Author Picture

সক্রেটিসের কাছ থেকে একজন নেতা কী শিখবেন?-দ্বিতীয় পর্ব

রেজাউল করিম রনি

নেতৃত্বের সক্রেটিসীয় পদ্ধতি

জ্ঞানই ক্ষমতা এবং এর সাথে মিল রেখে যখন বলা হয় সেই ক্ষমতাতে পৌঁছাতে তিন প্রজন্ম পার হতে হয়েছে; মানে-সক্রেটিসের শিষ্য প্লেটো এবং প্লেটোর শিষ্য অ্যারিস্টটল এবং তার শিষ্য আলেকজান্ডার, যিনি সারা দুনিয়ায় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার মিশন নিয়েছিলেন। এবং মহাপরাক্রমশালী শাসকে পরিণত হয়েছিলেন। এমন সরল লাইন সক্রেটিসীয় শিক্ষাকে উপেক্ষা করেই টানা হয়। নেতার প্রতি সক্রেটিসীয় শিক্ষা মোটেও এমন না। আধুনিককালেও যখন এই বিষয়টি গবেষকদের অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে ওঠে তখন বিষয়টার বিভিন্ন মুখীন ব্যাখ্যা বাজারে থাকবে এটাই স্বাভাবি।

স্বনামধন্য মার্কিন বিমান সেনা লেফটেনেন্ট কর্নেল অ্যারন টাকার ২০০৮ সালে ‘লিডারশিপ বাই সক্রেটিক মেথড’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। সেই প্রবন্ধে তিনি সক্রেটিসের যেসব মেথড আলোচনা করেছেন তার পুরোটা আমাদের জন্য খুব একটা কাজের মনে হয় না। হাল আমলের মডিভেশনাল গুরুরা সব কিছুই যেভাবে রেডিম্যাট পদ্ধতিতে নিজের সুবিধার জন্য ব্যাবহারের তরিকা দিয়ে থাকেন অনেকটা সেই পদ্ধতিতেই নেতৃত্বের প্রতি সক্রেটিসের শিক্ষাকে তিনি দেখেছেন। কেননা তিনি যেইসব আমেরিকান নেতাদের উদাহরণ দিয়েছেন তারা সক্রেটিসের পদ্ধতি ফলো করলে আমেরিকার তো এমন প্রভু-শক্তি হিসেবে হাজির হওয়ার কথা না। মানে সক্রেটিসের শিক্ষা কেবল কাগুজে বিষয় নয়। প্রতিদিনের জীবনে সবচেয়ে সেরা নৈতিকতার চর্চার ওপরই সক্রেটিসের দর্শন দাঁড়িয়ে থাকে। এটা জীবন থেকে দূরবর্তী কোন দার্শনিক প্রকল্পমাত্র নয়। এটা সব মানুষের জন্য পালনীয় কর্ম আকারে তিনি হাজির করেন। তারপরেও যে বিষয়গুলো নেতৃত্বের জন্য সক্রেটিসীয় শিক্ষা আকারে দেখা যেতে পারে সংক্ষেপে সেই আলাপ করেই এই লেখা শেষ করছি।

বেঞ্জামিন ফ্রাকলিন তার অটোবায়েগ্রাফিতে স্বীকার করেছেন তার সফলতার পিছনে সক্রেটিসের চিন্তার অবদান রয়েছে। তিনি জটিল পরিস্থিতিতে আলাপের মাধ্যমে সামাধান বের করা এবং উত্তম পন্থা অবলম্বনের সুযোগ তৈরিতে সক্রেটিসের পদ্ধতিকে কার্যকর বলে মনে করেছেন

সক্রেটিস তার অনুসারীদের প্রশ্ন করতেন। তাঁদের জানা বিষয়কে পদ্ধতিগত প্রশ্নের মাধ্যমে সংশয়ে ফেলে দিতেন। এবং তার পরে অনুসরীদের এই বিষয়ে আরও উন্নত চিন্তা কি হতে পারে সেই দিকগুলো নিয়ে ভাবতে বাধ্য করতেন। এবং যে কোন সমস্যার সমাধান তাদের কাছ থেকেই বের করে আনতে চেষ্টা করতেন প্রথমত। এভাবে তিনি অনুসারীদের চিন্তার ক্ষমতাকে প্রসারিত করতে ভূমিকা রাখতেন। একজন নেতারও অনুসারীদের এইভাবে প্রশিক্ষিত করে নেয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত বলে এই চৌকস মার্কিন বিমান সেনা মনে করেন। আধুনিক আমেরিকার অন্যতম রুপকার, দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক নেতা বেঞ্জামিন ফ্রাকলিন তার অটোবায়েগ্রাফিতে স্বীকার করেছেন তার সফলতার পিছনে সক্রেটিসের চিন্তার অবদান রয়েছে। তিনি জটিল পরিস্থিতিতে আলাপের মাধ্যমে সামাধান বের করা এবং উত্তম পন্থা অবলম্বনের সুযোগ তৈরিতে সক্রেটিসের পদ্ধতিকে কার্যকর বলে মনে করেছেন। আমেরিকার সংবিধান প্রণয়নে এই পদ্ধতি তাকে ব্যাপকভাবে সহায্য করেছিল বলে লিখেছেন।

আইনি সমস্যার সমাধানের কাজে সক্রেটিসের পদ্ধতি খুব কাজের। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ব্যক্তির ভেতরের সত্যকে বের করে আনা সম্ভব হয়। অন্যদিকে একজন নেতার জন্য এটা অনুসরণীয় হতে পারে যে, সক্রেটিস কীভাবে তার অনুসারীদের ভেতর থেকে উত্তম চিন্তা-ভাবনা বের করে আনতেন। তিনি কখনও প্রথাগত শিক্ষক ছিলেন না। তিনি স্বাভাবিকভাবে আলাপ শুরু করতেন। আলাপ করতে করতে তিনি অনুসারীকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত ও জ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তুলতেন অনুসারীর নিজেকে কখনও ছাত্র মনে হতো না। একজন নেতাও এই পদ্ধতিতে তার অনুসারীদের প্রশিক্ষিত করতে পারেন। যাতে তারা মনে করবেন উনারা নিজেরা নিজেরাই শিখছেন। তাতে অনুসারীদের আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে।

একজন নেতা যখন ক্রমাগত প্রচলিত নিয়মে প্রশ্ন করে যাবেন তখন অনুসারীদের মধ্যে একটা অস্বস্তির পরিবেশ তৈরি হতে পারে। ফলে এখানে ভনিতা না করে নেতাকেও সক্রিয় হতে হবে। সংলাপী পদ্ধতিতে নেতাকেও প্রমাণ করতে হবে তিনি আসলেই প্রশ্নের উত্তর পেতে চান। তিনি নিজেও চেষ্টা করছেন। অনেক সময় নেতা প্রশ্ন করেন কিন্তু নেতার মনোভাব কী তা প্রকাশ করেন না। নিজের মনোভাব আড়াল করতে অনেকে পাল্টা প্রশ্নের পদ্ধতি ফলো করেন। আবার অনেকে চ্যালেঞ্জিং প্রশ্নের মুখে, যখন অনুসারী বা কোন সাংবাদিক তার উত্তর জানতে চাইছেন তখন তিনি পাল্টা প্রশ্ন তুলে প্রসঙ্গের মোড় ঘুরিয়ে দেন। এই সমস্যাগুলো সক্রেটিসীয় পদ্ধতি ব্যবহারে এড়ানো হয়। এলেংকাস বা খণ্ডননীতির সংলাপে এই ধরণের সমস্যা থাকে না। অন্যদিকে সম্মিলিত সংলাপের পাশাপাশি একজন একজন করে মুখোমুখি কথা বলার মাধ্যমে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের সুযোগ তৈরি হয়। এবং সবার কাছ থেকে পাওয়া সেরা মতামতগুলোকে নিয়ে আবার সংলাপের মাধ্যমে আরও অগ্রসর অবস্থানে যাওয়া সম্ভব হয়- সক্রেটিসীয় পদ্ধতি ব্যবহার করে।

একজন নেতাও যদি অনুসারীদের কাছে মাস্টার বা মোড়ল হিসেবে হাজির না হয়ে সক্রেটিসীয় সংলাপের মতোন সহজভাবে নিজেকে হাজির করেন তখন অনুসারীরা সহজেই নেতাকে বুঝতে পারবেন

সক্রেটিসীয় নেতৃত্বের ধারণায় এই শিক্ষাটা মনে রাখা জরুরী যে, নেতৃত্ব হলো মানুষকে দিয়ে এমন কিছু করানো যা আপনি চান এবং তিনিও (অনুসারী) এটাই করতে চান। এবং একজন নেতা তখনই সফল- তিনি যেটা করতে চান সেটা যখন একইভাবে তার আশে-পাশের লোকজনও করতে চাইবেন। এবং সক্রেটিসীয় পদ্ধতি এখানে খুবই কার্যকর। সক্রেটিস যা করতে চাইতেন গোটা অ্যাথেন্সের জ্ঞানপিপাসু তরুণরা তখন তাই করতে চাইতেন। এবং সক্রেটিস তাদের সামনে হাজির হতেন একজন জ্ঞানানুরাগী হিসেবে। ফলে একজন নেতাও যদি অনুসারীদের কাছে মাস্টার বা মোড়ল হিসেবে হাজির না হয়ে সক্রেটিসীয় সংলাপের মতোন সহজভাবে নিজেকে হাজির করেন তখন অনুসারীরা সহজেই নেতাকে বুঝতে পারবেন। নেতাকে যদি জটিল মনে করেন অনুসারীদের মনে বিশ্বাস তৈরি হওয়ার বদলে সন্দেহ তৈরি হবে। সক্রেটিসীয় পদ্ধতি অনুসারীদের সাথে নেতার নৈকট্য নিবিড় করতে সাহায্য করে। আব্রাহাম লিঙ্কনকে সক্রেটিসীয় পদ্ধতির অনুসারী একজন নেতা হিসেবে গবেষকরা চিহ্নিত করে থাকেন । তিনি তার সহকর্মিদের সাথে সক্রেটিসের মতো আচরণ করতেন। তাদের কাছ থেকে সরাসরি সেরাটা বের করে আনতে চাইতেন -এমনভাবে যেন কাজটা তারাই করছে। তিনি তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু করছেন না। সক্রেটিসও এমনভাবেই হাজির হতেন। কখনও শিক্ষকের মতো না। যেন সামান্য সূত্রধর তিনি। কিন্তু এমনভাবে সমস্যাটাকে হাজির করতেন যাতে অনুসারীদের আত্মজ্ঞান তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আব্রাহাম লিংকনও এই পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। তিনি হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথি নিজে পড়ার পাশাপাশি সহকর্মিদের বলতেন সেগুলার সামারি তৈরি করে তাকে পেশ করতে। এতে কাজ যেমন সহজ হতো সহকর্মিদের দক্ষতাও তৈরি হতো।

আরও একটি কার্যকরী সক্রেটিসীয় পদ্ধতি হলো, কোন বিষয়ে অনুসারীদের চিন্তামূলক সহমত তৈরি করা। ঐক্যমতের চেয়ে শক্তিশালী সম্পর্ক খুব কমই আছে। চিন্তার ঐক্য নেতাকে দ্রুতই শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করে। এবং সক্রেটিস শুন্যহাতে খালি পেটে এই ঐক্য তৈরি করতে পেরেছিলেন তার অনুসারীদের মধ্যে। যার ফলে শাসকশ্রেণিও ভড়কে গিয়েছিল। যেকোন নেতার জন্য বিখ্যাত দার্শনিক মেকিয়াভেলির প্রিন্স গ্রন্থটি যুগযুগ ধরে অতি জরুরী পাঠ্য। মেকিয়াভেলি সক্রেটিসীয় নীতির অনুসরণের পরামর্শ নিয়েছেন রাষ্ট্র নায়ককে। সরাসরি নেতার সাথে সংলাপের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার গুরুত্ব নিয়ে তিনি বিস্তর লিখেছেন। এমন আরও বহু দিক নিয়ে আলোচনা করা যাবে। কিন্তু মূল বিষয় হিসেবে যেটা বুঝতে হবে তা হলো- সক্রেটিসের কাছে সবকিছুর চেয়ে মূল্যবান হলো সত্য। এবং এই সত্যের পথে আসার জন্য সক্রেটিসের পরামর্শ হলো, ‘আপনি যদি সত্যের দিকে আসতে চান তা হলে, আপনার নিজেকেই আসতে হবে, নিজের জন্যই আসতে হবে।’

এখন কথা হলো সক্রেটিসের শিক্ষা কি মানুষ নিয়েছেন। সক্রেটিসের সময়েই একদল সফিস্ট/ছদ্মজ্ঞানী যাদের বিরুদ্ধে সক্রেটিসের মূল সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তারা সক্রেটিসেরই চিন্তার তালিমে অংশগ্রহণও করতো শুধু নিজেদের খ্যাতি ও বাজার তৈরি করার জন্য তার সক্রেটিসকে অনুসরণ করতো। তার অনেক অনুসারীও পরে সক্রেটিসের ঠিক উল্টা পথে নিজেদের পরিচালিত করেছেন। তাকে নিয়ে বিদ্রুপ ও কমেডি নাটক তৈরি করেছেন।
সুখবাদি বা হেডোনিস্ট দার্শনের প্রবক্তারা সক্রেটিসের সরাসরি শিষ্য ছিলেন। কিন্তু ঠিক সক্রেটিসের উল্টা দর্শন তারা প্রচার করেছেন। এমনকি তাঁর অন্যতম প্রধান শিষ্য প্লেটো, যেখানেই তিনি রেডিম্যাট সমাধান দিতে গিয়ে ক্রমাগত সত্যের সংগ্রামে নিয়োজিত হওয়ার পথ থেকে সরে এসেছেন, স্কেপ করেছেন সেখানেই নিজেকে সফিস্ট করে ফেলেছেন। সেইদিক থেকে অনেকে মনে করেন সবচেয়ে বিখ্যাত সফিস্ট হলেন, প্লেটো। যার জবানিতে আমরা সক্রেটিসকে পাই। কিন্তু প্লেটো যখন পেশাদার দার্শনিক হয়ে উঠলেন, বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠা করে একদল বিশেষজ্ঞ তৈরির আয়োজন করলেন, এগুলো সবই সফিস্টদের লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। আজকের দুনিয়ার বেশিরভাগ রাষ্ট্র যে রিপাবলিকান বা জন/গণরাষ্ট্রের ধারণার চর্চা করছে তার প্রবক্তা বলা হয় প্লেটোকে। তাঁর রচিত রিপাবলিক গ্রন্থটি রাজনীতি ও শাসনতন্ত্র চর্চার মহান গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু প্লেটোর চিন্তার মূলশাঁস আসলে সক্রেটিসে নিহিত। সক্রেটিসের রাজনৈতিক ধারণাগুলোর প্লেটোনিক পরিবেশনার মধ্যদিয়ে সক্রেটিসের দর্শনের বিচ্যূতি শুরু হয় বলে মনে করেন অনেক গবেষক।

সক্রেটিসের জ্ঞানের জেল্লা নিয়ে তার পরীক্ষিত ব্যবহারিক জীবনের সংগ্রামকে পাশ কাটিয়ে, সত্যকে অনুন্ধানের নীতি থেকে সরে এসে শুধু বুদ্ধিবাদি চর্চার জোরে যারা দার্শনিক হয়ে উঠেছেন তারা নিজেরা নিজেদের দার্শনিক বলে পরিচয় করাতে পারেন বটে কিন্তু সক্রেটিসীয় উচ্চতায় বা বিচারে তারা সফিস্ট

যদিও সক্রেটিস একটি কাজ ভালোভাবেই করে গিয়েছেন। সেটা হলো- যেনতেন ভাবে জ্ঞান ফলিয়ে দার্শনিক হওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। তাদের তিনি সফিস্ট বা ছদ্ম চিন্তক হিসেবে চিহ্নিত করার কাজটি ভালো মতোই করেছেন। সক্রেটিস দর্শনকে যে স্তরে নিয়ে গিয়েছেন তাতে প্রকৃত দার্শনিক হতে হলে, সদগুণ, সত্য-জ্ঞান এর ব্যবহারিক চর্চায় শামিল হতে হবে। শুধু জ্ঞানগত কচকচানির কোন স্থান সেখানে নাই। এবং কঠিন, পরীক্ষিত জীবন যাপন করেই তা অর্জন করতে হয়। সেই দিক থেকে সক্রেটিসের জ্ঞানের জেল্লা নিয়ে তার পরীক্ষিত ব্যবহারিক জীবনের সংগ্রামকে পাশ কাটিয়ে, সত্যকে অনুন্ধানের নীতি থেকে সরে এসে শুধু বুদ্ধিবাদি চর্চার জোরে যারা দার্শনিক হয়ে উঠেছেন তারা নিজেরা নিজেদের দার্শনিক বলে পরিচয় করাতে পারেন বটে কিন্তু সক্রেটিসীয় উচ্চতায় বা বিচারে তারা সফিস্ট। সেই দিক থেকে সক্রেটিসীয় ধারণার কাছাকাছি বা বিচারে দুনিয়াতে দার্শনিকের সংখ্যা হাতেগোনা। বেশির ভাগই ছদ্ম দার্শনিক। তেমনিভাবে সক্রেটিসের চিন্তাকেও খণ্ডিতভাবে ব্যবহার করে যেমন নকল চিন্তক তৈরি হয়েছে, বিপুল নকল নেতাও তৈরি হয়েছে। তারা শুধু চালাকির আশ্রয় নিয়ে সক্রেটিসের চিন্তার আলোটা নিয়েছেন। নিজেরা আগুনের খনি বা আলো হতে পারেন নাই। সত্যান্বেষী জ্ঞান ও ব্যক্তি একাকার হতে পারে নাই। ফলে দুনিয়াতে সক্রেটিস বা যে কোন প্রকৃত চিন্তকের চিন্তার মূল স্পিরিটাকে বিকৃত করে তাকে নকল করে বহুধরণের চিন্তার বাজারি বিস্তারের জোয়ার আজও প্রবলভাবেই দেখা যায়। কিন্তু তাতে সত্য সাধনের, প্রকৃত চিন্তকের মাহাত্ম্য এতোকুটু কমে না।

সক্রেটিস কোন বিদ্যালয় স্থাপন করেন নি। নিজের নামে কিছু লিখেনও নাই। জীবনে কোনদিন অর্থের বিনিময়ে দর্শন চর্চা করেন নাই। শুধু নিরলস সত্যের দিকে ছুটেছেন। এর বাইরে যারা অস্তিত্বের সত্যের আকুতির চেয়ে অন্যকিছুকে বেশি প্রধান্য দিবে তাদের প্রবণতাকে এক কথায় সফিস্ট বলা যায়। এদের চটকদারিতে তরুণ প্রজন্ম যুগে যুগে বিভ্রান্ত হয়ে থাকে। সক্রেটিসের দর্শনের প্রভাব তাঁর জীবনাবসানের পর থেকেই দুনিয়াতে পড়তে শুরু করে। মাঝখানে খ্রিষ্ট ধর্মের প্রভাবের কারণে গ্রিকদর্শনের ধারা আড়ালে পড়ে গিয়েছিল। এর পরে মুসলিম দার্শনিকদের অনুবাদ থেকে আবার প্লেটো- অ্যারিস্টটল পশ্চিমে অনুবাদ হতে থাকে। ১৫ শতকের পরে আবার নতুন জোয়ার শুরু হয়। দর্শনের সবগুলো ধারাই কোন না কোনভাবে সক্রেটিসের চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে। অন্যতম প্রধান দুটি ধারা এক. এপিসটোমলোজি/জ্ঞানতত্ব ও দুই. অনটলজি/সত্তাতত্ত্ব-এই দুটি ধারাই আদি পুরুষ সক্রেটিস। একই সাথে মেটাফিজিক্স ও যুক্তিবাদি দুই ধারাতেই সক্রেটিসের অবদানকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়। আধুনিক পশ্চিমা দর্শনের এমনকি সক্রেটিসের পরে সবচেয়ে বড় দার্শনিক হেগেল বের হয়ে আসেন সক্রেটিসের স্পিরিটকে ধারণ করেই। ধার্মিকতার আলাপে সক্রেটিস তথাকথিত ধর্মবাদিদের ঈশ্বরের নীতির বিরুদ্ধে ঈশ্বরের নামে নানান বিষয় মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়ার প্রবণার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তিনি একেশ্বরবাদি ছিলেন। প্রচলিত ধর্মের ঈশ্বরের নয় তিনি ধার্মিকতার বিষয়ে অনেক কথা বলেছেন। ধার্মিকতার ভেতর আসলেই সত্য আছে কিনা তা দেখতে চেয়েছেন। এবং তিনি যা করতেন তা ঈশ্বরের অনুগ্রহেই করতেন বলে মত দিয়েছেন। তিনি একধরণের স্পিরিটে বিশ্বাস করেন বলে জানিয়েছেন। এই স্পিরিট বিষয়টি নিয়ে পরর্বতী সময়ে ব্যাপক আলোচনার শুরু হয়। এবং হেগেল সক্রেটিসীয় ধারার আলোকেই নিজের দর্শন বিকাশের পথে এগিয়েছেন। বিভিন্ন লেখায় তিনি সক্রেটিস নিয়ে আলোচনা করেছেন দেখতে পাই। এছাড়া অস্তিত্ববাদী দর্শনের গুরু কিয়ের্কেগার্দ সক্রেটিসের অনুরাগী ছিলেন।

অন্যদিকে মহান জর্মন দার্শনিক নিৎসে একাধিক বইয়ে সক্রেটিসের ওপর লিখেছেন। তিনি বেশ শক্ত ক্রিটিকও করেছেন। বার্থ অব ট্র্যাজেডিতে তিনি গ্রিক দর্শনের এই সক্রেটিসীয় ইভেন্টকে পশ্চিমা দর্শনের সমস্যা হিসেবে ক্রিটিক করেছেন। যদিও নিৎসে ব্যক্তি সক্রেটিসের চেয়ে গ্রিক সমাজকেই বেশি ক্রিটিক করেছেন। তিনি মনে করতেন গ্রিস সমাজ সক্রেটিসের জন্য তৈরি হয়েছিল। সক্রেটিস অ্যাথেন্সকে কব্জা করে ফেলেছিলেন। সক্রেটিস দেখতে খুব নজর কাড়া ছিলেন না- এটা নিয়েও তিনি সমালোচনা করেছেন। সক্রেটিসের নীতি দর্শনের পথ ধরে যেভাবে হেলেনীয় নীতিবোধ এবং এর সাথে যে খ্রিষ্ট নৈতিকতা ও অপরাধবোধের মানসিকতা জন্ম লাভ করেছে তিনি এগুলোর কঠোর সমালোচনা করেছেন।
নিৎসের সূত্র ধরে পশ্চিমা দর্শনের ক্রিটিক এখন আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। সক্রেটিসীয় ইভেন্টকে, এই ধরণের নীতিবোধ থেকে যে দার্শনিকতা বোধের জন্ম হয়েছে, এবং গ্রিক সমাজের সাথে পশ্চিমা দর্শনের উত্থান-পতনের এই সম্পর্ক এবং সক্রেটিসীয় যুক্তিবাদকে একটা সূচনা বিন্দু হিসেবে দেখা, সক্রেটিসের আগের দার্শনিকদের প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ধারাকে বাদ দিয়ে দর্শনের নীতিবাদি ধারা হিসেবে বিকাশের এই সক্রেটিসীয় পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন নিৎসে। এই জন্য তিনি পার্সি ট্রেডিশনে যাত্রা করেছেন। জরাথ্রুস্টকে খুঁজে বের করেছেন।

সব মিলিয়ে এখনকার দুনিয়ায় নিৎসের যে বিপুল প্রভাব এবং তাকে উত্তরাধুনিক চিন্তারও প্রধান গুরু মনে করা হয় তা সম্ভব হয়েছে সক্রেটিসের চিন্তার সাথে মোকাবেলার মধ্য দিয়েই। এবং তিনি সক্রেটিসকে প্রথম থিওরিটিক্যাল চিন্তক হিসেবে মেনে নিয়েছেন। দুনিয়ার দর্শনের পূর্ব-পশ্চিম বিভাজন বাদ দিলে দেখা যায় আজও সক্রেটিসের চিন্তা ও সাধনার জ্যোতি সক্রিয়। সক্রেটিসের পরে পশ্চিমা দর্শনের শক্তিশালী সবগুলো ধারাই সরাসরি সক্রেটিসের চিন্তার ভিত্তির ওপর কোন না কোনভাবে নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু সক্রেটিস যখন চর্চা ও চিন্তাকে একাকার করে দেখেন- এটা কার্ল মার্কসকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে।

সক্রেটিসের পালিয়ে যাওয়া বা মিমাংসার অনেক পথ ছিল কিন্তু যখন তিনি সত্যের জন্য শহিদ হন, তিনি যখন একটা নাম থেকে স্বভাবে পরিণত হন তখন তিনি আর শুধু পশ্চিমের সম্পত্তি থাকেন না। তিনি আমাদের স্বভাবেরও আপনজন হয়ে ওঠেন। যাহোক, গ্রিক দর্শনের ধারাকে পশ্চিমা দর্শন এবং এটাকে পৃথিবীর দর্শন আকারে চর্চার ফলে অন্য সংস্কৃতি ও সভ্যতা এবং চিন্তার ইতিহাসের দিকে আমরা নজর দিতে পারি নাই। ফলে সক্রেটিসের জীবনাবসানের এই করুণ পরিণতিকে দর্শনের শহিদ হিসেবে আখ্যায়িত করে যেভাবে পশ্চিমা দর্শনের ইতিহাস চর্চা শুরু হয় এটা এখন পশ্চিমা দর্শনেরই সমস্যা হয়ে উঠেছে। তারপরেও এটার জন্য সক্রেটিসকে খুব একটা দায়ী করা চলে না। সক্রেটিসের কাছে ব্যক্তি নয়, সত্যই অমর। আর দর্শনের কাজ হলো এই সত্যের কাছে পৌঁছানোর পথকে পরখ করে দেখা। আপনি যাই হোন, নেতা বা কর্মী বা সাধারণ আম-জনতা-এই যাত্রায় সক্রেটিস চিরদিন আমাদের সঙ্গী।

আরো পড়তে পারেন

ত্বহা হুসাইনের দিনগুলি

চৌদ্দ. মিশরের প্রাদেশিক শহর ও গ্রামগুলোতে শিক্ষা যেমন বিরাট মর্যাদার এক বিষয়; শহর ও এর পরিমণ্ডলে থাকা বিভিন্ন শিক্ষা ক্ষেত্রগুলোয় তা একেবারোই উল্টো। আর অবশ্যই এতে আশ্চর্য হওয়ার মত কিছু নেই। কেননা এটিও সম্পূর্ণভাবে চাহিদা ও সরবরাহ আইন; যা ক্রয়বিক্রয় সম্বন্ধীয় অন্যান্য জিনিসের মতো জ্ঞানের ক্ষেত্রেও চলত। এই যেমন, কায়রোতে বিদ্বান আলেমরা স্বাভাবিক আসা-যাওয়া করে।….

ত্বহা হুসাইনের দিনগুলি

তের সে দেখে শহুরে ওই যুবক প্রথম ও দ্বিতীয় দিন কিছুই বলে না তাকে। কিন্তু এই ঘটনা যখন ধারাবাহিক ঘটতে থাকে, তখন একদিন (শায়খ) বাবার চলে যাওয়ার অপেক্ষা করে সে। তারপর বালককে তার মায়ের সামনে বলে, ‘তুমি তোমার বাবার সঙ্গে প্রতারণা করছ এবং তাকে মিথ্যা বলছ। মকতবে পড়াশোনা কিছুই করো না, শুধু কেবল খেলাধুলাই করো….

ত্বহা হুসাইনের দিনগুলি

বারো কিন্তু আলফিয়া!.. আলফিয়া সম্পর্কে কী জানো তুমি? মনে কর আমাদের শিক্ষক এই কিতাবের একটি শব্দও মুখস্থ করেননি। এও মনে কর, আরিফ এই পুস্তকের প্রথম স্তবকটিও ভালোভাবে পড়তে পারবে না। আলফিয়া হচ্ছে কাব্য। আর কোরানে তো কাব্য নেই।   যদিও মাস অতিক্রান্ত হয়। আযহার থেকে ভাইও ফিরে আসে। কিন্ত তার অবস্থা যেমন ছিল তেমনই রয়।….

error: Content is protected !!