Thursday, January 15, 2026
spot_img
More

    সর্বশেষ

    মুনশী ভাইয়ের হজ

    মুনশী ভাই কর্ম জীবন শুরু করেছিলেন একজন শিশু শ্রমিক হিসেবে, দশ বছর বয়েসে বাবাকে হারিয়ে হয়ে গেলেন পাড়ার হাজী সাহেবের বাসার চাকর। যখন পাড়ার ছেলেরা রাস্তার ধারে ক্রিকেট খেলতো, দেখতো ছক্কা মারার স্বপ্ন, তখন মুনশী ভাই স্বপ্ন দেখতেন মক্কা যাওয়ার। মনিব আর মনিবের বউ দুজনেই হাজী, তাঁদের কাছে মক্কার অনেক গল্প শুনেছেন তিনি I জমজমের মিঠা পানি, আরাফাতের ময়দান, মদিনায় নবীজির মসজিদ, সব মুনশী ভাইয়ের চোখের সামনে ভাসে। মুনশী ভাইকে দেখে হাজী সাহেবের মনটা দরদে ভরে উঠে; নবীকরিম এতিম ছিলেন, মা খোদেজা ও নবীজি জায়েদ নামে এক বালককে ক্রীতদাস ব্যবসায়ীর কবল থেকে উদ্ধার করে নিজেদের ছেলে হিসেবে বড়ো করেছিলেন। মুনসী ভাই শিখলেন নামাজ পড়া, মুখস্ত করলেন অনেক দোয়া আর কলেমা, ছাতি হাতে মসজিদের পথে হলেন হাজী সাহেবের নিত্য সঙ্গী। রাতে রান্না ঘরের এক কোনে ঘুমাতেন মুনশী ভাই, পাশের ঘর থেকে গ্রামোফোন রেকর্ডে হঠাৎ ভেসে আসতো ইসলামী গানের সুর, ‘‘পুবাল হাওয়া, পশ্চিমে যাও কাবার পথে বইয়া, যাওগো বইয়া এই গরিবের সালাম খানি লইয়া।’’ সুরের ডানায় ভেসে মুনশী ভাই মুহুর্তে পৌঁছে যেতেন মক্কায়, গানের ঘোরে মনে হতো তিনিও একজন হাজী, চাকর জীবনের সব গ্লানি গেছে মুছে, তাঁর সালাম পৌঁছে গেছে নবীজি আর মা ফাতেমার দরবারে।

    আমার সাথে যখন মুনশী ভাইয়ের পরিচয়, তখন তিনি জীবনের মধ্যাহ্নে। হাজী বাড়ির চাকরি গেছে। রিক্সা চালক, কামলা, রাজ মিস্ত্রির যোগালদার, বেড়া মেরামত, খোয়া ভাঙ্গা, সব কাজের কাজী তিনি এখন। পাড়ার কেউ মারা গেলে মুনশী ভাই কোদাল হাতে গোরস্থানে হাজির, কারো বিয়ে হলে তিনি গেট সাজাতে ব্যস্ত; কলেরা বসন্তের রোগীদের কে আর সেবা করবে মুনশী ভাই ছাড়া? কোদাল, দা, বা কাস্তে হাতে নম্র নেত্রে তাঁর পথ চলা, পরনে লুঙ্গি, গেঞ্জি, গামছা, পায়ে স্পঞ্জের সান্ডেল, মাথায় সাদা টুপি, কাঁচাপাকা দাড়ি, মুখের হাসিটাও নবীজির সুন্নত। অভাবের সংসারে দুবেলা ভাত জোটে না, কিন্তু মক্কা যাওয়ার স্বপ্ন তেমনি অক্ষুন্ন আছে। পাড়াতে হাজীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, হাজীরা মক্কা থেকে নিয়ে আসেন জমজমের পানি ভর্তি বোতল, খোর্মার পুলিন্দা; তার ভাগ মাঝে মধ্যে জোটে মুন্সী ভাইয়ের কপালে। এক শিশি জমজমের পানি তাঁর কাছে মজুদ আছে, অসুখে ধরলে একটু করে খান। হজের সমস্ত প্রক্রিয়া তাঁর মুখস্ত: গোছোল শেষে দুটি সাদা কাপড়ে শরীর ঢেকে ইহরাম, লাব্বাইকা আল্লাহুমা লাব্বাইকা (আমি এসে গেছি, হে আল্লাহ, আমি এসে গেছি) ঘোষণা দিয়ে কাবার চারপাশে ৭ বার ঘোরা, সাফাহ এবং মারওয়া মধ্যে ৭ বার ছোটাছুটি, মসজিদুল হারামে নামাজ পড়া, কোরবানী দেওয়া, মিনাতে যেয়ে পাথর ছোড়া, কাবার কালো পাথরে চুমু খাওয়া। সশরীরে না হলেও কল্পনায় অনেকবার হজ করে ফেলেছেন মুনশী ভাই। হজ করলে জীবনের সকল গুনা মাফ, জান্নাতের দুয়ার একেবার খোলা।

    আতর মেখে তালিমারা সাদা পাঞ্জাবিটি গায়ে দিয়ে পাড়ার মিলাদ মহফিলে হাজির হতেন মুনশী ভাই। বাংলা, আরবি, উর্দুর জগাখিচুরী পাকিয়ে ওয়াজ করতেন ইমাম সাহেব, ‘‘চলো মুসাফির, বাঁধো গাঠুরী, কবর মে জানা পরে গা।’’ নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, মেয়েদের পর্দা, কবরের আজাব, দোযখের আগুন, বেহেশতের নহর, সব বিষয়ে জোরালো বক্তব্য রাখতেন ইমাম সাহেব। হজ করলেই সদ্যজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হওয়া যাবে শুনে মুন্সী ভাইয়ের চোখে আসতো পানি।

    কোরানশরীফে আয়াতের সংখ্যা সব মিলিয়ে ৬২৩৬, তার মধ্যে হজের উল্লেখ আছে প্রায় ৩০ টিতে। এই সব আয়াতগুলির সারমর্ম: সকল অসদাচরণ আর বিবাদ ভুলে আল্লাহকে হৃদয়ে স্মরণ ও ধারণ করে আত্মশুদ্ধির এক আয়োজনে যোগ দেওয়াই হচ্ছে হজ। হজ করলে সব পাপের ক্ষমা মিলবে তার সামান্যতম ইঙ্গিতও নেই এই আয়াত গুলিতে। হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) জীবনে মাত্র একবার হজ করেছিলেন। কোনো বড় পাপ করার মত ক্ষমতা, মেধা, বা শিক্ষাগত যোগ্যতা কিছুই ছিলনা মুনশী ভাইয়ের, সেটা বোঝার মতো বুদ্ধিও তাঁর নেই। কবরের আজাব আর দোজখের আগুনকে তাঁর বড় ভয়, আল্লাহপাক কি তাঁকে কোনদিন হজে যাওয়ার তৌফিক দিবেন ! তিন কাঠা মাটির উপরে বাপদাদার আমলের এক জীর্ণ কুটীর ছিল মুনশী ভাইয়ের সম্বল। তাঁর এক দূরসম্পর্কের চাচা অনেক কৌশলে, মিথ্যা দেনার খতে মুনশী ভাইয়ের জমিটুকু দখল করে তাঁকে গৃহহীন করেছেন; সেই চাচা এ বছর হজ করে ফিরেছেন।

    পড়াশুনা ও চাকরির প্রয়োজনে দেশ ছাড়তে হয়েছে, অনেক বছর পার হয়ে গেলো। শুনলাম বৃদ্ধ বয়েসে মুনশী ভাই শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন, কিছুটা বিকারগ্রস্ত। বাড়ির পাশের তালগাছে এক জ্বীন মিহি সুরে কোরান তেলোয়াত করে, মুনশী ভাই সেটি স্পষ্ট শুনতে পান, ঘুমের ঘোরে মুনশী ভাই লাব্বাইকা আল্লাহুমা লাব্বাইকা বলে কাঁদেন। একদিন খবর এলো মুনশী ভাই মারা গেছেন। মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগলো পবিত্র কোরানের একটি বাণী, ‘‘(কোরবানীর) মাংস, রক্ত, আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, যা পৌঁছায় তা হলো তোমাদের ভক্তিনত হৃদয়ের পবিত্রতা।’’ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজেউন, আমার মুনশী ভাইয়ের পবিত্র হৃদয় ফিরে গেছে তাঁর স্রষ্টার কাছে। হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদতে শুরু করলাম, ‘‘হে আল্লাহ, এই গোনাহগারের একটি মোনাজাত তুমি শোন, তুমি আমার মুন্সী ভাইয়ের কাল্পনিক হজগুলি কবুল করে নাও, তাঁকে জান্নাতবাসী করো।’’

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    Latest Posts

    spot_imgspot_img

    সর্বাধিক পঠিত

    Stay in touch

    To be updated with all the latest news, offers and special announcements.