Thursday, January 15, 2026
spot_img
More

    সর্বশেষ

    মুহম্মদ ইমদাদ-এর একগুচ্ছ কবিতা

    গ্লাসে পানি খেতে খেতে আপনি অনেকটা গ্লাস হয়ে গেছেন

    মালি শুধু মালি না কিছুটা ফুলও
    সৈনিক শুধু সৈনিক না, একটু রাইফেলও।
    ড্রাইভার একটু গাড়িও।

    ফলে কী হয়?
    ফলে আপনি আমার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে
    আশা করেন, আমি একটু আপনার মতো
    মানে আপনার চোখের মতো দেখি ধান পাখি নারী আকাশ ও স্বপ্ন।
    কিন্তু আমি আমার চোখ দিয়ে হয়তো কিছুই দেখি না।
    হয়তো দেখি আপনার অসুখ ও মৃত্যুর সম্ভাবনা।
    ফলে আপনি ভয় পেয়ে যান।
    আমার থেকে দূরে সরে যেতে যেতে ভাবতে থাকেন,
    প্রতিটি মানুষই একটা একটা ভিন্ন প্রাণি
    কেউ হরিণ কেউ বাঘ কেউ শুয়োর কেউ মাছ
    কেউ গাছ কেউ জিরাফ কেউ সাপ কেউ শকুন কেউ মাছরাঙা কেউ…

    কারণ কসাই একদিন নিজেরে জবাই করবে আমরা জানি
    কারণ শিকারি একদিন নিজেরে গুলি করবে আমরা জানি
    কারণ জেলে একদিন নিজেরেই আবিষ্কার করবে তার জালে আমরা জানি
    কারণ শিক্ষক একদিন পড়া না পারার অপরাধে নিজেরেই পেটাবে আমরা জানি

     

    নো ম্যানস ল্যান্ডের কবিতা

    আমরা যে গাছের নিচে দাঁড়ায়েছিলাম
    তাতে শুধু ফুল ধরতো। ফল ধরতো না।
    ক্ষুধার জ্বালায়
    ফল গাছের দিকে একবার দৌড় দিছিলাম
    পায়ে গুলি করে দিছিলো কে বা কারা
    ফলে আমরা ঐ ফুল গাছের নিচেই থেকে যাই
    প্রথমে চেষ্টা করছিলাম ফুলের গন্ধ খেয়ে বাঁচবো
    দেখি বাঁচা যাবে না।
    মানুষের ক্ষুধার সঙ্গে ফুলের গন্ধের সম্পর্ক নাই
    পরে পাতা খেয়ে
    পরে বাকল খেয়ে
    পরে ফুল খেয়ে
    পরে গাছ খেয়ে
    বাঁচার চেষ্টা করে
    আমরা মরে যাই।
    আমাদের মরা নিয়ে ফল গাছের তলের লোকেরা খুব নাকি হাসাহাসি করছিলো
    হাসতে হাসতে নাকি আমাদের লাশ তাদের কুকুরদের
    খেতে দিছিলো
    কুকুরগুলো খায় নাই
    আমাদের টেনে টেনে নিয়ে নাকি কবর দিছিলো।

     

    পৃথিবী

    ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে আমি একবার পৃথিবীতে যাই
    থাকি প্রায় ৬২ বছর।
    তারপর ফিরে আসি যাওয়ার আগের অবস্থায়।
    একজন মহিলার পেটে চড়ে আমি সেখানে যাই।
    সময় লাগে প্রায় ১০ মাস ১০ দিন।
    পৃথিবীতে পৌঁছে আমি এতটাই বেক্কল হয়ে যাই যে
    আমার কোনো কাণ্ডজ্ঞান থাকে না প্রায় ৪ বছর।
    ততদিন এই মহিলা আর তার প্রেমিক
    আমি আগুনে হাত দিতে চাইলে
    মাটি খেতে চাইলে
    পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিতে চাইলে
    মানা করেন এবং কোলে তুলে নেন
    এবং আমাকে তারা কমলালেবুর রস না খেতে চাইলে
    গরুর দুধ না খেতে চাইলে
    আদর করে হাতে-পায়ে ধরে খাওয়ান
    আমার কাণ্ডজ্ঞান হতে থাকে
    পৃথিবীতে বসবাসের নিয়ম-রীতি রপ্ত করতে থাকি
    আগুনের ধর্ম আর পানির ধর্ম জেনে যাই
    বুঝে ফেলে আমি মানুষ পৃথিবীতে এসেছি
    এখানে বেড়ানো যায় না,কাজ
    এখানে থাকতে হলে ভাত খেতে হয়
    ভাত রোজগার করতে হয়
    রোজগারের ধান্ধা করতে হয়
    মিথ্যা বলতে হয়
    জ্ঞান অর্জন করতে হয়
    ডাকাতি করতে হয়
    অন্যের ভাত কেড়ে আনতে হয়
    এখানে কাঁচা থাকলে চলে না, পাকা
    নগ্ন থাকলে চলে না, জামা
    খালি পায়ে চলে না, জুতা
    খালি হাতে চলে না, ছুরি, চাকু
    এখানে অহংকার লাগে, হুংকার গর্জন লাগে
    আমি ভাবলাম, আমার এসবের দরকার নাই
    পাখির স্বভাবে কদিন বেড়িয়ে যাই
    লোকে বলে চলবে না। তোমার বহু কাজ।
    কাজ করলে টাকা। টাকায় ভাত। জামা। ছুরি।
    আমার টাকা নাই। সবাই আমার ভালো চায়।
    আমাকে তারা একটা উড়োজাহাজের পেটে ঢুকিয়ে দেয়
    উড়োজাহাজের পেট থেকে আমি আমেরিকা নামক
    অন্য একটা পৃথিবীতে পৌঁছে তাজ্জব হই।
    অস্ত্র কারখানায় আমার কাজ হয়। টাকা হয়। ভাত হয়।
    এবং এই অস্ত্র আমাকে একদিন বের করে দেয় পৃথিবী থেকে।
    পৃথিবীর কথা আমার প্রায়ই মনে পড়ে।
    মাঝেমাঝে মনে হয় আবার যাই।
    যাওয়া কি ঠিক?

     

    আম্মা আর আমি

    একবার মধ্যরাতে আমি আর আম্মা
    কুপি হাতে গুণতে গেছিলাম একশো সাতাশটি গন্ধরাজ।

    দুইবার আমি আর আম্মা মধ্যরাতে
    কুপি হাতে
    দেখতে গেছিলাম বাঁশি;
    আম্মা বলেছিলেন, ‘রাবেয়ার প্রথম স্বামী গৌতমের কাজ।’

    তিনবার আমি আর আম্মা
    বাবুবাড়ির নয়া বউ দেখতে দৌড়ে গেছিলাম জানলায়;
    বিষাণের বিষাদসুরে আম্মা বলেছিলেন ‘হায় হায়!

    নদী দেখতে যাই নাই। নদী এসেছিলো নিজে;
    আমাদের দেখে গেছে, মনে মনে চেয়ে গেছে পানি;

    এদেশ মরুভূমি হলে ফলবে না সোনার ফসল;
    এই ভেবে কেঁদে গেছি আম্মা আর আমি

     

    কবিতা না 

    দুপুরে খেতে বসে বাচ্চার দিকে তাকিয়ে
    বউয়ের দিকে তাকিয়ে
    হঠাৎ তার মনে হলো : আমি তো মারা গেছি সাত বছর আগে!
    হঠাৎ তার মনে হলো : কবরে স্বপ্ন দেখা যায় নাকি;
    মরা মানুষের সাত বছর আগের স্মৃতি থাকে নাকি!
    সে বউয়ের দিকে নজর করে তাকায়
    সে বাচ্চার দিকে নজর করে তাকায়
    নিজের বিধবা বউ দেখতে কেমন
    নিজের এতিম বাচ্চা দেখতে কেমন
    স্বপ্নের খাবার টেবিলে তার চোখ ভিজে যায়
    খাওয়া শেষ করে সে পানি খায়
    মনে হয় বাস্তব; মনে হয় সত্যি; মনে হয় পিপাসা মিটতেছে
    সাত বছর আগে সে এইভাবে পানি খেত;
    এইভাবে বউ আর বাচ্চারে দেখত; এইভাবে…
    স্বপ্ন এত স্পষ্ট হতে পারে তার ধারণাতেই ছিলো না
    সে দেখে চুম্বনের অভাবে তার বাচ্চার মুখ এতিমকালার
    চুম্বনের অভাবে তার বউয়ের কপাল বিধবারঙিন
    চোখ ভিজে
    শোবার ঘরের দিকে যায়
    সবকিছুতে তার না-থাকার গাঢ় ছাপ
    বলে, আমার না-থাকার মাঝে কেমনে থাকো তোমরা
    বউ বলে পাগল হইছ? অফিসে যাও।
    সাত বছর আগে এইভাবে বলতো
    মৃত্যুচিন্তা হতো বলে
    হাসতো।
    অফিসে যাওয়ার মতো সে হাঁটে
    চোখ ভিজে স্বপ্নে
    কবরে স্বপ্ন দেখা যায় না কি
    মরা মানুষ কাঁদতে পারে না কি

     

    অপেক্ষা আমাদের আদিম অভ্যাস

    জীবনের কখনো শত শত পাপড়ি ছিলো না।
    যেহেতু জীবন কখনো ফুলের মতো ছিলো না।
    জীবন ছিলো পাহাড়ের মতো। পাথরের পাহাড়।
    আমরা ভাবতাম পাহড়ের ভিতর লুকিয়ে আছে সোনা ও সুখ।
    আর পাথর খুঁড়তাম। পাথর ভাঙতাম।
    ভাঙতে ভাঙতে ঘুম চলে আসতো। ঘুমিয়ে পড়ার আগে ভাত খেতাম।
    ভাত খেতে খেতে বউ বলতো, সুখ কতদূর?
    স্বামী বলতো, রাত পোহালেই।
    রাত ঠিকই পোহাতো কিন্তু সুখ পোহাতো না।
    সুখ ঘুমিয়ে থাকতো অসীম রাত্রি ও পাথরের পেটে।
    ফলে আমাদের পাথর ভাঙার কোনো শেষ ছিলো না।
    যেহেতু পাথরের কোনো শেষ ছিলো না।
    কারণ জীবন মূলত একটি অনন্ত পাথর।
    তবু আমরা পাথর ভাঙতাম। রাতে খেতে খেতে
    রাত পোহানোর অপেক্ষা করতাম। সুখের অপেক্ষা করতাম।
    কারণ অপেক্ষা আমাদের আদিম অভ্যাস।
    আমরা পথ চেয়ে থাকতাম।
    পথ চেয়ে থাকতে থাকতে আমরা মরে যেতাম।
    তবু আমাদের অপেক্ষা শেষ হতো না।
    আমরা কবরে শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করতাম
    পাথরের শেষ বুঝি হলো। সুখ বুঝি এলো।
    আমাদের সন্তানেরা সুখ ও সোনার দেখা পাবে : এই স্বপ্নে
    আমরা কবরকেও বিভোর করে রাখতাম।
    অপেক্ষায় বিভোর থাকতে থাকতে কবরের কাঠামো ভেঙে পড়তো
    কবরে বৃষ্টি পড়তো। শেয়াল বাচ্চা করতো। সাপ বাচ্চা করতো।
    একদিন স্বপ্ন শেষ হতো। অর্থাৎ আমরা স্বপ্ন দেখা ভুলে যেতাম।
    সন্তানকে ভুলে যেতাম।
    একদিন, এমনকী পৃথিবী পরিষ্কার হয়ে যেতো। কোনো মানুষ
    থাকতো না। এবং পাথর অর্থাৎ জীবন অটল পাথরই থাকতো।
    পাথরের পেটে সুখ থাকতো। আমরা তার দেখা পেতাম না।
    ফলে আমরা জীবনকে ভালোবাসতাম না।
    আমরা ভালোবাসতাম আমাদের দুঃখকে।
    আমাদের দুঃখের স্বরূপ অবিকল মায়ের মতো।
    ছেলের মতো। মেয়ের মতো। প্রেমের মতো। মৃত্যুর মতো।
    আমরা আমাদের মৃত্যুকে ভালোবসতাম। কেননা
    মৃত্যুই আমাদের মিথ্যা অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে
    শান্তি দিতো। নরম ও কোমল আর নির্জন আর করুণ শান্তি।

     

    এই কবিতাটির নাম
    বাস্তবতা খুব কঠিন জিনিস

    বাস্তবতা যে কী জিনিস আমি জানি না
    মানুষ বলে তাই আমিও বলি।
    মাঝে মাঝে মনে হয় বাস্তবতাটারে একটু চেনা দরকার
    পৃথিবীতে এলাম, কোন দিন চলে যাই তার কোনো ঠিক নাই
    জিনিসটারে একটু চিনে না-গেলে আফসোস থেকে যাবে।
    কিন্তু কেউ আমারে ভেঙে বলে না

    আর আমি তারে খুঁজতে থাকি।
    কখনো মনে হয় বাস্তবতা আসলে আঙরার বিরুদ্ধে ট্রুথব্রাশ
    বৃষ্টির বিরুদ্ধে ছাতা
    ফুলের গন্ধের বিরুদ্ধে সেন্টের শিশি
    থানকুনি রসের বিরুদ্ধে এন্টাসিড
    মাটির বিরুদ্ধে কার্পেট
    মানুষের বিরুদ্ধে শিক্ষক

    কিন্তু ঠিক বিশ্বাস হয় না নিজেকে
    মনে হয় বাস্তবতারে বুঝতে পারিনি
    হঠাৎ মনে হয়
    চোরের বিরুদ্ধে পুলিশ
    ভিনদেশের বিরুদ্ধে আর্মি
    চুলের বিরুদ্ধে হেয়ার ড্রেসার
    পরিব্রাজকের বিরুদ্ধে ভিসা
    নিঃসঙ্গতার বিরুদ্ধে বিবাহ
    নগ্নতার বিরুদ্ধে পোশাক
    জঙ্গলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিজ্ঞান
    জন্মের বিরুদ্ধে কন্ট্রাসেপটিভ
    গানের বিরুদ্ধে গণিতশাস্ত্র
    স্বপ্নের বিরুদ্ধে স্বর্ণ
    কবিতার বিরুদ্ধে কারিগর/কেরানি
    -বাস্তবতা।
    তবুও ঠিক বুঝতে পারি না।
    কঠিন তো। বোঝা যায় না।

    একদিন আমি বাস্তবতার মুখোমুখি হই
    আর দেখি যে
    আমার মাংস খাচ্ছে আমার স্বজন
    আর হাড্ডি নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে আরো সাত জন
    সেদিন আমি হাড়ে-হাড়ে টের পাই
    বাস্তবতা আসলে একটা পাগল কুত্তা

     

    কারণ আমরা আম্মার অমরতা চাই

    আম্মার কোনো জন্মদিন থাকতে পারে, আমরা কল্পনাও করিনি।
    (অথচ, শোনাতে পাই, তার একটা জন্মদিন ছিলো।)
    অথচ আমরা ভাবি এবং দুইহাজার বছর পরেও ভাববো :
    আম্মার কোনো জন্মদিন নাই। কারণ আম্মা কোনোদিন জন্মগ্রহণ করেন নাই।

    আব্বার প্রেমিকা এই নারী যাকে আমরা আম্মা বলে ডাকি
    যাকে আমরা ভাইবোনেরা একটা ফুলগাছ মনে করি
    কারণ তার পাশে বসে থেকে আমরা আমাদের জীবন সৌগন্ধে ভরে তুলি
    যার নাকের মতো ফুল আর চুলের মতো ফুল আর স্তনের মতো ফুল
    আর গালের মতো ফুল আর কোলের মতো ফুল থেকে
    আমরা মধুর মতো পান করি আয়ু

    আব্বার প্রেমিকা এই নারী যাকে আমরা আম্মা বলে ডাকি
    যাকে আমরা ভাইবোনেরা একটা চিরজীবিত ফলগাছ ভাবি
    যার ডালে ডালে ঝুলে থাকে আম আপেল নাশপাতি লেচু পেয়ারা কামরাঙা
    জলপাই চালতা ধান আর গম আর মৌচাক আর…
    যার পাতার পিছনে থাকে ছায়া। যার পাতায় মাখানো থাকে চিরসবুজ
    যার পাতাকে নাচাতেই জন্ম নেয় হাওয়া
    তাকে ঘিরে আমরা ভাইবোনেরা নাচি
    তাকে ঘিরে আমরা বাঁচি। বাঁচতে আমাদের খুব ভালো লাগে।

    জন্মের পর মৃত্যু থাকে বিধায়, আমরা আম্মার কোনো জন্মদিন
    স্বীকার করি না। যেহেতু আমরা আম্মার কোনো মৃত্যুদিন মানি না।
    অতএব আম্মা কখনো জন্ম নেননি।
    আমরা তার চিরজীবনের পাশে চির অবুঝ শিশু; গান গাই।
    যে গান গায়নি কেউ; কারো সাহস নাই যে গান গাওয়ার
    আমরা সেই গান কণ্ঠে তুলে নিয়ে বেজে যেতে চাই
    কারণ আমরা আম্মার ছেলেমেয়ে বেহালা সানাই
    কারণ আমরা আম্মার অমরতা চাই।

     

    দাম্পত্য

    লালের সাথে কালো মেশাই।
    লাল লাল থাকে না। কালো কালো থাকে না।
    তাদের নতুন একটা নাম হয়। ডাকি।
    সাড়া দেয়। সাড়াটি বোঝা যায় না।
    কীসের আওয়াজ?
    আওয়াজের ভিতর লাল লালের জন্য কাঁদে।
    আওয়াজের ভিতর কালো কালোর জন্য কাঁদে।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    Latest Posts

    spot_imgspot_img

    সর্বাধিক পঠিত

    Stay in touch

    To be updated with all the latest news, offers and special announcements.