Author Picture

পৃথিবী থেকে পলায়ন

খন্দকার রেজাউল করিম

‘‘নূতন আলোয় নূতন অন্ধকারে

লও যদি বা নূতন সিন্ধুপারে…”

‘পৃথিবী থেকে পালাতে চাই। যেতে চাই ল্যানিয়াকিয়া মহাপুঞ্জের কেন্দ্রে। ওখানে কোটি কোটি গ্যালাক্সির মেলা বসেছে। এর জন্যে দায়ী নাকি দ্য গ্রেট এট্ট্রাক্টর। ব্যাপারটা রীতিমতো রহস্যময়। ইচ্ছে করলে তুই আমার সঙ্গী হতে পারিস। এখন অংক কষে দেখতে হবে পৃথিবী থেকে পলায়ন সম্ভব কি না! মানে, খরচপাতি, যন্ত্রপাতি কেমন লাগবে।’

‘বাসা থেকে ইউনিভার্সিটি যাই প্রতিদিন, মায়ের বকাবকি শুনে থলি হাতে বাজারে গেছি কয়েকবার। ল্যানিয়াকিয়া কোথায়, কত দূর এবং ওখানে যেতে ট্রেন, প্লেন, না রকেট ধরতে হবে কিছুই তো জানা নেই।’

‘একটি গ্যালাক্সিতে প্রায় এক’শ বিলিয়ন তারা থাকে। এক বিলিয়ন মানে এক’শ কোটি। একটি তারার আয়তন দশ লক্ষ পৃথিবীর সমান। এরকম এক’শ কোটি গ্যালাক্সি নিয়ে তৈরী হয়েছে ল্যানিয়াকিয়া মহাপুঞ্জ। এখান থেকে ল্যানিয়াকিয়া মহাপুঞ্জের কেন্দ্রের দূরত্ব হবে প্রায় পঁচিশ কোটি আলোক বছর।’

‘আমি বাঁচবো বড়জোর আরো আশি বছর। যেখানে যেতে আলোর পঁচিশ কোটি বছর লাগে সেখানে আমি যাবো কি করে? যাত্রার শুরুতেই তো আমার মরার সময় ঘনিয়ে আসবে। তবে কোনো বৈজ্ঞানিক উপায়ে যদি আমার আয়ু পঁচিশ কোটি বছর করে দিতে পারো তবে মন্দ হয় না।’

‘আলোর বেগে চললে তোর বয়েস আর বাড়বে না। আলোর বেগে চলা সম্ভব না হলেও আলোর কাছাকাছি বেগে চলা সম্ভব। এখনকার গরুগাড়ি মার্কা রকেটগুলোর পেছন থেকে গ্যাস বের হয়। এমন রকেট নিয়ে ছায়াপথ পার হতেই কয়েক কোটি বছর লেগে যাবে। এই ধরণের রকেট বানানো শূন্য সভ্যতার (Civilization-0 বা 0C) প্রাণীদের দ্বারাই সম্ভব। 1C সভ্যতা হলে ওই রকেটের পেছন দিয়ে প্রায় আলোর গতিতে আয়ন (ion, ionized charged particle) বের হতো, 2C সভ্যতা হলে ওরা সময় এবং স্থানের মাঝে সুড়ঙ্গ (wormhole) খুঁড়ে বা আইনস্টাইন-রোজেন সেতু (Einstein-Rosen bridge) বানিয়ে যাত্রা শুরু করতো, 3C সভ্যতা হলে ওরা কোয়ান্টাম জড়াজড়ি (quantum entanglement) পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে এক নিমিষে যে কোনো দূরত্ব অতিক্রম করতো।’

‘পদার্থবিদদের এই এক দোষ, দুর্বোধ্য সাংকেতিক ভাষায় কথা বলা। 0C, 1C, কোয়ান্টাম জড়াজড়ি, আইনস্টাইন-রোজেন সেতু বা আয়ন-রকেট সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। তোমার সঙ্গী হতে হলে ব্যাপারগুলো আমার জানা দরকার।’

‘ইদানিংকালে টেলিফোন কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপনে জেনেরেশন-১ (1G) জেনারেশন-২ (2G), ডিজিটাল ইত্যাদি কথাগুলো শুনেছিস নিশ্চয়। বাংলাদেশ নাকি ইতেমধ্যেই ৩এ তে পৌঁছে গেছে। এ এর আগের সংখ্যাটা যতই বড়, মুঠোফোনের যোগাযোগ ব্যবস্থা ততই উন্নত। ১৯৮০ সালের 1G তে শুধুই কথা বলা যেত, ১৯৯১ সালের 2G তে পাঠানো গেলো টেক্সট, তারপরের জেনারেশনে মুঠোফোন হয়ে গেলো কম্পিউটার। ছবি, সিনেমা, ইন্টারনেট, প্রেমালাপ, ভিডিও-কনফারেন্স, ব্যাঙ্কিং। পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞান এবং গান এসে গেলো হাতের মুঠোয়। কম্পিউটারগুলো নিজেদের মধ্যে খবরাখবর আদানপ্রদান করতে পারে এবং ইচ্ছে করলে এক সাথে কাজ করতে পারে। এই যেমন তোর কম্পিউটার। ফেসবুক আর ভিডিও গেম খেলা ছাড়া আর কি করিস ওখানে? যখন ঘুমিয়ে থাকিস তখন কম্পিউটারটা বেকার বসে থাকে। তুই যদি অনুমুতি দিস তবে সুইজারল্যান্ডের মাটির নিচে বিশাল হ্যাড্রন কোলাইডারের বিজ্ঞানীরা তোর কম্পিউটারটা ওখানে বসেই ব্যবহার করতে পারে। ওদের কম্পিউটার যদিও বেজায় শক্তিশালী তবুও পৃথিবীজুড়ে লক্ষ লক্ষ খুদে কম্পিউটারের যৌথ শক্তির কাছে ওর ক্ষমতা কিছুই না। আগামী বছরে নাকি 5G  প্রযুক্তি এসে যাবে। তখন একজন ডাক্তার আমেরিকায় বসে রোবটের সাহায্যে বাংলাদেশের এক রোগীর উপরে অস্ত্রোপচার করতে পারবে।’

‘এত সব জেনে আমার কি হবে? মুঠোফোনে প্রেমালাপ এবং ভিডিও গেম খেলতে পারলেই আমি খুশি।’

‘এবারে টেকনোলজিক্যাল সভ্যতার কথা একটু বলি। শূন্য সভ্যতার (0C civilization) প্রাণীদের কাজকারবার নিজ গ্রহের ভিতরেই সীমাবদ্ধ। 1C, 2C, এবং 3C সভ্যতা যথাক্রমে সৌরজগৎ, আশেপাশের সৌরজগৎ, সমগ্র গ্যালাক্সি, এমনকি অন্য গালাক্সিতে ভ্রমণ এবং বসবাস করার ক্ষমতা অর্জন করবে।’

‘আমাদের সভ্যতা কোন মাপের?’

‘পৃথিবীর বর্তমান সভ্যতা শূন্য বা 0C সভ্যতা।’

‘1C সভ্যতার দিল্লি আর কত দূরে?’

‘হয়তো আরো দুই’শ বছর। তবে 0C থেকে 1C তে উত্তরণ সবচেয়ে বিপদসংকুল। এই ক্রান্তি-কালে শূন্য সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। গ্রহটি ধ্বংস হলেই 0C সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়, ওরা তো গ্রহ থেকে পালাতে শেখেনি। তবে ৩ঈ সভ্যতা ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। মহাশূন্য বা গ্রহাণু বেল্ট (asteroid belt) থেকে একটি গ্রহাণু ছুটে এসে পৃথিবীকে আঘাত করলেই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কোনো নতুন ধরণের ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া পৃথিবীর মানুষদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। পৃথিবীকে ধ্বংস করে দেয়ার মতো আণবিক বোমা সভ্যদেশগুলোর (!) অস্ত্রভাণ্ডারে মজুদ আছে। বিজ্ঞান এবং টেকনোলজি মানুষের হাতের মুঠোফোন এবং মারণাস্ত্র তুলে দেয়, কিন্তু ভালো মানুষ বানাতে পারে না।’

‘তা কবে নাগাদ আমাদের সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে?’

‘বলা মুশকিল। মেরুর বরফ গলে যাচ্ছে, দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলগুলো দাউ দাউ করে জ্বলছে। ধর্ষিতা পৃথিবী আর বেশি দিন আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না।’

আরো পড়তে পারেন

মুনশী ভাইয়ের হজ

মুনশী ভাই কর্ম জীবন শুরু করেছিলেন একজন শিশু শ্রমিক হিসেবে, দশ বছর বয়েসে বাবাকে হারিয়ে হয়ে গেলেন পাড়ার হাজী সাহেবের বাসার চাকর। যখন পাড়ার ছেলেরা রাস্তার ধারে ক্রিকেট খেলতো, দেখতো ছক্কা মারার স্বপ্ন, তখন মুনশী ভাই স্বপ্ন দেখতেন মক্কা যাওয়ার। মনিব আর মনিবের বউ দুজনেই হাজী, তাঁদের কাছে মক্কার অনেক গল্প শুনেছেন তিনি I জমজমের….

রুক্মিনী, বিন্দু, নোরা

‘‘জাতে হয়তো মেথর হবে, কিংবা নেহাত ওঁচা, যাত্রীঘরের করে ঝাড়ামোছা, পঁচিশ টাকা দিতেই হবে তাকে! এমন হলে দেউলে হতে কদিন বাকি থাকে।’’ বিলাসপুর ইস্টেশনে ট্রেন বদল করতে হবে, ছয় ঘন্টার বিরতি। ধরে নিচ্ছি যাত্রীটি রবীন্দ্রনাথ নিজেই, সাথের বিনু নামের মেয়েটি তাঁর অসুস্থ স্ত্রী মৃণালিনী দেবী। বিনু গল্প জুড়ে দিয়েছে যাত্রীঘরের মেথর রুক্মিনীর সাথে। সব কিছুতেই….

আমেরিকার ফুটবল মা

‘দারুন সে, সুন্দর সে, নহে সে ভোগীর লোচনলোভা।’ -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওরা অনেকেই মা। ওদের মাথায় ঘোমটা নেই। লজ্জা ওদেরকে দেখে লজ্জা পায়! ওরা রুক্ষকেশী, অলক্ষ্মী। খেলার মাঠে ওরা ঝড়ের বেগে ছুটে চলে। ওদের পায়ে মল নয়, বল জড়িয়ে থাকে। মার্কিন মহিলা ফুটবল খেলোয়াড় এলেক্স মরগ্যান, জেসিকা ম্যাকডোনাল্ড, কার্লি লয়েড, মিয়া হ্যাম, এবং ক্রিস্টিন লিলির কথা….

error: Content is protected !!