Thursday, January 15, 2026
spot_img
More

    সর্বশেষ

    কফি হাউজের আড্ডাটা আজ আর নেই

    বাংলা গানের প্রখ্যাত গীতিকবি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা এবং মান্না দে’র গাওয়া শিরোনামের জনপ্রিয় গানটির কল্যাণে কলকাতার কলেজ স্ট্রীটের কফি হাউজের নাম-পরিচয় এবং কফি হাউজ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেয়েছিল বাংলাভাষী দুই বাংলার মানুষ। কলকাতার শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় কফি হাউজের গুরুত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কে উচ্চ ধারণাই জন্মেছিল জনমনে। বাস্তবে আশির দশক পর্যন্ত কফি হাউজ ছিল বাঙালি উঠতি তরুণ লেখক, গবেষক, কবি, সাংস্কৃতিক-রাজনীতিক কর্মী হতে সৃজনশীল কর্মকা-ে নিবেদিতদের প্রাণকেন্দ্র। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার নিশ্চয় তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গানটি রচনা করেছিলেন। অপর দিকে গানটিতে কণ্ঠ দেয়া বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে অকপটে স্বীকার করেছিলেন, তিনি কখনো কফি হাউজে যান নি। অথচ তাঁর কণ্ঠেই গানটি খ্যাতিলাভ করেছিল।

    মান্না দে তরুণ বয়সেই বাংলা গানের শিল্পী না হয়ে সর্বভারতীয় প্রচার-প্রতিষ্ঠায় তাঁর কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে’র সঙ্গে বোম্বাই পাড়ি দিয়েছিলেন। বোম্বের হিন্দি ছবিতে গান গেয়েছেন, সুর করেছেন। কিন্তু বোম্বের প্রতিষ্ঠিত গায়কদের অতিক্রম করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি বলেই অবশেষে ফিরে এসেছিলেন বাংলা গানে। অবিকল মাইকেল মধুসূদনের অনুসরণে। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের সাহিত্য-জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার অভিপ্রায়ে মাতৃভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় ঝুঁকে পড়লে ইংরেজরা একজন অইংরেজ নেটিভ ভারতীয় সাহিত্যিককে স্বীকৃতি দেয়া তো পরের কথা পাত্তাই দেয়নি। নিরুপায়ে তাঁকেও ফিরে আসতে হয়েছে মাতৃভাষার কাছে। অগত্যা মধুসূদন দত্ত ইংরেজি সাহিত্য রচনা ত্যাগ করে মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনা করে অমরত্ব লাভ করেছেন। মান্না দে’র ক্ষেত্রেও মাতৃভাষার গান পরিত্যাগে হিন্দি গানের সর্বভারতীয় শিল্পী হবার ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে। মান্না দে পরিণত বয়সে তাই তাঁর আক্ষেপের কথাগুলো গোপন না করে বলেছেন, ‘একমাত্র বাঙালি বলেই আমার হিন্দি উচ্চারণ মোহাম্মদ রফি, মুকেশদের ন্যায় হতে পারেনি।’ শ্লেষে আরো বলেছেন, ‘হিন্দি গানের ভুবনে আই ওয়াজ অ্যান আউট সাইডার।’ প্রত্যেক মানুষের পক্ষে তাৎক্ষণিক ধর্ম পরিবর্তন সহজ-সম্ভব হলেও জাতীয়তার পরিবর্তন অসম্ভব। সুদীর্ঘকাল কোনো বাঙালি জাপান, জার্মান, ইংল্যান্ড, ফ্রান্সে বসবাস করলেও, হতে পারবে না জাপানি, জার্মানি, ইংরেজ কিংবা ফরাসি। তেমনি বঙ্গদেশে বিশ্বের যে কোন জাতির মানুষ সারাজীবন কাটিয়েও বাঙালি হতে পারবে না। জাতীয়তার ভিত্তি স্থায়ী এবং অপরিবর্তনীয়। জাতীয়তার ভিত্তিমূলেই ভাষা-সংস্কৃতি। যেটির পরিবর্তন অসম্ভব।

    আশির দশকে কফি হাউজে গিয়েছিলাম, ওই গানের টানেই। কফি হাউজের বেয়ারাদের সবার অভিন্ন পোশাক মাথায় পাগড়ি। ঔপনিবেশিক আমলের খানসামাদের আদলে। পরিপাটি কফি হাউজ, হল্লা নেই তবে গুঞ্জন আছে। টেবিলে টেবিলে বসা আগতরা মার্টন কাটলেট, মাখন মাখানো পাউরুটি ইত্যাদির সঙ্গে কফি পান করছে। পরস্পরের সঙ্গে গুরুগম্ভীর আলোচনায় মগ্ন। এদিক-ওদিক তাকাবারও ফুরসত কারো নেই। সবাই আলাপে-বিতর্কে মশগুল। উঁচু ছাদ। দোতলা পুরোটা এবং তিনতলার প্রায় অর্ধেক এবং দু’পাশে লম্বা বেলকনি নিয়ে কফি হাউজ। উচ্চৈঃস্বরে কথা কেউ বলছে না বটে তবে পরস্পরের সঙ্গে গম্ভীর আলাপ-বিতর্কের চাপা গুঞ্জন শোনা যেতো। ব্যস্ত বেয়ারাদের নিঃশব্দ ছোটাছুটি, খাবার পরিবেশন সমস্তটাই ছিল আকর্ষণীয়। অতীতের কফি হাউজের ধারাবাহিকতা আশির দশকের তরুণদের বহন করতে দেখেছি।

    আশির দশকে কফি হাউজে গিয়েছিলাম, ওই গানের টানেই। কফি হাউজের বেয়ারাদের সবার অভিন্ন পোশাক মাথায় পাগড়ি। ঔপনিবেশিক আমলের খানসামাদের আদলে। পরিপাটি কফি হাউজ, হল্লা নেই তবে গুঞ্জন আছে। টেবিলে টেবিলে বসা আগতরা মার্টন কাটলেট, মাখন মাখানো পাউরুটি ইত্যাদির সঙ্গে কফি পান করছে। পরস্পরের সঙ্গে গুরুগম্ভীর আলোচনায় মগ্ন।

    আমার দেখা সেই কফি হাউজ যে এতটা বদলে যেতে পারে সেটা কল্পনাও করিনি। অতি সম্প্রতি কলকাতা গিয়ে ভ্রমণসঙ্গীদের চাপে কফি হাউজে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হলো, সেটা এক কথায় ভয়াবহ। বদলে গেছে কফি হাউজ একশ’ আশি ডিগ্রিতে। কফি হাউজের কাঠামো নয়। বদলে গেছে কফি হাউজের পরিবেশ। অনেকবার কলকাতা সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ভ্রমণে গেলেও কফি হাউজে এরমধ্যে যাওয়া হয়নি। কলেজ স্ট্রীটে গেলেও ব্যস্ততার কারণে যাইনি। সে কারণে এবারে দেখা কফি হাউজের পরিবেশ আমাকে বিস্মিত করেছে। নিচতলার গেইটে ঢুকতেই দেখি নকশালবাড়ী আন্দোলনকারীদের স্মরণে পোস্টার দেয়ালে সাঁটা।

    এখনও আত্মত্যাগী আন্দোলনকারীদের তারা অনেকে স্মরণে রেখেছে দেখে ভালো লেগেছিল। চারু মজুমদার, কানু স্যান্নাল, জঙ্গল সাঁওতাল প্রমুখ নকশালবাড়ী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের স্মরণে পোস্টার এবং পোস্টারের বক্তব্যগুলো পড়ে একধরনের তৃপ্তি পেয়েছি। কফি হাউজের সিঁড়িতে ওঠার ডানপাশে সিগারেটের একমাত্র ছোট্ট দোকানটি ঘিরে তরুণ-তরুণীদের জটলা। পাটের মোটা দড়ির আগুন থেকে সবাই একে-একে সিগারেট জ্বালাচ্ছে। তরুণীরা বোম্বেটে মার্কা বিজাতীয় পোশাকে জ্বলন্ত সিগারেট হাতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। কফি হাউজে ঢোকার পূর্বে নিচে তরুণ-তরুণীদের জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে উপরে উঠা দেখে কিছুটা আঁচ করেছিলাম; তবে আমার জন্য যে আরো ভয়ানয় চমক উপরে অপেক্ষা করছে সেটা বুঝতে পারিনি। দোতলায় উঠে কফি হাউজে ঢুকে দেখি কফি হাউজ সিগারেটের ধোঁয়ায় ধোঁয়াচ্ছন্ন। গেইটের ডান পাশে কিছু মাঝ বয়সি নারী-পুরুষ বসে আছে আর বাম পাশের বিশাল অংশে বসে তরুণ-তরুণীরা অবিরাম সিগারেট ফুঁকছে। সেই ধোঁয়ায় কফি হাউজ ধোঁয়াচ্ছন্ন। প্রায় প্রত্যেকের কাছে থাকা মোবাইল ফোন টিপছে, পরস্পর সেলফি তুলছে। খোশ-গল্প করছে পরস্পর। কফি হাউজ অবাধ ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থানে পরিণত। অথচ কলকাতাসহ সারা ভারতে পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ। আইনটির কঠোর প্রয়োগের কারণে ভারতে যত্রতত্র ধূমপান বহুপূর্বেই বন্ধ হয়েছে। অথচ কফি হাউজের চিত্রটি ঠিক বিপরীত। কাউন্টারের দেয়ালে ‘ধূমপান নিষিদ্ধ’ কাগজ সাঁটানো দেখেছি কিন্তু সেটা কেউই তোয়াক্কা করছে না। তিনতলার বেলকনিতে যুগল তরুণ-তরুণীদের প্রকাশ্য বেলেল্লাপনা দেখেও হতাশ হয়েছি। রাখ-ঢাকহীন প্রকাশ্য উচ্ছৃঙ্খলতা বলিউডের স্থূল-কদর্য দৃশ্যকেও হার মানায়। কফি হাউজের তিনতলার অংশটি যেন সাক্ষাৎ নষ্টা বৃন্দাবন।

    কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, সংস্কৃত কলেজ, প্রেসিডেন্সী কলেজ, মেডিকেল কলেজ প্রমুখ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যবর্তী কফি হাউজ। পশ্চিম বাংলার সকল প্রকাশনা সংস্থাসমূহ এবং বই বিপনীগুলো কলেজ স্ট্রীট জুড়ে অবস্থিত। কলকাতার মুক্তবুদ্ধি চর্চা, জ্ঞানের চর্চা, সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা, প্রগতিশীল এবং সৃজনশীল কর্মকা-ের জন্য কফি হাউজ ঐতিহ্যের স্মারক। তার বর্তমান দশা সর্বোপরি তারুণ্যের অবক্ষয় ও অপচয়ের চিত্রটিতে ফুটে উঠেছে কলকাতার বর্তমান সমাজ, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের ছবি। যেটি পশ্চিম বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বর্তমান বিপর্যয়েরই ইঙ্গিত বহন করে।

    বহুপূর্ব থেকে রাজধানী কলকাতা এবং পশ্চিম বাংলা ছিল অবিভক্ত বাংলার সর্বক্ষেত্রেই অগ্রসর অংশ। শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক, গান অর্থাৎ সাংস্কৃতিক সকল মাধ্যমেই কেবল বাংলায় নয় শ্রেষ্ঠতর ছিল গোটা ভারতবর্ষে। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি ভারতবর্ষের অপরাপর জাতির ওপর পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল। আমাদের পূর্ববাংলাও পশ্চিম বাংলার সাংস্কৃতিক বলয়ে প্রভাবিত ছিল। সেই কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ক্রমেই হিন্দি-বোম্বেটে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে-অনুকরণে অবক্ষয়ের দ্বার প্রান্তে। যার নমুনা কফি হাউজে দেখা সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের ভেতর ফুটে উঠেছে। তারুণ্যের অধঃপতন বা অবক্ষয়ের চিত্রটি দিয়েই বিবেচনা করা যাবে পশ্চিম বাংলার সামগ্রিক রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক নিম্নগামী অধঃপতন। শঙ্কা এই যে তারুণ্যের এই অধঃপতনের ক্ষতি তো পূরণ হবার নয়। পশ্চিম বাংলার সাংস্কৃতিক মান যেমন নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে, তেমনি রাজনৈতিক সচেতনতারও বিলোপ ঘটেছে। পুঁজিবাদের নখের আঁচরে পশ্চিম বাংলার রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক আচার, তারুণ্যের অগ্রগামিতা ধসে পড়ার লক্ষণ নানা মাত্রায় প্রকাশ পেয়েছে। অসাম্প্রদায়িকতার দৃষ্টান্ত স্বরূপ পশ্চিম বাংলা ক্রমেই ধর্মান্ধ-উগ্র সাম্প্রদায়িক বিজেপি’র দুর্গে পরিণত হবার অপেক্ষায়। পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্যের শিকার পশ্চিম বাংলা একে একে তার ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে করুণ দশায়। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের গানে কফি হাউজের যে বর্ণনা তিনি দিয়েছিলেন তার ধারাবাহিকতা আশির দশক পর্যন্ত অটুট থাকলেও ক্রমেই সেটা আর অক্ষুণ্ণ থাকেনি। আজকের অধঃপতিত অবস্থানে পৌঁছে গেছে। পশ্চিম বাংলার সংস্কৃতি, মতাদর্শিক রাজনীতি, গণমুক্তির লড়াই, পুঁজিবাদী তৎপরতায় পথ হারিয়েছে। কলকাতার অতীত বাংলা গান, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, নাটক, মতাদর্শিক রাজনীতি মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণ-তরুণীদের আর আকর্ষণ করে না। বিপরীতে বোম্বেটে জীবনাচারকে তারা সানন্দে গ্রহণ করে বাঙালিয়ানাকে বিসর্জন দিয়েছে। পশ্চিম বাংলার মধ্যবিত্তরা নিজেদের জাতিসত্তা পর্যন্ত ত্যাগ করতে সামান্য দ্বিধা করেনি, ওই শ্রেণি উত্তোরন বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার মোহে। সর্বভারতীয় জাতি রূপে নিজেদের জাতিসত্তাকে বিলুপ্ত করে হিন্দি-ইংরেজি মিশেলে বলিউড চলচ্চিত্রের উপাদানে বোম্বেটে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। সকল ক্ষতির মারাত্মক ক্ষতিটি হচ্ছে তারুণ্যের, সে ক্ষতি তো কোনোভাবেই পূরণ হবার নয়। সে ক্ষতির দায় তো পশ্চিম বাংলার সমষ্টিগত মানুষদেরই বহন করতে হচ্ছে এবং হবে। তারুণ্যের অবক্ষয়-অপচয়ের ক্ষতি, পুরো জাতিরই ক্ষতি, সেটা কিসে আর পূরণ হবে!

    ভারতীয় পুঁজিপতিরা ঔপনিবেশিক আমলে এক রাষ্ট্রাধীনের সুবিধা পেয়েছিল। কিন্তু বহু ভাষাভাষী ভারতে বাণিজ্যের অবাধ সুবিধায় এক ভাষা অর্থাৎ হিন্দি ভাষা প্রসারে যার পর নাই চেষ্টা চালিয়েছিল। সাতচল্লিশের পর স্বাধীন ভারতের শাসকেরা পুঁজিপতিদের সেই বাসনা পুরোপুরি পূরণ করেছিল হিন্দি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিয়ে ভারতীয় জনগণের ওপর চাপিয়ে।

    পশ্চিম বাংলার মধ্যবিত্তদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাটি হচ্ছে সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠা। সেই প্রতিষ্ঠালাভে বাঙালি মধ্যবিত্তের সনাতনি বলয়ে আটকে থাকলে সম্ভব হবে না। তাই জাতিগত ভাষা-সংস্কৃতি ত্যাগ করে সর্বভারতীয় হিন্দি-ইংরেজি রপ্ত করা চাই। ভারতীয় শাসক শ্রেণির নির্দেশিত-নির্ধারিত পথেই বাঙালি মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুণীরা নিজেদের গড়ে তুলছে ওই পথালম্বনে। জাতীয়তা ত্যাগে সর্বভারতীয় হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতি গ্রহণের হিড়িক পড়েছে। আর পড়বে না কেন! রাজ্য সরকারের চাকরির তুলনায় কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরিতে দ্বিগুণ বেতন, ভাতা, বোনাস। এমন কি সপ্তাহে একদিনের স্থলে দু’দিন ছুটি। সেতো আকৃষ্ট করবেই। কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি পাবার সকল যোগ্যতার প্রধান যোগ্যতাটি হচ্ছে হিন্দি ও ইংরেজিতে পারদর্শী হওয়া। সেটা ব্যতীত কোনো যোগ্যতাই বিবেচ্য বলে গণ্য হয় না।

    ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী পুঁজিবাদী মতাদর্শী এবং সকল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। শাসকগোষ্ঠীর অনুসৃত পথে অগ্রসর না হলে প্রচার-প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। পুঁজিপতিদের বাণিজ্যিক প্রসার ও সুবিধার জন্যই সর্বভারতীয় হিন্দিকে তারা আশ্রয় করে নিয়েছে। এই শাসকশ্রেণির করতলগত ভারতীয় জনগণ। যাদের না আছে প্রকৃত স্বাধীনতা, না আছে ক্ষমতা। শাসকগোষ্ঠীর দাসানুদাস ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। ভারতীয় সমাজে যেন অসন্তোষের বিদ্রোহ-বিপ্লব সংঘটিত না হতে পারে এজন্য তারা সদা-তৎপর। এই পুঁজিপতিদের মালিকানাধীন টিভি মিডিয়াতে, চলচ্চিত্রে, গণমাধ্যমে অবিরাম স্থূলতা-ধর্মান্ধতার মাদক সরবরাহ করে যাচ্ছে। ধর্মান্ধতার ও অশ্লীলতার আফিমে-মাদকে গুলিয়ে দিচ্ছে জনগণের চেতনা ও জেদ।

    ভারতীয় পুঁজিপতিরা ঔপনিবেশিক আমলে এক রাষ্ট্রাধীনের সুবিধা পেয়েছিল। কিন্তু বহু ভাষাভাষী ভারতে বাণিজ্যের অবাধ সুবিধায় এক ভাষা অর্থাৎ হিন্দি ভাষা প্রসারে যার পর নাই চেষ্টা চালিয়েছিল। সাতচল্লিশের পর স্বাধীন ভারতের শাসকেরা পুঁজিপতিদের সেই বাসনা পুরোপুরি পূরণ করেছিল হিন্দি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিয়ে ভারতীয় জনগণের ওপর চাপিয়ে। এতে যে বহু ভাষাভাষীর ভারতে অসন্তোষের ঘটনা ঘটেনি-ঘটছে না তা কিন্তু নয়। জাতিগত ক্ষোভ-বিক্ষোভ, সংগ্রামকে কঠোর হস্তে দমন করছে বিচ্ছিন্নতাবাদী অভিধায়। প্রত্যেক জাতির জাতিসত্তার ভিত্তিমূলেই ভাষা-সংস্কৃতি। সেই ভাষা ও সংস্কৃতি পরিত্যাগে নানা কৌশল, শঠতা, বলপ্রয়োগ, প্রচার-প্রচারণা, সুযোগ-সুবিধা প্রদানে শাসকগোষ্ঠী সফল যে হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। পার্থিব লোভ-লালসায় মধ্যবিত্তরা প্রতিষ্ঠার ইঁদুর দৌড়ে এক প্রকার ঝাঁপিয়ে পড়েছে। পরিত্যাগ করেছে বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিকে, পুঁজিবাদী মোহে।

    পুঁজিবাদ ব্যক্তিগত মালিকানা ও উন্নতিতে সমর্থন জোগায়। সমষ্টিগত উন্নতি-সামাজিক মালিকানা পুঁজিবাদের প্রধান শত্রু এবং প্রতিপক্ষ। পুঁজিবাদী তৎপরতা ভারতে যেমন আমাদের দেশেও তেমনি ক্রমাগত বিস্তৃতি লাভ করেছে। ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসিতাও দুই দেশেই প্রবল ভাবে ব্যাপৃত।

    বহুজাতির ভারতকে একজাতিতে পরিণত করার প্রবণতা ভারতের পুঁজিপতিদের স্বপ্নাকাঙ্ক্ষা শাসকগোষ্ঠী ষোল আনা পূরণ করেছে। যেখানেই জনগণ জাতি ও শ্রেণিগত আন্দোলনে নেমেছে সেখানেই কঠোর দমন, পীড়ন, নির্বিচার হত্যাকা- ঘটাতে কসুর করেনি, করছেও না। জাতিগত চেতনা-শ্রেণি সংগ্রাম সম্পূর্ণ রূপে বিলুপ্ত করা সম্ভব হয় নি বলেই বিচ্ছিন্ন ভাবে সেটার প্রকাশ ঘটছে অহিংস ও সহিংস দুই পথেই। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়াবার মানুষ নিঃশেষ হয়ে যায় নি। তাই আশা-জাগানিয়া জাতি ও শ্রেণি সংগ্রাম চলছে এবং চলবেও। সেটাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয় জনগণের জন্য আশাবাদ।

    নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    Latest Posts

    spot_imgspot_img

    সর্বাধিক পঠিত

    Stay in touch

    To be updated with all the latest news, offers and special announcements.