ফুটবল কোনো ব্যাকরণ-ভাঙা খেলা না হলেও এই খেলাই মানচিত্রের বিভাজন মুছে দিয়ে জন্ম দেয় সর্বজনীন নায়কের। যেখানে তথাকথিত কপি-বুক বা যা কিছু ব্যাকরণ সম্মত তা ফ্রেম করে বাঁধিয়ে রাখা যায়। তবে মনে যা বাঁধা পড়ে থাকে তা কপি-বুককে খানিক কটাক্ষ হেনেই যেন নতুন ব্যাকরণ রচনা করতে চায় । তবে সকলেই নয়, কেউ কেউ পারেন ফুটবলের সেই সাজানো বাগানে বেপরোয়া হাওয়া খেলিয়ে দিয়ে ব্যাকরণ-ভাঙা আনন্দ উপহার দিতে । নিউইয়র্কের ব্রুকলিন ব্রিজ পার্কে জমকালো অনুষ্ঠানে হাজির হলেন এমন পাঁচ বিশ্বজয়ী ফুটবলার— জার্মানির ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমান, ব্রাজিলের কাফু, ইতালির আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো, স্পেনের জাভি হার্নান্দেজ এবং ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান। তাঁদের সবার হাতে একটি করে ‘ট্রাইওন্ডা’।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ সালে এক নতুন দিগন্তে পা রাখতে চলেছে। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো— যৌথভাবে এই মহাযজ্ঞের আয়োজন করবে এবং ৪৮টি দল এতে অংশ নেবে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে অ্যাডিডাস উন্মোচন করেছে বিশ্বকাপের অফিশিয়াল ম্যাচ বল ‘ট্রাইওন্ডা’। নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিন পার্কে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে এই নতুন বলের যাত্রা শুরু হলো, যেখানে মেসি, ইয়ামাল এবং বেলিংহামের মতো তারকারা ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অ্যাডিডাস, দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে বিশ্বকাপের বলের যোগানদাতা হিসেবে, আবারও প্রমাণ করল তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং ফুটবলের প্রতি অবিচল প্রতিশ্রুতি।
‘ট্রাইওন্ডা’ নামকরণ ও এর তাৎপর্য
‘ট্রাইওন্ডা’ নামটি স্প্যানিশ ভাষা থেকে এসেছে, যেখানে ‘ট্রাই’ অর্থ তিন এবং ‘ওন্ডা’ অর্থ তরঙ্গ বা ঢেউ। এই নামকরণের মাধ্যমে তিনটি আয়োজক দেশের মেলবন্ধন এবং ফুটবলের বিশ্বকে এক সূত্রে গাঁথার আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। বলের নকশায়ও এই বিশেষত্ব সুস্পষ্ট। ২০২৬ বিশ্বকাপের মূল আকর্ষণ তিনটি রঙে বিভাজিত হয়েছে—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী নীল তারা, কানাডার প্রতীক লাল মেপল পাতা এবং মেক্সিকোর সবুজ ঈগল। এই প্রতীকগুলি ছোট ছোট করে বলের পৃষ্ঠে খোদাই করা হয়েছে, যা শুধুমাত্র নান্দনিক সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করেনি, বরং খেলোয়াড়দের বলের উপর আরও ভালো গ্রিপ পেতে সাহায্য করবে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো যথার্থই বলেছেন, “২০২৬ সালের বিশ্বকাপের বলের নকশায় তিন আয়োজক দেশ আমেরিকা, কানাডা এবং মেক্সিকোকে তুলে ধরা হয়েছে।”
প্রযুক্তির অত্যাধুনিক সংযোজন
‘ট্রাইওন্ডা’ শুধুমাত্র একটি বল নয়, এটি প্রযুক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। অ্যাডিডাস এবার মাত্র চারটি প্যানেল ব্যবহার করেছে, যা কাতার বিশ্বকাপের বলের চেয়ে ১৬টি প্যানেল কম। এই সরলীকৃত নকশা বলের উড়ন্ত গতি এবং নির্ভুলতাকে বাড়িয়ে তোলে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংযোজন হলো মোশন সেন্সর চিপ, যা বলের একপাশে বসানো হয়েছে। এই চিপ প্রতি সেকেন্ডে ৫০০টি সিগনাল স্টেডিয়ামের চারপাশে বসানো হাবগুলোতে পাঠাতে সক্ষম। এই ডেটা সরাসরি ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) এবং ম্যাচের রেফারিদের কাছে পৌঁছাবে, যা খেলার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে, যেমন অফসাইড, গোল বা হ্যান্ডবলের সিদ্ধান্ত নিতে দ্রুত এবং সঠিক তথ্য দেবে। এতে রেফারির সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় যেমন কমবে, তেমনই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পরিমাণও হ্রাস পাবে। চিপের মধ্যে থাকা এক্সেলারোমিটার এবং জাইরোস্কোপ বলের উপর ক্ষুদ্রতম স্পর্শও শনাক্ত করতে পারে, যা হ্যান্ডবলের মতো সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হবে। এছাড়া, লোকাল পজিশনিং সিস্টেম প্রতি সেকেন্ডে মাঠে বলের পুঙ্খানুপুঙ্খ অবস্থান নিশ্চিত করবে, যা খেলার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করবে। বাকি তিনটি প্যানেল এমনভাবে সেট করা হয়েছে যাতে বলের ভারসাম্য যথাযথ থাকে, যা খেলোয়াড়দের আরও নিয়ন্ত্রিত শট নিতে সাহায্য করবে।
বিশ্বকাপ বলের দীর্ঘ ৯০ বছরের ইতিহাস: এক ফিরে দেখা
‘ট্রাইওন্ডা’র এই উন্মোচন শুধু একটি নতুন বলের আগমন নয়, এটি বিশ্বকাপের বলের দীর্ঘ ৯০ বছরের এক গৌরবময় ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে ‘টি-মডেল’ বল দিয়ে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেবার উরুগুয়ে ফাইনালের দ্বিতীয়ার্ধে এই বল ব্যবহার করে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল, যদিও প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার পছন্দের ‘টিএন্টো’ বল দিয়ে খেলা হয়েছিল। তখনকার দিনে ফাইনাল ম্যাচে বল পছন্দের সুযোগ দুই অধিনায়কেরই ছিল।
১৯৩৪ সালে ইতালিতে তৈরি ‘ফেদের আলোলে ওয়ান ওটু’ বল দিয়ে বিশ্বকাপ খেলা হয়েছিল, যা ইতালির ম্যানুফ্যাকচারিং দক্ষতার প্রতীক ছিল। ১৯৩৮ সালের ফ্রান্সের ‘এলেন’ বলটিও সুতার সেলাই ব্যবহার করে তৈরি হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ‘সুপার বল ডুপ্লোর টি’ এবং ১৯৫৪ সালে সুইজারল্যান্ডের সোনালী রঙের ‘সুইস ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন’ বল আসে, যা দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল। ১৯৫৮ সালের ‘টপ স্টার’ বল সাদা, বাদামী ও হলুদ রঙে পাওয়া গেলেও সাদা বলটিই বেশি ব্যবহার হয়েছিল।
১৯৬২ সালের ‘মিস্টার ক্র্যাক’ বলটি পানি শোষণ সমস্যা নিয়ে সমালোচিত হয়েছিল। এরপর ১৯৬৬ সালের ‘চ্যালেঞ্জ ফোর স্টার’ বল, যার ২৫টি প্যানেল ছিল এবং কমলা ভার্সন ফাইনাল ম্যাচে ব্যবহৃত হয়েছিল, যেখানে ইংল্যান্ডের জিওফ হারস্ট বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম হ্যাটট্রিক করেন।
১৯৭০ সাল থেকে অ্যাডিডাস ফিফা বিশ্বকাপের ম্যাচ বল তৈরির দায়িত্ব গ্রহণ করে, যা আজও অব্যাহত। এই পার্টনারশিপ ফুটবলের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭০ সালের আইকনিক ‘টেলস্টার’ বলটি ছিল টেলিভিশনে প্রথম আন্তর্জাতিক সম্প্রচারের প্রতীক, এবং যে স্যাটেলাইটের নামে এর নামকরণ হয়েছিল, তা সত্যিই একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল।
১৯৭৪ সালের ‘টেলস্টার ডুরলাস্ট’ বলটিকে পানি এবং কাদা প্রতিরোধী করে তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৭৮ সালের ‘ট্যাঙ্গো ডুরলাস্ট’ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল, যা হাতে সেলাই করা এবং ফ্রান্সের তৈরি ছিল। এর ডিজাইন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তী পাঁচটি বিশ্বকাপের বল তৈরি হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল ১৯৮২ সালের ‘ট্যাঙ্গোস্পানিয়া’, ১৯৮৬ সালের ‘আস্তেকা’, ১৯৯০ সালের ‘এথ্রুস্কো ইউনিকো’, ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের ‘কুয়েস্টরা’ এবং ১৯৯৮ সালের ‘ট্রাই কালার’—অ্যাডিডাসের প্রথম তিন রঙের ফুটবল।
২০০০ সালের দিকে ট্যাঙ্গো ধারা থেকে বেরিয়ে অ্যাডিডাস নতুন ডিজাইনের বল নিয়ে আসে। ২০০২ সালের ‘ফিভারনোভা’ বল দিয়ে ব্রাজিল তাদের পঞ্চম বিশ্বকাপ জেতে। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপের ‘টিমজাইস্ট’ (টিম স্পিরিট) বলের ডিজাইনে ট্রফির সামান্য অবয়ব ছিল। ২০১০ সালের আইকনিক ‘জাবুলানি’ বলটি তার অনন্য উড়ন্ত গতির জন্য পরিচিত ছিল, যা ফাইনাল ম্যাচে সোনালী টেক্সচার পেয়ে ‘জবুলানি’ নাম ধারণ করে।
২০১৪ সালের ‘ব্রাজুকা’ বলটি প্রায় ৬০০ ফুটবলার এবং বিজ্ঞানীর ৩০টি দল দ্বারা পরীক্ষিত হয়েছিল। এর বাঁকানো লাইনগুলি ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী উইশ ব্রেসলেটকে ইঙ্গিত করত, এবং ফাইনাল ম্যাচে এর গোল্ডেন টেক্সচার যোগ করা হয়। ২০১৮ সালের ‘টেলস্টার ১৮’ এবং নকআউট স্টেজে এর পরিবর্তিত রূপ ‘টেলস্টার মেকটা’ও বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ‘আল রেহলা’ (যাত্রা) বলটি তার কানেক্টেড বল প্রযুক্তির মাধ্যমে রেফারিদের দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল। সেমিফাইনাল থেকে এর রঙ এবং নামে পরিবর্তন আসে, এবং ‘আল হেলম’ (স্বপ্ন) নাম ধারণ করে।
ভবিষ্যতের দিকে এক নতুন পদক্ষেপ
‘ট্রাইওন্ডা’কেবল একটি বল নয়। এটি নব্বই বছরের উত্তরাধিকার, প্রযুক্তির বিস্ময়, এবং তিন জাতির একতার প্রতীক। এর প্রতিটি ভাঁজে লুকিয়ে আছে গল্প, প্রতিটি রঙে একেকটি সংস্কৃতির আভাস। এর বহু রঙের ডিজাইন এবং ডিপ সিম ব্যালেন্সড সারফেস বলকে হাওয়ায় পরিমিত ফ্লাইট দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিন দেশের ১৬টি শহরে ১০৪টি ম্যাচ আয়োজিত হবে ২০২৬ বিশ্বকাপে। ‘ট্রাইওন্ডা’র এই যাত্রা কেমন হয়, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, এই বল শুধুমাত্র একটি খেলার উপকরণ নয়, এটি ফুটবলের এক নতুন অধ্যায়ের প্রতীক, যা বিশ্বকে একাত্ম করবে, এবং প্রযুক্তির হাত ধরে খেলার অভিজ্ঞতাকে আরও উন্নত করবে। ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষা করছে, কখন মাঠে বাজবে বাঁশি, কখন খেলোয়াড়ের পায়ের ছোঁয়ায় প্রাণ পাবে ‘ট্রাইওন্ডা’। আর যখন সেই মুহূর্ত আসবে, তখন বিশ্ব দেখবে— একটি বল কীভাবে হয়ে উঠতে পারে মানুষের মিলনমেলার প্রতীক, কাব্যের নতুন স্তবক।




