Thursday, January 15, 2026
spot_img
More

    সর্বশেষ

    রুদেবিশ শেকাবের ব্যতিক্রমী জীবন: অদ্ভুত এক সাহিত্যনামা

    কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক হারুন আল রশীদের ২ খণ্ড ৪০ অধ্যায়ের মোট ১৮২ পৃষ্ঠার অদ্ভুত এক সাহিত্যনামা পড়লাম। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র- রুদেবিশ শেকাব, তাকে ঘিরে চরিত্র বিন্যাস, নারীদের প্রতি তার মোহ, প্রেমময় বিষাদে ভরা জীবন, কাঙ্ক্ষিত নারীকে পাবার জন্য অস্থিরতা, জ্যোতিষীর কাছে যাওয়া, উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।

    উপন্যাসের নায়ক, কোন ভৌগোলিক সীমায় তার বেড়ে ওঠা? সেখানকার লোকেদের জীবন যাপনের ধারা, ধর্মীয় বিধান, সব মিলিয়ে আসলে সে কোথাকার বাসিন্দা! ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য, পাদ্রীদের দৃঢ় সামাজিক অবস্থান, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত লোকেদের ব্যর্থ শাসন, আমাদের এই ক্ষুদ্র দেশটির সাথে মেলাবার চেষ্টা করেছি বারবার।

    উপন্যাসের শুরুটা এভাবে,
    “আমি সুখী হতে পারতাম”

    শব্দগুলো পড়ে মনে হোলো একজন অসুখী চরিত্রের সাতকাহন পড়তে চলেছি। পাঠক হিসেবে আগ্রহের দ্বার খুলে যায়, আতিপাতি আর তড়িঘড়ি করে খুঁজতে থাকি সে সুখের ঠিকানা পেলো কিনা বা পেলো না কেন? যদিও সুদুর বা নিকট অতীত দিয়ে শুরু করা বাক্যে খটকাও লাগে, রুদেবিশ পৃথিবীর কোন প্রান্ত থেকে এ কথাটি বলছে? ২য় অধ্যায়ে লেখক রুদেবিশের মাধ্যমে পাঠককে বোঝাচ্ছেন, সে পরলোকের স্বপ্নলোক (!) থেকে তার গল্প বলছে।

    একের পর এক অধ্যায়ের পাঠ পরিক্রমায় আমরা পাই, নারী বর্জিত একটি পরিবারে তার বেড়ে ওঠা হয়তো তাকে নারীদের ব্যপারে কৌতূহলী করে তুলেছিল। রু, একটা স্নেহময় স্পর্শের জন্যও যেন তৃষ্ণার্ত ছিলো। যেটা এক পর্যায়ে মনে হয়েছিলো তার বাবার বাড়িতে আশ্রিত খ্যাপাবুড়ি হয়তো সে হাত বাড়াবেন, বাস্তবে তা হয়নি। যদিও রু চাইতো, বাড়িতে নারীবান্ধব পরিবেশ থাকুক। তার থেকে বয়সে বড়ো লোটাসের সাথে তার সখ্যতা, স্নেহ, মায়া-মমতার বন্ধন গড়ে উঠেছিলো। লোটাস বিনির সাথে ঘর বাঁধতে চেয়েছিলো, সে লোটাসের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বন্ধুদের নিয়ে তাকে নষ্ট করে। রুদেবিশের নারী শরীরের প্রতি আগ্রহ লোটাস তার জীবনের শেষ দিনে মিটিয়েছিলো নিজ ইচ্ছায়, পবিত্র পানি পান করে, যা তারা ধর্মীয় বিধি মনে করেছে। রু প্রথম পুর্ণ নারী দেহের স্বাদ পায়। তাই বোধহয় লেখকের লেখায় উদ্ধৃত হয়, ”আহা লোটাসকে যদি বাঁচানো যেত। সে থাকলে জীবনে আর কখনও নারীর অভাব হত না। সে একাই কত নারী।”

    আশ্চর্যজনকভাবে উপন্যাসের এক পর্যায়ে এসে জানা যায়, খ্যাপাবুড়ি এক রাজকুমারী, পিতা দিওনিশ শেকাবের যৌবন কালের প্রেমিকা। দিওনিশের কাছে থাকার জন্যই খ্যাপাবুড়ি পাগলীনির বেশ ধারণ করে স্বামী-সন্তান-সংসার ত্যাগ করেছে। বহুবছর পর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে কোন এক অসতর্ক মুহুর্তে খ্যাপাবুড়ির সাথে বাবার অনৈতিক সম্পর্ক দেখে ফেলা তাকে দুঃখিত করে। সে আর ফিরতে চায় না। যদিও সে ফেরে শেষবার তার বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিতে।

    রুদেবিশ শেকাবের ব্যতিক্রমী জীবন । হারুন আল রশিদ
    উপন্যাস । প্রকাশক: সৃজন । প্রথম প্রকাশ: বইমেলা-২০২৩ । মূল্য: ৪৫০টাকা
    ঘরে বসে বইটি সংগ্রহ করতে মেসেজ করুন ‘সৃজন’-এর ফেসবুক পেইজে— fb.com/srijon2017 
    রকমারি ডটকম থেকে অর্ডার করতে— www.rokomari.com/book/290130
    কল করুন +৮৮ ০১৯১৪ ৬৯৬৬৫৮

    পারিবারিক শত্রুতার কারণে রু তার বাবা, সেবক নাজিফ নিরিবিলি জীবন যাপন করতেন। পরে খ্যাপাবুড়ি তাদের সংসারে যোগ হয়। লৌহান, গরু চোরের ছদ্মবেশে রুদেবিশের সৎ ভাইয়ের আগমন কিছু সময়ের জন্য উপন্যাসের ধারা অন্যদিকে নিয়ে যায়।  বাবার সৎ ভাই বিওনিশ শেকাবের চিঠি, পরিবারের অতীত নিয়ে নাজিফের বর্ণনা রুদেবিশকে কিছুটা সময় নারী নিয়ে তার আজব ভাবনা জগত থেকে চোখ সরিয়ে যাপিত জীবনের বাস্তবতাকে দেখার সুযোগ করে। তা যদিও স্বল্প সময়ের জন্য।

    উপন্যাসের ২য় খণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে লুনাভা মিনি রুদেবিশের জীবনে প্রেমের শিখা নয় বলবো আগ্নেয়গিরি নিয়ে আসে। লুনাভাকে পাবার জন্য তার আকাঙ্খা, পরিপূর্ণ করে পাবার জন্য জেদ পাগলামির পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ধর্মের বাধা রুদেবিশ আর লুনাভা মিনির মিলনের অন্তরায় হয়েছিলো। তবু লুনাভা মিনিকে পাবার জন্য তার আকাঙ্খা তাকে জ্যোতিষী ধ্রোণ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলো। আমার মতে ধ্রোণের উপদেশ রুদেবের কাছে অসহ্য হলেও, এক সময়ে পথ দেখিয়েছিলো জীবনকে অন্যভাবে দেখবার জন্য।

    উপন্যাসের রসবোধ নিয়ে যদি বলতে হয়, তাহলে বলতে হয় সে দেশের নারী পুরুষদের অসীম প্রজনন ক্ষমতা নিয়ে। যেহেতু পুকুরে, সুইমিং পুলে পুরুষের শুক্রাণু মিশে থাকতো, ধনী পরিবারের কুমারী মেয়েরা গর্ভধারণের ভয়ে পলিথিনের অন্তর্বাস পড়ে স্নানে নামতো। আর দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা খুব কম স্নান করতো ভয়ে। আর একটি যদি যোগ করি, তা হোলো, কৃষকের আকুতি পাড়ার দুষ্ট ছেলেদের কাছে- তাকে উলঙ্গ করুক, তবু তার সবজি নষ্ট না করুক।

    জ্যোতিষী ধ্রোনের উপদেশ “তোমার জন্য ভালো জীবন যাপনের কেবলমাত্র একটা উপায় আছে, তা হোলো, কখনও নারীর ভালোবাসা পাওয়ার আশা না করা”। এই বাণী রুদেবিশের জন্য ভুমিকম্প নিয়ে এলেও, উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে এসে সে এক শুদ্ধ জীবনের দেখা পায়।

    উদভ্রান্তের মতো হাঁটতে হাঁটতে এক রাতে সে বস্তিবাসীর জীবন দেখে। তার উপলব্ধি হয়, এক লুনাভা মিনিকে পাবার জন্য সে কতো রোনা নষ্ট করেছে। আর এ পুঁতিগন্ধময় বস্তির খুপড়ি ঘরে মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। তার মন ভারী হয় যখন নিজেকে এমন এক পরিস্থিতিতে পায়, দেহ বিক্রি করছে এক মা, তার ক্ষুধার্ত সন্তানদের জন্য। আবার সন্তান কেঁদে ফেলছে যখন খদ্দের ফেরত যাচ্ছে। এমন কিছু সমাজের বৈষম্য, দুঃখবোধ থেকে এক সময়ে সে জনসেবার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে।

    তার জীবনের প্রথম ২৩ বছর ব্যতিক্রমী, আর উদ্দেশ্যহীন ভাবে অতিক্রান্ত। লেখকের বর্ণনায় রুদেবিশের জীবনচক্র যদি ৩৩ বছরের হয়, পরের ১০ বছর সে সমাজ কল্যাণে ব্যয় করেছে ধরে নিয়েছি। রুদেবিশের মৃত্যু ঠিক কিভাবে হোলো তা রহস্যই রয়ে যায় শেষাবধি। তবে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করে ইহকাল থেকে পরকালের পথ মসৃণ করেছে, তা ভেবে ভালো লেগেছে পাঠক হিসেবে।

    উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠায় রুদেবিশের ভাবাবেগ লেখক উদ্ধৃত করেন এভাবে,

    “প্রেম এবং প্রেম-সংশ্লিস্ট অনুভুতিগুলো যেমন উদারতা, পরোপকারেচ্ছা, ইত্যাদি ছাড়া আর সব অনুভুতি আপনার জন্য ক্ষতিকর। প্রেম চিরস্থায়ী আর উপকারী অনুভূতি।  তাছাড়া, স্বর্গে প্রেমের অনুভূতি ছাড়া আর কোনও অনুভূতির স্থান নাই। আপনার প্রেম যত গভীর আপনার পরকাল তত সুখের।” 

    উপন্যাসের বিষয়বস্তু একেবারে বিরল না হলেও, লেখকের নির্মাণের মুন্সিয়ানায় চরিত্রগুলো পাঠককে ভাবনার রসদ যুগিয়েছে নিঃসন্দেহে বলা যায়।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    Latest Posts

    spot_imgspot_img

    সর্বাধিক পঠিত

    Stay in touch

    To be updated with all the latest news, offers and special announcements.