ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে। পায়ের সাথে কাপড় জড়িয়ে যাচ্ছে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। সবার আগে মনিশঙ্কর হাঁটছে। তার হাতে মাথায় খাবারের টিন। একটা কাপড়ের ট্রাঙ্ক। সকলের হাতেই কাপড়ের পুটুলি। এতটুকু আসতেই হাপিয়ে উঠেছে। আরো অনেকটা দূর যেতে হবে হেঁটে। তারপর নৌকায় সীমানার কাছাকাছি কোনো একটা জায়গায়।….

মহামায়া (পর্ব-১)

১. সূর্য উঠতে এখনো অনেকটা দেরি। আকাশে কোনো তারা নেই। পুরোটা আকাশ মেঘে ঢাকা। রাতের অন্ধকারটা আজকে আরও বেশি চোখে লাগছে। বাতাস হচ্ছে। মাঝে মাঝে মেঘের আলোতে দেবীপুর গ্রামটা দেখা যাচ্ছে। মুহুর্তের জন্য অন্ধকার সরে আলোয় ভেসে যাচ্ছে। রাধাশঙ্করের ভিটাবাড়ি, ধান ক্ষেত, বাঁশঝাড় হাইস্কুল আলোয় ভেসে যাচ্ছে মুহূর্তের জন্য। মহামায়া আর মনিশঙ্করের ঘরে হারিকেন জ্বলছে।….

স্বর্ণবোয়াল

মোবারক তার কন্যার পাতে তরকারি তুলে দেয় আর বলে, আইজ কয় পদের মাছ খাইতেছ সেইটা খাবা আর বলবা মা! দেখি তুমি কেমুন মাছ চিনো! ময়না তার গোলগাল তামাটে মুখে একটা মধুর হাসি ফুটিয়ে উল্লসিত হয়ে ওঠে এই প্রতিযোগিতায় নামার জন্য। যদিও পুরষ্কার ফুরষ্কারের কোন তোয়াক্কা নাই। খাবার সময় বাপবেটির এইসব ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ খেলা আজকাল নিয়মিত কারবার।….

error: Content is protected !!