Thursday, January 15, 2026
spot_img
More

    সর্বশেষ

    সূর্য-কেন্দ্রিক সৌরজগৎ

    একটি কাল্পনিক বিতর্ক। যাঁরা অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি :
    এরিসটারকাস (Aristarcus, খৃষ্টপূর্ব ৩১০-২৩০): গ্রিক দার্শনিক এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি-ই প্রথম সূর্য-কেন্দ্রিক সৌরজগতের কথা বলেন। ব্রহ্মগুপ্ত (Brahmagupta, ৫৯৭-৬৬৮): ভারতের অঙ্কবিদ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি শূন্যকে একটি সংখ্যা হিসাবে প্রথম ব্যবহার করেছিলেন, ‘পাই’ (বৃত্তের পরিধি/ব্যসের অনুপাত) গণনার কৌশল বাতলে দিয়েছিলেন, কোয়াড্র্যাটিক সমীকরণের সমাধান করেছিলেন। ওমর খৈয়াম (Omar Khayyam, ১০৪৮-১১৩১): ইরানের কবি, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, এবং গণিতবিদ। তাঁর আবিষ্কৃত সূর্য-ক্যালেন্ডার বর্তমানে ব্যবহৃত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চেয়ে নির্ভুল ছিল। তিনি কোয়াড্র্যাটিক এবং কিউবিক সমীকরণের সমাধান দিয়েছিলেন। তাঁর লেখা চার-লাইনের কবিতাগুলি রুবাই বলে পরিচিত। দার্শনিক আবু সিনার (Avicenna) ভক্ত এই গণিতবিদ দর্শনশাস্ত্রের উপরেও কয়েকটি বই লিখেছেন। মালেক শাহ (Malik-Shah, ১০৫৩-১০৯২): পারস্যের সুলতান।


    ওমর খৈয়াম :

    “বিধিনিষেধের পীত পরিধান ফাগুন আগুনে দহন করো,
    আয়ু বিহঙ্গ উড়ে চলে যায়, হে সাকি, অধরে পেয়ালা ধরো।”

    মালেক শাহ : আমি সুলতান হলেও তোমাকে বন্ধু বলেই জানি। তোমার রুবাই আমি ভালোবাসি। তবে শুধু কবিতা আর গান লিখে সময় নষ্ট করার মতো সময় তোমার হাতে নেই। তুমি একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং গণিতজ্ঞ । ইরানের ইস্ফাহানে আমি তোমার জন্যে একটি মানমন্দির (observatory) বানিয়ে দিয়েছি। তোমার দায়িত্ব একটা নির্ভুল সূর্য-ক্যালেন্ডার তৈরি করা। চন্দ্র-ক্যালেন্ডার দিয়ে রাজ্য চালানো ভীষণ ঝামেলা, কৃষকরা কখন মাঠে বীজ ফেলবে, প্রজারা কখন রাজকর দিবে, সেনাপতি কখন রাজ্যজয়ে বের হবে, সব তালগোল পাকিয়ে যায়। এ বছর বসন্ত উৎসবের সময়ে ছিল হাড়কাঁপানো শীত!

    খৈয়াম: একটি নিখুঁত সূর্য-ক্যালেন্ডার তৈরী করার কাজ ইতিমধ্যেই শুরু করেছি, সেই সাথে একটি নির্ভরযোগ্য চন্দ্র-ক্যালেন্ডার। তোমার সম্মানে এই সূর্য-ক্যালেন্ডারের নাম রাখবো জালালী ক্যালেন্ডার। এটা হবে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ক্যালেন্ডার। প্রতিদিন সাঁঝে এবং ভোররাতে সূর্যের অবস্থান মেপে চলেছি। কাল রাতে সূর্য জেমিনাই নক্ষত্রপুঞ্জের উপরে ছিল।

    এরিসটারকাস : সাবধান, খৈয়াম, সবার মতো তুমিও টলেমির (Ptolemy, ১০০-১৬৮) পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্ব বিশ্বাস করে বসো না। আমার ধারণা পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, সূর্য একটি নক্ষত্র, তবে আর সব নক্ষত্রেরা সূর্য থেকে অনেক দূরে, তাই তো আমাদের ভোঁতা যন্ত্রপাতি দিয়ে নক্ষত্র-লম্বন (stellar parallax) মাপা যাচ্ছে না। এ যুগে তো মুসলমানরা জ্ঞানে বিজ্ঞানে সবার সেরা। আব্বাসীদ (Abbasid Caliphate, ৭৫০-১৫১৭) খলিফাদের জ্ঞান চর্চায় ভয়ানক উৎসাহ, পৃথিবীর সব দেশের সব ধর্মের জ্ঞানীগুণী বাগদাদে এসে জুটেছে। পৃথিবীর সব বই আরবি ভাষায় অনুবাদ করার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটলের লেখা বই এখন আরবীতে পড়া যায়! শুনেছি ভারত এবং চীনের বেশ কিছু গণিতজ্ঞ এবং বিজ্ঞানী এসেছেন। সবাই মিলে একটু চেষ্টা করেই দেখো না নক্ষত্র-লম্বন মাপা যায় কি না!

    খৈয়াম, মুসলমানদের স্বর্ণযুগ শেষ হয়ে গেছে, ওরা এখন “বিবি তালাকের ফতোয়া খোঁজে কোরান কেতাব পড়ি।” তোমাদের সময় ছিল খ্রীষ্টানদের অন্ধকার যুগ, এখন চলছে মুসলমানদের অন্ধকার যুগ। অন্ধকার যুগের খৃস্টানরা জ্ঞানীলোকদের খুন করতো, স্বাধীনচেতা মেয়েদের ডাইনি বলে পুড়িয়ে মারতো, এখন মুসলমানরা ওই সব কাজের ভার নিয়েছে! খৈয়াম, তোমার সংখ্যাটিকে আমরা কাল্পনিক সংখ্যা বলি। ওদের ছাড়া এখন পদার্থবিদদের একদণ্ড চলে না, কোয়ান্টাতত্ত্ব দাঁড়িয়ে আছে কাল্পনিক সংখ্যার উপরে

    খৈয়াম: দুটো ব্যাপার খুবই গোলমেলে। শুক্র গ্রহ (Venus) মাঝরাতে কখনো দেখা যায় না, শুধুই সন্ধ্যে এবং ভোর বেলায়। তাইতো সবাই ওকে চেনে শুকতারা বা সন্ধ্যাতারা বলে। সূর্য থেকে ওর সবচেয়ে কৌণিক দূরত্ব (maximum elongation) হচ্ছে সাতচল্লিশ ডিগ্রি ৷ ওদিকে মঙ্গল গ্রহ তারাদের মাঝে পশ্চিম থেকে পূবে যায়, কিন্তু কখনো হটাৎ করে কিছুদিনের জন্যে উল্টো দিকে চলে (retrograde motion)৷ আমি যখন ঘোড়ায় চড়ে দ্রুতবেগে ছুটি, খুব পাশের গাছপালা উল্টোদিকে ছোটে বলে মনে হয়, কিন্তু দূরের পাহাড়টি আমাকে অনেকক্ষণ অনুসরণ করে, তারপরে একসময় হাল ছেড়ে দেয়। ওদিকে বহুদূরের চাঁদটি আমার পিছু একেবারেই ছাড়ে না। এর সাথে মঙ্গল গ্রহের গতির দিক পরিবর্তনের একটা সম্পর্ক আছে বলে মনে হয়। পৃথিবীটা কি ছুটে চলেছে? সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টট্ল, টলেমির মতো মহাজ্ঞানী লোকেরা কি ভুল করছেন! অনেক ভেবেছি, না ঘুমিয়ে মঙ্গল গ্রহের দিকে তাকিয়ে কত রাত কাটিয়েছি, কোনো সমাধান খুঁজে পাইনি। এতো বছরের সাধনা বিফলে গেল! তাই তো লিখি রুবাই, নিজেকে দিই সান্ত্বনা,

    “The Moving Finger Writes; and having writ,
    Moves on: nor all thy Piety nor Wit
    Shall lure back to cancel half a Line,
    Nor all thy Tears wash out a Word of it.”

    ব্রহ্মগুপ্ত : তুমি কবিতা এবং বিজ্ঞান আলাদা করে রেখেছো। আমি দুটোকে এক সঙ্গে মিশিয়ে লিখেছিলাম আমার বই “ব্রহ্মাশুদ্ধসিদ্ধান্ত”-এ। আমিও ভেবেছি পৃথিবীর অবস্থান নিয়ে। পৃথিবী ঘুরছে বললে ব্রাহ্মণ পন্ডিতের দল আমাকে একঘরে করে পাগলা গারদে ঢুকিয়ে দিবে।

    খৈয়াম: তোমাকে সালাম জানাই হে ব্রহ্মগুপ্ত! তুমি দূর ভারতের কবি এবং বিজ্ঞানী, তুমি শূন্য সংখ্যাটি আবিষ্কার করেছ, শূন্যের আলজেব্রা তোমার গড়া। কোয়াড্র্যাটিক সমীকরণের সমাধান করেছ, একটি বৃত্তের মাঝে বৃত্তকে স্পর্শ করে আঁকা চতুর্ভুজের আয়তন বের করার সমীকরণ দিয়েছ, “পাই” (একটি বৃত্তের পরিধি/ব্যাসের অনুপাত) গণনার কৌশল বলে দিয়েছ, আরো কত কি! মুসলমান গণিতজ্ঞ আল কিন্ডি (al-Kindi) তোমার মতোই কোয়াড্র্যাটিক সমীকরণের সমাধান বের করেছিলেন। মুসলমানদের স্বর্ণ যুগে তাঁর নাম প্রতিটি আলজেব্রা বইয়ে লেখা থাকতো। আমি নিজে এখন কিউবিক সমীকরণ নিয়ে লেগেছি, ওর জ্যামিতিক সমাধানটা বের করেছি। একটা সাধারণ আলজেব্রা সমাধান বের করতে গিয়ে অদ্ভুত সব সম্যসার সম্মুখীন হচ্ছি, কোনো কোনো সমাধান যেন এক বিয়োগাত্বক সংখ্যার বর্গমূল! তা কি করে হয়? হতবুদ্ধি হয়ে গেছি।

    লেখক : ব্রহ্মগুপ্ত, তোমার সাধের “পাই” একটি অযৌক্তিক সংখ্যা (irrational number) যাকে দুটি পূর্ণসংখ্যার (integer) ভাগফল হিসেবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। গণিতজ্ঞ পিথাগোরাস এমন সংখ্যাকে ঘৃণা করতেন। খৈয়াম, মুসলমানদের স্বর্ণযুগ শেষ হয়ে গেছে, ওরা এখন “বিবি তালাকের ফতোয়া খোঁজে কোরান কেতাব পড়ি।” তোমাদের সময় ছিল খ্রীষ্টানদের অন্ধকার যুগ, এখন চলছে মুসলমানদের অন্ধকার যুগ। অন্ধকার যুগের খৃস্টানরা জ্ঞানীলোকদের খুন করতো, স্বাধীনচেতা মেয়েদের ডাইনি বলে পুড়িয়ে মারতো, এখন মুসলমানরা ওই সব কাজের ভার নিয়েছে! খৈয়াম, তোমার সংখ্যাটিকে আমরা কাল্পনিক সংখ্যা বলি। ওদের ছাড়া এখন পদার্থবিদদের একদণ্ড চলে না, কোয়ান্টাতত্ত্ব দাঁড়িয়ে আছে কাল্পনিক সংখ্যার উপরে। কিছু কোয়াড্র্যাটিক সমীকরণেরও এমন কাল্পনিক সমাধান থাকতে পারে। অংকের কাল্পনিক জগৎ বাস্তব জগতে ধরা দেয়। যেন স্বপ্নে যাকে দেখেছি, ঘুম ভেঙে দেখি সে আমার পাশে বসে আছে! অংকের এই অলৌকিক আচরণ আমাকে ঈশ্বরে বিশ্বাসী করে ছেড়েছে!

    তোমার জালালী সূর্য-ক্যালেন্ডার বর্তমানে ব্যবহৃত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চেয়ে নির্ভুল ছিল, কিন্তু ওকে কেউ মনে রাখেনি। ব্রহ্মগুপ্ত, তোমার শূন্য সংখ্যাটি ছাড়া সব হিসেব অচল, এ যুগের কম্পিউটার শূন্য এবং এক ছাড়া কিছুই বোঝে না। কোয়াড্র্যাটিক সমীকরণ সমাধানের গৌরব এখন ইউরোপিয়ান গণিতজ্ঞরা ভাগ করে নিয়েছে। তোমার এবং আল কিন্ডির কথা কেউ জানে না। একটা সান্ত্বনা যে খৈয়ামের রুবাই ভাগাভাগি হয়নি, ক্ষণস্থায়ী অনিশ্চিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করার মন্ত্র ওরা:

    “সেই নিরালা পাতায় ঘেরা
    বনের ধারে শীতল ছায়
    খাদ্য কিছু, পেয়ালা হাতে
    ছন্দ গেঁথে দিনটা যায় !
    মৌন ভাঙ্গি মোর পাশেতে
    গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর –
    সেইতো সখি স্বপ্ন আমার,
    সেই বনানী স্বর্গপুর !”

    “Ah, make the most of what we yet may spend,
    Before we too into the Dust descend;
    Dust into Dust, and under Dust to lie
    Sans Wine, sans Song, sans Singer, and–sans End!”

    লেখক: পদার্থবিদ ও ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ইমিরিটাস প্রফেসর

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    Latest Posts

    spot_imgspot_img

    সর্বাধিক পঠিত

    Stay in touch

    To be updated with all the latest news, offers and special announcements.